Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩১

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩১

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩১
আয়াত বিনতে নূর

ফারিসের গাড়িটা চলে যাওয়ার পর নিশিতা ধীরে পায়ে ক্লাসরুমে ঢুকলো। ঢুকেই তার চোখে পড়লো—রিয়া আর অহনা পাশাপাশি বসে ফিসফিস করে কী যেন আলাপ করছে। তাদের মুখের ভাবটা অদ্ভুত রকম গম্ভীর। নিশিতা কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে রিয়ার পাশে বসে পড়লো।
নিশিতাকে বসতে দেখেই রিয়া আর অহনা হঠাৎ চুপ করে গেল। যেন কথার মাঝপথে হঠাৎ করে পর্দা নেমে এলো। এই আচরণটা নিশিতার চোখ এড়ালো না। একটু অবাক হয়ে সে দু’জনের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, ওরা নিশ্চয়ই এমন কিছু নিয়ে কথা বলছিল যেটা তাকে দেখেই থামাতে হলো।
নিশিতা ভ্রু কুঁচকে বলল,

— কী হয়েছে তোদের? আমাকে দেখেই এমন চুপ করে গেলি কেন?
নিশিতার কথা শুনে রিয়া আর অহনা একে অপরের দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে যেন অনেক প্রশ্ন, অনেক ইশারা লুকিয়ে ছিল। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর অহনাই আগে মুখ খুললো।
— কিছু না। আগে তুই বল… দুই দিন আগে তুই আর ফারিস ভাই কোথায় ছিলি? আমাদের কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছিস নাকি?
অহনাদের এই সরাসরি প্রশ্নে নিশিতা যেন হঠাৎ থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল, চোখে জমে উঠলো একরাশ বিস্ময়। সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল, কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। তারপর কথাটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে হালকা স্বরে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— কি লুকাবো বল তো? আমার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই নাকি? আর ফারিস ভাইয়ার সাথে একটু আটকে গিয়েছিলাম, এর বেশি আর কী-ই বা হবে?
বলতে বলতে সে রিয়ার দিকে তাকালো। কণ্ঠে সামান্য চাপা উৎকণ্ঠা।
— রিয়া, ওসব জানে নাকি?
এরপর আবার রিয়ার দিকেই তাকিয়ে আধা-রসিক, আধা-সন্দেহের সুরে বলল,
— কিরে, অহনাকে কী বলেছিস? কিছু তো বলেছিসই! কাল ফারিস ভাই তো সবকিছু বলেই দিলেন, তাই না?
রিয়া নিশিতার কথা পুরোপুরি উপেক্ষা করে রিয়া হঠাৎ অহনার দিকে ঝুঁকে নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে—
“আরেহ, অহনা ভাইয়া আমাকে সব বলেছে। আপাতত এই টপিক বাদ দে। সামনে ফাইনাল এক্সাম, স্যার এখন যা পড়াচ্ছে সেটায় মন দে।”

রিয়ার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল যে, নিশিতা আর কিছু বলার সাহস পেল না। কথাটা বলেই রিয়া থেমে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশের অস্থিরতা যেন হালকা হয়ে আসে। এরপর ধীরে ধীরে সবাই স্যারের ক্লাসে মনোযোগ দিতে শুরু করে। বোর্ডে লেখা শব্দগুলো, স্যারের কণ্ঠ—সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও রিয়ার মাথার ভেতর কিন্তু একদমই স্বাভাবিক ছিল না।

*ফ্ল্যাশব্যাক*
সকালের দৃশ্যটা বারবার রিয়ার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। তখন গাড়িতে এসে নিশিতাকে নামিয়ে দিয়ে রিয়া এক মুহূর্তও দেরি না করে তাড়াহুড়ো করে ক্লাসের দিকে চলে এসেছিল। নিশিতার মুখের সেই চাপা ভাব, চোখের ভেতরের অদ্ভুত নীরবতা—সবকিছু যেন কোথাও একটা রিয়ার মনে খচখচ করছিল।
ক্লাসে ঢুকে সোজা অহনার পাশের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ে রিয়া। কিন্তু বসেও সে যেন সেখানে নেই। চোখ বোর্ডে, কিন্তু মন কোথাও অনেক দূরে।
রিয়ার এই অমনোযোগী ভাবটা অহনার চোখ এড়ায় না। অহনা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হালকা হাসির আড়ালে চিন্তিত কণ্ঠে বলে ওঠে—

“কিরে রিয়ার বাচ্চা, তোর আবার কী হলো? মন খারাপ নাকি?”
অহনার কথায় রিয়া ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায়। সেই তাকানোর ভেতরে ছিল একরাশ বিভ্রান্তি আর অজানা ভয়। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে বলে—
“জানিস অহনা, নিশিতা আর ফারিস ভাইয়ার ব্যাপারটা কী হচ্ছে আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না।”
এই কথাটা শুনে অহনার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে ধক করে ওঠে। মনে মনে অহনা বলে—
“নিশিতা যে ফারিস ভাইকে ভালোবাসে… এই কথাটা কি তাহলে রিয়া জেনে গেছে?”
ভাবনাটা মাথায় আসতেই অহনা ভয় পেয়ে যায়। কারণ নিশিতা কখনোই রিয়াকে ফারিসের ব্যাপারে কিছু বলেনি। সবকিছু এত গোপনে ছিল যে, রিয়ার মুখে এমন কথা শুনে অহনার নিজেরই অস্বস্তি লাগছিল। নিজেকে সামলে নিয়ে অহনা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে—

“আমি তো কিছুই জানি না রে। তবে কাল নিশিতাকে কল দিয়েছিলাম। পড়াশোনার কথা বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু ও তাড়াতাড়ি লাইন কেটে দেয়। এরপর আর কিছু জানি না আমি।”
অহনার কথাগুলো শুনে রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। যেন কথাগুলোর ভেতর কোনো লুকানো অর্থ খুঁজছে। কিন্তু কিছু না পেয়ে হালকা
করে বলে—
“আচ্ছা, বাদ দে।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্লাসরুমের দরজা দিয়ে নিশিতা ঢুকে পড়ে। নিশিতাকে আসতে দেখেই রিয়া আর অহনা দুজনেই চুপ করে যায়। অনেক কথা জমে থাকলেও আর কিছু বলা হয় না।
নিশিতা নিজের জায়গায় বসে পড়ে, আর রিয়া সামনে তাকিয়ে থাকে—কিন্তু তার ভেতরে তখনও হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায় খুব গভীরভাবে। ক্লাস চলতে থাকে…কিন্তু তিনজনের মনই তখন পড়াশোনার চেয়ে অনেক দূরের কোনো এক অজানা সত্যের দিকে তাকিয়ে থাকে।

