খান সাহেব পর্ব ৬৬
সুমাইয়া জাহান
বেলা বাজে ১২: ১০। সুমু শাওয়ার নিয়ে এসে আয়নার সামনে বসে চুল শুকাতে ব্যস্ত। ভেজা চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে। আয়নার কুয়াশা ভেদ করে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সুমু হালকা লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিল। ঠিক তখনই শেরাজ পিছন থেকে এসে দু’হাত দিয়ে সুমুর কাঁধ জড়িয়ে নিল। হঠাৎ চমকে উঠে সুমু ঘুরে তাকাতেই শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,
“কি হলো? এতো সুন্দর লাগে কেন সবসময়?”
সুমু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“ছাড়ুন তো, ভিজে যাচ্ছেন।”
শেরাজ মৃদু হেসে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
“ছাড়ব না, ভালোবাসতে চাই।”
“ছাড়ুন! লাগবে না আপনার ভালোবাসা।”
“সত্যি লাগবে না আমার ভালোবাসা?”
“না!”
“আমি তবুও তোমাকে ভালোবাসব।”
সুমু মৃদু হেসে বলল,
“আমাকে এতো ভালোবাসার কারণ কি, স্যার?”
শেরাজ সুমু কাঁধে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“আপনাকে ভালোবাসার জন্য কোনো কারণ দেখানোর প্রয়োজন নেই, ম্যাডাম। আমি আপনাকে ভালোবাসি, তাই ভালোবাসি। ভালোবাসার জন্য যদি কোনো নির্দিষ্ট কারণ দাঁড় করাই, তাহলে তো আপনাকে শুধু সেই কারণটুকুর জন্যই ভালোবাসতে হবে। কিন্তু সময়ের সাথে যদি সেই কারণ একদিন আপনার মধ্যে থেকে হারিয়ে যায়, তাহলে কি আমার ভালোবাসাও হারিয়ে যাবে? না ম্যাডাম, ভালোবাসা তো এমন নয়। তাই আপনাকে আমি কোনো কারণ ছাড়াই নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসি।”
সুমু আলতো হাসল। শেরাজ টেবিল থেকে হেয়ার ড্রায়ারটা তুলে নিয়ে সুমুর হাতে দিয়ে বলল,
“এটা দিয়ে শুকাও, না হলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। আমি কিন্তু আমার বেবিকে সামান্যতম কষ্টও পেতে দিতে চাই না।”
সুমু শেরাজের দিকে একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে আবার আয়নার দিকে তাকাল। শেরাজ পাশে দাঁড়িয়ে তার চুলের ভেজা গোছা আঙুলে জড়িয়ে খেলতে লাগল।
চুল শুকিয়ে সুমু আয়নার সামনে বসেই শেরাজকে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, আপনি আজকে কোথাও যাবেন না তো?”
শেরাজ হেসে বলল,
যাব-ই তো, তবে একা না। তুমিও আমার সাথে যাবে। তাই তো সকালে বলেছিলাম, বিকালে একটা জায়গায় যেতে হবে।”
সুমু কপালে ভাঁজ ফেলে তাকাল
“কোথায় যাব আমরা?”
শেরাজ রহস্যমাখা চোখে তাকিয়ে বলল
“সেটা এখন বলব না। চমক না থাকলে কি মজা আছে?”
সে কাবার্ড থেকে একটি হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি বের করে এনে সুমুর হাতে দিল।
“এটা পরে রেডি হও।”
সুমু শাড়িটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে বলল,
“এই শাড়ি তো আমি আগে দেখিনি।”
শেরাজ মুচকি হেসে তার কানে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি দেখোনি মানে, আগে ছিলনা—আমি তোমার জন্য নতুন করে এনেছি।”
সুমুর গাল লাল হয়ে উঠল। সে লাজুক ভঙ্গিতে শাড়িটা নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটল। শেরাজ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল চোখে ভরপুর ভালোবাসা আর অপেক্ষা নিয়ে।
সুমু রেডি হয়ে ওয়াশরুমের দরজা খুলতেই ঘরটি আনন্দের উল্লাসে ভরে উঠল।
“কংগ্রাচুলেশন!”
