Home চারুবৃত্ত চারুবৃত্ত পর্ব ১৪

চারুবৃত্ত পর্ব ১৪

চারুবৃত্ত পর্ব ১৪
জুলি জোনাকি

সকালের সতেজ শীতল আবহাওয়া, শীতকাল আসতে এখনো দেড়ি অথচ হালকা কুয়াশায় চারপাশের পরিবেশ যেন তরতাজা হয়ে উঠেছে । সেই কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে চারু উঠে পড়েছে । সকাল ছয়টা থেকে একটা টিউশন আছে , তারি প্রস্তুতি নিচ্ছে । চারু ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে মাকে ডাকলো ,

“মা ,ওমা শুনছো ।”
চারুর মা নড়ে উঠলো , টিপটিপ করে তাঁকাল , ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,
” যাইতাছো ?”
“হ , আসতে দেরি হবে , অনেক কিছু কিনতে হবে তাই ফিরতে লেট হবে তুমি খেয়ে নিও তারপর আমি এসে তোমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব কেমন?”
“সাবধানে যাইস মা ”
“ঠিক আছে , আসছি ।”
চারু যাওয়া আগে লতাকে বলে গেল , যেন রান্না করে মাকে খাইয়ে দেয় । তারপর চারু গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল তার গন্তব্যের দিকে ।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কালো শার্ট কালো প্যান্ট, চুলগুলো গোছালো, হাতা কুনই ওপদি ফোল্ড করা , পায়ে জুতা , একদম ইন করে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে যাবে তখন বৃত্তের মা বাবা দুজনি এলো । বৃত্ত তখন আয়না থেকে মুখ সরিয়ে ঘর থেকে বের হতে যাবে বাবা এসে ঘরে ঢুকে পড়লো, আর মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তা দেখলো । বৃত্ত বাবাকে দেখে হেসে বলল,
” আব্বু কিছু বলবে ?”
“চলো খাবে ।”
বৃত্ত তারা মায়ের দিক একবার তাকাল , চোখ সরিয়ে কোন কিছু না ভেবে সোজা বলল,
“হ্যাঁ চলো ।”

বৃত্তের মা কপালের মৃদু ভাজ ফেললো , এতো ডাকাডাকির পরেও যায় না আর আজ এতো সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছ? বাবা ডাকতেই হ্যাঁ বলে দিল ?মুখ বাঁকিয়ে চলে গেল । বৃত্তের বাবা বৃত্তের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“বউমাকে তাহলে খুঁজে পেয়েছ ?”
বৃত্ত ঘার ঘুমিয়ে তাকালো , মেকি সুরে বলল,
“তুমি কি করে বুঝলে ?”
“ছেলের চোখ সব বলে দিচ্ছে।”
বৃত্ত মাথা চুলকে হাসলো, বলল,
“ইয়ে মানে ….”
“আরে চলো কিছু বলতে হবে না । এবার বাড়িতে নিয়ে আসলে একদম বিয়ে করে আনবে ।”
“ঠিক আছে আব্বু ।”

বেশ হাসি মুখে বাবার সাথে গল্প করতে করতে খাওয়া শেষ করে উঠলো ।
কলেজের জন্য বের হলো , একটু হেটে গিয়ে সামনে একটা গাড়ি থামিয়ে উঠতে যাবে তখন বেশ কিছু টা দূরে চারুর মতো দেখতে কাউকে নজরে এলো , গাড়ি ছেড়ে দিল । দু হাত ভর্তি বাজার নিয়ে হেটে যাচ্ছি অন্য পাশ দিয়ে, বৃত্ত মৃদু হেসে সেদিকে পা বাড়ালো । ঘড়ির কাঁটায় তখন নয়টা ছুইছুই , সেদিকে তার খেয়াল নেই । চারু কোন দিক না তাকিয়ে যাচ্ছি, পেছন পেছন কাউ যেন ফলো করছিল এমন মনোভাব নিয়ে পেছন ফিরলো, কাউকে নজরে এলো না , সামনে ঘুরতেই ‘ওমা ‘বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো , বৃত্ত দাঁড়িয়ে আছে । বৃত্ত হাসলো, একটু চারুর দিক ঝুঁকে বলল,

