চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৪ (২)
ইশরাত জাহান জেরিন
চারদিন পেরিয়ে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিন বদলেছে, কিন্তু মোহনার ভেতরে সময় থেমে আছে। ঘরটা এখনো রোশানের গন্ধে ভরা। তার ব্যবহৃত শার্টটা আলনায় ঝুলে আছে। মনে হচ্ছে এখনই এসে বলবে, “এইটা এখনও শুকায়নি?” মোহনা সকালে উঠে জানালার ধারে দাঁড়ায়। রোদের আলো আসে, কিন্তু গায়ে লাগে না। চারদিনে সে বুঝে গেছে। আলো থাকলেও উষ্ণতা নাও থাকতে পারে। খাবার টেবিলে থালা সাজানো হয়, কিন্তু সে বসে না। কেউ জোর করলে দু’চামচ মুখে তোলে, তারপর আর পারে না। গলা দিয়ে খাবার নামে না, নামলেও বুকের কোথাও আটকে যায়। যেন শরীর বুঝে গেছে এই জীবনে আর পেট ভরে কিছু খাওয়ার দরকার নেই।
রাতগুলো সবচেয়ে ভয়ংকর। চারপাশ চুপচাপ হলে রোশানের অনুপস্থিতিটা শব্দ করে ওঠে। মোহনা বিছানার একপাশে শুয়ে থাকে। অন্য পাশটা ফাঁকা। হাত বাড়িয়ে দেয় অভ্যাসে, তারপর হঠাৎ মনে পড়ে এই হাতটা আর কোনোদিন ধরা হবে না। তারপর বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। সে কথা বলে না। কাঁদেও না ঠিকমতো। চোখের জল ক্লান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু অন্তরদহন, ওটা বাইরে থেকে দেখা যায় না, অথচ ভেতরে ভেতরে সব পুড়িয়ে দেয়।
রোশানের নামটা মনে হলেই মোহনার শ্বাস আটকে আসে। কত কথা বাকি ছিল! কত ‘পরে বলবো’ জমে ছিল! ভালোবাসাটা তো পেয়েছিল সে। পুরোটা পেয়েছিল। তাই হারানোর যন্ত্রণাটা এত নিষ্ঠুর।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
চারদিন পর মোহনা বুঝতে পারে মৃত্যু শুধু মানুষকে নিয়ে যায় না, সে জীবনের একটা মানে তুলে নিয়ে যায়। এখন সে বেঁচে আছে, কিন্তু বাঁচার ভেতরের কারণটা নেই। মোহনা আকাশের দিকে তাকায়। সেথায় চেয়ে বলে,
“শুনছো কী রোশান? ভালোবাসা যে পাওয়া যায়, তা আমি তোমার হাত ধরেই জেনেছিলাম। আর হারানো যে এমন পাগল করে দেয়, তা জানলাম তোমার চলে যাওয়ার পর। চারদিন, মাত্র চারটা দিন… অথচ মনে হচ্ছে ভুবন বদলে গেছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকেই চিনতে পারি না। যে চোখ দু’টা তুমি বলতে ভুবনরূপসী গোলাপের মতো, তার নিচে এখন কালি। চুলে জট পড়ে গেছে, খুলতে ইচ্ছে করে না। সব কিছু এলোমেলো, যেমন আমার মাথার ভেতরটা। আমি কথা বলি তোমার সঙ্গে সবাই ভাবে আমি পাগল হয়ে গেছি। হয়েছি বোধহয়। কারণ ভালোবাসা পেয়ে হারানো মানুষ আর স্বাভাবিক থাকে কী করে? বুকের ভেতর সারাক্ষণ একটা পোড়া গন্ধ, নিঃশ্বাস নিলেই কষ্ট লাগে। তুমি জানো, আমি কাঁদতে পারি না। চোখের জল শুকিয়ে গেছে, কিন্তু যন্ত্রণাটা শুকোয়নি। তুমি ছাড়া সময় থেমে থাকে, আবার নিষ্ঠুরভাবে চলেও যায়। রোশান, তুমি কি জানো তোমাকে হারিয়ে আমি আসলে নিজেকেই হারিয়েছি? তুমি চলে গেছ, আর আমি পড়ে আছি এই ভালোবাসার ধ্বংসস্তূপের নিচে, অর্ধমৃত, অর্ধপাগল তোমারই হয়ে।”
মোহনার চোখ যায় হঠাৎ আয়নার দিকে। সে নিজের শেষ হয়ে যাওয়া সৌন্দর্যটা দেখে মলিন হেসে বলে, “দেখছো রোশান, তোমার গোলাপ শুঁকিয়ে গেছে।”
অভ্র বিছানার মাথায় হেলান দিয়ে বসে আছে। আহত হাতটা বালিশের ওপর রাখা। আয়েশা ধীরে ধীরে এসে তার কোলে হেলান দেয়। বুকের ভেতর জমে থাকা চারদিনের ভয়টা যেন এখনো তার নিঃশ্বাসে আটকে আছে। ফারাজ ভাই প্রথমে অভ্রর কথা না বললেও পড়ে বলেছে। সেই রাতে আয়েশা অভ্রকে ফোন করে কম বকেনি, কম কাঁদেও নি।
অভ্র আর আয়েশা উভয়ে চুপ। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলে না। আয়েশা আঙুল দিয়ে ব্যান্ডেজের ধার ছুঁয়ে দেখে। খুব আলতো করে।
” এখনও ব্যথা করে?”