এদিকে চৌধুরী বাড়িটা আজ অদ্ভুত রকমের ফাঁকা।
যেন চেনা বাড়িটাই আজ অপরিচিত হয়ে গেছে।
সব সময়ের কোলাহল, হাসি-ঠাট্টা, মানুষের যাতায়াত—কিছুই নেই। পুরো বাড়িজুড়ে এক ধরনের শান্ত, শিষ্ট, নিরিবিলি নীরবতা নেমে এসেছে। মেডরা নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
কেউ নিচতলায় পরিষ্কার করছে, কেউ রান্নাঘরে ঢুকছে আবার বের হচ্ছে—সবকিছুই নিয়মমাফিক, কিন্তু প্রাণহীন।
এই বিশাল বাড়িটায় আজ যেন মানুষের উপস্থিতি থাকলেও উষ্ণতা নেই। ডাইনিং রুমে আমেনা চৌধুরী একা একা কাজ করছেন। পরিপাটি করে টেবিলের উপর প্লেট, গ্লাস সাজিয়ে রাখছেন।
হাতের কাজে কোনো ভুল নেই, কিন্তু চোখে-মুখে একটা অদ্ভুত শূন্যতা।
মাঝে মাঝেই থেমে যান, যেন কাউকে খুঁজছেন—আবার নিজেকে সামলে কাজে ফিরে যান সকালেই বাড়িটা এমন ফাঁকা হয়ে গেল। সকালে সবাই বের হবার কিছুক্ষণ পরেই আফিয়া চৌধুরীর বাবার বাড়ি থেকে ফোন আসে। খবরটা ভালো ছিল না—আফিয়া চৌধুরীর মা গুরুতর অসুস্থ।

এক মুহূর্ত দেরি না করে আরাফাত চৌধুরী অফিসের সব কাজ ফেলে সেদিনই বাসায় ফিরে আসেন।
তারপর দুজন মিলে তাড়াহুড়ো করে আফিয়া চৌধুরীর বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
বলে যান—
“দুই দিন পর ফিরবো ইনশাআল্লাহ।”
আর আলতাফ চৌধুরী তো আগেই ব্যবসার কাজে সিলেট গেছেন। কবে ফিরবেন, সেটাও ঠিক করে বলা নেই। সব মিলিয়ে—

এই বিশাল চৌধুরী বাড়িতে এখন শুধুই আমেনা চৌধুরী। ঠিক তখনই বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় তনয়া। তিন দিন পর আজ বাড়ি ফিরেছে সে। চেনা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে একটু থামে। মনে হয়, নিজের ঘরেও আজ সে একটু অতিথি। ভেতরে ঢুকেই দেখে—আমেনা চৌধুরী ডাইনিং টেবিলের পাশে কাজ করছেন।
এক মুহূর্তও দেরি না করে তনয়া নিঃশব্দে পেছন থেকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে আমেনা চৌধুরীকে।
হঠাৎ এই স্পর্শে আমেনা চৌধুরী একটু চমকে ওঠেন।
তারপর মেয়ের হাতের উষ্ণতা বুঝে চোখে-মুখে বিস্ময় আর স্বস্তি একসাথে ভেসে ওঠে।
তনয়া শিশুসুলভ আনন্দে বলে ওঠে—
“আম্মু দেখো, আমি এসে গেছি।”

নিশ্চয়ই। নিচে অংশটুকু বর্ণনা, আবেগ আর সংলাপের গভীরতা বাড়িয়ে সুন্দরভাবে লিখে দিলাম— হঠাৎ তনয়ার এমন আগমনে আমেনা চৌধুরী একটু বিব্রত হয়ে পড়লেন। মেয়ের হঠাৎ জড়িয়ে ধরায় বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানটা যেন এক মুহূর্তে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।
নিজেকে সামলে নিয়ে তনয়াকে আলতো করে ছাড়িয়ে দিয়ে একটু কঠিন স্বরে তাকিয়ে বললেন—
“ছাড়… আর ভালোবাসা দেখাতে হবে না।
সবই তো উপর উপর ভালোবাসা দেখাস।”
কথার ভেতরে জমে থাকা কষ্টটা আর চেপে রাখতে পারলেন না। চোখের কোণে বিরক্তি, গলায় চাপা অভিমান—সব একসাথে বেরিয়ে এলো।

“একবার চিন্তা করিস তোদের জন্য তোদের বাবার কাছে আমাকে কত কথা শুনতে হয়!
বাড়ির মেয়ে বাড়িতে নেই—তাও নাকি আমার দোষ!
আমি নাকি ঠিকমতো শাসন করতে পারি না!”
আমেনা চৌধুরীর কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।
এই কথাগুলো তিনি শুধু মেয়েকে বলছিলেন না,
বলছিলেন নিজের জমে থাকা অসহায়ত্বটাকেও।
তনয়া বুঝে গেল—এটা রাগ নয়, এটা মায়ের অভিমান। এক মুহূর্ত দেরি না করে তনয়া এগিয়ে এসে মায়ের গালে আলতো করে চুমু খেল।
চোখে মুখে অনুশোচনা, কণ্ঠে আদরের ছোঁয়া—

“সরি আম্মু…
এমন আর হবে না, সত্যি।”
একটু থেমে নরম স্বরে আবার বলল—
“কিন্তু তুমি তো জানো, আমি ফ্রেন্ডদের সাথেই ছিলাম। কোনো খারাপ কিছু করিনি।”
আমেনা চৌধুরী কিছু না বললেও মেয়ের কণ্ঠের আন্তরিকতা তার মনটা একটু নরম করে দিল।
হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়ে গেল তনয়ার।
চারপাশে তাকিয়ে কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করল—
“আচ্ছা আম্মু… রিয়া, নিশু—এরা কোথায়?”
আমেনা চৌধুরী টেবিলে প্লেট সাজাতে সাজাতে উত্তর দিলেন—
“ওরা কলেজে গেছে। বলেছে, একটু পরেই ফিরবে।”
তনয়া মাথা নাড়িয়ে বলল—

“আচ্ছা আম্মু, তাহলে আমি আগে ফ্রেশ হয়ে আসি।
তুমি খাবার বাড়ো।”
আমেনা চৌধুরী মেয়ের দিকে তাকিয়ে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। কোনো কথা না বললেও চোখে মুখে স্পষ্ট— মেয়ের ফিরে আসাতেই তার দিনের নিঃসঙ্গতাটা অনেকটা কমে গেছে।
নিরিবিলি বাড়িটা আবার ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
তনয়া নিজের রুমে ঢুকেই ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দিল। বিছানার কিনারায় বসে পড়ে জোরে একটা নিশ্বাস ছাড়ল। মনে হলো, এতক্ষণ চেপে রাখা সব অনুভূতি একসাথে বেরিয়ে এলো।
নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল—

