খান সাহেব পর্ব ৭১ (২)
সুমাইয়া জাহান
বাইরে এসে গাড়ির ভেতর ঢুকতেই সামিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বুক ফেটে কান্না যেন থেমেই থাকছিল না। কাচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে শুধু বলল,
“সব আমার দোষ, রাহিন ভাই। আমি যদি ওর সাথে বিয়েটা…”
রাহিন সঙ্গে সঙ্গে সামিয়ার হাত চেপে ধরল,
“চুপ, সামু। একদম চুপ। বারবার এই একই কথা বলবি না। আমি কতবার বলেছি—জীবন-মরণ কারও হাতে নেই। তুই যা ভাবছিস, সেটা সত্যি না। আজ যা হচ্ছে, এসবের পেছনে আরও অনেক অজানা কাহিনী আছে। সেসব ধরে বিচার করতে গেলে, আজ পিয়াসের অবস্থার জন্য পিয়াস নিজেই দায়ী।”
সামিয়া মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“আমি জানিনা এর পেছনে আর কি আছে। আমি জানতেও চাইনা। কিন্তু সবাই আমাকে দায়ী করছে। সুমি ফুফি, ফারিন, সবাই ঘৃণা করছে আমায়। আমি কারো সামনে দাঁড়াতেও পারছি না।”
রাহিন চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর শান্ত স্বরে বলল,
“দেখ সামু, দোষারোপ করা মানুষের স্বভাব। বিশেষ করে শোকে থাকলে মানুষ অনেক কিছু বলে ফেলে। কিন্তু তাতে সত্য বদলায় না। আমি তোকে বিশ্বাস করি। তুই আমার স্ত্রী। সবাই না থাকলেও, আমি তোর পাশে আছি।”
সামিয়া ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে তার কাঁধে
রাখল। গাড়ি নিস্তব্ধ রাস্তায় এগিয়ে চলল।
হসপিটালের রাতটা যেন একদম জমাট অন্ধকার কাটিয়ের ভোর হতে চলল। করিডরের সাদা লাইটগুলো নিস্তেজ, চারপাশ নিঃশব্দ, শুধু ভেতর থেকে মনিটরের বিপ-বিপ শব্দ মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে।
পিয়াসকে আইসিইউতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার শরীরে একাধিক টিউব লাগানো, হাতে আইভি লাইন, অক্সিজেন মাস্কে ঢেকে মুখ। রক্ত দেয়া হচ্ছে। নার্সরা একের পর এক এসে ভায়টাল চেক করছে।
সুমি বেগম দরজার গ্লাসে হাত রেখে বসে আছেন ছেলের দিকে তাকিয়ে। তার চোখে অশ্রু শুকিয়েও আবার ভিজে যাচ্ছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“আল্লাহ! আমার ছেলেকে তুমি ফিরিয়ে দাও।”
মুস্তাক সিকদার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন, গম্ভীর মুখে, হাত দুটো জোড়া করা। ভেতরের ঝড়টাকে বাইরে বের করতে দিচ্ছেন না তিনি।
সাখাওয়াত সাহেব চুপচাপ ডাক্তারের সাথে কথা বলছেন। ডাক্তার ধীর কণ্ঠে বললেন,
“রোগীর শরীরে অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা আপাতত স্ট্যাবিলাইজ করার চেষ্টা করছি। সকাল পর্যন্ত যদি কোনো জটিলতা না হয়, তবে আশা আছে। তবে সত্যি বলছি—ক্রিটিক্যাল অবস্থা কেটে যেতে সময় লাগবে।”
ফারিন মাথা গুঁজে কাঁদছে, আর ফারিয়া দূরে দাঁড়িয়ে কেবল চেয়ে আছে। তার চোখে অপরাধবোধ স্পষ্ট।
করিডরে শেরাজ দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে। তার চোখ লালচে। সুমু তার কাছে গিয়ে ধীরে বলল,
“খান সাহেব, আপনি ঠিক আছেন?”
শেরাজ এক চিলতে নিঃশ্বাস ছাড়ল,
“আমি শক্ত আছি, সুইটহার্ট। কিন্তু এখানে কেউই কাউকে সহ্য করতে পারছে না। সামু, রাহিন—এদের ওপর চাপ এসে পড়ছে। ইভেন তোমার এই অবস্থায় মধ্যেও, তোমাকে সকলে দোষ দিচ্ছে।”
সুমু নিচু স্বরে বলল,
“সময়টা এখন কঠিন। ঝগড়া নয়, সবাইকে শান্ত হতে হবে।”
শেরাজ তাকিয়ে বলল,
“তুমি পাশে আছো বলেই হয়তো আমি শান্ত থাকতে পারছি। নয়তো এতোক্ষণ সকলে যে ছেলেকে নিয়ে এত বড় বড় ডায়লগ দিয়েছে, সেই ছেলের….”
