চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৫
ইশরাত জাহান জেরিন
ঘাটে এই সময়টায় মানুষের আনাগোনা থাকে না বললেই চলে। বিকেলের দিকে সূর্য ঢলে পড়লেই হঠাৎ করে ভিড় জমে ওঠে। সোহান কাল রাতে বাড়ি ফেরেনি। রাত কাটিয়েছে লঞ্চেই। আজ তার গন্তব্য হাওর। ঘুম ভাঙতেই সে সোজা নদীর ঘাটে নেমে গোসল সেরে নেয়। তারপর সরওয়ালা এক কাপ কড়া চা খায় মাথার ঝিমুনি কাটাতে। শরীরে সরিষার তেল ঢেলে দু’হাতে ঘষে ঘষে মাখায় কাঁধ, বুক, পিঠ, বাহু সবখানে। খালি গায়েই এসে রোদের মধ্যে বসে পড়ে। মুইন নামের ছেলেটা আরেক কাপ চা এনে তার হাতে দেয়।
সোহান চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, ” সিফাত কই?”
“ভাই তো মাইয়া লইয়া ঘুমাইয়া আছে।”
” জানোয়ার তো জানোয়ারই। যা গিয়া উঠা ওরে। গিয়া কইবি রাত কাটছে। বৈশ্যা লইয়া দিনে শুইয়া থাকা চলে না।”
মুইন এক মুহূর্ত দেরি করল না। দ্রুত চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, ” ভাই, একজন আপনার লগে দেখা করবার আইছে।”
সোহান তখন ব্লেড দিয়ে নখ কাটছিল। মাথা না তুলেই বলে, ” সকাল সকাল আবার কেডা বাল ফালাইতে আসছে?”
” বজ্র কায়সার।”
সোহান থমকে তাকায়। “একটা চেয়ার দিয়া আয়। আরেক কাপ মালাই চা আনবি। বজ্ররে দাঁড় করাইয়া রাখছোস নাকি হারামজাদা?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” না ভাই, আসতে কইছি।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই বজ্র এসে বসল। মুইন চেয়ার দিল, চা রাখল। বজ্র চায়ে হাত দিল না। চায়ের ওপর একটা মাছি বসে পড়ল। কেউ তাড়াল না। বজ্র চারপাশে তাকিয়ে বলল, “মানুষজন দেখি একেবারেই নাই।”
” এই সময় থাকেও না। মানুষ দরকার হইলে বিকাল-সন্ধ্যায় আইসো।”
বজ্র গম্ভীর গলায় বলল, “ভালো কথা, সব ব্যবস্থা করলাম। এবার আপনার পালা।”
” শুনি কী ব্যবস্থা করছো।”
” আজ রাতে চিত্রাকে আপনার হাতে তুলে দেব। তবে বিনিময়ে আমার পাওনাটা মনে আছে তো?”
সোহানের চোখ সরু হয়ে আসে। ” মনে আছে। তুমি ফারাজের জায়গায় বসতে চাও। এলাহী বাড়ি, সম্পদ, নাম সব তোমার চাই। তাই তো? আমি তো আগেই কইছি, চিত্রারে কাইরা নিলে ফারাজ হাতে আইব। আর ওরে ভাবতাছি ঠিক ওর মায়ের মতোই মৃত্যু দিমু। ওই গাছটা এখনো আছে না? আগুন আবার লাগল, তবে এবার লাগাইবো অন্য কেউ আর পুড়ব অন্য কেউ।”
বজ্র চাপা স্বরে বলে, ” আপনি তাহলে সব জানেন?”