অভ্র মাথা নাড়ায়। ” হাত নাড়ালে।”
একটু থেমে যোগ করল, “কিন্তু তুমি এভাবে থাকায় কম লাগছে এখন।”
আয়েশা হালজা করে তার বুকের সঙ্গে গাল ঠেকায় “আমি বকেছি খুব, তাই না?”
“বকার দরকার ছিল।” অভ্র হাসার চেষ্টা করে। ” ওটাই তো প্রমাণ তুমি আমায় কত ভালোবাসো।”
আয়েশার চোখ ভিজে ওঠে। “তুমি জানো, আমি সবচেয়ে বেশি কী ভয় পেয়েছি?” একটু থামল সে। “এই ভেবে না, তোমার হাতের আঘাত। এই ভেবে—যদি তুমি আর না ফিরো, আমি কীভাবে বাঁচবো। এমনিতেই চারিদিকে এত শোক।”
অভ্র চুপ করে থাকে। তার সুস্থ হাতটা আয়েশার চুলে চলে যায়। জট ধরা নেই, তবু আঙুল আটকে যায় মাঝেমাঝে। ” আমি তখন ভাবছিলাম ফিরতে পারলেই হলো। একবার তোমার কোলটা পেলেই সব ঠিক।”
আয়েশা মাথা তোলে। ” এই কোল কি ঢাল?”
” না।”
অভ্র ফিসফিস করল, ” এটা আশ্রয়।”
আয়েশা চোখ বন্ধ করল। ” চারদিনে আমি শিখেছি ভালোবাসা মানে শুধু অপেক্ষা না। ভালোবাসা মানে ভয় নিয়ে বাঁচা।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নামে। কিন্তু এই নীরবতা ভারী নয়। আয়েশা একটু সরে এসে তার কোলেই বসে থাকে, হাত দুটো জড়িয়ে ধরে। “ব্যথা হলে বলবে। আমার আবার নিচে যেতে হবে। রোশান ভাইয়ের চারদিনের মিলাত আজকে। কত্তকাজ।”
“একটু পরে যাও।”
“পরে গেলে সেই আমারই ক্ষতি। কাজ যত জলদি শেষ হবে ততই ঝামেল মুক্ত।”
হঠাৎ অভ্র আয়েশাকে নিজের দিকে ফেরায়, চিবুকে হাত দিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতে যাবে তার আগেই আয়েশা তাকে সরিয়ে দিয়ে বলল, “উঁহু এসব এখন না৷ আগে সুস্থ হন। আপনার হাত এখনো সুস্থ না।”
“বাকি জিনিস তো সুস্থ আছে। আর কী চাই?”
