Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১০

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১০

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১০
আরোবা চৌধুরী আরু

সকালটা যেন স্বপ্নের মতো নেমে আসে।
চোখ মেলে তাকালেই দেখা যায়,ো। সূর্যটা এখনও পুরোপুরি ওঠেনি, লাজুক মুখে আলোর রেখা ছড়িয়ে দিয়েছে জানালার গ্লাসে। খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাতাসের নরম ছোঁয়া লাগে গাল ছুঁয়ে, কোনো মায়ের মমতা যেন।
পাখিরা দল বেঁধে ডেকে চলেছে। দূর থেকে মসজিদের মাইকে ভেসে আসে ফজরের আজান, আল্লাহু আকবর…আল্লাহু আকবর…

শহরের কোলাহল তখনও ঘুমিয়ে আছে। চারদিকে এক অদ্ভুত শান্তিময় নিরবতা।
ঘরের কোণে একটা পাতলা লাল চাদর গায়ে দিয়ে বসে আছে নাফিসা। চোখ তার খোলা, কিন্তু মন দূরে কোথাও হারিয়ে আছে। জানালার গায়ে ঠেস দিয়ে বসে আকাশ দেখছিল সে অনেকক্ষণ ধরেই। ঘুম থেকে ঠিক কখন জেগেছে, মনেও নেই।
আসলে ঘুমটাই বা কই?
অলস ভোর কাটিয়ে সে উঠে পড়ে চুপচাপ।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

৷ পায়ের আওয়াজ না তুলেই চলে যায় বাথরুমে। মুখে পানি দেয়, ওযু করে। ঠাণ্ডা পানির ছোঁয়ায় শরীর যেন এক লহমায় চনমনে হয়ে ওঠে। কাঁপতে কাঁপতে নামাজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়।
জায়নামাজে সিজদায় মাথা রেখে সে খুব ধীরে বলে ওঠে,
“হে আল্লাহ, তুমি আমার শুরু হও। সারাজীবন তোমারই পথ ধরি, আমায় শক্তি দিও, সহ্য দিও, আলো দিও…”
প্রার্থনার শেষ সুর মিলিয়ে যায় হাওয়ার মাঝে।
সেই হাওয়ায় যেন সত্যিই সাড়া মেলে।
মনটা তার হালকা হয়, শরীরটাও এক ধরনের আত্মবিশ্বাসে ভরে ওঠে।
নামাজ শেষে সে বিছানায় বসে, আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকে চুপচাপ। আয়নায় প্রতিফলিত নিজের চোখে ক্লান্তি, অভিমান আর একটা অদ্ভুত আলো।

নাফিসা আয়নার দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে ছিল। এমন সময় দরজায় একটুখানি কড়া নাড়ার শব্দ।
টকটকে লাল রঙের শালটা গায়ে টেনে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সে।
“ভিতরে আসুন।” কণ্ঠস্বর তার হালকা কাঁপা।
দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল বাড়ির একজন গৃহকর্মী মেয়ে, বয়স বেশি না, হয়তো আঠারো উনিশ হবে।
হাতে একটা শপিং ব্যাগ ধরে রেখেছে সে। ব্যাগটা আগিয়ে দিয়ে বলল,
“এইটা আপনাকে দিতে বলেছেন সায়মান স্যার, ম্যাম।”
নাফিসা চোখ কুঁচকে তাকাল তার দিকে,আস্তে আস্তে নরম সুরে জিজ্ঞেস করে।
“কি আছে এতে? কে পাঠিয়েছে?”
মেয়েটি মাথা নত করে শান্ত গলায় বলল,

“আমি জানি না ম্যাম। শুধু দিতে বলেছেন আপনাকে। আর বলেছেন আপনি যেন আটটার মধ্যে রেডি হয়ে নিচে নামেন।”
বলতে বলতেই ব্যাগটা তার হাতে ধরিয়ে দিল।
“আরো বলেছেন, আপনার যদি চা-কফি বা অন্য কিছু দরকার হয়, আপনি আমাকে জানাবেন। দরজা বন্ধ করে দিন, আপনি নক দিলেই আমি চলে আসবো।”
মেয়েটার কথায় একটু থমকে গেল নাফিসা। ওর ব্যবহারটা এতটা কাঠখোট্টা না, ।
তবু হাসি মুখে বলল সে,