“ভয় পেয়েছ? ”
চারু একটু পেছন দিক মাথাটা ঝুঁকিয়ে বলল,
“আপনার এই স্বভাব টা বড্ড অসহ্যকর । যখন তখন সামনে এসে দাঁড়ান । ”
বৃত্ত এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“তার মানে ভয় পেয়েছ ?”
হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নাও ছুঁইয়ে দাও ।”
চারু ছুলো না উল্টে প্রশ্ন করলো,
“আপনি এখানে কেন ।”

বৃত্ত হাত ঘুরিয়ে তার প্যান্টের পকেটে হাত গুজে বলল,
“তোমায় দেখতে এলাম ।”
চারু এদিক ওদিক আড় চোখে তাকাল । তারিঘরি করে বলল,
” সরুন সামনে থেকে ,যেতে দিন ।”
বৃত্ত চারুর হাত থেকে বাজারে ব্যাগটা হাতে নিয়ে নিল । বলল,
“চলো একসাথেই যাই ।”
চারু বাজারের ব্যাগ টা কেড়ে নিয়ে বলল,
” আমার হেল্প লাগবে না , আপনি আপনার কাজে যান ।”
পাশ কেটে চারু চললো । বৃত্ত ঘুরে চেঁচিয়ে ডাকলো ,
“চারু শুনছো? ”

চারু দাড়িয়ে গেল , ঘার ঘুড়িয়ে পেছনে তাকাল , বৃত্ত ঠোঁট এলিয়ে হেসে বলল,
” দেখা হবে চিন্তা করো না ।”
চারুও চেঁচিয়ে বলে উঠলো ,
” দেখা না হওয়াই ভলো । ”
“দেখা তো হবেই ।”
চারু গম্ভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ফের হাটা ধরলো । বৃত্ত হেসে ঘড়িটার দিকে তাকালো, তখন নয়টা ত্রিশ বাজে । কপালে বিকট চিন্তা ফেলে একটা গাড়ি ধরলো ।

এখন দুপুর, চারু তার মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল, ডাক্তার বলল,
“আপনার মাকে একদম বেড রেস্ট নিতে হবে, নিয়মিত খাওয়াতে হবে । আর পারলে আগের কিছু কিছু কথা মনে করতে সাহায্য করবেন । এতে সমস্যা টা তারাতারি দূর হয়ে যাবে । ”
“ঠিক আছে ডক্টর আমি খুব করে খেয়াল রাখবো । ”
“দুই সপ্তাহ পরে আবার আসবেন ।”
“আচ্ছা ।”
তারপর চারু মাকে নিয়ে বেরিয়ে একটা গাড়ি করে বাড়ি গেল ।
ঘড়িটার কাঁটায় যখন বিকেল চারটে নাগাদ তখন চারু আর লতা দোকান খুলতে বেরুল । চারুর মাকে বাড়িতে রেখেই গেল তার যে রেস্টের দরকার । দোকান এখনো খুলেই নি অথচ কয়েকটা মেয়ে এসে দাঁড়িয়ে দোকান খোলার অপেক্ষা করছিল । চারু আসতেই হেসে এগিয়ে গেল । বলল,

” আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম , জোরে ক্ষুদা পাইছে, তারাতারি দোকান খুলেন । ”
চারুর বেশ ভালো লাগলো, চারু লতার দিক তাকিয়ে হাসলো । লতা বলল,
“আপু আপনারা ওই খানটাতে একটু বসে অপেক্ষা করুন , আমরা এখনি রান্না শুরু করে দিব ।”
মেয়ে গুলো গিয়ে বসলো । চারু দোকান খুলে চুলা জ্বালাল , তা দেখে একটা মেয়ে বলল,

“দিদি চুই ঝাল পাওয়া যাবে ?”
“হ্যাঁ আপু পাওয়া যাবে ”
তাদের মধ্যে একজন হিন্দু ছিল সে বলল,
“গরুর মাংস ও কি এখানে রান্না হয় ?”
লতা এগিয়ে এসে বুঝিয়ে বলল,
“না আপু , এখানে অনেক হিন্দু ছেলে মেয়ে খেতে আসে তাই গরুর মাংস এখানে রান্না হয় না । চিন্তা করবেন না , কি খাবেন বলুন ?”