শেরাজ থেমে গেল। সুমুর চোখে জল চিকচিক করছিল। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“ঠিক বুঝলাম না আপনার কথা।”
এমন সময় একজন নার্স দ্রুত বেরিয়ে এসে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বলল,
“ব্লাড প্রেসার আবার নিচে নেমে যাচ্ছে। স্যার! দ্রুত আসুন, ব্লাড দিতে হবে।”
সবাই চমকে উঠল। করিডরে আবার হুলস্থুল শুরু হলো।
সুমি বেগম হাহাকার করে উঠলেন,
“আমার ছেলেকে বাঁচাতে রক্ত লাগবে। রক্ত এনে দাও।”
ডাক্তার কড়া কণ্ঠে বললেন,
“সময় নষ্ট করলে হবে না। দ্রুত ব্লাড চাই।”
সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে, ঠিক তখনই শেরাজ এগিয়ে এলো। শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল,
“ব্লাডের ব্যবস্থা আমি আগেই করেছি।”
ডাক্তার অবাক হয়ে তাকালেন,
“কীভাবে? আমরা তো আর বলিনি ব্লাড রেডি রাখতে। কারণ আমাদের ধারণা ছিল ব্লাড আর লাগবেনা।”
শেরাজ ঠান্ডা গলায় বলল,
“পিয়াসের খবর শোনার পরই আমি তার ব্লাড গ্রুপ জেনে ব্যাংকে রিকুইজিশন পাঠাই। ইউনিটগুলো রেডি রাখা হয়েছে। এখনই নার্সরা নিয়ে আসুক।”
ডাক্তার হালকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন,
“গুড! তাহলে দেরি নয়। এক্ষুনি নিয়ে আসুন।”
নার্সরা দ্রুত দৌড়ে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা রক্তের ব্যাগ নিয়ে এসে মেশিনে সেট করল। আইভি লাইনের সাথে যুক্ত হতেই ধীরে ধীরে লালচে তরলটা পিয়াসের শরীরে ঢুকতে শুরু করল।
সুমি বেগম হাউমাউ করে কেঁদে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আল্লাহ! আমার ছেলেকে তুমি সুস্থ করে দাও।”
মুস্তাক সিকদার এবার শেরাজের দিকে তাকালেন। চোখে ভরা ক্লান্তি, কিন্তু ঠোঁটে প্রথমবারের মতো কৃতজ্ঞতার ছাপ ফুটে উঠল। গলায় কর্কশ টান নিয়ে তিনি বললেন,
“যদিও আমার ছেলের এই অবস্থায় জন্য তোমরা দায়ী। তারপরেও ধন্যবাদ, শেরাজ। তুমি সময়মতো ব্যবস্থা না করলে আজ হয়তো আমার ছেলেকে হারাতাম।”
শেরাজ কোনো কথা বলল না। করিডরে সামান্য হলেও ভার কমল। তবে সবাই জানে—পিয়াসের লড়াইটা এখনও শেষ হয়নি। মনিটরের বিপ-বিপ শব্দ যেন সবার বুকের ভেতরে প্রতিধ্বনি তুলছে।
রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সাথে সাথে মনিটরের বিপ-বিপ শব্দে সামান্য পরিবর্তন এলো। হার্টবিটের গ্রাফ আগে ওঠানামা করছিল অস্থিরভাবে, এখন ধীরে ধীরে একটা তালে ফিরতে লাগল। ডাক্তাররা একে অপরের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
সিনিয়র ডাক্তার সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
“আপাতত স্টেবল হচ্ছে। কিন্তু সময়টা খুবই ক্রিটিক্যাল। রক্তের ক্ষয় অনেক বেশি হয়েছে। পরবর্তী বারো ঘণ্টা আমরা ওকে অবজারভেশনে রাখব। কোন সেলফ কনশাস রেসপন্স আসছে না এখনো, তবে ব্লাড প্রেসার একটু নিয়ন্ত্রণে এসেছে।”
কথাগুলো বলে ডাক্তার সবকিছু চেক করে বাহিরে এলো। সকলে আবারও ডাক্তারকে ঘিরে ধরল।
ফারিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ভাইয়া বেঁচে যাবে তো?”
ডাক্তার এবার একটু দৃঢ় গলায় বললেন,
“আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এখন প্রার্থনা ছাড়া আর কিছু করার নেই।”
করিডরে নীরবতা নেমে এলো। বাইরে সকাল হয়ে এসেছে, ঘড়ির কাঁটা যেন ভারী হয়ে চলছে।
ঘড়ির কাঁটায় সকাল দশটা। রাতভর দৌড়ঝাঁপ, কান্না আর আতঙ্কের পর সকলে যেন ভোর হতেই হাড়ভাঙা ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু কেউই ঘুমোয়নি। কাল রাত থেকে কেউ মুখে একফোঁটা খাবারও তুলেনি। শোকে হাসপাতালের করিডরের সাদা দেয়াল আর ফ্লোর যেন আরও ফ্যাকাশে আর নিস্তেজ হয়ে উঠেছে।
শেরাজ সকালেই বাইরের রেস্টুরেন্ট থেকে খাবারের প্যাকেট নিয়ে এসেছে। এক কোণে টেবিলে ভাত, স্যুপ, মুরগি, রুটি, ভাজি, সালাদ সাজানো আছে। কিন্তু সবকিছু স্পর্শহীন হয়ে পড়ে আছে—যেন ওগুলো কোনো মৃত জিনিস, কারো হাত উঠছে না সেখানে। সকলের একটাই কথা, পিয়াসের কোনো ভালো খবর না পাওয়া পযর্ন্ত কেউ কিছু মুখে তুলবেনা।
শেরাজ বিরক্ত হয়ে চেয়ারে হেলান দিল। তার চোখ শুধু সুমুর দিকে। সে চাপাস্বরে বলল,
“আমি কতবার বললাম, কিছু খাও। সবাই না খেলেও তুমি খাবে। তুমি অসুস্থ হয়ে গেলে আমি কার ওপর রাগ ঝাড়ব বলো তো? আর তুমি জানো না, তুমি এখন একা নও? চুপচাপ খেয়ে নাও সুমু। মাথা প্রচন্ড গরম হচ্ছে। তোমার এসব কারণে যদি আমার বেবিদের কিছু হয়, তখন আমার থেকে খারাপ কেউ হবেনা।”
সুমু নিঃশব্দে বসে আছে। সে আস্তে বলল,
“খান সাহেব, আমার পেটে কিছু নামবে না। পিয়াস ভাইয়া এখনো চোখ খুলেনি। আমি কীভাবে খাই?”
শেরাজ ধৈর্য হারিয়ে সোজা হয়ে বসল,
“সুমু, এটা তোমার জেদ। অসুস্থ মানুষকে দেখতে হলে আগে তোমাকে সুস্থ থাকতে হবে। ডাক্তাররা বারবার বলছে, ওকে এখনো ক্রিটিক্যাল অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। তুমি না খেয়ে থাকলে, আমি শপথ করছি, আমি…”
কথা শেষ করল না সে। কেবল হাতের মুঠি শক্ত করে রাখল। চোখে এক অদ্ভুত রাগ—যেটা শুধু সুমুর ওপরই ঝরে পড়ে।
ঠিক এমন সময় হঠাৎ কেবিনের দরজাটা খুলে গেল। ভেতর থেকে একজন নার্স দ্রুত বেরিয়ে এলো। সবার বুক ধক করে উঠল।
“গার্ডিয়ান কে?”