“আপু, আপনি তো আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়, আমি আপনাকে আপু বলে ডাকবো। ঠিক আছে?”
কথাটা শুনে মেয়েটা থমকে দাঁড়াল। চোখে-মুখে কেমন একটা বিস্ময়ের ছাপ।
“সরি ম্যাম। এই বাসায় এভাবে ডাকা হয় না। আমি আপনাকে ম্যাম বলেই ডাকবো, এই নিয়ম।”
নাফিসার ঠোঁট হালকা কেঁপে ওঠে। ভেতরে কী যেন খচ করে ওঠে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুধু মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
মেয়েটা মাথা নিচু করে চলে গেল।

দরজাটা বন্ধ হতেই শপিং ব্যাগটা নিয়ে নাফিসা ধীরে ধীরে বিছানায় বসে।
ব্যাগটা টান দিয়ে খুলল। ভিতরে সযত্নে ভাঁজ করে রাখা একজোড়া সাদা স্কুল ড্রেস।
তার চোখ মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল।
দুটি হাত দিয়ে জামাটা তুলে ধরল নতুন, সাদা, ঝকঝকে ইউনিফর্ম। সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হালকা ঝকঝকে সাদা রঙের হিজাব। একটা নয়, দুটো হিজাব একটা কাপড়ের, আরেকটা জর্জেটের।
হিজাবের প্যাকে ছোট করে লেখা:

“First day of your new life. Don’t forget to smile.”
– S
সায়মান…!
নাফিসার বুকের ভেতর যেন কিছু একটা কাঁপতে থাকে।
এই সাদা রঙ, এই স্কুল ড্রেস এই লেখা… এগুলো যেন শুধু কাপড় নয়, তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের প্রথম সূচনা।
হিজাবটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে গালে ঘষে সে। যেন স্পর্শ করে অনুভব করতে চায় এই কেবল কাপড় নয়, একরাশ নির্ভরতা।
আচমকা চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।
সে জল কান্নার না, আনন্দের না, ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না এক অদ্ভুত অনুভব। বুকের ভেতর হালকা হাহাকার আর কৃতজ্ঞতার এক অদ্ভুত মিশেল।

হিজাবটা বুকের ওপর চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ।
সেই মুহূর্তে মনে হয়, তার জীবনের সব হারানো পথ যেন ধীরে ধীরে জোড়া লাগছে, কেউ একজন নিঃশব্দে পেছন থেকে আলতো করে ওর হাত ধরে বলছে,
“চলো, আমি আছি। এইবার পথ হারাবে না তুমি…”
নাফিসা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে।
নিচে নেমেই প্রথমেই চোখে পড়ে ডাইনিং টেবিল ঘিরে সকালের চেনা ব্যস্ততা জমে উঠেছে।
টেবিলের একপাশে বসে আছে রুহি। আজ তার পরনে স্টাইলিশ কুর্তি, চোখে হালকা কাজল, চুল খোলা রেখে ব্যাগ গায়ে চাপিয়ে বসে আছে। মোবাইলে চোখ রেখেই নাস্তার ফাঁকে এক চুমুক দিচ্ছে চায়ে। দেখে বোঝা যায়, সে ভার্সিটির জন্য রেডি নিত্যদিনের এই রুটিনে একটুও তাড়াহুড়ো নেই তার।

রিশা স্কুল ড্রেস পরে বসে আছে পাশেই। চোখ দুটো ঘুমে আধবোজা,ঝিমুতে ঝিমুতে বসে আছে, ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে গাল ফুলে আছে, মাথাটা একটু পরপর ঢলে পড়ছে একদিকে। ঘুমে ঢোলতে ঢোলতে চামচ দিয়ে নাস্তা মুখে দিচ্ছে। রুটির সাথে হালুয়া মুখে দিয়ে আবার চোখ বুজে ফেলে মনে হচ্ছে যদি এখানে একটু ঘুমানো যেত! তার এই অবস্থা দেখে নাফিসার মুখে হালকা হাসি চলে আসে গাল ফুলা দেখে মনে হচ্ছে কোনো হাইবারনেটেড কাঠবিড়ালী।
আরেক পাশে বসে আছেন আফিয়া বেগম। উনি একপাশে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছেন, চোখে-মুখে একটা অস্থিরতা। যেন কারো জন্য অপেক্ষা করছেন। চেহারাটা একটু চিন্তিত, কিন্তু সেটার নিচে চাপা পড়ে আছে স্নেহের এক বিশাল সমুদ্র।
ভেতরের দিক থেকে ভেসে আসছে কথাবার্তার হালকা শব্দ। ইমা বেগম আর বিলকিস আরা বেগম, রাহিলের রুমে রয়েছেন।নাফিসার সাথে এখনো রাহিলের কথা হয়নি। কিন্তু ও বাচ্চাটিকে দেখেছে ওর খুব ভালো লেগেছে কিরকম চুপচাপ ওদিকে শান্তভাবে তাকিয়ে থাকে। খুবই কিউট গোলুমোলু বাচ্চা।
মাহবুব রশিদ আর মঈন রাশিদ কোথাও নেই,বোঝাই যাচ্ছে, তারা অনেক আগেই নাস্তা সেরে, নিজেদের কাজের দিকেই রওনা হয়েছে।

