চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৬
আয়াত বিনতে নূর
প্রতিদিনের মতোই নতুন এক সকালের শুরু হলো।
চারদিকে রোদের রশ্মি ছড়িয়ে পড়ল।
আলোয় ঝলমল করে উঠল ব্যস্ততার শহর ঢাকা।
চৌধুরী বাড়িতে এখনো যেন কারও ঘুম ভাঙেনি। কাল রাতের পার্টি থেকে ফিরে সবাই ছিল বেশ ক্লান্ত। তাই আজ সকালটা একটু দেরিতেই শুরু হচ্ছে সবার। তবে নিশিতার সকাল সকাল উঠে পড়ার অভ্যাস। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
নিশিতা চোখ পিটপিট করে চারদিকে তাকাল। কিছুটা সময় লাগল বুঝতে সে তার নিজের রুমে নেই। ধীরে ধীরে উঠে বসে একবার ফারিসের দিকে তাকাল সে। ঠোঁটের কোণে হালকা এক মুচকি হাসি ফুটে উঠল। ফারিস পিঠ ফিরিয়ে, একদম বাচ্চাদের মতো গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। মুখটা এতটাই শান্ত আর নিষ্পাপ লাগছে, যেন কোনো দুষ্টুমি তার জীবনে নেই। নিশিতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল কিন্তু হঠাৎই নিজের খেয়ালে চমকে উঠল।
চোখ চলে গেল দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে।
৬টা বাজে।মনে মনে ফিসফিস করে বলল,
“কেউ ওঠার আগেই আমাকে যেতে হবে…”
আর দেরি করল না সে। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। একবার শেষবারের মতো ফারিসের দিকে তাকাল তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে পা বাড়াল।রুম থেকে বের হয়ে নিশিতা আস্তে করে ফারিসের রুমের দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল। যেন দরজার সামান্য শব্দও কারও কানে না পৌঁছায়।
তারপর চারদিকে একবার তাকাল। করিডোর নিঃশব্দ। ভোরের আলো ধীরে ধীরে জানালার কাঁচ ভেদ করে ভেতরে ঢুকছে। পুরো বাড়িটা যেন এখনো গভীর ঘুমে ডুবে আছে।নিশিতা নিশ্চিত হলো এখনও কেউ ওঠেনি।
বুকের ভেতর জমে থাকা চাপা অস্বস্তিটা একটু কমলো। সে ধীরে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল। তারপর পা বাড়াল নিজের রুমের দিকে।
রুমে ঢুকেই দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল। আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। আলমারি থেকে টাওয়ালটা নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
সারারাত ঠিকমতো ঘুম হয়নি তার। চোখ দুটো ভারী, মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। শরীরজুড়ে এক অদ্ভুত ক্লান্তি। যেন মন আর শরীর দুটোই অবসন্ন হয়ে আছে।
ওয়াশরুমে ঢুকেই কোনো কিছু না ভেবে সোজা শাওয়ার ছেড়ে দিল। ঠান্ডা পানির ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল তার শরীর বেয়ে। চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল নিশিতা। পানির প্রতিটা ঝাপটা যেন সারারাতের অস্থিরতা, দ্বিধা আর ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যেতে লাগল। ধীরে ধীরে শরীরটা হালকা লাগতে শুরু করল। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটাও যেন একটু কমে এলো।
কিছুক্ষণ পর শাওয়ার বন্ধ করে বের হলো সে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে একবার তাকাল। চোখে লালচে ক্লান্তির ছাপ এখনো স্পষ্ট।
তাড়াতাড়ি জামাকাপড় পরে নিল। ভেজা চুলগুলো টাওয়াল দিয়ে মুড়িয়ে নিল মাথার ওপর।
তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল পড়ার টেবিলের দিকে।
আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি ফাইনাল পরীক্ষার। এই সময়টায় যদি মনোযোগ না দেয়, তাহলে বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে কীভাবে মুখ তুলবে? এতদিনের বিশ্বাস, এত স্বপ্নসবকিছু ভেঙে যাবে না তো?নিজেকে শক্ত করল নিশিতা।
“না এখন আর দুর্বল হওয়া যাবে না,”
মনে মনে বলল সে। চেয়ার টেনে বসে বই খুলল। চেষ্টা করল মনটা পড়ায় বসাতে। শব্দগুলো চোখের সামনে ভাসছে, কিন্তু মনটা বারবার অন্যদিকে ছুটে যাচ্ছে। ঠিক তখনই হঠাৎ করে তার চোখ গিয়ে থামল টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট একটা প্যাকেটের দিকে। পিল। এক মুহূর্তে যেন বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সময় যেন থমকে গেল। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে বইয়ের পাতার ওপর স্থির হয়ে রইল। সেদিন থেকে ওটা ঠিক এখানেই পড়ে আছে।
টেবিলের কোণায়, বইয়ের পাশে নিঃশব্দ অথচ স্পষ্ট উপস্থিতি নিয়ে।ফারিস সেদিন তাকে বলেছিল এটা খেতে। কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য, যেন বিষয়টা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কিন্তু এটা ঠিক কী ওষুধ—তা নিশিতা জানে না। জানার চেষ্টাও করেনি। নাকি সাহস পায়নি? ফারিসের কথা অমান্য করার সাহস তার নেই। সেই ছোটবেলা থেকেই সে শিখেছে বিশ্বাস করতে হয়, প্রশ্ন করতে নেই। আর ফারিস তার প্রতি এক অদ্ভুত নির্ভরতা কাজ করে নিশিতার।
তবুও আজ প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইল সে। মনে হলো,
খাওয়া উচিত? না কি না?
