Home ডেসটেনি ডেসটেনি পর্ব ২৯

ডেসটেনি পর্ব ২৯

ডেসটেনি পর্ব ২৯
সুহাসিনি মিমি

কলিংবেলের একঘেয়ে বিরক্তির তীক্ষ্ণ শব্দটা বেজেই চলেছে তখন থেকে। রান্নাঘরে ব্যস্ত তখন বাড়ির কাজের মেয়েটা।থালা বাসন মাজা থামিয়ে বারকয়েক বিড়বিড় করে ধুয়ে দিলো শব্দ করা সেই আগন্তুককে। বড্ড অধৈর্য সহ্য লোক তো! দেখছে খুলছে না, নিশ্চই বাড়ির মানুষ ব্যস্ত আছে। সেসব বুঝার জ্ঞানটুকুও নেই।
“আরেহ আইতাছি! আইতাছি তো!”
গায়ের ওড়না দিয়ে হাত মুছল মেয়েটা। রিলেক্সে হেটে হেটে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল সদর দরজার সামনে। স্বতঃস্ফূর্ত মনেই দরজাটা খুলল টেনে। আর অমনি থমকে গেল জায়গায়। নিমিষেই গায়ের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে জমে গেল বরফের মতন। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অতি পরিচিত মানুষটাকে দেখে বিস্ময়ে রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে এলো অক্ষিপুট। গেছে! এতদিনের আরাম আয়েসে জীবন পার করার বারোটা বেজে গেছে এবার!
গাঢ় ধূসর রঙের ফরমাল শার্ট পরা সেহরোজ দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা। বাম হাতে ভাঁজ করে রাখা কালো কোট। কব্জিতে দামি ঘড়ি। এইযে এতো ঘন্টার টানা জার্নির চিন্হটুকুও নেই মানবের সুদর্শন চেহারায়। বরং সবসময়ের মতোই তীক্ষ্ণ, কঠোর আর গম্ভীর মুখশ্রী!
কাজের মেয়েটার ধড়ফড় করা বুকে শুষ্ক ঢুক গিলল। শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে আমতা আমতা
করে বলল,

“ভা ভাই আফনে ইয়ে না মানে আপনে?”
মেয়েটির এই ভাঙাচোরা শব্দ উচ্চারণের পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। শুদ্ধ ভাষার বাইরে আঞ্চলিক টানযুক্ত কথা একেবারেই পছন্দ নয় সেহরোজের। তাই সে বাড়িতে উপস্থিত থাকা কালীন প্রাণপণ চেষ্টা করে শহুরে ভাষায় কথা বলতে হয় তাকে। যদিও সেই প্রচেষ্টায় মাঝেমধ্যেই এমন অবস্থা হয় যে, একেকটা শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়ে মেয়েটার দাঁত ভাঙার উপক্রম হয়ে দাঁড়ায়।
“ভিতরে যেতে দিবি নাকি এখানেই দাঁড় করিয়ে রাখবি ইডিয়েট?”
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে থামল শেহরোজ।তড়িৎ বেগের এক লাফে সেখান থেকে সরে দাঁড়াল ঝুমুর নামের মেয়েটি।

“কি কন ভাই, না মানে কি বলিছেন ভাই। আসেন, আসেন ভিতরে আসেন!”
এবার বিনাবাক্যয় ভিতরে পা রাখল শেহরোজ। ড্রয়ইংরুমের নাজেহাল, এলোমেলো, অগোছালো অবস্থা থেকে রীতিমতো চোখ সরু করে চাইতেই মিনমিন করে উঠে ঝুমুর। মনে মনে মাথায় হাত দেয় মেয়েটা। সোফার উপর এলোমেলো হয়ে আছে কুশনগুলো।সেন্টার টেবিল ভর্তি বিভিন্ন রকম স্ন্যাকসের প্যাকেট, সেই সাথে মেঝেতে পড়ে আছে চিপসের খালি মোড়ক, জুস্, বিস্কুটের প্যাকেট।রাস্তার পাশ ঘেঁষা ডাস্টবিনের থেকে কম নোংরা মনে হলোনা সেসব শেহরোজের চোখে। কপালের রগটা টনটন করে উঠল।জীবনের বহু বিষয় নিয়ে সে আপস করতে পারে। কিন্তু অপরিচ্ছন্নতা,অগোছালো পরিবেশ এই দুটো জিনিস তার সহ্যের তালিকায় বাইরে অবশিষ্ট।ছোটবেলা থেকেই ওর প্রতিটা জিনিস নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার অভ্যাস।ঘরের প্রতিটা জিনিস নিখুঁতভাবে গোছানো দেখতে অভ্যস্ত সে।আর এখন নিজের বাড়িতে ঢুকেই এমন দৃশ্য দেখে স্বাভাবিকভাবেই বিরক্তিটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ঝুমুরের ভয়ে মাটির নিচে ঢুকে পড়তে মন চাইলো এপর্যায়ে।সে খুব ভালো করেই জানে এই মানুষটা কী ধরনের।উচ্চস্বরে রাগ দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না তার।চোখের একটা চাহনিই যথেষ্ট।শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