সেই মুহূর্তে চোখ যায় সোফার দিকে।
সায়মান বসে আছে, চুপচাপ। এক হাতে কফির মগ, অন্য হাতে ফোন। চোখ তার ফোনের স্ক্রিনে নিবদ্ধ। অলিভ কালার শার্ট উপরের দুইটা বোতাম খোলা , কালো প্যান্ট , একদম পারফেক্টলি সাজানো, গোঁছানো। চুলে জেল দেওয়া, মুখে হালকা দাড়ি, চোখে চশমা।
সেই বসে থাকা সায়মানকে দেখে কারো চোখে পড়লে মনে হতে পারে এ যেন কোনো প্রফেশনাল মানুষের ক্যাটালগে ছাপানো মডেল। কিন্তু তার মন কোথায়, তা বোঝা দায়।
নাফিসা এক ঝলক তাকায়, চুপচাপ ভাবে,

“এই লোকটা সবসময় ফোনে কী করে? এত কী আছে জীবনে, যা মোবাইল ছাড়া চলে না?”
তার ভাবনার ফাঁকেই আফিয়া বেগমের চোখ যায় নাফিসার দিকে। একগাল প্রশান্ত হাসি দিয়ে বলেন,
“তাড়াতাড়ি নাস্তা করে নে মা, তারপর আবার বেরুতে হবে তো স্কুলের জন্য।”
নাফিসা কিছু না বলে মুচকি হেসে মাথা নাড়ে।
এই ছোট্ট মুচকি হাসিটাই যেন ঝড় তোলে কোথাও।
সায়মানের কানে গিয়ে বাজে ওদের কথা। মুখ থেকে কফির কাপটা নামিয়ে সে চোখ তুলে তাকায় ওদের দিকে। তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে নাফিসার হেসে থাকা মুখে।
এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায় তার ভেতরটা।
এই হাসি এতটা সরল, এতটা নরম, এতটা প্রাণবন্ত তা তার ভেতর কোথাও যেন ধাক্কা দেয়। বুকের বাঁ দিকে কেমন এক চাপা অনুভব। সে সেটা ঠেলে সরাতে চায়, তাই আবার চোখ নামিয়ে ফোনের স্ক্রিনে মন বসায়।
কিন্তু ফোনের লেখাগুলো তখন ঝাপসা হয়ে গেছে।
আফিয়া বেগম এবার নাফিসার হাত ধরে ওকে পাশে বসালেন।

তার সামনে রাখা হলো ঠাসা নাস্তার প্লেট দুইটা ডিম সিদ্ধ, পরোটা, হালুয়া, কলা, একটা গ্লাস গরম দুধ, আর কিছু মিষ্টান্ন। একটা পরিপাটি রকম সাজানো খাবার যেন শুধু শরীর না, আত্মাকেও পুষ্টি দিতে চায়।
নাফিসা একটু চমকে তাকায়, ঠোঁট কাঁপে হালকা। মিন মিন করে বলে,
“আমি এত খেতে পারব না মামনি…”
আফিয়া বেগম চোখ তুলে তাকালেন, দৃষ্টিতে মমতা আর কঠোরতা মিশে আছে।
“তাড়াতাড়ি শেষ কর। শরীরের অবস্থা এই জন্যই… না খেয়ে।”
নাফিসা মুখ নিচু করে একটু থেমে আবার বলল,
“সত্যি বলছি, আমি এত খেতে পারবো না…”
এইবার আফিয়া বেগম কোনো কথা না বলে নিজের প্লেটটা এগিয়ে নিলেন। হাতে তুলে নিলেন এক টুকরো পরোটা আর হালুয়া।

