চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৭
আরোবা চৌধুরী আরু
সায়ফানের কথা শুনে জাহির হোসেন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তিনি সরাসরি মাহবুব রাশিদের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললেন,
“এগুলো কোন ধরনের কথাবার্তা আপনার ছেলে বলছে? আমার মেয়ে কোথায়? আপনাদের বাসার ছেলের কাছ থেকে এরকম আচরণ আমি একদমই আশা করিনি।”
মাহবুব রাশিদ কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই সায়ফান এগিয়ে এল।
“আরে শ্বশুর আব্বু… এত রাগ করছেন কেন? আমি তো মজা করলাম একটু। আপনার মেয়ে একদম সেফ আছে। আমার কাছেই আছে… আর থাকবে ইনশাআল্লাহ সারাজীবন।”
জারিফ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আবার বলে উঠল,
“এইসব ফাজলামি বন্ধ কর! আমার বোনকে এখনই সামনে আন!”
সায়ফান ভ্রু তুলে হালকা হেসে বলল,
“এই যে এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? আপনি তো আর ছোট বাচ্চা না… বুঝেন না কিছু?”
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নিচে নামল সায়মান। নিচে নেমে চারদিকে একবার তাকাল, তারপর শান্ত গলায় বলল,
“কি হচ্ছে এখানে?”
জারিফ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“আপনার ভাই আমার বোনকে জোর করে বিয়ে করেছে! আমরা এটা মানি না!”
সায়মান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে জারিফের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গলায় একদম স্থিরতা,
“দেখো, কথা একটু ক্লিয়ার করি। এখানে জোর করার কোনো বিষয় নেই। দুজনেই অ্যাডাল্ট… নিজেদের সিদ্ধান্তে বিয়ে করেছে।”
জাহির হোসেন কপাল কুঁচকে বললেন,
“কিন্তু আমাদের না জানিয়ে—”
সায়মান তাকে থামিয়ে নরম গলায় বলল,
“হ্যাঁ, না জানিয়ে করেছে। এটা ভুল। কিন্তু বিয়েটা অবৈধ না। আর সবচেয়ে বড় কথা… আপনার মেয়ে যদি নিজে না চাইত, কেউ তাকে বাধ্য করতে পারত না।”
কথাগুলো শুনে জারিফ কিছুক্ষণ চুপ হয়ে গেল। কিন্তু তারপর আবার বলে উঠল,
“আমি এসব মানি না! ওকে আমি নিয়ে যাব!”
সায়ফান এবার একটু সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। তার গলায় দৃঢ়তা,
“নিয়ে যেতে চাইলে আগে ওর সাথে কথা বল । ও যদি যেতে চায়, আমি এক সেকেন্ডও আটকাব না।”
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। ঠিক তখনই সিঁড়ির ওপর থেকে ধীরে ধীরে নিচে নামল জারিন। মুখে লজ্জা আর অস্বস্তি… চোখ নিচু।সবাই একসাথে তার দিকে তাকাল। জারিন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার বাবার সামনে দাঁড়াল। এক সেকেন্ডও দেরি না করে হঠাৎ জাহির হোসেনকে জড়িয়ে ধরল।
“আব্বু… আমি সরি…আমি আপনাদের না জানিয়ে বিয়ে করেছি… আমি জানি আমি ভুল করেছি… কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসি…”
জাহির হোসেন প্রথমে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে তার হাত উঠল… মেয়ের মাথায় রাখলেন। চোখে রাগ থাকলেও সেখানে মায়া স্পষ্ট।
“তুই আমাকে এত বড় সিদ্ধান্তের আগে একবারও বললি না, মা?”
জারিন কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ল,
“ভয় পাইছিলাম আব্বু…”
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর জাহির হোসেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চারদিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন,
“যেহেতু তুই নিজের ইচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিস… আমি আর কিছু বলব না।”
জারিফ অবাক হয়ে তাকাল,
“আব্বু!”
