Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৮

খান সাহেব পর্ব ৮

খান সাহেব পর্ব ৮
সুমাইয়া জাহান

পুরো বাড়ির আলো নিভানো। অন্ধকারে ছেয়ে আছে পুরো বাড়ি। চারপাশ একদম নিশ্চুপ। বাড়ির সকলে ঘুমের রাজ‍্যে পাড়ি জমিয়েছে। সুমু প্রচন্ড কান্নার ফলে অনুষ্ঠান শেষ হবার আগেই রুমে এসে পেইন কিলার আর স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুমিয়েছে। ইফতিয়া, সামিয়া, নাজমিন, রাইশা, সুমু, মাইশা সকলে একই রুমে শুয়েছে। সকলেই অনেক ক্লান্ত তাই ঘুমে বিভোর। শুধু ঘুমায়নি ইফতিয়া। তখনের অপমান কিছুতেই ভুলতে পারছেনা সে। কিভাবে প্রতিশোধ নিবে সেই প্ল‍্যান কষতে ব‍্যস্ত সে।
হঠাৎ সুমুর ফোনের এসএমএসের নোটিফিকেশনের শব্দ আসলো ইফতিয়ার কানে। কৌতুহলবশত ফোনটা হাতে নিল ইফতিয়া। স্ক্রিনের ওপর শেরাজ খানের নামটা দেখে চমকে উঠল ইফতিয়া। বিড়বিড়য়ে বলল,

“তাহলে এই ব‍্যাপার। এই অসভ‍‍্য, গাইয়া, ফকিন্নি মেয়েটা আমার শেরাজের সাথে কনভারেশন চালায়। সোশ্যাল মিডিয়াতে কথা হয় ওদের। আর সবার সামনে এমন একটা ভাব করে যেন কোনো ছেলের দিকে তাকায় না। নিশ্চয় এই সুমু আমার শেরাজকে ডিস্টার্ব করে। আচ্ছা ও ভাবল কি করে, চারপাশে আমার মতো স্মার্ট মেয়ে থাকতে, শেরাজ ওর মতো একটা গাইয়া মেয়েকে পাত্তা দিবে। শুধু রুপ থাকলেই হয়না। শেরাজকে নিজের করে পেতে হলে, স্মার্টনেস বেশি প্রয়োজন। আর এই সুমুর না আছে কোনো স্মার্টনেস, না আছে কোনো ক্লাস। আমাকে জানতেই হবে কি কথা হয় ওদের। কিন্তু পাসওয়ার্ড? পেয়েছি, সুমুর ফিঙ্গারপ্রিন্ট।”
কথাটা বলে ইফতিয়া আর একসেকেন্ডও দেরি না করে সুমুর হাতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে ফোনটা আনলক করল। ইনস্টাগ্রামের ইনবক্সে ঢুকতেই মেসেজটা দেখতে পেলো।
“পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার রুমে এসো। কাজ আছে।”
ইফতিয়া পুরো কনভারেশন পড়ল। কিন্তু তেমন কিছুই পেল না― শুধু চা, কফি দিয়ে যাওয়ার টেক্সট ছাড়া। ইফতিয়া ফোনটা সুমুর পাশে রেখে, মাথায় এক শয়তানি বুদ্ধি আটলো। নিজের ফোনটা বালিশের নিচে রেখে রুমের দরজার সামনে আসলো। নিঃশব্দে দরজা খুলে বাহিরে চলে গেল।

পুরো রুম অন্ধকার হয়ে আছে। আজ আর ডিমলাইট জ্বালায়নি শেরাজ। ব‍েলকনিতে রাখা রকিং চেয়ারের ওপর বসে আছে সে। চাঁদের দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে। কি জানো একটা খুব মনযোগ দিয়ে দেখছে সে। হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে ইনস্টাগ্রামে ঢুকল। চেক করল খুব প্রিয় কেউ তার দেওয়া টেক্সটটা সিন করেছে কি’না। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা দেখে আলতো হাসল সে। ফোনটা পুনরায় একই জায়গায় রাখল। রুমের দরজার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে দু’পকেটে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল সে। অপেক্ষা করল তার প্রেয়সীর।
হঠাৎ দরজায় নক করার শব্দ ভেসে আসলো শেরাজের কানে। ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে মৃদ‍ু আওয়াজে সে বলল,
“কাম ইন!”

