Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৮৫

খান সাহেব পর্ব ৮৫

খান সাহেব পর্ব ৮৫
সুমাইয়া জাহান

​রাত্রির বুক চিরে আগুনের লেলিহান শিখা যখন আকাশের কৃষ্ণবর্ণ মেঘগুলোকে স্পর্শ করতে চাইছে, ঠিক তখন অকুস্থলে উপস্থিত হলো একঝাঁক ছায়া। পুলিশের সাইরেন নয়, বরং স্বজনদের হৃদস্পন্দনের শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠল পাতালপুরীর সংলগ্ন সেই ধ্বংসপুরী। সুমু তখনও নিস্পন্দ, অবিকল এক পাষাণপ্রতিমা। তার চোখের মণি স্থির, যেন ওই আগুনের শিখার প্রতিটি স্পন্দনে সে তার ভালোবাসার শেষ নিঃশ্বাসটুকু গুনে নিচ্ছে।

​হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে সেখানে আছড়ে পড়ল সারবাজ, আরবাজ, শাহরুখ এবং শেরাজের প্রাণের বন্ধুরা— আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন আর রিসান। পেছনে আলুথালু বেশে সামিয়া, নাজমিন, নাতাশা, রোজা, ইনায়া আর ইশিতাও এসে দাঁড়িয়েছে। সকলের চোখে এক দুস্তর ভীতি। তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে রিয়াজ। তাদের সকলের সাথে এসে উপস্থিত হয়েছে খান ম‍্যানশন আর চৌধুরী ম‍্যানশনের সকলে।
​পাতালপুরীর ভেতর থেকে আগুনের শিখাগুলো দানবের মতো উপরে উঠে আসছে। চারদিকে মদের বোতল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সুমু পাতালপুরীর সেই গোল গর্তটার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে কীভাবে তার জীবনের সব সুখ, দুঃখ, প্রেম আর ঘৃণা এক নিমিষে ভস্মীভূত হয়ে যাচ্ছে।
​উপস্থিত সকলেরই দেখল এক অদ্ভুত দৃশ্য। আকাশচুম্বী আগুনের লেলিহান শিখার সামনে এক নারী পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার ওড়নার আঁচল বাতাসে উড়ছে, আর চোখে এক অপার্থিব শান্ত চাউনি।
নাতাশা দৌড়ে এসে সুমুকে জড়িয়ে ধরল,

“ম‍্যাম! স‍্যার কোথায়? কী হয়েছে এখানে?”
​সুমু আগুনের দিকে নির্দেশ করে খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল,
​“যাকে তোমরা খুঁজছো, সে এখন আগুনের ছাই হয়ে নক্ষত্রের দেশে চলে গেছে। সে তার সব পাপ এই আগুনে ধুয়ে ফেলেছে। আজ থেকে এই পৃথিবীতে আর কোনো ‘শেরাজ খান’ নেই।” ​সে মনে মনে বলল, ​“খান সাহেব, আপনি বলেছিলেন না আমি স্ট্রং? দেখুন, আপনার দেওয়া সেই শক্তি দিয়েই আমি আপনাকে বিদায় জানালাম। আমাদের গল্পের ইতি কোনো মলাটবদ্ধ বইয়ে নয়, বরং আকাশের ওই ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে লেখা রইল। পরের জন্মে সত্যিই কি আপনি সাদা পাঞ্জাবি পরে আসবেন?”
​রোজা উন্মত্তের মতো সুমুর কাঁধ ধরে সজোরে ঝাঁকুনি দিয়ে গর্জে উঠল,

​“সুমু! কোথায় ওরা? আমার ব্রো কোথায়? এস.কে আর রায়য়ানকেই বা দেখছি না কেন? এই প্রলয়ংকরী আগুন কোত্থেকে এলো? কথা বলো, সুমু।”
​সুমু কোনো কথা বলল না। তার ঠোঁট দুটো পাথরের মতো চেপে রাখা। সে ধীরে ধীরে তার ডান হাতটি তুলল। কম্পনহীন সেই তর্জনীটি নির্দেশ করল পাতালপুরীর সেই প্রবেশপথের দিকে, যেখান থেকে আগুনের জিবগুলো তৃষ্ণার্ত নাগিনীর মতো বেরিয়ে আসছে।
​মুহূর্তে পুরো চত্বরে এক হাড়কাঁপানো নীরবতা নেমে এলো। আরবাজ আর শাহরুখ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে সেই লেলিহান শিখার দিকে তাকিয়ে রইল। রোজার হাত সুমুর কাঁধ থেকে শিথিল হয়ে খসে পড়ল। ইশিতা আর ইনায়া, সিমরার আর শেরানকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আর্তনাদ করতে গিয়েও যেন তাদের কণ্ঠরোধ হয়ে এলো।
​সুমুর অবিন্যস্ত চুলের আড়ালে থাকা সেই শান্ত চাহনি তখন এক নির্মম সত্য প্রচার করছিল। আগুনের প্রচণ্ড উত্তাপেও আইয়ুব, নিহাল আর ফাহিমদের শরীর হিম হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল—যে বন্ধুত্বের বাঁধনে তারা এতদিন এই সুন্দর পৃথিবীতে শ্বাস নিয়েছে, সেই সম্পর্কের মোহ আজ এক ঝটকায় মুছে গেল।

​রাত্রির নিস্তব্ধতা খানখান করে এক বুকফাটা হাহাকার আকাশ-বাতাসকে বিদীর্ণ করে তুলল। আগুনের সেই লেলিহান শিখা যখন শেরাজ, আরিয়ান আর রায়য়ানের শেষ স্মৃতিটুকুকেও ভস্মীভূত করছিল, তখন উপস্থিত প্রতিটি মানুষের পায়ের নিচ থেকে যেন পৃথিবীটা সরে গেল।
​অনন্যা খাতুন এক উন্মাদিনীর মতো আগুনের দিকে ছুটতে চাইলেন। সাহাবাজ খান তাকে কোনোমতে জাপটে ধরে রাখলেন, কিন্তু তার নিজের চোখের অশ্রু বাঁধ মানল না। অনন্যা খাতুন আর্তনাদ করে উঠলেন,
​“ওরে আমার কলিজার টুকরা! তুই কেন আমাকে ফাঁকি দিলি বেটা? এই আগুনের মাঝে তুই আমায় রেখে কোন ঠিকানায় চলে গেলি?”
​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিয়াজ তার মায়ের আঁচল ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার ছোট্ট মনে তখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে তার বড় ভাই আর কোনোদিন তাকে আগলে রাখবে না।
​অন্যদিকে, মৌ সেন আর আফতাব চৌধুরী পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মৌ সেনের বুক চিরে এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো, তারপর তিনি জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন। রোজা তার ভাইয়ের কথা ভেবে মাটির ওপর বসে পড়ে নিজের চুল খামচে ধরে বিলাপ করতে লাগল,
​“ব্রো! তুমি কোথায়? তুমি কি সত্যি এই আগুনের তাপে ঘুমিয়ে আছো? একবার উঠে এসো ব্রো, আমাকে একটু বক অন্তত।”

আফিয়া খাতুন আর শেহেজাদ খান তাদের তিন ছেলে—সারবাজ, আরবাজ ও শাহরুখকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। তারা জানেন, তাদের তিন সন্তানের বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
সারবাজ আর আরবাজ, যারা ছিল শেরাজের ডানহাত-বামহাত, তারা দুজনের পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। তাদের মনে হচ্ছে আজ শুধু শেরাজ মারা যায়নি, তাদের অস্তিত্বের একটা বিশাল অংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
​শেরাজের বন্ধুরা— আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, ফাহিম, রাহিন— সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে সেই আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে শৈশবের সেই ক্রিকেটের মাঠ, সেই আড্ডা আর অটুট বন্ধুত্বের স্মৃতি। সামিয়া আর নাজমিনও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করছে।
​রুহি খাতুন তার পাঁচ বছরের মেয়ে ফিরোজাকে কোলে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ফিরোজা তার ছোট্ট হাতে মায়ের মুখ মুছে দিয়ে অবুঝ গলায় জিঙ্গেস করল,

​“মাম্মা, আমাল লাভ কি ওই আগুনের ভেতর থেলা করছে? লাভ কী আর ততনও আমাতে ‘মাই লাভ’ বলে ডাতবে না?”
​ফিরোজার এই প্রশ্নে সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে যেন তপ্ত সিসা ঢেলে দেওয়া হলো। আকাশটা সত্যিই আর সইতে পারল না হঠাৎ করেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল, যেন বিধাতাও আজ এই মর্মান্তিক পরিণতির সাক্ষী হয়ে অশ্রু বিসর্জন করছেন। কিন্তু সেই বৃষ্টিও পাতালপুরীর আগুনের ক্রোধ কমাতে পারল না। আগুনের দাউদাউ শব্দ আর মানুষের বুকফাটা কান্নার সুর মিলেমিশে এক বিভীষিকাময় নরকের আবহ তৈরি করল। সামিয়া আর নাজমিন দৌড়ে গিয়ে গাড়ি থেকে দুটো ছাতা এনে ইশিতা আর ইনায়ার মাথার ওপর ধরল।
সুমু বৃষ্টির ঝাপটায় ভেজা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সে দেখল, ধোঁয়ার কুণ্ডলী হয়ে আগুনের তাপ মেঘেদের সাথে মিশে যাচ্ছে। ​সে বিড়বিড় করে বলল,

​“দেখে নিন খান সাহেব, আপনি ছাড়া এই মানুষগুলো আজ কতটা নিঃস্ব। আপনি সবাইকে আগলে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সবাইকে এক সাগর যন্ত্রণায় ভাসিয়ে দিয়ে আপনি আজ মুক্ত।”
​বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়ল, কিন্তু উপস্থিত মানুষের হৃদয়ে জ্বলতে থাকা ক্রোধের আগুন যেন সেই বর্ষণকেও হার মানাল। সারবাজ লাল চোখে সুমুর সামনে এসে দাঁড়াল। তার সারা শরীর কাঁপছে।
​“কী হয়েছিল ভেতরে? উত্তর দাও, সুমু!”
সারবাজের গর্জনে সকলের কান্নার রোল এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। রোজা, শাহরুখ আর রাহিনও সুমুকে ঘিরে ধরল। তাদের চোখে তখন আর সমবেদনা নেই, আছে হাজারো ধারালো প্রশ্ন।
​সাহাবাজ খান টলতে টলতে এগিয়ে এলেন। তিনি সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বললেন,