সবার কণ্ঠ একসাথে। সুমু অবাক হয়ে তাকাল। তার রুমে উপস্থিত সবাই। অনন্যা খাতুন, শাহবাজ খান, শেহেজাদ খান, আফিয়া খাতুন, সারবাজ, আরবাজ, ইশিতা, শাহরুখ, রিয়াজ, ফিরোজা, আদনান চৌধুরী, রুহি খাতুন, নাতাশা আর ইনায়া। প্রত্যেকের হাতে ফুল, মুখে হাসি, আর চোখে উচ্ছ্বাস।
অনন্যা খাতুন ধীরে এগিয়ে এসে সুমুর কপালে আলতো করে ভালোবাসার ছোঁয়া দিয়ে বললেন,
“সুখী হও, মামনি! আমরা সবাই জানি, তুমি শেরাজের সাথে আবারও এক নতুন জীবন শুরু করছ। আর খুব শীঘ্রই আমদের পরিবারে নিউ অতিথিও আসছে।”
সুমু চোখের অশ্রু ধরে লাজুকভাবে হাসল। তার দিকে তাকিয়ে শেরাজ হালকা চোখে ইশারা করল। সুমুর হৃদয় আনন্দে ভরে উঠল। ফিরোজা দৌড়ে এসে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। সে এখন স্পষ্ট করে কথা বলে। সুমু দু’হাতে ফিরোজাকে আগলে নিল। রিয়াজ এসে সুমুর পাশে দাঁড়াল। সুমু একহাতে রিয়াজের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। আফিয়া খাতুন সুমুকে মিষ্টি খাইয়ে দিল।
শেরাজ অনন্যা খাতুন আর সাহাবাজ খানের সামনে গিয়ে বলল,
“মম,ড্যাড! আজ রাতে আমরা সবাই বিডিতে যাচ্ছি, তোমরা সকলে জানো তো?”
অনন্যা খাতুন ছেলের চোয়াল ছুঁয়ে চুমু খেয়ে বললেন,
“হ্যাঁ বেটা! সাবধানে নিয়ে যাবে আমার মামনিকে।”
এরই মধ্যে নাতাশা এগিয়ে এসে বলল,
“আপনি কোন চিন্তা করবেন না আন্টি। আমি, ইনায়া আর ইশিতা ভাবিজি আছি তো ম্যামের খেয়াল রাখার জন্য।”
ফিরোজা সুমুকে জড়িয়ে রেখেই বলল,
“নিউ ফ্রেন্ড! আমি কিটিকে নিয়ে যেতে দিব না। ওকে তুমি রেখে যাবে, প্লিজ।”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“অবশ্যই ডিয়ার! ওকে আমি তোমার কাছে রেখে যাব। তুমি আর রিয়াজ ওর খেয়াল রাখবে।”
রিয়াজ শেরাজের কাছে গিয়ে বলল,
“ব্রো! আমার পার্টনারকে তুমি দু’বার বিয়ে করে ফেললে। আমি কত ভাবলাম, এবার পার্টনার ফিরে এলে আমি তাকে বিয়ে করে নিব। যাই হোক, বিয়ে না হলেও সে আমার পার্টনার। তার খেয়াল রেখো।”
শেরাজ রিয়াজের কান টেনে ধরে বলল,
“আমি আমার বউকে আরও দুবার বিয়ে করব। আর আমার বউয়ের খেয়াল আমি অবশ্যই রাখব। তুই গিয়ে পড়তে বস।”
রিয়াজ কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“আহ্, ছাড়ো! শাহরুখ ব্রো’কে নিয়ে যাচ্ছো এবার বিডিতে। আমাকে নিয়ে গেল কি হতো?”
শেরাজ ওর কান ছেড়ে দিয়ে বলল,
“তোর সামনে এক্সাম আছে। কিন্তু শাহরুখের এক্সাম নেই।”
“কিন্তু, একাডেমিতে তো যেতে হয় ব্রো’কে।”
“সেটা আমি বুঝে নিব। তুই তোর নিজের চাকায় তেল দে।”
“কিন্তু, শাহরুখ ব্রো’র চাকায় তো তুমি তেল দিচ্ছো। আমারটাতেও দিয়ে দাও একটু।”
শেরাজ আবারও ওর কান ধরতে যেতেই রিয়াজ দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। শেরাজও ওর পেছনে ছুটটে লাগল। দুই ভাইয়ের খুনশুটি দেখে সকলে হাসতে লাগল।
গাড়ি এসে থেকে থেমে গেল একটা বাড়ির সামনে। শেরাজ আর সুমু একসাথে গাড়ি থেকে নামল। সুমুর চোখ প্রথমে পড়ল সামনের বিশাল গেটের দিকে। সেখানে বড় উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা,
“সুমুরাজ মহল”
সুমু মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোখে বিস্ময় আর আনন্দের ছোঁয়া। সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে, এই প্ল্যান আপনার?”
