ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৪
অনামিকা আহমেদ
বছরের প্রথম ঈদটা সাধারণত মির্জা বাড়ির সদস্যরা তাদের গ্রামের ভিটাতে উদযাপন করে। গ্রামের বাড়িটা কোনো রাজপ্রাসাদের চেয়ে কম নয়, বলতে গেলে কয়েক একর জমির ওপর ইটের তোলা দোতলা বাড়িটা বহু বছরের আভিজাত্য ধরে রেখেছে। সেখানে ইশতিহার এর দাদি আজমেরী মির্জা আর তার গুটিকয়েক কাজের লোক ছাড়া কেও থাকে না। এ বছর আগে ভাগেই বাড়িতে যাওয়ার জন্য শাশুড়ি খবর পাঠালে সুলেখার মনে ইচ্ছা জাগে এবারে গ্রামেই ছেলের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে নেওয়ার। খুশি মনে সেটা আমির মির্জার কাছে পারলেও তিনি তেমন একটা আপত্তি করেন না। কিন্তু বিপত্তি হয়ে দাঁড়ায় ইশতিহার নিজেই, সে গ্রামে নিজেও যাবে না আবার রূপ কেও যেতে দিবে না।
এটা নতুন কিছু নয়, প্রতিবছর এ সময় ইশতিহার কাজের বাহানা দেখিয়ে নিজের যাওয়ার পাশাপাশি রূপের যাওয়াটাও পন্ড করে দেয়। যার দরুন গত পাঁচ বছরে একবারও রূপের সাথে তার দাদির দেখা সাক্ষাৎ হয় না। তাই এবার ইশতিহার সুলেখার মুখের ওপর না করে দিলেও রূপ তাকে বাধা দিয়ে বলে,
” আপনি যান বা না যান, আমি যাব এবার। কতদিন হলো দাদি কে দেখি না। মানুষটা কেমন আছে সেও জানি না। আমি আপনার মতো পাষাণ হতে পারব না।”
ইশতিহার তখন লেপটপের কী বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছিল। রূপের কথা শুনে সে চোখের চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে বাজ পাখির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার দিকে। রূপ বিছানার এক কোণে বসে তার রেশমি চুলগুলো ভালো করে আঁচড়ে নিচ্ছিল। বেশ কয়েকদিন ধরে অসুস্থ থাকার কারণে মাথা তুলে বসতে পারেনি সে। আজ সকাল থেকে শরীর তো একটু ভালো লাগছিল বলে সিঁড়ি বেয়ে উঠানামা বেড়েছে তার।
রূপ ভালই বুঝতে পারছে ইশতিহার এর দৃষ্টি তার উপরই নিবদ্ধ। তাই সে চোখ তুলে চায় না তার দিকে, ইশতিহার এর সাঙ্ঘাতিক চোখের মুখোমুখি হওয়ার সাহস তার নেই। চিরুনি টা নাইট স্ট্যান্ড এর ওপর রেখে মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে নিলে ইশতিহার এর হ্যাঁচকা টানে রূপের পুরো শরীরটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইশতিহার এর কোলের ওপর পড়ে যায়।
এক প্রকার জোর করেই রূপ উঠে যেতে চাইলে ইশতিহার তাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে রূপের গলায় মুখ ডুবিয়ে তার ঘ্রাণ নিতে থাকে। সেই সাথে স্পর্শকাতর অংশে আঙুল বুলাতে বুলাতে ইশতিহার রূপের শরীরের নিম্নাংশে প্রবেশ করে। এই কয়দিনে সুখভোগ হয়নি মোটেও, তাই এবার আর ইশতিহার এক মুহুর্ত ও নষ্ট করে না। রূপ ইশতিহার এর চুল মুঠো করে তাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কোনো রকমে উঠে দাঁড়ায় তারপর আশপাশে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
” ভারী নির্লজ্জ হয়ে গেছেন দেখি আপনি, দিনে দুপুরে ওই সব শুরু করেছেন? আগে তো তাও দরজার আড়ালে করতেন এখন একেবারে সবার সামনে। এই উন্নতি হয়েছে আপনার বিয়ের পর?”