মুস্তাক সিকদার আর শেরাজ প্রায় একসাথে উঠে দাঁড়াল। মুস্তাক সিকদার এগিয়ে গিয়ে বলল,
“কী হয়েছে?”
নার্সের ঠোঁটে সামান্য হাসি খেলে গেল।
“রোগী সামান্য নড়েচড়ে উঠেছে। ওনার আঙুল নড়েছে, আর চোখের পাতা কেঁপেছে। মানে, জ্ঞান ফিরতে শুরু করেছে।”
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে যেন একসাথে নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ হলো। সুমি বেগম মাটিতে বসা অবস্থায় দুহাত আকাশের দিকে তুলে কেঁদে উঠলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ! আমার ছেলে বেঁচে আছে।”
ফারিন এসে সুমি বেগমকে জড়িয়ে ধরল। তাদের চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছে।
সুমু হতবিহ্বল দৃষ্টিতে শেরাজের দিকে তাকাল,
“খান সাহেব! আল্লাহ রহমত করেছে।”
শেরাজ গভীর দৃষ্টিতে সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁট শক্ত হয়ে আছে, কিন্তু চোখে হালকা শান্তির ছাপ। সে শুধু ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“আল্লাহর রহমতেই সব সম্ভব।”
ডাক্তার এবার কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,
“রোগী আস্তে আস্তে কনশাস হচ্ছে। এখনো পুরোপুরি জ্ঞান ফেরেনি, তবে রেসপন্স আসছে। কাউকে ভেতরে এক মিনিটের জন্য দেখতে দেওয়া যাবে। কিন্তু কেউ যেন কান্নাকাটি না করে। ওনার মস্তিষ্ক এখনো দুর্বল অবস্থায় আছে। পেশেন্টকে আমরা কেবিনে শিফট করব।”
সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। সুমি বেগম তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গেলেন,
“আমি ঢুকব। আমার ছেলেকে আমি একবার দেখব।”
ডাক্তার অনুমতি দিলেন। পিয়াসকে কেবিন থেকে বের করা হলো। করিডরে দাঁড়ানো সকলে একপলকের জন্য পিয়াসের শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখল। সুমি বেগম নার্সের সাথে ভেতরে ঢুকে গেলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সকলে করে অপেক্ষা করতে লাগল।
কেবিনের ভেতরে পিয়াস অচেতন দেহ নিয়ে শুয়ে আছে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, হাতজুড়ে স্যালাইন আর ক্যানুলা। হঠাৎ চোখের পাতা আবার কেঁপে উঠল। সুমি বেগম কাঁপা গলায় বললেন,
“পিয়াস! আমার বাবা। আমার কলিজার টুকরা।”
হঠাৎ পিয়াসের মস্তিষ্ক সচেতন হয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে ঠোঁট নাড়ল। খুব ক্ষীণ স্বরে যেন ফিসফিস করে কিছু বলতে চাইছে। নার্স হেসে বলল,
“পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে।”
কথাটা বলে নার্স পিয়াসের মুখের কাছে ঝুঁকে বলল,
“আপনি কি কিছু বলতে চাইছেন?”
সুমি বেগমের বুক ধক করে উঠল। পিয়াসের ঠোঁট নড়ে উঠল,
“মা…”
শব্দটা শুনে সুমি বেগম কেঁদে ফেললেন। নার্স তাকে শান্ত করে বলল,
“প্লিজ, কান্না করবেন না। উনাকে শান্ত রাখতে হবে। আপনি এভাবে ওনার সামনে কাঁদলে পেশেন্টের মাথায় চাপ পড়বে।”
সুমি বেগম নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। পিয়াস ধীরে নার্সের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমার মাকে বাহিরে নিয়ে যান। আর আমার বাবাকে গিয়ে বলুন, শেরাজ খানকে যেন একবার আমার সাথে দেখা করতে আসে।”
সুমি বেগম অবাক হয়ে বললেন,
“শেরাজ?”
পিয়াস ধীরে মাথা নাড়ল। সুমি বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নার্স বলল,
“ম্যাম! পেশেন্ট যেটা বলছে, সেটাই করুন। আপনি এখন বাহিরে চলুন। আর উনি যার সাথে দেখা করতে চাইছেন, তাকে আসতে বলুন।”
সুমি বেগম ধীরে মাথা নাড়লেন। তিনি বুঝতে পারলেন না, তার ছেলে কেন শেরাজের সাথে দেখা করতে চাইছে।
করিডরের চারপাশে এখানো নিস্তব্ধতা। সকলে একে একে সামান্য করে খাবারে হাত দিয়েছে, কিন্তু সুমু এখনো চুপচাপ বসে আছে। চোখ শুধু কেবিনের দরজায়, যেন সেখানে তাকিয়ে থাকলেই পিয়াসের খবর পাওয়া যাবে।
শেরাজ একপাশ থেকে সব দেখছিল। তার চোখে স্পষ্ট বিরক্তি আর দুশ্চিন্তার ছায়া। অবশেষে সে ধীরে ধীরে সুমুর সামনে এসে দাঁড়াল।
“সুইটহার্ট, তুমি কিছু খাচ্ছো না কেন?”