কিন্তু পরক্ষণেই মাথা ঝাঁকালো।
“ওনি যা বলেছে, নিশ্চয়ই ভালো ভেবেই বলেছে ”
নিজেকে বোঝাল।
পাশ থেকে পানির গ্লাসটা তুলে নিল। হাতটা কেমন যেন কাঁপছে সামান্য। প্যাকেট খুলে একটা পিল বের করল। ছোট্ট সাদা ট্যাবলেটটা তার হাতের তালুতে পড়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর আর কিছু না ভেবে ওষুধটা মুখে দিয়ে পানি খেল।
গিলতে গিয়ে গলায় কেমন যেন একটা শুকনো অনুভূতি হলো। প্যাকেটটা আবার গুছিয়ে ড্রয়ারে রেখে দিল সে। যেন চোখের আড়ালে রাখলেই বিষয়টা আর ভাবতে হবে না। গভীর একটা শ্বাস নিয়ে আবার বইয়ের দিকে মন ফেরাল।
শব্দগুলো পড়ছে, কিন্তু মনটা এখনো অদ্ভুত ভারী।
কেন যেন মনে হচ্ছে—এই ছোট্ট একটা সিদ্ধান্ত হয়তো তার জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন ডেকে আনতে পারে তবুও নিজেকে শক্ত করল নিশিতা।
এখন তার প্রথম দায়িত্ব পড়াশোনা।
বাইরে তখন সকালের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, আর ভেতরে নিশিতার মনে অদৃশ্য এক ঝড় ধীরে ধীরে জমে উঠছে।
এদিকে অহনা তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হয়ে নিল।
খুব ভোরেই তার বাসা থেকে ফোন এসেছিল—মায়ের শরীরটা ভালো নেই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরতে হবে। ফোন রাখার পর থেকেই মনটা অস্থির হয়ে আছে তার। তাই আর দেরি না করে গোসল সেরে, দ্রুত রেডি হয়ে নিল। চুল বেঁধে, ব্যাগটা গুছিয়ে নিল কয়েক মিনিটের মধ্যেই।
রিয়া বিছানায় বসে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। অবশেষে জিজ্ঞেস করল,
“এত সকালে কোথায় যাবি তুই?”
অহনা ব্যস্তভাবে বলল,
“বাসায় যেতে হবে রে। মায়ের শরীরটা নাকি ভালো না। ফোন এসেছে।”
রিয়া এক লাফে উঠে দাঁড়াল।
“দাঁড়া, আমি ভাইয়াকে বলছি তোকে পৌঁছে দিতে। এই সকালে কোনো গাড়ি পাবি না। অটোরিকশাও মুশকিল। তুই বস, আমি ডেকে আনছি।”
অহনা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
“না রে, লাগবে না। আমি চলে যেতে পারব। সমস্যা নেই।”
রিয়া এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল তার দিকে।
“তুই কি বেশি বুঝিস নাকি? এত সকাল থেকে একা একা কোথায় যাবি? আমাকে বল তো!”
