ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৭
সাবিলা সাবি
ভিলা এস্পেরেন্জার চারপাশ তখনো ক্ষুব্ধ জনতার হাহাকার আর পুলিশের অলীক নজরদারিতে থমথম করছে। ঠিক এই বিশৃঙ্খলার সুযোগটাই নিল মার্কো। অত্যন্ত সুনিপুণ ও চতুরতার সাথে, সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সে তান্বীকে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে নিয়ে এল। তান্বীর হাতে তখন ছোট একটি ব্যাগ আর বুকে জাভিয়ানকে ফিরে পাওয়ার এক অন্ধ আকুতি।
ধূসর রঙের একটা কাঁচঢাকা গাড়ি মেক্সিকোর ব্যস্ত রাজপথ ছেড়ে ক্রমশ নির্জন, পাহাড়ি এক উপত্যকার দিকে ছুটে চলল। যতদূর চোখ যায়, কেবল রুক্ষ প্রকৃতি আর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। তান্বী জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল—এই পথ কি সত্যিই তাকে জাভিয়ানের কাছে নিয়ে যাবে?
অবশেষে গাড়িটা এসে থামল এক বিশাল, প্রাচীন এবং কিছুটা ভুতুড়ে প্রাসাদের সামনে। লোহার তৈরি বিশাল ফটক, যার গায়ে শ্যাওলা আর জং ধরেছে। বাড়ির নেমপ্লেটে কোনো নাম নেই, কিন্তু চারপাশের থমথমে বাতাস বলে দিচ্ছিল—এটাই সেই নিষিদ্ধ পেন্টহাউস।গাড়ি থামতেই মার্কো লক খুলে দিয়ে অত্যন্ত শীতল গলায় বলল, “নেমে যাও তান্বী। তোমার গন্তব্য চলে এসেছে।”
তান্বী বাইরের সেই দানবীয় প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে এক অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল। সে গাড়ি থেকে না নেমে মার্কোর হাতটা শক্ত করে ধরে অনুনয় করতে লাগল, “মার্কো ভাইয়া, আমার একা ভেতরে যেতে ভয় হচ্ছে। আপনি প্লিজ আমার সাথে ভেতরে চলুন!অন্তত সদর দরজা পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিয়ে আসুন।”
মার্কো অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তার হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তার ঠোঁটের কোণে তখন পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি। সে গম্ভীর গলায় বলল, “ভুলো না তান্বী, তুমি কার কাছে এসেছ। মেইলস্ট্রোম আমার ভাই হলেও সে কোনো সাধারণ মানুষ নয়। তার স্পষ্ট নির্দেশ তোমাকে একাই ভেতরে যেতে হবে। আমি যদি এই সীমানায় পা রাখি, তবে জাভিয়ানের শেষ আশাটুকুও চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। এবার ন ভেবে যাওতো ভেতরে!”
তান্বী আর কোনো উপায় না দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখের জল মুছে, অবশ হয়ে আসা পায়ে সে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। সে পা বাড়ানো মাত্রই মার্কো এক মুহূর্তও নষ্ট না করে গাড়ি ঘুরিয়ে তীব্র গতিতে ধুলো উড়িয়ে সেখান থেকে চলে গেল। তান্বী একবার পেছনে তাকিয়ে দেখল, ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। লোহার ভারী গেটটি ঠেলতেই এক কর্কশ শব্দ করে খুলে গেল। তান্বী ধীর, কাঁপাকাঁপা পায়ে বিশাল লন পেরিয়ে মূল বাড়ির সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। চারপাশটা এতটাই নিঝুম যে নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দও সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। ঠিক তখনই এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। সেই সুনসান নীরবতা ভেঙে প্রাসাদের ওপর তলার কোনো এক ঘর থেকে ভেসে আসতে লাগল একটি গানের সুর। কেউ একজন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পিয়ানো বাজাচ্ছে, আর তার সাথে মিশে যাচ্ছে এক ভারী, গম্ভীর অথচ তীব্র মাদকতাময় পুরুষের কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠ ভেসে আসা সুরের বাণীতে গাইছে—”তুম দিল কি ধারকান মে রেহতে হো, রেহতে হো…” গানটা শোনামাত্র তান্বীর পায়ের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। মেক্সিকোর এই অন্ধকার জগতের এক সম্রাট, যার নাম শুনলে আন্ডারওয়ার্ল্ড কেঁপে ওঠে, সে কি না পিয়ানোর রিফে হাত রেখে এই চিরচেনা হিন্দি গানের সুর তুলছে? এই সুর কি জাভিয়ানের মুক্তির পথ, নাকি তান্বীর নিজের আত্মাহুতির এক সুমধুর উপক্রমণিকা? তান্বী বুক ভরে শ্বাস নিয়ে দরজার হাতলটায় হাত রাখল। ভেতরের অন্ধকার তাকে গ্রাস করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।
ভারী কাঠের তৈরি সদর দরজাটি একটু ধাক্কা দিতেই নিঃশব্দে খুলে গেল। তান্বী কাঁপাকাঁপা পায়ে ধীর পদক্ষেপে ভেতরের অতিকায় হলরুমটায় এসে দাঁড়াল। চারদিকের দেয়ালে ঝুলছে প্রাচীন সব তৈলচিত্র, আর ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা একটি রাজকীয় কালো গ্র্যান্ড পিয়ানো। সেখানে বসে এক রহস্যময় পুরুষ পিয়ানোর রিফে আঙুল ছুঁইয়ে গান গেয়ে চলেছে।
তান্বীর উপস্থিতিতে সেই পিয়ানোর সুর থামল না, এমনকি মেইলস্ট্রৌমের চোখেমুখে বিস্ময়ের এক বিন্দু আভাসও ফুটল না। মনে হলো এই ঘরে তান্বীর আগমন অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং বহু আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। সে পিয়ানো ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীরপায়ে তান্বীর দিকে এগিয়ে এসে, তাকে কেন্দ্র করে এক অদ্ভুত বৃত্তে চারপাশ ঘুরে দাঁড়াল। তান্বী আড়ষ্ট হয়ে রইল। মেইলস্ট্রোম কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে নিজের দুহাত মেলে ধরে পুরো শূন্যতাকে আলিঙ্গন করলো। সেই অবস্থাতেই সে তার মখমলি কণ্ঠের শেষ তানটুকু দিয়ে গানটি সম্পূর্ণ করল—”তুম দিল কি ধারকান মে রেহতে হো, রেহতে হো…” শেষ সুরের রেশটুকু যখন ঘরের দেওয়ালে লেগে মিলিয়ে গেল, তখন মেইলস্ট্রোমের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মনস্তাত্ত্বিক হাসি ফুটে উঠল। সে তান্বীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি জানতাম তুমি আসবে, ‘সোলফ্লেম’! আমার কাছে তোমাকে আসতেই হতো। অবশেষে তোমার গন্তব্য আমাতেই এসে শেষ হলো, তাই না? যদিও অনেকটা দেরি হয়ে গেছে, তবে শেষ ভালো যার সব ভালো তার—তাই না বলো?”
তার মুখের এই অদ্ভুত বুলি আর ‘সোলফ্লেম’ সম্বোধন তান্বীর বুকের ভেতরটায় ভয়ের কাঁপন ধরিয়ে দিল। কিন্তু এই মুহূর্তে জাভিয়ানকে বাঁচানোর উন্মাদনা তার ভয়ের চেয়েও অনেক বড়। তান্বী নিজের চোখের জল মুছে, কণ্ঠস্বর শক্ত করে বলল, “আমি এখানে কেন এসেছি, আপনি নিশ্চয়ই খুব ভালো করে জানেন। আপনিই তো মার্কো ভাইয়াকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছেন।প্লিজ, যেকোনো মূল্যে জাভিয়ানকে ওই নরক থেকে বের করার, তার মুক্তির ব্যবস্থা করে দিন সেতো আপনার ভাই হয়!”
‘জাভিয়ান’ নামটা শোনামাত্রই মেইলস্ট্রোমের হাসিমুখটা এক নিমেষে কঠোর হয়ে গেল। সে ঘর জুড়ে পায়চারি করতে করতে কিছুটা বিরক্ত এবং তাচ্ছিল্যের সুরে আওড়াতে লাগল, “জাভিয়ান! জাভিয়ান! জাভিয়ান! অদ্ভুত! তুমি কি ওকে এখনো ঘৃণা করছোনা তান্বী? ও একটা ইন্টারন্যাশনাল টেরোরিস্ট! আইনের চোখে ও একজন চরম দেশদ্রোহী এবং এই অন্ধকার ব্ল্যাক ওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত সম্রাট। অথচ, এত কিছুর পরও তুমি ওকে এখনো ঘৃণা করছোনা?”
মেইলস্ট্রোমের এই উস্কানিমূলক কথা তান্বীর কান অব্দি পৌঁছালেও তার মস্তিষ্কে কোনো প্রভাব ফেলল না। সে এখন যুক্তিতর্কের উর্ধ্বে। তান্বী দুই হাত জোড় করে তীব্র আকুতি নিয়ে বলল, “আমি এত কিছু জানি না, আর জানতেও চাইছিও না! ও মাফিয়া নাকি টেরোরিস্ট তা দিয়ে আমার কোনো লাভ নেই। আমি শুধু জাভিয়ানের মুক্তি চাই। আপনি আমাকে এই জন্যই তো এখানে আসতে বলেছিলেন, তাই না? তাহলে এবার আপনার শর্ত বলুন!”
