চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৯
ইশরাত জাহান জেরিন
“এক গ্লাস পানি দেওয়া যাবে?” ফারাজ তরুণীকে কথাখানা বলা মাত্রই সে দৌড়ে রশুইঘর থেকে গ্লাস ধুয়ে পানি নিয়ে এলো। ফারাজের দিকে এগিয়ে দিতে গিয়ে লজ্জায় পড়ে বলল, “আপনে এত বড় মানুষ। এই গ্লাসের পানি খেতে পারবেন?”
“কেন পারব না? রক্ত কাটলে তো রক্তের রঙ লালই হবে। কালো কিংবা অন্য রঙ তো আর নয়? তাহলে মানুষে, মানুষে এত কিসের পার্থক্য? লালন কি বলেছিলেন জানো না? মানবধর্মের উপরে কিচ্ছু হয়না। যখন তুমি মানবধর্ম করতে জানবে, তখন খোদার ধর্মের প্রতি আপনাআপনি আকৃষ্ট হয়ে যাবে।” ফারাজ পানিটা ঢকঢক করে পান করে পুনরায় জিজ্ঞেস করল, “ঘরে কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো আবার? সব বাজার-সদাই আছে তো?”
“আল্লাহ রহমতে সবই আছে। খালি ভাই সূর্যের আলোর যে বড় অভাব এইখানে। মনে হয় আমি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন।”
“এই বিচ্ছিন্নতাই তো এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছে।”
“এবার কী আমি আম্মার সঙ্গে দেখা করতে পারব না?”
“হ্যাঁ কারণ তোমাকে মারার জন্য যেই আল্লাহর বান্দা উঠে-পড়ে লেগেছিল তাকে আল্লাহ নিজের কাছে নিয়ে গেছেন।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“চিত্রার সঙ্গে দেখা করতে পারব?”
“তুমি দেখা করতে চাও মরিয়ম?”
“হুম। সে জানে আমি মৃত। তার জন্যই তো বেঁচে আছি। সে না থাকলে আপনার মতো ভাইজান কই পেতাম? তাকে দিয়েই তো আপনাকে চেনা।”
“দুই-এক দিনের মধ্যে চিত্রার সঙ্গে দেখা করাবো সমস্যা নেই। আর তোমার পুনরায় পড়ালেখার ব্যবস্থা করব। তুমি চিন্তা করো না। ভাই থাকতে বোনের এত চিন্তা করা লাগে? দূর বোকা!”
মরিয়মের চোখে জল জমে উঠল। কৃতজ্ঞতা জানালেও মনে হলো—এই সব শব্দ বড্ড ছোট, এত কিছুর সামনে তুচ্ছ। কিছু ঋণ আছে, যা গায়ের চামড়া কেটে জুতা বানিয়ে পরালেও শোধ করা যায় না। একেবারে অচেনা হয়েও এই মানুষটাই মরিয়মের পরিবারের জায়গা নিয়েছে, নিঃশর্তভাবে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। এমন ঋণ কোনো হিসাবেই মেটে না—এ শুধু বুকে চেপে বয়ে বেড়ানোর দায়।
রাত অনেকটা নেমে এসেছে। ঘরের আলোটা ম্লান, জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের সাদা আলো মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। মোহনা রোশানের পাশে বসে আছে, তার কাঁধে মাথা রেখে। রোশানের আঙুলগুলো মোহনার চুলে ধীরে ধীরে চলাচল করছে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো কথা বলার প্রয়োজনও নেই। মোহনা মৃদু হেসে রোশানকে বলল, “এই সময়গুলো যদি থেমে যেত…”
রোশান কিছু বলল না। শুধু মোহনাকে আরও কাছে টেনে নিলো। তার চোখে একধরনের প্রশান্তি। যেটা সে খুব কমই পায়। ঠিক তখনই মোবাইলটা কেঁপে ওঠে।
একবার। দু’বার। রোশানের ভ্রু কুঁচকে যায়। স্ক্রিনে নামটা দেখে সে একটু থমকে যায়—রাজন। মোহনা সেটা লক্ষ করে ফেলে।
“ধরছো না কেন?” সে ধীরে জিজ্ঞেস করে।
রোশান ফোনটা উল্টো করে পাশে রাখে। “এখন না।”
মোহনার চোখে সন্দেহের ছায়া নামে৷ “কি চায় সে? ধরে দেখো।”
রোশানের গলা হালকা শক্ত হয়ে যায়। “ওনার কল মানেই ঝামেলা, মোহনা। আজকে আমি সেটা চাই না।”
মোহনা একটু সরে বসে। কণ্ঠে চাপা রাগ, “তারা তোমাকে পাপে আবারও জড়ানোর জন্য বিরক্ত করছে তাই না?”
রোশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে।ঠিক তখনই ফোনটা আবার বেজে ওঠে। মোহনা উঠে দাঁড়ায়। “ধরো ফোনটা।”
রোশানের চোখে বিরক্তি আর ক্লান্তি একসাথে জমে ওঠে। “তুমি বুঝছো না, রাজন মানেই—”
“না, বুঝা লাগবে না!” মোহনা কথাটা কেটে দেয়।
এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা ভারী হয়ে যায়।
ফোনের স্ক্রিনে রাজনের নামটা এখনও জ্বলছে। রোশান শেষমেশ ফোনটা হাতে নেয়। বারান্দায় গিয়ে কলটা ধরতেই ওপাশ থেকে রাজনের কড়া গলা ভেসে আসে। “জানোয়াররে বাচ্চা, এইখানে ব্যবসা লাটে ফালাইয়া তুমি বাড়িতে বউ নিয়া রঙ তামাশা করো?”
“আমি বলেছি না, ওইসব কাজ এখন থেকে আমি করব না? তোমাদের যা মন চায় করো গিয়ে। এসব বিষয় নিয়ে আমি আর কারো সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী না।”
“সাবধান কইরা দিতাছি, কপালে শনি আছে। পরে আমারে কিন্তু দোষারোপ করতে পারবি না”
“ফোন রাখলাম।” বলেই রোশান ফোন কেটে দেয়। মাথাটা কাজ করছে না। মহা ঝামেলায় পড়েছে দেখছি! রাগ লাগছে ভীষণ। মোহনা এসে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন করে, “কোনো ঝামেলা হয়েছে?”
রোশান মেকি হেসে বলল, “না কিসের ঝামেলা হবে? রুমে চলো এখানে অনেক ঠান্ডা।”
মোহনার দুশ্চিন্তা কিছুতেই কমে না। মনে হয়—এভাবে আর কতদিন চলা যায়? আজ না হলে কাল, এই চাপা অস্থিরতা থেকেই একটা বড় ঝামেলা জন্ম নেবে—সে কথা সে গভীরভাবে জানে। চারপাশের এই জীবনটা যেন পাপে ভেজা এক বসতি, যেখানে প্রতিটা নিশ্বাসই অপরাধের গন্ধ বহন করে। সে ভাবে, এখান থেকে কি সত্যিই কোনো মুক্তির পথ আছে? নাকি সব দরজাই আগেই বন্ধ হয়ে গেছে? মাঝে মাঝে তার মনে হয়, জীবনটা বুঝি ধীরে ধীরে এই নরকের ভেতরেই পুড়ে শেষ হবে—কোনো আলো, কোনো পরিত্রাণ ছাড়াই।
রাজন ফোনটা রেখে ধীরে ধীরে লুঙ্গি ঠিক করল। গায়ে তার কালো শার্ট, রাতের অন্ধকারে আরও কালচে হয়ে উঠেছে রঙটা। পরনে ধবধবে সাদা লুঙ্গি। কালো শার্টের সঙ্গে অদ্ভুত এক বৈপরীত্য তৈরি করেছে। গলায় ঝুলছে মোটা স্বর্ণের চেইন, বুকের কাছে ঠুকে ঠুকে শব্দ করছে। চোখের নিচে সুরমার গাঢ় রেখা, যেন ঘুমহীন রাতের সাক্ষী। মুখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, অথচ প্রতিটা নড়াচড়ায় একটা সতর্কতা লেগে আছে। লুঙ্গি ঠিক করতে করতেই সে মাথা নিচু করে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ঢোকার আগমুহূর্তে আশপাশে একবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে নেয়। এই কাজটা তার রক্তে মিশে গেছে। কেউ তাকিয়ে আছে কি না, কোনো অপ্রত্যাশিত ছায়া নড়ছে কি না সবকিছু এক ঝলকে যাচাই করে নেয় সে।