চিত্রা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ব্লাউজের ফিতা লাগাতে ব্যস্ত। আঙুলে ফিতার জট খুলতে খুলতে কপালের ভাঁজে হালকা বিরক্তি জমে। ঠিক তখনই পেছনে সাদা পাঞ্জাবি পরা ফারাজের, হাতে ঘড়ির ক্ল্যাস্প আটকাতে গিয়ে চোখ আটকে যায় চিত্রার ঘাড়ে। আয়নার প্রতিফলনে দাগটা স্পষ্ট। সে এগিয়ে এসে নিঃশব্দে ফিতাটা লাগিয়ে দেয়। গলার কাছে হাত থামতেই ফারাজ আনমনে বলে ওঠে, ” ক্ষত সেরে গেলেও দাগ থেকে যায়, তাই না? তোমার মামী… আগে কেমন মানুষ ছিলেন, আর এখন সব হারিয়ে কেমন হয়ে গেছেন।”
চিত্রা মুহূর্তেই ঘুরে দাঁড়ায়। কণ্ঠে কঠিন সংযম, ” বাদ দেন না। অতীতের কথা।”
ফারাজ শান্ত গলায় বলে, ” বাদ তো দিয়েছিই। নইলে প্রথম দিন যখন এই দাগ দেখেছিলাম, তখনই দাগ দেওয়া মানুষটির নাম মুছে ফেলতাম।”
“রোশান ভাইয়ের খুনির কী হলো?”
” খুঁজে পেয়েছিলাম। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, ছেলেটাকে আগেই কেউ বিষ দিয়েছিল। যাতে আমার কাছে ধরা পড়লেও সত্য বলতে না পারে।”
চিত্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ” এটাই আশা করেছিলাম।”
ফারাজ তাকায়। ” তুমি আজকাল এসব নিয়েও ভাবো?”
” হায় খোদা! একটু ভাবলে কী এমন হয়? “চিত্রা প্রসঙ্গ বদলায়, ” আচ্ছা, নিচে চলুন। আপনি বিরিয়ানিটা হাড়িতে চড়াবেন না?”
ফারাজ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। কিন্তু নামার পথে তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে। বাগানে আয়োজন করা হয়েছে রান্নাবান্নার খাওয়ার। রান্নার জাগায় ঢুকে হাড়ির ঢাকনা খুলতেই ভাপের সঙ্গে স্মৃতিও উঠে আসে। রোশান বেঁচে থাকতে বলেছিল। একদিন বাড়িতে আয়োজন করে ফারাজের হাতের বিরিয়ানি খাবে। সেই অনুরোধটা এখনও ফারাজের কানে বাজে। আজও আয়োজন হচ্ছে। হাড়ি চড়ছে। মশলার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু রোশান নেই। যে মানুষটার জন্য রান্না, সে খাওয়ার জন্য আর রইল না। চারদিনের মিলাতে ফারাজ মাদ্রাসার হাফেজদের দাওয়াত দিয়েছে। রোশানের নামে কোরআন খতম হবে। ওদের সে নিজ হাতে খাওয়াবে। চাল ধোয়ার সময় তার আঙুল কেঁপে ওঠে। কাউকে সে বুঝতে দেয় না। চোখ ভিজে আসলে সে মাথা নোয়ায়। এই বিরিয়ানি আজ উৎসবের নয়, এটা দায়ের। স্মৃতির কাছে দায়, প্রতিশ্রুতির কাছে দায়।
হাড়ির ঢাকনা বন্ধ করে ফারাজ এক মুহূর্ত থেমে থাকে। ভেতরে জমে থাকা দুঃখটা চেপে রাখে বুকের গভীরে।
বাগানজুড়ে প্যান্ডেল টানানো হয়েছে সাদা কাপড়ে। চারদিক খোলা। কিন্তু মাথার ওপর ছায়া। পুরোনো আমগাছ আর কৃষ্ণচূড়ার ফাঁকে ফাঁকে রশি বেঁধে কাপড় টাঙানো, নিচে সবুজ ঘাসের ওপর সারি সারি চেয়ার টেবিল। বাতাসে পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ে, আবার সরে যায়।
প্যান্ডেলের এক পাশে বড় বড় হাঁড়ি রাখা। ঢাকনা খুললেই ভাপ উঠে আসে, গন্ধে পুরো বাগান ভরে যায়। দূরে কোরআন তিলাওয়াতের সুর। হুজুররা বসে আছেন, শিশুরা সারিবদ্ধ হয়ে। এই খোলা জায়গাটাই আজ যেন বেশি মানানসই।