ইশতিহার এতক্ষণ ক্রুর চোখে চেয়েছিল রূপের দিকে। রূপের কথা শেষ হতেই সে নির্লজ্জের মতো হাসতে হাসতে ঠোঁট কামড়ে তার দিকে এগোতে থাকে। বলে,
” আমি যে কতটা নির্লজ্জ সেটা তো তোর বিশাল আকৃতির পেট দেখলেই বোঝা যায় রূপ। স্ত্রীর সামনে লজ্জা শরম পেলে যে বংশ রক্ষা হবে না আবার মনের তৃপ্তি ও মিটবে না।”
ইশতিহার এর সাথে তাল মিলিয়ে রূপের পা ও কদম কদম করে পিছিয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকতেই রূপের গা থেকে শাড়ির আঁচলটা খুলে মেঝেতে পড়ে যায় যেনো ইশতিহার এর ইচ্ছাতেই এসব কিছু হচ্ছে। রূপ এবার চোখ বুজে ফেললে বেশ কিছুক্ষণ শরীরের কোথাও কোনো স্পর্শ না পেয়ে সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। দেখে ইশতিহার তার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। রূপ একেবারে বোকা বোন যায়, ইশতিহার তাকে আরও একটু অবাক করে দিয়ে মেঝেতে পড়া শাড়ির আঁচলটা রূপের কাঁধে তুলে খানিক দূরে সরে যায় তার কাছ থেকে।
” আমি রোমান্টিক হতে পারি কিন্তু ভুলভাল টাইমে রোমান্স করার বদ অভ্যাস আমার নেই। ওসব ছোট লোকের কাজ, আমি আবার ভীষণ বড়লোক, এলন মাস্কের ছোট ভাই।”
এই বলে বিছানার ওপর রাখা ব্যাগ আর এপ্রোন টা হাতে নিয়ে ইশতিহার দরজার দিকে পা বাড়ায়। তবে একেবারে বার হয়ে যাওয়ার আগে সে রূপের দিকে চেয়ে বলে,
” পাকনামি করে যদি মায়ের কথায় নাচতে নাচতে গ্রামে যাস তাহলে মনে রাখিস, আমার থেকে পালানোর জন্য ওই দুটো ঠ্যাং আমি আস্ত রাখবো না।”
আজ বেশ রাত করেই বাড়ি ফেরে ইশতিহার। পরপর দুটো সার্জারি শেষে তবে রেহাই মিলছে তার। চোখ দুটো ক্লান্তিতে বন্ধ হয়ে আসছে তার। তবুও কোনো রকমে নিজের ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরে এসেছে সে। ইচ্ছে ছিল কোনো দিক না চেয়ে সোজা ঘরে ঢুকে রূপকে জড়িয়ে ধরে ঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়ার। কিন্তু বাড়ির সামনে আসতেই তার নজরে আসে বাড়ির ভেতরটা অন্ধকার, বাইরের লাইটগুলো ছাড়া আর কোথাও কোনো আলো জ্বলছে না।
ইশতিহার এর মনে খটকা লাগে। শেষে দারোয়ানের কাছ থেকে সে খবর পায় আজ বিকেলেই বাড়ির সকলে গ্রামে চলে গেছে। খবরটা যেনো ইশতিহার এর পা থেকে মাথা পর্যন্ত নাড়িয়ে তোলে। রাগ আর জেড দুটোই ভয়ংকর রকমে ভর করছে তার উপর। গাড়ির চাবিটা দারোয়ানের দিকে ছুঁড়ে দিয়েই সে দৌড়ে বাড়িতে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যায়।
জনমাবন শূন্য ঠান্ডা করিডোর পেরিয়ে নিজের রুমের দরজা খুলে সে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। ইশতিহার এর বুঝতে বাকি থাকে না কি হয়েছে। তাও মনের কিঞ্চিৎ আশা বাস্তবায়িত করবার জন্য সে রুমের বাতি জ্বালালে আশেপাশে কাউকেই দেখতে পায়না। ঘরের প্রতিটা জিনিসে রূপের অস্তিত্ব লেপ্টে থাকলেও, গোটা মানুষটা যেনো নিমিষেই উধাও হয়ে গেছে। ইশতিহার এর শ্বাস ভারী হয়ে আসে, রাগের চোটে ঘাড়ের রগগুলো ফুলে দৃশ্যমান হতে থাকে। তার বিশ্বাস হচ্ছে না রূপ তে কথা অমান্য করে গ্রামে গেছে।