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো মানুষটি। ভেতর থেকে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে ছুটে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল শেরাজকে।
এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন‍্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না শেরাজ। তার মন, মস্তিষ্ক দুইটায় বলছে, এইটা তার সুইটহার্ট না। হতেই পারে না।
নিজের বুকের ওপর থেকে জাপটে ধরা দুইহাতকে টেনে সরিয়ে দিল শেরাজ। হাত ধরে জোরে টান দিয়ে নিজের সামনে দাঁড় করালো সেই অপ্রত্যাশিত মানুষটিকে।
টানের এতোটাই জোর ছিল যে, ইফতিয়া পড়েই যাচ্ছিল। নিজেকে কোনমতে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঠোঁটে তার লেগে আছে এখনো আলতো হাসি। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ইফতিয়ার মুখ। একে’তো অসভ‍্যের মতো এমন জঘন্য একটা কাজ করেছে। তার ওপরে নির্লজ্জের মতো হাসছে।

চোখের সামনে ইফতিয়ার মুখ আর কিছুক্ষণ আগের ঘটনা মনে পড়তেই রাগ হানা দিল শেরাজের শরীরে। কপালের আর পেশিবহুল হাতের সমস্ত শিরা-উপশিরা রাগে ফুলে উঠেছে তার। সে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে ইফতিয়ার দিকে। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে, শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে কষিয়ে এক চড় মারল ইফতিয়াকে। চড়ের তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে ছিঁটকে পড়ল ইফতিয়া। ব‍্যথায় সারা মুখ জ্বলে যাচ্ছে তার। মাথা ঝিম ধরে গেছে। চোখের পানি ফোটায়-ফোটায় মেঝেতে পড়ছে। মুহুর্তের মধ্যে গাল ফুলে লাল হয়ে গেল তার।
রাগের ফলে শেরাজের শরীর কাঁপছে। তার ইচ্ছে করছে, চোখের সামনে থাকা নোংরা মেয়েটাকে রুমে থাকা গানটা দিয়ে শ‍ুট করে দিতে। গানের প্রতিটা বুলেট এক এক করে পুশ করতে এই অসভ‍্য মেয়েটার শরীরে।
নিজের সেফটি আর সকলের অজানা প্রফেশনাল লাইফের জন‍্য এই গান ব‍্যবহার করে সে। ইফতিয়ার দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত সুরে বলল,

“ইউ ডার্টি গার্ল! হাউ ডেয়ার ইউ টাচ মি? থাউজেন্ডস ওফ প্রিটিয়ার গার্লস দেন ইউ আর ওয়েটিং টু শেয়ার এ বেড উইথ মি। আই হ‍্যাভ নো ইন্টারেস্ট ইন দোস গার্লস। দেয়ার ইউ আর নট এব‍িলিটি টু বি দ‍্যা সার্ভেন্ট ওফ মাই হাউস সার্ভেন্ট। মাই হাউজ সার্ভেন্ট অলসো হেভ এ ক্লাস। শেহেরাজ খান ডাজেন্ট হেভ চিপ টাইম টু ফা*ক এ ক‍্যারেকটারলেস গার্ল লাইক ইউ। শেহেরাজ খান ইজ নট ইন্টারেস্টেড ইন এনিথিং দ‍্যাট ইজ চিপ এন্ড‍ ইজিলি অবেলএবেল।”
একটু থেমে আবারও বলল,
“তোমার এই স্পর্শে আমার শরীর অপবিত্র হয়েছে। ঘৃণা হচ্ছে আমার এখন নিজের প্রতি। এই মুহূর্তে, এই রুম থেকে বেড়িয়ে যাও। আর ভবিষ্যতে কোনোদিন এমন কিছু করার সাহস দেখালে, তোমার এমন হাল করব– সেইদিন তুমি কেন, তোমার জন্মদাত্রী মাও তোমায় চিনতে পারবে না। আমার হাসিখুশি ফেসটা দেখেছ। হাসির আড়ালের মানুষটিকে টেনে বের করো না। সেই মানুষটি বেরোলে, তোমার জন‍্য খুব একটা ভালো হবে না। লিভ দিজ রুম, রাইট নাও।”
একটু থেমে আবারও উচ্চস্বরে বলল,