তান্বীর মরিয়া আকুতি শুনে মেইলস্ট্রোম হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠল। সে তার পিয়ানোর ওপর থেকে একটা রিমোট তুলে নিয়ে হলের দেওয়ালে থাকা বিশাল স্ক্রিনটা অন করল। শীতল গলায় সে বলল, “শর্তের কথা পরে হবে, তার আগে তোমাকে একটা জিনিস দেখাই।” পর্দায় একে একে ভেসে উঠতে লাগল মেক্সিকোর ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস সব দৃশ্য। এই অন্ধকার জগতের যেসব গডফাদার আর টেরোরিস্টদের সরকার গ্রেফতার করেছিল, তাদের পরিণতি কী হয়েছিল—তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছিল। বুলেটবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহ, ‘ক্রসফায়ার’ এর নামে রাতের অন্ধকারে লাইনে দাঁড় করিয়ে বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়ার সেই অমানভিল নথিপত্র দেখে তান্বীর চোখের সামনে পৃথিবীটা দুলতে লাগল। ঘরের এসি চালু থাকা সত্ত্বেও তার কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম ঝরে পড়ল। এক চরম আতঙ্কে সে প্রায় জ্ঞান হারানোর অবস্থায় চলে গেল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। জাভিয়ানেরও এমন করুণ পরিণতি হবে—এই ভয়ে সে প্রায় এক প্রকার মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে মেইলস্ট্রোমের পা জড়িয়ে ধরতে গেল। কিন্তু মেইলস্ট্রোম অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে তাকে ধরে ফেলল, কোনোভাবেই নিজের পা স্পর্শ করতে দিল না। তাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে মেইলস্ট্রোম তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি জাভিয়ানের মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারব। আলতিপ্লানোর মতো দুর্ভেদ্য জেল ভেঙে তাকে বের করে আনা কেবল আমার পক্ষেই সম্ভব, তবে একটা শর্তে।”
তান্বী তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আপনি যা বলবেন আমি তাই করব। আমার জীবন চাইলে আমি তাও দিয়ে দেব, শুধু ওর প্রাণটা ভিক্ষা দিন!”
মেইলস্ট্রোম তার ঠোঁটের কোণে পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে উচ্চারণ করল, “তোমাকে জাভিয়ানকে ডিভোর্স দিয়ে আমাকে বিয়ে করতে হবে।”
শব্দগুলো তান্বীর কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল, তার মুখ থমথমে হয়ে উঠল। চিৎকার করে সে বলল, “অসম্ভব! এ হতে পারে না! আমি জাভিয়ানের স্ত্রী। আমি তাকে ডিভোর্স দিয়ে আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। এটা পাপ, এটা চরম অন্যায়!” মেইলস্ট্রোম এবার তান্বীর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন এক তীব্র অধিকারবোধ। সে ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “তাহলে আমি কেন জাভিয়ানকে ছাড়াব? তাতে আমার কী লাভ? তোমার কী মনে হয়, ইভান জাভিয়ানের মুক্তির বিনিময়ে তোমার কাছ থেকে কোটি টাকা নেবে? নাকি কোনো ক্ষমতা চাইবে? অদ্ভুত!এই টাকা, এই ক্ষমতা সব আমার পায়ের নিচে গড়াগড়ি খায়। এসব তো তোমার কাছেই নেই। তোমার কাছে আমাকে দেওয়ার মতো কী আছে শুনি? শুধু তুমি নিজে!” সে জানালার বাইরে মেক্সিকোর জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমার জীবনে সব আছে তান্বী, অঢেল সম্পদ আছে অনেক ক্ষমতা আছে, শুধু তুমি নেই। আর আমার যা কিছু আছে, তার সবটুকুর শেষ গন্তব্যই তো তুমি।”
পেন্টহাউসের সেই নিস্তব্ধ হলরুমে তান্বী এক জীবন্ত লাশে পরিণত হলো। একদিকে তার সতীত্ব, তার ভালোবাসা আর ধর্মের অনুশাসন; অন্যদিকে তার স্বামীর নিশ্চিত মৃত্যুর পরোয়ানা। ইভানের মুখ থেকে এমন কুৎসিত এবং অভাবনীয় শর্ত শোনার পর তান্বী আর নিজের ভেতর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। তার এতক্ষণের ধরে রাখা সব শক্তি এক নিমেষে উবে গেল। সে দুই হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার বুক চিরে বেরিয়ে আসা সেই আর্তনাদ হাউসের বিশাল হলরুমের পাথুরে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে এক করুণ প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করল। তার কান্না কোনোভাবেই থামছিল না, এক তীব্র যন্ত্রণায় তার পুরো শরীর সংকুচিত হয়ে আসছিল। তান্বীর এই বাঁধভাঙা কান্না দেখে ইভানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ঘরের ভেতরের শান্ত পরিবেশটা এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। সে অত্যন্ত বিরক্ত এবং কঠোর গলায় গর্জে উঠল, “কান্না বন্ধ করো তান্বী! এই কান্না আমার একদম সহ্য হচ্ছে না।” সে ধীরপায়ে তান্বীর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন একাধারে ক্রোধ আবার চরম অধিকারবোধ। সে পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে সময় দেখে সে অত্যন্ত ঠান্ডা হুঁশিয়ারি কণ্ঠে বলল, “আমি তোমাকে নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করার জন্য ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিলাম। এই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তুমি চিন্তা করে নিজের শেষ সিদ্ধান্ত আমাকে জানাবে। হয় জাভিয়ানের ডিভোর্স পেপার আর আমার গলার মালা, না হয় মেক্সিকোর ডাস্টবিনে জেনো জাভিয়ানের বুলেটবিদ্ধ লাশ—সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তোমার।”
কথাটা শেষ করেই ইভান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। তার বুটের খটখট শব্দ তুলে সে হনহন করে হলরুম থেকে বেরিয়ে গেল। ভারী কাঠের দরজাটা এক বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে যেতেই পুরো প্রাসাদে আবার সেই ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এল। তান্বী তখনো সেই ঠান্ডা মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে অঝোরে কাঁদছে। ঘরের এক কোণে রাখা দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটা তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, জাভিয়ানের জীবনের আয়ু ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। একদিকে তার নিজের পবিত্র ভালোবাসা, অন্যদিকে জাভিয়ানের নিশ্চিত মৃত্যু—এই চব্বিশ ঘণ্টার গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে তান্বী এখন কোন নরকের পথ বেছে নেবে?
ইভান চলে যাওয়ার পর সেই বিশাল, নিস্তব্ধ ঘরে তান্বী মেঝের ওপর অবশ হয়ে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে তখনো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু কান্নার সেই তীব্র বেগ হঠাৎ করেই অলৌকিক শান্ততায় রূপ নিয়েছে।সময় ফুরিয়ে আসছে, আর তাকে বেছে নিতে হবে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। সে শূন্য দৃষ্টিতে জানালার ওপাশে তাকিয়ে ভাবতে লাগল যদি জাভিয়ান এই পৃথিবীতে বেচেই না থাকে, তবে সে কাকে ভালোবাসবে? এই শূন্য হৃদয়ের ভালোবাসা তখন কাকে জড়িয়ে বাঁচবে? কার জন্য সে প্রতিদিন সকালে চোখ মেলবে? তার চেয়ে অন্তত জাভিয়ান বেঁচে থাকুক। সে যদি অন্য কারো হয়েও যায়, তবুও অন্তত দূর থেকে কোনো একদিন সে দেখতে পাবে যে তার ভালোবাসা, তার স্বামী এই পৃথিবীর বুকে বেঁচে আছে, মুক্ত আকাশে প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। জাভিয়ানের বেঁচে থাকার আনন্দের চেয়ে তান্বীর নিজের সুখ বড় হতে পারে না।
তাকে বাঁচানোর জন্য যদি নিজের পবিত্র ভালোবাসা, নিজের স্বামীকে এভাবে স্যাক্রিফাইস বা বিসর্জন দিতেই হয়, তবে সে তাই করবে। তবুও তো জাভিয়ানের বুকে ওই নির্মম বুলেটগুলো লাগবে না, সে তো বেঁচে যাবে! তান্বী নিজের বুকের ওপর হাত রেখে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজ যদি আমার জায়গায় জাভিয়ান হতো, আর আমাকে বাঁচানোর জন্য যদি তাকে এমন কোনো নরকের পথ বেছে নিতে হতো সেও কি পিছপা হতো? না, জাভিয়ান হলে সেও আমাকে বাঁচাতে ঠিক এই সিদ্ধান্তই নিতো।” এই ভাবনামাত্রই তান্বীর চোখের জল শুকিয়ে গেল, তার মনের সব দ্বিধা এক নিমেষে কেটে গেল। তার ভালোবাসার শক্তি আজ তাকে এক ভয়ংকর পাপের পথকে বরণ করে নেওয়ার সাহস দিচ্ছে। জাভিয়ানের প্রাণের বিনিময়ে সে নিজের আত্মাকে নরকের আগুনে পুড়িয়ে মারতে প্রস্তুত। চব্বিশ ঘণ্টার সেই ডেডলাইন শেষ হওয়ার আগেই তান্বী তার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং নির্মম সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলল।
রাত তখন গভীর। বাইরে মেক্সিকোর পাহাড়ি হাওয়া শায়শায় শব্দ তুলছিল। ঠিক তখনই ভারী বুটের শব্দে পেন্টহাউসে ফিরে এল ইভান। তার চোখেমুখে ছিল তান্বীকে ভেঙে পড়তে দেখার এক নিষ্ঠুর কৌতূহল। কিন্তু হলরুমের আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা তান্বীর অবয়বে এখন আর কোনো কান্নার লেশমাত্র নেই। সেখানে স্থান করে নিয়েছে এক পাথুরে দৃঢ়তা।
ইভানকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই তান্বী কয়েক পা এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপল না, অত্যন্ত স্থির গলায় সে বলল, “আমি আপনার শর্তে রাজি আছি। আমি জাভিয়ানকে ডিভোর্স দিয়ে আপনাকে বিয়ে করব।”
কথাটা শোনামাত্র ইভানের চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠল। এক পৈশাচিক বিজয়ের উল্লাসে সে দুই হাত বাড়িয়ে তান্বীকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরতে গেল। কিন্তু সে স্পর্শ করার ঠিক আগের মুহূর্তে তান্বী তীব্র ঘৃণায় আর শক্তিতে তাকে দুই হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে পিছিয়ে দিল। ইভান আকস্মিক এই ধাক্কায় কিছুটা চমকে উঠে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তান্বী তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত কড়া এবং স্পষ্ট ভাষায় বলল, “পিছিয়ে যান। আমার একটা ছোট অনুরোধ… কিংবা বলতে পারেন আমার চূড়ান্ত একটা শর্ত। বিয়ের আগে আপনি আমাকে ভুলেও স্পর্শ করার চেষ্টা করবেন না। আইনত এবং ধর্মীয় দিক থেকে আমি এখনো জাভিয়ানের স্ত্রী। যতক্ষণ না সব নিয়ম মেনে আমাদের বিয়ে হচ্ছে, ততক্ষণ আমি অন্য কারো ছোঁয়া সহ্য করব না।” তান্বীর এই অপ্রত্যাশিত দৃঢ়তা দেখে ইভান ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘরের ভেতরের নীরবতায় শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ইভান কিছুক্ষণ গভীরভাবে তান্বীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, সে আসলে বোঝার চেষ্টা করছিল এই মেয়েটির ভেতরের শক্তির উৎস ঠিক কোথায়। হঠাৎ করেই তার ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা, অহংকারী হাসি ফুটে উঠল। সে মাথা নেড়ে বলল, “রাইট! তুমি ঠিকই বলেছ সোলফ্লেম। অন্য কারো জিনিস স্পর্শ করার সস্তা মানসিকতা ইভানের নেই। আমি তোমায় এখনই জোর করে ছুঁয়ে এই পবিত্র জেদটা নষ্ট করতে চাই না। যখন তুমি আইনি আর ধর্মীয়ভাবে একান্তই আমার হয়ে যাবে, সেদিন আমি তোমাকে পুরোপুরি নিজের করে নিবো। তার আগে অব্দি তুমি মুক্ত।”
সেই পেন্টহাউসে জাভিয়ানের জীবনের বিনিময়ে এক অদ্ভুত অসম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। তান্বী নিজেকে এক অলিখিত খাঁচায় বন্দী করে জাভিয়ানের মুক্তির আকাশ কিনে নিল।
পেন্টহাউসের দোতলার সেই অন্ধকার ঘরটিতে সারারাত আলো জ্বলছিল। সেখানে কোনো পিয়ানোর সুর ছিল না, ছিল কেবল গা শিউরে ওঠা ফিসফিসানি শব্দ। ঘরের ঠিক মাঝখানের দেয়ালে টাঙানো তান্বীর এক বিশাল তৈলচিত্র, আর তার ঠিক নিচে একটি কাঁচের জারে রাসায়নিক তরলে সংরক্ষিত রয়েছে ইভানের মৃত মা ইসাবেলার সেই হৃৎপিণ্ড। ইভান সারারাত সেই ছবি আর কাঁচের জারের সামনে দাঁড়িয়ে পায়চারি করেছে। কখনো সে হালকা কেঁদেছে, আবার কখনো বিজয়ের হাসিতে ফেটে পড়েছে। জারের গায়ে হাত রেখে সে ফিসফিস করে বলছিল, “দেখো মম… অবশেষে তান্বী ফিরে এসেছে আমার কাছেই। শেষ পর্যন্ত জিতটা আমারই হলো, মম! জাভিয়ান হেরে গেছে। আমি জানতাম, এই পৃথিবীতে এমন কিছুই নেই যা এই ইভান পাবে না। জাভিয়ান এখন শৃঙ্খলিত, আর ওর সবচেয়ে দামী রত্নটা এখন আমার হাতের মুঠোয়।”
পরদিন সকাল হতেই পেন্টহাউসে এসে হাজির হলো মেক্সিকোর এক নামকরা কুখ্যাত উকিল। তার হাতে বেশ কিছু আইনি নথিপত্র আর ডিভোর্স পেপার। ইভান গম্ভীর গলায় তান্বীকে নিচে ডেকে পাঠাল। তান্বী যখন সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল, তার চোখ দুটো সারারাতের জাগরণে লাল হয়ে আছে। উকিল সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে কাগজের ওপর আঙুল রেখে বললেন, “এই যে দেখুন মিস তান্বী, মিস্টার জাভিয়ানের জামিন আর মুক্তির সমস্ত আইনি কাগজপত্র একদম রেডি। কয়দিনের মধ্যেই উনি আলতিপ্লানোর সেই সেল থেকে বের হয়ে আসবেন।”
তান্বী অবিশ্বাস্য চোখে কাগজগুলোর দিকে তাকাল। যে দুর্ভেদ্য কারাগার থেকে মাফিয়া সম্রাটরাও কোনোদিন বের হতে পারে না, সেখান থেকে মাত্র কয়েকদিনেই জাভিয়ানের মুক্তি কীভাবে সম্ভব? সে বিস্ময় আর শঙ্কাভরা কণ্ঠে ইভানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “কীভাবে হলো এটা? মেক্সিকোর আইন এত বড় অপরাধীকে এত সহজে ছেড়ে দিচ্ছে?”
ইভান সোফায় হেলান দিয়ে বসে একটা চুরুট ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে সে অহংকারী গলায় বলল, “মেইলস্ট্রোম পারে না, এই ব্ল্যাক ওয়ার্ল্ডে এমন কিছুই নেই তান্বী। জাভিয়ানের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল ডার্ক ওয়েবে সেই পাসকোড লিক করা, তাই তো? ওই পাসকোড যে আসলে জাভিয়ান লিখ করেনি, তার সব প্রমাণ এখন আমার হাতে। পাসকোড হ্যাক করা হয়েছে এমনটাই আদালতে দেখানো হবে। আর কে হ্যাক করেছে—সেই আসল আসামিও আমি নিজে তৈরি করে কোর্টের সামনে হাজির করে দেবো।”
তান্বী স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে উকিলের হাতের কাগজের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “মানে? তার মানে কী? কেউ নিজের ঘাড়ে এত বড় দেশদ্রোহিতার দোষ কেন নেবে? অন্য কেউ কেন জাভিয়ানের বদলে সারাজীবন জেলে পচে মরতে রাজি হবে?”
ইভান এবার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তান্বীর খুব কাছে এসে তার মুখের ওপর গরম ধোঁয়া ছেড়ে এক পৈশাচিক শীতলতায় বলল, “কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, নিজের ঘাড়ে দোষ নিয়ে যদি সে আলতিপ্লানোর ‘যাপিত জীবন’ জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে না যায় তবে আমার হাতে কুকুরের মতো মরতে হবে। আমার হাত থেকে বাঁচার জন্য মেক্সিকোর জেলের চেয়ে নিরাপদ জায়গা ওর জন্য আর দ্বিতীয়টি নেই! তাই সে সানন্দে রাজি হয়েছে।”
ইভান তান্বীর থুতনিটা স্পর্শ করতে গিয়েও কালকের শর্তের কথা মনে করে হাতটা গুটিয়ে নিল। সে বাঁকা হেসে বলল, “তোমার এত কিছু দেখে লাভ নেই সোলফ্লেম। জাভিয়ান মুক্তি পেলেই তো হলো, তাই না? নাকি এখনো তোমার মনে অন্য কোনো দ্বিধা আছে?”
ইভানের এই ঠান্ডা মাথার চাল দেখে তান্বী বুঝতে পারল, সে এক পরম শক্তিশালী ও বিপজ্জনক দানবের জালে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। জাভিয়ানের মুক্তির আকাশ হয়তো কেনা হয়ে গেছে, কিন্তু তার বিনিময়ে তান্বীর নিজের জীবন এখন চিরতরে অন্ধকূপে হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়।
ইভান এবার টেবিলের ওপর থেকে খসখসে ডিভোর্স পেপারটা তান্বীর দিকে এগিয়ে দিল। তার চোখে তখন এক তীব্র, অধৈর্য চাতুর্য। সে শীতল গলায় বলল, “সাইন করো। তুমি এখানে সই করলেই আজকের মধ্যে জাভিয়ানের মুক্তির সমস্ত প্রমাণ কোর্টে জমা পড়ে যাবে। আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই ও আলতিপ্লানোর কারাগার থেকে চিরতরে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসবে।”
ডিভোর্স পেপারটা হাতে নিতেই তান্বীর মাথার ওপর আক্ষরিক অর্থেই আকাশ ভেঙে পড়ল। কাগজের সাদা পৃষ্ঠাটা তার কাছে এক টুকরো ধারালো কাঁচের মতো মনে হতে লাগল। তার হাত থরথর করে কাঁপছে, চোখের কোণে টলমল করছে নোনা জল। ঝাপসা চোখে সে কাগজের বুকে নিজের আর জাভিয়ানের নামটা দেখছিল। মুহূর্তেই তান্বীর চোখের সামনে ভেসে উঠল জাভিয়ানের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটি স্মৃতি আর তাঁর সেই চওড়া বাহুর ওম। এই একটা সই, আর তার পরেই সে আইনিভাবে জাভিয়ানের পর হয়ে যাবে। আর কোনোদিন সে জাভিয়ানের বুকে মাথা রেখে শান্তিতে চোখ বুজতে পারবে না। জাভিয়ানকে ছাড়া কীভাবে বাঁচবে তান্বী? একই শহরে, একই আকাশের নিচে থেকেও সে কোনোদিন জাভিয়ানের কাছে যেতে পারবে না। এই জীবন্ত মৃত্যুর যন্ত্রণা সে কীভাবে সহ্য করবে?
তান্বীকে এভাবে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভেঙে পড়তে দেখে ইভান এবার নিজের ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। তার ভেতরের হিংস্র মাফিয়া রূপটা বেরিয়ে এল। সে রাগ চিৎকার করে টেবিল চাপড়ে বলল, “দরকার নেই তোমার সাইন করার! জাভিয়ান জেলেই পচে মরুক, না হয় আজ রাতেই ও ক্রসফায়ারে শেষ হয়ে যাক।”
ইভান পেপারটা টেনে নিতেই তান্বী আবার পাগলের মতো মিনতি করে উঠল, “না, না! প্লিজ ইভান ভাইয়া, এমন করবেন না!” সে আর এক মুহূর্তও ভাবল না। চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু কাগজের বুকে টুপ করে খসে পড়ার মাঝেই, কাঁপাকাঁপা হাতে কলমটা চেপে ধরে সে সই করে দিল। ইভান তখন পৈশাচিক খুশিতে তান্বীর হাত থেকে ডিভোর্স পেপারটা প্রায় ছিনিয়ে নিল। কিন্তু কাগজের বুকে চোখ পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, কপাল জুড়ে রাগের শিরাগুলো জেগে উঠল। সে তান্বীর সইটার দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল, “তান্বী এমিলিও চৌধুরী! তুমি এখনো নিজের নামের পাশে ওর পদবী নাম লিখেছ কেন?”