“না জানার কী আছে? সবাই জানে। শুধু দরকার হইলে মুখ খুলে।”
বজ্র উঠে দাঁড়ায়। ” তাহলে আমি যাই। অনেক কাজ বাকি। আপনি বিয়ের বন্দোবস্ত করেন। আর একটা কথা সিফাতকেই আগে পাঠানো ভালো। চিত্রা তাকে ভালো করে চেনে না। আপনাকে দেখলে সন্দেহ করবে। ঝামেলা বাড়বে। তাই ওর হাতেই মেয়েটাকে তুলে দেব। আর আপনি বাকি কাজ ততক্ষণে সামলাবেন।”
বজ্র হাত বাড়ালে সোহান শক্ত করে ধরল।” জলদি করো যাহ করার, বজ্র। আমার আর ধৈর্য্যে কুলাইতাছে না।”
রাজন আজও বাড়ি ফেরেনি। বাড়িতে এখন বোধহয় কেউ তার অপেক্ষায় থাকে না। সে ফিরুক কিংবা না ফিরুক কারও জীবনে আর তাতে কোনো প্রভাব পড়ে না। আজও সে বসে আছে কবরের সামনে। একাগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাটির দিকে। এই পৃথিবী বড় অদ্ভুত। এখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ কমে না বরং গভীর হয়। তবে কি দুঃখের পরিসমাপ্তি মৃত্যু? মনে হয় না। কারণ মৃত্যু যদি সব কষ্ট শেষ করেই দিত, তবে খোদা জাহান্নাম সৃষ্টি করতেন কেন? মানুষ চাইলে বদলাতে পারে তবু কেউ কেউ সুযোগ এসেও তা কাজে লাগায় না। রাজন যদি আজ কবরের শেষ সীমানার সেই বাঁকটায় দাঁড়িয়ে নদীরকে একবার পিছন ফিরে দেখত। তাহলে কি দেখতে পেত না তার অযত্নে ফেলে আসা ফুলের বাগান? দেখতে পেত না নদী এখনো তার জন্য কাঁদে, তার কথা ভাবে? নদীর মুখে নিকাব। কালো বোরকার আড়ালে লুকানো চোখ দুটো অশ্রুতে ভিজে যাচ্ছে স্বামীর এই পরিণতি দেখে। তার মনে পড়ে যায় ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। রাজন যখন রাবসার প্রেমে পড়ে, তার কিছুদিন পর রোশান একদিন ইঙ্গিতে বিষয়টা নদীকে জানায়। সেদিন থেকেই তার বুকের ভেতর জন্ম নেয় ক্ষুদ্র এক সন্দেহ। আর সন্দেহ যখন দীর্ঘ হয় তখন মানুষ সত্যের খোঁজে নামে। একদিন নদী সত্যিই পৌঁছে যায় রাবসার কাছে। সেদিন সেখানে দাঁড়িয়ে বুঝে যায় তার স্বামীও ভালোবাসতে জানে।
তার হৃদয়ও অন্য কারও জন্য কাঁপে।সেদিন খোদার কাছে আর কোনো অভিযোগ রাখেনি নদী। সে শুধু এটুকুই চেয়েছিল সে দূরে থাকুক, অন্যের হোক, তবুও যেন রাজনের জীবনে নদীর মতো ভালোবাসা হারিয়ে না যায়। এই যে নুড়ি যে তার গর্ভের সন্তান নয়। তবুও তাকে ঘিরেই এখন নদী আবার বাঁচার স্বপ্ন দেখে। কারণ সবাই যদি পূর্ণতা পায়, তাহলে অপূর্ণতার স্বাদ গ্রহণ করবে কে? নদী চোখের জল মুছে নেয়। এই এক জীবনে এত দুঃখ সহ্য করা কঠিন, তবু দুঃখ নিয়েই টিকে থাকার নামই তো জীবন।
মার্জিয়া বেগম বহুদিন পর বাড়ি ফিরেছেন। বাড়ির পাশেই, একটু উঁচু জমির ওপর পাশাপাশি তিনটি কবর মারিয়া, মাহাদী আর তার স্বামীর। এতদিন পেরিয়ে গেল, অথচ আজও জানা হলো না কে কেড়ে নিয়েছিল তার ছেলে এবং বউমার প্রাণ। কার জন্যে মাটির ঢিবিতে শুয়ে আছে তার ছেলে-ছেলের বউটা। দেশটা দিনকে দিন আরও নিচে নামছে। আরো নামবে।
বিকেলের দিকে মার্জিয়া কবরগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়ান। আগাছা আর শুকনো পাতায় ঢেকে গেছে তিনটি কবর। আসছে বর্ষা। পানি উঠলে কবরের বুক ছুঁয়ে যাবে কিনা সেই দুশ্চিন্তা মাথা ছাড়ে না। হাতের আঁচলে মাটি ঝাড়তে ঝাড়তেই তার চোখ ভিজে ওঠে।
ঠিক তখনই মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। মার্জিয়া ঘোমটাটা আরও টেনে নেন। ঠোঁট নড়ে। দোয়া পড়তে যাবেন এমন সময় বাড়ির গেটে শব্দ। সোহাগ ফিরেছে। হাতে বাজারের ব্যাগ। মার্জিয়া তাকিয়ে বললেন, “কিরে বাপ, এই সময় কী আনছোস?” ব্যাগটা দরজার পাশে নামিয়ে রেখে সোহাগ হাসল। “অনেক দিন ধইরা আম্মা তোমার হাতের খাওন খাইতে পারি নাই। গরুর হাড় আনছি। বুটের ডাল দিয়া রান্ধবা?” শব্দগুলো শুনেই মার্জিয়ার চোখ ভরে উঠল। এই খাবারটাই মাহাদীর সবচেয়ে প্রিয় ছিল।