“আমার ছেলেটা কি ভেতরে ছিল, মামনি? তাহলে ও কেন বেরিয়ে এলো না? তুমি কেন এখানে একা দাঁড়িয়ে? ওরা কি কেউ বাঁচেনি?”
​সুমু বৃষ্টির ঝাপটা উপেক্ষা করে আবারও মাথা উঁচু করল। তার মুখশ্রী এখন অস্বাভাবিক শান্ত, যেন কোনো এক ভয়ংকর ঝড়ের কেন্দ্রস্থল। সে ধীরস্থিরভাবে উপস্থিত সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর বজ্রকঠিন স্বরে বলল,
​“ওরা আর কোনোদিন বেরিয়ে আসবে না। কারণ আমিই ওদের শেষ করে দিয়েছি।”
​মুহূর্তে চারদিকের কান্নার রোল থেমে গিয়ে এক অদ্ভুত, শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা নেমে এলো। সকলে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে, যেন তারা যা শুনেছে তা বিশ্বাস করতে পারছে না।

রোজা চিৎকার করে উঠল,
“কী বললে তুমি? ব্রো’র সাথে তুমি কী করেছ? আর আমার এস.কের সাথেই বা কী করেছ?”
সুমু পাষাণ গলায় আবার বলল,
​“শুনে রাখুন সবাই—আমি নিজেই আরিয়ান আর রায়য়ানকে গুলি করেছি। আর শেরাজ খান… আপনাদের সেই অপরাজেয় শেরাজ খানকে আমি নিজের হাতে খতম করেছি। আমার চালানো বুলেটে যখন ওনার বুকটা ঝাঁঝরা হয়ে গেল, তখনও উনি আপনাদের কাউকে ডাকেনি। আমি ওদের তিনজনকে মেরে, পুড়িয়ে এই মাফিয়া সাম্রাজ্যের কলঙ্ক চিরতরে মুছে দিয়েছি।”
​তার স্বীকারোক্তি যেন একটা ফুটন্ত লাভার মতো সবার ওপর আছড়ে পড়ল। অনন্যা খাতুন আর্তনাদ করে সুমুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলেন,
“খুনি! তুমি আমার সন্তানকে মেরে ফেললে? ডাইনি, তুমি আমাদের ঘরে এসে আমার জানটাই কেড়ে নিলে?”
আইয়ুব আর নিহাল ক্ষিপ্ত হয়ে সুমুর দিকে এগিয়ে আসতেই সারবাজ তাদের আটকে দিল, কিন্তু তার নিজের চোখ দিয়ে তখন আগুনের হলকা বেরোচ্ছে। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“কেন? কেন করলে এই কাজ? এস.কে তো তোমাকে রানির মতো করে আগলে রেখেছিল।”

সুমু তাচ্ছিল্যভরা হাসি হাসল। সে বৃষ্টির অশ্রুতে ভেজা মুখটা মুছে নিয়ে সবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
​“রানি? নাকি সোনার খাঁচায় বন্দি কোনো দাসী? আপনারা শুধু ওদের ক্ষমতা দেখেছেন, ওদের হাতের রক্ত দেখেননি। প্রতিদিন নরক যন্ত্রণা ভোগ করা একজন নারীর আর্তনাদ আপনারা শোনেননি। আজ শেরাজ খান নেই, তাই আপনাদের বুক ফাটছে। কিন্তু প্রতিদিন যে শত শত মানুষ ওদের জন্য মরছিল, তাদের বিচার কে করত? আমি আজ বিচারকের আসনে বসেছিলাম। আমি শুধু ওদের মারিনি, আমি এই রক্তের নেশাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছি। এখন আপনারা চাইলে আমাকে মেরে ফেলতে পারেন, কিন্তু মৃতদের আর ফিরিয়ে আনতে পারবেন না।”
​উপস্থিত প্রতিটা মানুষ ঘৃণায় আর ক্ষোভে ফুঁসতে লাগল। বন্ধুরা কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তাদের ‘এস.কে’ এভাবে একজন নারীর হাতে শেষ হয়ে গেল। ফাহিম আর সাইফ অস্ফুট স্বরে বলল,
“বিশ্বাসঘাতক! আপনার মতো একাটা মেয়েকে ভালোবাসে এস.কে নিজের মরণ ডেকে আনলো।”
​সুমু কোনো উত্তর দিল না। সে হাত দুটো বাড়িয়ে দিল সারবাজের দিকে।
​“পুলিশ আসার অপেক্ষায় থাকবেন না, ভাইয়া। আপনারা তো নিজেরাই আজ আইন। আজ এই আগুনকে সাক্ষী রেখে আমাকে শেষ করে দিন। আপনাদের ভাইয়ের পাশে আজ আমার ছাইটুকুও মিশিয়ে দিন।”
রাহিন এসে সুমুর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“তুই এসব কী বলছিস, সুমু? মাথা ঠিক আছে তোর?”
সুমু উত্তর দিল না। ​বৃষ্টির বেগ আরও বেড়ে গেল, যেন প্রকৃতির অশ্রুধারা সুমুর স্বীকারোক্তির কালকালি ধুয়ে ফেলতে চাইছে। কিন্তু মানুষের মনের গহীন থেকে আসা ঘৃণা কি অত সহজে মোছে? অনন্যা খাতুন আবারও বাঘিনীর মতো সুমুর দিকে এগিয়ে এলেন। সুমুর দু’বাহু ধরে তিনি উন্মত্তের মতো ঝাঁকাতে লাগলেন।
​ “বল ডাইনি! তুই আমার শেরাজকে মারলি কোন সাহসে? ও তোকে ভালোবেসেছিল, তোকে নিজের জীবন দিয়ে ভালোবেসেছিল—আর তুই তার বদলে ওর জীবন নিলি?”
তার প্রতিটি শব্দ যেন এক একটা চাবুকের মতো সুমুর গায়ে বিঁধল। ​সাহবাজ খান এগিয়ে এলেন। তার চোখে তখন কোনো পানি নেই, আছে কেবল জ্বলন্ত অঙ্গার। তিনি দাঁত চেপে বললেন,
​“আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাদের ঘরের আলো হবে, কিন্তু তুমি তো সব শেষ করে দিলে, মামনি। আমার বংশপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে তুমি এখন বিচারকের কথা বলছ? কিন্তু আমি কেন বিশ্বাস করতে পারছি না এসব? আমার কেন মনে হচ্ছে তুমি এমন কিছু করতে পারো না?”
​মৌ সেন মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই চিৎকার করে উঠলেন। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এসেছে, তবুও তাতে তীব্র বিষ ভরা।

​“আমার নিষ্পাপ ছেলেটার কী দোষ ছিল রে খুনি? ও তোকে ভালোবেসেছিল, এইটাই কি ওর দোষ? ওর এই দোষের শাস্তি হিসাবে ওকে তুই মৃত্যু দিলি?”
​আফতাব চৌধুরী তেড়ে এলেন সুমুর দিকে। তিনি হাত তুললেন সুমুকে আঘাত করার জন্য।
​“তোকে আজ আমি নিজ হাতে এই আগুনেই ফেলে দেব। যে নরকে তুই আমার ছেলেকে পাঠিয়েছিস, সেই নরকেই তোকে যেতে হবে। তোর মতো বিশ্বাসঘাতক মেয়ের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।”
​সারবাজ আর আরবাজ তাকে সরিয়ে দিলে। বন্ধুদের ভিড় থেকে আইয়ুব আর নিহাল চিৎকার করে বলল,
“আমাদের বন্ধুকে মারার বিচার আমরা করবই। আপনি ভাবছেন স্বীকারোক্তি দিয়ে পার পেয়ে যাবেন? আপনাকে আমরা তিল তিল করে শেষ করব।”
​সুমু এক চুলও নড়ল না। অনন্যা খাতুনের চড়-থাপ্পড় আর সাহাবাজ খানের ঘৃণ্য চাউনি সে নিঃশব্দে সহ্য করল। তার ঠোঁটের কোণে তখনও সেই রহস্যময়, যন্ত্রণাদায়ক হাসি। সে সাহবাজ খানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,

​“আপনার ছেলে মরে গিয়ে শান্তি পেয়েছে, আব্বু। সে বেঁচে থাকলে প্রতিদিন যে বিষ আপনারা পান করতেন, তার চেয়ে এই মৃত্যু অনেক ভালো। আমাকে মারবেন? মারুন! কিন্তু মনে রাখবেন, শেরাজ খান নিজেই চেয়েছিল এই সাম্রাজ্য ছাই হয়ে যাক। আমি শুধু তার শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করেছি।”
​এই কথা শুনে অনন্যা খাতুন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন।
​“মিথ্যা কথা! আমার ছেলে মরতে চাইবে কেন? তুমি ওকে প্ররোচনা দিয়েছ, তুমি ওকে তিলে তিলে ধ্বংস করেছ। তোমাকে আমরা পুলিশের হাতে দেব না, তোমাকে আমরা জ্যান্ত পুড়িয়ে মারব!”
রোজা এতক্ষণ পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে আগুনের দিকে তাকিয়ে ছিল, সে যেন হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেল। তার চোখের সামনে এখন আর কেবল ধোঁয়ার কুণ্ডলী নেই, আছে তার দুটি অস্তিত্বের ধ্বংসাবশেষ—একদিকে তার সহোদর ভাই, আর অন্যদিকে তার সারাজীবনের অপ্রাপ্তি, তার একতরফা প্রেম শেরাজ খান। সে পাগলের মতো ভিড় ঠেলে আবারও সুমুর সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল, বৃষ্টির জলে ভিজে জবজবে হয়ে থাকা পরনের শাড়িটা মেঝের ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে। সে সুমুর গলা টিপে ধরে চিৎকার করে উঠল,
​“তুই কেন করলি এসব? তুই শুধু আমার ভাইকে মারিসনি, তুই আমার পৃথিবীটাকেও জ্বালিয়ে দিয়েছিস। আমি এস.কে’কে ভালোবাসতাম, জেনেশুনে ভালোবাসতাম যে ও তোর! আমি তো কোনোদিন ওকে তোর কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইনি, শুধু দূর থেকে একটু দেখতে চেয়েছিলাম। তুই সেই দেখার অধিকারটুকুও রাখলি না?”
​সে সুমুকে ছেড়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার বিলাপের সুর এতই করুণ যে উপস্থিত মানুষজন এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল। সে বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,