রাগে অন্ধ হয়ে ইভান হাতের কলমটা দিয়ে পৈশাচিক হিংস্রতায় কাগজের বুক থেকে ‘এমিলিও চৌধুরী’ নামটা কেটে কুটি কুটি করে দিল, তারপর সে এক ঝটকায় তান্বীর নরম হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার নখের তীব্র চাপ তান্বীর চামড়ায় বসে গেল। ইভান তান্বীর চোখের দিকে তাকিয়ে হিংস্র বন্য পশুর মতো ফিসফিস করে বলল, “এখানে ‘রেহমান’ লেখো। লেখো—তান্বী রেহমান!”
অবশেষে জাভিয়ানের জীবনের বিনিময়ে সেই অভিশপ্ত ডিভোর্স পেপারে তান্বীর সই হয়ে গেল। কাগজের বুকে রক্তের মতো লাল কালিতে লেখা ‘তান্বী রেহমান’ নামটার দিকে তাকিয়ে ইভানের ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে পরম যত্নে কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের ওপর রাখল। ইভান এবার সোফায় বসে থাকা সেই কুখ্যাত উকিলের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন একাধারে নিষ্ঠুরতা এবং তীব্র প্রতিশোধের নেশা। সে কাগজটা উকিলের দিকে এগিয়ে দিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল, “নাও, আমার শিকার তার কাজ শেষ করে দিয়েছে। এবার এই কাগজটা আলতিপ্লানো কারাগারে বন্দী জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর কাছে নিয়ে যাও। তবে মনে রেখো, এটা কোনো সাধারণ আইনি নোটিশ নয়; এটা মেইলস্ট্রোমের তরফ থেকে ওর জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় ‘উপহার’।”
‘উপহার’ শব্দটা শুনে তান্বীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, ইভান জাভিয়ানকে মানসিকভাবে তাকে জ্যান্ত কবর দিতে চাইছে।
ইভান উকিলকে উদ্দেশ্য করে আবার বলল, “জেলে গিয়ে ওকে স্পষ্ট বলবে বাইরে ওর সাজানো সাম্রাজ্য যেমন ধুলোয় মিশে গেছে, ঠিক তেমনি ওর সবচেয়ে দামী রত্নটাও এখন অন্য কারো ঘরে আলো ছড়াচ্ছে। ও যেনো আর কোনো দ্বিধা না রেখে এই পেপারে সই করে দেয়। ও সই করলেই মুক্তির অর্ডার কার্যকর হবে।
উকিল সাহেব কুটিল হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলেন এবং ফাইলটি ব্যাগে পুরে নিলেন। তান্বী তখন দেওয়ালের ওপাশে মুখ ফিরিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছিল। সে মনে মনে ভাবছিল জাভিয়ান যখন এই কাগজে তার সই দেখবে, যখন জানবে তার জিন্নীয়া আজ তাকে ডিভোর্স দিয়েছে তখন তাঁর মনের অবস্থা কী হবে? জাভিয়ান কি তান্বীর এই নিরুপায় আত্মত্যাগ বুঝতে পারবে, নাকি তীব্র ঘৃণায় চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নেবে?
মেক্সিকোর ‘আলতিপ্লানো’ কারাগার। মাটির নিচে স্তরে স্তরে সাজানো এই কংক্রিটের নরক থেকে আজ অব্দি কোনো বন্দি নিজের ইচ্ছায় জীবিত ফিরতে পারেনি। ইন্টারপোলের বিশেষ নজরদারি এবং সামরিক প্রহরার মাঝে জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীকে রাখা হয়েছিল জেলের সবচেয়ে সুরক্ষিত আইসোলেশন উইংএ।
বিগত বাহাত্তর ঘণ্টা জাভিয়ানের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। মেক্সিকান ফেডারেল পুলিশ এবং ইন্টারপোলের কাউন্টার সাইবার ক্রাইম ইউনিট তাকে বিরতিহীন রিমান্ডে নিয়েছিল। সাউন্ডপ্রুফ জেরা কক্ষে তীব্র ফ্লাডলাইটের আলোর নিচে তাকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঘুমাতে দেওয়া হয়নি এক সেকেন্ডের জন্যও। Cicada 3301 এর মূল সার্ভার কোড এবং ‘নাইট রেভেন’ এর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ব্লুপ্রিন্ট বের করার জন্য তার ওপর মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কিন্তু জাভিয়ানের পাথুরে চোয়াল ভাঙতে পারেনি তারা। শরীরের চামড়ায় রিমান্ডের ক্লান্তি আর ধূসর কয়েদির পোশাক থাকলেও, তার চোখের সেই রাজকীয় অহংকার বিন্দুমাত্র কমেনি। সে কোনো স্বীকারোক্তিতে সই করেনি, একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি তার ঠোঁট থেকে। সে জানত, বাইরে সায়েম চৌধুরী তাকে ত্যাজ্য করেছেন, কিন্তু তার মন পড়ে ছিল ভিলা এস্পেরেন্জার সেই চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকা মেয়েটির কাছে।
আলতিপ্লানো জেলে বাইরের কোনো সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই, এমনকি কোনো চিঠি বা পার্সেলও কড়া স্ক্রিনিং ছাড়া ভেতরে যায় না। কিন্তু ইভানের ক্ষমতা মেক্সিকোর বিচার ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়ানো। সে সরাসরি কোনো বেআইনি পথ বেছে নেয়নি, বরং আইনের গলিপথ ব্যবহার করেছে। ইভানের নিযুক্ত মেক্সিকোর সবচেয়ে দামী এবং প্রভাবশালী ক্রিমিনাল ল ইয়ার, ব্যারিস্টার কার্লোস হিউম্যান রাইটস এবং লিগ্যাল প্রিভিলেজ এর দোহাই দিয়ে আদালতে জরুরি আবেদন জানান। আইন অনুযায়ী, যেকোনো বন্দির বিচার চলাকালীন তার আইনি পরামর্শদাতার সাথে গোপনে দেখা করার এবং আইনি নথিপত্রে সই নেওয়ার অধিকার রয়েছে। আদালত থেকে এই স্পেশাল পারমিশন বা অ্যাটর্নি ভিজিট অর্ডার বের করে নেন কার্লোস। কারাগারের মূল ফটকে তিনটি মেটাল ডিটেক্টর এবং এক্সরে স্ক্যানার পার হয়ে কার্লোসের চামড়ার ব্রিফকেসটি যখন ভেতরে ঢুকল, তখন গার্ডরা শুধু দেখল সেখানে কিছু লিগ্যাল ডকুমেন্ট আর ডিভোর্স পেপার আছে। আইন অনুযায়ী অ্যাটর্নি ক্লায়েন্ট প্রিভিলেজের কারণে গার্ডরা সেই আইনি কাগজ বাজেয়াপ্ত করতে পারেনি। এভাবেই ইভানের পাঠানো বিষাক্ত বুলেটটি আইনি পথেই জাভিয়ানের সেলের সামনে এসে পৌঁছাল।
ভারী লোহার দরজাটি বিকট শব্দে খুলে গেল। কাঁচের বুলেটপ্রুফ দেয়ালের ওপাশে এসে বসল জাভিয়ান। তার দুই হাতে তখনো ভারী হাতকড়া, তার ঠিক ওপাশে বসল কার্লোস। কার্লোস কুটিল হেসে ইন্টারকমে বলল, “মিস্টার জাভিয়ান, রিমান্ডের ধকল কেমন গেল? বাইরে থেকে আপনার জন্য একটা বিশেষ উপহার এনেছি।” সে ফাইলটি জাভিয়ানের দিকে ঠেলে দিল। জাভিয়ান অত্যন্ত শান্ত ও ক্লান্ত চোখে ফাইলের প্রথম পাতাটি উল্টাল। ডিভোর্স পিটিশন। তার চোখ জোড়া এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। আর যখন সে কাগজের একদম নিচে তাকাল, তার বুকের ভেতর কোনো এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি স্তব্ধ হয়ে গেল।