অহনা হালকা মুচকি হেসে বলল,
“আচ্ছা আচ্ছা, এত রাগ করতে হবে না ম্যাডাম। যা, ভাইয়াকে ডেকে আন। আমি ভাইয়ার সাথেই যাব।”
রিয়া বিজয়ী ভঙ্গিতে বলল,
“এই তো বুদ্ধির কথা! তুই বস, আমি পাঁচ মিনিটে আসছি।”
অহনা মাথা নাড়িয়ে হেসে বসে রইল।
রিয়া আর সময় নষ্ট না করে সোজা রুম থেকে বেরিয়ে রাজীবের রুমের দিকে হাঁটা দিল।
রাজীবের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার নক করল টক টক টক কোনো সাড়া নেই। আরও জোরে নক করল। তবুও নীরবতা। বিরক্ত হয়ে দরজার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল রিয়া।
রুমে ঢুকেই বলল,
“তোমাকে আর কতবার ডাকব ভাইয়া? এতবার নক করলাম, তাও দরজা খুললে না! ব্যাপারটা কী বলো তো?”
কথা বলতে বলতেই চোখ গেল বিছানার দিকে।
রাজীব এখনো গভীর ঘুমে। চাদর গায়ে দিয়ে একদম নিশ্চিন্তে পড়ে আছে। রিয়া এক প্রকার চমকে উঠল, তারপর রাগে বিড়বিড় করে বলল,
“এই বাঁদরটা দেখি এখনো ঘুমটাই ভাঙ্গে নাই। ”
সে বিছানার কাছে গিয়ে চাদরটা টান দিয়ে বলল,
“ভাইয়া, ওঠো! তাড়াতাড়ি ওঠো। তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।”
রাজীব ঘুমের ঘোরেই বিরক্ত মুখে চোখ কুঁচকে বলল,
“যা তো… পারব না। এখন কিছুই করতে পারব না।”
রিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে মনে মনে বলল,
“তোমাকে কিভাবে সোজা করতে হয়, তা আমি জানি ভাইয়া ”
তারপর আয়েসী ভঙ্গিতে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা, আমি তো তোমার সেটিং করাতে এসেছিলাম। তুমি তো নিজেই রাজি হচ্ছো না থাক, আমি বরং যাই।”
এই বলে ঘুরে দাঁড়াতেই,
“কিসের সেটিং? কার সেটিং?”
রিয়া দরজার দিকে এগোচ্ছিল, হঠাৎই রাজীবের কণ্ঠ শুনে থেমে গেল। সে পিছনে ঘুরে তাকাতেই দেখে রাজীব চট করে উঠে বসেছে। ঘুমের চিহ্ন চোখে থাকলেও কৌতূহলটা একদম স্পষ্ট।
রিয়া ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“অহনার। ওর আম্মু অসুস্থ, তাই ও বাসায় যাবে। তোকে বলছিলাম একটু ড্রপ করে দিতে।”
অহনার নামটা শুনতেই রাজীবের চোখেমুখে যেন
ঝিলিক খেলে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই তার আলস্য উধাও।
“আরে না না! আমার তো ঘুম ভেঙেই গেছে,” সে
তড়িঘড়ি করে বলল।
“আমি এখনই যাচ্ছি। তুই যা, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
রিয়া একটু অবাক হলো। অহনার কথা বললে রাজীব রাজি হবেই এটা জানা ছিল। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি, এত আগ্রহ নিয়ে উঠে পড়বে—তা সে ভাবেনি।মুখ টিপে হেসে বলল,
“আচ্ছা ভাইয়া, তাড়াতাড়ি আসো কিন্তু। এখনই যাবে।”
রাজীব মাথা নাড়িয়ে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে গেল। ওয়াশরুমে গিয়ে কোনো মতে ফ্রেশ হয়ে বের হলো। আলমারি খুলে তাড়াতাড়ি টি-শার্ট বদলে একটা সাদা রঙের শার্ট পরে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো হাত দিয়ে হালকা করে সেট করল। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল কেমন যেন আলাদা উচ্ছ্বাস কাজ করছে তার ভেতরে।
টেবিলের ওপর থেকে ফোন আর গাড়ির চাবি তুলে নিল। রুম থেকে বের হতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল।
কিছু একটা মনে পড়েছে যেন। আবার ঘুরে এসে ড্রয়ার খুলে একটা ছোট্ট বাক্স বের করল। বাক্সটার দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
বাক্সটা পকেটে রেখে দ্রুত বের হয়ে গেল রুম থেকে। রিয়ার রুমের দিকে এগোতেই পেছন থেকে রিয়ার কণ্ঠ,
“ভাইয়া, এখানে আসো! ও নিচে আছে।”
রাজীব মুচকি হেসে নিচে নামল। পুরো ড্রয়িংরুম ফাঁকা। ভোরের নরম আলো জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। বাড়ির অন্যরা এখনো ঘুমিয়ে।
রিয়া নিচে দাঁড়িয়ে রাজীবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাইয়া, ও বাইরে ওয়েট করছে। ঠিক মতো পৌঁছে দিও। আর আমি রুমে যাচ্ছি। শরীরটা ক্লান্ত লাগছে।”
রাজীব ভান করা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“তোর ভাইয়াকে কি তুই চোর না ডাকাত মনে করিস? আমি ওকে পৌঁছাতে দেবো না এমন কথা বলছিস কেন?”