এই বাড়ির গেইটটা অস্বস্তিকর রকমের নিচু। রাজনের মতো লম্বা-চওড়া, দাপুটে মানুষের জন্য এই গেইট যেন এক নীরব অপমান। এখানে ঢুকতে হলে মাথা নত করতেই হয়। দুনিয়ার কোনো মানুষের ক্ষমতা নেই তাকে মাথা নত করানোর সে কথা রাজন নিজেই ভালো জানে। অথচ এই সামান্য দরজাটার সামনে এসে তাকে নত হতে হয়। লোহার এই ফ্রেমের ভেতর দিয়ে ঢুকতে গিয়ে তার মনে হয়, ক্ষমতা আর দুর্বলতার মাঝে পার্থক্যটা কত বিচিত্র। কখনো মানুষ হার মানে মানুষের কাছে, কখনো আবার একটা মানুষের সৃষ্টির কাছেই।
রাতটা ভালোই জমেছে। এই সময়টায় পাড়া প্রায় নিঃশব্দ হয়ে আসে। বেশিরভাগ মানুষই গভীর ঘুমে ডুবে গেছে। কোথাও কোথাও হয়তো কেউ এখনো জেগে আছে, কিন্তু তাদের অস্তিত্বও এই নীরবতার ভেতর হারিয়ে গেছে। দূরে কিশোরগঞ্জ স্টেশন থেকে ভেসে আসছে ট্রেনের শব্দ। সেই শব্দ রাতের স্তব্ধতাকে আরও গভীর করে তুলেছে।
গেইটের বাইরে একদল কুকুরের ঘেউঘেউ শোনা যাচ্ছে। কখনো একসঙ্গে, কখনো আবার থেমে থেমে। শীতের কুয়াশাভেজা বাতাসে তাদের ডাক কেমন খচখচে লাগে। হয়তো তারা কাউকে দেখেছে, কিংবা নিছকই অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করছে। শীতের এই রাতে চারপাশটা থমথমে, ভারী। বাতাসে হয়তো অদৃশ্য কোনো আশঙ্কা ঝুলে আছে।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে রাজন ধীরে হাতে টেনে রুমের দরজাটা লাগিয়ে দেয়। দরজার বন্ধ হওয়ার শব্দটা যেন গোটা বাড়ির নিস্তব্ধতার ভেতর চাপা পড়ে যায়। এই ঘরটার সঙ্গে তার একটা অদ্ভুত শত্রুতা আছে তবু এখানেই তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কারণ এখানে তার রাবসা থাকে। শয়নকক্ষে শুয়ে আছে রাবসা। অসুস্থ শরীরটা বালিশে হেলানো, চোখ দুটো আধখোলা। আগের তুলনায় অবস্থাটা কিছুটা ভালোই মনে হয়। শ্বাসটা আগের মতো অস্থির নয়, বুক ওঠানামাও স্বাভাবিকের কাছাকাছি। রাজন এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে। মুখে কিছু বলে না, চোখেও কোনো আবেগ ভাসে না। শুধু হিসাব। ডাক্তার আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। আজ আবার চেকআপ করবে।
সময়টা ধীরে কাটে। বাড়ির ভেতরে ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়। অবশেষে ডাক্তার আসে। রাবসাকে পরীক্ষা করে, কিছু নোট নেয়, প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে। তার মুখভঙ্গি দেখে রাজনের বুকের ভেতর অস্বস্তি জমে ওঠে। চেকআপ শেষ হলে রাজন পাশের ঘরে ডাক্তারের সঙ্গে যায়। দরজা বন্ধ হতেই সে সোজাসুজি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
“এখন শরীরের অবস্থা কী?”