সুমু মাথা নেড়ে ধীরে বলল,
“খান সাহেব, এখনো খাওয়ার কথা ভাবতেই পারছি না। পিয়াস ভাইয়া ওই অবস্থায় শুয়ে আছে, আর আমি বসে খাব? না, পারব না। আর আপনি জানেন তো, এসবের জন্য সকলে আমাদের দায়ী করছে। ওদিকে, আমার বোনটা ভেঙে পড়েছে।”
শেরাজ ঠোঁট শক্ত করে ফেলল। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হঠাৎ নিচু হয়ে খাবারের বক্স খুলে তার সামনে রাখল।
“আমি বলছি, খাবে তুমি।”
সুমু শেরাজের দিকে তাকাল।
“আমি বলেছি, আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।”
শেরাজ এবার চেয়ারের হাতল ধরে তার কাছে ঝুঁকল। কণ্ঠ নিচু কিন্তু কঠিন করে বলল,
“শোনো, জেদ করো না। তুমি জানো আমি সহ্য করতে পারি না। সারারাত না খেয়ে বসে আছো। তোমার মুখ শুকিয়ে গেছে। যদি তুমি দুর্বল হয়ে পড়ো, আমি কার কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াব বলো তো?”
সুমুর চোখ ভিজে উঠল।
“আমি কিভাবে খাব? আমার গলা দিয়ে কিছু নামবে না, খান সাহেব।”
শেরাজ এবার আর কোনো উত্তর দিল না। সে নিজেই হাতে এক টুকরো রুটি ছিঁড়ে নিয়ে সুমুর মুখের সামনে ধরল।
“মুখ খুলো।”
“খান সাহেব…”
“বলেছি মুখ খুলো।”
শেরাজের গলায় এমন দৃঢ়তা ছিল যে সুমু আর না বলতে পারল না। আস্তে আস্তে ঠোঁট ফাঁকা করে দিল। শেরাজ নিজের হাতে খাইয়ে দিল প্রথম টুকরো।
সুমু চোখ বন্ধ করে কষ্টে করে গিলল। তারপর চোখ খুলে চেয়ে দেখল—শেরাজের চোখে রাগের সাথে গভীর কোমলতা মিশে আছে।
“এভাবেই খাবে। যতক্ষণ না শেষ করছো, আমি তোমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকব।”
সুমু ফিসফিস করে বলল,
“আপনি এত রেগে যান কেন?”
শেরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কারণ তোমার কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। তুমি যদি নিজেকে ভেঙে ফেলো, আমি আর বাঁচতে পারব না।”
সুমুর চোখ ভিজে গেল, অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গালে। শেরাজ হাত বাড়িয়ে অশ্রু মুছে দিল।
“আর কান্না না। খাও। শুধু আমার জন্য খাও।” আমাদের বেবিদের জন্য খাও।”
এইবার সুমু কিছু না বলে ধীরে ধীরে খেতে লাগল। শেরাজ পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিটি টুকরো নিজে খাইয়ে দিল। করিডরের বাকিরা চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
সুমু খাওয়া শেষ করে নিচু চোখে বসে রইল। শেরাজ হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“এবার তুমি শক্ত থাকবে। আমিও শক্ত থাকব।”
সুমু নিঃশব্দে মাথা নুইয়ে দিল। শেরাজ এক ঝটকায় তার হাত নিজের হাতে নিয়ে মুঠো করে ধরল,
“আর কখনো না খেয়ে বসে থাকবে না, সুইটহার্ট।”
সুমু কিছু বলতে চাইল তার আগেই নার্স এসে বলল,
“আপনারা কেউ শেরাজ খানকে খবর দিন। পেশেন্ট শেরাজ খানের সাথে দেখা করতে চাইছে।”
সকলে তাকাল সেদিকে। সুমি বেগম গিয়ে মুস্তাক সিকদারের পাশে দাঁড়ল। নার্সের কথা শুনে সকলে উঠে দাঁড়াল। করিডরে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো। নার্সের কথায় সকলে অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল, যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না—অজ্ঞান অবস্থায় এতক্ষণ থাকার পর পিয়াস প্রথম যার নাম বলল, সে শেরাজ খান।
মুস্তাক সিকদার ভ্রু কুঁচকে ধীরে বললেন,
“শেরাজ খানকে? ওকে কেন ডাকছে?”
সুমি বেগম চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“জানিনা।”
শেরাজ তখন সুমুর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সবার দৃষ্টি তার দিকে ঘুরতেই সে গম্ভীর চোখে চারপাশ দেখল। পাশ থেকে সুমুও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
শেরাজ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল,
“আমি শেরাজ খান।”
নার্স একবার শেরাজকে ভালো করে দেখে বলল,
“আপনি ভেতরে যান। পেশেন্ট আপনার সাথে দেখা করতে চাইছে।”
শেরাজের ঠোঁটে বাঁকা হাসি খেলে গেল। সে ধীরে বলল,
“অবশ্যই!”
করিডরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। সকলে তাকিয়ে আছে শেরাজের দিকে। শেরাজ ধীর, পরিমিত ভঙ্গিতে কেবিনের দরজার দিকে এগোতে লাগল। তার পায়ের শব্দ যেন করিডরের নীরবতার ভেতর অস্বাভাবিকভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
সুমু দাঁড়িয়ে রইল, তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি জমে উঠেছে। সে চোখ সরাতে পারছিল না।
শেরাজ কেবিনের ভেতরে ঢুকতেই দরজাটা আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। ভেতরের দৃশ্য ভীষণ নিস্তব্ধ। যন্ত্রপাতির বিপ-বিপ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। পিয়াস শুয়ে আছে অক্সিজেন মাস্কে, তার চোখ আধখোলা, নিঃশ্বাস ধীরে চলছে।
শেরাজ এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়াল। পিয়াস দুর্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“ব্রো!”
শেরাজ ঝুঁকে বাঁকা হেসে বলল,
“আমি জানতাম, আমাকে তুমি ডাকবে। তা বলো, কাহিনী শোনার জন্য ডাকলে নাকি শোনানোর জন্য?”