ফারাজ, অভ্র আর বজ্র প্যান্ডেলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পরিবেশন করছে। ভাত, বিরয়ানী দুইটার আয়োজনই করা হয়েছে। সবাই খুব একটা বিরিয়ানি খেতে পারে না। তাদের জন্য ভাতই কম্ফোর্ট। ফারাজ পাতে ভাত তুলে দেয়, অভ্র মাংস, বজ্র ডিম আর সালাদ। অভ্র বাচ্চাদের দিকে ঝুঁকে হাসে, ছোটদের হাত থেকে থালা নিয়ে সামনে এগিয়ে দেয়। ফারাজের চোখ বারবার বাগানের এক কোণে চলে যায়। যেখানে সেদিন রোশান দাঁড়িয়ে গল্প করেছিল। আজ সেখানে কেউ নেই। তবু ফারাজ কাজ থামায় না। প্রতিটা থালা নামানোর সময় মনে মনে বলে, আপনার জন্যই তো সব।
দোয়া শেষে ফারাজ একটু পিছনে সরে দাঁড়ায়। প্যান্ডেলের সাদা কাপড় নড়ে ওঠে বাতাসে। তার বুকের ভেতরের চাপা দুঃখটা আজও রয়ে যায়। কিন্তু তার ওপর দায়িত্বের একটা শান্ত স্তর বসে গেছে। আজকের আয়োজন কোনো প্রদর্শন নয়, এটা কেবল এক অনুপস্থিত মানুষের নামে দেওয়া ভালোবাসা। ফারাজ আকাশের দিকে তাকায়, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভাই আপনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন। এই দুনিয়ায় যতখানি কষ্ট করেছেন আপনার ঠিক ততখানি সুখ হোক। চিন্তা নেই, আমাদের একদিন ঠিকই মুলাকাত হবে।”
রাজন কবরের সামনে নিথর হয়ে পড়ে আছে। গায়ে লেগে আছে ভেজা মাটির গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে রয়েছে তীব্র মদের ঝাঁঝ। চারদিন ধরে সে বাড়ি ফেরেনি। ফেরার কোনো তাগিদও তার নেই। এই কবরটিই এখন তার ঠিকানা। কারণ এই মাটির নিচেই শুয়ে আছে তার রাবসা। রাজন জানে, এখান থেকে কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রাবসাকে ছেড়ে সে আর কোনো পথ চেনে না। রাবসাকে হারিয়ে, সে গভীরভাবে উপলব্ধি করছে ভালোবাসার মানুষকে হারালে যন্ত্রণা কতটা অসহ্যকর হতে পারে।
রাবসাকে যে মহিলা বাসায় দেখাশোনা করত, বিষ পানের ঠিক আগমুহূর্তে তাকে ডেকে নেয় সে। কাঁপা হাতে একটা ভাঁজ করা চিঠি তার হাতে গুঁজে দিয়ে শুধু এটুকুই বলে। রাজনকে দিও। আর কিছু নয়। কোনো অভিযোগ নয়, কোনো কান্নাও না।
আজ সেই চিঠিটা রাজনের পকেটেই আছে। চারদিনে সে চিঠি একশ ছাপ্পান্নবার পড়েছে রাজন। কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো বসে, কখনো আবার এই কবরের পাশেই পড়ে পড়ে। প্রতিবার পড়ার পর মনে হয়, এই শেষবার। কিন্তু পকেট থেকে চিঠিটা বের হয় আবারও। অক্ষরগুলো তার চোখে বদলায় না, অথচ প্রতিবারই ভিন্নভাবে আঘাত করে। কিছু শব্দ বুক পোড়ায়, কিছু বাক্য শ্বাস আটকে দেয়।
প্রিয় রাজন,