ইশতিহার চিৎকার করতে করতে রূপ তে ডাকতে থাকে। কিন্তু ইশতিহার এর সেই গর্জন দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে তার কাছে ফিরে আসা ছাড়া কিছুই হয়না। শেষে টেবিলে রাগে লাথি মারলে শো পিস টা পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
” আমার কথা অমান্য করার ফল তোকে আজ করায় গণ্ডায় বুঝাবো রূপ। ”
বিকেলে রওয়ানা দিলেও সকলের পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। বেশ বড় রকমের এক জার্নি করে বাড়ির সকলে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই এশার আজান দিতে না দিতেই রাতের খাওয়া দাওয়ার পাঠ চুকিয়ে যে যার রুমে ঘুমাতে চলে যায়। এদিকে দাদি তো রূপ তে পেয়ে ভীষণই খুশি, এতগুলো দিন পর নিজের অপরূপা নাতনি কে দেখতে পেয়ে তার যেনো প্রাণ জুড়িয়ে গেছে। ইশতিহার আর রূপের অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের খবরও কানে এসেছে তার। বলা বাহুল্য, আমরিন বেশ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে মুখ বেকা করে কথাগুলো শাশুড়ির কানে পাড়লেও আজমেরী বেশ খুশি হয়। তার দীর্ঘদিনের মোনাজাত যে আজ সত্যি হয়েছে। তাই ভিন্ন রুমে রূপ কে যেতে না দিয়ে তার সাথেই রূপ কে রাখার আবদার সে সুলেখার কাছে করে।
ইশতিহার তাদের সাথে আসেনি, আর আসবে বলে মনেও হয়না। বড়জোর ফোনে রূপ তে ধমকি ধামকি দিবে এই ভেবে সুলেখা ও আর আপত্তি করে না। ফলে রূপের জন্য দাদির সাথে থাকার বন্দোবস্ত করা যায়।
অনেকদিন পর দাদির সাথে দেখা হওয়ার দাবি নাতনি তে বেশ অনেকক্ষণই গল্প গুজব হয়। রাত বাড়লে বুড়ো দাদি ঘুমিয়ে পড়লেও রূপের চোখে ঘুম আসে না। সময়ের সাথে সাথে মনের আতঙ্ক বাড়তে থাকে। ইশতিহার এর নিষেধ এভাবে অগ্রাহ্য করার সাহস কখনোই রূপের ছিল না, বলতে গেলে সুলেখা ই জোর করে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ইশতিহার কখনও গ্রামে আসবে না সেটা রূপ ভালো করেই জানে, তবুও কেনো জানি তার মনটা বারবার কু ডাকছে।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে তার চোখ লেগে যায় রূপ নিজেও জানে না। হঠাৎ গাড়ির শব্দ শুনে তার হালকা তন্দ্রার ঘোর কেটে যায়। রূপ উঠে বসে।
ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৩
, ফোনে সময়টা চেক করলে দেখতে পায় প্রায় একটা বাজে। গ্রামে এটা মধ্যরাত বলা চলে। এত রাতে গাড়ির শব্দ কোথা থেকে আসতে পারে এটা ভেবে রূপের মনে ভয় জমতে শুরু করে। কেনো জানি বারবার ইশতিহার এর উপস্থিতি তার মন কে নাড়া দিতে থাকে। রূপ শুকনো গলায় ঢোক গিলে। মনের সন্দেহ দুর করতে ভাঙ্গা জানলার কপাট সরিয়ে একটু খানি ফাঁকা করতেই যা দেখে এতে রূপের প্রাণটাই যেনো বেরিয়ে আসতে চায় শরীর থেকে।
কাপা কাপা ঠোঁট গলে একটাই কথা বেরিয়ে আসে।
” ইশতিহার।”