​ “এস.কে তুমি তো জানতে আমি তোমাকে কতটা চাইতাম। একবার, শুধু একবার ফিরে এসে আমার দিকে তাকাও। তুমি তো অপরাজেয় ছিলে, তবে আজ এই ডাইনির হাতে কেন হার মানলে?” ​সে সুমুর পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে সুমুর পা ধরে আর্তনাদ করে বলল, “আমি রোজা চৌধুরী আজ তোমার পা ধরছি সুমু, তুমি একবার বলো যে, এসব মিথ্যে বলছ। বলো যে ওরা কোথাও লুকিয়ে আছে। তুমি কেন ওদের দুজনকে আমাদের থেকে সারাজীবনের জন‍্য কেড়ে নিবে, তাই না? তুমি তো এস.কে’কে ভালোবাসো। আর আমার ভাইটাও তো তোমাকে শুধু ভালোবেসেছিল। এইটা তো অন‍্যায় নয়। তাছাড়া এস.কে… ও তো তোমার হাজব‍্যান্ড ছিল। তুমি কোন ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজের হাতে নিজের কলিজা কেটে ছিঁড়ে আনলে, সুমু? তুমি আমাদের সবাইকে জ্যান্ত কবর দিয়ে নিজে কীভাবে ঠিক আছো, সুমু? এতোটা পাষাণ হইয়ো না, সুমু। সত্যি করে বলো, ওরা কোথায়?”

সুমু নিরুত্তর। ​রোজার এই আর্তনাদ যেন আগুনের শিখার চেয়েও বেশি দহন। মৌ সেন আর আফতাব চৌধুরী তাদের মেয়ের এই দশা দেখে আরও বেশি ভেঙে পড়লেন। রোজা আবারও চিৎকার করে বলতে লাগল,
​“এস.কে! তুমি কি দেখছ না এই নির্লজ্জ, বেহায়া রোজা আজ কতটা নিঃস্ব? আমার তো তোমাকে ভালোবাসার ভাগ‍্য হলো, কিন্তু আমার কেন তোমার নিজের করে পাওয়ার ভাগ‍্য হলো না? তুমি থাকতে সুমুর হয়ে, তবুও তুমি বেঁচে থাকতে এস.কে। কিন্তু তুমি কেন এভাবে চলে গেল? এই রোজা তো শুধুমাত্র তোমাকে দেখেই শান্তি পেত। আজ তুমি রোজার থেকে সেটুকুও কেড়ে নিলে? এতোটা স্বার্থপর কীভাবে হলে এস.কে?”
সুমু নিস্পলক চোখে রোজার দিকে তাকিয়ে রইল, তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, কিন্তু মুখে সে এক নিরেট নির্লিপ্ততা ধরে রেখে মনে মনে বলল,

‘ক্ষমা করো, রোজা। আমি আজ নিরুপায়। তোমরা সবাই আমাকে ক্ষমা করো।’
​বৃষ্টির শব্দ আর বড়দের বুকফাটা আর্তনাদের মাঝে হঠাৎ একটি ছোট, ভাঙা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ছোট্ট ফিরোজা, যাকে শেরাজ আদর করে ‘মাই লাভ’ বলে ডাকত, সে এতক্ষণ তার মা রুহি খাতুনের আঁচল ধরে ভয়ে কুঁকড়ে ছিল। কিন্তু আগুনের সেই দাউদাউ শব্দ আর বড়দের ‘শেরাজ নেই’ বলে হাহাকার শুনে তার ছোট্ট মনটা আর স্থির থাকতে পারল না। সে তার মায়ের হাত ছাড়িয়ে টলমল পায়ে আগুনের শিখার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল। তার গোলগাল তোতলা কণ্ঠে সে আকাশের দিকে মুখ করে চিৎকার করে ডাকল,
​“লাভ… ও লাভ! তুমি তোথায়? তুমি আগুনের ভিতল লুতিয়ে আছো কেন লাভ? আমাল সাথে থেলা কলবে না?”
​ছোট্ট ফিরোজার এই ডাক শুনে উপস্থিত সবার কান্না যেন এক মুহূর্তের জন্য গলায় আটকে গেল। সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ওই অবুঝ শিশুটির দিকে। ফিরোজা বৃষ্টির জলে পুরোপুরি ভিজে গেছে, তার চোখের জল আর বৃষ্টির জল মিশে একাকার। সে সুমুর দিকে ফিরে তার জামাটা ধরে টেনে কাঁপা গলায় বলল,

​“চুমু, নিউ ফ্রেন্ড… আমাল লাভকে ডাতো। লাভ তেনো তথা বলছে না? লাভকে বলো আমি থুউব ভয় পাচ্ছি। লাভ তো আমায় বলেতে সে আমায় ছেড়ে তোথাও যাবে না। ও চুমু মাম্মি, লাভকে বলো আমায় একবাল ‘মাই লাভ’ বলে ডাততে।” ফিরোজা আবার আগুনের দিকে ঘুরে দু’হাত বাড়িয়ে বলল, “লাভ… তুমি আমাল কতা শুনছো না তেনো? আমি তো তোমাল মাই লাভ! তুমি তো বলেতো আমি ডাতলে তুমি সব পেলে চলে আসবে। ও লাভ… উঠে আসো না! আমাল লক্ষ্মী লাভ, আমি আর কোনোদিন জিদ তলব না, আমায় একবাল থোলে নাও না!”
​ছোট্ট ফিরোজার এই আর্তনাদ যেন আগুনের উত্তাপের চেয়েও বেশি ধারালো হয়ে সবার বুকে বিঁধল। সাহবাজ খান আর অনন্যা খাতুন নিজেদের কান্না ভুলে ফিরোজার দিকে তাকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। রুহি খাতুন দৌড়ে এসে ফিরোজাকে জড়িয়ে ধরলেন, কিন্তু ফিরোজা তার মায়ের কোল থেকে ছটফট করে নামতে চাইল। সে চিৎকার করে বলতে লাগল,
​“ছালো মাম্মা! লাভ পুলে যাচ্ছে। লাভের তষ্ট হচ্ছে! চুমু মাম্মি, তুমি লাভকে বাঁতাও। তুমি না বনেছিলে আমাল লাভ সুপালম্যান? আমাল সুপালম্যান তোনো আমাল তাছে আসতে না?”
​ফিরোজার এই তোতলা কথার আকুতি সেখানে উপস্থিত পাষাণ হৃদয়ের মানুষদেরও চোখের অশ্রু ধরে রাখতে দিল না। যে শেরাজ খান দুনিয়ার কাছে এক ভয়ংকর মাফিয়া ছিল, এই ছোট্ট মেয়েটির কাছে সে ছিল শুধুই তার ‘লাভ’।
​সুমু স্থির চোখে ফিরোজার দিকে তাকাল। তার মনে হলো, শেরাজের বিদেহী আত্মা হয়তো ওই আগুনের শিখার আড়াল থেকেই তার ‘মাই লাভ’-এর এই ডাক শুনছে, কিন্তু তার ফিরে আসার আর কোনো পথ নেই।
​রাত্রির সেই প্রলয়ংকরী তান্ডবের মাঝে রিয়াজও এতক্ষণ পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কাচা বয়সের চোখ দুটো দিয়ে সে দেখছিল তার আশৈশব আদর্শ, তার গর্ব, তার ভাই শেরাজ খানের তিলে তিলে গড়া সাম্রাজ্য কীভাবে অগ্নিকুণ্ডে বিলীন হচ্ছে। রিয়াজের কাছে শেরাজ শুধু একজন ভাই ছিল না, সে ছিল এক অপরাজেয় পাহাড়, যাকে স্পর্শ করার সাহস কারও ছিল না।

হঠাত্‍ রিয়াজের সেই নীরবতা এক তীব্র আর্তনাদে ফেটে পড়ল। সে সুমুর দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে নিজের গলার সবটুকু জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
​“মিথ্যে! সব মিথ্যে! পার্টনার, তুমি মিথ্যে বলছো! ব্রো কোনোদিন হারতে পারে না। আমার ব্রোকে মারার ক্ষমতা এই দুনিয়ায় কারও নেই, তোমার তো নেই।”
​রিয়াজ দৌড়ে গিয়ে জ্বলন্ত পাতালপুরীর প্রবেশপথের দিকে যেতে চাইল, কিন্তু সারবাজ আর আইয়ুব তাকে পেছন থেকে জাপটে ধরল। রিয়াজ তাদের হাতের বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল। তার কিশোর কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

​“ছাড়ো আমাকে! আমার ব্রো ভেতরে আটকা পড়ে আছে। ব্রো হয়তো আমাকে ডাকছে। ব্রো তো আমাকে বলেছিল আমি বড় হলে আমাকে ওর মতো সাহসী বানাবে, আমাকে বাইক চালানো, কার চালানো শেখাবে। ও কিচ্ছু না বলে এভাবে একা একা চলে যেতে পারে না। ব্রো… ব্রো! একবার উত্তর দাও।” সে মাটির ওপর আছড়ে পড়ে কাদা আর বৃষ্টির জলে মাখামাখি হয়ে গেল। সুমুর দিকে হাত উঁচিয়ে ঘৃণাভরা চোখে তাকিয়ে গর্জে উঠল, “তুমি খুনি! তুমি আমার ব্রোকে মেরেছো। আমার ব্রো তোমাকে চোখের মণি করে রাখত, সে তোমার জন্য সারা দুনিয়ার সাথে লড়ত, আর তাকে তুমি এভাবে পুড়িয়ে মারলে? আমি তোমাকে কোনোদিন মাফ করব না। আমি বড় হয়ে আমার ব্রো-এর মতো হবো, আর সেদিন আমি তোমার কাছ থেকে আমার ব্রো-এর রক্তের হিসাব নেব।”
​রিয়াজ উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে তার বাবার সামনে গেল। সে কাঁদতে কাঁদতে সাহবাজ খানের পা জড়িয়ে ধরে বলল,