“খা, আমিই খাইয়ে দিচ্ছি,” বললেন কঠিন কণ্ঠে।
নাফিসা কেঁপে ওঠে। চোখের পাতা নেমে আসে। জীবনে এই অনুভবটা যেন নতুন। কেউ তাকে এমন করে খাইয়ে দিচ্ছে… এমনটা কবে ঘটেছে, মনে পড়ে না।
সে চোখে জল আসার আগে সেটাকে ঠেকিয়ে রাখে। মনে মনে ভাবে—এই মেয়েটা তো কখনও এমন ভালোবাসা পায়নি। খাওয়ার জন্য গালিগালাজ শুনেছে, মারের ভয় পেয়েছে, উপহাস সহ্য করেছে। অথচ আজ?
আজ কেউ নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছে।
এই ভালোবাসা কি সত্যি তার জন্য?
এইখানে বসে সে আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা করে,

“এই মুহূর্তগুলো থেমে যাক… এই আলো, এই গন্ধ, এই ছোঁয়া, এই আদর… সবকিছু আমি টুকরো টুকরো করে জড়িয়ে রাখতে চাই বুকের মধ্যে। আল্লাহ, দয়া করে এইবার হারিয়ে যেতে দিও না আমাকে…”
নাফিসা হিজাবের আড়ালে নিজের চোখ মুছে আবার হালকা করে খেতে শুরু করে।
ব্যস্ততার মাঝে আচমকা রিশার মাথায় একটা গাট্টা মেরে দিবে,
“আউউউউউউ!”
একটা ‘থাপ্’ শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আর একটা রিশার মাথায় আছড়ে পড়ে এক গাট্টা।
“আউউউউউউ!” রিশা চিৎকার করে ওঠে।
“এই…!ওই ধলা বিলাই?”

সে যেই কথা শেষ করে, তখনই আরও একটা ঠাস করে কারচি তার মাথায়। এবার আর সহ্য করতে না পেরে চোখে পানি এনে দিয়ে চিৎকার শুরু করে রিশা—
“এইটা অন্যায়! অন্যায়! এইটা নিপীড়ন! আমি ইউএনওর কাছে বিচার চাই…!”
পাশ থেকে নাফিসা পুরো দৃশ্যটা দেখে একটুকরো হাসি লুকাতে পারে না। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। গুটিয়ে বসা সকালটা যেন মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায় এই ভাইবোনের হুলস্থুলে কাণ্ডে।
সাইফান meanwhile পুরোপুরি রেডি একটা একটা ফুল হাতা টি শার্ট সাথে জিন্স পরা ব্লু কালার চোখে চশমা, দেখে এমন ফিল হচ্ছে পোলা তো নয় যেন আগুনেরই গোলা, ভার্সিটি সাবার ক্রাশ বলে কথা, একদম ভার্সিটি স্টুডেন্ট লুকে হাজির হয়েছে।
আফিয়া বেগম এবার চেয়ে বললেন,

“সাইফান, দুষ্টুমি করিস না তো! তোর ছোট ও ছোট বোনকে বিরক্ত করিস কেন রে?”
সাইফান হেসে উঠে বলল,
“আরে আম্মু, এইটা তো ভাইয়ের আদর। এইটা না করলে দিনে ভালো লাগে নাকি?”
আফিয়া বেগম তার পাজি ছেলের কথা শুনে হেসে ওঠে।
সাইফান এরপর টেবিলে বসে তাড়াতাড়ি নাস্তা করতে শুরু করল। এক হাত দিয়ে পরোটা টুকরো করে মুখে দিচ্ছে, অন্য হাতে ফোন স্ক্রল করছে।
মিনিট দশেকের মধ্যেই সে উঠে দাঁড়ায়। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বলে
“আম্মু আমি গেলাম। আজ একটা ক্লাস মিস করতে চাই না।”
রুহি তখন হঠাৎ বলে ওঠে
“এই সাইফান! আমাকে নিয়েও যা প্লিজ। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
সাইফান চোখ গুটিয়ে বলল,