“ভাই… আসলে মেহমান আইছে, আসছে তো। তাই আরকি। আ আমি এখনই সব ঠিক কইরা ফেলতাছি ভাই। এক মিনিটও লাগব না।”
চলন্ত ট্রেনের বেগে ছুটল ঝুমুর এবার। লাফিয়ে লাফিয়ে মেঝে থেকে ছো মেরে চিপস, বিস্কুটের প্যাকেটগুলো একত্র করে তুলল। সেন্টার টেবিল গুছিয়ে কুশনও ঠিক করে ফেলল চোখের পলকে। মনে হচ্ছে যেন জীবন-মরণ লড়াই চলছে এখানে। সেহরোজ দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই হাফ ছাড়ল বেচারি।অগোচরে স্বস্তির নিঃশাস ফেলে তাড়াহুড়ায় স্টোররুমের দিকে দৌড়াল। সেইবার শেহরোজ যাওয়ার পরপরই শেহরোজের এনে দেয়া বইগুলো ওখানে ফেলে রেখেছিলো মেয়েটা।এরপর আর ধরে ছুঁয়েও দেখেনি। এই বয়সে এসে স্কুলের বই পড়ে ও এখন কি করবে? ওর কি এখন পড়াশোনার বয়স আছে? তবে এই ব্যাটাকে এসব কে বুঝাবে।যতদিন না বাড়ি থেকে বিদেয় হচ্ছে ততদিন চলতেই থাকবে এই নির্যাতন!

সোজা করিডোরের শেষ মাথার রুমটার দিকে এসে থামল শেহরোজ। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ ।গতকাল রাতেই ফোনে শুনেছিল হঠাৎ করেই নাকি শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে মায়ের। বুকের ব্যথা, প্রেসার ওঠানামা, মাথা ঘোরা,এমন সব উপসর্গের কথা শুনেই জরুরি ছুটি ম্যানেজ করে রাতারাতি চলে এসেছে সে।
“আম্মু আসব?”
দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসা পরিচিত কণ্ঠটা কানে পৌঁছাতেই আতঙ্কিত হলেন সুমি বেগম।গুলিয়ে ফেললেন সমস্তকিছু।চোখ বড় বড় করে তাকালেন দরজার দিকে। এই সময়ে? শেহরোজ?মহিলা তো ভেবেই রেখেছিলেন ছেলে অন্তত আরও দু-তিনদিন পরে আসবে। তাই নিশ্চিন্ত মনে বিছানার উপর বসে কুশনের কাভারে নকশা কাটছিলেন। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা রঙিন কাপড়, সুতা, কাঁচি আর কয়েকটা অসমাপ্ত কুশন কভার।দ্বিতীয়বার দরজায় টোকা পড়তেই সম্বিৎ ফিরল তার।