“এই তিনটা দিন… আমি সারা জীবন মনে রাখবো।”
ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল এক গভীর, অর্থপূর্ণ হাসি।
যেন সেই তিন দিনের স্মৃতি এখনো তার চোখের সামনে ভাসছে। তারপর পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে তাকিয়ে কারো নাম দেখে এক মুহূর্ত থামল। আঙুল নড়ল কিবোর্ডে—
কাকে যেন ছোট্ট একটা মেসেজ পাঠাল।
মেসেজ পাঠিয়েই ফোনটা পাশে রেখে দিল,
মুখের হাসিটা তখনো মিলিয়ে যায়নি।
এরপর ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে গেল।

লম্বা একটা শাওয়ার নিল। গরম পানির নিচে দাঁড়িয়ে যেন শরীরের সাথে সাথে মনটাকেও হালকা করে নিল।
কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো।
ক্লজেট খুলে একটা সাধারণ টি-শার্ট বের করে পরল। সাথে জিন্সের প্লাজু কাট প্যান্ট।
কোনো বাড়তি সাজ নয়—তবুও ওকে পরিপাটি লাগছিল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পিঠ ছোঁয়া লম্বা চুলগুলো হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে ভালো করে শুকাল।
নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে একবার তাকিয়ে হালকা করে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তারপর রুমের দরজা খুলে নিচতলার দিকে নামল। ডাইনিং রুমে এসে দেখল—

আমেনা চৌধুরী প্লেটে খাবার বাড়ছেন। পরিচিত সেই দৃশ্যটা দেখে তনয়ার বুকের ভেতর এক ধরনের শান্তি নামলো। কোনো কথা না বলে চুপচাপ গিয়ে ডাইনিং টেবিলের এক পাশে বসে পড়ল।
আমেনা চৌধুরী ধীরে ধীরে প্লেটটা এগিয়ে দিলেন তনয়ার সামনে। মায়ের হাতের যত্ন, পরিচিত সেই খাবারের গন্ধ—সবকিছু মিলেও আজ তনয়ার মনে কোনো আলাদা আনন্দ জাগালো না।
সে কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেতে শুরু করল।
চামচ নড়ছে ঠিকই, কিন্তু মনটা যেন অন্য কোথাও আটকে আছে। কিছুক্ষণ পর আমেনা চৌধুরীও এসে চেয়ারে বসলেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মনে হলো, এত বড় বাড়ির সব দায়িত্ব যেন একাই তার কাঁধে চেপে বসেছে।

হঠাৎ দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বললেন—
“তুই যখন বাড়িতে ছিলি না, তখন অনেক ঝামেলা হয়ে গেছে রে…”
এই কথার ভেতরে শুধু অভিযোগ নয়, লুকিয়ে ছিল ক্লান্তি আর ভয়। একটু থেমে আবার বললেন—
“তোদের নিয়ে আমি আর পারি না তনয়া। কাকে রেখে কাকে দেখবো বল তো? একজনের চিন্তা সামলাতে না সামলাতেই আরেকজনের নতুন ঝামেলা।”
মায়ের গলার ভারী স্বর শুনে তনয়ার হাত থেমে গেল। সে খাওয়া বন্ধ করে ধীরে ধীরে তাকাল মায়ের দিকে। চোখে কৌতূহল আর উদ্বেগ একসাথে।
“কি ঝামেলা হয়েছে, আম্মু?”

—তনয়ার প্রশ্নটা খুব শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে অস্বস্তি অনুভব করছিল। আমেনা চৌধুরী আবারও একটা গভীর শ্বাস নিলেন।মনে হলো, কিছু কথা বলতে তার নিজেরই কষ্ট হচ্ছে।
“কিছু দিন আগে ফারিস আর নিশি…”
একটু থেমে কথাটা পরিষ্কার করে বললেন—
“সারা রাত বাড়ি ফেরেনি।”
এই কথা শুনেই তনয়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। চেয়ারে বসে থাকা শরীরটা সোজা হয়ে গেল হঠাৎ।
“কিহ্?
সত্যি?বিগ ব্রো আর নিশি… সারা রাত বাড়িতে ফেরেনি?!”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট অবিশ্বাস।
ফারিসকে সে সবসময় দায়িত্বশীল হিসেবেই জানত। এই কথা তার মাথায় যেন আচমকা ঝড় তুলে দিল। আমেনা চৌধুরী ধীরে মাথা নাড়ালেন।

“হ্যাঁ। কাজে গিয়েছিল।
ঝড়ের কারণে নাকি আটকে পড়েছিল।”
তারপর একটু বিরক্ত, একটু ক্লান্ত গলায় যোগ করলেন—
“কিন্তু এই একটা ঘটনাতেই বাড়িতে কত কথা হয়েছে জানিস? আমি একাই সব সামলাতে গিয়ে প্রায় ভেঙে পড়েছিলাম।”
শেষে হালকা স্বরে বললেন—
“এখন অবশ্য সব ঠিকঠাক আছে।”

কিন্তু ততক্ষণে তনয়ার মন আর খাবারের টেবিলে নেই।তার মাথার ভেতরে ঘুরছে নানা প্রশ্ন।
ফারিস আর নিশি, সেই রাত, বাড়ির ঝামেলা—সব মিলিয়ে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি কাজ করছে।
সে আর একটুও খেতে পারল না।
চামচটা নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল।
“আম্মু… আমি আর খাবো না।”
তার গলা শান্ত হলেও ভেতরে একটা চাপা অস্থিরতা ছিল। হাত ধুয়ে নিয়ে আবার বলল—
“একটু রেস্ট নিবো।”
এই কথা বলেই আর কিছু না শুনে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
ধীরে ধীরে উপরে উঠে নিজের রুমে চলে গেল তনয়া। ডাইনিং রুমে একা বসে রইলেন আমেনা চৌধুরী। মেয়ের পিঠের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর আবারও পুরনো দুশ্চিন্তাগুলো মাথা তুলল।
নীরব বাড়িটার ভেতর।

দেখতে দেখতে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট বেজে গেছে।
ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে নিজের নিয়মে, কিন্তু ফারিসের কাছে সময়টা যেন সকাল থেকেই একটানা ছুটে চলেছে। সকালে অফিসে ঢোকার পর থেকেই তার এক মুহূর্তও ফাঁকা যায়নি।
একটার পর একটা মিটিং—আজ সে টানা তিনটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এটেন্ড করেছে।
প্রতিটা মিটিংই ছিল বড় প্রোজেক্ট, বড় বিনিয়োগ আর বড় সিদ্ধান্তের। কোনো একটা সিদ্ধান্ত এদিক-ওদিক হলে পুরো কোম্পানির উপর তার প্রভাব পড়তে পারতো। আর এখন চলছে আরও একটা মিটিং। মিটিং রুমে সবাই গম্ভীর মুখে বসে আছে।