আমি জানি, ডাক্তার স্পষ্ট করে বলেছে, আমার সময় খুব বেশি নেই। কথাটা শুনে আমি ভয় পাইনি, রাজন। ভয় পেয়েছি তখন, যখন বুঝেছি আমি তোমার জীবনের একটা অনিশ্চিত অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছি। এমন এক অধ্যায়, যার কোনো ভবিষ্যৎ নেই, আছে শুধু প্রশ্ন আর অপরাধবোধ। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি তোমার আর নদীর জীবনটাই ভেঙে দিয়েছি। তুমি হয়তো তা কখনো মুখে বলোনি, কিন্তু আমার চোখ এড়িয়ে কিছুই যায়নি। নদী তোমাকে ভালোবাসে। একেবারে নিঃশর্তভাবে, গভীরভাবে। সে তার সংসারটাকে, তার স্বামীকে, তার স্বপ্নগুলোকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চেয়েছিল। আর আমি… আমি যেন নিঃশব্দে তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছি। তার স্বামী, তার ভালোবাসা, তার অধিকার—সব।
রাজন, বলো তো, এত দায় কাঁধে নিয়ে কি বাঁচা যায়? প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে নিজেকে অপরাধী হিসেবে দেখা কতটা অসহ্য, তুমি বুঝবে না। আমি চেয়েছিলাম তোমার জীবনে শান্তি হোক, নিশ্চিত একটা সকাল হোক। কিন্তু আমার উপস্থিতি শুধু জটিলতা এনেছে। আমি জানি, তুমি আমাকে ভালোবাসো। হয়তো সেই ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় শাস্তি। কারণ এই ভালোবাসার ঠিকানা নেই, কোনো নিরাপদ ভবিষ্যৎ নেই। আমি চাই না, আমার জন্য তুমি সারাজীবন অপরাধবোধে পুড়ে মরো। আমি চাই না, নদীর চোখে আরেকটা অন্ধকার যোগ হোক। এই জনমে তুমি আমার ভালোবাসা নদীকেই দিও।
তার হাতটা শক্ত করে ধরো, তাকে কখনো একা ফেলে যেয়ো না। আমার জন্য তাকে আর একটুও কষ্ট দিও না, রাজন। আমি চাই না, আমার নামটা তার জীবনের যন্ত্রণার সাথে জড়িয়ে থাকুক। আর যদি কোনো পরের জন্ম থাকে, পারলে সেই জন্মে কেবল শুধু রাবসার হয়েই তুমি জন্ম নিও। তখন আর কোনো দায় থাকবে না, কোনো নিষেধ থাকবে না, কোনো মানুষ কষ্ট পাবে না। তখন আমি তোমাকে বুকভরে ভালোবাসব, কিন্তু এই জন্মে আমাকে বিদায় তোমার দিতেই হবে, রাজন। এই বিদায়টাই সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ভেবে নিও। যদি কোনোদিন আমাকে মনে পড়ে, মনে কোরো আমি তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ভুলটা ছিলাম। যে ভুলটা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু সত্যিটা চিনতে শিখিয়েছে। আমাকে ক্ষমা করে দিও, রাজন। যদি পারো, নিজেকেও ক্ষমা কোরো। সুখী হওয়ার অধিকার তোমার আছে আমার না থাকলেও।
ভালো থেকো। খুব ভালো থেকো।
তোমার প্রিয় রাবসা
শেষমেশ রাবসার কবরের মাটিতে দু’হাত চেপে ধরে বসে যায় সে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে মাটি গড়িয়ে পড়ে।
গলা ফেটে বেরিয়ে আসে হাহাকার। সে ফিরে আসতে বলে, বারবার বলে,একবার, শুধু একবার। মাটি আঁকড়ে ধরে। কাঁপা কণ্ঠে সে মাটির সঙ্গে কথা বলে, মৃতের কাছে বেঁচে থাকার দাবি তোলে। কিন্তু যে চলে যাওয়ার, সে কি আর ফিরে আসে? কবর নিতে জানে, দিতে নয়। তবে এত হাহাকার কেবল কী রাজনের একার? ওপাশে যে নদী শোক মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে যে শক্ত হচ্ছে, অপেক্ষার প্রহর যে তার ফুরিয়ে আসছে সেই কথা কী রাজন জানে না?