ডাক্তার একটু চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে, মেপে কথা বলে, “সময় খুব বেশি হাতে নেই।”
এই কথাটুকুই যথেষ্ট। রাজনের মাথার ভেতর যেন কিছু একটা ছিঁড়ে যায়। এতক্ষণ যে সংযম, যে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা সব মুহূর্তের মধ্যে গলে যায়। রাগটা চোখে-মুখে উঠে আসে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। এরপর যা ঘটে, তা দ্রুত। হঠাৎ। অপ্রত্যাশিত। ডাক্তারের হাতে থাকা জিনিসটাই রাজনের হাতে চলে আসে। কোনো কথা, কোনো সতর্কবার্তা কিছুই নয়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পাশের ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ঘরটায় পড়ে থাকে নিথর দেহটা। মেঝের ওপর শরীরটা কেমন বেঁকে গেছে, যেন শেষ মুহূর্তে কিছু বলতে চেয়েও পারেনি। চোখ দুটো আধখোলা, বিস্ময়ের ছাপ এখনো জমে আছে সেখানে। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয়নি—না আর্তচিৎকার, না সাহায্যের ডাক। সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছে যে শব্দের সুযোগই পায়নি সে।
রক্ত ছড়িয়ে পড়েছে মেঝে জুড়ে। লালচে গাঢ় তরলটা রাজনের সাদা লুঙ্গিতে লেগে গেছে, দাগ কেটে কেটে পুরো কাপড়টা আর সাদা নেই। রক্তের ছিটে মুখেও ছড়িয়ে পড়েছে ঠোঁটের কোণে, গালের পাশে, চোখের নিচে। সেই রক্তে কোনো আতঙ্ক নেই, আছে উন্মাদনার উত্তাপ। রাজনের নিঃশ্বাস ভারী, চোখ দুটো জ্বলছে। যেন এই মুহূর্তে সে মানুষ নয়, কোনো হিংস্র ইচ্ছার নগ্ন রূপ।
পাশের রুমে শুয়ে থাকা রাবসা সব বুঝতে পেরেছে। দেয়ালের ওপাশ থেকে কোনো শব্দ না এলেও নীরবতাটাই তাকে সব বলে দিয়েছে। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে, হাত দুটো শক্ত করে চাদরের কোণ চেপে ধরে। সে চুপ করে থাকে। একেবারে চুপ। রাবসার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে কান্নার শব্দ করে না। কেবল চোখ দুটো ছলছল করে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারের দিকে। বাইরে রাত যেমন ছিল, তেমনই আছে। কিন্তু এই বাড়ির ভেতরে, এই দুটো ঘরের মাঝে, সবকিছু চিরতরে বদলে গেছে।
রাজন রক্তমাখা শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে পাশের ঘরে আসে। তার পায়ের শব্দ খুবই মৃদু। বিছানার পাশে এসে বসে পড়ল সে। রাবসা নড়েচড়ে তাকায়। চোখে ভয় আছে, কিন্তু প্রশ্ন নেই। রাজনের সাদা লুঙ্গি আর সাদা নেই, গাঢ় লাল ছোপে ভরা। মুখে, হাতে রক্তের দাগ। সব মিলিয়ে সে যেন রাতেরই এক অংশ হয়ে গেছে।
রাজন রক্তমাখা হাতটা তুলে রাবসার চুলে আলতো করে বুলিয়ে দেয়। হাতের স্পর্শে রাবসা কেঁপে ওঠে, কিন্তু মুখ খোলে না। রাজন ঝুঁকে এসে রাবসার চোখের পানি মুছে দেয়। তার আঙুল কাঁপছে। ভীর এক শ্বাস ফেলে রাবসা ধীরে বলল, “আমার পেছনে তুমি জীবনটা নষ্ট করো না। আমি পচে–গলে গেছি। এখন কেবল মাটিতে মিশে যাওয়ার অপেক্ষায় আছি।”