এসি-চালু ঘরের ভেতরেও একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। টেবিলের চারপাশে সিনিয়র ম্যানেজার, ফাইন্যান্স টিম, ক্লায়েন্ট প্রতিনিধি—সবার চোখ এখন ফারিসের দিকে। ফারিস প্রজেক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রোজেক্ট প্ল্যানিং বুঝিয়ে দিচ্ছে। হাতে ফাইল, স্ক্রিনে স্লাইড, আর কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস। সে কোথাও থামে না, কোথাও দ্বিধা করে না। যেন সব হিসাব, সব পরিকল্পনা তার মাথার ভেতর আগেই সাজানো।
আজকের দিনটা বিজনেসের দিক থেকে ভীষণ সফল। ইতিমধ্যেই তিনটা বড় ডিল সাইন হয়েছে।
কোম্পানির জন্য এই তিনটা ডিল মানে—
নতুন সুযোগ, নতুন লাভ, আর বোর্ড মেম্বারদের আস্থা আরও মজবুত হওয়া। মিটিং রুমে চাপা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে। শেষ স্লাইডটা দেখিয়ে ফারিস কথা শেষ করে। সবাই একে একে মাথা নাড়ে, কেউ কেউ নোট নেয়। অবশেষে মিটিং শেষ হয়।

ফারিস ধীরে ধীরে মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় মনে হয়— আজকের দিনটার ভারটা অবশেষে একটু নামলো। নিজের কেবিনে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়।
এই দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই যেন বাইরের পুরো দুনিয়া একটু দূরে সরে যায়।
নিজের বরাদ্দ করা CO চেয়ারে এসে বসে পড়ে ফারিস। চেয়ারের পিঠে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে একটানা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। এই নিঃশ্বাসের ভেতর জমে আছে সকাল থেকে জমে থাকা ক্লান্তি, চাপ আর দায়িত্ব। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—

এত ব্যস্ততার মাঝেও আজ সারাদিন ধরে ফারিসের মাথার ভেতর একটাই মুখ বারবার ভেসে উঠছে। নিশিতা।
সকালের সেই মায়া মাখা মুখটা যেন তার চোখে লেগে আছে। নিশিতার চোখের সেই শান্ত দৃষ্টি,
হালকা কিন্তু গভীর হাসি, যেন কোনো কথা না বলেও অনেক কিছু বলে দেয়। চেয়ারে হেলান দিয়ে ফারিস চোখ বন্ধ করে। চারপাশের সব শব্দ—
ফোনের রিং, অফিসের কোলাহল, ইমেইলের নোটিফিকেশন—
সবকিছু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
সে শুধু নিশিতাকে অনুভব করার চেষ্টা করে।
হঠাৎ করেই তার চোখ বন্ধ অবস্থায় সামনে ভেসে ওঠে এক পুরনো দৃশ্য। নিশিতা সেদিন নীল শাড়ি পরে ছিল। নীল রঙটা তার গায়ে কী অপূর্ব মানিয়েছিল! মুখে এক ধরনের শান্ত সৌন্দর্য, চোখে লাজুক দীপ্তি—
সেদিন নিশিতাকে অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা লাগছিল। মনে মনে সেই দৃশ্যটায় হারিয়ে যায় ফারিস। নিজের অজান্তেই ঠোঁট নড়ে ওঠে,
নামটা শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসে—

“নীলাম্বরী…”
ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলে যায়।
রাজীব ভেতরে ঢোকে। ফারিসকে কিছু বলতে দেখে থেমে গিয়ে একটু অবাক হয়ে বলে—
“কিছু বলছো ভাইয়া?”
রাজীবের কণ্ঠে ফারিসের ভাবনার জগৎ ভেঙে যায়। এক মুহূর্তের মধ্যেই চোখ খুলে নিজের অফিসিয়াল গম্ভীর মুখশ্রী ফিরিয়ে আনে সে।
মনের ভেতরের সব আবেগ, সব নরম অনুভূতি গুটিয়ে রেখে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে—
“নাথিং।
কিছু বলবি?”
রাজীব আর বাড়তি প্রশ্ন করে না।
হাতে থাকা ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলে—

“এই যে ফাইলটা, যেটা তুমি চাইছিলে।”
ফারিস ফাইলটা হাতে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কাজে মন দেয়। প্রতিটা পৃষ্ঠা মনোযোগ দিয়ে চেক করতে থাকে। কোথাও কোনো সংখ্যা ভুল আছে কিনা,
কোনো ক্লজ বাদ পড়েছে কিনা—সব খুঁটিয়ে দেখে।
রাজীব বুঝে যায়—
এই মুহূর্তে ফারিস পুরোপুরি কাজে ফিরে গেছে।
আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে যায়।
কেবিনে নীরবতা নেমে আসে। ফারিস ফাইলের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, মনের এক কোণে তখনও নীল শাড়ির সেই ছায়াটা রয়ে যায়।
বাইরে সময় এগোচ্ছে, আর ফারিসের ভেতরে ধীরে ধীরে জমে উঠছে আরেকটা গল্প—
যার নাম শুধু দায়িত্ব নয়, ভেতরে ভেতরে সেখানে ভালোবাসার ছায়াও গভীর হয়ে উঠছে।

ফারিসের মতোই আজকাল রাজীবের অবস্থাটাও একেবারে আলাদা কিছু নয়। দুজনেই আলাদা আলাদা ভাবে প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে— তবে পরিস্থিতি আর সম্পর্কের জায়গাটা ভিন্ন।
একজন নিজের বউকে নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তিত,
আর আরেকজন… নিজের বোনের বান্ধবীকে নিয়ে মনটা পুরোপুরি হাতছাড়া করে ফেলেছে।
ফারিসের কেবিন থেকে বের হতে হতে রাজীবের মাথার ভেতর হঠাৎ করেই অহনার মুখটা ভেসে উঠল। ওই স্বচ্ছ চোখ, স্বাভাবিক হাসি, আর কথা বলার সময় অজান্তেই যে সরল আকর্ষণ তৈরি করে— সব মিলিয়ে অহনাকে নিয়ে ভাবলেই রাজীবের মুখে অজান্তে একটা হাসি চলে আসে।
হাঁটতে হাঁটতেই নিজের মনেই ফিসফিস
করে বলল—