অভাবের সংসারে কতদিন যে এমন রান্না হয়নি, তার হিসেব নেই। মাঝেমধ্যে টাকা এলেও তখন ক্ষুধার চেয়ে দুশ্চিন্তাই বড় হয়ে উঠত। মার্জিয়া ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। আগে নামাজ শেষ করতে হবে। দরজার কাছে গিয়েও একবার পেছনে তাকালেন। রান্না হবে বাইরের মাটির চুলায়। সোহাগ পকেট থেকে লাইটার বের করে উনুনের সামনে ঝুঁকে পড়ল। শীত পড়েছে। আগুন ধরালে একটু উষ্ণতা মিলবে। হঠাৎ পেছন থেকে মার্জিয়ার কণ্ঠ ভেসে এলো, “অনেক ভালোবাসোস চিত্রারে তাই না?” একটু থেমে, ভারী স্বরে যোগ করলেন,
“তুই বাপজান, একটু স্বার্থপর হইতে পারলি না?” সোহাগের হাত থেমে গেল। সে তখনও ফিরে তাকাল না।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর বলল, “মাটি হইয়া যে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতে পারছি এইটাই কি কম আম্মা? কয়জনে এত বড় স্বপ্ন দেখার সাহস পায়?”
মার্জিয়ার কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল, “তুই আসলেই বোকা।”
সোহাগ হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ল। “মাটি যদি বোকা না হইত, তাইলে দুনিয়া কি আর তার বুকের ওপর দিয়া হাঁটতে পারত আম্মা?” তারপর প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নরম স্বরে বলল, “আম্মা যান। নামাজ পড়েন গিয়া।” মার্জিয়া আর কিছু বললেন না। কারন তার চুপ করে যাওয়ার ভাষাই তো তার না বলা কথার সমান।
আজ সারাদিন ফারাজের কাছে আসার সুযোগ পায়নি চিত্রা। বাইরে নানা কাজে সময় কেটে গেছে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে রুমে ঢুকতেই সে পেছন থেকে ফারাজকে জড়িয়ে ধরল। দিনভর জমে থাকা অভিমান আর ভালোবাসা একসঙ্গে উজাড় করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনো সাড়া মিলল না। ফারাজ ধীরে উঠে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল, “আগে সাওয়ার নিই। ভালো লাগছে না।”
চিত্রার মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল। খানিক চুপ থেকে নরম স্বরে বলল,” তাহলে আমি এই ফাঁকে খাবার গুছিয়ে আনি। আজ আপনার পছন্দের কলিজা ভুনা করেছি।”
ফারাজ পেছনে ফিরে তাকাল না। হাঁটতে হাঁটতেই বলল,
“বাইরে থেকেই খেয়ে এসেছি।”
চিত্রার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।” কিন্তু আমি তো আপনার জন্য না খেয়ে বসে ছিলাম… এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম।”
“এত অপেক্ষার দরকার ছিল না। তোমার ক্ষুধা পেলে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমার কাজ আছে। গোসল করে স্টাডি রুমে যাব, আজ সেখানেই থাকব। অনেক কাজ বুঝলে।” কথাগুলো বলে সে সরাসরি ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। বাইরে বাতাসে শীতের তীব্রতা, অথচ ফারাজের শরীরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে আগুনের মতো উত্তাপ। রাগ, হতাশা আর অবিশ্বাস একসঙ্গে চেপে বসেছে তার মনে। এই দুনিয়ায় কি সত্যিই ভরসা করার মতো কেউ নেই? কেন তার জীবনটাই বারবার এমন নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়? চিত্রা ছাড়া সে কিছুই চায় না। নিজেকেই সে বোঝাতে চেষ্টা করে তার মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাওয়া ভয়গুলো সত্য নয়, কিছুই হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে। চিত্রাকে নিয়ে যে আশঙ্কা তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে, সেটা কখনোই সত্য হতে পারে না। ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে সে চোখ বন্ধ করল। বরফ শীতল জল শরীর ছুঁয়ে গেলেও মনকে ছুঁতে পারল না। ভেতরের অস্থিরতা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠল। কেন এমন অশান্ত লাগে সব?