শেরাজ হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“শুধু তোমার জন্য, সুইটহার্ট। আজ থেকে আমাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু।”
সুমু ধীরে ধীরে গেটের দিকে এগোতে লাগল। গেটের পাশে সাজানো ফুলের গারল্যান্ড আর ঝলমলে আলোতে পুরো মহল যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। শেরাজ তার পাশে এসে হাত ধরে মৃদু কন্ঠে বলল,
“চলো, সুইটহার্ট! এখন আমাদের মহল দেখার পালা।”
সুমু হাসি দিয়ে তার হাত আরও শক্ত করে ধরে নিল। একজন দারোয়ান গেট খুলে দিল। সুমু আর শেরাজ ঢুকে গেল বাড়ির ভেতর।
ভেতরে ঢুকতেই সুমু চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। পুরো মহল যেন স্বপ্নের কোনো ছবি। প্রবেশপথে বড় বড় ক্রিস্টাল লেস্টার ঝুলছে, প্রতিটা ঝিলিক যেন সূর্যের আলোকে খেলাচ্ছে। মেঝে মার্বেল আর উজ্জ্বল পলিশে এমন প্রতিফলন হচ্ছে, যেন তারা লালিটার মধ্যে পদার্পণ করছে। দেওয়ালে হালকা গোল্ডেন ফ্রেমে সজ্জিত চিত্রকর্ম, আর শীর্ষে সাজানো ইন্টেরিয়র লাইটিংয়ের কোমল আলো পুরো হলকে উষ্ণ এবং রাজকীয় মনে করাচ্ছে। বড় বড় আরামদায়ক সোফা সেট, নরম বালিশ আর ঝলমলে কার্পেট—সবই পরিশীলিত স্বাদ এবং বিলাসিতার প্রতীক। মহলের কেন্দ্রে একটি বড় ডাইনিং টেবিল সাজানো, ক্রিস্টালের ভাস্কর্য ও গোলাপ ফুল দিয়ে সজ্জিত। পাশের লিভিং রুমে বিশাল জানালা দিয়ে বাইরের বাগানের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
শেরাজ ধীরে সুমুর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“এখানেই আমাদের নতুন জীবন শুরু হবে, সুইটহার্ট। প্রতিটি কোণা শুধু তোমার জন্য সাজানো।”
সুমু চোখ ভরা আনন্দ নিয়ে তাকিয়ে বলল,
“খান সাহেব, এটা স্বপ্নের মতো। আমি সত্যিই আনন্দিত।”
শেরাজ হেসে বলল,
“শুধু আনন্দ নয়, এখানে আমাদের ছোট্ট পরিবারও আসবে। প্রতিটি মুহূর্ত হবে আমাদের স্মৃতির অংশ।”
সুমু হাত দিয়ে শেরাজের হাত চেপে ধরল। তারা ধীরে ধীরে মহলের ভিতরে এগোতে লাগল, প্রতিটি কোণ থেকে বিলাসিতা, উষ্ণতা আর প্রেমের ছোঁয়া যেন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল। শেরাজ ধীরে সুমুর হাত ধরে তাদের বেডরুমের দিকে এগোতে লাগল। দরজা খুলতেই সুমুর চোখের সামনে চোখ ধাধানো দৃশ্য ফুটে উঠল।
বেডরুমের মাঝখানে বিশাল কিং সাইজ বেড। বেডের উপর ঝুলছে নরম সিল্কের লেইন ও ঝলমলে সিলভার ও গোল্ডেন কুশন। পালঙ্কের চারপাশে হালকা গোল্ডেন টোনের ফ্রেমে সজ্জিত পিলো এবং নরম ড্রেপস দুলছে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপকে রাজকীয় এবং কোমল করে তুলছে। ছাদের এক কোণ থেকে পুরো রুম জুড়ে ছড়িয়ে আছে গ্যালাক্সির মতো এলইডি লাইট—নীল, বেগুনি আর হালকা গোলাপি আলো মিশে এক অবিস্মরণীয় আকাশের ছাপ তৈরি করছে। ছাদের কেন্দ্র থেকে ঝুলছে বড় ক্রিস্টাল লেস্টার, প্রতিটি ঝিলিক যেন রুমের প্রতিটি কোণকে উজ্জ্বল আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছে। জানালার পাশে লং উইন্ডো আছে, যার হালকা সিল্কের পর্দা বাতাসের সাথে নরমভাবে দুলছে। জানালার বাইরে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট বাগানের সবুজ ছটা, আর সূর্য হালকা আলো ছড়িয়ে রুমকে স্বর্গীয় করে তুলেছে। দেয়ালে ঝুলছে ফ্রেমে সাজানো আধুনিক আর্টওয়ার্ক, আর এক পাশে রাখা আরামদায়ক চেয়ার সেট। ফ্লোরে নরম কার্পেট, যা প্রতিটি পা রাখার ধাপকে মৃদু করে দিচ্ছে।