জাহির হোসেন তাকে থামিয়ে বললেন,
“বিয়ে হয়ে গেছে। এখন ওর সম্মানটাই আগে।”
তারপর সায়ফানের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললেন,
“আমার মেয়ের চোখে এক ফোঁটা পানি দেখলে… আমি কিন্তু চুপ করে থাকব না।”
সায়ফান এবার মাথা নিচু করে বলল,
“ইনশাআল্লাহ, কখনো কাঁদতে দেব না।”
পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। মাহবুব রাশিদ গলা খাঁকারি দিয়ে সবার দিকে,
“আমরা সবাই এক জায়গায় বসে ব্যাপারটা ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করি। যেহেতু বিয়েটা হয়ে গেছে… এখন এটাকে সুন্দরভাবে কীভাবে সামলানো যায় সেটাই ভাবা উচিত।”
সবাই ধীরে ধীরে ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসল। জারিন চুপচাপ মাথা নিচু করে সায়ফানের পাশে বসে আছে।
মাহবুব রাশিদ আবার বললেন,
“আমার মতে, একটা রিসেপশন রাখা যায়। সবাইকে জানানো হবে ঘরোয়া ভাবে বিয়ে হয়েছে। এতে করে দুই পরিবারের সম্মানও থাকবে, আর ব্যাপারটাও স্বাভাবিক হয়ে যাবে।”
জাহির হোসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে মাথা নাড়লেন।
“ঠিক আছে… সেটাই ভালো হবে।”
সায়মানও সম্মতি জানাল। সবাই বিষয়টাতে খুশি হলো। শুধু জারিফই মুখ গোমড়া করে একপাশে বসে আছে। তার চোখে এখনো রাগ স্পষ্ট। সায়ফান হেলান দিয়ে বসে মাঝে মাঝে জারিফের দিকে তাকাচ্ছে, আর ঠোঁটের কোণে হালকা মুচকি হাসি খেলছে। ইচ্ছে করেই ওকে আরও খেপিয়ে তুলছে।জারিফ সেটা লক্ষ্য করেই দাঁতে দাঁত চেপে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
অনেকক্ষণ আলোচনা শেষে বিষয়টা মোটামুটি ঠিক হয়ে গেল। আয়োজন নিয়ে প্রাথমিক কথা বলা শেষ।তারপর জাহির হোসেন উঠে দাঁড়ালেন। তার সাথে জারিফও উঠে দাঁড়াল।
“ঠিক আছে… আমরা তাহলে উঠি।”
কথাটা বলেই তিনি জারিনের দিকে তাকালেন।
“জারিন, চল মা… আমাদের সাথে চল। কিছুদিন বাসায় থাকবি, তারপর সবকিছু ঠিকঠাক করে আবার আসবি।”
কথাটা শোনার সাথে সাথে পুরো ঘরটা আবার একটু থমথমে হয়ে গেল।জারিন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। তার চোখ অজান্তেই সায়ফানের দিকে চলে গেল।
সায়ফান হঠাৎ সোজা হয়ে বসে জারিনের হাতটা শক্ত করে নিজের বগলের নিচে টেনে নিল।
“এক মিনিট।”
সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।সায়ফান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু জারিনের হাত এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়ল না।
“বিয়ের পর আমার বউকে আমি কোথাও পাঠাব—এইটা কে বলল?”
জারিফ সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেপে উঠল,
“এইটা কী ধরনের কথা! ও আমার বোন —আমরা নিয়ে যাব!”
সায়ফান এবার সরাসরি জারিফের চোখে চোখ রাখল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি,
“আপনার বোন—ঠিক আছে। কিন্তু এখন ও আমার স্ত্রীও। এই কথাটা ভুলে গেলে চলবে না।”
জাহির হোসেন কপাল কুঁচকে বললেন,
“সায়ফান, আমরা জোর করছি না। মেয়েকে কয়েকদিনের জন্য নিতে চাচ্ছি, এটাই স্বাভাবিক।”
মাহাবুব রাশিদ এবার ক্ষেপে গেল সাইফানের উপর,,
আর একটা কথা বলবে না তুমি। আগে তো অন্যায় করছো তার প্রতি এখন এত বড় বড় কথা বলছো। তোমার বউ হারায় যাচ্ছে না।
সায়ফান একটু নরম হলো, কিন্তু হাতের চাপ কমাল না।
“স্বাভাবিক… আমি বুঝি। কিন্তু একটা কথা ক্লিয়ার করে বলি—ও কোথাও যাবে কি যাবে না, সেটা ও নিজে বলবে।”
তারপর মাথা ঘুরিয়ে জারিনের দিকে তাকাল।
“তুমি যেতে চাও?”