রিয়া হেসে ফেলল।
“আচ্ছা আচ্ছা, রাগ করো না। যাও।”
আর কিছু না বলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল সে।
রাজীব দরজা পেরিয়ে বাইরে বের হলো। বাড়ির গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে অহনা। মাথা নিচু করে, দুই হাত জড়িয়ে চুপচাপ। ভোরের আলোয় তাকে কেমন যেন শান্ত, নরম লাগছে। রাজীব কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর এগিয়ে গিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“একটু ওয়েট করো, আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।”
অহনা শুধু মুচকি হেসে মাথা নাড়াল। কোনো কথা বলল না। রাজীবের বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা ধক করে উঠল। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সে গাড়ি আনতে এগিয়ে গেল।কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি নিয়ে হাজির হলো রাজীব। ড্রাইভিং সিটে বসে জানালার গ্লাস নামিয়ে ইশারায় অহনাকে ডাকল।
অহনা আর কথা বাড়াল না। ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। গাড়ির ব্যাক সিটের দরজা খুলে বসতে যাবে, ঠিক তখনই রাজীব একপ্রকার ধমক দিয়ে বলল,
“পেছনে না… সামনে এসে বসো।”
কণ্ঠটা খুব কড়া না হলেও স্পষ্ট। অহনা এক মুহূর্ত তার দিকে তাকাল। কিছু বলতে গিয়েও বলল না। চুপচাপ দরজা বন্ধ করে সামনে এসে ফ্রন্ট সিটে, রাজীবের পাশে বসে পড়ল।রাজীব হালকা মুচকি হেসে বলল,
“বাধ্য মেয়ের মতো কথা শুনতে পারো তাহলে?”
অহনা কোনো উত্তর দিল না। রাজীব ইঞ্জিন স্টার্ট করল। ধীরে ধীরে গাড়ি রওনা দিল। ভোরের ঢাকা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ব্যস্ততার শহরটা আজ অদ্ভুত শান্ত। রাস্তা দিয়ে দু-একটা গাড়ি যাচ্ছে। চারপাশে নরম রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। সকালের সেই হালকা আলোয় শহরটাকে অন্যরকম সুন্দর লাগছে। গাড়ির ভেতরে নিস্তব্ধতা।
অহনা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। চোখে চিন্তার ছায়া, তবু দৃশ্যটা যেন উপভোগও করছে।
রাজীব কয়েকবার চোরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
এভাবে চুপচাপ থাকাটা যেন তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে।
নীরবতা ভাঙতে গাড়ির রেডিওটা অন করে দিল সে। হালকা একটা পুরোনো গান ভেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বলল,
“অহনা, চা খাবে?”
অহনা চোখ না ঘুরিয়েই বলল,
“না আপনি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিন।”
রাজীব একটু থামল। তারপর গভীর স্বরে বলল,
“তুমি কি সত্যিই কিছু বোঝো না, অহনা?”
এবার অহনা মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল।
“মানে?”
রাজীব এক ঝলক তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটাও কি মানে করে বলতে হবে?”
অহনা বুঝে গেল কথার ইঙ্গিত। ঠোঁটে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল যেন স্বীকারও করছে, আবার এড়িয়েও যাচ্ছে। রাজীব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আবার রাস্তার দিকে মন দিল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর অহনা নিজেই বলল,
“জানেন আমি এসব প্রেম-ভালোবাসায় বিশ্বাস করি না।”
রাজীব চুপ। অহনা আবার বলল,
“কেন জানি না, এগুলো আমার ভালো লাগে না। তাই আমার কাছ থেকে ভালোবাসা আশা করা আপনার ভুল, রাজীব চৌধুরী।”
শেষ কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা।
রাজীব একবার তাকাল তার দিকে। চোখে কষ্টের ছায়া এলেও মুখে কিছু বলল না। গাড়ি চলতে থাকল। অহনা বিরক্ত হয়ে বলল,
“কিছু বললেন না যে?”
রাজীব কোনো উত্তর দিল না। শুধু স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে সামনে তাকিয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড তারপর হঠাৎ করে গাড়িটা সাইডে নিয়ে থামাল।
অহনা চমকে তাকাল তার দিকে।ভোরের নিরিবিলি রাস্তায় গাড়ি থেমে আছে।নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠল।গাড়ি থামতেই অহনা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এটা তো আমাদের বাড়ির রাস্তা না কোথায় নিয়ে এলেন আমাকে আপনি?”