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“এই রুমটা আমাদের জন্য, সুইটহার্ট। প্রতিটি কোণা, প্রতিটি জিনিস আমাদের নতুন জীবনের শুরুতে শুধু তোমার আনন্দের জন্য।”
সুমু চোখে আনন্দের অশ্রু ধরে হাসল, ধীরে ধীরে বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সে হাত বাড়িয়ে শেরাজের হাত ধরল। শেরাজ কোমল কণ্ঠে বলল,
“চলো, সুইটহার্ট! এই জায়গাটাকে আমাদের ছোট্ট স্বর্গ বানাই।”
সুমুর মন ভরে গেল উচ্ছ্বাস, আর শেরাজের চোখে ভাসল অম্লান ভালোবাসার ছোঁয়া। রুমের প্রতিটি কোণ যেন তাদের নতুন জীবনের স্বপ্ন আর আনন্দের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল। শেরাজ ধীরে বলল,
“এখন আরও অনেক কিছু দেখার বাকি আছে, সুইটহার্ট।”
সুমু এক নজর বেডরুমের গ্যালাক্সি আলো দেখে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়াল, তারপর হালকা হাসি দিয়ে শেরাজকে চোখের ইশারায় সম্মতি জানালো। শেরাজ তার হাত ধরে ধীরে ধীরে আরও একটি রুমের দিকে এগোতে লাগল। দরজা খুলতেই সুমুর চোখ কপালে উঠে গেল।
এই রুমটি লিভিং ওয়ার্ল্ডের মতো সাজানো সবকিছু আধুনিক আর বিলাসবহুল। মাঝখানে একটি আরামদায়ক সাদা সোফা সেট, নরম কুশন আর সোফার পাশে ছোট্ট কফি টেবিল, যা ক্রিস্টালের সাজসজ্জায় ঝলমল করছে। একটি বিলাসবহুল দোলনাও আছে। জানালার পাশে বড় বড় প্যানোরামিক কাচ, যার বাইরে দেখা যাচ্ছে ফুলের বাগান। ছাদের কোণে ছোট্ট এলইডি লাইটের স্ট্রিপ, গ্যালাক্সি থিমে নীল-বেগুনি আলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল, আর একটি ছোট্ট ওয়ানডারফুল স্টার প্রজেক্টর পুরো রুমকে রাতের আকাশের মতো করে তুলেছে।
শেরাজ হাসি দিয়ে বলল,
এই রুমে আমরা বসব, গল্প করব, আর আমাদের ছোট্ট পরিবারের জন্য পরিকল্পনা করব। সুইটহার্ট, দেখো, সবই শুধু তোমার জন্য।”
সুমু চোখে আনন্দের জল ধরে ধীরে ধীরে সোফার দিকে এগোল। শেরাজ সুমু হাত ধরে বলল,
“চলো!”
সে এবার সুমুর হাত ধরে তাদের বেডরুমের পাশের রুমে নিয়ে গেল। দরজা ধীরে খুলতেই সুমুর চোখ বড় হয়ে গেল।
রুমটি ছিল একেবারে রঙিন। প্রতিটি দেয়াল সাজানো কিডস থিমের ওয়ালপেপার দিয়ে, যেখানে রয়েছে ছোট্ট নক্ষত্র, চাঁদ, সূর্য আর প্রাণীদের ছবি। বিছানার ওপর রাখা ছোট্ট, আরামদায়ক কুশন আর খেলনা। রুমের এক কোণে রাখা ছোট্ট খেলনা শেলফ, যেখানে গাড়ি, পুতুল, ও বই সাজানো। জানালার পাশে নরম কার্পেট বিছানো, যাতে শিশুরা বসে খেলতে পারে। রুমের কোণে ছোট্ট গ্যালাক্সি লাইটের প্রজেক্টর, যা রুমটিতে নীল-গোলাপি আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
সুমু অবাক হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছিল, কথা বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না। শুধু মুগ্ধ চোখে সবকিছু দেখছিল আজ। পেছন থেকে শেরাজ এসে আলতোভাবে তার কোমরে হাত রেখে কানে কানে বলল,
“আমার চ্যাম্পদের জন্য।”
সুমু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে তার দিকে তাকাল। সেই হাসিতে ছিল বিস্ময় আর ভালোবাসা। শেরাজ সুমুকে নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে রুমের একপাশে থাকা বড় কাচের দরজা খুলল। দুজন মিলে বাইরে বেরিয়ে এলো বেলকনিতে।
