খান সাহেব পর্ব ৪
সুমাইয়া জাহান
ছাদের মধ্যেখানে গোল করে রাখা হয়েছে পনেরোটা চেয়ার। সকলে মিলে ঠিক করেছে মিউজিকাল চেয়ার্স খেলবে। রাইশা, ইফতিয়া, নাজমিন, সামিয়া, রাইফ, তিশা, সুমু, নিহাল, আইয়ুব, রাহিন, সারবাজ, রিসান আর রাইশার খালাতো বোন মাহি। শেরাজকে তার ফ্রেন্ডরা মিলে জোর করে রাজি করিয়েছে গেমে অংশগ্রহণ করার জন্য। পনোরোটা চেয়ারের মাঝখানে একটা চেয়ার রাখা হয়েছে। ওইখানে মাইশাকে চোখ বেঁধে বসানো হবে। আর বাকি সবাই নিরব দর্শক। তারা সবটা লক্ষ্য করবে— কে চেয়ার আগে বসে। মাইশা সবাইকে গেমের নিয়ম বুঝিয়ে দিল।
সুমুর পিছনে দাড়িয়েছে শেরাজ। এতেই মেয়েটার হাত-পা কাঁপছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি পড়ে যাবে। সুমুর এই অবস্থা শেরাজ খেয়াল করেও— মেয়েটাকে হাঁপানির রোগী ভেবে ব্যাপারটা তেমন একটা পাত্তা দিল না।
শুরু হলো গেম। চোখ বাধা অবস্থায় মাইশা হাতে ফোন নিয়ে বসে আছে। অডিও স্পিকারে “কালা চাশমা” গান বাজছে। সকলে চেয়ারের পাশ দিয়ে গোল-গোল ঘুরছে। হঠাৎ গান বন্ধ করে দেওয়া হলো। গেম থেকে বেরিয়ে গেল মাহি।
একই নিয়মে আবারো গেম শুরু হলো। এইবার বেঁধেছে আবারও এক গন্ডগোল। নাজমিন আর আইয়ুব এক চেয়ারে বসতে গিয়ে আইয়ুবের ধাক্কা খেয়ে নাজমিন আবারও পড়ে গেল। কোমরের ব্যথা আবারও টনটন করে উঠল। ব্যথায় চোখ মুখ খিঁচে ফেলল সে। ব্যথাটাকে কোনোমতে গিলে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকাল আইয়ুবের দিকে। এইদিকে আইয়ুব ঠোঁট কামড়ে হাসছে। আইয়ুবের হাসি দেখে আরও রেগে গেলো নাজমিন। কোমরের ব্যথাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাগ জেকে বসল তার সারা শরীরে। আইয়ুবের দিকে আঙুল তাক করে বলল,
“আপনার সমস্যা কি মিস্টার? আমার কোমরটা কি পুরোপুরি ভেঙে ফেলার প্ল্যান করেছেন আপনি?”
“আশ্চর্য! আমি আবার কি করলাম? ফার্স্ট অফ অল, এইটা একটা গেম ছিল, আর তুমি খেলতে গিয়ে পড়েছো। সেকেন্ড অফ অল, তুমি নিজেকে ব্যালেন্স করতে পারো না। থার্ড অফ অল, এমন পাটকাঠির মতো শরীর নিয়ে ঘুরলে পড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক— এতে আমার কোনো দোষ নেই।”
“কিহ! আমি পাটকাঠির মতো শরীর নিয়ে ঘুরি? আপনি মিস্টার অসভ্য, আমাকে ইচ্ছা করে ফেলেছেন। আমি আগে চেয়ারটায় বসেছিলাম। আপনি আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলেছেন।”
“এই যে ঝগড়াটে লেডি, এই চেয়ারে আগে আমি বসেছি— তুমি না।”
ওদের দুজনের ঝগড়া শুনে— গেম থেকে দুজনকেই বাদ দেওয়া হলো। মাহি এসে নাজমিনকে টেনে তুলে সাইডে একটা চেয়ারে নিয়ে বসিয়ে দিল। আইয়ুব এসে নাজমিনের পাশে দাঁড়িয়ে সামান্য একটু ঝুকে নাজমিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“হেই প্রিটি লেডি! নাম কি তোমার ?”