“তুই কি ভাবছিস আমি রেন্ট-এ-ব্রাদার সার্ভিস দিই? আলাদা গাড়িতে যা।”
রুহি মুখ ফুলিয়ে কিছু বলবে ঠিক তখনই,
সায়মান সেই মুহূর্তে মুখ তোলে, গম্ভীর গলায় বলে,
“ওকে সাথে করে নিয়ে যা। ওর দেরি হচ্ছে।”
সাইফান বড় ভাইয়ের কথা অমান্য করতে পারে না। খানিকটা বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে রুহির দিকে তাকিয়ে বলে,
“আয় ধলা ক্যাঙারু! আবার যদি মুখ খোলিস পথে, আমি রাস্তায় ফেলে চলে আসব!”
রুহি ব্যাগটা তুলে নেয়, মুখে মুচকি হাসি, সে জানে সাইফান যা বলুক, আদতে কিছু করবে না।
“আচ্ছা ভাইয়া, আসছি। ধলা ক্যাঙারু না, ধলা পরী বলো!”
এই বলে দুইজন একসাথে বেরিয়ে পড়ে।
পরিচিত কোলাহল একটু একটু করে ফিকে হয়ে আসছে।
নাফিসা এদিকে নাস্তার শেষ চুমুকটা দিচ্ছে দুধে। হিজাবটা একটু ঠিক করে নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আফিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“আম্মু, তাহলে আমরা বের হই এখন? দেরি হয়ে যাবে না তো?”
আফিয়া বেগম উঠে এসে ওর গালে একটা চুমু দিয়ে বলে,
“আল্লাহ হাফেজ মা। ভালো করে মন দিয়ে পড়াশোনা করবি, আর ভয় পাবি না। আজ তো জীবনের নতুন যাত্রা।”
রিশা তখনও আধঘুমে ঢুলছে। ওর মাথায় হাত রেখে বলল,
“এই রিশু খাওয়া শেষ হল দেরি হয়ে যাচ্ছে তো তাড়াতাড়ি বের হও!”
রিশা চোখ খুলে শুধু মাথা নাড়ে, মুখে কিছু বলে না।
সায়মান ওদের দিকে হালকা৷তাকিয়ে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়াল।
“চলো।”
গাড়ির দরজা খুলে সায়মান প্রথমে ফ্রন্ট সিটে উঠে। আজ সে নিজেই ড্রাইভ করবে।
পেছনের দরজা খুলে নাফিসা আর রিশা দুজনেই উঠল। ব্যাক সিটে বসার সময় হিজাবটা একটু সামলে নিল নাফিসা।

গাড়ি চলতে শুরু করল। জানালার পাশ দিয়ে যেতে যেতে নাফিসার চোখে ধরা পড়ে ভোরের শহরএকটা শান্ত, সদ্য জাগা ঢাকা শহর।
গাড়ির ভেতরে প্রথমদিকে নীরবতা, কিন্তু ধীরে ধীরে রিশা কথা বলতে শুরু করে।
আমি আজ ক্লাসে একটু দেরি করলে টিচার কি বকে দেবে এখন একটু ঘুমিয়ে নিতাম তারপরে যাইতাম সাইমানের দিকে তাকিয়ে বলে ?”
নাফিসা মুচকি হাসে ।।
সায়মান গম্ভীর মুখে বলে, “তুই তো প্রতিদিনই দেরি করিস, আজ টিচার অবাক হবে না।”
রিশা চোখ ছোট করে তাকিয়ে বলে,
“টিচারের মুখ আমি ধুয়ে দিয়েছি এর জন্য আর অবাক এর রেশ মুখে থাকে না !”
“তুই দিন দিন অনেক ফাজিল হচ্ছিস!