বেলকনিতে পা দিতেই সুমুর নিঃশ্বাস থমকে গেল। সামনের দৃশ্য যেন স্বপ্নের মতো। দূরে বিশাল সবুজ পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের গায়ের ওপর সূর্যের আলো লেগে এক অন্যরকম সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। বেলকনির চারপাশে সাজানো টবে টবে ফুল—গোলাপ, টিউলিপ, লিলি, আর ল্যাভেন্ডারের গন্ধে বাতাস ম’ম করছে। একপাশে রাখা আরামদায়ক রকিং চেয়ার আর মাঝখানে ছোট্ট কাঠের টেবিল অন্যপাশে বাচ্চাদের জন্য দোলনা।
সুমু আলতো হেসে বলল,
“খান সাহেব! আমি ভাবতেই পারিনি, এতো সুন্দর কিছু আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
শেরাজ মুচকি হেসে তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“সবকিছু শুধু তোমার জন্যই, সুইটহার্ট। আর আমাদের ছোট্ট চ্যাম্পদের জন্য।”
সুমুর চোখ ভিজে উঠল আনন্দে। সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শেরাজকে। শেরাজ আগলে নিল তাকে। সুমু কান্নামিশ্রিত গলায় বলল,
“এতো সুখ তিন বছর আগেও সয়নি আমার কপালে। আপনি আমাকে কথা দিয়েছেন, আমি কষ্ট পায় এমন কিছু করবেন না। আমার সব কষ্ট দূর করে দিবেন বলেছেন। সেই আশায় আমি আবারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। খান সাহেব, আমি আপনাকে হারাতে চাইনা। আপনি কখনও হারিয়ে যাবেন না তো?”
শেরাজ সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে ছোট করে তার চুলের ওপর ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“তোমার হাতটা ধরে আছি যতক্ষণ, ততক্ষণ আমি হারিয়ে যাব না। আর যদি কোনোদিন হারিয়েও যাই, বিশ্বাস রেখো, তোমার দোয়া আর তোমার ভালোবাসাই আমায় খুঁজে নিয়ে আসবে আবার তোমার কাছে।”
সুমু ভেজা চোখ মুছে শেরাজের বুকের কাছে মাথা রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। পাহাড়ের বাতাস তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছিল, তবুও তার মনে হয় শেরাজের বুকের আশ্রয়ে যেন পৃথিবীর সব নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর শেরাজ সুমুর থুতনিটা আলতো করে উঁচু করল। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“সুইটহার্ট! আমাদের যত স্বপ্ন বাকি আছে, সেগুলো একসাথে পূরণ করব। তুমি শুধু আমার হাত ছেড়ো না।”
সুমু ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তার ঠোঁটে একটুকরো লাজুক হাসি ফুটে উঠল। শেরাজ তাকে নিয়ে বেলকনির দোলনায় বসিয়ে সে সুমুর পাশে বসল। সুমু তার মাথা শেরাজের কাঁধে রেখে দোল খেতে লাগল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ বিকালের হাওয়া আর পাহাড়ের নীরবতা উপভোগ করল।
কিছুক্ষণ পর শেরাজ সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“চলো, এখন বাড়ির পথে ফিরি। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।”
সুমু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। বাসা থেকে বেরিয়ে দুজনেই হাত ধরে গাড়িতে গিয়ে বসল। শেরাজ গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি পাহাড়ি রাস্তা ধরে শহরের দিকে নামতে লাগল।
শহরের কোলাহলপূর্ণ রাস্তায় গাড়ি ঢুকতেই হঠাৎ সুমুর চোখ রাস্তার একপাশে গিয়ে পড়ল। ছোট্ট একটি ফুচকার দোকান। সেখানে ফুচকা, ভেলপুরি বিক্রি হচ্ছে। সামনে কয়েকজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে খাচ্ছে। সুমুর চোখ চকচক করে উঠল। সে শেরাজের হাত আলতো টেনে বলল,
“খান সাহেব! আমি ফুচকা খেতে চাই।”
শেরাজ অবাক হয়ে তাকাল।
“ফুচকা? এখন?”