​“ড‍্যাড, ব্রো’কে বাঁচাও! ও তো খুব শক্ত মানুষ, ও কি আগুনে পুড়ে সত্যি মরা যাবে? আমার ব্রো’কে বাঁচাও। আমার ব্রো পুড়ে যাচ্ছে ড‍্যাড… আমার ব্রো মরে যাচ্ছে।”
​রিয়াজের সেই কিশোরী আকুতি আর শোক যেন উপস্থিত সবার কলিজা চিরে দিল। বড়দের শোকের মাঝে এই ছোট্ট ছেলেটির অসহায়ত্ব প্রমাণ করে দিচ্ছিল যে, শেরাজ খান কেবল একজন মাফিয়া ছিল না, সে ছিল একটি পরিবারের মেরুদণ্ড।
​রিয়াজ হঠাৎ শান্ত হয়ে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে, কিন্তু দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে ফিসফিস করে বলল,
​“ব্রো বলেছিল, ‘রিয়াজ, কিছু হলে ভয় পাবি না, আমি তো আছি’। আজ আমি খুব ভয় পাচ্ছি ব্রো… তুমি কোথায়? কেন আসছো না?”
শাহরুখ ধীর পায়ে রিয়াজের পাশে এসে বসল। সে রিয়াজকে বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলল,

“ব্রো আমাকে সবসময় বলত, ‘শাহরুখ, কোনো অন্ধকার জগত তোর জন্য না। তুই ব্যাট ধরবি, বন্দুক না। তোকে আমি আফগানিস্তানের জাতীয় দলে খেলতে দেখতে চাই। তুই যখন মাঠ কাঁপাবি, আমি গ্যালারিতে বসে কলার তুলে বলব— ওটা আমার ভাই, শাহরুখ’!”
​হঠাৎ তার সেই পাথরের মতো মৌনতা এক ভয়ংকর হাহাকারে পরিণত হলো। সে পাগলের মতো উঠে দাঁড়িয়ে সুমুর সামনে এসে এক আর্তনাদে ভেঙে পড়ল,
​“ভাবিজি! কিছুদিন পরেই তো আমার আফগানিস্তান যাওয়ার ফ্লাইট কনফার্ম করার কথা ছিল। ব্রো বলেছিল ও নিজে আমাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করবে। তাহলে এই আগুনের ফুলকিগুলো কি আজ আমার স্বপ্ন ভাবিজি? ও কি জানত না, ও না থাকলে আমার ওই সেঞ্চুরি আর গ্যালারির তালি সব অর্থহীন?” সে সুমুর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, ​“তুমিও তো জানতে ভাবিজি! তুমি তো ব্রো’র সবথেকে কাছের মানুষ ছিলে। তুমি কেন ব্রো’কে আটকালে না? ব্রো যখন আমাকে বলত, ‘শাহরুখ, তুই একদিন বিশ্বজয় করবি’, আমি তখন ব্রো-এর চোখের দিকে তাকিয়ে সাহস পেতাম। আজ আমি কার দিকে তাকাব? কার জন্য আমি মাঠে নামব? কে আমাকে বলবে— ‘সাবাস শাহরুখ, আরও জোরে ব্যাট চালা’?”
​শাহরুখ মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার দু’হাত বৃষ্টির জলে ভেজা কাদা খামচে ধরে আছে। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলতে লাগল,

​“ব্রো আমাকে বলত এই জগত থেকে দূরে থাকতে। ব্রো নিজে নরকে থেকেও আমাকে জান্নাতের স্বপ্ন দেখাত। তুমি জানো, ব্রো আমার এই দু’হাত ধরে তার নিজের হাতে আমাকে ক্রিকেট খেলা শিখিয়েছে। আজ ব্রো নিজেই নরকের আগুনে শেষ হয়ে গেল? ব্রো কি একবারও ভাবল না, ওর এই স্বপ্নের ক্রিকেটার ভাইটা ওকে ছাড়া একা হয়ে যাবে? ব্রো… ব্রো! আমি আর ক্রিকেট খেলব না! আমি আফগানিস্তান যাব না। তুমি ফিরে এসো। তুমি এসে আমাকে একটা ধমক দাও।”
​শাহরুখের এই আকুতি যেন উপস্থিত শেরাজের বন্ধুদের হৃদয়ে আরও বড় ক্ষত তৈরি করল। আইয়ুব আর নিহাল শাহরুখকে টেনে তোলার চেষ্টা করল, কিন্তু শাহরুখ ছোট বাচ্চার মতো কাঁদতে লাগল। তার প্রতিটি শব্দে মিশে ছিল এক অসমাপ্ত স্বপ্নের করুণ আর্তি। ​সে ফিসফিস করে আগুনের লেলিহান শিখার দিকে তাকিয়ে বলল,
​“ব্রো, তুমি বলেছিলে আমার জয় দেখার আগে তুমি মরবে না। তুমি তো বেইমানি করলে ব্রো… তুমি তো বেইমানি করলে।”

সারবাজ, আরবাজ আর শেরাজের বন্ধুরা— আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন ও রিসান— এতক্ষণ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ছিল। কিন্তু হঠাত্‍ যেন তাদের সবার রক্তে এক আত্মঘাতী প্রতিশোধের নেশা চড়ে বসল। শেরাজ ছিল তাদের মধ্যমণি, তাদের অস্তিত্বের ধ্রুবতারা। সেই তারা যখন নিভে গেছে, তখন এই অন্ধকার পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো অর্থই তাদের কাছে অবশিষ্ট নেই।
​সারবাজ আগুনের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল। তার চাউনি তখন মানুষের নয়, এক আহত নেকড়ের মতো। সে গর্জে উঠে বলল,

​“এস.কে আমাদের ছাড়া কোনোদিন কোথাও যায়নি। ও একা এই আগুনে জ্বলছে—এটা হতে পারে না। আমাদের শপথ ছিল ‘বাঁচলে একসাথে, মরলে একসাথে’। আজ ও নেই, তাহলে আমাদের বেঁচে থাকাটাও বেইমানি।”
​আরবাজ তার ভাইয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে অশ্রু নেই, আছে এক অবিনশ্বর জেদ। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল,
​“আপনি ভেবেছিলেন ব্রো’কে মেরে আমাদের আলাদা করবেন? আপনি ব্রো’কে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবেন না, ভাবিজি। আজ এই আগুনই আমাদের মিলনস্থল হবে।”
​বন্ধুদের ভিড় থেকে আইয়ুব আর নিহাল চিৎকার করে উঠল। সাইফ, ফাহিম আর রাহিনও কাতারবদ্ধ হয়ে সারবাজের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের সবার চোখে তখন এক অমানুষিক সংকল্প। আইয়ুব কাঁপা গলায় কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল,

​“এস.কে ছাড়া এই জগত আমাদের কাছে শ্মশান। আমাদের নেতা যেখানে, আমরাও সেখানে। চল ভাইরা, আজ এস.কের সেই শেষ কথাটা সত্যি করি— ‘উই ডাই টুগেদার’!”
​দশজন টগবগে যুবক, যারা সারা শহর কাঁপিয়ে বেড়াত, তারা আজ লাইন ধরে আগুনের লেলিহান শিখার দিকে হাঁটতে শুরু করল। উপস্থিত পরিবারের সদস্যরা— সাহবাজ খান, অনন্যা খাতুন, মৌ সেন— সবাই আর্তনাদ করে উঠলেন। মায়েরা তাদের সন্তানদের আটকাতে চাইলেন, কিন্তু তারা আজ অপ্রতিরোধ্য।
​সারবাজ পাতালপুরীর দরজার একদম কিনারে গিয়ে হাত দুটো প্রসারিত করে দিল। আগুনের হলকা তার গায়ের চামড়া স্পর্শ করছে, কিন্তু তার মুখে এক স্বর্গীয় তৃপ্তি। সে পেছনে ফিরে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল,
​“রেডি সবাই? ওইপারে আমাদের কিং অপেক্ষা করছে। আজ আবার সবাই মিলে ক্রিকেট খেলব, আবার আড্ডা হবে। চল।”
​সুমু স্তব্ধ হয়ে এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখছে। সে কল্পনাও করতে পারেনি যে শেরাজের প্রতি এই ছেলেগুলোর আনুগত্য মৃত্যুর চেয়েও শক্তিশালী। সে চিৎকার করে উঠল,

​“থামুন সবাই! আপনারা কি পাগল হয়ে গেছেন? খান সাহেব আপনাদের সবাইকে সুখী দেখতে চায়। সে নিজের জীবন দিয়েছে যাতে সে তার পাপ থেকে মুক্তি পায়।”
​কিন্তু কেউ শুনল না। অমিত, রিয়াদ আর রিসান একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে আগুনের শিখার দিকে প্রথম লাফটা দিতে চাইল। একদল জলজ্যান্ত মানুষের এই গণ-আত্মহত্যার প্রচেষ্টা পুরো পরিবেশকে এক মহাপ্রলয়ের বিভীষিকায় রূপ দিল। পেছন থেকে মায়েরা এবার আরও জোরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, বাবারা সন্তানদের নাম ধরে আর্তনাদ করতে লাগলেন। বৃষ্টির জল যেন ওই আগুনের তেজ কমাতে ব্যর্থ, আর মানুষের আবেগ যেন ওই মরণ-নেশা কমাতে অক্ষম। শেরাজের প্রতি এই চরম ‘ব্রাদারহুড’ বা ভ্রাতৃত্বের এক চূড়ান্ত এবং নৃশংস প্রমাণ দিতে তারা সবাই প্রস্তুত।

হঠাৎ নাজমিন দৌড়ে এসে আইয়ুবের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। নাজমিনের দুচোখে অশ্রু, গলায় একরাশ আতঙ্ক। সে আইয়ুবকে টেনে সরানোর চেষ্টা করে চিৎকার করে বলল,

“কী করছেন আপনি এসব? পাগল হয়ে গেছেন? আপনি কি পুড়ে মরতে যাচ্ছেন? নিজের জীবনের মায়া না থাক, একবারও কি আমার কথা ভাববেন না? আমি আপনাকে কোথাও যেতে দেব না। সরে আসুন বলছি।”
​আইয়ুব এক ঝটকায় নাজমিনের হাতটা সরিয়ে দিল। তার চোখের মণি এখন রক্তবর্ণ, বন্ধুর শোকে সে এখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। নাজমিনের দিকে তাকিয়ে পাথরকাটা গলায় সে গর্জে উঠে বলল