রাজীব কোনো উত্তর দিল না। গানটা বন্ধ করে ধীরে দরজা খুলে নেমে গেল। গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,
“নেমে আসো।”
অহনাদের বুক ধকধক করতে লাগল।মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন কেন এখানে থামল? কী বলতে চায়? কিছু করবে না তো? তবুও নিজেকে সামলে দরজা খুলে নেমে দাঁড়াল। রাজীব সামনে এসে দাঁড়াল তার একদম কাছে।এতটা কাছে যে অহনা অস্বস্তিতে এক পা পেছাতে চাইলো।
ঠিক তখনই রাজীব তার হাতটা ধরে ফেলল।
“কি করছেন আপনি?”
বিরক্ত আর নার্ভাস কণ্ঠে বলল অহনা।রাজীবের কণ্ঠ শক্ত, অথচ কাঁপা,
“তুমি প্রেম-ভালোবাসা পছন্দ করো না… তাই না?”
এক সেকেন্ড থেমে গভীর শ্বাস নিল সে।
“কিন্তু আমি তোমার সাথে প্রেম করতে চাই না, অহনা। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। আই লাভ ইউ।”
অহনাদের চোখ বড় হয়ে গেল।রাজীব বলেই চলল,
“আমি তোমাকে চাই খুব করে চাই। প্রেমিকা হিসেবে না বউ হিসেবে। নিজের করে চাই।”
অহনা যেন জমে গেল জায়গাতেই।এতদিনের না-বলা অনুভূতিগুলো হঠাৎ করেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রাজীব ধীরে তার হাত ছেড়ে দুই গালে হাত রাখল।
“যেদিন বড় হওয়ার পর প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম, সেদিনই ভেবেছিলাম তোমাকেই বিয়ে করবো। না হলে কাউকে না। কখনো তোমাকে প্রেমিকা হিসেবে ভাবিনি সবসময় ভেবেছি আমার বাড়ির বউ হবে।”
তার চোখে পানি জমে উঠেছে।
“বউ হবে আমার? প্রমিস করছি, কখনো কষ্ট দেবো না। আগলে রাখবো শুধু আমার হয়ে যাও।”
অহনা বরফের মতো দাঁড়িয়ে। রাজীবের প্রতিটা শব্দ মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজীব এক হাত তার গালে রেখে আরেক হাতে তার হাত ধরে বলল,
“তুমিই আমার প্রথম আর তুমিই শেষ ভালোবাসা। এত মেয়ের মাঝে শুধু তোমাকেই পছন্দ হয়েছে। প্লিজ না বলো না। খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে নিজের বউ করে আনবো।”
এরপর হঠাৎ করেই রাজীব হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
পকেট থেকে ছোট্ট একটা বাক্স বের করে খুলল।
ভেতর থেকে ঝলমলে একটা হীরার আংটি বের হলো। অহনাদের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
মনে হলো পৃথিবীটা ঘুরছে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও যেন কমে যাচ্ছে। তবুও কষ্ট করে নিজেকে সামলে দাঁড়িয়ে রইল। রাজীব আংটিটা হাতে তুলে বলল,
“বউ হবে আমার? প্রেমিকা না বউ হিসেবে চাই তোমাকে। সারা জীবন নিজের করে রাখবো। আজ যদি না বলো অহনা তাহলে আমার ভালোবাসা অপূর্ণ থেকে যাবে। তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসতে পারবো না। মায়ের পর তুমি-ই আমার জীবনের প্রথম আর শেষ নারী।”
অহনাদের চোখ ভিজে উঠল। কাঁপা হাতে নিজের চোখের জল মুছে ধীরে বলল,
“বিশ্বাস করুন আপনাকে আমি ভালোবাসি।”
রাজীব থমকে গেল।অহনা আবার বলল,
“কিভাবে যে এই টানাপোড়েনের মাঝে আপনাকে ভালোবেসে ফেললাম আমিও জানি না। আপনার সাথে ছোট ছোট ঝগড়া, খুনসুটি সবকিছুর ভেতরেই হয়তো ভালোবাসাটা জন্ম নিয়েছে। কিন্তু বলতে ভয় পেয়েছি।”
কণ্ঠ ভেঙে আসছে তার।
“ভালোবাসা সবসময় পূর্ণতা পায় না। আর মেয়েরা আগে বললে সেটা অভদ্রতা বলে। তাই সাহস করিনি। কিন্তু ”
সে এক মুহূর্ত থামল।