সুমু আলতো হেসে লাজুকভাবে বলল,
“হ্যাঁ, এখনই! অনেকদিন খাইনি।”
শেরাজ হালকা হেসে গাড়ি থামিয়ে দিল। দুজনেই নেমে দোকানের সামনে গেল। দোকানদার অবাক হয়ে ভদ্রদম্পতিকে দেখে হাসিমুখে বললেন,
“কি খাবেন?”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“যা আমার বউ খাবে, তাই দিন।”
সুমু হেসে বলল,
“ফুচকা! আমার জন্য ঝাল বেশি দিয়ে বানাবেন। আর উনাকে একটু কম ঝাল দিন।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এতো ঝাল খাবে না তুমি।”
সুমু মুচকি হেসে প্রথম ফুচকাটা তুলে শেরাজের মুখের সামনে ধরল। শেরাজ চোখ ছোট করে তাকিয়ে অবশেষে খেয়ে নিল। সুমু আলতো হেসে নিজেও ফুচকা খেতে শুরু করল। দুজনেই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়াতে মেতে উঠল, যেন কোনো সাধারণ প্রেমিক-প্রেমিকা। গাড়ি, বিলাসিতা, সব ভুলে সেই মুহূর্তে তাদের সুখ ছিল একেকটা ফুচকার ভেতরে।
হঠাৎ শেরাজ সুমুকে বলল,
“সুইটহার্ট, একটু এখানে থাকো। আমি পানি নিয়ে আসি।”
সুমু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। শেরাজ ফুচকাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলল,
“মামা! আমাকে বউটার দিকে একটু খেয়াল রাখবেন।”
“ঠিক আছে, বেটা।”
শেরাজ সুমুকে রেখে একটা শপে গেল। পানির বোতল কিনে ফিরে আসতে গিয়ে আবারও পিছিয়ে গেল। দোকানের পাশে মুখে মাস্ক পরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার সামনে গিয়ে বলল,
“স্টক করছিস?”
রায়য়ান মাস্ক খুলে বলল,
“সুহাসিনীকে দেখতে এসেছিলাম। যদি এটাকে স্টক করা বলিস, তাহলে তাই।”
শেরাজ চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,
“সুহাসিনী? ভালো! তা প্রাক্তন বন্ধুর বউকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখিস? এতো ভয় কিসের? সামনা-সামনি এসে সালাম দিয়ে যাস। আফটার অল, তোর ভাবিজি বলে কথা।”
রায়য়ান গর্জে উঠে বলল,
“এস.কে, তুই কিন্তু…”
শেরাজ ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“শুনতে পাচ্ছি তো। এতো চিৎকার করে বলার কি আছে? আর আমি তোকে আগেই সাবধান করেছিলাম, আমার বউয়ের থেকে দূরে থাকতে। সেটা ভুলে গেছিস নাকি?”
রায়য়ান তাচ্ছিল্যভরা চোখে তাকাল।
“আমি দূরে থাকব না। কি করবি তুই? যা ইচ্ছা কর। পারলে আমার একটা বাল ছিঁড়ে দেখাস।”
“ইয়াক! ছিঃ রায়য়ান। খবিস একটা। বাল নিয়ে ঘুরে বেড়াস? আফ্রিকার জঙ্গল বানিয়ে রেখেছিস নাকি? ফেলাস না কত বছর? আর তুই ভাবিস কীভাবে আমি তোর ওই জঙ্গলে হাত দিয়ে বাল ছিঁড়তে যাব? তোর মতো খবিস নাকি আমি?”
রায়য়ান কিছু বলতে গিয়েও মুখ খুলতে পারল না। শেরাজ কেবল চোখ ভরা বিরক্তি আর হালকা হেসে বাঁশি বাজাতে বাজাতে ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল। রায়য়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে রাগ। সে দূরে বসে থাকা সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আমার স্বপ্নের রাজকন্যা হয়ে থেকো, সুহাসিনী। কখনও আমার কাছে ধরা দিওনা। মানুষকে দুনিয়াতে বাঁচতে হলে স্বপ্ন দেখতে হয়। আমার শেষ স্বপ্ন তুমি। যদি কোনদিনও তুমি আমার কাছে ধরা দাও, তাহলে আমার মৃত্যু ঘটবে সুহাসিনী”
কথাগুলো বলে সে শেরাজের দিকে তাকাল। তারপর বাঁকা হেসে বলল,