“ছাড়ো! আমার হাত ছাড়ো নাজমিন। দেখছ না আমার প্রাণের প্রিয় বন্ধু, আমার ভাই ওই আগুনের ভেতর ঝলসে যাচ্ছে? আমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি ওর পুড়ে যাওয়া দেখব?”
​নাজমিন তাকে ধরতে চাইল, কিন্তু আইয়ুব ধাক্কা দিয়ে পিছিয়ে দিল।
“শোনো নাজমিন, আজ একটা কথা পরিষ্কার শুনে রাখো— আমাদের এই বন্ধুত্ব আর বন্ধুদের জন্য আমরা তোমার মতো লক্ষ্য নারীকে এক নিমেষে ছেড়ে দিতে পারি। কিন্তু আমরা আমাদের বন্ধুদের ছাড়তে পারি না। আমাদের রক্তে মিশে আছে এস.কে, আরিয়ান আর রায়য়ান। হতে পারে আরিয়ান আর রায়য়ান আমাদের শত্রুর মতো ছিল, তবে একটা সময় ওরা দুজনও আমাদের বন্ধু ছিল। ওদের লাশ যেখানে, আমাদের জানও সেখানে। কোনো নারী, কোনো ভালোবাসা আজ আমাকে এই আগুন থেকে আটকাতে পারবে না।”

তার এই নিষ্ঠুর কথায় নাজমিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, এই জগতের পুরুষদের কাছে বন্ধুত্বের টান রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বেশি, এমনকি ভালোবাসার চেয়েও দামী।
সাহাবাজ খান, শেহেজাদ খান, আফতাব চৌধুরী আর আদনান চৌধুরী নিজেদের সবটুকু শক্তি দিয়ে সবাইকে পেছন থেকে টেনে ধরলেন। আফিয়া খাতুন আর্তনাদ করে বললেন,
​“আমায় মেরে তারপর যা তোদের শখ মেটা।”
তার বুকফাটা আর্তনাদে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সেই মরণযাত্রা। বড়দের এই বাঁধার কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হলো তারুণ্যের সেই উন্মাদনাকে। মৃত্যুর দুয়ার থেকে তাদের টেনে হলো। তারা সবাই একসাথে বৃষ্টির কাদার মধ্যে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। তাদের সেই গর্বিত মাথাগুলো আজ নুয়ে পড়েছে মাটির কাছাকাছি। ​শুরু হলো এক সম্মিলিত আর্তনাদ। কোনো শব্দ নেই, কেবল বুক চিরে আসা এক অমানুষিক হাহাকার।
রাহিন দুই হাতে মাটির কাদা খামচে ধরে পাগলের মতো নিজের কপালে আঘাত করতে লাগল। সে চিৎকার করে বলল,

​“কেন আটকালেন আমাদের? কেন? এস.কে একা ওই নরকের আগুনে জ্বলছে, আর আমরা এখানে দাঁড়িয়ে ভিজছি? এই জীবন দিয়ে আমরা কী করব? কে আমাদের হুকুম দেবে? কার ছায়ায় আমরা বুক ফুলিয়ে হাঁটব?”
অমিত আর নিহাল পাগলের মতো চিৎকার করে বলল,
​“এস.কে! তুই আমাদের বেইমান বানিয়ে দিয়ে চলে গেলি। তুই জানতি তোকে ছাড়া আমরা অচল, তাও কেন এই বেইমানি করলি? ফিরে আয় ভাই, একবার শুধু গালি দিয়ে বল যে আমরা ভুল করছি। আমাদের এইভাবে এতো সহজে ভেঙে পড়া উচিত না।”
​মাঠের মাঝখানে দশজন শক্তিশালী যুবক কাদা মেখে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অবুঝ শিশুদের মতো ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। ​ফাহিম, সাইফ, রিসান আর রিয়াদ ভেজা মাটির ওপর পড়ে রইল। তাদের মনে হচ্ছে আজ আকাশটা ভেঙে তাদের মাথায় ওপর পড়েছে। যে মানুষটা তাদের বিপদ-আপদে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকত, সেই মানুষটাই আজ ছাই হয়ে ধোঁয়ার সাথে মিশে যাচ্ছে।
​উপস্থিত প্রতিটি মানুষ সবাই স্তব্ধ হয়ে যুবকদের এই পাগলামি দেখছে। শেরাজ খান যে কেবল একজন মাফিয়া লিডার ছিল না, বরং এই ছেলেগুলোর প্রাণের স্পন্দন ছিল, তার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?
​সুমু একটু দূরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ঝাপটায় এই দৃশ্য দেখছে। তার চোখ দিয়েও নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে বিড়বিড় করে বলল,

​“দেখুন খান সাহেব, আপনার ভাইয়েরা আজ আপনার জন্য মাটি কামড়ে কাঁদছে। আপনি তো আমাদের ছেড়ে চলে যাননি, আপনি তো এদের সবার বিশ্বাসের মধ্যে অমর হয়ে গেছেন। কিন্তু এই দহন কি ওরা সইতে পারবে?”
মৌ সেন কাদা মাখা হাতে নিজের বুকটা খামচে ধরে বললেন,
​“আরিয়ান বেটা। তোর ওই সুন্দর মুখটা কি আগুনের আঁচে পুড়ে ঝলসে গেছে বেটা? তুই তো গরমে একটু ঘামলেই অস্থির হয়ে যেতি, আজ এই দাউদাউ আগুনের মাঝে তুই কীভাবে আছিস? ওরে আমার চাঁদের কণা, একবার মম বলে ডাক দে!” ​তিনি পাগলের মতো নিজের কপাল চাপড়াতে লাগলেন, ​“ছোটবেলায় তোর কপালে আমি রোজ কালো টিপ দিয়ে দিতাম যাতে কারো নজর না লাগে। আজ কার নজর লাগল বেটা? তোর ওই রাজপুত্রের মতো দেহটা কি এখন ছাই হয়ে গেছে? আমি এখন কাকে আদর করব? কার জন্য পছন্দের খাবার সাজিয়ে বসে থাকব? ওরে আমার নাড়ি ছেঁড়া ধন, তুই তো বলতি আমাকে ছাড়া তোর এক মুহূর্ত চলে না—আজ কোন অভিমানে একা চলে গেলি?” তিনি মাটির বুক খুঁড়ে যেন তার ছেলেকে খুঁজে পেতে চাইলেন, ​“আজ কেন আমাকে এই গাঢ় অন্ধকারে ফেলে দিয়ে তুই চিরতরে হারিয়ে গেলি? আল্লাহ! কেন তুমি আমার কোল খালি করলে? কেন আমার চাঁদের টুকরোকে তুমি কেড়ে নিলে?”
​সুমুর এক মুহূর্ত আফতাব চৌধুরীর কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটার দিকে তাকাল। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল,

​“মামা, এই যে চারদিকে কান্নার সমুদ্র দেখছেন… এখানে শেরাজ খানের জন্য বিলাপ করার মানুষের অভাব নেই। আরিয়ান চৌধুরীর ওই চাঁদের মতো সুন্দর মুখের ছেলেটার জন‍্য তার মম শোক করছে। কিন্তু আপনি কি একবার ওই আগুনের তৃতীয় শিখাটার দিকে তাকিয়ে দেখেছেন?”
​আফতাব চৌধুরী অবাক হয়ে সুমুর দিকে চোখ তুললেন। সুমু তার খুব কাছে ঝুঁকে গিয়ে ঠোঁটের কোণে এক বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে বলল,

​“রায়য়ানও তো ভেতরেই ছিল, মামা। কিন্তু ওই ছেলেটার জন্য এখানে চোখের পানি ফেলার মতো একটা মানুষও নেই। ওর কি কোনো মা ছিল না? কোনো বাবা ছিল না? কি মামা… আর কেউ না কাঁদুক, আপনার তো অন্তত এখন বুক ফেটে কান্না আসার কথা ছিল। আপনার হৃদয়ে কি একটুও টান লাগছে না?”
​আফতাব চৌধুরীর মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার চোখ কাঁপতে শুরু করল। সুমু আরও দৃঢ় গলায় বলল,
“হাজার হোক, রায়য়ান তো আপনারই রক্ত, মামা। আপনার সেই অন্ধকার অতীতে ফেলে আসা অবৈধ সন্তান, তাই না? যাকে কোনোদিন স্বীকৃতি দেননি, যাকে আড়ালে রেখেছিলেন— আজ সেই ছেলেও আপনার বৈধ ছেলের সাথেই ছাই হয়ে গেল। রায়য়ানের জন্য একটা ফোঁটা চোখের জল কি আজ আপনার চোখ থেকে পড়বে না? নাকি নিজের সম্মান বাঁচানোর লড়াইয়ে আপনি পিতা হিসেবে আজও হেরে গেলেন?”
​আফতাব চৌধুরী নিথর হয়ে গেলেন। তার গলার স্বর আটকে এলো, যেন তার পাঁজরের হাড়গুলো কেউ এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন,
“তুমি… তুমি এসব কী বলছো?”

সুমু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আগুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
​“আমি যা বলছি, তা আপনি আর আপনার বিবেক—উভয়েই জানেন। এক ছেলে রাজপুত্রের মতো বিদায় নিচ্ছে, আর অন্য ছেলেটা অভিশপ্ত হয়ে ছাই হচ্ছে। অথচ দুজনেই আপনার রক্ত। কি বিচিত্র এই নিয়তি, তাই না মামা?”
​মৌ সেন যিনি এতক্ষণ আরিয়ানের শোকে জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয়েছিলেন, তিনি হঠাত্‍ যেন এক অমানুষিক শক্তিতে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তার কান্নারত চোখে এখন শোকের চেয়েও বড় এক ঘৃণা আর বিস্ময়। তিনি টলতে টলতে স্বামীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
রোজা পাগলের মতো এগিয়ে এসে তার বাবার কলার চেপে ধরে চিৎকার করে বলল,

​“ড্যাড! সুমু এসব কী বলছে? রায়য়ান চৌধুরী আমাদের রক্ত? ও আমার ভাই? বলো ড্যাড, চুপ করে থেকো না। আরিয়ান, রায়য়ান আর আমি কি তবে একই বাবার সন্তান?”
​আফতাব চৌধুরী কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। তিনি এক দৃষ্টিতে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মৌ সেন তার স্বামীর কাঁধ ধরে সজোরে এক ঝাঁকুনি দিলেন।
​“আফতাব! রায়য়ান চৌধুরী তবে তোমার সেই সন্তান? যার কথা তুমি আমাকে বিয়ের আগে কোনোদিন বলোনি? আর বিয়ের পর যখন আমি জানতে পেরেছিলাম, তখন তুমি কী বলেছিলে মনে আছে? তুমি বলেছিলে— তুমি ওই পাপ আর ওই অবৈধ সন্তানকে নিজের হাতে শেষ করে দিয়েছ। তুমি বলেছিলে ও আর এই দুনিয়াতে নেই। তবে রায়য়ান কীভাবে ফিরে এলো? কীভাবে বলো?”