বাড়ি প্রায় খালি হয়ে গিয়েছে। হুজুর নিচে জরুরী কিছু কথা বলছেন। তার নাকি ঠান্ডার সমস্যা। ঠান্ডা পানি পান করতে পারেন না। তাই ফারাজ ঝমেলাকে পাঠিয়েছে উষ্ণ গরম পানি নিয়ে আসার জন্য। অনেকক্ষণ হয়ে গেল আসছে না দেখে নিজেই উঠে গেল সে। রান্নাঘরে গিয়ে দেখল পানি পাতিল থেকে গ্লাসে ঢালার সময় গায়ের ওপর পড়ে গেছে জমেলার। বাড়ির সব মানুষ বাইরে থাকার কারনে কেউ জমেলার চিল্লাচিল্লি শুনতে পায়নি। শেষে ফারাজ তাকে এই অবস্থায় দেখে দৌড়ে আসে। জলদি মলম এনে জমেলাকে সোফায় বসিয়ে বলে, “আপনি ডাকবেন না কাউকে? দেখেছেন তো এখন কী অবস্থা হয়েছে? দেন আমি মলম লাগিয়ে দিচ্ছি হাত দেন আপনার।”
“না সমস্যা নাই, আমি পারুম।”
“দিতে বলেছি।”
জমেলার মাথায় ঘোমটা দেওয়া ছিল। পাকা চুলগুলো খোঁপা করা। তাড়াহুড়োয় ঘোমটা পড়ে যায়। বেচারি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। হঠাৎ ফারাজ মলম হাতে বসতে যাবে ঠিক সেই সময় জমেলার ঘাড়ের দিকে চোখ যায় তার। এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় ফারাজ। অকস্মাৎ জমেলাকে জিজ্ঞেস করে, “ওয়েট ঘাড়ে এটা কিসের দাগ? মানে এই ছোট্ট কাটা দাগের ওপর কিসের ট্যাটু?” জমেলা মুহূর্তেই মাথায় ঘোমটা দিয়ে ফারাজকে বলল, “আরে ওইটা তো জন্মদাগ। আপনি মলম আমারে দেন। আমিই পারমু লাগাইতে।”
জমেলা ফারাজকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেল। ফারাজ সেখানেই দাড়িয়ে রইল। কিছু বলার সুযোগই পেল না। মাথায় কেবল এখন প্রশ্নের পোকারা কিলবিল করছে।
সন্ধ্যায় স্টাডি রুমে অভ্র প্রবেশ করল। ফারাজ হাতের সিগারেটটা ফেলে অভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “ইতালিতে যেই লোক রোজের গায়ে গুলি করেছিল ওর হাতে একটা ট্যাটু ছিল তাই না? ছবিটা দেখা তো।”
অভ্র ছবিটা দেখাতেই ফারাজ জুম করে দেখল। হ্যাঁ হুবহু একই ট্যাটু। তবে ভিন্ন জায়গায়। একটা ছোট্ট কাটা দাগ তার ওপর একটা ফিনিক্স পাখির ট্যাটু করা হয়েছে। একেবারে সেইম টু সেইম। ফারাজ অভ্রর দিকে তাকায়, অভ্রও ফারাজের দিকে তাকায়। “অভ্র তুই কী ভাবছিস?”
“আপনি যা ভাবছেন।”
“আমি ওইসব ভাবতে চাই না। কিন্তু….”
রাতে ফারাজের ঘুম কিছুতেই আসছে না। সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটার পর একটা সিগারেট জ্বালাচ্ছে। মাথায় এক গাদা প্রশ্ন, তবে উত্তরের খুব কাছাকাছি সে। এতটাই কাছাকাছি যে সকলের কল্পনার বাইরে। হঠাৎ চিত্রা এসে পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে ফারাজের নগ্ন পিঠে চুমু খায়। ফারাজকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলে, “ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে?”
ফারাজ কিছু বলে না। চিত্রা ফারাজকে নিজের দিকে ঘুরায়। ঠোঁটে পরপর বেশ কয়েকটি চুমু খায়। সেই চুমু কেবল ঠোঁটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ফারাজের মাথা থেকে ততক্ষণে সব চিন্তা বের হয়ে গেছে। এই নারী কত জাদু জানে। এক চুমুতেই সব ভুলিয়ে দিলো। হঠাৎ চিত্রা চুমু থামিয়ে ফারাজকে বলল, “আপনি আমার জন্য কি করতে পারবেন ফারাজ এলাহী?” চিত্রা থমথমে গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ল। ফারাজের সেই অদ্ভুত রঙের বাদামি-কালোর মিশেলে গড়া চোখের তীক্ষ্ণ চাহনি চিত্রার কালো নয়নে পড়তেই পরিবেশটা অন্যরকম ভাবে বদলে গেল। ফারাজ এক পা দুই পা করে এগিয়ে এসে চিত্রার মুখের সামনে পড়ে থাকা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে তার পেছনে গেল। শীতল হাত দু’টো চিত্রার কোমল পেটে ছোঁয়াতেই কেঁপে উঠল চিত্রা ঠিক প্রথম দিনের মতো করেই। ফারাজ তার থুতনি ঠেকিয়ে দিলো চিত্রার কাঁধে। পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গুনগুনিয়ে উঠল,