সারা রাত চিত্রার চোখে ঘুম ছিল না। ভোরের দিকে একফোঁটা তন্দ্রা নেমে এলেও তা দীর্ঘ হলো না। ঘুম ভাঙতেই পাশের শূন্যতা তাকে আরও ভেঙে দিল। ফারাজ নেই তার পাশে। এত হাসিখুশি মানুষটা হঠাৎ করে এমন বদলে গেল কেন? বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল চিত্রার। অজানা আশঙ্কায় হৃদয় ভারী হয়ে গেল। দেরি না করে সে তিন তলার স্টাডি রুমের দিকে গেল। বাইরে পৌঁছেই থমকে দাঁড়াল। দরজায় তালা। ভেতরে ঢোকার কোনো উপায় নেই। ঠিক তখনই সিঁড়ির দিকে চোখ পড়ল। ছাদ থেকে নামছে মোহনা। চিত্রা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,ভাবি, ফারাজকে দেখেছেন?”
মোহনা হালকা গলায় বলল, “হ্যাঁ। অভ্রর সঙ্গে কোথাও গেল।” এই কথাটুকুতেই চিত্রার বুকটা আরও ভারী হয়ে গেল। মোহনাকে দেখলেই এখন কষ্ট হয় তার। সেদিন শরীরও ভেঙে পড়েছিল। এই অবস্থায় গর্ভের সন্তান কি টিকবে?না—শুধু নিজের জন্য নয়, সন্তানের জন্য হলেও তাকে লড়তেই হবে। মোহনা আর কিছু না বলে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। চিত্রাও আর দাঁড়াল না। রুমে ফিরে একের পর এক ফারাজকে ফোন করল। কোনো সাড়া নেই। শেষে বুঝল। সিম বন্ধ। দুশ্চিন্তা তখন বুক চেপে ধরল। খিদের টানে অবশেষে নিচে নামল সে। সকালে বমি করেছে, শরীর ভীষণ দুর্বল। রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়ে সিঁড়িতে পা হড়কে পড়েই যাচ্ছিল ঠিক তখনই কোথা থেকে আয়েশা ছুটে এসে ধরে ফেলল।
মেয়েটাকে যেন খোদা বিশেষ কোনো শক্তি দিয়ে পাঠিয়েছেন। প্রতিবার বিপদে সে ঠিক হাজির হয়।
ভাগ্য ভালো, তখন বজ্রও বাসায় ছিল। সে চিত্রাকে বসিয়ে পরীক্ষা করল। কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে থেকে বলল,
” ভাবি, আপনার মেনস্ট্রু…” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তার ফোন বেজে উঠল। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো ফারাজের কণ্ঠ,” আজ রাতে অভ্রকে নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছি। কাজ আছে। তোর ভাবীকে জানিয়ে দিস। ওকে নেটওয়ার্কে পাচ্ছি না।”
কল কেটে গেল। বজ্র কিছুক্ষণ নীরব থেকে চিত্রার দিকে তাকাল। ” ফারাজ ফোন করেছিল।”
“কী বলল?” চিত্রার গলা কাঁপল।
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৪ (২)
বজ্র হঠাৎ হেসে দাঁত বের করল, আগের মতো বিনয়ের মুখোশ পরে বলল,” আপনার জন্য আজ রাতে একটা স্পেশাল সারপ্রাইজ তৈরি করেছে। লোকেশন আমার কাছে আছে পাঠিয়ে দিবে। ঠিক সময় আপনাকে সেখানে পৌঁছে যেন দিয়ে আসি তাই বলল।” বলেই সে পুনরায় বিনয়ের সঙ্গে দাঁত বিকশিত করল।

next part taratari deben.