জারিন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তার বুক ধুকপুক করছে। একদিকে বাবা… অন্যদিকে সায়ফান। আগেই একবার বাবাকে কষ্ট দিয়েছে—আরেকবার সেই কষ্ট দিতে চাইছে না।
“হ্যাঁ… আমি যেতে চাই…”
সায়ফান স্তব্ধ। চোখের দৃষ্টি বদলে গেল এক লহমায়। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।জাহির হোসেনও কিছুক্ষণ চুপ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সায়ফান তা হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বললো,
“এই চশমা! আল্লাহ তোর উপর গজব ফেলবে। স্বামী রেখে যেতে চাস, শয়তান বেডি?”
জারিন চোখ ছোট করে সায়ফানের দিকে তাকাল। ঠিক তখনই ইমা বেগম এগিয়ে এসে সায়ফানের কাধেঁ হালকা চড় বসালেন।
“তুই বড্ড নিলজ্জ হচ্ছিস, বুঝছিস?”
সায়ফান মুখ কুঁচকে বলল,
“এই ছোট আম্মু! তুমি আমার ছোট আম্মু হয়ে—ছেলের দুঃখটা বুঝলা না? ছেলের সাইড না নিয়ে ওই নিরামিষ বউমার সাইড নিচ্ছো?”
তারপর সায়ফান এবার সায়মানের দিকে তাকাল,
“ভাই! এ ভাই! তুমি কিছু বলছো না কেন? আমার ওপর জুলুম হচ্ছে—কিছু বলো!”
সায়মান তখন একপাশে দাঁড়িয়ে ফোন দেখছিল। ফোনটা পকেটে রাখল। তারপর একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জাহির হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আঙ্কেল, আপনারা চাইলে ওকে নিয়ে যেতে পারেন। কোনো সমস্যা নেই।”
এই এক কথায় সায়ফানের মুখ পুরো ঝুলে গেল।সে হতভম্ব হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ তার সাপোর্টে দাঁড়াল না।
আর তার “নিরামিষ বউ”—সেও একবারের জন্যও ফিরে তাকাল না!সায়ফান দাঁত চেপে মনে মনে বলল,
“সমস্যা নেই… ঘুরে ফিরে তো আমার কাছেই আসতে হবে। তখন মজা বুঝাবো, চশমা…”
কিছুক্ষণের মধ্যেই জারিনরা চলে গেল।যাওয়ার সময় জারিফ সায়ফানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে এক চওড়া বিজয়ের হাসি দিল।সায়ফান সেটা দেখে দাঁত চেপে রইল।
ওরা চলে যাওয়ার পর ঘরের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
সবাই যে যার রুমে যেতে গেলে সায়ামান সবাইকে দাঁড়াতে বলল।
বিশেষ করে ইমা বেগম আর মইন রাশিদকে।রিশা আর আকাশ একপাশে দাঁড়িয়ে আছে—দুজনের মাথা নিচু, শরীর জড়সড়ো।
সায়মান ধীরে বলল,
“রিশা, আকাশ—তোরা এখানে আস।”
দুজন কাঁপা পায়ে এগিয়ে এসে সায়মানের পাশে দাঁড়াল।মাহবুব রাশিদ ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“তুমি আবার কী বলতে যাচ্ছো?”
সায়মান শান্ত গলায় বলল,
“আব্বু… একটু ওয়েট করো।”
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো।কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেতরে ঢুকলেন একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক।
“আসসালামু আলাইকুম।”
মাহবুব রাশিদ অবাক হয়ে বললেন
“আরহাম? তুমি এখানে?”