“আপনি তো আমাকে একেবারে জ্বালাচ্ছেন, মিস অহনা।
এইভাবে আর কতদিন চলবে বলুন তো?”
একটু থেমে নিজের চিন্তার ধারাটাকে আরও এগিয়ে নিল—
“মনে হচ্ছে… মিস অহনা থেকে আপনাকে মিসেস রাজীব অহনা বানানোর সময় এসে গেছে।”
এই কথা ভাবতেই বুকের ভেতর কেমন একটা অদ্ভুত উত্তেজনা খেলে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবতা তাকে টেনে আনল। রাজীব নিজেকে নিজেই বুঝিয়ে বলল—
“না, এখন এসব ভাবলে চলবে না।
এই মুহূর্তে অহনার কথা মাথায় নিলে কাজে আর মন বসবে না।”
ঠিক তখনই তার মনে হলো—
এক কাপ কফি হলে মন্দ হয় না। কফির গরম ধোঁয়া, তেতো স্বাদ— হয়তো মাথাটাকে একটু ঠাণ্ডা করবে। এই চিন্তা নিয়েই সামনের দিকে এগোতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ সামনে কাউকে দেখে এমনভাবে চমকে উঠল,যেন ভূত দেখেছে।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরিশা। রাজীবের এমন প্রতিক্রিয়ায় আরিশার মুখে কোনো পরিবর্তনই এলো না।তার মতিগতি একেবারেই স্বাভাবিক।
বরং সে অবাক হয়ে রাজীবের দিকে তাকিয়ে. আছে— এই হঠাৎ চমকানোর কারণ বুঝে উঠতে পারছে না।রাজীব নিজেকে সামলে নিয়ে একটু অস্বস্তিকর হাসি দিয়ে বলল—
“আরিশা?
তুমি এখানে?”
আরিশা খুব স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল—
“হ্যাঁ ভাইয়া।
ফারিসের সাথে দেখা করতে এসেছি।”
একটু থেমে আবার বলল—
“ও নিশ্চয়ই কেবিনেই আছে, তাই না?”
রাজীব কিছু বলার আগেই আরিশা নিজের কথার উত্তর নিজেই ধরে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
দ্রুত পায়ে সে ফারিসের কেবিনের দিকেই চলে গেল। রাজীব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

ফারিস তখন নিজের কেবিনে বসে একদম মনোযোগ দিয়ে ইম্পরট্যান্ট ফাইল চেক করছিল।
ডেস্কের উপর ছড়ানো কাগজপত্র, চুক্তির কপি, সাইন করা ডিলের ফাইল—সবকিছু খুব সতর্কভাবে যাচাই করছে সে। আজকের দিনটা এমনিতেই মানসিকভাবে ভারী গেছে, তাই কাজে ডুবে থেকেই সে নিজেকে সামলাতে চাইছিল।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলে নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে পড়ল আরিশা। ফারিস খেয়ালই করলো না। সে তখন সংখ্যার হিসাব, ক্লজের লাইন, সিগনেচার—এই সবের ভেতরে ডুবে আছে।
ঘরের ভেতরে আরেকজন মানুষ ঢুকেছে—এই অনুভূতিটুকুও তার মাথায় ঢোকেনি। আরিশা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তার চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা, আবার ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের আবেগ।
এক মুহূর্ত থেমে, যেন সাহস জোগাড় করছে।

তারপর হঠাৎ করেই ফারিসের কাঁধে হাত রাখলো।
এই স্পর্শটা ছিল একদম অপ্রত্যাশিত। ফারিস যেন বিদ্যুৎ খেয়ে গেল। সে মুহূর্তের মধ্যে হাতটা ঝাঁকিয়ে সরিয়ে দিল এবং চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালো।
চোখে বিস্ময়, বিরক্তি আর রাগ—সব একসাথে ফুটে উঠল।
“আরিশা?
তুই?! তুই এখানে কী করছিস?!”
তার কণ্ঠে কোনো কোমলতা নেই।
একটা কড়া প্রশ্ন, যেটা শুনেই বোঝা যায়—এই উপস্থিতি তার কাছে একদমই গ্রহণযোগ্য না।
কিন্তু আরিশা থামলো না। বরং আরও জোরে, আরও আবেগে কথা বলতে শুরু করল।

“Yes, I am!
I came running for you like a brat!”
তার কণ্ঠে তখন নিয়ন্ত্রণ নেই, আছে শুধু জমে থাকা ভালোবাসার উন্মাদনা।
“I love you, Faris! আমি তোকে অনেক ভালোবাসি! এই ভালোবাসার জন্যই আমি ১২ ঘণ্টার জার্নি করে লন্ডন থেকে বাংলাদেশে এসেছি।
কাউকে কিছু না বলে—শুধু তোমার জন্য!”
একটু থেমে, চোখে পানি নিয়ে সে বলল—
“Faris… I love you.”
এই কথাটা বলার সাথেসাথেই—
চড়।

একটা বিকট শব্দ কেবিনের ভেতর কেঁপে উঠল।
ফারিস নিজের সমস্ত রাগ এক চড়ের মধ্যে ঢেলে দিল। আরিশার মাথা একপাশে ঘুরে গেল, গাল লাল হয়ে উঠল।
সে কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করল—কি হলো?
ছলছল চোখে ফারিসের দিকে তাকিয়ে রইলো।
এই চড়টা শুধু গালে নয়, যেন তার সমস্ত আত্মসম্মানে আঘাত করল। কিন্তু ফারিস তখন আর থামার অবস্থায় নেই।
তার রাগ পুরোপুরি মাথায় উঠে গেছে।
চোখ লাল, শ্বাস দ্রুত, কণ্ঠে ঘৃণা—
“You bloody bitch!”

তার চিৎকারে কেবিনের ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে গেল।
“ওই চড় খাওয়ার পরও তোর শিক্ষা হয়নি, তাই না?!
তোর মতো মেয়ে যে কোনোদিন আমার ফ্রেন্ড ছিল—এই কথাটা ভাবতেই আমার এখন ঘৃণা হচ্ছে!”
আরিশা মুখ খুলতে চাইলো, কিন্তু ফারিস তাকে কোনো সুযোগ দিল না।
“আমি তোকে আগেও পরিষ্কার বলেছি—
আমি তোকে ভালোবাসি না! আর কখনোই নিজের ফ্রেন্ডের বাইরে কোনো চোখে দেখিনি!”
তার কণ্ঠ আরও শক্ত হয়ে উঠল—
“তাহলে কেন নিজে নিজে যেচে অপমান হতে আসিস?!”
দরজার দিকে আঙুল তুলে সে গর্জে উঠল—

“Get out!
Just get out!
And yes—
you won’t come in front of me a second time!”
এই কথাগুলোর পর আরিশার শরীর যেন শক্ত হয়ে গেল। আর কোনো কথা বের হলো না তার মুখ থেকে। চুপচাপ মাথা নিচু করে সে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর অফিস থেকেও চলে গেল—চোখের পানি আর গালের জ্বালা লুকিয়ে।
কেবিনের ভেতর একা রইলো ফারিস।কিন্তু তার রাগ তখনও কমেনি। হাত কাঁপছে, বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে। হঠাৎ সে দরজার দিকে মুখ করে চিৎকার করে উঠল—
“রাজীব!
নিহান!”
তার গলার স্বরে এমন ভয় ছিল যে বাইরে বসে থাকা রাজীব আর নিহান দুজনেই চমকে উঠল।
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। কারণ তারা দুজনেই জানে—
এই মুহূর্তে ফারিস মানে শুধু একজন বস না,
এই মুহূর্তে ফারিস মানে একটা বিস্ফোরণ।