​আফতাব চৌধুরী ধপ করে কাদার মধ্যে বসে পড়লেন। তার চারপাশের মানুষের ঘৃণাভরা চাউনি তাকে যেন জীবন্ত দগ্ধ করছে। আরিয়ানের বন্ধুরা—আইয়ুব, নিহাল—সবার চোখে এখন এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্য।
সুমু তার সামনে আরও এক পা এগিয়ে এসে বলল,
​“মামা, আজ আপনি সত্যিই একা। এক ছেলে আপনার পাপে শেষ হলো, অন্য ছেলে আপনার গোপনীয়তার বলি হলো। নিজের সম্মান বাঁচাতে যাকে আপনি মৃত বলে ঘোষণা করেছিলেন, সেই রায়য়ানই আজ আপনার সাজানো বাগান পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে গেল। আজ আপনার কাছে না আছে পুত্র, না আছে সম্মান। আপনি আজ সব হারালেন।”
​তার প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি তপ্ত পেরেক হয়ে আফতাব চৌধুরীর মগজে বিঁধছে। হঠাত্‍ তিনি এক উন্মত্ত পশুর মতো গর্জে উঠলেন। কাদার ওপর বসে থাকা অবস্থাতেই তিনি মাথা তুললেন। তার চোখ দিয়ে তখন অশ্রু নয়, বরং ঝরছে আগ্নেয়গিরির লাভা। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে, গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,

​“চুপ করো! একদম চুপ করো। আজ আমার যা কিছু গেছে, সব তোমার জন্য। এই সর্বনাশের মূলে তুমি। তুমি আমাদের জীবনে না এলে আজ আমার আরিয়ান বেঁচে থাকত। আমার বংশের রক্ত আজ ওই নর্দমার কীটের সাথে ছাই হতো না।” ​তিনি সুমুর দিকে তর্জনী উঁচিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ​“তোমার জন্য আমি আজ সব হারিয়েছি। তুমি ওই শেরাজকে উসকে দিয়েছ, তুমি আরিয়ান আর রায়য়ানের মাঝখানে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছ। তুমি যদি সত্যি আমাদের জীবনে না আসতে, তবে আমার গোপন কথা আজীবন গোপনই থাকত। আমি রায়য়ানকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু তুমি তাকে আবার আমার জীবনে টেনে এনেছ। আজ আমি নিঃস্ব, কিন্তু এই নিঃস্ব হওয়ার কারিগর তুমি।”

​মৌ সেন আর্তনাদ করে উঠে স্বামীকে থামানোর চেষ্টা করলেন না, বরং ঘৃণায় দূরে সরে দাঁড়ালেন। কিন্তু সুমু একটুও বিচলিত হলো না। সে আফতাব চৌধুরীর আগুনের মতো চাহনির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
​“দোষারোপ করা খুব সহজ, মামা। কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখ দুটোকে প্রশ্ন করুন তো— রায়য়ানকে কি আমি সৃষ্টি করেছি? তার মনে যে প্রতিশোধের বিষ ছিল, সেটা কি আমার দেওয়া? নাকি আপনার দেওয়া পরিচয়হীন শৈশব আর মিথ্যে মৃত্যুর যন্ত্রণার ফল? আপনি সব হারিয়েছেন আজ থেকে নয়, যেদিন আপনি আপনার নিজের রক্তকে অস্বীকার করেছিলেন, আপনার পতন সেদিনই শুরু হয়েছিল। আমি তো কেবল সেই পরিণতির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।”
​রোজা আবারও উন্মাদিনীর মতো এগিয়ে এলো। সে সুমুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য হাত তুলল,

“তুই আমার ভাইদের আর আমার ভালোবাসা, দুজনকেই কেড়ে নিয়েছিস। তোকে আজ আমি নিজ হাতে ওই আগুনেই পুড়িয়ে মারব।”
​সে সুমুকে স্পর্শ করার আগেই এক শক্ত দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল পাঁচজন নারী— ইশিতা, ইনায়া, নাতাশা, সামিয়া আর নাজমিন। তারা একে অপরের হাত ধরাধরি করে সুমুকে মাঝখানে রেখে এক দুর্ভেদ্য বৃত্ত তৈরি করল।
​নাতাশা, রোজার হাতটা মাঝপথেই শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের চাহনিতে তখন এক অটল কাঠিন্য। সে উপস্থিত পুরুষদের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বলল,
​“থামুন সবাই! অনেক হয়েছে। আপনারা যারা আজ ম‍্যামকে দোষ দিচ্ছেন, আপনারা কি এক মুহূর্তের জন্য ভেবে দেখেছেন এই মেয়েটা কীসের ভেতর দিয়ে গেছে? ম‍্যাম, আমি জানি না ভেতরে ঠিক কী ঘটেছিল। আমি জানি না কেন আপনি তিনজনকে মারতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু আমি এটুকু জানি, আপনার মতো একটা মেয়ে তখনি অস্ত্র ধরে, যখন দেয়ালে তার পিঠ ঠেকে যায়।”

​ইশিতা, সুমুর দিকে ফিরে তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
​“তুমি কেন ওদের মেরেছ, এর পেছনে নিশ্চয়ই এমন কোনো বড় কারণ আছে যা এই পুরুষশাসিত সমাজ কোনোদিন বুঝবে না। আমরা তো এই বাড়ির বউ হয়ে এসেছিলাম সুমু, আমরা তো পরের বাড়ির মেয়ে। আর এই সমাজ শিখিয়েছে, কোনো বিপর্যয় ঘটলে সবার আগে পরের বাড়ির মেয়েদের দিকে আঙুল তোলা কত সহজ। ঠিক-ভুল বিচার না করে দোষ দেওয়াটা এখানে প্রথা।”
​সামিয়া আর নাজমিন সুমুর দুপাশে দাঁড়িয়ে তাকে আগলে ধরল। ইনায়া গম্ভীর গলায় বলল,
​“তুমি কোনো চিন্তা কোরো না, সুমু। আমরা এই পরের বাড়ির মেয়েরা আজ তোমার সাথে আছি। যদি তুমি অপরাধী হও, তবে তার বিচার আইন করবে, অন‍্য কেউ নয়। আর যদি তুমি আজ কোনো পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এই পথ বেছে নিয়ে থাকো, তবে আমরা পাঁচজন তোমার জন‍্য সকলের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়াব।”
নাতাশা, সুমুর হাত শক্ত করে ধরে বলল,

​ “আমি নাতাশা আজ বলছি—ম‍্যাম যা করেছে, তা বিচার নয়, তা ছিল মুক্তি। এই তথাকথিত পরের বাড়ির মেয়েরা যদি আজ আপনার পাশে না দাঁড়াত, তবে আমি একাই আপনার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াতাম।’
সুমুর চোখ অন‍্যদিকে। সে দেখল, ইনায়া আর ইশিতার হাতের কোমল কাপড়ের ভাঁজে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে দুই নিষ্পাপ প্রাণ— সিমরান আর শেরান। বৃষ্টির আঁচ থেকে তাদের খুব আকড়ে ধরে রেখেছে ইনায়া আর ইশিতা। আগুনের গর্জন আর স্বজনদের আর্তনাদ কিছুই তাদের কানে পৌঁছায়নি, তারা কেবল তাদের মায়ের গন্ধ আর স্নেহের স্পর্শের অপেক্ষায় বিভোর।
​সন্তানদের দেখা মাত্রই সুমুর ভেতরের সেই পাথর-শীতল সত্তাটা মুহূর্তেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। সে এতক্ষণ যেভাবে খুনের দায় নিয়ে অবিচল দাঁড়িয়ে ছিল, সেই সুমু এখন এক মুহূর্তেই কেবল এক রিক্তা মা হয়ে উঠল। তার দুচোখ দিয়ে অশ্রুর বাঁধ ভেঙে গেল। সে টলমল পায়ে, বুকফাটা আকুতি নিয়ে হাত বাড়িয়ে সন্তানদের ধরতে চাইল। ​সে ফিসফিস করে কাঁপানো গলায় ডাকল,

​“আমার সিমরান… আমার শেরান।”
​কিন্তু সে তার সন্তানদের স্পর্শ করার আগেই বিদ্যুতের বেগে সামনে এসে দাঁড়ালেন অনন্যা খাতুন। তার অবয়ব এখন এক রুদ্রমূর্তির মতো। তিনি সুমুর দুই কাঁধ বরাবর হাত বাড়িয়ে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেন। সজোরে সুমুকে ধাক্কা দিয়ে পিছিয়ে দিয়ে গর্জে উঠে বললেন,
​“খবরদার ডাইনি! একদম কাছে আসবি না। ওই তোর অপবিত্র হাত দিয়ে আমার শেরাজের রক্তকণিকাগুলোকে ছোঁয়ার সাহস করবি না। তুই তো শুধু এক ঘাতক নস, তুই এক ধ্বংসিনী। যে মা নিজের হাতে সন্তানদের বাবাকে পুড়িয়ে মারতে পারে, তার ছায়াও যেন আমার নাতি-নাতনির ওপর না পড়ে।”
​সুমু মাটির ওপর আছড়ে পড়ে আর্তনাদ করে উঠল,