“আমার দ্বারা এভাবে ভালোবাসা সম্ভব না এতটা স্বপ্ন দেখানোর সাহস আমার নেই।”
ভোরের নরম আলোয় দু’জন দাঁড়িয়ে,
একজন হাঁটু গেড়ে, আংটি হাতে আরেকজন চোখে জল নিয়ে, ভালোবাসা স্বীকার করেও দ্বিধায় কাঁপছে। অহনার উত্তরের অপেক্ষা না করেই রাজীব ধীরে তার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল।
কাঁপা আঙুলে আংটিটা পরিয়ে দিল।
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত দিয়ে অহনার হাত দুটো ধরে বলল,
“পরীক্ষাটা শেষ করো। তারপর তোমার আর আমার বিয়ে ফাইনাল। ভাইয়া যখন বিয়ে করবে করবে কিন্তু আমি তোমাকে নিজের বউয়ের রূপে দেখতে চাই। আর সেটা খুব তাড়াতাড়িই হবে।”
অহনা কিছু বলতে যাচ্ছিল,ঠিক তখনই রাজীবের ফোন বেজে উঠল। রাজীব বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে ফোন বের করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে রিয়া কলিং একটু বিরক্ত মুখেই রিসিভ করল সে।
কিন্তু রাজীব কিছু বলার আগেই রিয়া এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল,
“ভালো হবি না নাকি তুই? কখন থেকে অহনাকে নিয়ে বের হয়েছিস? ওর আম্মু আমাকে বারবার কল দিচ্ছে! আমি কী বলব এখন? আর কিছু শুনতে চাই না তুই তাড়াতাড়ি করে ওকে পৌঁছে দে, ভাইয়া!”
এই বলে ফোন কেটে দিল। রাজীব কিছুক্ষণ ফোন হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে রইল। মুখে হতভম্ব ভাব।
অহনা কপাল কুঁচকে বলল,
“কি হয়েছে? রিয়া কি বলল?”
রাজীবের ধ্যান ভাঙল। সে হালকা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“তেমন কিছু না তুমি গাড়িতে গিয়ে বসো। আমার শাশুড়ি আম্মু নাকি তোমার জন্য চিন্তা করছে। রিয়াকে অনেকবার কল দিয়েছে।”
‘শাশুড়ি আম্মু’ শব্দটা শুনে অহনার ঠোঁটে অজান্তেই হালকা হাসি ফুটে উঠল। কিছু না বলে সে সোজা গাড়িতে গিয়ে বসে পড়ল। রাজীবও আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট করল।গাড়িটা ঘুরিয়ে এবার সত্যিই অহনার বাড়ির দিকে রওনা দিল। গাড়ির ভেতরে আবার নীরবতা।কিন্তু এবার সেই নীরবতা আগের মতো না অহনাদের হাতে ঝলমল করছে আংটি।
আর দু’জনের বুকের ভেতর একসাথে ধুকপুক করছে নতুন একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
এদিকে পড়তে পড়তেই হঠাৎ নিশিতার চোখ চলে গেল দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে। ৭টা ৩০। সময়টা দেখে সে একটু চমকাল। এতক্ষণ ধরে একটানা পড়ছে! ঠিক তখনই পেটের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। ক্ষুধাটা হঠাৎ করেই তীব্র হয়ে উঠেছে। আর বসে থাকা সম্ভব হলো না তার পক্ষে। বইটা বন্ধ করে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল নিশিতা। রুম থেকে বের হয়ে চারদিকে তাকাল। বাড়িটা এখনো অদ্ভুত চুপচাপ। কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি বুঝাই যাচ্ছে।
কিছু না ভেবে সে ধীরে ধীরে ফারিসের রুমের দিকে এগোল। দরজাটা হালকা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিল।
ফারিস এখনো গভীর ঘুমে। চাদর গায়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। নিশিতা ভেতরে ঢুকল না। বাইরে দাঁড়িয়েই বিড়বিড় করে বলল,
“নবাবজাদার তো দেখি এখনো ঘুমই ভাঙেনি আর এদিকে আমার খিদে পেয়েছে!”