বিরক্তিসূরে নাজমিন বলল,
“অসহ্য!”
বলেই কোমরের ব্যথা নিয়েই হনহনিয়ে উঠে চলে গেল নাজমিন। আইয়ুব ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“অসহ্য! বাহ্, বেশ ইউনিক নাম তো।”
গেম আবারও শুরু হলো। একে-একে সকলে বেরিয়ে গেলো গেম থেকে। এখন শুধু আছে শেরাজ আর সুমু— মাঝে একটা চেয়ার। দুজনে সমান তালে ঘুরছে। হঠাৎ গান স্টপ করে দেওয়া হলো। হাফ-হাফ করে দুজনেই বসল চেয়ারে। দেহের সাথে দেহের স্পর্শ লাগতেই কেঁপে উঠল সুমুর ছোট্ট দেহখানা। হাত-পা অবশ হয়ে এলে তার। বরফের ন্যায় জমে গেল পুরো শরীর। দৃষ্টি দুজনের-দুজনের দিকে আটকে আছে। সকলে ওদের দুজনের অবস্থা দেখে হতভম্ব। শেরাজের ফ্রেন্ডরা অবাকের শেষ সিমানায়। আইয়ুবের মুখ হা হয়ে গেল। চোখের সামনে যেটা দেখছে— এমনটা যেনো কেউ প্রত্যাশা করেনি। দূরে দাঁড়িয়ে রাগে ফুসছে ইফতিয়া আর রাইশা। চারপাশে নিরবতা দেখে আইয়ুব ঠোঁট টিপে হেসে ওদের দুজনের সামনে গিয়ে মুখটা একটু ঝুঁকিয়ে বলল,
“ভাই কোথায় লস্ট হয়ে গেছিস তোরা? তোরা দুজন’কি পৃথিবীতে আছিস নাকি কল্পনার শহরে হারিয়ে গেছিস? পৃথিবীতে থাকলে আমাদের দিকেও একটু তাকা। আমরাও একটু দেখি তোদের।”
আইয়ুবের কথা শুনে শেরাজ ঘুরে তাকাল ওর দিকে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি পরে বসেছি, ও আগে বসেছে।”
বলেই হনহনিয়ে চলে যাচ্ছিল সে। আইয়ুব ওর হাত টেনে ধরে নিয়ে গেল ছাদের অপর সাইডে।
এদিকে এতক্ষণে সুমু দম ছাড়াল। আর কিছুক্ষণ ওভাবে বসে থাকলে হয়তো দম আটকে মারাই যেতে সে। মাইশা সুমুকে বিজয়ী ঘোষণা করল। আর শুরু হলো নেক্সট গেমের আয়োজন। সকলে গোল হয়ে বসল। একটা জারে অনেক গুলো চিরকুট রাখা হয়েছে। একটা বোতল সবার মাঝে রেখে ঘোরানো হবে। যার দিকে বোতলের মাথা পড়বে। তাকে ওই জার থেকে একটা চিরকুট তুলতে হবে। আর ওই চিরকুটে থাকা ওয়ার্ড অনুযায়ী গান বা নাচ যেকোনো একটা পারফরম্যান্স করতে হবে।
আইয়ুব অনেকক্ষণ ধরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শেরাজের দিকে। এইবার সে মুখ খুলল,
“শেহুবেবী! আমাকে একটা কথা বলতো, এইভাবে লস্ট হয়ে তাকিয়ে ছিলি কেন? এই প্রথমবার তোকে কোনো মেয়ের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম। তুই তো কোনো মেয়ের দিকে ভুলেও তাকাস না। এতো সুন্দরী-সুন্দরী মেয়েরা তোর জন্য পাগল। তাহলে ওই মেয়ের মধ্যে এমন কি দেখলি— যে লস্ট হয়ে তাকিয়ে ছিলি?”