“এসব বইলো না। তোমার কিছুই হইব না। ওই ডাক্তারের মাথায়ই সমস্যা ছিল। তাই উল্টাপাল্টা কথা কইছে।”
রাবসা তাকিয়ে থাকে। কিছু বলতে চেয়েও বলে না।
রাজন একটু থেমে আবার বলে, “বিনিময়ে ওরে আমি শাস্তি দিছি। আমার রাবসারে নিয়া এসব বলার অধিকার কারো নাই। কারোই না।” রাজন রাবসাকে বুকে টেনে নিলো। শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। রাবসার সে কিছুই হতে দিবে না। রাবসার কোনো অধিকার নেই তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার। কোনো ভাবেই সে রাজনকে ছেড়ে যেতে পারবে না। হঠাৎ রাজনের ফোন বেজে উঠে। ফোনটা কে দিলো একবার দেখার চেষ্টাও করে না সে। এখন কোনো কিছুই দেখতে চায় না সে। কোনো কিছুই। তবে রাজন যদি একটু জানতে পারত, ওপাশে তাদের বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে নদী তার সব পছন্দের খাবার তৈরি করেছে। তার জন্য অপেক্ষা করছে। তবে সে তো জানার চেষ্টাই করল না। নদীকে বোঝার চেষ্টাই করল না। কেবল সারাটা জীবন অপেক্ষা করিয়ে গেল।
রাত তখন শহরের কোল ঘেঁষে নামছে। ফারাজ বাড়ির গেট পেরোতেই ভেতরের নিস্তব্ধতাটা কেমন আলাদা লাগল। রুমে ঢুকে আলো জ্বালাতেই চোখে পড়ল—সব গুছানো। অস্বাভাবিক রকম পরিপাটি। যেন কেউ খুব যত্ন করে জায়গাটাকে সাজিয়েছে। সে রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে এক মুহূর্তের জন্য সে থমকে গেল। চিত্রা দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে। কালো নাইটি পরহিত। ভয়ংকরভাবে আকর্ষণীয় লাগছে। আলোটা এমনভাবে পড়েছে যে তার শরীরের রেখাগুলো ছায়া-আলোয় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চুলগুলো খোলা, সামান্য ভেজা৷ হয়তো ইচ্ছে করেই। চোখে কাজল নেই বেশি, তবু দৃষ্টিটাই যথেষ্ট। সে সেজেছে। ফারাজের মাথার ভেতর যেন হঠাৎ সব শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। “চিত্রা…”নিজের গলাটাই নিজের কানে অচেনা লাগল।
চিত্রা ঘুরে তাকাল। ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি। সেই হাসিতে কোনো জটিলতা নেই, আছে অপেক্ষা।
“এত দেরি করলেন যে?” সে শান্ত স্বরে বলল, “ভাবলাম আজ আর আসবেনই না।”
ফারাজ কয়েক কদম এগিয়ে গেল। চোখ সরাতে পারছে না। এই চিত্রাকে সে চেনে, আবার চেনে না। যুদ্ধক্লান্ত ফারাজের সামনে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে এমন নারী যার সম্মুখে সে পরাজিত সৈনিক।
“তুমি…,” ফারাজ বাকিটা বলতে পারল না। মাথা সত্যিই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চিত্রা কাছে এল। দূরত্বটা নিজেই ভেঙে দিল।“আমি জানি,” সে নিচু স্বরে বলল, “এই চোখটা আজ একটু বেশি কথা বলছে।” ফারাজ হাত বাড়িয়ে তার কবজি ধরল। শক্ত করে না ভেঙে পড়া মানুষ যেমন করে ধরে তেমন ভাবে। চিত্রা একটুও সরে গেল না। বরং আরও কাছে এল। তাদের নিঃশ্বাস এক হয়ে গেল।