“উফফ! আমার যে মুড সুইং হয়ে গেল। তোমাকে যে আমার চাই, সুহাসিনী।”
রায়য়ান হাসল। সে দাঁত কটমট করতে করতে স্থান ত্যাগ করল।
শেরাজ হাতে ঠাণ্ডা পানির বোতল নিয়ে ফিরে এলো। সুমু তখন ফুচকা খেতে খেতে চারপাশে তাকাচ্ছিল। শেরাজ এগিয়ে এসে তার পাশে বসে পানির বোতলটা হাতে ধরিয়ে দিল।
“নাও, সুইটহার্ট! এতো ঝাল খাও, পানি ছাড়া আবার চোখ-মুখ লাল হয়ে যাবে। আবার তোমার লাল ফেস দেখে আমার তোমাকে…”
সুমু চোখ রাঙিয়ে তাকাল। শেরাজ চুপ হয়ে গেল। সুমু বোতল নিয়ে হেসে বলল,
“ধন্যবাদ, খান সাহেব! আপনি না থাকলে কে আর এতো খেয়াল রাখত আমার।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে মজার ভঙ্গিতে বলল,
“তোমার খেয়াল রাখা আমার চাকরি নয়, দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব থেকে আমি কখনও পালাব না।”
সুমু মাথা নিচু করে মিষ্টি হেসে নিল। দু’জন একসাথে ফুচকা খাওয়া শেষ করে গাড়িতে উঠল। ফেরার পথে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের আলো, ঝলমলে শহর আর চেনা গন্ধ সুমুর মন ভরে দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে শেরাজ সুমুর হাত নিজের হাতে নিয়ে আলতো চেপে ধরছিল, যেন নিঃশব্দে আশ্বাস দিচ্ছিল— তুমি একা নও, আমি আছি।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি গিয়ে থামল তাদের বাড়ির সামনে। শেরাজ গাড়ি থেকে নেমে সুমুর জন্য দরজা খুলে দিল। সুমু গাড়ি থেকে নামতেই দুজনে একসাথে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
টানা তিন বছর এগারো মাস পর সুমু আবারও তার দেশের মাটিতে পা রাখল। বিমানবন্দর থেকে বের হতেই চেনা বাতাস, মানুষের কোলাহল আর পরিচিত ভাষার সুর যেন তাকে ঘিরে ধরল। সুমুর চোখে অশ্রু জমে উঠল। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে গভীর শ্বাস নিল, যেন আপন মাটির গন্ধ বুকভরে নিতে চাইছে।
শেরাজ পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসল। তার হাত শক্ত করে সুমুর হাত চেপে ধরে বলল,
“সুইটহার্ট! তোমার দেশ, তোমার আপন ভুবন, আবারও তোমাকে বরণ করে নিল।”
সুমু কেঁপে ওঠা গলায় বলল,
“আমার প্রাণটা যেন হালকা হয়ে গেল, খান সাহেব। এতোদিন পরে আবার এই মাটির স্পর্শ পেলাম।”
শেরাজ মৃদু চোখ টিপে বলল,
“তাহলে এবার চলো, তোমার জন্য যে চমকগুলো অপেক্ষা করছে সেগুলো দেখার পালা।”
সুমু অবাক দৃষ্টিতে তাকাল।
“চমক? আবার কীসের চমক?”
শেরাজ হেসে বলল,
“সময় হলে জানতে পারবে। আপাতত চলো, আমাদের জন্য যে গাড়ি এসেছে তাতে উঠি।”
বিমানবন্দরের বাইরে সুমুদের জন্য তিনটা লাক্সারিয়াস গাড়ি দাঁড়িয়ে। নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম আর রিসান একটা গাড়িতে উঠল। শেরাজ, সুমু, ইশিতা, আরবাজ, নাতাশা আর ইনায়া দ্বিতীয় গাড়িতে উঠল। সারবাজ, শাহরুখ, স্যান্ডি, আইয়ুব আর রাহিন তৃতীয় গাড়িতে উঠল।
গাড়িগুলো ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে এগোতে লাগল। সুমু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। রাতের শহর, চেনা দোকান, পুরনো রাস্তাঘাট, মানুষের ভিড় সবকিছুই তাকে এক অদ্ভুত আবেগে ভাসিয়ে নিচ্ছিল। শেরাজ তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে আলতো করে চাপ দিয়ে বলল,
“এতো চুপ হয়ে আছো কেন, সুইটহার্ট?”