-ফারিস হঠাৎ করেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। চোখে-মুখে তখন ভয়ংকর এক রাগের ছাপ। মুহূর্তের মধ্যেই সে সামনে রাখা টেবিলে জোরে থাবা দিয়ে আঘাত করল। কাঠের টেবিলটা কেঁপে উঠল, কেবিনের ভেতরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। গলা চড়িয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে ফারিস চিৎকার করে উঠল—
“কোন সাহসে ওই ব্লাডি বিচটাকে আমার কেবিনে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে?”
তার চোখে তখন আগুন, কণ্ঠে অসম্ভব ঘৃণা আর অপমানের রেশ।
এক মুহূর্ত দম নিয়ে আবার বলল—
“সিকিউরিটিকে স্পষ্ট করে বলা হয়নি—আমার কেবিনে কোনো অচেনা মেয়ে ঢুকবে না? তাহলে কেন ওকে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে? ড্যাম ইট!”
রুমের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কেউ কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। ফারিসের এই রূপ সবাই খুব কমই দেখে—যখন সে সত্যিই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই নীরবতা ভাঙে রাজীব। সাবধানে, নরম স্বরে সে বলে—

“ভাইয়া… আসলে আরিশা তো তোমার ফ্রেন্ড… তাই হয়তো সিকিউরিটিগুলো আটকায়নি।”
একটু থেমে যোগ করে—
“তুমি এত রাগ করো না। এরপর থেকে বিষয়টা খেয়ালে রাখা হবে।”
রাজীবের কণ্ঠে শান্ত করার চেষ্টা থাকলেও ফারিসের রাগ তাতে এক ফোঁটাও কমে না। বরং সে আরও ঠান্ডা, আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
ফারিস ঘুরে নিহানের দিকে তাকায়। চোখে স্পষ্ট নির্দেশ, কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই—
“আর যে মিটিংটা আছে, সেটা তোমরা সামলে নাও।”
তারপর বলল —
“NF গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির সব মিটিং এখন থেকে তুমিই লিড করবে। আমি বাইরে যাচ্ছি। ফিরতে দেরি হবে।”
কেউ কিছু বলার আগেই ফারিস ফাইলটা টেবিলে রেখে, কোনো দিকে না তাকিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। দরজাটা বন্ধ হতেই ভেতরের সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
বাইরে এসে আরিশা দ্রুত একটা ক্যাব বুক করে। ক্যাব আসতেই উঠে বসে পড়ে। জানালার বাইরে শহরের রাস্তাগুলো ছুটে চলেছে, কিন্তু তার চোখে কিছুই ধরা পড়ছে না। মাথার ভেতর তখন শুধু একটাই দৃশ্য ঘুরছে—আরিশার উপস্থিতি, তার নির্লজ্জ আত্মবিশ্বাস, আর সেই অপমানজনক মুহূর্ত। ফারিস দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলে ওঠে—

“এই চড়ের প্রতিশোধ আমি নেব, ফারিস।”
তার কণ্ঠে এবার নিজের সাথেই কথা বলা, কিন্তু সেই কথাগুলোতে ছিল ভয়ংকর দৃঢ়তা।
“আমি রিজেক্ট করার কোনো না কোনো কারণ তো আছেই। আর সেই কারণ যদি কোনো মেয়ে হয়…”
একটু থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—
“দরকার হলে তাকে পথ থেকে সরিয়েও দেবো। তবুও এই আরিশা রহমান হেরে যাওয়ার পাত্রী না।”
তার চোখে তখন একরাশ জেদ, একরাশ প্রতিহিংসা। ভালোবাসা নয়—এটা এখন জয়ের লড়াই। ইগোর যুদ্ধ।
“আমি তোমাকে নিজের করেই ছাড়বো, ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী।”
এই কথা বলেই সে ফোন বের করে কাউকে কল দেয়। কণ্ঠটা এবার ঠান্ডা, হিসেবি—
“একটা ভালো হোটেল বুক করো। আজই।”
কল কেটে দিয়ে সে জানালার দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা বিশ্রী, আত্মতৃপ্ত হাসি ফুটে ওঠে—যে হাসির ভেতরে লুকিয়ে আছে ষড়যন্ত্র, জেদ আর আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস।
শহর তখন আগের মতোই ব্যস্ত, কিন্তু কারো জানা নেই— এই মুহূর্তে একজন নারীর আহত অহংকার।

এদিকে কলেজে ক্লাস শেষ হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। নিশিতা, অহনা আর রিয়া তিনজন একসাথে বেরিয়ে এসেছে কলেজের মূল গেট দিয়ে। বাইরে বেরোতেই হালকা রোদ আর ঠাণ্ডা বাতাসে যেন মনটা এক মুহূর্তের জন্য মুক্ত হয়ে ওঠে। তিনজন পাশে পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দৃষ্টি মেলায় বাইরে থাকা মানুষ আর গাড়ির হুলস্থুল দেখে। হঠাৎ অহনা মুখ খুলল—
“আজকে নাভিদকে দেখলাম না কেনো? কই গেছে হঠাৎ করে?”
নিশিতা কিছুটা বিরক্ত হলো নাভিদের নাম শুনে। মুখে কিছু বলল না, কেবল চোখ মটমট করল।
রিয়া তখন কাঁধ ঠেসে হেসে বলল—
“তোর মনে হয় ওইদিন পর থেকে নাভিদ আর কলেজে আসবে? ভাইয়া ওকে যে মারটা দিয়েছে, তাতে মনে হয় আর জীবনে কলেজের দিকে পা বাড়াবে না।”
নিশিতা এখন চাইলো এই বিষয়ে আর কথা বাড়াতে না। নিজের চুপচাপ হাওয়ায় বাতাসে হালকা অসন্তোষ মিশে আছে। হঠাৎ সে বলে—

“বাদ দে এসব কথা। পরীক্ষা নিয়ে ভাব। আর মাত্র ১৮ দিন পর পরীক্ষা। তোদের কোনো চিন্তা নাই নাকি?”
অহনা খানিকটা মন দিয়ে বলে—
“হ্যাঁ… ঠিক আছে। ভালো করে পড়াশোনায় মন দে। সামনে আবারও বছর, আবারও HSC। এসব ভাবলেই মাথা ঘুরে যায়।”
কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে অহনা বলে উঠে —
“আচ্ছা থাক… আমি বাড়ি যাচ্ছি। কালকে দেখা হবে।”
রিয়া আর নিশিতাকে বিদায় জানিয়ে রিকশায় উঠে বসে অহনা। রিকশাও ধীরে ধীরে গতি নেয়। নিশিতা আর রিয়া তখন দাঁড়িয়ে রিকশা চলতে দেখছে। হাওয়া হালকা, রোদ ঢলে পড়ছে, কিন্তু তিনজনের মন যেন একদম অন্য কোনো জায়গায়।
কিছুক্ষণ পর বাড়ির গাড়ি চলে আসে। রিয়া আর নিশিতা গাড়িতে ওঠার জন্য এগোতেই হঠাৎ ফারিস তার নিজের গাড়ি নিয়ে উপস্থিত হয়। নিশিতা কিছুটা চমকে যায়।
সে জানে না কেমন করে এত দ্রুত ফারিস এখানে এসে গেছে। ফারিস গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি নিশিতার দিকে এগিয়ে আসে এবং তার হাত ধরে ধরে। নিশিতার চোখ বড় হয়ে যায়—হঠাৎ এই অবস্থা দেখে সে কিছুটা লজ্জিত, কিছুটা অবাক। কণ্ঠ কেঁপে উঠে, কেবল বলে—
“ফারিস ভাই, আপনি?”