লোকটা সম্মান নিয়ে মাথা নত করলেন,
“স্যার… সায়মান বাবা আমাকে আসতে বলেছে। কী ব্যাপার, আমি নিজেও জানি না।”
সবাই সায়মানের দিকে তাকিয়ে। সায়মান এবার একবার চারদিকে তাকাল। তারপর স্থির গলায় বলল,
“আমি আজ একটা বিষয় ক্লিয়ার করতে চাই। রিশা আর আকাশ—ওরা একে অপরকে ভালোবাসে। আর ওদের বিয়েটা আমি দিয়ে দিয়েছি ।”
বাড়ির বড়রা সবাই অবাক হয়ে তাকালো সবার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে কিভাবে কি হলো। ইমা বেগম ঝড়ের মতো এগিয়ে এসে রিশার গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলেন।
“এইসব কি শুনতেছি আমি?!”
রিশা কেঁপে উঠল। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।ঠিক তখনই সায়মান এগিয়ে এসে রিশাকে নিজের পেছনে আগলে নিল।
“ছোট আম্মু, হাত তুলবে না।”
ইমা বেগম থেমে গেলেন। আরহাম সাহেব এগিয়ে গিয়ে আকাশের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল।
” আমার সম্মান রাখলে না তুমি এতদিন ধরে তিলে তিলে করে রাখা সম্মান তুমিই এক নিমেষে ধুলোয় উড়িয়ে দিলে। ”
আকাশ বাবার দিকে অসহায় চোখে তাকালে। আরহাম সাহেব মাহাবুব রাশিদ এর দিকে তাকিয়ে বললেন,,
” ক্ষমা করে দেন আমাকে। আমার ছেলে এমন কিছু করবে আমি কোনদিন ভাবতে পারিনি।
সায়মান আরহাম সাহেবকে এগিয়ে এসে জড়িয়ে নিল নিজের সাথে।
“আঙ্কেল এভাবে বলবেন না। ওরা কোন অপরাধ করেনি। আর আপনাকে আমি ছোট থেকে চিনি আপনি কতটা সৎ মানুষ সেটা আমাদের পরিবারের সবাই জানে। আপনাকে আর আকাশকে আমাদের পরিবারের অংশ আগে থেকেই আমরা মনে করি। নিজেকে ছোট করবেন না।
এবার ধীরে ধীরে মইন রাশিদ আর ইমা বেগমের দিকে তাকাল।
“ছোট আব্বা… ছোট আম্মু… একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
কেউ কিছু বলল না।
” তোমরা কি রিশার ভালো চান?”
মইন রাশিদ গম্ভীর হয়ে বললেন
“অবশ্যই চাই।”
সায়মান মাথা নাড়ল।
“তাহলে ও যেখানে ভালো থাকবে… সেটা মানা উচিত না?”
ইমা বেগম তীব্র গলায় বললেন,
“ভালো থাকবে? একটা চাকরিজীবী ছেলের সাথে? আমাদের স্ট্যাটাসের কথা ভাবছো?”
সায়মান মুচকি হাসল। সেই হাসিতে তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া।
“স্ট্যাটাস? টাকা?”
তারপর ধীরে ধীরে আকাশের বাবার দিকে তাকাল,
“আপনার ছেলে কি অযোগ্য?”
আরহাম সাহেব শান্ত গলায় বললেন,
“না, ও নিজের যোগ্যতায় চাকরি করছে। সৎভাবে চলতে শিখেছি আমরা।”
সায়মান আবার বলল,
“আকাশ এখন চাকরি করে—ঠিক। কিন্তু ওর যোগ্যতা আছে। ইচ্ছে আছে। পরিশ্রম আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা—ও রিশাকে ভালোবাসে।” টাকা দিয়ে সব কেনা যায়… কিন্তু শান্তি কেনা যায় না।আজ আপনি জোর করে অন্য কোথাও বিয়ে দিলেন—হয়তো বড় ঘরে যাবে। কিন্তু যদি সুখ না পায়? তখন কি সেই টাকায় ওর চোখের পানি মুছাতে পারবেন?”