ঠোঁট বাঁকিয়ে দরজাটা আবার আস্তে করে বন্ধ করে দিল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। বাড়ির মেটরা এখনো আসেনি। রান্নাঘর ফাঁকা। অগত্যা নিজেকেই কিছু একটা বানাতে হবে। রান্নাঘরে ঢুকে খুব বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হলো না তাকে। ক্যাবিনেটের ওপরেই কয়েকটা ব্রেডের প্যাকেট রাখা। সেখান থেকে দুটো ব্রেড বের করে টোস্টারে ঢুকিয়ে দিল।
টোস্ট হওয়ার অপেক্ষায় চারদিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ তার চোখে পড়ল যেটা সে খুঁজছিল।
জ্যামের বোয়াম।
একগাল হেসে সেটা হাতে তুলে নিল। এদিকে টোস্টার থেকে পপ করে ব্রেড দুটো উঠে এলো। সাবধানে তুলে প্লেটে রাখল নিশিতা। একটা চামচ দিয়ে উদারভাবে জ্যাম মাখাতে লাগল। ব্রেড দুটো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে রান্নায় খুব একটা অভিজ্ঞতা নেই তার। কোথাও বেশি পুড়ে গেছে, কোথাও কম সেঁকা। জ্যামও অসমানভাবে লেগেছে। তবুও সেসব পাত্তা দিল না।
প্লেটটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে আবার উপরে উঠে গেল। নিজের রুমে গিয়ে চেয়ার টেনে বসল। এক হাতে ব্রেড, অন্য হাতে বই।এক কামড় ব্রেড খেতে খেতেই আবার পড়া শুরু করল সে।বাইরে সকালটা ধীরে ধীরে ব্যস্ত হয়ে উঠছে আর ভেতরে নিশিতা নিজের ভবিষ্যৎটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বাড়িতে হালকা আলো ঢুকতে শুরু করেছে। সবার ঘুম ভেঙেছে। ফারিস ঘুম থেকে উঠে বেডে তাকাল।
নিশিতা পাশে নেই। হালকা মুচকি হাসি মুখে ফুটল।
“লজ্জা পেয়েছ নাকি, বউ?”
মনে মনে বলল। কিছুক্ষণ নিজের ভেতরের হাসিটা ধরে রাখার চেষ্টা করল। তারপর চোখ পড়ল ঘড়িতে। কাটা ১০টা ছুঁই ছুঁই। ফারিস আর দেরি করল না। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
টাওয়াল হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোতে লাগল। ওয়াশরুমে গিয়ে নরম পানির ঝাপটায় শরীরটা ফ্রেশ করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হয়ে এলো। টাওয়াল জড়িয়ে বের হওয়ার সময় তার জিম করা পেশিগুলো চোখে পড়ল দৃশ্যটা নিজের মতোই আকর্ষণীয়।ক্লোজেট থেকে কালো শার্ট আর প্যান্ট বের করে পরল। ফর্মাল লুকে রেডি হয়ে গেল। হাতের ফোনে একবার সময় চেক করল।
আজকের দিনটা ফারিসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজ NS গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির বড় একটা ডিল সাইন হওয়ার কথা। এমন গুরুত্বপূর্ণ ডিল নিয়ে ফারিস একটু চিন্তিত, কিন্তু আত্মবিশ্বাসও ছিল তার চোখে। সোফায় গিয়ে বসল।
টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপ খুলল। ভিডিও কনফারেন্সের জন্য মিটিং শুরু হওয়ার অপেক্ষা। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্ক্রিনে কল কনফারেন্স লাইভ হলো। ফারিস তাদের ভিন্ন ভিন্ন ডকুমেন্ট, টেন্ডার, প্রেজেন্টেশনের বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করতে লাগল। তার দৃষ্টিতে প্রফেশনাল দিকটা স্পষ্ট কোনো সন্দেহ, কোনো দেরি নয়, কেবল ফোকাস আর নিখুঁত প্রস্তুতি।মিটিংয়ের মাঝেই ফারিস বুঝতে পারছিল আজকের দিন তার জন্য শুধুই সফল হওয়ার দিন।
এদিকে বাড়ির গিন্নিরা সবাই রান্নাঘরে ব্যস্ত, আর মেইডরা টেবিল সাজাচ্ছেন। বাড়ির কর্তা এসে সোফায় বসলেন। নাস্তার পর অফিসে যাবার প্রস্তুতি চলছে।কিন্তু আরাফাত চৌধুরীর মুখটা মলিন।কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত নতুন কোনো ঝড়, নাকি তার মনের কোনো ধারণা?চিন্তার দোলায় দুলতে দুলতে হঠাৎ চেনা এক কণ্ঠ ভেসে এলো পেছন থেকে,
“কেমন আছেন, আরাফাত চৌধুরী?”