পিয়াস অক্সিজেন মাস্ক খুলে বলল,
“এর মাসুল তোমাদের দিতে হবে।”
শেরাজ একটু উচ্চস্বরে হেসে বলল,
“সিরিয়াসলি ম্যান! শেরাজ খানকেও কেউ থ্রেট করছে।”
সে পিয়াসের কাঁটা হাতের ওপর চাপর মেরে বলল,
“মানতে হবে তোমার দম আছে।”
পিয়াস চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে আবারও খুলল। তার ব্যান্ডেজ রক্তে ভিজে উঠল। তবে সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“আমি পিয়াস সিকদার! হার মানতে শিখিনি।”
শেরাজ পিয়াসের হাতে দিকে তাকিয়ে বলল,
“ইশ! রক্ত বের হচ্ছে তো? এখন আমি কি করি? ডাক্তার ডাকব পিয়াস?”
পিয়াস তাচ্ছিল্যে করে হেসে বলল,
“দেখো আবার! আমার ক্ষত শুকানোর আগে, তোমার প্রিয় কারো জীবনে ক্ষত না হয়ে যায়।”
শেরাজ কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল পিয়াসের চোখে। পিয়াসের দুর্বল শরীর, রক্তাক্ত হাত, কিন্তু ঠোঁটে সেই অদ্ভুত হাসি– যেন মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে থেকেও ভয়কে তাচ্ছিল্য করছে।
শেরাজ ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু হেসে উঠল।
“হুঁ… প্রিয় কারো জীবনে ক্ষত। তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ পিয়াস?”
পিয়াস ফিসফিসিয়ে বলল,
“ভয় না ব্রো! সতর্ক করে দিচ্ছি। আমি হয়তো পড়ে গেছি, কিন্তু খেলা শেষ হয়নি। তুমি জানোনা, আমি যখন কোনো কিছু চাই, সেটা না পাওয়া পর্যন্ত ছাড়ি না।”
শেরাজের ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। সে ধীরে বিছানার ওপর ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“খেলা খেলতে চাইছো? তবে, মনে রেখো খেলাটা যদি আমার সাথে হয়—শেষ বাঁশি আমি বাজাবো।”
পিয়াসের শ্বাস ভারী হয়ে এল, কপালে ঘাম জমল। তবুও সে মৃদু হাসি দিয়ে উত্তর দিল,
“বাঁশি তো তুমি বাজাবে, কিন্তু মাঠের ভেতরে কে পড়ে থাকবে–সেটা এখনও বলা যায় না।”
“ওহ রিয়েলি? আসো! তোমাকে একটা স্টোরি শোনাই।”
পিয়াস ভ্রু কুঁচকে বলল,
“স্টোরি? কিসের স্টোরি?”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“তখন আমার শালিকা মানে গল্পের হিরোইন একদম ছোট। সে আধো আধো বুলিতে কথা বলতে পারে। এই গল্পের নায়ক রাহিন ভাই, তার নায়িকাকে অনেক ছোট্টবেলা থেকে ভালোবাসে। গল্পের হিরোইন যখন একটু একটু আবদার করতে শিখল, গল্পের হিরো তার সব আবদার পূরণ করত। আর বাচ্চারা হয় অবুঝ। যেসব মানুষ খুব ছোট থেকে ওদের সাথে থাকে, ওদের সব আবদার পূরণ করে– বাচ্চারা তাদেরকেই নিজেদের আইডল মনে করে, এবং লাইফে হিরো বা সবথেকে কাছের মানুষ মনে করে। বাচ্চারা তখন ওই মানুষটার সাথে সবথেকে বেশি সময় কাটাতে চায়, ইভেন তাদেরকেই সবথেকে বেশি ভালোবাসে। সামিয়াও তেমন ছিল। রাহিনকে ও ছোট থেকেই খুব ভালোবাসত। সবসময় রাহিন ভাইয়া, রাহিন ভাইয়া করত। আর রাহিনও ওর সব আবদার পূরণ করত। রাহিনের জন্য সামিয়াকে কেউ কখন বকতে পারত না। এরপর সামিয়া বড় হতে শুরু করল। অল্প অল্প সবকিছু বুঝতে শুরু করল। নিজেকে নিজের মতো করে ধীরে ধীরে গুছিয়ে নিচ্ছিল সে। তবে সে যত বড় হচ্ছিল, রাহিনের মনে তার সেই ছোট্ট পিচ্চি তত জায়গা করে নিচ্ছিল।”
পিয়াস তাকিয়ে আছে শেরাজের দিকে। শেরাজ একটু থেমে আবারও বলল,
“চলো এই পযর্ন্ত তো গল্পের কাহিনী ঠিকই ছিল। এরপরের কাহিনীতে আসি। সামিয়া তখন ক্লাস সিক্সের স্টুডেন্ট। আর রাহিন তখন বাহিরে চলে যাবার পিপারেশন নিচ্ছে। তো রাহিন বাহিরে চলে যাবার আগে, গোপালগঞ্জ আসে তার পিচ্চিটার সাথে দেখা করতে। রাহিন এখানে তিনদিন থাকে। এমনিতেও সামিয়ার আগে থেকেই অভিমান ছিল রাহিনের ওপর। কারণ, রাহিন তার থেকে দূরে থাকে। আর এখন দেশে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে শুনে, সামিয়ার অনেক বেশি অভিমান হয়। সে রাহিনের সাথে অভিমান করে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। তো চুয়াডাঙ্গা ফিরে যাবার আগের দিন বিকালে রাহিন সামিয়ার রুমে যায়। সামিয়া রাহিনকে দেখে অভিমান করে কেঁদে ফেলে। তখন রাহিন সামিয়াকে বোঝায় যে, সে