“ওহ! শাট আপ আয়ুবা। কীসব উল্টাপাল্টা বলছিস তুই ? ওইটা জাস্ট একটা এক্সিডেন্ট ব্যাস। আর কিছুই না। এইটার আর কোনো বাজে মানে বের করবিনা।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে! মেনে নিলাম এইটা একটা এক্সিডেন্ট। কিন্তু তুই যে আজ পযর্ন্ত কোনো কিছুতে হারিসনি— সেটা গেম হোক বা বিজনেসের ক্ষেত্রে। আর সেই তুই দ্য ওয়ার্ল্ড ফেমাস বিজনেসম্যান শেরাজ খান বাহাদুরখেল এস.কে ফ্যাশান গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র ওনার— সে কিনা এইটুকু একটা পুচকে মেয়ের কাছে হেরে গেল। তোর ফলোয়াররা এইটা শুনলে— আমাকে বলবে, আমি নেশা করেছি। তবুও এই এতোবড় সত্যি কথা বিশ্বাস করবেনা। মুজে তো লাগতাহে ডালমে কুচ কালাহে। কিরে ভাই সামথিং সামথিং?”
বিরক্তির চোখে শেরাজ তাকাল আইয়ুবের দিকে। মুখ ফুটে বলল,
“হোয়াট দ্য….”
কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারল না শেরাজ। তার আগেই আইয়ুব বলল,
“থাক ভাই! আর বলিস না। সামথিং ইজ রং, আমি বুঝে গেছি।”
“আইয়ুব! তো আমি কি করতাম? তোর মতো ওইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতাম?”
“আমি মোটেও পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করিনি। ডিসটেন্স মেইনটেইন করেই ঝগড়া করেছি।”
আইয়ুবের কথা শুনে আর কিছুই বলল না শেরাজ। ওমানে সে সবসময় ওর সব বন্ধুদের পিছে লাগত। আর এখন ওর বন্ধুরা ওর পিছে লেগেছে। সুযোগের সৎ ব্যবহার করে রিভেঞ্জ নিচ্ছে ওরা।
আইয়ুব টেনে নিয়ে এলো শেরাজকে। কিন্তু এইবার আর ওর বন্ধুরা ওকে কিছুতে পার্টিসিপেট করতে বলার সাহস পেল না। কারণ ওরা খুব ভালো করেই জানে— ছেলেটা এমনিতে অনেক ফানি মুডে থাকে সবসময়, কিন্তু একবার রেগে গেলে ওকে সামলানোর ক্ষমতা কারও নেই। সবকিছু ভেঙ্গে চুরে শেষ করবে, আর যে ওর রেগে যাওয়ার কারণ হবে— তাকে ধ্বংস করে তবে শান্ত হবে। এখন ওকে আর কিছুতে অংশগ্রহণ করতে বললে শিওর সবাই মিলে কেলানি খাবে। বন্ধু টিমের সবাই ওকে খুব ভালো করে চিনে। ওর ওই পালোয়ানের মতো হাতের একটা ঘুষি মুখে পড়লে মুখের মধ্যে আর একটা দাঁতও অবশিষ্ট থাকবে না।
আইয়ুব ভাবল, বিয়ে বাড়িতে এসে একটা খাবারও খেতে পারবেনা। বিয়ে হবেনা কোনদিন। সবাই ওকে “ফোকলা আইয়ুব” বলে ডাকবে। না না এমনটা কখনই চায়না আইয়ুব।
মনে মনে এতসব ভেবে— নিজের অজান্তেই হাত নিজের মুখের ওপর রেখে একপলক শেরাজের দিকে তাকিয়ে মানে-মানে কেটে পড়ল সে।
আসার পর থেকে একবারও নিজের প্রেয়সীর সাথে কথা বলতে পারেনি রাহিন। তার প্রেয়সী বড্ড চঞ্চল কিনা। একদণ্ড ও একটা জায়গায় বসে থাকে না। কিন্তু তার অবাধ্য চোখ আর ব্যাকুল হৃদয় যে, এই চঞ্চল মেয়েটাতেই পড়ে থাকে। এই যে, এখনো তার অবাধ্য চোখ তার প্রেয়সীতে আটকে আছে। কতগুলো বছর পর তার ছোট প্রেয়সীকে দেখছে সে। এই চোখে যে অনেক তৃষ্ণা তাকে মন ভরে দেখার। একযুগ তাকে চোখের সামনে বসিয়ে রাখলেও হয়তো এই দেখা শেষ হবে না রাহিনের। আর না দেখতে-দেখতে কোনো বিরক্তি আসবে তার মধ্যে । ছোট্ট থেকেই মেয়েটা জেদি আর চঞ্চল। একমাত্র রাহিন ছাড়া কারও কথা শুনত না। রাহিনও ছোট থেকে ওর সব আবদার পূরণ করত। আধো-আধো কন্ঠে রাহিনকে ভাইয়া বলে ডাকতে-ডাকতে দৌড়ে আসত। এসেই নানান রকম আবদার করত, অভিযোগ শুনাত। সেই ছোট্ট মেয়েটা যে কখন তার মনে এইভাবে জায়গা করে নিলে— বুঝে উঠতে পারেনি রাহিন।
হঠাৎ সকলের চেঁচামেচিতে ধ্যান ভাঙাল তার। বোতলের মুখ গিয়ে পড়েছে সুমুর দিকে। সুমুর সামনে চিরকুট ধরা হলো। সে একটা চিরকুট তুলে নিল। চিরকুট খুলে দেখল তাতে “ক” লেখা। সকলে মিলে বলল সুমুকে গান গাইতে। ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে উঠে এসে ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে নরম সুরে গান ধরল সুমু।
“হ্যে তামান্না হামে, তুমহে দুলহান বানায়ে!