রিয়ার চোখেও অবাক ভাব দেখা দেয়। সে নিশিতার দিকে তাকিয়ে ফারিসের হাতে নিশিতার হাত ধরে থাকা দেখে কিছুটা হতবাক হয়ে যায়। রিয়া কিছু বুঝতে পারল না। রিয়া কিছু বলার আগেই ফারিস কণ্ঠে ধীর অথচ দৃঢ়—
“তুই বাড়ি চলে যা। নিশিতাকে নিয়ে আমি আসছি। একটু পরে।”
এই কথাটা রিয়ার মনে যেন আকাশ থেকে পড়লো। মাথা ঘুরে যায়, কিন্তু অন্তত একটা আন্দাজ সে করতে পারে যে পরিস্থিতি এখন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই সে চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসে। গাড়ি চলে যায় চৌধুরী ভিলার দিকে।
ফারিস তখন নিশিতাকে কোলে তুলে নিল। নিশিতা ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে যায়। লজ্জা আর নার্ভাসনেসের মধ্যে সে ছটফট করতে থাকে।

“ছাড়োন আমাকে! কেউ দেখে ফেলবে তো। কি জ্বালায় পড়লাম আমি।”
তবুও ফারিসের কোনো হেলদুল নেই। নিশিতাকে কোমলভাবে ধরে রাখা অবস্থায় সে অদম্য দৃঢ়তায় বসে আছে।
ফারিস হঠাৎ নিশিতার ঠোঁটে হালকা চুমু দিলো। নিশিতার চোখ বড় হয়ে গেলো, মুখ লাল হয়ে উঠলো। সে কোনোমতে চুপচাপ বসে আছে, কোনো শব্দ বলতে পারছে না।
“আমার বউ, আমি যা খুশি তাই করবো। কে কি বলবে?”
ফারিস হেসে বলে। নিশিতা চুপচাপ বসে থাকে, ভেতরে লজ্জা আর বিভ্রান্তি মিশে গেছে।
এরপর ফারিস ধীরে ধীরে নিশিতার হিজাব খুলে গাড়ির ব্যাক সিটে ফেলে দেয়। তারপর আবার তার ঠোঁটের সাথে নিশিতার ঠোঁটের মিলিয়ে চুমু দেয়। নিশিতার হৃদয় দ্রুত ধড়ধড় করতে থাকে, পুরো শরীর টানাপোড়নের মধ্যে থাকে।

এই অবস্থা কতক্ষণ চললো তা বলা কঠিন। অবশেষে ফারিস নিশিতাকে ছাড়লো, নিশিতার দিকে তাকিয়ে বললো—
“তোকে এখন দরকার আমার, নিশি।”
নিশিতা কথার অর্থ বুঝতে পেরে লজ্জা আর উত্তেজনায় মিশে যায়। গাঢ় লাল চোখ, লজ্জার চুম্বকতা তার গালের রং আরও বাড়িয়ে দেয়।
ফারিস গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট করলো। গাড়ি ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। রাস্তায় হালকা বাতাস বইছে, কিন্তু গাড়ির ভেতরে এখন শুধুই নিশিতার লজ্জা, ফারিসের দৃঢ়তা আর নিস্তব্ধ উত্তেজনা।
গল্পটা এই মুহূর্তে এক অদ্ভুত চরমে পৌঁছে গেছে—যেখানে চারপাশের কোনো শব্দ বা আলো তাদের অনুভূতির ভারসাম্য ভেঙে দিতে পারে না।

গাড়ি চলতে থাকলো। শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাট ক্রমেই পিছনে থেকে দূর হতে লাগলো। নিশিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়লো দূরে বাড়ির রাস্তার সঙ্গে মিলছে না কোনো পরিচিত দৃশ্য—পথটা যেন শহরের মূল সড়ক বা তার পরিচিত রাস্তা নয়।
একটু ভয়ে ভেসে ওঠা কণ্ঠে নিশিতা বলল—
“ফারিস ভাই?”
ফারিস হঠাৎ হাত গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে আটকে রেখে চোখে-মুখে অল্প বিরক্তি ফুটিয়ে বলল—
“আমি তোর ভাই? ভাইরা কি ওসব করে যা তোর সাথে আমি একটু আগে করলাম?”
নিশিতা হতবাক। তার মনের ভেতর এক মুহূর্তে দ্বিধা, লজ্জা আর অবিশ্বাসের মিলিত অনুভূতি ঘোরলো। কিছু বলতে গিয়ে সে নিজেই বেয়াকুব বনে গেলো। তারপর হালকা কণ্ঠে ধীরভাবে বলল—
“তাহলে কি বলবো আমি…?”
ফারিস হেসে বলে—

“নাম ধরে ডাক, বা যা খুশি বলে ডাক। কিন্তু ভাই ডাকবি না, একদম না।”
নিশিতার চোখ বড় হয়ে যায়। সে হালকা কাঁপতে লাগলো। লজ্জা আর দ্বিধার মিশ্রণে বলল—
“নাম ধরে ডাকবো? না… না… আপনার তো আমার থেকে বড়।”
কণ্ঠের কম্পন যত্নসহকারে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও সে ফেলতে পারল না।
একদম হেসে বলল—
“শুনুন না…”
ফারিস তখন ধীর, গভীর কণ্ঠে বলেন—
“বল, বউ।”
নিশিতা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। হৃদয় দ্রুত ধড়ধড় করতে থাকে। ফারিসের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটে ওঠে, চোখে দৃঢ়তা। নিশিতার মনে এখন ভিন্ন এক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সে ধীরে ধীরে কণ্ঠ উঁচু করে—