সামিয়াকে সারাজীবনের জন্য নিজের কাছে নিয়ে যাবার জন্যই বিদেশ যাচ্ছে। তবুও সামিয়ার অভিমান শেষ হয়না। রাহিন সামিয়ার অভিমান ভাঙানোর জন্য সামিয়াকে বাহিরে ঘুরতে নিয়ে যায়। দুজনে একসাথে একটা ফুচকার স্টলে গিয়ে বসতেই সামিয়া বায়না করে সে আইসক্রিম খাবে। রাহিন সামিয়ার হাতে একপ্লেট ফুচকা দিয়ে সে সামিয়াকে বসতে বলে, আইসক্রিম আনতে যায়। আর ঠিক তখনই গল্পে ভিলেনের এন্ট্রি হয়। ভিলেন ভাই তখন তার বন্ধুদের সাথে যাচ্ছিল। ফুচকার স্টলে সামিয়াকে একা বসে ফুচকা খেতে দেখে, সে রেগে যায়। তিনি তখন রেগে দায়িত্ববান ভাইয়ের কর্তব্য পালন করতে আসে।
সে এসেই সামিয়াকে বাসা থেকে একা বের হবার জন্য বকাবকি শুরু করে দেয়। সামিয়া তাকে বারবার বলার চেষ্টা করে যে, সে একা এখানে আসেনি। কিন্তু আমার ভিলেন ভাই মানে পিয়াস ভাই কোনো কথা শোনার প্রয়োজন মনে করেনা। সে একপ্রকার ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করার জন্য পাবলিক প্লেসে বকাবকি করেই যাচ্ছে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, এই পিয়াস ভাই বছরেও তার মামাদের বাসায় যায় না। আর না মামাতো বোনদের খেয়াল রাখে। সেদিনের আগে সামিয়ার সাথে তার কোনোদিনও ঠিকমতো কথাও পযর্ন্ত হয়নি। শুধু তারা নামেই একে অপরকে চিনতো। পাবলিক প্লেসের মধ্যে বকাবকি করাতে সামিয়া একটু খারাপ লাগে। ঠিক তখনই রাহিন আইসক্রিম নিয়ে এসে দেখে, তার পিচ্চিকে কেউ বকাবকি করছে। ছোট থেকে যে মেয়েটা সে আগলে রেখেছে। তাকে কেউ এভাবে বকছে, এইটা দেখে রাহিন সহ্য করতে পারেনা। সে এসে পিয়াসকে প্রথমে ঠান্ডা মাথায় বোঝায়। কিন্তু আমাদের পিয়াস ভাইয়ের আবার রক্ত একটু বেশি গরম। একজন পলিটিশিয়ানের ছেলে তিনি। রক্ত গরম থাকাটাও স্বাভাবিক। তিনি বন্ধুদের সামনে একটু হিরোগিরি দেখাতে গিয়ে রাহিনের ওপর চড়াও হয়।
ব্যস, একটা অশান্তি শুরু হয় সেখানে। এরপর সাখাওয়াত সাহেবকে খবর দিয়ে আনা হয়। তিনি এসে সবটা মিটিয়ে নেয়। আর এই ঘটনাটা, পিয়াসের সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা হয়ে সামিয়ার ছোট মনে গভীর দাগ কাটে। উল্টো দিকে পিয়াস ভাই যখন বুঝতে পারে ভুলটা তারই, তখন তিনি আরও রেগে যান। নিজের হারটা মেনে নিতে না পেরে, তিনি মনে মনে একটা রাগ রাহিনের ওপর পুষে রাখেন। অবশ্য তখন বয়সটাও অল্প, তাই এসব ছোটখাটো বিষয়টাকে বড় করে দেখে ফেলে আমাদের পিয়াস ভাই। সেদিনের পর থেকে তিনি সামিয়াদের বাড়িতে যেতে শুরু করে। আমার শাশুড়ির থেকে সে রাহিনের ব্যাপারে জানতে চায়। আমার শাশুড়ি সরল মনের মানুষ।
তিনি সবকিছু বলেন। পিয়াস! রাহিন আর সামিয়ার ছোটবেলার সবকিছু শুনে বুঝে ফেলে যে, রাহিনের মনে সামিয়ার জন্য একটা অন্যরকম সফট কর্ণার আছে। এই বিষয়টা নিয়ে সে আরও শিওর হবার জন্য, সামিয়ার দিকে নজর রাখে। ইভেন সে জানতে পারে, রাহিন প্রতিদিন তিনবেলা করে ফোন দিয়ে সামিয়া খোঁজ খবর নেয়। ফোন দিলেই আগে সামিয়াকে খোঁজে সে। পিয়াস ভাইয়ার তখন যা বোঝার, বুঝে নেয়। এরপর সে রাহিনকে শিক্ষা দেবার জন্য একটা প্ল্যান বানায়। তার প্ল্যান হলো, সে সামিয়াকে রাহিনের থেকে কেড়ে নিবে। এরজন সে ধীরে ধীরে সামিয়ার মনে জায়গা করার জন্য, সামিয়ার কেয়ার করতে শুরু করে। কিন্তু সামিয়া পিয়াসকে সেদিনের ঘটনার পর থেকে সহ্য করতে পারত না। এভাবেই দিন যাচ্ছিল তাদের। আর এমন করতে করতে একটা সময়ে এসে আমাদের পিয়াস ভাইয়া সামিয়াকে ভালোবেসে ফেলে। আর সেই ভালোবাসা, যে সে ভালোবাসা নয়। সেই ভালোবাসা হলো একদম, “তোমাকে না পেলে আমি মরে যাব” টাইপ ভালোবাসা।”
শেরাজ থামে। পিয়াসের গতিবিধি বোঝার চেষ্টা করে সে আবারও বলল,