“আম্মু! ওরা আমার প্রাণ। ওদের থেকে আমাকে আলাদা করবেন না। ওরা ছাড়া আমার আর কেউ নেই।”
​কিন্তু অনন্যা খাতুন কোনো কথা শুনলেন না। তিনি সাহাবাজ খান আর রিয়াজকে সাথে নিয়ে ইনায়া আর ইশিতাকে কড়া গলায় সিমরান আর শেরানকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবার আদেশ দিলেন। সামিয়া, নাজমিন আর নাতাশা সুমুকে শান্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু সুমু কাদার ওপর হাত-পা ছুড়ে বাচ্চাদের দিকে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল। তার কান্নার রোলের মাঝে হঠাৎ একটি সাদা গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে এলো আলিশা আর তার মা মরিয়ম। আলিশার পরনে উজ্জ্বল লাল রঙের একটি শাড়ি—যেটি দুদিন আগে রায়য়ান তাকে শেষ বিদায় দিয়ে আসার সময় উপহার দিয়েছিল। বৃষ্টির ছাঁটে শাড়িটা ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে যাচ্ছে, কিন্তু আলিশার মুখে এক অদ্ভুত লাজুক হাসি। তার হাতে রায়য়ানের দেওয়া একটি দামি ব্যাগ। সে এখনো জানে না, যেই রায়য়ানের দেওয়া লোকেশন ধরে সে এখানে এসেছে, সেই রায়য়ান এখন একমুঠো ছাই ছাড়া আর কিছুই নয়।
​আলিশা হালকা হেসে মরিয়মকে বলল,

“আম্মু, আর.সি নিশ্চয়ই কোনো সারপ্রাইজ দেবে। দেখো, সবাইকে এখানে ডেকেছে।”
​কিন্তু আরও একটু এগিয়ে আসতেই তার সেই হাসি মুহূর্তেই হিম হয়ে গেল। আগুনের সেই প্রলয়ংকরী রূপ আর উপস্থিত সবার আর্তনাদ দেখে আলিশার হাতের ব্যাগটা কাদার মধ্যে পড়ে গেল। মরিয়ম হন্তদন্ত হয়ে সামনে এগিয়ে এসে চিৎকার করে উঠলেন,
​“কী হয়েছে এখানে? সাহবাজ ভাই! অনন্যা আপা! আপনারা কাঁদছেন কেন? রায়য়ান কোথায়? আমার বাজান কোথায়?”
​আলিশা বিমূঢ় হয়ে চারদিকে তাকাল। তার সেই লাল শাড়িটা এই শ্মশানপুরীর মাঝে এক বিসদৃশ বিদ্রূপের মতো লাগছে। সে সুমুকে দেখে দৌড়ে গিয়ে তার হাত ধরল।

​“সুমু! আর.সি কোথায়? উনি তো আমাকে এখানে আসতে বলেছিল। বলেছিল আজ সব ঠিক হয়ে যাবে। এই আগুন কিসের? আরিয়ান আর শেরাজ ভাইয়া কোথায়?”
​সুমু কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু অশ্রুসজল চোখে ওই জ্বলন্ত পাতালপুরীর প্রবেশপথের দিকে তাকাল। আলিশা এবার খেয়াল করল আফতাব চৌধুরী কাদার মধ্যে বসে আছেন আর মৌ সেন ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন। সারবাজ আর আইয়ুবদের বিধ্বস্ত দশা দেখে আলিশার বুকটা ধক করে উঠল।
​মরিয়ম পাগলের মতো আগুনের দিকে এগোতে চাইলে রুহি খাতুন তাকে আটকে দিলেন। মরিয়ম চিৎকার করে উঠলেন,

​“ছাড়ুন আমাকে! আমি জানি আমার রায়য়ান ভেতরে। ও ছোট থেকে আমার কোলে বড় হয়েছে, ওর গায়ের গন্ধে আমি বুঝতে পারছি ও বিপদে আছে। সুমু মামনি, কথা বলছো না কেন? আমার রায়য়ানকে ডাকো।”
​আলিশা বুঝতে পারল আগুনের ওই লেলিহান শিখাগুলোই তার সব স্বপ্নের সমাধি। সে তার লাল শাড়ির আঁচলটা মুঠো করে ধরে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল। তার সেই প্রিয় মানুষটা, সে কি তাকে দুদিন আগে এই শাড়িটা দিয়ে এভাবেই শেষ বিদায় চেয়ে এসেছিল?

আলিশা আর্তনাদ করে উঠল,
​“আর.সি! তুমি মিথ্যে বললে! তুমি টেক্সটে বলেছিলে সারপ্রাইজ দেবে, এই কি তোমার সারপ্রাইজ? আমি তো তোমার দেওয়া শাড়ি পরে এসেছি, তুমি কেন দেখতে আসছো না? উঠে এসো আর.সি। একবার দেখো এই আলিশাকে।”
​মরিয়ম মাটির ওপর আছড়ে পড়ে বিলাপ করতে শুরু করলেন। রায়য়ানকে তিনি সন্তানের মতো মানুষ করেছেন, তার অবৈধ পরিচয়ের কলঙ্ক ধুয়ে পরম মমতায় বড় করেছেন। আজ সেই রায়য়ান তার আগেই বিলীন হয়ে গেল।
​আলিশা বৃষ্টির জলে ভিজে জবুথবু হয়ে আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে রইল। তার লাল শাড়িটা এখন রক্তের মতো দেখাচ্ছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল,

​“তুমি আমাকে এইভাবে শেষ বিদায় দিতে এসেছিলে, আমি বুঝতে পারিনি। আমি বুঝতে পারিনি এই লাল শাড়িটা আমার বিয়ের নয়, আমার স্বপ্নের কাফন হতে চলেছে।”
​মরিয়ম, আফতাব চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার চোখের জল বৃষ্টির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেলেও, তার চাউনিতে আছে এমন এক জ্বলন্ত ঘৃণা যা ওই ধ্বংসের আগুনকেও হার মানায়।
​আফতাব চৌধুরী কাদার মধ্যে বসে মাথা নিচু করে রেখেছেন, কিন্তু মরিয়মের ছায়া সামনে পড়তেই তিনি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে চোখ তুললেন। মরিয়ম তার সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে।
​“চেয়ে দেখুন আফতাব চৌধুরী! আজ ওই আগুনের শিখায় আপনার পাপ পুড়ে ছাই হচ্ছে। আপনি যাকে সারা জীবন ‘অবৈধ’ বলে লোকচক্ষুর অন্তরালে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, সেই রায়য়ান আজ আপনার সাজানো বাগান জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। আজ স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন কেন? উত্তর দিন।” একটু থেমে আবারও বললেন, ​“আমার রায়য়ানটা জানোয়ার হয়ে উঠেছিল শুধুমাত্র আপনার জন্য। ও জন্ম থেকেই তো অপরাধী ছিল না। আপনি ওকে জন্ম দিয়ে পরিচয় দেননি, বাবা হিসেবে ওর মাথায় হাত রাখেননি। একটা ছোট শিশুকে আপনি অন্ধকারের নর্দমায় ছুড়ে ফেলেছিলেন কেবল নিজের ‘সম্মান’ বাঁচাতে। শুধু তাই নয়, আপনি একটা দুধের শিশুকে প্রাণেও মারতে চেয়েছিলেন। তিলে তিলে ওর মনে আপনি বিষ বুনেছিলেন। আজ ও যদি খুনি হয়, আজ ও যদি জানোয়ার হয়ে থাকে, তবে সেই জানোয়ারটা আপনার সৃষ্টি।”

​আফতাব চৌধুরী স্তব্ধ। মরিয়ম, তার দিকে ঘৃণাভরে আঙুল উঁচিয়ে বললেন,
​“আপনার মতো বাবা যেন আর কারো না হয়। আপনি তো সেই পুরুষ, যে নিজের রক্তকে অস্বীকার করে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। আজ রায়য়ানের অপরাধের ভাগীদার আপনিও। আপনি শুধু আমার রায়য়ানকে ধ্বংস করেননি, আপনি আপনার বৈধ সন্তান আরিয়ানকেও নিজের অজান্তে ওই মৃত্যুর আগুনে টেনে এনেছেন। এই যে চারদিকে আজ শ্মশান দেখছেন, এর চিতা আপনি বহু বছর আগেই সাজিয়েছিলেন আপনার মিথ্যে দিয়ে।”
মরিয়মের এই প্রতিটি কথা যেন চাবুকের মতো আফতাব চৌধুরীর গায়ে বিঁধল। তিনি একবারও মাথা তুলে মরিয়মের চোখের দিকে তাকানোর সাহস পেলেন না।
​আলিশা তার লাল শাড়ির আঁচল কামড়ে ধরে কাঁদছে। সে আজ বুঝতে পারল, তার ভালোবাসার মানুষটা কেন এত হিংস্র ছিল, কেন সে সারাক্ষণ এক অদৃশ্য যন্ত্রণায় জ্বলত।

মরিয়ম বুক চিরে আসা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আগুনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন,
​“রায়য়ানরে… তুই ঠিকই বলেছিলি। এই লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো ছিল। তুই আজ মুক্ত হলি বাপ, কিন্তু এই পাপী মানুষটাকে নরকের যন্ত্রণায় ফেলে দিয়ে গেলি।”
​রোজার বিলাপ শুনে বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে হঠাৎ আলিশার গগনবিদারী চিৎকার যেন আকাশ-বাতাসকে স্তব্ধ করে দিল। সে সুমুর ভেজা দুই হাত সজোরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আর্তনাদ করে উঠল,
​ “তুমি মেরেছ আমার আর.সি’কে, সুমু? কেন মেরেছ বলো? আমার আর.সি যাই করুক, তার শাস্তি দেবার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে? সে তো তোমার কোনোদিনও কোনো ক্ষতি করেনি। কী না করেছে ওই মানুষটা তোমার জন্য।” সে কান্নায় ভেঙে পড়ে সুমুর বুকের ওপর মাথা রেখে উন্মাদের মতো বলতে লাগল,​ “যে রায়য়ান চৌধুরী নারী বিদ্বেষী ছিল, সে তোমাকে পাগলের মতো ভালোবেসেছিল। আমি জানতাম সে তোমায় ভালোবাসে, তাই তার খুশির জন্য আমি নিজের ভালোবাসা চিরকাল নিজের বুকের ভেতর চেপে রেখেছিলাম। আর তুমি? তুমি তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারলে? তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করব না সুমু, কোনোদিনও না!”
​সে তার পরনের লাল শাড়ির আঁচলটা দেখিয়ে বলল,