“এটা তো বাড়ির রাস্তা না। আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
ফারিস এক হাত স্টিয়ারিং ধরে, আরেক হাত ধীরে ধীরে নিশিতার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলেন—
“ফার্ম হাউজে।”
নিশিতা কিছুটা অবাক হয়ে বলল—
“ওই সুন্দর বাড়িটাতে?”
ফারিস হেসে বলল—
“হুম… তোর বাড়িতে।”
নিশিতা কিছু বুঝতে পারল না। মনের ভেতরে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খেতে থাকলো। কোথায় যাচ্ছি, কেন এমন করে নিয়ে যাচ্ছেন—সব কিছু মিলিয়ে বুঝবার চেষ্টা করছিল। তাই চুপচাপ বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, ধুলোর সাথে মিশে আসে হালকা শীতলতা। নিশিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে আনন্দে চকচক করে ওঠে।
সে ফারিসের দিকে চোখ তুলে বলে—

“শুনুন না…! বৃষ্টি হচ্ছে। আমি একটু ভিজতে চাই, প্লিজ।”
ফারিস গাড়ি চালাতে চালাতে ধীর কণ্ঠে বললো—
“একদম না। বৃষ্টিতে ভিজে শরীর খারাপ হবে। এসবের কোনো দরকার নেই।”
নিশিতার চোখ বড় হয়ে গেল। মুখটা যেন বাংলা সংখ্যার পাচের এর মতো গলানো দাঁড়ানো রূপে বদলে গেছে। হঠাৎ একটি ঢেউ ভরা লজ্জা তার ভেতর থেকে ফুটে উঠল। আর কোনো শব্দ বের হলো না।
ফারিসের কণ্ঠ, স্থির চোখ, আর তার ভেতরের দৃঢ়তা নিশিতাকে এক মুহূর্তে চুপ করে বসতে বাধ্য করল। ফারিস লক্ষ্য করলো নিশিতার চোখে, ঠোঁটে, এবং সামান্য কণ্ঠে রাগের ছাপ। হঠাৎ মনে হলো, সে যেন ছোট্ট একটা বুলবুল হয়ে ওঠে—যে বুলবুলকে সে কিছুতেই রাগের মধ্যে রাখতে চাইছে না।
ফারিস ধীরে নিশিতার গালে হাত তুলে টুপুস টুপুস করে দুটো চুমু দিল। ঠোঁটের নরম স্পর্শ নিশিতার লজ্জা আরও বাড়িয়ে দিল। ফারিসের কণ্ঠে স্নিগ্ধ কিন্তু দৃঢ়—

“রাগ করে না বউ, তোর ভালোোর জন্যই বলছি।”
নিশিতা কেবল চুপচাপ বসে থাকলো। কিছু বলার সাহস নেই, না চাইছে। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উত্তেজনা, লজ্জা আর অচেনা নড়াচড়া অনুভব করছে।
কিন্তু হঠাৎ করেই গাড়ি থেমে গেল। স্টার্ট দিলেও কোনো সাড়া নেই। ফারিস বুঝতে পারল—গাড়িতে কোনো সমস্যা হয়েছে। ফারিস নিশিতার দিকে তাকালো। তার চোখে মিশ্রিত হলো এক অদ্ভুত দুঃখ আর উদাসীনতা।
তারপর ধীর কণ্ঠে বলল—

“তুই বস এখানে। আমি গাড়ি ঠিক করে আসছি। তুই গাড়ি থেকে নামবি না।”ওকেই?
নিশিতা চুপচাপ পাশের সিটে বসে থাকে। ফারিস গাড়ি থেকে নেমে তার হাতে থাকা ছাতা বন্ধ করে ধরে, তারপর গাড়ির উপরের অংশ খুলে দেখল। কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর ফারিস বুঝলো সমস্যার মূল কারণটা। সে দ্রুত ঠিক করল গাড়িটা, ইঞ্জিন ঘুরল, স্টিয়ারিং ঠিকমতো কাজ করতে শুরু করল।
তারপর সে গাড়ির ভিতরে ফিরে দেখল—নিশিতা নেই। হৃদয়টা হঠাৎ ধক করে উঠল। বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য ব্যথা শুরু হলো। ফারিস অনুভব করলো এক অজানা শূন্যতা, মাথা ফাঁকা হয়ে গেছে। সে ভয়ে নিজেকে আটকাতে পারছিল না। সাধারণত দৃঢ়, ভয়কে অচেতন করে রাখে এমন ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী এখন কেবল একটাই ভাবনায় বিভোর—

নিশিতা কোথায়? ঠিক আছে তো তার নিশি? দেরি না করে ফারিস গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো।
চারপাশে তাকাল। রাস্তা, গাছ, ফুটপাত—কোথাও নিশিতার কোনো ছায়া নেই। হৃদয়ের ধ্বনি আরও দ্রুত বেজে উঠল।
হঠাৎ দূরে তার চোখে পড়ল কিছু। একটু দূরে, বৃষ্টি থেমে নেই। এক মেয়ে—ছোট্ট বাচ্চার মতো হাত-পা ছড়িয়ে, অজান্তে বৃষ্টিতে ভিজছে। তার গা ঘিরে পানি ঝরছে, চুল ভিজে আছে, কিন্তু মুখে আনন্দ।
ফারিসের বুকের ভিতর এক অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে গেল।

আনন্দ আর শঙ্কা একসাথে। হৃদয়টা বলছে—ওই নিশি। ওই আমার নিশি। ফারিস দ্রুত তার দিকে দৌড়ে গেল। বৃষ্টির মধ্যেও সে এক মুহূর্তের জন্য থেমে নেই। পানি ছুঁয়ে মাটির গন্ধ, বৃষ্টির শব্দ, বাতাস—সব মিলিয়ে যেন এক নিরব কিন্তু জীবন্ত মুহূর্ত তৈরি হলো। ফারিসের চোখে একরাশ সতর্কতা আর উত্তেজনা।
এমন মুহূর্তে, ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী বুঝতে পারলো—নিশিতা তার জন্য শুধু একজন মানুষ নয়। নিশিতা তার জীবন, তার আবেগ, তার অদৃশ্য শান্তি। ও চামড়া স্পর্শ করছে, কিন্তু তার মন এখন কেবল নিশিতার দিকে। নিশিতার ভিজে থাকা বোরকা শরীরের সঙ্গে লেগে আছে। প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি কম্পন ফারিসকে অদ্ভুত এক উত্তেজনায় ভরিয়ে দেয়। তার চোখে ঝলমল করছে কেবল নিশিতার সৌন্দর্য, ভেতরে জ্বলছে এক অদ্ভুত আবেগের অগ্নিশিখা।
ফারিস আনমনে পকেটে হাত দিয়ে ধীরে ধীরে নিশিতার দিকে এগোতে লাগল। মনে মনে গুনগুন করে গেয়ে উঠল, স্বরের প্রতিটি কম্পন বৃষ্টির সঙ্গী হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল—

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩০

“তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে”
“তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে”
“আর কমলো চিন্তা আমার”
“”আমি তোমার কাছেই রাখবো”
“আজ মনের কথা হাজার ”
“দিয়ে তোমার কাজল আকঁবো”
আজ সারা দিনটা আমার..!
~আয়াত বিনতে নূর~

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩২