চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩+৪
আয়াত বিনতে নূর
সকালটা যেনো কারো মন খারাপের রঙে রঙিন।
আকাশে রোদ আছে, তবুও নিশির পৃথিবীটা অন্ধকার। কলেজের বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসে আছে সে।
কলেজের মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখের দৃষ্টি যেনো কোথাও নেই…তার মুখে ক্লান্তি, চোখে রাতের লুকানো কান্না, আর মনের মধ্যে অনুতপ্ত ভালোবাসা।
অহনার প্রশ্ন, নিশির নীরবতা
অহনা পাশে বসেই তাকিয়ে থাকে নিশির দিকে।
তার চোখের নীরবতা সে স্পষ্ট বুঝতে পারে।
এত আপন বন্ধু, তবু কথায় প্রকাশ করতে পারছে না অনুভূতি…
— “কী হয়েছে, বল না?”
নিশি চোখ নামিয়ে বলে না।
তার ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু শব্দ বের হয় না।
অহনা বিরক্ত ভান করে বলে—
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
— “দেখ নিশি, যদি বলবি না, আমি কিন্তু রাগ করবো… রাগ করলেও কিন্তু তোকে জড়িয়ে ধরেই কান্না থামাবো!”
এ কথা শুনে নিশি হালকা হেসে ফেলে।
ঠিক হাসি নয়, বরং বুকের ব্যথা ঢাকার চেষ্টা।
অহনা তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর শান্ত গলায় বলে—
— “ফারিস ভাই কিছু বলেছে? আজকে তোকে এমন লাগছে কেনো?”
নিশি কিছু না বলে জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে—
— “ভালোবাসি বলেছিলাম… তবে শাস্তি পেয়েছি।”
অহনা চমকে ওঠে।
— “কি?! বলেছিস?? সামনাসামনি??”
নিশি মাথা নেড়ে হালকা ভেঙে যাওয়া হাসি দিয়ে বলে—
— “আর সে… আমাকে ১৫টা থাপ্পড় দিয়েছে।”
অহনার মুখ জমে যায়, চোখ বড় হয়ে ওঠে—
— “কি বললি?! থাপ্পড় আবার ১৫ টা??”
নিশি নিজের হাতের আঙুল শক্ত করে চেপে ধরে…
— “হ্যাঁ… তারপর বলেছে, সে আমাকে কখনও ভালোবাসবে না। আমার মতো মেয়েকে নাকি ভালোবাসবে না।”
অহনার চোখে পানি চলে আসে রাগে, কষ্টে—
— “সে কি মানুষ নাকি পাথর? তুই কি কখনো কোনো অপরাধ করেছিস?”
নিশি মাথা নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলে—
— “হ্যাঁ… আমি অপরাধ করেছি—”আমি ওনাকে ভালোবেসেছি।”হ্যাঁ এইটাই আমার অপরাধ।”আমি আর পারছিনা অহনা,
আর না।
কথাটা শুনে অহনা নিশির হাত ধরে বলে—
— “ভালোবাসা কখনো অপরাধ না। অপরাধ করলে সে করেছে, তুই নয়।”
নিশি তবুও শান্ত…
সে তর্ক চায় না… রাগ নেই…
কারণ ভালোবাসা কখনো রাগ শেখায় না, কেবল কষ্ট সহ্য করতে শেখায়।।”
সে দুঃখ নিয়ে তাকিয়ে বলে—
— “তুই জানিস অহনা… আমি ওনাকে কখনো চাই নি। শুধু পছন্দ করেছি। আমি জানি না কবে ভালোবেসে ফেলেছি। হয়তো ওনার একটুখানি তাকানোই আমাকে বন্দী করেছে।”
অহনা তাকিয়ে থাকে।
নিশির চোখে কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু আছে একটা হারিয়ে যাওয়ার ভীতি।
তাদের ক্লাস শুরু হয়, ক্লাসে শিক্ষক প্রবেশ করেন।
সবাই বই-খাতা তৈরি করে। অহনা পড়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু নিশি…
সে খাতা খোলে, কিন্তু পাতা ঝাপসা—
শব্দগুলো মিলিয়ে যায়, বর্ণেরা অচেনা হয়ে ওঠে।
বোর্ডে স্যার সমীকরণ লিখছে, কিন্তু নিশির মন মনে মনে সমাধান করছে—
সে কি সত্যিই কাউকে ভালোবাসে? নাকি আমি আমার ভাবটা ভুল ?
তার বুকের ভেতর প্রশ্নের জট বাঁধে—
ফারিস কি কাউকে ভালোবাসে?
ফারিশ ভাই কি আমাকে অপমান করলো কারণ তার জীবনে কেউ আছে?
নিশি উত্তর খুঁজে পায় না।
একসময় হঠাৎ স্যারের গলা—
— “নিশিতা! বোর্ডে এসে সমীকরণটা করে দাও।”
নিশি চমকে ওঠে।
সে মনের জট থেকে বাস্তবে ফিরে আসে।
বোর্ডে যায়।
খুব সুন্দরভাবে সমাধান করে ফেলে।
স্যার প্রশংসা করেন।
ক্লাসের সবাই তাকিয়ে দেখে—
অহনা মুচকি হাসে—
— “আলহামদুলিল্লাহ, তোর কোনো তুলনা হয় না জান ।”এই প্রশংসায় মন ভালো হওয়ার কথা…
কিন্তু নিশির চোখে সুখ নেই।
কারণ যার জন্য এত ভালো হতে চায়, সে তো তাকে মানুষ হিসেবেও মানে না।
বিরতির সময়, অপ্রত্যাশিত ফোন
বিরতির সময় রিয়ার ফোন আসে।
রিয়া হাসছে, চঞ্চল গলায় বলছে—
— “এখনো কলেজে? মজার খবর আছে নিশি!”
নিশি ক্লান্ত কণ্ঠে—
— “কি খবর?”
রিয়া উত্তেজিত—
— “আমাদের বাসায় আজ নতুন একজন আসছে। চিনতে পারলে অবাক হয়ে যাবে!”
নিশি কিছু বুঝতে না পেরে বলে—
— “কে আসে?”
রিয়া ফিসফিসিয়ে—
— “ফারিস ভাইয়ের শৈশবে ভাইয়ার ফ্রেন্ড মানে, তার বাগদত্তা বাংলাদেশে এসেছে!”
নিশি যেনো কিছু শুনতে পেল না।
বিশ্বটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
শব্দগুলো তার কানে বীজের মতো পড়ে—
বাগদত্তা… বাগদত্তা… বাগদত্তা…
অহনা চমকে নিশির মুখের অবস্থা দেখে ফোন কানে নেয়—
— “কি?! কার বাগদত্তা?”
রিয়া খুশি গলায়—
— “আমাদের ফারিস ভাইয়ের! তার ছোটবেলার ফ্রেন্ড আমাদেত আরিশা আপুকে ভুলে গেছিস।”
যার সাথে আব্বু ফারিস ভাইয়ার বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলো?
ফোন কেটে যায়।
অহনা স্থির হয়ে বসে থাকে।
নিশির মুখে কোনো ভাষা নেই।
তার ঠোঁট শুকনো, চোখের ভেতর পানি জমে উঠছে…
সে কাপা কাপা গলায় খুব ধীরে বলে—
— “আমি ফারিস ভাইকে হারিয়ে ফেলেছি?… আমি তো কখনো তার ছিলামই না।” তাইতো বলি কেন আমাকে রিজেক্ট করলো। আ আ আমি পাগল তাইই না। সে অন্যকাউকে ভালোবাসে আর আমিই??
বেল বাজে।ক্লাস শেষ।
নিশি উঠে দাঁড়ায়। দেখতে শান্ত।
কিন্তু ভেতরটা টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।
অহনা তাকে জড়িয়ে ধরে বলে—
— “তুই কাঁদতে পারিস। কষ্ট লুকিয়ে রাখা ভালো না।”প্লিজ কাদঁ জান প্লিজ।
নিশি দুর্বল হেসে বলে—
— “কান্না তো তখনই হয়, যখন আশা ভাঙে। আমি কখনো আশা করিনি… তাই কান্না করবো না। শুধু… ব্যাথা পাবো।” তার মুখে আর অশ্রু নেই।
কিন্তু ভালোবাসা যখন মরতে থাকে, চোখ শুকনো থাকে… অথচ হৃদয় রক্ত ঝরায়।
ঠিক তখনি রিয়া আসে আর নিশি, অহনা চুপ হয়ে যায়।
ড্রাইভার নিয়ে ফিরছে ওরা তিনজন— নিশি,রিয়া, তনয়া।
রিয়া খুশি—
— “ভাবী খুব সুন্দর নাকি!”
তনয়া হাসে—
— “উনি বিদেশে বড় হয়েছে। দেখতে ও স্মার্ট তো হবেই তাই না?।”
নিশি জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার হৃদয়ে একটা প্রার্থনা—
“আল্লাহ, আমাকে শক্তি দাও… আমি যেনো আমার অনুভূতি, আবেগ ধরে রাখতে পারি।”
ঘরে প্রবেশের সাথে সাথে চারদিকে সাজ সাজ রব।
লাইট, ফুল, খাবারের আয়োজন।
নিশি দরজায় দাঁড়িয়ে, মানুষের ভিড়ের মধ্যে তাকায়…
ঠিক তখন—
দরজা দিয়ে প্রবেশ করে একটি মেয়ে।
সাদা রঙের গাউন, খোলা চুল, মুখে হালকা হাসি, হাতে ব্যাগ…
আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী।
আজ সে অন্যরকম।
কোনো রাগ নেই, কোনো কড়াকড়ি নেই।
তার চোখে শান্তি, তার কণ্ঠে কোমলতা।
কিন্তু তার মুখে সেই স্বাভাবিক গম্ভীর ভাব—যা কেউই ঠিক বুঝতে পারে না।ফারিস গম্ভীর মুখে বলে—
— “Welcome home, Arisha.”
মেয়েটি মিষ্টি গলায়—
— “Thank you… Faris.”
সবাই হাততালি দেয়।
উল্লাস, হাসি…
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিশি বুঝতে পারে তার ভালোবাসা আজ সত্যিই চোখের আড়ালে।
দূরে দাঁড়িয়ে, খুব ধীরে সে শুধু বলে—
— “তাহলে এইটাই হলো আমাকে রিজেক্ট করার মেইন কারন, তাই না?”আর আমি আপনার যোগ্য না?
তার চোখে পানি ঝরে না…
শুধু হৃদয়টাই ভেঙে যায়।
ঘরে অদ্ভুত উত্তেজনা ভেসে আছে। নিশি দূর থেকে ফারিস আর আরিশাকে দেখছে। আরিশা ফারিসের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত, মাঝে মাঝে তার হাত ফারিসের বাহুতে রাখছে। তারপর হালকা নেকাভাবে বলে—
“ফারিস, তুমি কখন থেকে ফোনে ক্রল করছো? আমি একাই কথা বলছি, তুমি তো কিছুই বলছ না।”
ফারিস চুপচাপ ফোনে ক্রল করতে থাকে, আর কথাগুলো উপেক্ষা করে।
নিশির চোখ ভেঙে যায়।
এত কাছাকাছি ফারিস আর আরিশা, আর সে আর কোনো অংশ হতে পারছে না।
সে কান্না করতে চায় না, তবুও চোখের পানি বাধ মানছে না। টপটপ করে
নোনা জল কাঁপানো গালে পড়ে।
সহ্য করতে না পেরে নিশি দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উপরে তার রুমে চলে যায়। দরজা আটকিয়ে দেয়, নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
এরই মধ্যে রিয়া আরিশার কাছে আসে।
“ভাবি, তোমাকে তো খুব সুন্দর লাগছে।”
আরিশা হালকা নেকাভাবে ধন্যবাদ জানায়।
রিয়া হাসিমুখে যোগ করে—
“আমার সাথে পরিচিত হলে, তবে তোমার আরও দুটো ননদ আছে।”
ফারিস এই কথার মাঝেই ফোন ক্রল বন্ধ করে দেয়। মনে হয়, কিছু একটা ভাবলো। তারপর অন্য দিকে চলে যায়। আরিশা সঙ্গে সঙ্গে বলে—
“হুয়াই নট!”
রিয়া তনয়াকে ডেকে আনে।
আরিশা হাত বাড়িয়ে দেয় হ্যান্ডশেক করার জন্য। তানিয়াও খুশি হয়ে হাত বাড়ায়।
দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তা শুরু হয়।
কিন্তু হঠাৎ রিয়া বলে—
“তোমার কিন্তু আরও একটা ননদ আছে ভাবি… নিশি কোথায়? তোমার সঙ্গে পরিচয় হয়নি।”
তানিয়া বলল—
“আমি খুঁজে নিয়ে আসছি নিশিকে।”
এভাবেই আলোচনা চলতে থাকে,
সবাই ব্যস্ত হয়ে যায়।
হঠাৎ ঘরে আরাফাত চৌধুরী ঘোষণা করেন—
“আজ আমার বড় ছেলে ফারিস ও আরিশার engagement।”
সকলেই আনন্দে হাততালি দেয়।
কিন্তু ফারিস হঠাৎ রেগে গিয়ে
পাশে থাকা টেবিল উল্টে দেয়।
তার চোখে আগুন ঝরে, মুখে হিংস্রা।
“আমি আরিশাকে বিয়ে করতে পারব না! আরিশা… একেবারেই নয়!”
আমাকে না জানিয়ে আমার এনগেজমেন্টের আয়োজন করে ফেলেছেন?কেন কেন কেন?
“হুয়াই”
—জোরে চিৎকার করে সে।
আরিশার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়, চোখে পানি জমে।
রেগে গিয়ে সে ব্ল্যাক কোর্ট খুলে ছুড়ে ফেলে। আজকে সে ফর্মাল ড্রেসে মারাত্মক সুন্দর লাগছিল।ফারিস চুপচাপ বাইরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। চোখে চোয়াল শক্ত, চোখে হিংস্রা।
আলতাফ চৌধুরী এগিয়ে এসে বলে—
“ফারিস, তুমি এটা করতে পারো না। এত লোকের সামনে আরিশা আর তার ফ্যামিলিকে অপমান করতে পারো না।”
পিছন থেকে আরাফাত চৌধুরী এসে বলেন—
“আজকে তোমাকে আরিশার সঙ্গে engagement করতে হবে। মেয়েটা ছোট থেকেই তোমাকে ভালোবাসে। এই দিন দেখার জন্যই তোমাকে আমি জন্ম দিয়েছি।” তুমি এতটা অবাধ্য কি করে হরে পারো ফারিস ।”
ফারিস রাগে চিৎকার করে—
“আই ডোন্ট কেয়ার, আব্বু! তোমরা কি একবারও আমাকে বলছো ? আমি আরিশাকে কেবল ফ্রেন্ড মনে করি, নাথিং ইলস!” আমি ওকে বিয়ে করতে পারব না।
এই বলে সে গটগট পায়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
আরাফাত চৌধুরী আর কিছু বলেন না। সবাই চুপচাপ তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
আরিশার বাবা চিৎকার করে বলেন—
“আমরা কি এখানে মজা দেখতে এসেছি? আমাদের অপমান করার জন্য ডাকা হয়েছে?”এই বিয়ে ফারিস কি ক্যান্সেল করবে আমি নিজেই ক্যান্সেল করছি।
এই বলে তারা চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে যায়।আরিশা কে টানতে টানতে।
এইদিকে নিশি নিজের রুমে এসে কান্না করতে করতে ওয়াশরুমে চলে যায়। দরজা আটকিয়ে সাওয়ার চালিয়ে দেয়। বারবার কণ্ঠে বলে—
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১+২
“কেনো, ফারিস ভাই? আমার সাথে কেনো এটা করলেন? আমি সবটা দিয়ে আপনাকে ভালোবেসেছি… আমার দোষটা কোথায়? আপনাকে ভালোবাসাটাই কি দোষ? আমাকে সত্যি ভালোবাসা যায় না? কেনো এতো কষ্ট দিলেন আমাকে?”
প্রায় এক ঘণ্টা সাওয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে কান্না করার পর নিশি রুমে ফিরে আসে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, চোখ লাল, মুখ ফ্যাকাসে। চুপচাপ বিছানায় বসে পড়ে।………..