“সামিয়ার চোখে তখনও রাহিনই একমাত্র ভরসা। তার অভিমান, কাঁদুনি, আবার আবদার সবকিছুতেই রাহিনের উপস্থিতি অপরিহার্য। কিন্তু পিয়াসের অদৃশ্য উপস্থিতি তখন থেকে তাদের জীবনে ঢুকে গেছে। এদিকে পিয়াস মুখে যতই না মানুক, ভেতরে ভেতরে ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—সামিয়া হবে তার। সামিয়াকে সে নিজের করেই ছাড়বে। রাহিন বিদেশে চলে যায়। দূরত্ব শুরু হয়। তবে ফোনে প্রতিদিনের খোঁজখবর, যত্ন, আর মনোযোগে সম্পর্কটা টিকে থাকে। সামিয়া যখন পড়ালেখায় এগোতে থাকে, তখনও রাহিন ওকে আগলে রাখে নিজের মতো। সামিয়ার এক্সট্রা কেয়ারের জন্য তার পেছনে লোক লাগায়। অন্যদিকে, পিয়াস সবসময় খেয়াল রাখতে থাকে সামিয়ার গতিবিধি। কখন স্কুলে যায়, কার সঙ্গে মিশছে—সব যেন তার নজরে। সামিয়া প্রথমে এসবকে বিরক্তিকর ভাবে নেয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে পিয়াসের অতিরিক্ত কেয়ার তাকে কেমন অস্বস্তি, আবার খানিকটা নিরাপত্তার অনুভূতিও দেয়। রাহিন দূরে থেকে শুধু ফোনে কথা বলে—সামিয়ার মনে কখনও কখনও শূন্যতা এসে ভর করে। সেই ফাঁকটা পিয়াস পূরণ করার চেষ্টা করে।
কখনও হঠাৎ স্কুল গেটে হাজির হয়ে তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া, কখনও সামান্য অসুস্থ হলে বাড়তি কেয়ার করা—এমন সব ছোটখাটো ঘটনায় পিয়াস তার জায়গা বানানোর চেষ্টা করতে শুরু করে। তবে সামিয়ার ভেতরে সবসময় একটা টান ছিল—সে জানত, তার জন্য যে মানুষটা পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লড়বে, সে রাহিন। আর পিয়াসের ভালোবাসা অদ্ভুত, চাপিয়ে দেওয়া, অধিকারবোধে ভরা। পিয়াস ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, যতই যত্ন করুক না কেন, সামিয়ার মন রাহিনেই বাঁধা। আর এই উপলব্ধিই তাকে আরও অস্থির করে তোলে। সে ভাবে—‘রাহিন যদি না থাকত, তাহলে সামিয়া একদিন বুঝত তার ভালোবাসা কতটা গভীর।’ এই ভুল ভাবনাটা তাকে একরকম বিপজ্জনক পথে নিয়ে যায়। তার ভালোবাসা তখন আর স্বাভাবিক থাকে না—হয়ে ওঠে একধরনের প্রতিযোগিতা, একধরনের জয় করার খেলা। তাই সে সামিয়াকে কোনোদিনও “ভালোবাসি” না বলে, ডিরেক্ট বাসায় বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কারণ সে জানত, সামিয়াকে ভালোবাসার কথা জানালে সামিয়া তাকে ডিরেক্ট না করে দিবে। এদিকে বিয়েতে যাতে সামিয়া ‘না’ করতে না পারে, সেই হিসাবে সে শাহরুখ আর ফারিয়ার ভালোবাসাকে সামিয়ার সামনে দাঁড় করায়। এরজন্যই পিয়াসের মতো একটা রগচটা ছেলে, কোনোদিনও শাহরুখ আর ফারিয়ার সম্পর্কে সবকিছু জেনেও কোনো রিয়াক্ট করেনি।”
পিয়াসের শ্বাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি এতোকিছু কীভাবে জানো?”
শেরাজ ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু স্বরে উত্তর দিল,
“আমি শুধু গল্প শুনি না, গল্পের চরিত্রদের ভেতরে ঢুকে পড়ি।”
সে একটু থেমে আবারও বলল,
“তুমি যেটাকে ভালোবাসা ভাবো, সেটা আসলে একধরনের জেদ। ভালোবাসা তো শান্তি দেয়, ভরসা দেয়। তুমি সামিয়াকে পাওয়ার জন্য একপ্রকার প্রতিযোগিতা শুরু করেছিলে। তোমার মাথায় একটাই চিন্তা—যেভাবেই হোক না কেন সামিয়াকে তুমি পাবে।”
পিয়াস কাঁপা গলায় বলল,
“আমি সামুকে সত্যি ভালোবাসি।”
কথাটা যেন বুকের ভেতর থেকে ছিঁড়ে বের হলো তার। পিয়াসের চোখে ভালোবাসা আছে, কিন্তু ভালোবাসার ভেতরে মিশে আছে অদ্ভুত এক জেদ, একরকম হার না মানার প্রবণতা।
শেরাজ শান্ত চোখে তাকাল তার দিকে। ধীরে ধীরে বলল,
“ভালোবাসা শুধু বললেই প্রমাণ হয় না, পিয়াস। তোমার এই ভালোবাসা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা ছিলনা, সমস্যা ছিল তোমার এই অদ্ভূত জেদ নিয়ে। আজ তোমার এই অবস্থার জন্য তুমি নিজেই দায়ী। অথচ সবাই আমাকে, সুমুকে, সামিয়াকে আর রাহিনকে দায়ী করছে। আমার বউ অপরাধবোধে ভুগছে। আমার শালী কাঁদতে-কাঁদতে ভেঙে পড়েছে। কাল তুমি আমার বউকে প্রেগনেন্ট অবস্থায় ফেলে দিতে গিয়েছিলে। তখন ইচ্ছা করেছিল, তোমার কলিজাটা একটানে ছিঁড়ে তোমার হাতে দিয়ে দেই।”
“শেরাজ! তুমি কী জানো ভালোবাসার কষ্ট কী? হতে পারে ও প্রথমে আমার জেদ ছিল। কিন্তু যাকে ছোটবেলা থেকে চোখের সামনে বড় হতে দেখছি, যার প্রতিটা হাসি-কান্নার কারণ বুঝেছি, যার মনে একটু জায়গা পাবার জন্য কতো কিছু করেছি–তারপরেও সে আমাকে নয়, অন্য কাউকে বেছে নিয়েছে। এটা কি এত সহজ?”