ইমা বেগম চুপ। মইন রাশিদও কিছু বলছেন না। সায়মান শেষবারের মতো বলল,
“আমি কাউকে বাধ্য করছি না। শুধু বলছি—ওদের একটা সুযোগ দেন।”
রিশা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের হাত কাঁপছে, কিন্তু সে দাঁড়িয়ে আছে দৃঢ়ভাবে। ঘরের ভেতর ভারী নীরবতা। কারো মুখে কোনো কথা নেই। ঠিক তখনই,আকাশ সোজা মইন রাশিদের সামনে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল… তারপর হঠাৎ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
মঈন রাশিদ চমকে উঠল।
“আকাশ! এটা কি করছো?”
মঈন রাশিদ বিস্ময়ে বলে উঠলেন।কিন্তু আকাশ থামল না। সে দুই হাতে মইন রাশিদের পা জড়িয়ে ধরল। তার কণ্ঠ কাঁপছে,
“আঙ্কেল… প্লিজ… আমাকে ভুল বুঝবেন না…”
ঘরের সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল।আকাশ মাথা নিচু করেই বলতে লাগল,
“আমি জানি… আমি আপনাদের মতো বড়লোক না। আমার তেমন কিছু নেই… বড় বাড়ি নাই, বড় নাম নাই… কিন্তু একটা জিনিস আছে—আপনার মেয়ের জন্য আমার ভালোবাসা।”
তার গলা ধরে আসছে।
“আমি ওকে কোনোদিন কষ্ট দেব না, আঙ্কেল… আমি পারলে নিজের আগে ওর হাসিটা রাখব… ওর চোখে পানি আসার আগেই আমি সেটা মুছে দিতে চাই…”
রিশা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।আকাশ আবার বলল,
“আপনারা চাইলে আমি নিজেকে প্রমাণ করার সময় নিতে পারি… যতটা সময় দেন, আমি পরিশ্রম করব… কিন্তু প্লিজ… আমাকে একটা সুযোগ দেন।”
সে এবার মাথা নিচু করে প্রায় কেঁদে ফেলল,
“আমি আপনার মেয়েকে ভিক্ষা চাইতেছি না, আঙ্কেল… আমি ওকে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হিসেবে চাইতেছি…”
মইন রাশিদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখে দ্বিধা, আবার কোথাও যেন নরম হয়ে আসার আভাস।ইমা বেগমও চুপ হয়ে গেছেন। সায়মান গভীরভাবে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। তার চোখে এক ধরনের স্বীকৃতি।
রিশা আর সহ্য করতে পারল না। দৌড়ে এসে আকাশের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
“আব্বু… প্লিজ… আমি ওকে ছাড়া পারব না…”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।
“আমি সুখী হব আব্বু… সত্যি সুখী হব…”
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল কান্নায়। মইন রাশিদ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।তারপর নিচের দিকে তাকালেন। আকাশ এখনো তার পা ধরে আছে।কয়েক সেকেন্ড… নিস্তব্ধতা।তারপর ধীরে ধীরে তিনি হাত বাড়িয়ে আকাশের কাঁধে রাখলেন।
“উঠো…”
আকাশ থমকে গেল। ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
“উঠো, বাবা।”
এই ‘বাবা’ শব্দটা শুনে সবাই অবাক হয়ে গেল।
আকাশ কাঁপা হাতে উঠে দাঁড়াল। মইন রাশিদ এবার রিশার দিকে তাকালেন। মেয়ের চোখে পানি… তিনি আবার আকাশের দিকে তাকালেন
“দেখো… মেয়েকে সুখে রাখতে পারবা তো?”
আকাশ বিন্দুমাত্র দেরি না করে বলল,
“জীবন দিয়ে চেষ্টা করব, আঙ্কেল!”
মইন রাশিদের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
“চেষ্টা না… দায়িত্ব।”
তারপর ধীরে মাথা নাড়লেন,
“ঠিক আছে… আমি রাজি।”
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৬
কথাটা বলা মাত্রই রিশা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।ইমা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। হয়তো তার মনও নরম হয়ে গেছে।আরহাম সাহেব চোখ মুছলেন চুপচাপ।
সায়মান নিঃশব্দে এক চিলতে হাসল।