রিশা দাঁত কেলিয়ে বলল ওই আর কি দাভাই। নাফিসা রিশার কথা শুনে শুধু মুচকি হাসি দিচ্ছে। এই মেয়ে যে এত কথা বলে। সে পরিচয় হওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই বুঝে গেছে।
সায়মান হতাশ ওর ভাই বোন গুলো এক একটা এক এক রকম পাজির পাজি এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় দেখ!
গাড়ি বড় একটা স্কুলের সামনে এসে থামে। পার্কিং লটের একদিকে গাড়ি দাঁড় করায় সায়মান।
রিশা ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বলে,
“আমি ক্লাসে যাচ্ছি। টিফিনে তোর সাথে দেখা করব নাফু, ঠিক আছে?”
নাফিসা মাথা নাড়ে,
“হ্যাঁ, ।”

রিশা চলে গেলে সায়মান ঘাড় ঘুরিয়ে বলে,
“আমার পেছন পেছন আসো।”
নাফিসার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। তারপরও ধীরে পায়ে এগিয়ে যায়।
সায়মান অফিস রুমে ঢোকে। ভিতরে বসে আছেন প্রিন্সিপাল সাহেব, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, গম্ভীর মুখে চশমা চোখে।

“আসসালামু আলাইকুম,” সায়মান এগিয়ে গিয়ে হাত মেলালেন।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। ও, তুমি সায়মান? হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি চিনেছি।তোমার বাবা কেমন আছে।
জ্বী আঙ্কেল আবু ভালো আছে।
তো এই মেয়েটিই আমাদের নতুন স্টুডেন্ট?”
“জ্বী, ওর নাম নাফিসা আলম। সব কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।”
“ভালো। স্কুলে আমাদের নিয়ম একটু কড়াকড়ি, তবে তোমার পরিচয়ে ওর দেখভাল হবে ইনশাআল্লাহ।”
কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলার পর প্রিন্সিপাল একজন মহিলা স্টাফকে ডেকে বলেন,
“শাহিনা, তুমি ওকে ক্লাসরুমটা দেখিয়ে দাও।”
নাফিসার ভিতর তখন কেমন করছে, মনে হচ্ছে পেটের মধ্যে প্রজাপতিরা উড়ছে। সায়মান সেটা বুঝতে পেরে,মনের ভিতর দোটানা অনুভব করে ও খুব ধীরে ওর মাথায় হাত রাখে, এক চিমটি আদর দিয়ে বলে,
“সব ঠিক আছে। ভয় পেও না। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। বাসায় রিশার সাথে যাবে ড্রাইভার নিতে আসবে আর কোন প্রবলেম হলে সরাসরি প্রিন্সিপাল কে জানাবে।”

ওর ঠান্ডা কণ্ঠ আর আলতো হাতের ছোঁয়ায় নাফিসার মনটা আশ্চর্য শান্ত হয়ে যায়। চোখে চোখ পড়ে যায় একবার। ওই চোখে কেমন এক গভীরতা, অদৃশ্য সাহস, আর একটি নির্ভরতার প্রতিচ্ছবি।
সায়মান সরে যায়। কিন্তু নাফিসা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে জায়গাতেই, তাকিয়ে থাকে সেই চলে যাওয়া ছায়ার দিকে।
তারপর ধীরে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে যায়, নতুন একটা জীবনকে বরণ করে নিতে।
বুকের ভিতর শুধু একটাই অনুভূতি বাজতে থাকে,
“জীবনের সমস্ত হারানো দিন পেছনে রেখে, আজ থেকে আমি শুরু করব নতুন করে… আল্লাহ, তুমি পাশে থেকো।”
[নাফিসা ক্লাসরুমে ঢোকার সময় তার হৃদস্পন্দন যেন একটু থেমে থেমে চলছে। ভেতরে ঢুকেই চোখ আটকে যায়, চারপাশে গিজগিজ করছে ছেলে-মেয়েদের কোলাহল। একেকজন একেকভাবে ব্যস্ত
প্রথম সারির সিটগুলো অনেক আগেই দখল হয়ে গেছে।
নাফিসা নিরবে ক্লাসরুমের পিছনের সারিতে গিয়ে জানালার পাশের একটা সিটে বসে। ব্যাগটা পাশে রাখে, দুই হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে।
মুহূর্ত পেরোতেই ওর পাশে এসে বসে এক মিষ্টি মুখের মেয়ে। কাঁধে খোপা, চোখে শীতলতা।