শেরাজ শান্তভাবে গ্লাসে পানি ঢালল। তারপর মৃদু স্বরে বলল,
“সহজ না। একদমই সহজ না। কিন্তু ভালোবাসা তো জোর করে পাওয়ার জিনিস না। ভালোবাসা মানে মানুষটাকে তার নিজের মতো থাকতে দেওয়া। যদি সে তোমার না হয়, তবুও তার সুখে তুমি হাসতে পারলে– তবেই তোমার ভালোবাসা সত্যি। না হলে সেটা কেবল জেদ।”
পিয়াস মাথা নিচু করল। তার গলা ভারী হয়ে এলো।
“কিন্তু আমি তো ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। রাহিন কেন? কেন ও রাহিনকে এত ভালোবাসে? আমি তো কোনো দোষ করিনি। আমি তো শুধু ওকে চাই।”
শেরাজ হালকা নিঃশ্বাস ফেলল।
“ভালোবাসায় দোষ-অদোষ নেই, পিয়াস। হৃদয়ের টান হিসেব-নিকেশ মানে না।”
“তাহলে আমার সামুকে চাই।”
শেরাজ ক্ষিপ্ত হয়ে বলল,
“সেদিন বলেছিলাম, আজও বলছি, সামু এখন শুধু আমার শালিকা নয়, সে আমার বন্ধুর বউ। ওর দিকে হাত বাড়ালে, তোমার লাইফে সমস্যা হয়ে যাবে।”
শেরাজ চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। হঠাৎ পেছন থেকে পিয়াস বলল,
“আমার জায়গায় আজ তুমি থাকলে, তুমি কি করতে?”
শেরাজ পেছন ঘুরে তাকিয়ে বলল,
“শেরাজ খানের সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস পছন্দ না। আর অন্যের জিনিস নেভার এভার। সুমুকে আমি ভালোবাসার আগে থেকেই যদি ও অন্য কাউকে চাইত, তাহলে হয়ত আমাদের পরিচয়টাও কোনোদিনও হতোনা। আমার বউয়ের জীবনে প্রথম এবং শেষ পুরুষ আমি।”
পিয়াস ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আর যদি এখন অন্য কাউকে ভালোবেসে থাকে? অন্য কাউকে চাইতে শুরু করে?”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“সেই সুযোগ ওর লাইফে আসবেনা। আর যদি এসেও যায়, আগে ওকে ওপরে পাঠাব। তারপর আমি নিজেও ওপরে চলে যাব। সেখানে বউ তার ওই ভালোবাসাকে ভুলে গিয়ে আবারও তার এই স্বামীকেই ভালোবাসবে। সেখানে আমরা একসাথে থাকব। ইহকাল হোক কিংবা পরকাল, ও যখন একবার আমার হয়েছে আর আমি যখন একবার ওকে আমার নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছি, তখন ওকে আমার সঙ্গেই থাকতে হবে।”
দু’জনের চোখ আটকে রইল একে অপরের দিকে—একটা লুকোনো যুদ্ধের সূচনা যেন হাসপাতালের সেই ছোট্ট কেবিনেই শুরু হয়ে গেল।
ঠিক তখনই নার্স দ্রুত ভেতরে ঢুকল।
“এক্সকিউজ মি! বেশি কথা বললে পেশেন্টের অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।”
শেরাজ আস্তে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার মুখে বাঁকা হাসি, কিন্তু চোখের ভেতর অদ্ভুত এক আগুন জ্বলছে। বেরিয়ে যাওয়ার আগে পিয়াসের দিকে শেষবার তাকিয়ে মৃদু গলায় বলল,
“লড়াই করতে চাইলে লড়াই চলবে, ব্রো। তবে মনে রেখো—শেরাজ খান কাউকে সহজে ক্ষমা করে না।”
সে ঘুরে দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল।
বাইরে করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা সকলে শেরাজের মুখের ভাব দেখে চমকে উঠল। সুমু ভয়ে ভয়ে এক পা এগিয়ে এল, কিন্তু শেরাজের চোখের আগুন দেখে দাঁড়িয়ে গেল।
এদিকে ভেতরে নার্স পিয়াসের হাত দেখে আঁতকে উঠল। সে তাড়াহুড়ো করে নতুন করে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে বলল,
“এসব কীভাবে হলো? আর আপনার কোন জ্ঞান নেই? হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে আপনি দেখতে পারছেন না?”
পিয়াস একপ্রকার হতবাক হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। হাতটা ব্যথায় কেঁপে উঠছে, কিন্তু ভেতরে তার জেদ, রাগ, অস্থিরতা যা তাকে ভিতর থেকে চূর্ণ করে দিচ্ছিল।
“আপনি বুঝতে পারছেন না? এইভাবে রক্ত পড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”
পিয়াস মুখে কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। মনে মনে সে নিজের রাগ আর হাহাকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না।
তার ভেতরে লুকোনো যুদ্ধটা আরও প্রকট হয়ে উঠল—শেরাজের সঙ্গে এই ছোট্ট কেবিনে শুরু হওয়া দ্বন্দ্ব যেন এখন তার মস্তিষ্কের প্রতিটা কোণে ছড়িয়ে গেছে।
পিয়াস হাত তুলল, আঙুলে লাল রক্ত মেখে ঘুরিয়ে দেখল। সে বুঝতে পারল—শেরাজকে হারানো সহজ নয়। শেরাজ মুখে না বললেও, তার চোখের আগুন, হাসির ভঙ্গি, সবকিছু যেন পিয়াসকে জানিয়ে দিয়েছে—এই লড়াইতে কোনো ছাড় নেই।
খান সাহেব পর্ব ৭১
পিয়াস ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার মাথায় ঘুরছে। সে ভাবছে, কীভাবে সামিয়ার প্রতি নিজের ভালোবাসার জেদকে নিয়ন্ত্রণ করবে। চোখ বন্ধ করে সে নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বকে অনুভব করল। ভালোবাসা, অহংকার, জেদ আর একপ্রকার ভয়– সবই মিশে এক ভয়ানক ঝড় বানিয়ে দিয়েছে। তার এখন শুধু একটাই কথা মনে হচ্ছে—‘এই লড়াইটি শেষ হবে না ততক্ষণ, যতক্ষণ সে তার অন্তরের সত্যি অস্বীকার না করে।’