মেরে হাতো-পে মেহেন্দি, তেরে নাম কি সাঁজায়ে!
তেরি লেলে বালায়ে, তেরে সাদকে উতারে!
হ্যে তামান্না হামে, তুমহে আপনা বানায়ে!
নেহি মুশকিল ওয়াফা, জারা দেখো ইয়াহা!
তেরে আখোমে বাছতা-হে মেরা যাহা!
কাভি শুনতো যারা, যো ম্যা কেহনা সাকা!
মেরি দুনিয়া তুম-হি হো, তুম-হি আছরা!
দুয়ায়ে সুনো, সাজায়ে সুনো
মুঝে পেয়ার হুয়া থা, ইকরার হুয়া থাকা
কাহানী সুনো, জুবানি সুনো
মুঝে পেয়ার হুয়া থা, ইক-রার হুয়া থা
মুঝে – পেয়ার হুয়াথা, পেয়ার হুয়াথা, পেয়ার হুয়াথা, পেয়ার হুয়াথা”
গান শুনে সকলে অনেক প্রশংসা করল তার। সকলের মুখ থেকে প্রশংসা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেল সুমু। শুধু একটা মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথায় বলল না। সুমুতো আশা করেছিল— সেও হয়তো কিছু বলবে। কিন্তু সে কিছু বলল না বলে সুমুর একটু মন খারাপ। সে আবারও পূণরায় জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল।
কিন্তু সুমু জানতেই পারল না। সে যখন আকাশের পানে তাকিয়ে গান গাইছিল। তখন কেউ চোখ বন্ধ করে খুব মন দিয়ে তার গান শুনছিল। শুধু লস্ট হয়ে তাকিয়ে থাকতে পারেনি। কারণ এইভাবে তাকিয়ে থাকা হয়তো তার পার্সোনালিটির সাথে ম্যাচ করে না। তাই হয়তো তখন তার বন্ধু আইয়ুব ওইভাবে তার পেছন লাগছিল।
পার্টি শেষে সকলে গ্রুপে “আরে আভিতো পার্টি শুরু হুয়িহে” গানে ড্যান্স করে, কেক কেটে অনুষ্ঠান শেষ করল। তারপর ছাদের সব জিনিসপত্র গুছিয়ে, সকলে চলে গেল যার যার রুমে।
আইয়ুব শেরাজের কাধে হাত রেখে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৪
“চল! ভাই রুমে যাই।”
“তোরা যা। আমি স্যান্ডির সাথে কথা বলে আসছি।”
“ওকে আয়। আমরা গেলাম।”
কথাটা বলেই বাকি বন্ধুদের সাথে চলে গেল আইয়ুব।
ছাদে দাঁড়িয়ে থেকে পুরোটা দেখল সুমু। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারপর নিজের রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। রুমে দিকে যেতে-যেতে মনে-মনে বলল,
“রুমে গিয়ে আজকের দিনটার সবকিছু ডায়েরিতে লিখে স্মৃতি করে রাখবে।”