“হাই! তুমি কি নতুন এসেছো?”
নাফিসা প্রথমে একটু জড়োসড়ো হয়ে চুপ থাকে, তারপর মুচকি হেসে ধীরে মাথা নেড়ে বলে,
“হ্যাঁ… আজই প্রথম ক্লাস।”
“ওয়াও! আমি মেহরিন। তোমার নাম?”
“আমি… নাফিসা।”
মেহরিন হাসে,“নাফিসা নামটা অনেক সুন্দর, জানো?”
নাফিসা লজ্জা পায়। ছোট্ট করে হাসে।
এইভাবে দু’জনের আলাপ জমে উঠছিল, এমন সময় তাদের সামনে থেকে হুট করে একজন ছেলে এসে পাশে বসে পড়ে। ছেলেটার চোখে স্মার্টনেস, চুলগুলো এলোমেলো স্টাইল করা, মুখে হালকা দুষ্টু হাসি।
সে নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল,

“Well well well… New student alert! And… you’re so cute!”
নাফিসার মুখ লাল হয়ে যায়। কী বলবে বুঝতে পারে না।
তারপর ছেলেটি মেহরিনের দিকে ঘুরে ঠাট্টার ছলে বলে,
“তুমি কী করছো ওর পাশে বসে? ওর সাথে বেশি মিশবে না!”
মেহরিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোকেই কে বলেছে কে কাদের সাথে মিশবে সেটা ঠিক করার?”
ছেলেটা চোয়াল শক্ত করে একটু ঝুঁকে বলল,
“আমি বললে বলতে পারি!”
নাফিসা চোখ কপালে তুলে দুজনের ঝগড়া দেখছে। একসময় বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে,
“থামো! তোমরা থামো! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না! তোমাদের চেহারার মধ্যে এত মিল কেন?”
এই প্রশ্নটা করতেই হঠাৎ যেন মুহূর্তটা থেমে যায়।
দুজনেই একসাথে বলে ওঠে,

“আমরা টুইন্স!”
তারপর দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে, যেন বুঝতে পারেনি একই সাথে উত্তর দিয়ে ফেলেছে।
এরপর দুজনেই মুখ ঘুরিয়ে নেয় দুইদিকে।
নাফিসা হা করে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর মুখ চেপে হাসে,একটা মুচকি হাসি। অদ্ভুত দুজন ভাইবোন। ঠিক যেন টম এন্ড জেরি।
মেহরিন একটু নরম গলায় বলল,
“ওর নাম মেহরাব। আমার যমজ ভাই। ওর সাথে কথা বলার আগে তিনবার ভাববে, ওর মাথার প্যাঁচগুলো ঠিক নেই।”
মেহরাব তখন বলল,

“আমি না থাকলে ওর জীবন একদম বোরিং হয়ে যেত, বুঝলে!”
নাফিসা হাসতে হাসতে বলে,
“তোমরা দুজনে অনেক মজার মানুষ ”
এরপর ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে কথাবার্তা জমে ওঠে। ক্লাসের সময় কখন চলে যায়, কেউ খেয়ালই করে না।
স্কুল ছুটি হয়ে গেলে সবাই বাইরে বেরিয়ে আসে।
মেহরিন ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে বলে,
“কাল আসবি তো, নাফিসা?”
“হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ। অনেক ভালো লাগছে এখানে।”
মেহরাব পাশ থেকে বলে,

“দেখো, আমাদের ‘গ্যাং’-এ ঢুকতে গেলে নিয়ম আছে। প্রথম দিনই তিনটা হাসি, দুইটা ঠোঁট বাঁকানো আর একবার হা করে তাকানো লাগবে!”
নাফিসা হেসে বলে,
“তাহলে তো আমি কনফার্মড মেম্বার!”
হাসতে হাসতে সবাই বিদায় নেয়।
গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল রিশা, ওর ছোট্ট মুখটা উঁকি দিচ্ছে ভিড়ের মাঝে।
নাফিসা এগিয়ে যায়। রিশা বলে,
“হ্যালো হ্যালো! ক্লাস কেমন হলো ম্যাডাম?”
নাফিসা একটু মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
“অনেক ভালো আপু “।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৯

“দারুণ! “তুই তো ধলা ক্যাঙারু! তোর তো খামারেই থাকা উচিত।” আমার বাবা এত ভালো লাগে না পড়াশোনা করতে আকাশ ভঙ্গিতে বললো।
নাফসা ওর কথা শুনে হাসে, থাক তোর আর হাসতে হবে না, রিশা বলে ওঠে গাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।
আজ নাফিসার মনে হয় অনেক দিন পর, প্রথমবারের মতো একটা দিন সত্যিই তার নিজের মতো করে কাটলো।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১১