“আম্মু?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ,আসো !”
হকচকিয়ে উত্তর করলেন তিনি। পরোমুহূর্তেই ছো মেরে হাতে থাকা কাপড়গুলো গুটিয়ে তাড়াহুড়য় বালিশের নিচে লুকিয়ে ফেললেন।অসমাপ্ত কুশন কভারগুলোও দ্রুত ভাঁজ করে সরিয়ে ফেললেন চোখের আড়ালে।অতঃপর বুক অব্দি কম্বল টেনে গুরুত্বর অসুস্থ রোগীর মতো বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। লম্বা দেহটা প্রবেশ করল তখুনি।
” কেমন লাগছে এখন?”
ছেলের কথার পিঠে দুর্বল গলায় প্রত্তুত্তর করলেন সুমি,
“এই তো, যেমন দেখছিস!”
শেহরোজ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে রাখা চেয়াটায় বসল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। দীর্ঘদিন সমুদ্রে, যুদ্ধজাহাজে, অপারেশনের মধ্যে কাটালেও এই মুখটা দেখলেই তার ভেতরের কঠোর মানুষটাও যেন নরম হয়ে যায়।

“মুহিন আংকেল কে দেখিয়েছ?”
“হুম।”
“কি বলেছে?”
“বলেছে বিশ্রাম নিতে।আর অতিরিক্ত টেনশন না করতে।”
“ঔষধ খাচ্ছ?”
“খাচ্ছি তো।”
শেহরোজ ভ্রু কুঁচকে বলল এবার,
“সময়মতো?”
“আরে বাবা, তোর মা কি আর ছোট বাচ্চা নাকি?সময়মতোই তো খাচ্ছি!”
“সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি, সময়মতো খাওয়ার ফল!”
“এসেই জেরা শুরু করে দিয়েছিস?”
“আমি জেরা করছি না আম্মু। জাস্ট জানতে চাচ্ছি।”
“খবর তো নিয়েই ফেললি। এখন একটু কাছে আয় তো। তোকে দেখি।কতদিন তোকে কাছ থেকে দেখিনা। শুকিয়ে গেছিস দেখছি!”

“আম্মু , আই’ভ গেইনড ফোর কিলোগ্রামস সিন্স লাস্ট টাইম।”
ছেলের কথার ঘোর বিরোধিতা জানিয়ে বললেন সুমি,
“এতদিন গ্যাপে আসলে মায়ের চোখে সন্তানদের এমনই লাগে!এখন বুঝবি না, আগে বিয়ে কর, সন্তান হক। তারপর বুঝবি।নিজের শরীরের খেয়াল তো রাখতে পারিস।”
“বাহ্! বিছানায় পড়ে থাকা অসুস্থ রোগী আবার দেখছি লেকচারও দেয় আজকাল!”
থতমত খেলেন ভদ্রমহিলা।খুক খুক করে কেশে উঠলেন একদফা।বললেন,
“দেখছিস? কাশিটা যাচ্ছেইনা।”
“হুম।”
“মাথাও ঘোরে।”
“আচ্ছা।”
“বুকও ধড়ফড় করে।”
“বুঝলাম।”
ছেলের নির্বিকার উত্তর শুনে মহিলা কেমন যেন ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় পেলেন। তবু মুখে কিছু প্রকাশ করলেন না।কিছুক্ষণ নীরবতা চলল মা ছেলের মাঝে।

“এত তাড়াতাড়ি ছুটি পেলি কীভাবে?”
“ম্যানেজ করেছি।”
“ওমা আমার জন্য নাকি?”
“তুমি ছাড়া আর কে আছে বাড়িতে?”
“আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনি বাবা।তুই ব্যস্ত থাকিস। দায়িত্ব থাকে। দেশের কাজ থাকে। বারবার বিরক্ত করতে ভালো লাগে না।”
শেহরোজ মৃদু স্বরে বলল,
“বিরক্ত শব্দটা আর কখনও আমার সামনে ব্যবহার করবে না, আম্মু।তোমার জন্য আসতে হলে আমি হাজার বার আসব।”
মহিলার চোখদুটো চিকচিক করে উঠল।
“ছোটবেলায় তুই যখন স্কুলে যেতি, আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম।তুই কখন ফিরবি সেটা দেখার জন্য।তারপর বড় হলি। কলেজে গেলি। একাডেমিতে গেলি। এরপর চাকরি। এখন তো কখন আসিস, কখন যাস, আমি নিজেই জানি না। এই বিশাল বাড়িটা মাঝে মাঝে কেমন খালি খালি লাগে।”
কিছুক্ষণ আরও নানা কথাবার্তা চলল। আত্মীয়স্বজনের খবর, বাড়ির খবর, গ্রামের খবর— একটার পর একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে লাগলেন দুজন। শেহরোজ চুপচাপ শুনল শুধু। মায়ের প্রতিটা কথাই সম্পূর্ণ মনোযোগে শুনে এক পর্যায়ে উঠে দাঁড়াল।