সুমু মৃদু হেসে বলল,
“সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছে। বিশ্বাসই করতে পারছি না আমি আবার আমার দেশে ফিরেছি।”
শেরাজ আলতো হাসল। সুমু শেরাজের কাঁধে মাথা রেখে অপেক্ষায় রইল প্রিয় মানুষগুলোর জন্য।
ঘড়ির কাঁটায় সময় রাত বারোটা পঁয়তাল্লিশ। গাড়িগুলো ধীরে ধীরে থামল শেখ বাড়ির বিশাল গেটের সামনে। উঁচু গেট, চারপাশে আলোর সাজ। গেট খুলে দিতেই ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য চেনা মুখ এগিয়ে এলো। শেখ বাড়ির সকলে যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।
গেট দিয়ে গাড়িগুলো ভেতরে ঢুকতেই চারপাশে একসাথে উল্লাস আর আনন্দের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। আলোর ঝলকানি, ফুলের গন্ধ আর প্রিয়জনদের হাসি যেন পুরো পরিবেশটাকে আরও আবেগময় করে তুলল।
প্রথমেই ছুটে এলেন হাসি বেগম। সুমুকে দেখে তার চোখ ভিজে উঠল। তিনি সুমুকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বললেন,
“আমার মা! কতদিন পর তোকে দেখলাম।”
পেছনেই দাঁড়ানো শামীম সাহেব এগিয়ে এসে আলতো করে সুমুর মাথায় হাত রাখলেন। তার গলা ভারী হয়ে গেছে আবেগে।
“আমার আম্মাজান, অবশেষে বাবা মাকে মনে পড়ল।”
সুমুর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে আস্তে করে বলল,
“আব্বু, আম্মু! আমি সত্যিই তোমাদের খুব মিস করতাম।”
সাখাওয়াত সাহেব আর রুমা বেগম এগিয়ে এলেন। সাখাওয়াত সাহেব গম্ভীর অথচ স্নেহভরা চোখে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“বাহিরে দাঁড়িয়ে থেকো না। সকলে ভেতরে এসো।”
রুমা বেগম স্নেহভরা আলিঙ্গনে সুমুকে টেনে নিলেন। তাদের পেছনেই হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিল সামিয়া। প্রিয় বোনকে দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ছুটে এসে সুমুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।
“আপু, আমি তোকে ভীষণ মিস করেছি!”
সুমু সামিয়ার চোখ মুছিয়ে দিল।
“আমিও তোর জন্যই দিন গুনতাম, বোন। কিন্তু তুই এভাবে কাঁদছিস কেন?”
সামিয়া একটু থতমত খেয়ে বলল,
“অনেকদিন পর তোকে দেখলাম তো, তাই।”
এবার সামনে এলো তিন কাজিন। শাহরুখ, আশিক আর নাজমিন। শাহরুখ মজা করে বলল,
“এতদিন পর ফিরলি। তাও এভাবে হিরোইন হয়ে।’
আশিক হেসে বলল,
“হিরোইন নয়, কুইন হয়ে। কারণ ওর সাথে ভাইয়া ও এসেছে।”
নাজমিন এগিয়ে এসে আলতো করে সুমুর হাত ধরল।
“আপু! কেমন আছো তুমি?”
“ভালো বোন!”
সবাই মিলে একসাথে সুমুকে ঘিরে ধরল। সুমুর বুক ভরে উঠল নিজের আপনজনদের ভালোবাসায়।
শেরাজ একটু দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল। তার ঠোঁটে শান্ত হাসি, চোখে সন্তুষ্টি। প্রিয়তমার আপন ঘরে ফেরা দেখে তার মনও ভরে উঠেছিল।
গেটের ভেতর সবাই যখন সুমুকে ঘিরে আবেগে ভাসছে, তখন রাহিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে সামিয়ার কান্না দেখছিল। সামিয়ার চোখের জল যেন তার ভেতরটা অস্থির করে তুলল। বুকের ভেতরে চাপা কষ্ট নিয়ে রাহিন ঘুরে বেরিয়ে যেতে চাইল। ঠিক সেই মুহূর্তে শেরাজ এগিয়ে এসে তার হাত চেপে ধরে নিচু গলায় বলল,
“আপাতত সহ্য করে চুপচাপ এখানে দাঁড়িয়ে থাক।”
রাহিন এক মুহূর্ত শেরাজের দিকে তাকাল, তারপর মাথা নেড়ে পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
অন্যদিকে ভিড়ের মাঝে আইয়ুব নীরবে তাকিয়ে ছিল। এতো বছর পর প্রেয়সীর মুখটা চোখের সামনে পড়তেই তার ঠোঁটে অচেনা হাসি ফুটল। সে সোজা হয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৬৫
“আসসালামু ওয়ালাইকুম, বেয়াইন।”
নাজমিন প্রথমে অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল, তারপর ঠোঁটে মিষ্টি এক টুকরো হাসি এনে শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম, বেয়াই!”
তাদের কথায় চারপাশে কেউ খেয়াল করল না, কিন্তু দু’জনের চোখে চোখ পড়তেই যেন অগণিত অজানা অনুভূতি নীরবে খেলা করতে শুরু করল। সবাই একসাথে গল্প আর কান্না–হাসির মাঝেই ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