“খাসি হবে ?”
“হ্যাঁ হবে ।”
“আচ্ছা তাহলে খাসির চুই ঝাল আর ছেটানো রুটি ।”
অন্য মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলল,
“আপনাদের কি দিব ?”
“আমাদের ও ।”
“আচ্ছা আপু আর একটু অপেক্ষা করুন । ”
লতা জলদি গেল । চারুকে সব বলল । চারু একটা মিনিটও সময় নষ্ট না করে রান্না বসিয়ে দিল ।
আস্তে আস্তে লোকজন আসতে লাগলো । ,সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ছুঁইছুঁই, এমন সময়ে লতা এসে কপালে বিরক্তির রেখা টেনে বলল,

” একটা কাস্টমার এসেছে ।”
“কি অর্ডার দিল ?”
“আমায় বলছে না কিছু বললো যে তোমার কাছে অর্ডার দিবে ।”
“আমার কাছে ?”
“হুমম , যাও অর্ডার নিয়ে এসো আমি এদিকটা দেখছি ।”
চারু হাতটা কোমরে বাঁধা গামছাতে মুছতে মুছতে গেল ।অন্য দিক মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিল । চারু পেছন থেকে বলল,
” হ্যালো, আপনার অর্ডার দিন ?”
ঘুড়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে দাঁত বের করে হেসে বলল,

“বলেছিলাম না আবার দেখা হবে ?কেমন আছো শ্যামবতী ?”
চারুর মুখটা হা হয়ে গেল ,চোখ বার কয়ে বার ফেলে বলল,
“আপনি এখানে কি করছেন ?”
“ওমা এটা আবার কেমন কথা ,ক্ষুদা পেয়েছে খেতে এলাম ।”
“এখানে আপনার খাবার মতো কিছুই নেই । বাড়ি যান ।”
চারু চলে যেতে নিলেই বৃত্ত একটু জোরে করে বলতে লাগলো ,
” কাস্টমারের সাথে এমন বেগোছালো ভাবে কথা বলো ?”
চারু দাঁতে দাঁত চেপে ঘুরে তাকালো , এদিকে ওদিকে তাকাল ,সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে দেখে দাঁতে দাঁত চেপে হাসে বৃত্তের দিক এগিয়ে গিয়ে ওভাবেই মুখে হাসি টেনে বলল,

“কি খাবেন স্যার বলুন ?”বৃত্ত দায়সারা ভাব নিয়ে বলল,
“আপনি যা খেতে দিবেন তাই ।”
“বলুন কি খাবেন , আমার সময় নষ্ট করবেন না , আরো অর্ডার আছে ।”
“ঠিক আছে , একটা কোল্ড কফি দাও ।”
“এখানে চা ,কফি কোনটাই পাবেন না অন্য কিছু অর্ডার করুন ।”
“আমি কোল্ড কফিই খাব ।”
“আরে আশ্চর্য! বলছি তো এখানে নেই ।”
“এনে বানিয়ে দাও , নাহলে এখনি আবার চেঁচিয়ে উঠবো ।”
চারু ঠোঁট কামড়ে তাকাল, বলল,

“তাহলে অনেক দেরি হবে আপনি ওয়েট করতে না পারলে অন্য কোথাও যেতে পারেন ।”
“যদি সারা রাতও ওয়েট করতে হয় তাহলে আমি তাই করবো ।”
“ঠিক আছে স্যার ওয়েট করুন ।”
চারু চলে গেল । গিয়ে লতাকে বরফ,দুধ , কফি , আর চিনি আনতে বলল । অনেকখন পরে লতা গিয়ে দিয়ে আসলো । লতা কেবলমাত্র বৃত্ত কে কফি দিয়ে চারুর কাজে সাহায্য করছিল ফের বৃত্ত ডাকলো , লতা গেলে বলল,
“কফি যে বানিয়েছে তারে ডাকুন ।”
“কেন ভাইয়া ভালো হয়নি ?”
“যে বানিয়ে তাকে বলবো । ”
লতা গিয়ে চারুকে ডেকে আনলো । চারু বলল,