“বিশ্রাম নাও এখন।”
“এই তো এলি, আবার চলে যাচ্ছিস?”
“কোথাও যাচ্ছি না। নিচে আছি।”
“আচ্ছা।”
দরজার দিকে কয়েক কদম এগিয়ে গেল শেহরোজ।
সুমি বেগম ছেলের চলে যাওয়া দেখছিলেন শান্ত চোখে।দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে দাঁড়াল ও।তারপর উল্টো দিকে না ঘুরেই স্বাভাবিক গলায় জানাল মাকে,
“তোমার অভিনয় স্কিল একদম বাজে, আম্মু।”
বলেই ততক্ষণে শেহরোজ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেছে।মহিলা কয়েক সেকেন্ড হাঁ করে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন।মুখটা কাঁচুমাচু করে বিড়বিড় ককরে আওড়ালেন,
“হায় আল্লাহ! এই ছেলের চোখ ফাঁকি দেয়া,আর সূর্যকে হাত দিয়ে ঢেকে রাখা একই কথা!’
বলেই অসহায় হাসলেন তিনি। তবে সেই হাসির আড়ালেও একরাশ স্বস্তি লুকিয়ে আছে। কারণ একটা বিষয় অন্তত নিশ্চিত, তার ছেলে যত বড়ই হোক, একঘেয়ে হোক। মায়ের জন্য ছুটে আসতে এখনও এক মুহূর্ত দেরি করে না।এবার ভালোয় ভালোয় নিজ পরিকল্পনা মোতাবেগ সবটা হলেই হলো।

“আ আপনি এখানে?”
পুরো অপ্রত্যাশিত ভাবে তাজধীরকে উক্ত জায়গায় আবিষ্কার করল প্রিয়ন্তী। কথাটা বলতে গিয়েও কেমন জিভ জড়িয়ে গেল ওর। বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল চোখ দুটো। এই লোক এখানে কি করছে? উনি না সকালেই চলে গেলেন?একই সময়ে তাজধীরের অবস্থাও অনেকটা সেইম। সেও অবাক হয়েছে ভীষণ। চোখে মুখে তারও স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে উঠেছে। এরকম একটা জায়গায় প্রিয়ন্তীকে দেখার বিষয়টা তার হিসেবেই মিলছে না। কয়েকমুহূর্ত নির্বাক তাকিয়ে থেকে আচানক জিজ্ঞেস করল,
“আমারো তো একই প্রশ্ন,আপনি এখানে কি করছেন?”
প্রিয়ন্তী এবার অস্বস্তিতে পড়ল। চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। বাতাসের তীব্রতাও বাড়ছে আরো। একেতো এরকম অপরিচিত জায়গায় এসে আটকে পরা, তারউপর আবার দীর্ঘক্ষন যাবৎ বান্ধবীকে খুঁজে না পাওয়া। সব মিলিয়ে ভীষণ ঘাবড়ে গেল মেয়েটা। উৎকন্ঠীত হয়ে বলল,

“আমি শ্রেয়াকে খুঁজতে এসেছি। ও আমাকে এখানে এনে রেখে হঠাৎ কোথায় যে চলে গেছে আমি জানি না। খুঁজে পাচ্ছিনা ওকে কোথাও!
“শ্রেয়া?”
“হ্যাঁ, আমার ফ্রেন্ড।”
সংক্ষিপ্তভাবে প্রশ্ন করল তাজধীর,
“ফোন করেছেন?”
প্রিয়ন্তী বিব্রত মুখে মাথা নেড়ে বলল,
“আমার ফোনে চার্জ নেই। অনেকক্ষণ আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।”
তাজধীর কিছুক্ষণ চুপ করে চারপাশটা দেখে নিল। তারপর আবার প্রিয়ন্তীর দিকে তাকাল।বলল,
“কোন পাশে গেছে আপনার ফ্রেন্ড?”
প্রিয়ন্তী হতাশ গলায় বলল,
“জানি না। সবই তো একরকম লাগছে এখানে। কোথায় গেছে বুঝলে তো খুঁজেই পেতাম।”
একটু থেমে সে আবার বলল,
“কিন্ত আপনি এখানে কি করছেন? আপনি না সকালে ডিউটিতে ফিরে গেলেন?”
প্রশ্নটার উত্তর দিলোনা তাজধীর।বরং একবার আকাশের দিকে তাকাল। কালো মেঘে প্রায় ঢেকে গেছে পুরো আকাশ। বাতাসের বেগও ক্রমশ বাড়ছে।
গম্ভীর স্বরে বলল,

“চলুন আমার সঙ্গে।”
প্রিয়ন্তী ভ্রু কুঁচকে ফেলল সঙ্গে সঙ্গেই,
“কোথায়?”
প্রশ্নটা ধপ করে করে বসল প্রিয়ন্তী। তাজধীর কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আবার থামল। পেছনে ফিরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আপনাকে নিশ্চয়ই নিয়ে বেচে দেব না। আপনার বান্ধবীকে খুঁজব। চলুন।”
তন্মধ্য তাজধিরের ফোনটা বেজে উঠল আবারো। তখন পুরো কথা শেষ না করেই কল কা টায় হয়তো ফোনের ওপাশের ব্যক্তিটিই কল দিয়েছে। তাজধীর ফোন বের করে দেখল, অর্ণব।
“ওয়ান মিনিট!’
বলেই কল রিসিভ করল। ওপাশে শুনতে পেল অর্ণবের উত্তেজিত কণ্ঠখানা,
“কোথায় তুই, পেয়েছিস?লোকেশন তো ওখানেই দেয়া।”
চারপাশে একবার সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে জবাব দিল তাজধীর,

“না। এখনও কনফার্ম কিছু পাইনি।”
“আমাদের সোর্স ভুল হওয়ার কথা না। আজ বিকেলের মধ্যেই চালান মুভ করার কথা ছিল।”
“ডিটেইলস বল।সিউর না হয়েই এভাবে হুট্ করে মাঝরাস্তা থেকে ব্যাক করাসনিতো আবার?”
“আরেহ না। দুই ঘণ্টা আগে খবর এসেছে। নদীপথে যেসব বালুবাহী কার্গো চলে, সেগুলোর একটা ব্যবহার হচ্ছে কাভার হিসেবে। উপরে বালি, নিচে অ স্ত্র। ছোটখাটো কিছু না পরিমাণও বেশ বড়।”
প্রিয়ন্তী কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। কথাগুলোর পুরোটা শুনতে না পেলেও তাজধীরের মুখের গম্ভীরতা দেখে অজান্তেই কৌতূহলী হয়ে উঠল।
ওপাশে অর্ণব আবার বলল,
“লোকাল থানাকে এখনো ইনফর্ম করা হয়নি। তথ্যটা শতভাগ ভেরিফাই না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টা সীমিত রাখার নির্দেশ আছে।”
“কতগুলো ভেসেল সন্দেহের তালিকায়?”
“তিনটা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সন্দেহ ‘আল-বারাকা’ নামের কার্গোটার ওপর। গত তিন সপ্তাহে ওটার রুট অস্বাভাবিকভাবে বদলেছে।”
তাজধীরের দৃষ্টি এবার নদীর দিকে আটকালো।
দূরে ম্লান আলোয় কয়েকটা বড় বালুবাহী জাহাজ অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
“টিম কোথায়?”
“দুই ইউনিট পথে আছে। আরেকটা টিম নদীর উল্টোপাশে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু তুই কাছাকাছি আছিস বলে আগে তোকে জানালাম।”
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল তাজধীর।
তারপর নিচু গলায় বলল,

“কোনো ধরনের অ্যাকশন কেউ নেবে না যতক্ষণ না আমি কনফার্ম করছি।”
“রজার।”
কলটা কে টে গেল। ফোন নামিয়ে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল তাজধীর।বাতাস আরও জোরে বইতে শুরু করেছে ততক্ষনে। এদিকে প্রিয়ন্তীর অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। শ্রেয়ার কোনো খোঁজ নেই, চারপাশের পরিবেশও কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। কি হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই মাথায় ঢুকছেনা। তাজধীর ফোনটা পকেটে রেখে আদেশ করল,
“চলুন।”
“কি হয়েছে?আপনি কি এখানে কোনো জরুরি কাজে এসেছেন?”
“এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার বান্ধবীকে খুঁজে বের করা। বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর পরে দেওয়া যাবে।”
দ্বিধা, অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিছু নিলো প্রিয়ন্তী লোকটার।এভাবে মিনিট পাঁচেক পার হলো। হাঁটতে হাটতেই আচানক পা চেপে ধরে ব্যথায় আর্তনাদ করে বসে পড়ল প্রিয়ন্তী,
“আহ!”
“কী হলো?”

তড়িৎ বেগের তাজধীর পিছু ঘুরতেই চোখে পড়ল মেয়েটার ব্যথাতুর চেহারাটা।
“পা পায়ে ব্যথা পেয়েছি। কিছু একটা বিঁধেছে মন হচ্ছে!”
তাজধীর চোখ নামাল।লক্ষ্য করল স্যান্ডেলের পাশ দিয়ে পায়ের ভেতরটা কে টে গেছে। মাটি আর ছোট পাথরের খোঁচায় ক্ষতটা গভীর না হলেও রক্ত বের হতে শুরু করেছে।প্রিয়ন্তী কাঁপা গলায় বলল,
“ব্যথা করছে খুব।”
তাজধীর অসস্তিতে পড়ল। হাঁটুঘেরে বসে পা টা পরখ করে পকেট থেকে রোমাল বের করে চেপে ধরল আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে। আশেপাশে সতর্ক চোখ বুলিয়ে বলল,
“উঠতে পারবেন?”
প্রিয়ন্তী উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আবার ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল ওর।নিজের পুরুষালি হাতটা বাড়িয়ে দিল তাজধীর।
“ধরুন।”
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত না চাইতেও হাতটা ধরল প্রিয়ন্তী।তাজধীর সাবধানে উঠিয়ে দাঁড় করাল ওকে।কিছুটা দূরে বাঁশ আর ত্রিপল দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটা টং দোকান দেখা যাচ্ছে।দোকানটার চারপাশে টাঙানো নীলচে ত্রিপলগুলো বাতাসে বারবার ফড়ফড় করে উঠছে। দোকানটা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। আশপাশে মানুষের কোনো চিহ্ন নেই। দূরে শুধু কালচে জলরাশি আর কাশবনের দুলে ওঠা মাথাগুলো দেখা যাচ্ছে।তাজধীর প্রিয়ন্তী কে সেখানে নিয়ে বসাল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

“আপনি এখানেই বসুন।আমি আসছি!”
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“আপনার বান্ধবীকে খুঁজতে।”
“আমি একা থাকব এখানে?”
“তো আপনি কি চাচ্ছেন আপনায় কোলে নিয়ে নিয়ে আপনার ফ্রেন্ডকে খুজি?”
লোকটার তেরা জবাবে চুপসে যায় বেচারি। মুখ ফুলিয়ে তাকায় আশেপাশে।তাজধীর সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেই শুনতে পায় আচানক,
“এই! এখানে! এখানে একটারে পাইছি!”
“ধর ধর! আজকে এইগুলারে ধর!”
“আমি কইছিলাম না কেউ ঢুকছে এইদিকে?”
বলতে বলতেই বাইরে থেকে চার পাঁচজন ছেলে হুড়মুড় করে টং দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল জড়ো হয়ে। ছেলেগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে এই এলাকার’ই হবে হয়তো। পোশাক আশাক তেমন সুবিধার নয়। বখাটে, মাস্তান টাইপ লাগছে অনেকটা দেখতে।