কণ্ঠ স্বরটা চেনা চেনা। পিছন ফিরে তাকালেই দেখা গেলআরাফাত চৌধুরীর ভয় যে সত্যি হয়েছে, সেটাই হলো। আরিশ। আর তার সঙ্গে এসেছে আরিশা। চৌধুরী বাড়িতে এলো এভাবে হঠাৎ। এবার কি হবে? ফারিস যদি দেখল তাহলে আজকের পরিকল্পনা শেষ হয়ে যাবে।
এই ভেবে আরাফাত চৌধুরীর বুক কেঁপে উঠল।
রান্নাঘর থেকে আফিয়া চৌধুরী ও আমেনা চৌধুরী বেরিয়ে এলেন। আরিশা আর তার বাবাকে দেখেই বোঝা গেল, তাঁরা একদমই খুশি নন। আফিয়া চৌধুরী রেগে চোখ ভরা তাকিয়ে থাকলেন আরিশার দিকে। আরিশার লুকও বেশ ঝামেলাময় টাইট ফিটিং জিন্স আর সাথে টাইট ফিটিং টি-শার্ট।একদমই সহ্য করা যায় না এই বাড়ির গিন্নিদের।আমেনা চৌধুরী আফিয়ার কানে ঝোপট করে ফিসফিস করল,
“ভালোই হলো ভাবি। ফারিসের সাথে এমন মেয়ের বিয়ে হলে আমাদের মানসম্মান মাটিতে মিশে যেত। আরিশার মতো বউ থাকলে ।”
আফিয়া কিছু বললেন না। শুধু বিরক্তিভরে তাকিয়ে আছেন আরিশার দিকে।আরাফাত চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
“আপনারা এখানে কি করছেন, এখন?”
আরিশা নির্বিকারভাবে হেসে বললেন,
“সে কি? মিস্টার চৌধুরী, আপনাকে তো কালই
ফোন দিয়েছিলাম আমরা আসব। আর কেন এসেছি, সেটা তো ভালোই জানেন।”
বলেই সোফায় বসে পড়লেন। আরিশা পাশে এগিয়ে দাঁড়ালেন। আরাফাত চৌধুরী বিরক্ত হয়ে শ্বাস ফেললেন,
“দেখুন, এই মুহূর্তে আমি কিছু বলতে পারব না। আমি আমার ছেলের বিরুদ্ধে যেতে পারবো না।
আর আমার ছেলে যথেষ্ট এডাল্ট। তাই আমি তার উপর আমার সিদ্ধান্ত চাপাতে পারব না।”
মিজান চৌধুরী হালকা হেসে বললেন,
“রাজি নয়? রাজি করানো ছাড়া আমার মেয়ে আপনার ছেলেকে ছাড়বে না। আমার মেয়ে যা চেয়েছে, তা কখনো পাইনি। ফারিসকে তাকে ভালোবাসতেই হবে মানে, বাসতেই হবে।”
আরাফাত চৌধুরী কিছু বলতে যেতেন তখনই ফারিস ফোন স্ক্রল করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। ফারিস এখনও এই বিষয়ে একদম অজানা যে নিচে আরিশা ও তার বাবা এসেছে।সে একধারে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল, এক হাত স্ক্রল করতে করতে। ড্রয়িং রুমের দিকে এগোতেই সবাই তাকালো ফারিসের উপস্থিতি ঘরে।ফারিস এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়ালো।
তার চোখ পড়ল আরিশা ও তার বাবার দিকে।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৫
সেই ঠান্ডা মেজাজটা হঠাৎই ভেঙে পড়ল। কিন্তু আর কিছু বলার আগেই আরিশা হঠাৎ করেই ঝাপিয়ে পড়ল ফারিসের দিকে। এক ঝটকায় ফারিসকে জড়িয়ে ধরল। ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল।
কেউই এমন দৃশ্যের আশা করেনি। চোখ বড় হয়ে গেল, মুখে বিস্ময়ের ছাপ। এই মুহূর্তে নিশিতা পড়াশোনা শেষ করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল। ফারিস ও আরিশাকে এভাবে একত্রে দেখে নিশিতার চোখকে বিশ্বাস করা যাচ্ছিল না।হৃদয় ধুকপুক করছে।নিশিতা নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করলেও শ্বাস কেঁপে উঠছে। দ্রুত নিজের কণ্ঠ ও কান্না দমিয়ে রাখতে না পেরে নিশিতা চুপচাপ উপরে ফিরে গেল।কেউ টেরও পেলো না নিশিতা কখন উপস্হিতি থেকে চলে গেল।কেবল একটা নীরবতা রয়ে গেল, যা ড্রয়িং রুমের সবাইকে আরও অদ্ভুত ভাবিয়ে তুলল।