“বলুন ”
“এটা কি বানিয়েছেন ? কি বাজে খেতে ?”
“স সব তো ঠিকি আছে ।”
বৃত্ত কফি টা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“তো আমি কি মিথ্যা বলছি , নিজেই খেয়ে দেখুন ।”
লতা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, পাশে থেকে ধীরে বলল,
“চারু খেয়ে দেখ ।”
চারু ভেবেছে হয়তো সত্যি খারাপ হয়েছে তাই কিছু না ভেবে একটু খেল । কিছু বলার আগেই বৃত্ত উঠে চারুর হাত থেকে কেঁড়ে খেতে খেতে বলল,

“এবার ঠিক আছে ।”
বৃত্ত স্বাভাবিক ভাবে খেতে লাগলো , এমন ব্যাপার স্যাপার দেখে চারু ঘপ করে লতার দিক তাকালো , লতা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে দেখে চারু হেসে লতাকে সরিয়ে নিয়ে গেল । লতা অনেক প্রশ্ন করছিল তাই চারু বাদ্ধ হয়ে বলে দিল যে বৃত্ত তাকে পছন্দ করে । লতা তা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিল ।
রাত সারে দশটা বাজবে বাজবে ভাব, বৃত্ত এখনো বসে আছে । চারুর একটু পরে দোকান বন্ধ করবে । তাই চারু এসে বলল,

” এখনো বসে আছেন ?”
“হুমম ,একটু কথা বলবো , বসবে ?”
“আকাশে বড্ড মেঘ করেছে , এখনি বাড়ি না ফিরলে আটকা পড়ে যাবেন ।”
” একটু কথা বলবো বসো না চারু ।”
চারু বসলো না উল্টে বলল,
” প্লিজ আপনি এখন যান । রাত অনেক হয়েছে ।”
বৃত্ত মনটা ছোট করে বেরিয়ে গেল । তবে কাজ হলো না ,বেশি দূরেও হয়তো যেতে পারেনি জোরে ঝেঁকে বৃষ্টি পড়তে শুরু হলো । লতা তখন চারুকে বলল,

“চারু ।”
চারু তখন দোকানের সব গুছিয়ে রাখছিল ।
“হুমম ।”
“বলছি যে বৃত্ত ভাইয়া তো মাত্রই গেল ভিজে যাবে না ?”
চারু চটকরে বৃষ্টির দিক তাকাল , তারপর চোখ সরিয়ে লতার দিক তাকিয়ে বলল,
“তাতে আমার কি ?”
“তোমার আবার কি ? আমার অনেক কিছু ,আমার একটা কাস্টমার কমে যাবে । বলছি কি যাও না এই ছাতাটা তাকে দিয়ে আসো । ”

“পারবো না আমি , তুমি যাও আর তাছাড়া ওনাকে ছাতা দিলে আমরা কি করে বাড়ি ফিরবো ?”
“আমাদের কাছে তো দুইটা , একটা দিয়ে এসো , আর একটাতে আমরা যাব ।”
চারু রাজিই হলো না ।
বৃত্ত মাথায় হাত দিয়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে , অর্ধেক ভিজেই গেছে , তবুও দাঁড়াল । কিন্তু যেহেতু ভিজে গেছে তাই ভিজেই বাড়ি যাবে বলে দৌড়া যাওয়া জন্য কয়েক পা বাড়াতে পেছন থেকে কেউ জোরে ডাকলো ,

চারুবৃত্ত পর্ব ১৩

“শুনুন . . . ওখানেই দাড়ান ।”
বৃত্ত মাথায় হাত দিয়ে বৃষ্টি আটকে ফিরে তাকালো , কেউ একজন দৌড়ে ছাতা নিয়ে এগিয়ে আসছে , কাছাকাছি আসতেই বৃত্ত বুঝতে পারলো , চিনতে পাড়লো । কেউ একজন ছাতা নিয়ে বৃত্তের মাথার উপর ধরলো , বৃত্তের

চারুবৃত্ত পর্ব ১৫