​”এই দেখো, এই শাড়িটা আমাকে আমার আর.সি দিয়েছিল। আর ওই যে কাদার মধ্যে পড়ে আছে ব্যাগটা, ওটার ভেতরে তোমার জন্যও সে কিছু একটা রেখেছে। প্রায় কয়েক ঘন্টা আগে সে আমাকে টেক্সট করে বলেছে— ‘আলিশা, আমার দেওয়া শাড়িটা পরে এই লোকেশনে চলে আয় আর সুমুর জন্য রাখা প্যাকেটটাও নিয়ে আয়’। আমি তো সব নিয়ে এলাম সুমু… কিন্তু আমার আর.সি কই? আমার বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে সুমু, আমার আর.সি কই?”
​সুমু বাকরুদ্ধ হয়ে আলিশার দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে না রায়য়ান তার জন্য কি উপহার রেখে গেছে। ​আলিশা কাদার ওপর বসে পড়ে রায়য়ানের দেওয়া সেই ব্যাগটা জড়িয়ে ধরল। তার লাল শাড়িটা এখন কাদায় মাখামাখি। সে পাগলের মতো বলতে লাগল,

​”তুমি বলেছিলে সারপ্রাইজ দেবে আর.সি। এই কি তোমার সারপ্রাইজ? আমি শাড়ি পরে এসেছি, আমি তোমার জন‍্য খুব সুন্দর করে সেজে এসেছি… তুমি কেন আসছ না? একবার এসে দেখো তো আমায় কেমন লাগছে। ও আর.সি… ফিরে এসো না। কেন তুমি আমাকে এক নজর দেখতে আসছ না? কেন আমাকে এই মিথ্যে আশার সাজে সাজিয়ে তুমি ছাই হয়ে গেলে? সবাই তোমাকে ঘৃণা করে আর.সি, কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। তোমার ওই অন্ধকার মনে আমার জন্য একটুও জায়গা ছিল না আমি জানতাম, তবুও আমি তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম। আজ আমার সেই ভালোবাসার মানুষটা আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেল। আমি এই শাড়িটা নিয়ে এখন কোথায় যাব আর.সি? তুমি তাকাবে না জেনেও একটু আশা নিয়ে আজকের পর আর কার জন্য সাজব আমি?”
​সকলে আজ স্তব্ধ হয়ে আলিশাকে তাকে দেখছে। যে রায়য়ানকে সবাই কেবল এক জানোয়ার হিসেবে চিনেছে, তার হৃদয়ের এই কোমল অংশটুকু আজ আলিশার মাধ্যমে সবার সামনে উন্মোচিত হলো। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা আর বৃষ্টির জল মিলেমিশে রায়য়ানের দেওয়া সেই ‘উপহার’ আর আলিশার ‘ভালোবাসা’কে এক বিষাদময় ট্র্যাজেডিতে পরিণত করেছে। রায়য়ান এখন আর নেই। সে হারিয়ে গেছে গহীন অতলে।

মেয়ের আর্তনাদ শুনে মরিয়ম, যিনি রায়য়ানকে নিজের সন্তানের মতো বুকের ওমে আগলে বড় করেছিলেন, তিনি আর এই নির্মম বাস্তবতার ভার সইতে পারলেন না। রায়য়ানের জন্য তার সেই আদিম মাতৃত্বের হাহাকার হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বুক চেপে ধরে তিনি কাদার ওপর লুটিয়ে পড়লেন। তার শরীরটা কাঁপতে কাঁপতে নিস্তেজ হয়ে এলো। শোক আর উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন।
​রুহি খাতুন আর আফিয়া খাতুন চিৎকার করে উঠলেন,
“মরিয়ম আপা! মরিয়ম আপা, চোখ খোলেন।”

কিন্তু মরিয়ম তখন এক গভীর অন্ধকার আর সংজ্ঞাহীনতার অতলে তলিয়ে গেছেন। ​ঠিক সেই মুহূর্তে, আলিশার ভেতর যেন কিছু একটা চিরতরে ভেঙে গেল। এতক্ষণ যে মেয়েটি পাগলের মতো আর্তনাদ করছিল, রায়য়ানের জন্য নিজের বুক চাপড়াচ্ছিল, সে হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। তার কান্না থেমে গেল, চোখের জল যেন চোখের কোটরেই শুকিয়ে পাথর হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে কাদা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার সেই লাল শাড়িটা এখন বৃষ্টির জলে ভিজে ভারী হয়ে পায়ে জড়িয়ে ধরছে, কিন্তু তার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার দৃষ্টি এখন শূন্য, শীতল আর প্রাণহীন। সে আর একবারের জন্যও সেই জ্বলন্ত আগুনের দিকে তাকাল না, একবারও ফিরে দেখল না তার অসুস্থ মাকে। সে যন্ত্রচালিত মানুষের মতো টলমল পায়ে হেঁটে চলে গেল।
​নাতাশা কম্পিত কণ্ঠে ডাকল,
“আলিশা! যেও না, শোনো…”

কিন্তু আলিশা থামল না। সে কোনো কথা বলল না, কারো দিকে তাকাল না। তার হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ওই আগুনের শিখায় ছাই হয়ে গেছে। যে আলিশা রায়য়ানের এক ইশারায় হাসত বা কাঁদত, সেই আলিশা আজ এক জ্যান্ত লাশে পরিণত হয়েছে।
​বৃষ্টির ঝাপটার মাঝে তার সেই লাল শাড়ির আঁচলটা শেষবারের মতো উড়তে দেখা গেল, তারপর সে পাতালপুরীর সেই অভিশপ্ত সীমানা পার হয়ে অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল তার মায়ের নিথর দেহ, একরাশ ঘৃণা আর সেই ব্যাগ—যার ভেতরে রয়ে গেছে সুমুর জন্য রায়য়ানের শেষ উপহার।
সুমু সেই ব্যাগটা তুলবে না ভেবেও একজন মৃত মানুষের শেষ স্মৃতি ভেবে কম্পিত হাতে কাদার ওপর থেকে রায়য়ানের দেওয়া ব‍্যাগটা তুলে নিল। ব্যাগের চেইনটা খোলার জন্য সে হাত উদ‍্যত হতেই, সাইরেন বাজিয়ে ধেয়ে এলো পুলিশের একাধিক গাড়ি। নীল-লাল আলোর ঝলকানিতে পুরো অন্ধকার জায়গাটা যেন এক থমথমে রণক্ষেত্রে পরিণত হলো।
​গাড়ি থেকে নামলেন এসিপি প্রশান্ত ঘোষ। তার পেছনে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। সুমু আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে ব্যাগটা শক্ত করে ধরে দুহাত তুলে পুলিশের দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো ভয় নেই, আছে কেবল এক গভীর ক্লান্তি। সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

​“আমিই আপনাদের কল করেছিলাম। আমিই ওদের মেরেছি, অফিসার। আমি স্যালেন্ডার করছি। আমাকে নিয়ে যান।”
​এসিপি প্রশান্ত ঘোষ সুমুর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার মুখাবয়বে আজ কোনো কাঠিন্য নেই, বরং একরাশ স্বস্তি আর বিষাদ মিশে আছে। তিনি সুমুর হাতে হাতকড়া পরানোর আগে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
​“মিসেস খান, আপনি জানেন না আপনি আজ কী করেছেন। শেরাজ খান, রায়য়ান চৌধুরী আর আরিয়ান চৌধুরী—এই তিনজন এই শহরের কেবল মাফিয়া ছিল না, ওরা ছিল এক একটা বিষবৃক্ষ। আমরা বছরের পর বছর ওদের ধরার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ওরা এতটাই চতুর ছিল যে কোনো প্রমাণ রেখে কাজ করত না। উল্টো আমাকে আর আমার উপরের কর্মকর্তাদের ব্ল‍্যাকমেইল করে নিরপরাধ মানুষদের আমাদের দিয়ে মার্ডার করিয়ে ভিডিও বানিয়ে রাখত। আর পরে সেই ভিডিওর ভয় দেখিয়ে ওরা সবাইকে হাতের পুতুল বানিয়ে রেখেছিল। আমার চোখের সামনে কত অপরাধ হয়েছে, কিন্তু আমি হাত-পা বাঁধা ছিল। আমি তখন বান‍্য শুধু চেয়ে দেখেছি।”
তিনি আগুনের লেলিহান শিখার দিকে তাকিয়ে একটু থমকালেন, তারপর আবার বললেন,

“সিআইডি থেকে শুরু করে লোকাল পুলিশ—সবাইকে ওরা নিজেদের মুঠোয় রেখে নাচিয়েছে। আপনি হয়তো আজ সমাজ থেকে অনেক বড় তিনজন ক্রিমিনালকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। আপনি যা করেছেন, তা এক অর্থে বিচার। কিন্তু আইনের চোখে আপনি অপরাধী, মিসেস খান। আপনি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। সত্যের খাতিরে হলেও আমাকে আমার ডিউটি করতে হবে।”
​পুলিশের লোকরা সুমুকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল। ইশিতা, নাতাশা আর ইনায়ারা সুমুর দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ তাদের বাঁধা দিল। সুমু একবার পেছনে ফিরে তাকাল। সেখানে তার দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে অনন্যা খাতুন আগলে দাঁড়িয়ে আছেন, তার চোখে এখনো সেই রক্তবর্ণ ঘৃণা।

খান সাহেব পর্ব ৮৪ (২)

​সুমু ব্যাগটা নিয়ে পুলিশের গাড়ির দিকে পা বাড়াল। সে জানে না এই ব্যাগের ভেতর কী আছে, সে জানে না রায়য়ান চৌধুরী তার জন্য শেষ কী বার্তা রেখে গেছে। কিন্তু সে এটুকু জানে—আজ থেকে সে আর কারো স্ত্রী নয়, কারো বউ নয়, আজ থেকে সে কেবল এক বিচারক, যে নিজের জীবন বাজি রেখে এক অন্ধকার অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনেছে।
​গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার আগে সুমু একবার আকাশের দিকে তাকাল। আকাশটা এখনো কাঁদছে। পুলিশের লোকেরা গাড়িতে উঠে সাইরেন বাজিয়ে সুমুকে নিয়ে চলে গেল।

খান সাহেব পর্ব ৮৬