“আউট।”
ধমকে কেঁপে উঠল ইফতিয়া। চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়াল সে। শেরাজের দিকে একপলক তাকিয়ে দৌড়ে রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
ইফতিয়া রুমে এসে ফোনটা নিয়ে খুশি বেগমকে কল করল। খুশি বেগম ঘুম-ঘুম চোখে বিরক্তির সাথে কল রিসিভ করল। হ‍্যালো বলার আগেই অপরপাশ থেকে মেয়ের কান্না শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠল। খুশি বেগম বললেন,
“ইফতিয়া মা, কি হয়েছে তোর? তুই কাঁদছিস কেন?”
ইফতিয়া বলল,
“আম্মু, তুমি এক্ষুনি আমার সাথে ছাদে দেখা করো।”
“এক্ষুনি আসছি মা।”
কথাটা বলেই কল কেটে দিলেন খুশি বেগম। বিছানা থেকে নেমে ছুটলেন মেয়ের সাথে দেখা করতে।

শেরাজ কিছুতেই নিজের রাগকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। তার ইচ্ছে করছে সবকিছু ধ্বংস করে ফেলতে। রুমের মধ্যে সবকিছু এলোমেলো হয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, রুমের ওপর দিয়ে ঝড় গিয়েছে।
পাক্কা ত্রিশমিনিট ধরে এই শীতের মধ্যে শাওয়ার নিয়েছে সে। একটানা পানিতে ভিজেই গেছে, রাগটাকে কন্ট্রোল করার জন‍্য। কিন্তু যতবার ওই ঘটনা মনে পড়ছে – ততই রাগ বেড়ে যাচ্ছে তার।
ফোনটা হাতে নিয়ে রাহিনকে কল করল সে। পাঁচ মিনিটের মাথায় রাহিন এসে হাজির হলো রুমে। রুমের অবস্থা দেখেই বুঝতে পারল সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে – যার জন‍্য তার ফ্রেন্ড এমনভাবে ক্ষেপেছে।
শেরাজ সবসময় হাসিখুশি থাকা একটা ছেলে। কিন্তু একবার রেগে গেলে ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে তার জলজ‍্যান্ত প্রমাণ শেরাজের সব ফ্রেন্ডরা। শেরাজের সকল কর্মের সাক্ষী তারা।
রাহিন একটা কথায় ভাবছে,

“না জানি কার দুনিয়া থেকে মনে ভরে গেছে। তাই নিজের সর্বনাশ ডাকতে ঘুমন্ত সিংহকে জাগিয়ে তুলেছে। যেই করুক না কেন এই কাজটা, তার দুনিয়াতে মেয়াদ খুব কম।”
সকল ভাবনা থেকে বেরিয়ে রাহিন ফ্রেন্ড গ্রুপে কল করল। মুহূর্তের মধ্যেই সকলে এসে হাজির হলো।
সকলের মনে একটায় প্রশ্ন,
“কি হয়েছে?”
কিন্তু কেউ মুখে কিছুই বলল না। সকলেই জানে শেরাজ এমনি এমনি নরমাল কোনো ব‍্যাপারে এমন করার ছেলে না। তাও ফ্রেন্ডের বাসায় এসে। নিশ্চয় ব‍্যাপারটা গুরুতর।
শেরাজ বেডে স্টিল হয়ে মাথা ঝুঁকে বসে আছে। চুল দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে তার। যার ফলে মেঝেটা ভিজে গেছে। সে ওভাবে বসে থেকেই রাহিনের উদ্দেশ্যে বলল,

“রাহিন তোদের গাড়ি বের কর। আমি বেরোবো।”
রাহিন বলল,
“কিন্তু, এখন এতোরাতে কোথায় যাবি তুই?”
রাহিনের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে, সে রাগ দেখিয়ে বলল,
“বের করে দিলে, দে। নয়তো রুম থেকে যা। অযথা প্রশ্ন করে আমাকে বিরক্ত করিস না। আমি গাড়ি ছাড়াই বের হবো।”
শেরাজের রাগ দেখে রাহিন আর কিছু বলল না। এই ছেলের কোনো বিশ্বাস নেই। যা খুশি করতে পারে। রাহিন চুপচাপ চলে গেল গাড়ি বের করতে।
শেরাজ বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল,

“তোরা রুমটা গুছিয়ে রাখ।”
শেরাজের আদেশ পাওয়ার সাথে- সাথে সকলে কাজে লেগে পড়ল। আইয়ুব রাহিনকে টেক্সট করে বলল,
“ওকে একা ছাড়িস না। সাথে যাস।”
রাহিন গাড়ি বের করে শেরাজকে টেক্সট করল। টেক্সট পাওয়ার সাথে-সাথে শেরাজ ফোনটা হাতে নিয়ে বেড়িয়ে গেল। আইয়ুবও গেল পিছু-পিছু।
শেরাজ কিছুতেই রাহিনকে সাথে নিবে না। রাহিন বলল,
“এস.কে! আমি তোকে কিছুতেই একা ছাড়ব না। এতক্ষণ আমরা তোর কথা শুনেছি। এইবার তুই আমাদের কথা শুনবি।”
কথাটা বলেই ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল রাহিন। শেরাজ বাধ্য হলো রাহিনকে সাথে নিতে। পাশের সিটে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইল সে। আইয়ুব রাহিনের উদ্দেশ্যে বলল,

“আমি সদর দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিচ্ছি। তোরা সাবধানে যা। আর ফিরে আসার সময়, বাসার কাছে আসতেই টেক্সট করে জানাস।”
রাহিন সম্মতি জানিয়ে গাড়ি স্টার্ট করল। গাড়ি বেরিয়ে গেল মেইন গেট দিয়ে। আইয়ুব বাড়ির সদর দরজা লাগিয়ে দিয়ে চলে গেল শেরাজের রুমে।

সোডিয়ামের আলোতে পুরো ছাদ আলোকিত। ছাদের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে মা-মেয়ে। ইফতিয়া কাঁদতে-কাঁদতে সবটা খুলে বলেছে নিজের মাকে। খুশি বেগম খবরটা শোনার পর থেকেই চুপ করে আছে। কারো মুখে শব্দ নেই।
খুশি বেগম বাসা থেকে গাড়ি বের হতে দেখছিল। এতক্ষণে তিনি মুখ খুলল। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে চড় মারা জায়গায় হাত রাখলেন। ব‍্যথায় মৃদ‍ুস্বরে “আহ্” করে উঠল ইফতিয়া। খুশি বেগম মেয়ের মুখ থেকে হাত নামিয়ে বললেন
“এই কর্মের মাশুল দিতেই হবে শেরাজ খানকে। আমি ওর লাইফ থেকে ওর সবথেকে কাছের জিনিস কেড়ে নিব। যতটুকু পানি ও ফেলেছে তোর চোখ থেকে, তার থেকে বেশি পানি ফেলব আমি ওর প্রিয় মানুষকে কেড়ে নিয়ে ওর চোখ থেকে।”

“আম্মু! তুমি যা খুশি করো। কিন্তু ওই শেরাজকে আমার চাই।”
“পাবি,পাবি। তুই যেন কি বললি? শেরাজ এতরাতে সুমুকে ওর ঘরে ডেকে পাঠিয়েছিল?”
“হ‍্যাঁ!”
“এর মানে তুই কি বুঝিস ইফতিয়া? এতরাতে একটা বিবাহযোগ‍্য আনমেরিড পুরুষ একটা মেয়েকে নিজের রুমে কেন ডাকে?”
“কিন্তু আম্মু, তুমি যা বলছো এইটা কিভাবে সম্ভব? শেরাজ কেনো ওই গাইয়া মেয়েটার প্রতি অবসেসড হতে যাবে? কি আছে ওর মধ‍্যে– যা শেরাজের মতো ছেলেকে কাবু করতে পারে?”
“আছে আছে। সুমু তোদের থেকেও বেশি সুন্দরী। আর সৌন্দর্য বড় কথা না। ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত মায়া আছে। যেটা যেকোনো ছেলেকে কাবু করতে যথেষ্ট। মায়বিনী ও। ওর মতো মেয়ের পক্ষে সব সম্ভব।”
“তুমি কিছু করো আম্মু। যে করেই হোক শেরাজকে আমার চাই।”
“তুই কোনো চিন্তা করিস না। সুমুকে সরিয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।”
“কিন্তু, কিভাবে আম্মু?”
খুশি বেগম মুখে বাঁকা হাসি রেখে বললেন,

“বিয়ে দিয়ে।”
“বিয়ে? কিন্তু কিভাবে ওর বিয়ে দিবে? আন্টি, আঙ্কেল কি রাজি হবে?”
“হবে হবে। সব ব‍্যবস্থা আমি করব– মিনা ভাবিকে সাথে নিয়ে। তুই কোনো চিন্তা করিস না।”
“কিন্তু মামি কেনো তোমাকে হেল্প করবে?
“তুই কি জানিস না, মিনা ভাবি তার দুই ননদের মেয়েদের পছন্দ করে না। সবথেকে বেশি অপছন্দ করে সুমুকে। আমার বড় ভাইয়ের, সুমুর প্রতি এত ভালোবাসা পছন্দ করেন না ভাবি। আর তুইতো জানিস, শত্রুর শত্রু বন্ধু। ভাবি ওদের দু’বোনকেই অপছন্দ করেন। আর এই কাজে ভাবি আমাকে হেল্প করবে আমি জানি।”
ইফতিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। খুশি বেগম মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। মা-মেয়ে জঘন্য প্ল‍্যান করে ছাদ ত‍্যাগ করলেন।

চারপাশটা শুনশান। পুরো রাস্তা জনমানবহীন। হিমশীতল হাওয়া বইছে। রাতের আকাশে হাজারো তারার মেলার মাঝে রুপার থালার মতো বড় একটা চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোর সাথে সোডিয়ামের আলোয় চারপাশটা আলোকিত। শাপলা বিলের জলের ওপর চাঁদের আলো পড়াতে সময়টা অনেক বেশি রোমাঞ্চকর লাগছে।
এমন সুন্দর মুহুর্ত অনুভব করার মানসিকতায় নেই দু’টি মানুষ। হাতে দুজনের দুটি “রেড বুল” ক‍্যানের বোতল। বাসা থেকে আসার সময় রাহিন নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটাও চুমুক বসাইনি দুজনে। কিছুক্ষণ আগে শেরাজ বাসায় পরনে থাকা হুডি, টি-শার্ট, আর ট্রাউজার পুড়িয়েছে। তখনও রাহিন কিছু জিঙ্গাসা করেনি শেরাজকে। কিন্তু শেরাজের নিরবতা সহ‍্য না করতে পেরে, ওকে ফোর্স করে সবটা জেনেছে ওর থেকে।

সবটা শোনার পর আর একটাও কথা বলেনি রাহিন। সে বুঝে গেছে ওগুলো পোড়ানোর কারণ। সে ভাবতেই পারছে না তার ফুফাতো বোন ইফতিয়া এমন কিছু করতে পারে। ছোট থেকে দেখছে রাহিন মেয়েটাকে। কবে এতোটা নিচে নেমে গেল এই মেয়ে, ভেবেই পাচ্ছেনা রাহিন। কিন্তু এইটা খুব ভালো করে বুঝতে পারছে সে— শেরাজ এতো সহজে ইফতিয়াকে ছেড়ে দিবে না। যতই তখন ওয়ার্নিং দিক না কেনো— এই কাজের চরম রিভেঞ্জ নিবে শেরাজ। রাহিন বারণ করবে না শেরাজকে কিছু করতে। ওই মেয়ে যা করেছে শুধু একটা চড় কেনো, আরো বেশি শাস্তি পাওয়া উচিত ওর।
দুজনেই চুপচাপ শাপলা বিলের শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে আছে। এতোক্ষণের নিরবতা ভেঙ্গে রাহিন বলল,

“তুই কি সুমুকে পছন্দ করিস শেরাজ?”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“আমিতো ভেবেছিলাম, প্রশ্নটা তুই আরও আগে আমাকে করবি। এতোটা লেট করবি প্রশ্নটা করতে, ওইটা ভাবিনি।”
রাহিন শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বল না, এস.কে। আজ অন্তত‍ বল।”
শেরাজ রেড বুলের বোতলে একটা চুমুক দিল। একটু সময় নিয়ে সে কোনো অস্বস্তি ছাড়াই বলল,
“জানি না। শুধু জানি, ওকে আমার লাগবে। চোখের, মনের শান্তির জন‍্য ওকে আমার লাগবে। নিজেকে ভালো রাখার জন্য ওকে আমার লাগবে। বেঁচে থাকার জন‍্য ওকে আমার লাগবে। লাইফে প্রথম কোনো মেয়ে, যে আমার আশেপাশে থাকলে আমি অস্বস্তি না শান্তি ফিল করি। ওকে দেখলে আমার মনের ভেতর ঝড় ওঠে। প্রথম কোনো মেয়ে, যার শরীর আমাকে চম্বুকের মতো টানে, যার ঠোঁট আমার শরীরে আফিমের মতো নেশা ধরিয়ে দেয়। এই সভ‍্য পুরুষটাকে অসভ‍্য হতে বাধ‍্য করে। প্রথম কোনো মেয়ে, যাকে একপলক না দেখলে হৃদয় ব‍্যাকুল হয়। সারাদিন দেখতে ইচ্ছা করে। যার হাসি দেখলে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি আমি। যার কান্না দেখে হৃদয় পুড়েছিল আমার। আর আমার এই অনুভূতিগুলোকে যদি ভালোবাসা বলে, তাহলে আমি ওকে পছন্দ না, ভালোবাসি। ওকে ছাড়া আমার চলবে না। রাহিন, আমি তোকে আমার অনুভূতিগুলো বলে বুঝাতে পারব না। লোকে ঠিকই বলে, একবার কারো মায়ায় পড়লে, সেই অনুভূতি কাউকে বলে বুঝানো যায় না।”
রাহিন বলল,

তোকে বলতে হবে না এস.কে। আমি বুঝি তোর সব অনুভূতি। কারণ তোর মতো আমিও কারো মায়ায় আসক্ত। আর প্রেমে পড়লে বা কাউকে ভালোবাসলে তাকে ভুলে থাকা যায়। কিন্তু কারো মায়ায় পড়লে তাকে ভুলে থাকা অসম্ভব। আর তাকে ছাড়া নিজের জীবনে অন‍্য কাউকে ভাবা মৃত্যুর যন্ত্রণার থেকেও হাজার গুন বেশি কষ্ট দেয়।”
শেরাজ বলল,
“কারো মায়ায় পড়লে হয়তো নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলা যায়, কিন্তু তার অস্তিত্ব নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলা যায় না।”
“আমাদের কাছে তোর এই ব‍্যাপারটা অবিশ্বাস্য হলেও— তুই সত্যি ফেঁসে গেছিস এস.কে। যে ছেলে প্রেম, ভালোবাসা, কমিটমেন্ট, ফিলিংস বিশ্বাস করতো না, বরং, আমরা বললেও অলওয়েজ আমাদের সাথে মজা নিত— সেই শেরাজ আজ খুব বাজে ভাবে ফেঁসেছে। আচ্ছা তুই বলতো, তুই প্রতিনিয়ত কত মেয়ের প্রপোজ পাস। তোর বড়মামার মেয়ে রোজা— মেয়েটা তো পাগল তোর জন‍্য। আকাশের তারা যেমন গুনে শেষ করা সম্ভব না। ঠিক তেমনি তোর ওপর ক্রাশ খাওয়া মেয়েদের সংখ‍্যাও গুনে শেষ করা সম্ভব না। ইশ! কিছু মেয়ে যদি আমাদেরকেও পাত্তা দিত।”

“সামিয়াকে বলব নাকি রাহিন, যে তোর প্রেম করার জন‍্য মেয়ে লাগবে।”
“এই না ভাই! এখনো নিজের ফিলিংসের কথা বলতে পারিনি ওকে। তুই এমন কিছু বললে, প্রপোজ করার আগেই ব্রেকাপ হয়ে যাবে আমাদের।”
শেরাজ রাহিনের কাঁধের ওপর হাত রেখে বলল,
“সম্পর্কে আমি কিন্তু তোর বড়— এইটা মাথায় রাখিস।”
“ভাই! সম্পর্কে আমি তোর সমন্ধী হই।”
“তুই সামিয়াকে বিয়ে করলে, আমি তোর সম্পর্কে বড় হব। কারণ সামিয়া সুমুর ছোট বোন। তাহলে কে বড় বল?”

খান সাহেব পর্ব ৭

“সুমু আগে নাকি আমি আগে শেরাজ? সুমুর বড় ভাই আমি। সম্পর্কে তুই ছোট আমি না।”
এইভাবে দুইবন্ধুর খুনশুটি চলতে থাকল। শাপলা বিলের শান্ত পানি, আকাশের চাঁদ, তারা সাক্ষী রইল এই বন্ধুত্বের মিষ্টি খুনশুটির।

খান সাহেব পর্ব ৯