~Teri nazron ke sadqe, yeh jaan vaar doon ga
Tu jo keh de tou apna jahan vaar doon ga
Mene maula se teri meri duniya hai maangi
Woh jo likh de tou usko hee haq maan loon ga~
ফারাজ চিত্রার ঘাড়ের থেকে চুলগুলো সরিয়ে পিঠে চুমু খেতে যাবে তার আগেই সেই দাগের দিকে চোখ যায় তার। হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় সে। ভালো করে আঙ্গুল বুলাতেই আরো গভীর ভাবে চিন্তায় পড়ে যায়। আরো নিখুঁত ভাবে দেখতেই হঠাৎ জমেলার ট্যাটুর কথা মাথায় আসে। আচ্ছা এটাও কী একটা ট্যাটুর দাগ যেটা উঠিয়ে ফেলা হয়েছিল? এই দাগের আয়োতন ঠিক ততখানি যতখানি জমেলা আর ওই লোকের ট্যাটু ছিল। তারচেয়েও বড় কথা,এখানেও ছোট্ট একটা কাটা দাগ আছে। ফারাজের হৃদয় চিরে যাচ্ছে। হায় খোদা, তুমি আর কতবার তোমার এই বান্দাকে মারলে খুশি হবে? আর কত খোদা? হঠাৎ চিত্রা ফারাজের দিকে ফিরে তাকে পুনরায় চুমু দেয়। “কি হলো আপনার?” ফারাজ একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, “কিছু না, কিছু হয়নি।” চিত্রা তখন বাতি বন্ধ করে তাকে কাছে টেনে নিলো, আরো গভীর ভাবে, গভীর থেকেও গভীর ভাবে।
শেষরাত। ফারাজ তখন স্টাডি রুমে। ঘুম আসছে না তার। সারারাত ঘুমাতে পারেনি সে। হঠাৎ ফোনটা হাতে নিয়ে, বারবার রেখে দিচ্ছে। শেষবার আর রেখে দিতে পারল না। হঠাৎ ফারাজ অভ্রকে কল করল। একটা কল বাজতেই ধরল অভ্র। ঘুম চোখে জিজ্ঞেস করল, “ভাই এইসময় কিছু হয়েছে নাকি?”
“কিছু না। মনে কিছু নিস না। একটা ছবি পাঠাচ্ছি, একটু দেখ তো তোর বউয়ের ঘাড়ে এমন কোনো দাগ আছে নাকি?”
“ভাই এসবের সাথে আমার বউয়ের কী সম্পর্ক থাকতে পারে?”
“বললাম তো মনে কিছু নিস না। আমি ভাই ঘুমাতে পারছি না। অশান্তি লাগছে। আমি কেবল সব ভুল প্রমাণ করতে চাই।”
অভ্র ফারাজের পাঠানো ছবিটা আগে দেখল। একটু ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। হ্যাঁ একটা ছোট কাটা দাগ। তার ওপর থেকে ট্যাটু উঠিয়ে নিলে যেমন দাগ থাকে তেমন দাগ আছে। হঠাৎ সে সাহস করে ঘুমন্ত আয়েশার চুল গুলো ঘাড় থেকে সরিয়ে দিলো। আয়েশার জীবন অনেক কষ্টে গেছে। শরীরে অনেক জায়গায় দাগ আছে। এত গভীর ভাবে কোনো কিছু ভেবেছে নাকি অভ্র? সে নিশ্চিত দাগ থাকলেও এমন দাগ থাকবে না। সে ফোনের ফ্লাশ জ্বালালো না। কেবল ফোনের স্ক্রিনের আলোয় দেখল। কিছুই পেল না। মনে মনে খুশি হয়ে গেল। তবে হঠাৎ করে একে ঘাড়ের একেবারে নিচের চুলগুলো সরাতেই থমকে গেল অভ্র। কানে তার এয়ারপডস। ফারাজ এলাহী জিজ্ঞেস করল, “কিরে কিছু পেয়েছিস?”
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৪
“ভাই কী করে সম্ভব? একেবারে একই?” অভ্রর মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। চোখের কোণে এখনই জল চলে এসেছে।
ফারাজ কল কেটে দিলো। তার স্ক্রিনে তার স্ত্রী চিত্রাঙ্গনার ছবি। সে ওই ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, “কে তুমি? কে এই নারী, যার নাম চিত্রাঙ্গনা?”

Apu next part ta tara Tari Dan please
Apu next part ki pabo