সেখানে কাঁপাকাঁপা হাতের সই, যার ওপরের এমিলিও চৌধুরী অংশটি কলম দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে কেটে কুটি কুটি করা, আর তার পাশেই লেখা তান্বী রেহমান। এত বড় রিমান্ডের থার্ড ডিগ্রি টর্চারও জাভিয়ানের চোখে যে জল আনতে পারেনি, এক টুকরো কাগজের এই নামটা দেখে তার ভেতরের পুরো জগতটা এক নিমিষে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। কার্লোস ফিসফিস করে বলল, মেইলস্ট্রোমের স্পষ্ট বার্তা এখানে সই করলে কয়েদিনের মধ্যে জামিন, আর সই না করলে আলতিপ্লানোর এই সেলেই আপনার ডেডবডি পাওয়া যাবে। এবার বেছে নিন, সম্রাট।”
কাগজের নিচে তান্বীর হাতের চেনা অক্ষরে লেখা নিষ্ঠুর বাক্যগুলোর ওপর জাভিয়ানের দৃষ্টি আটকে রইল। সেখানে লেখা—”সাইন করে দিও জাভিয়ান। তোমার মতো একজন টেরোরিস্টের সাথে আমি থাকতে পারব না। আর থাকবই বা কীভাবে? তুমি তো কোনোদিন জেল থেকে বের হতেই পারবে না। আমি কি সারাজীবন তোমার জন্য অপেক্ষা করব? এটা সম্ভব নয় জাভিয়ান, কারো জন্য কারো জীবন থেমে থাকে না। প্লিজ, সাইন করে আমাকে মুক্তি দাও।”
শব্দগুলো একেকটি বিষাক্ত তীরের মতো জাভিয়ানের বুকে এসে বিঁধছিল। কিন্তু যতই সে লেখাটার দিকে তাকাচ্ছিল, তার চোখের ভেতরের বিষণ্ণতা কেটে গিয়ে সেখানে এক তীব্র, তীক্ষ্ণ আলো জ্বলে উঠল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, হাতের রগগুলো ফুলে উঠল।
জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী আর যাই হোক, বোকা নয়। সে তান্বীকে চেনে। সে তান্বীর আত্মার স্পন্দন চেনে। যে মেয়েটি তার সামান্যতম রাগে চাতক পাখির মতো কেঁদে বুক ভাসায়, সে তাকে টেরোরিস্ট বলে ঘৃণা করে ডিভোর্স দিবে এটা অসম্ভব! তান্বী নিজের ইচ্ছায় এই কাজ কখনো করতে পারে না। এই লেখার পেছনে, এই ডিভোর্স পেপারের পেছনে এক গভীর, কুৎসিত ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে। যেভাবে হোক, সত্যটা তাকে জানতেই হবে; তান্বীর মুখোমুখি তাকে দাঁড়াতেই হবে। জাভিয়ান তার ভেতরের ঝড়টাকে কোনোমতে চেপে রেখে অত্যন্ত শান্ত, কিন্তু হাড় কাঁপানো শীতল গলায় উকিল কার্লোসকে বলল, “আমি সই করব। তবে এই কাগজে কলম ছোঁয়ানোর আগে, আমি তান্বীর সাথে দেখা করতে চাই। ও নিজে এসে আমার সামনে দাঁড়াবে, তারপর আমি সই দেব।”
কার্লোস একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে চশমাটা ঠিক করল। সে অত্যন্ত অহংকার নিয়ে বলল, “মিস্টার জাভিয়ান, আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন আপনি কোথায় আছেন। আর তা ছাড়া, মিস তান্বী এখন মেক্সিকোর অন্ধকার জগতের নতুন সম্রাট—মেইলস্ট্রোমের পেন্টহাউসে আছেন। তিনি পরম সুখে ও নিরাপদে আছেন, আপনার এই নরককুণ্ডে আসার কোনো ইচ্ছে বা সময় তাঁর নেই।”
মেইলস্ট্রৌমের পেন্টহাউস শব্দ দুটো কান দিয়ে মগজে পৌঁছানো মাত্রই জাভিয়ানের মাথাটা এক নিমিষে ঘুরে গেল। হিতাহিত জ্ঞান, আইনি পরিণতি, জেলের নিয়ম—সবকিছু তার মস্তিষ্ক থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেল। তার জিন্নীয়া, তার পবিত্র ভালোবাসা আজ ওই পৈশাচিক ইভানের ডেরায় বন্দি। পরের মুহূর্তেই জেরা কক্ষের শান্ত পরিবেশ এক ভয়াবহ নরককুণ্ডে পরিণত হলো। দুই হাতে ভারী হাতকড়া পরা থাকা অবস্থাতেই জাভিয়ান এক তীব্র বন্য পশুর মতো গর্জে উঠল। লোহার কর্কশ আওয়াজ ছাপিয়ে সে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ওপাশে থাকা কার্লোসের ওপর। “হারামজাদা তোর এত বড় সাহস!”
হাতকড়া পরা দুই হাত একসাথে জড়ো করে সে হাতুড়ির মতো কার্লোসের মুখের ওপর আঘাত করল। প্রথম আঘাতেই কার্লোসের চশমা ভেঙে চোখের ভেতর ঢুকে গেল, নাকমুখ ফেটে রক্তের ফোয়ারা ছুটল। জাভিয়ান তখন উন্মাদ। সে হাতকড়ার ভারী লোহার চেইনটা কার্লোসের গলায় পেঁচিয়ে ধরে দেয়ালের সাথে আছড়াতে লাগল। লোহার হাতকড়াটাই এখন তার সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র। হাতকড়ার প্রতিটি আঘাতে কার্লোসের হাড় ভাঙার মটমট শব্দ হতে লাগল। সে যন্ত্রণায় চিৎকার করারও সুযোগ পেল না, মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে রক্তের সাগরে ভাসতে লাগল।
জেরা কক্ষের অ্যালার্ম তখন তীব্র শব্দে বেজে উঠেছে। “বন্দি বিদ্রোহী হয়েছে।শুট হিম।” চিৎকার করতে করতে দরজার লক ভেঙে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল দশবারোজন সশস্ত্র মেক্সিকান কমান্ডো। তারা রাইফেলের বাট দিয়ে জাভিয়ানকে আঘাত করতে লাগল। কিন্তু জাভিয়ান যেন এক জ্যান্ত কঙ্কাল, কোনো আঘাতই তাকে থামাতে পারছিল না। রক্তমাখা হাতকড়া উঁচিয়ে সে গার্ডদের দিকে তাকিয়ে বন্য পশুর মতো হাসছিল আর চিৎকার করছিল “ইভান! আমি আসছি! মেক্সিকোর মাটি খুঁড়ে তোকে আর তোর সাম্রাজ্যকে কুটি কুটি না করা পর্যন্ত এই নাইট রেভেন মরবে না!”
অবশেষে চারপাঁচজন গার্ড মিলে তার পিঠে ইলেকট্রিক শক পুশ করতেই জাভিয়ানের দেহটা মেঝেতে আছড়ে পড়ল। কিন্তু অবশ হয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্তেও তার চোখ জোড়া লাল হয়ে জ্বলছিল, আর ঠোঁটের কোণে ছিল মেইলস্ট্রোমের ধ্বংসের অমোঘ প্রতিজ্ঞা।
কার্লোসকে রক্তাক্ত করার অপরাধে জাভিয়ানকে ডাবল লকআপের আন্ডারগ্রাউন্ড সেলে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। চারদিকে সিসিটিভি ক্যামেরা, আর দরজার ওপাশে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র প্রহরা। কিন্তু ইভানের ওই একটা কথাই জাভিয়ানের মগজে বিষের মতো চরে বেড়াচ্ছিল—*তান্বী এখন মেইলস্ট্রোমের পেন্টহাউসে।* তাকে এখান থেকে বের হতেই হবে, মেক্সিকোর এই লোহার দেয়াল তাকে আটকে রাখতে পারবে না।
জাভিয়ানের সেলের দায়িত্বে ছিল মেক্সিকান ফেডারেল পুলিশের এক অসৎ এবং লোভী চিফ সার্জেন্ট, নাম ‘ডিয়েগো’। ডিয়েগোকে পুরো ডিপার্টমেন্ট চিনত জুয়া আর মাদকের নেশার জন্য। জাভিয়ান বিগত কয়েকদিন ধরে ডিয়েগোর মনস্তত্ত্ব খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। সে জানত, এই পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যাকে সঠিক মূল্যে কেনা যায় না।
রাত তখন প্রায় তিনটা। ডিয়েগো যখন সেলের বাইরে এসে চুরুট ধরাল, জাভিয়ান অন্ধকারের মাঝখান থেকে অত্যন্ত নিচু, কিন্তু তীব্র সম্মোহনী গলায় ইংরেজিতে বলল, “সার্জেন্ট ডিয়েগো… এই কর্কশ বুট আর বারুদের গন্ধের মাঝে জীবন পার করে আর কত? মেক্সিকান সরকারের এই সস্তা বেতনে তোমার জুয়ার ধার শোধ হচ্ছে তো?”
ডিয়েগো চমকে উঠে রিভলভারে হাত দিয়ে সেলের গরাদের সামনে এসে দাঁড়াল, “মুখ বন্ধ রাখো, কয়েদি!”
জাভিয়ান হালকা হাসল। সে গরাদের কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “একটা সুযোগ দিচ্ছি ডিয়েগো। সুইজারল্যান্ডের ‘ইউবিএস’ (UBS Bank) ব্যাংকের একটা সিক্রেট এনামেলড অ্যাকাউন্ট, যা কেবল আমার চোখের রেটিনা আর একটা ক্লাউড পাসকোড দিয়ে খোলে। সেখানে এই মুহূর্তে ১০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১২০ কোটি টাকা) অলস পড়ে আছে। তুমি যদি আমাকে এখান থেকে বের হওয়ার একটা রাস্তা করে দাও, তবে ওই পাসকোড আর অ্যাকাউন্টের পুরো এক্সেস তোমার।”
১০ মিলিয়ন ডলার! শোনামাত্রই ডিয়েগোর চোখের মণি দুটো লোভের আগুনে চকচক করে উঠল। এই টাকা পেলে সে মেক্সিকো ছেড়ে রাতারাতি কোনো ক্যারিবিয়ান দ্বীপে গিয়ে রাজার মতো জীবন কাটাতে পারবে। কিন্তু সে ভয় পেয়ে বলল, “এটা আলতিপ্লানো! এখান থেকে পালানো অসম্ভব। সিসিটিভি ক্যামেরা…”
জাভিয়ান ডিয়েগোর দুর্বলতা বুঝে নিয়ে চালটা চালল, “অসম্ভব বলে কিছু নেই। আজ রাত ৪টায় যখন মেইন গ্রিডের সার্ভার ব্যাকআপ নেওয়ার জন্য সিসিটিভি ঠিক ৩০ সেকেন্ডের জন্য লুপে (হোল্ড) যাবে, তখন তুমি পেছনের লন্ড্রি ভ্যানের এক্সিট রুটটা ক্লিয়ার রাখবে। আর এই নাও তোমার প্রথম কিস্তি—”
জাভিয়ান তার কয়েদির শার্টের কলারের ভেতরের সেলাই ছিঁড়ে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের চিপ বের করল। “এটা ডার্ক ওয়েবের একটা ক্রিপ্টো ওয়ালেটের পাসকোড। এতে অলরেডি এক লাখ ডলার আছে। চেক করে নাও। বাকি ১০ মিলিয়ন ডলার পাবে লন্ড্রি ভ্যানের চাবি আমার হাতে দেওয়ার পর।”
লোভের কাছে ডিয়েগোর সব আইনি সততা বালি খণ্ডের মতো উড়ে গেল। সে তার পার্সোনাল ট্যাবে চিপটি স্ক্যান করতেই দেখল সত্যিই সেখানে এক লাখ ডলারের বিটকয়েন জ্বলজ্বল করছে। ডিয়েগো আর দ্বিধা করল না। রাত ঠিক ৩টা বেজে ৫৯ মিনিট। ডিয়েগো অত্যন্ত সন্তর্পণে জাভিয়ানের সেলের লক খুলে দিল। জাভিয়ান বাঘের মতো নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এল। ডিয়েগো কাঁপাকাঁপা হাতে তার দিকে একটা লন্ড্রি প্রহরীর ইউনিফর্ম আর ব্যাকআপ পাসকোডের একটি বায়োমেট্রিক কার্ড এগিয়ে দিল।
“লন্ড্রি এরিয়ার পেছনের ৩ নম্বর ভ্যানের নিচে চাবি গোঁজা আছে। জলদি করো, সার্ভার রিবুট হতে আর মাত্র ১৫ সেকেন্ড বাকি!” ডিয়েগো ফিসফিস করে বলল। জাভিয়ান ডিয়েগোর চোখের দিকে তাকিয়ে সেই চিরচেনা নাইট রেভেন এর মতো ঠান্ডা গলায় সুইশ ব্যাংকের মূল পাসকোডটি উচ্চারণ করল “Jinniyah_666#! উপহারটা উপভোগ করো, সার্জেন্ট। কথাটি বলেই জাভিয়ান অন্ধকারের ছায়ার সাথে মিশে গেল।
ঠিক ৪টা বেজে ৩০ মিনিটে আলতিপ্লানো কারাগারের পেছনের ময়লা ফেলার গেট দিয়ে একটা ধূসর লন্ড্রি ভ্যান তীব্র গতিতে বেরিয়ে গেল। গেটের গার্ডরা ডিয়েগোর দেওয়া ভুয়া ক্লিয়ারেন্স কোডের কারণে গাড়িটি চেক করেনি। শহরের শেষ সীমানায় এসে জাভিয়ান গাড়িটি থামাল। সে যখন ম্যাপটার দিকে তাকাল, তার চোখে তখন কেবল রক্তের নেশা। যে আরেকটা পাসকোডের জন্য ইন্টারপোল তাকে রিমান্ডে নিয়েছিল, সেই পাসকোডের এক শতাংশ লোভ দেখিয়ে সে আজ মেক্সিকোর সবচেয়ে সুরক্ষিত খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। হাতকড়ার দাগ পরা নিজের কব্জিটা ঘুরিয়ে জাভিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ইভান… তুই আমার জিন্নীয়ার গায়ে হাত দেওয়া তো দূরের কথা, তার ছায়া ছোঁয়ার অপরাধেও তোকে জীবন্ত কবর দেব!”
আলতিপ্লানো কারাগার থেকে শৃঙ্খল ভেঙে এক সিংহ মুক্ত হয়েছে এই খবর মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না। পেন্টহাউসের সিকিউরিটি কন্ট্রোল রুমে বসে ইভান যখন সিসিটিভি স্ক্রিনে দেখল যে জাভিয়ান তার সীমানায় পা রেখেছে, তখন তার ঠোঁটের কোণে কোনো ভয়ের রেখা ফুটল না বরং আনন্দ খেলে গেলো।
সে ইন্টারকমে তার এলিট গার্ডদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দিল, “শোনো সবাই, নাইট রেভেনকে কেউ বাধা দেবে না। ওর জন্য সদর দরজা খুলে দাও। আমি চাই ও সোজা আমার শোবার ঘর পর্যন্ত আসুক। বাঘ যখন খাঁচা ভেঙে শিকারীর ডেরায় আসে, তখন তাকে একটু ভেতরে আসতে দিতে হয়।”
কন্ট্রোল রুম থেকে বের হয়ে ইভান ধীরপায়ে তান্বীর ঘরে গিয়ে ঢুকল। তান্বী তখন জানালার গ্রিল ধরে জাভিয়ানের মুক্তির কামনায় মনে মনে প্রার্থনা করছিল। ইভান তার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “তোমার প্রার্থনা কবুল হয়েছে সোলফ্লেম। তোমার স্বামী আলতিপ্লানোর জেল ভেঙে পালিয়েছে।”
জাভিয়ানের পালানোর কথা শুনে তান্বীর চোখে এক লহমায় আনন্দের আলো জ্বলে উঠল। কিন্তু ইভানের পরের কথাটাই সেই আলো কেড়ে নিল। ইভান কুটিল হেসে বলল, “কিন্তু ও সোজা আমার এই পেন্টহাউসের দিকে আসছে। আর ফেডারেল পুলিশ ওর পেছনেই আছে। ও এখানে পা রাখা মাত্রই ওকে জ্যান্ত ক্রসফায়ার করা হবে। এই মেক্সিকোর মাটিতে ওকে বাঁচানোর ক্ষমতা আর কারো নেই।”
তান্বী আতঙ্কে শিউরে উঠে বলল, “না! আপনি তো কথা দিয়েছিলেন আমি সই করলেই ও মুক্তি পাবে! প্লিজ ওকে বাঁচান!”
“ওকে বাঁচানোর একটা রাস্তাই আছে,” ইভান তান্বীর খুব কাছে এসে বলল, “জাভিয়ান যদি নিজের চোখে দেখে যে তুমি এখন পুরোপুরি আমার, ও যদি তীব্র ঘৃণায় এখান থেকে নিজে মুখ ফিরিয়ে চলে যায় তবেই ওর প্রাণ বাঁচবে। আমি বাঁচাবো তান্বী, ও এখন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে। জলদি করো, বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ো! আমাদের একসাথে দেখে ও যেন ভেতরে ভেতরে মরে যায়। এই অভিনয়টুকু তোমাকে করতেই হবে, তান্বী… জাভিয়ানের জীবনের জন্য!”
তান্বীর সারা শরীর ঘৃণায় রি রি করে উঠল। কিন্তু জাভিয়ানের জীবনের ওপর ঝুলতে থাকা সেই ক্রসফায়ারের তরবারি তাকে বাধ্য করল। নিজের আত্মাকে বিসর্জন দিয়ে, তীব্র কান্না চেপে সে কাঁপতে কাঁপতে ইভানের সাজানো সেই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। ইভান এক পৈশাচিক তৃপ্তি নিয়ে তার ঠিক পাশেই এসে বসল এমনটা মনে হলো তারা এক নিবিড় মুহূর্তে লিপ্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে, ধুপধাপ ভারী বুটের শব্দে পেন্টহাউসের কাঠের সিঁড়িগুলো কেঁপে উঠল। দরজা খোলার কোনো প্রয়োজন হলো না; জাভিয়ানের এক শক্তিশালী লাথিতে ভারী দরজাটি কব্জি থেকে উপড়ে ছিটকে পড়ল ঘরের মেঝেতে। জাভিয়ান ঘরের ভেতর ঢুকল। তার পরনে তখনো সেই রক্তাক্ত লন্ড্রি গার্ডের যেটা সে আসার সময় পাল্টেছে। শার্ট, হাতকড়ার চাবুকে কব্জি কেটে রক্ত ঝরছে, আর চোখের মণি দুটো ক্রোধে টকটকে লাল। কিন্তু ঘরের ভেতরের দৃশ্যটা দেখামাত্রই তার পায়ের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল।
সে দেখল বিছানার চাদরটা অর্ধেক ছড়ানো, আর তার নিচে শুয়ে আছে তার জিন্নীয়া, তার তান্বী! আর তার ঠিক পাশেই শার্টের বোতাম খোলা অবস্থায় বসে আছে ইভান। জাভিয়ানের মাথার ভেতর হাজারটা বজ্রপাত একসাথে আছড়ে পড়ল। যে তান্বীকে বাঁচানোর জন্য সে মেক্সিকোর নরক গুলজার করে ছুটে এসেছে, সেই তান্বী আজ অন্য পুরুষের বিছানায়? জাভিয়ানের সমস্ত মায়া, সমস্ত ভালোবাসা এক নিমিষে তীব্র, অন্ধ এবং পৈশাচিক ঘৃণায় রূপ নিল। তার চোখের সেই জ্যান্ত বাঘটা এবার এক হিংস্র দানবে পরিণত হলো। সে বুঝতে পারল না, এটা তান্বীর আত্মত্যাগের এক চরম অভিনয় ছিল।
জাভিয়ানকে এক জ্যান্ত আগ্নেয়গিরির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইভান বাঁকা হাসল। আর তান্বী? তার বুকের ভেতর তখন প্রলয় চলছে। সে খুব ভালো করেই জানে, জানালার ওপাশে স্নাইপার আর ফেডারেল পুলিশ জাভিয়ানের বুকে ক্রসফায়ার এর বুলেট দাগার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। জাভিয়ানকে এই নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে তাড়াতে হলে তাকে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর অভিনয়টা করতে হবে। তান্বী বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন কোনো কান্না নেই, বরং এক অলীক আর কৃত্রিম পাথুরে চাতুর্য। সে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক ফোঁটা মায়া না দেখিয়ে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল—”কী দেখছ এভাবে জাভিয়ান? অবাক হচ্ছো? বাস্তবতা এটাই। তোমার এখন আর আছেটা কী শুনি? তুমি আইনের চোখে একজন ফেরারি আসামি, ইন্টারন্যাশনাল টেরোরিস্ট! তোমার ধনসম্পদ, ক্ষমতা সব আজ ধুলোয় মিশে গেছে। তোমার তো নিজেরই কোনো ভবিষ্যৎ নেই, আমি নিঃসন্দেহে কেন তোমার মতো একটা ধ্বংসস্তূপের সাথে নিজের জীবন নষ্ট করব, বলো? তার চেয়ে ইভানের কাছে থাকা অনেক বেটার। কারণ ইভানের ক্ষমতা আছে, টাকা আছে, আমাকে দেওয়ার মতো একটা নিরাপদ ভবিষ্যৎতো আছে। আমারও তো একটা পার্সোনাল লাইফ আছে, তাই না? আমি কি জীবনে একটু হ্যাপিনেস, একটু সুখ ডিজার্ভ করি না, বলো?”
তান্বীর মুখে এই চরম স্বার্থপরের মতো কথাগুলো শুনে জাভিয়ানের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। তার মনে পড়ে গেল এক সোনালী অতীতের কথা। কিছুদিন আগেই তারা যখন বাংলাদেশে তান্বীর বাবামায়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল, তখন দাঁড়িয়ে সে শুনেছিল তান্বী তার সেই বান্ধবীদের কাছে হাসতে হাসতে গর্ব করে বলছিল “আমার হাজবেন্ড যেমন হ্যান্ডসাম, তেমনই রিচ! ওর মতো পারফেক্ট লাইফ পার্টনার পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।”
তখন জাভিয়ান ভেবেছিল তান্বী হয়তো শুধু মজা করেই বলেছে কিন্তু এখন বুঝতে পারলো সে তান্বী আসলে তার রূপ আর ঐশ্বর্যকে ভালোবেসেছিল। আজ এই চরম বিপদের দিনে তান্বীর চোখের দিকে তাকিয়ে জাভিয়ানের মনে হলো, মেয়েটি আজ কোনো মিথ্যে বলছে না। তার চোখ আজ বড় নির্মম সত্য কথা বলছে! সত্যিই তো, জাভিয়ানের এখন যে পরিস্থিতি, যে অন্ধকার ভবিষ্যৎ কোনো মেয়েই হয়তো এমন একজন সর্বহারা পুরুষের আশায় নিজের জীবনটা এভাবে নষ্ট করতে চাইবে না। বিশ্বাসের শেষ দেওয়ালটুকুও এক নিমিষে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। জাভিয়ানের ভেতরের সবটুকু ভালোবাসা, সবটুকু মায়া রূপ নিল এক নজিরবিহীন, দানবীয় প্রতিহিংসায়। আর ঠিক এর পরেই শুরু হলো সেই ধ্বংসের মহালীলা…
জাভিয়ান যখন আলতিপ্লানো কারাগার ভেঙে মেইলস্ট্রৌমের পেন্টহাউসের দিকে আসছিল, সে কিন্তু খালি হাতে বা অবুঝের মতো আসেনি। ইভানের পুরো রাজকীয় প্রাসাদের আর্কিটেকচারাল ডিজাইন এবং এর দুর্বলতা তার নখদর্পণে ছিল। নিজের ভালোবাসার এই চরম অপমান দেখার পর সে পুরো বাড়িটাকে ধ্বংস করার জন্য ৩টি ধাপে আগুন ছড়াতে শুরু করে।
সেন্ট্রাল গ্যাস পাইপলাইন অ্যান্ড হিটিং সিস্টেম হ্যাক
পেন্টহাউসে ঢোকার ঠিক আগেই জাভিয়ান তার সাথে আনা ডার্ক ওয়েবের একটি পোর্টেবল হ্যাকিং ডিভাইস দিয়ে মেইলস্ট্রৌমের বাড়ির মূল স্মার্ট অটোমেশন সার্ভারে হিট করে। মেক্সিকোর পাহাড়ি অঞ্চলের এই বিলাসবহুল প্রাসাদে সেন্ট্রাল হিটিং এবং রান্নার জন্য বিশাল প্রোপেন গ্যাস পাইপলাইন ছিল। জাভিয়ান হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে সেফটি ভালভগুলো লক করে দেয় এবং গ্যাস প্রেসার সর্বোচ্চ বাড়িয়ে পুরো বাড়ির ভেন্টিলেশন ডাক্ট (বাতাস চলাচলের সুড়ঙ্গ) দিয়ে গ্যাস ছড়াতে শুরু করে। ফলে, জাভিয়ান যখন দোতলার বেডরুমে দাঁড়ানো, ততক্ষণে পুরো বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে অদৃশ্য মিথেন আর প্রোপেন গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছে।
বেডরুমে তান্বীর সেই বুকফাটা মিথ্যে কথাগুলো শোনার পর জাভিয়ানের মনের শেষ মায়াটা যখন মরে যায়, সে তখন পকেটে থাকা তার সেই ডার্ক ওয়েব ডিভাইসটির এন্টার বাটন প্রেস করে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো পেন্টহাউসের মেইন পাওয়ার গ্রিডে হাইভোল্টেজ ট্রিপ করে। নিচতলার পাওয়ার জেনারেটর রুমে এক বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। আগুনের ফুলকি বাতাসে ভাসতে থাকা প্রোপেন গ্যাসের সংস্পর্শে আসতেই এক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোর এবং লবি দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। ইভানের বেডরুমের মিনি বারে সাজানো ছিল মেক্সিকোর সবচেয়ে দামী এবং তীব্র অ্যালকোহল অ্যাবসিন্থ ও উচ্চমাত্রার টেকিলা যাতে অ্যালকোহলের পরিমাণ ৭০% থেকে ৮০% এর ওপর থাকে। এই ধরনের স্পিরিট আগুনের জন্য পেট্রোলের মতোই বিপজ্জনক এক্সিলারেটর হিসেবে কাজ করে। জাভিয়ান ঘর থেকে বের হওয়ার ঠিক আগে সেই কড়া অ্যালকোহলের বোতলগুলো ভেঙে পুরো বেডরুমে, বিছানায় ছুঁড়ে মারে। ইতিমধ্যেই দেওয়াল আর সিলিং বেয়ে নিচতলার আগুন দোতলায় চলে এসেছিল।ইভানের রাজকীয় অট্টালিকা আজ এক জীবন্ত অগ্নিকুণ্ড হয়ে গেছে। চারদিকে শুধু দাউদাউ করে জ্বলছে আভিজাত্যের শেষ চিহ্নটুকু, আর সেই আগুনের লেলিহান শিখায় জাভিয়ানের ছায়াটাকে কোনো এক নরকের দূতের মতোই মনে হচ্ছে।
বাতাসের প্রতিটি কণা এখন আগুনের পোড়া গন্ধে ভারী হয়ে আছে। হঠাৎ এক পৈশাচিক ক্ষিপ্রতায় জাভিয়ান তার হাতে থাকা বোতলের কড়া অ্যালকোহল তান্বীর ওপর ছুঁড়ে দিল। তান্বী তখন ভয়ে কুঁকড়ে গেলেও চোখে অদম্য জেদ ধরে রেখেছে, ওর চোখের সামনে জাভিয়ানের নজিরবিহীন দানবীয় রূপ ওকে টলাতে পারছে না। জাভিয়ান কাউকে কোনো সুযোগ দিল না, ম্যাচ লাইটটা জ্বালিয়ে অবলীলায় ছুড়ে মারল তান্বীর দিকে। মুহূর্তের মধ্যে নীলচে আগুনের শিখা তান্বীর সিল্কের নাইট ড্রেসটিকে গ্রাস করতে শুরু করল। ঠিক যখন আগুন তান্বীর শরীরকে ছাই করে দিতে উদ্যত, তখনই মেইলস্ট্রোম পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। নিজের চামড়া ঝলসে যাওয়ার তোয়াক্কা না করে নিজের ভারী ব্লেজার দিয়ে জাপটে ধরে আগুন নেভালো সে।কিন্তু ধ্বংসের এই লীলাখেলা কেবল শুরু! জাভিয়ান বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গিয়ে তান্বীর কণ্ঠনালী চেপে ধরল দেয়ালের সাথে। ওর চোখের মণি দুটো তখন আগুনের শিখার মতোই টকটকে লাল। দাঁতে দাঁত চিপে জাভিয়ান প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল হাড়হিম করা স্বরে ”তুই কি ভেবেছিস ডিভোর্স পেপারে সাইন করলেই আমার থেকে মুক্তি পেয়ে যাবি? ভুল ভেবেছিস তান্বী, তুই যদি ডিভোর্স পেপারে সাইন করে থাকিস, তবে আমি সাইন করব তোর ডেথ সার্টিফিকেটে। তোকে আমি বাঁচতে দেব না। যা আমার নয়, তা অন্য কারোর হয়ে এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকবে এতটা উদার আমি নই। আজ থেকে প্রতিটা সেকেন্ড মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাক, কারণ তোর শেষ নিশ্বাসটুকু কেড়ে নেওয়ার অধিকারও আমি কাউকে দেব না!”
তান্বীর কণ্ঠনালী চেপে ধরে রাখা জাভিয়ানের জ্বলন্ত চোখ দুটোর সামনে তখন মৃত্যু নিজে এসে যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ঠিক তখনই প্রাসাদের বাইরে পুলিশের সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ এবং একের পর এক গাড়ির টায়ারের কর্কশ আওয়াজ ভেসে এল। ইভানের সেই স্নাইপার আর মেক্সিকান ফেডারেল ফোর্সের দল পেন্টহাউসটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলছে।
জাভিয়ানের ক্ষিপ্ত মস্তিষ্কে মুহূর্তের জন্য আইনি বাস্তবতার আলো খেলে গেল। সে বুঝতে পারল, আর মাত্র কয়েকটা মিনিট… তারপরেই এখানে পুলিশের পুরো বাহিনী আছড়ে পড়বে। সে আজ ধরা দিতে আসেনি, আর এই সস্তা পুলিশের গুলিতে কুকুরের মতো মরতেও আসেনি। তার প্রতিহিংসার আগুন এখনো পুরোপুরি শান্ত হয়নি। এই বিশ্বাসঘাতক তান্বী আর ধূর্ত মেইলস্ট্রম এই দুজনকেই সে এক নিমেষে শেষ করতে পারত, কিন্তু এই জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে এত সহজে তাদের মুক্তি সে দেবে না। সে চায় তারা প্রতিটা মূহূর্ত মৃত্যুর আতঙ্কে তিলে তিলে শেষ হোক।
জাভিয়ান এক ঝটকায় তান্বীকে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেতে। তীব্র ঘৃণায় একবার নজর বুলিয়ে সে জানালার কাঁচ ভেঙে অন্ধকারের মাঝে চিতাবাঘের মতো লাফিয়ে পড়ে উধাও হয়ে গেল। এদিকে চারদিকের আগুন তখন সিলিং ছুঁয়েছে। দাউদাউ করে জ্বলছে দামী আসবাবপত্র, বিষাক্ত নীল ধোঁয়ায় ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। মেঝেতে পড়ে তান্বী তখন কাশছিল, তার সিল্কের পোশাকের অংশবিশেষ ততক্ষণে ইভানের ব্লেজারের কারণে নিভে গেলেও শরীর জুড়ে তীব্র জ্বালা। ইভান নিজের ঝলসে যাওয়া হাতের চামড়ার তোয়াক্কা না করে পাগলের মতো এগিয়ে এল। সে তান্বীকে মেঝে থেকে পাঁজকোলা করে তুলে নিলো। পুরো হাউস তখন একটা জীবন্ত আগ্নেয়কুণ্ড, যেকোনো মুহূর্তে ছাদ ধসে পড়তে পারে।
“সোলফ্লেম, চোখ খোলো! আমাদের এখান থেকে বের হতেই হবে!” ইভান চিৎকার করে উঠল। সে তান্বীকে শক্ত করে ধরে জ্বলন্ত কাঠের টুকরো আর ভেঙে পড়া বিমের ওপর দিয়ে লাফিয়ে কোনোমতে পেছনের সিক্রেট ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে প্রাসাদের বাইরে নিয়ে এল। ঠিক তার কয়েক সেকেন্ডের মাথায় মেইলস্ট্রোমের সেই অহংকারের রাজকীয় অট্টালিকা এক বিকট শব্দে ভেঙে গুঁড়িয়ে ছাইস্তূপে পরিণত হলো। বাইরে তখন পুলিশের গাড়ির লালনীল আলো আর ফায়ার সার্ভিসের শব্দ। ইভান তান্বীকে গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে পেছনের লুকিং গ্লাসে জ্বলন্ত প্রাসাদের দিকে তাকাল। তার সাম্রাজ্য আজ ধ্বংস, কিন্তু তার পাশে তান্বী আছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “নাইট রেভেন… তুই আমার প্রাসাদ পুড়িয়েছিস, কিন্তু আমার জয় কেড়ে নিতে পারিসনি। তান্বী এখন শুধুই আমার!”
ভোরের আলো ফোটার আগেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পেন্টহাউসের সেই জ্বলন্ত কুণ্ড পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলো। কিন্তু ততক্ষণে বিলাসবহুল প্রাসাদটি এক কঙ্কালসার ছাইস্তূপে পরিণত হয়েছে। মেক্সিকান ফেডারেল পুলিশের চিফ এবং ইন্টারপোলের বিশেষ দল কর্ডন করা সীমানার ভেতরে এসে দাঁড়াল। ভেতরের তাপমাত্রা তখনো এতটাই বেশি যে সাধারণ মানুষের পক্ষে ভেতরে ঢোকা অসম্ভব। ফরেনসিক দল এবং ক্রাইম সিনের অফিসাররা দূর থেকে পুড়ে যাওয়া বিম আর ছাইয়ের স্তূপ পরীক্ষা করছিলেন। ইভানের সেই কুখ্যাত উকিল কার্লোসকে যেভাবে আলতিপ্লানো জেলে রক্তাক্ত করা হয়েছিল এবং তারপরেই এই পেন্টহাউসে আগুনের তাণ্ডব সব মিলিয়ে পুলিশ একটা সহজ সমীকরণে এসে পৌঁছাল।
পুলিশের চিফ চুরুটে একটা শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে তার সাবঅর্ডিনেটকে বলল, “কেস ক্লোজড করার প্রসেস শুরু করো। আলতিপ্লানো থেকে পালানো মোস্ট ওয়ান্টেড কয়েদি জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী সোজা মেইলস্ট্রোমের ডেরায় হানা দিয়েছিল। আর ভেতরের ভয়াবহ বিস্ফোরণ আর আগুনের তীব্রতা বলে দিচ্ছে—এই ধ্বংসস্তূপের ভেতর যারা যারা ছিল, কেউ জীবিত বের হতে পারেনি। সবাই এই অগ্নিকুণ্ডেই জ্যান্ত পুড়ে খাক হয়ে গেছে।”
মেক্সিকান মিডিয়া এবং টেলিভিশনের পর্দায় ব্রেকিং নিউজ ফ্ল্যাশ হতে লাগল—”আলতিপ্লানোর পলাতক কয়েদি জাভিয়ানের করুণ পরিণতি; অগ্নিকাণ্ডে নিহত মেক্সিকোর মাফিয়া মেইলস্ট্রোম এবং স্বয়ং নাইট রেভেন।”
মেক্সিকোর সীমানা পেরিয়ে এক গোপন হাইওয়ের ওপর দিয়ে ছুটে চলা কালো রঙের ল্যান্ড ক্রুজারের ভেতরে বসে ইভান তখন রেডিওর সেই নিউজ শুনছিল। তার ঠোঁটের কোণে এক বিজয়ের পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। পুলিশের এই ভুল ধারণাটাই এখন তার সবচেয়ে বড় ঢাল। আইনের চোখে মৃত হয়ে যাওয়ার মানে হলো—এখন সে তান্বীকে নিয়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যেতে পারবে, কেউ তাদের খুঁজতে আসবে না। সে পেছনের সিটে অচেতন অবস্থায় শুয়ে থাকা তান্বীর দিকে তাকাল, যার শ্বাসনালীতে জাভিয়ানের আঙুলের কালচে দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে। ইভান ফিসফিস করে বলল, “শুনলে তো সোলফ্লেম? জাভিয়ান আর এই দুনিয়ায় নেই। ও পুলিশের খাতায় মৃত, আর আমার এই বন্ধ খাঁচায় তুমি এখন চিরদিনের জন্য বন্দি।”
কিন্তু ইভান জানত না, মেক্সিকোর এক জীর্ণ, পরিত্যক্ত ডার্ক ওয়েবের সার্ভার রুমের ভাঙা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তখন নিজের রক্তাক্ত কব্জিটা ব্যান্ডেজ করছিল জাভিয়ান। রেডিওতে নিজের মৃত্যুর খবর শুনে তার ঠোঁটের কোণে এক শীতল, হিমশীতল হাসি ফুটে উঠল।
আইনের চোখে মৃত হয়ে যাওয়াটাই তো একজন ‘নাইট রেভেন’ এর জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক। এখন সে কোনো নিয়ম, কোনো আইন বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির তোয়াক্কা না করে এক অদৃশ্য ভূতের মতো ইভানের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলবে।
গাড়ির এসি চললেও তান্বীর বুকের ভেতরের উত্তাপ কিছুতেই কমছিল না। রেডিওতে জাভিয়ানের মৃত্যুর খবরটা শোনার পর থেকেই তার পুরো পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেছে। ইভানের দিকে তাকিয়ে তার চোখ দুটো এবার ক্ষোভে আর তীব্র যন্ত্রণায় ফেটে পড়ল। সে সিটের ওপর সোজা হয়ে বসে চিৎকার করে উঠল—
“আমি এসবের কিছুই চাই না! আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে ডিভোর্স পেপারে সই করলে আপনি জাভিয়ানকে আইনি পথে মুক্তি দেবেন! তাহলে এসব কী হলো? কেন চারদিকে আগুন জ্বলল? আর কেনই বা রেডিওতে ওকে মৃত বলা হচ্ছে? আপনি আমার সাথে প্রতারণা করেছেন, ইভান!”
তান্বীর এই আকস্মিক হাহাকার আর অভিযোগ শুনেও ইভানের হাত থেকে গাড়ির স্টিয়ারিং এক চুলও নড়ল না। সে অত্যন্ত শান্ত ও ঠান্ডা মাথায় গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে বাঁকা হেসে বলল—”রিল্যাক্স সোলফ্লেম, রিল্যাক্স! এত হাইপার হচ্ছো কেন? যা হয়েছে, সবকিছু আমাদের প্ল্যানমাফিক না হলেও রেজাল্ট কিন্তু আমাদের পক্ষেই এসেছে। আগে আমাদের একটা নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাতে দাও, সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।”
সে সামনের উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে মেক্সিকোর ধূসর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে চতুরতার সুরে আবার বলল, “একটা কথা মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখো তান্বী—যতক্ষণ আইনের চোখে জাভিয়ান মৃত, ততক্ষণ কিন্তু ও আসলে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ! আলতিপ্লানোর জেল ভাঙার পর মেক্সিকান গভর্নমেন্ট ওর পেছনে পুরো আর্মি লেলিয়ে দিত। ও বাইরে থাকলে যেকোনো মুহূর্তে পুলিশ আবার ওর খোঁজ পেয়ে যেত এবং তখন ওকে জ্যান্ত ক্রসফায়ার করা ছাড়া তাদের কাছে কোনো অপশন থাকত না। কিন্তু এখন? এখন পুলিশ ভাবছে ও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, তাই কেউ ওকে আর খুঁজবে না। প্রকারান্তরে আমি ওকে একপ্রকার নিরাপদ জীবনই উপহার দিলাম, তাই নাকি?”
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৬
ইভানের এই ধূর্ত আইনি ব্যাখ্যা তান্বীর মাথায় জট পাকিয়ে দিল। একদিকে জাভিয়ানের বেঁচে থাকার এক ক্ষীণ আশা, অন্যদিকে সে এখন পুলিশের খাতায় এক মৃত লাশ। ইভানের এই শান্ত রূপের আড়ালে যে কত বড় বিষাক্ত সাপ লুকিয়ে আছে, তা ভেবে তান্বী জানালার বাইরে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল না, জাভিয়ান সত্যিই বেঁচে আছে কি না, আর বেঁচে থাকলেও সে এখন কোন নরকে আছে।