“আজ কথা হবে না বিবিজান। আমি ক্লান্ত, তারচেয়ে ক্লান্ত তোমায় স্পর্শসুখের অসুখে।” ফারাজ ফিসফিস করে বলল। চিত্রা চোখ নামাল। তারপর ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। বলল, “তাহলে চলুন আপনার সঙ্গে আমিও ক্লান্তের সমুদ্রে ঝাপ দেই।”
রুমের আলোটা মৃদু। বাইরে রাত গভীর হচ্ছে।
ফারাজ জানে এই মুহূর্তে, এই কালো নাইটির ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা চিত্রাই তার সব সকল রোগের একমাত্র নিরাময়।
শীতের ভোর। চারপাশ এখনো কুয়াশার চাদরে ঢাকা। অন্ধকারটা পুরোপুরি কাটেনি—আলো আর রাতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামটা। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে ফজরের আজান। মাটির রাস্তার ধারে জমে থাকা শিশিরে পা ফেললে হালকা শব্দ হয়। খেজুর আর তালগাছের পাতায় জমা কুয়াশা টুপটাপ করে পড়ছে। পুকুরের পানিতে হালকা কুয়াশা ভাসছে। পানির ওপর গাছের ছায়া ঝাপসা, কাঁপা কাঁপা। নারকেল পাতার বেড়ার আড়াল থেকে ভেসে আসে বাসন নড়াচড়ার মৃদু আওয়াজ।
এলাহী বাড়ির সদর দরজাটি নিঃশব্দে খুলে গেল। কালো রঙের চাদরে নিজেকে আড়াল করা একজন মানুষ দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ল। যেন এক মুহূর্তও নষ্ট করার সুযোগ নেই। তাড়াহুড়োয় অন্দরমহল পেরিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল। ঠিক সিঁড়ির মাঝ বরাবর উঠতেই হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল ফারাজ এলাহী। ফারাজ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
মুহূর্তের মধ্যে সামনের মানুষটির চোখ-মুখের রেখা বদলে গেল। আতঙ্ক, বিস্ময় আর ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় সব একসঙ্গে জমে উঠল মুখে। সেই থমথমে নীরবতা ভেঙে হঠাৎ ফারাজ এলাহী নিচু তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “বউ… তুমি?”
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৮
রুমানার রাতে ঘুম হয়নি। তবু ভোরের নিয়ম ভাঙেননি—আজও খুব সকালে উঠে পড়েছেন। নিত্যদিনের মতো পুকুরপাড়ে যান। ছাই দিয়ে দাঁত মেজে, মুখ-হাত ধুয়ে ঘরে ফিরে আসেন। হাতে ঝুলে থাকে কালো রঙের তসবি। কিছুদিন ধরে তার পথ এক জায়গাতেই এসে থামে—বাড়ির পেছনের ঘাট করা শ্যাওলা-ধরা পুকুরপাড়ে। আজও ব্যতিক্রম হয়নি। ইদানীং রুমানার গা ভর্তি করে গহনা পরতে ইচ্ছে করে না। চুলে তেল ঢেলে মাঝ বরাবর সিঁথি কেটে খোঁপা বাঁধার আগ্রহ নেই। রসালো, বাটা ভর্তি পানও আর মুখে রোচে না। ঘাটের সিঁড়িতে বসে সে পানিতে হাত দিতেই হঠাৎ চমকে ওঠে। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে আতঙ্কে। মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে চিৎকার,
“লাশ!!!!!!”

Porbo 70 den plz