“কি ভাই, মাইয়া মানুষ নিয়ে চিপায় চাপায় কি কাম?
দেখতে তো ভদ্রলোকের মতো লাগে!”
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
“উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট। ভদ্রলোকের ছেলেরা নিশ্চই মেয়ে নিয়ে এই জঙ্গলের চিপায় আসবো না?”
দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে অপর ছেলেটি কথাটা বলেই কেমন বিদঘুটে হেসে উঠল। তাজধীর কে পেরিয়ে লোভাতুর চোখে চাইলো প্রিয়ন্তীর দিকে। ছেলেটার ওই খারাপ নজর লক্ষ্য করতেই গা হিম হয়ে এলো মেয়েটার। নিজেকে তাজধীরের আড়াল করল তৎক্ষণাৎ। শান্ত মেজাজি তাজধীরের ধৈর্যর বাধ ভাঙল এবার।
“মুখ সামলিয়ে কথা বল। কারো সম্পর্কে না জেনে শুনেই এভাবে যা তা মন্তব্য করার মানে কি?”
“চুরি চুরি আবার সিনা জুড়ি? আমাগো এলাকায় মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করবা ওপেন প্লেইসে? আবার আমরা কিছু বললেই গায়ে ফোস্কা লাগছে? এমনটাতো হইবো না।”

“দেখুন আপনারা যা মনে করছেন তেমন না নয়। আমি এখানে আমার ফ্রেন্ডের সঙ্গে এসেছি। ওকে হারিয়ে ফেলেছি। খুজছিলাম কি তখুনি উনার সঙ্গে…
“হইছে। তুমি চুপ থাকো মেয়ে। এরকম কত দেখলাম। অকাজ করার পর কি কেউ স্বীকার করে নাকি? এইযে হিরো সাহেব, আপনি চাইলে কিন্ত ব্যাপারটা আমাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। বুঝতেই পারছেন কি বলছি। না মানে সাথে যা যা আছে ভালোয় ভালোয় বের করে দিয়ে দেন, আমরাও ঠান্ডা মাথায় চুপচাপ চলে যাই। নাহলে বুঝতেই পারছেন বাকিটা…

ছেলেটার পুরো কথা শেষ করার আগেই শক্তপোক্ত এক ঘুষি পরে ছেলেটার গাল বরাবর। কয়েক কদম পিছিয়ে যায় তাতে ছেলেটা। আরো ক্ষিপ্ত হয়ে এগিয়ে যেতে নিলেই আকস্মিক বাধা পায় তাজধীর। অগত্যা থেমে যায় সে। পিছন থেকে ওর শার্ট এর একাংশ শক্ত করে খামচে ধরেছে প্রিয়ন্তী। মেয়েটা ভয়ে জড়োসড়ো। মুখটা শুকিয়ে এইটুকুন হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। বুঝাই যাচ্ছে এসব ঘটনার সঙ্গে সদ্য পরিচিত।
ওদিকে ছেলেগুলো বেপক ক্ষেপে যায় তাতে। বিষাক্ত সাপের মতো ফোঁসফোঁস করে উঠে। তাজধীর তৎক্ষণাৎ পকেট হাতড়ে ফোন করে করে।বলে,
“আমি কে সেটা এখুনি বুঝাচ্ছি। ওয়েট!”
খপ করে হাত থেকে ফোনটা ঝাটকা মেরে টেনে নিয়ে যায় ছেলেগুলো। আঘাত পাওয়া ছেলেটা ফোনটা সামনে এনে পরখ করে বলে,

“বাহ্ বেশ নামি দামি মডেলের ফোন’তো দেখছি। যাক এটা এখন থেইকা আমার !’
“এই কি হইতাসে রে এখানে। এতো হট্টগোল ক্যান?”
পাশ থেকে অচেনা কারো কণ্ঠস্বরে ছেলেগুলো ঘাড় উঁচিয়ে বলে,
“আর বইলেন না জামাল চাচা। পোলামাইয়া গুলো আজকাল এমন নষ্ট হইসে। আমাগো এই এলাকাটার নাম খারাপ করে ফেলসে পুরা। দুইটারে আটকাইসি দেহেন!বলেন এডিরে কি শাস্তি দেয়া যায়।”
“রাস্কেল মুখ সামলে কথা বলো। জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো একদম!”
বজ্র কণ্ঠে হুমকিসরূপ বাক্য ছুড়ল তাজধীর। ছেলেটা দাঁত খিচিয়ে বলল,
“দেখছেন চাচা। ধরা খাওয়ার পরও কেমন তেজ দেখায়? এই তোরা ভিডিও কর। আজকে এগুলারে ভাইরাল করব। আমার গায়ে হাত তোলা?”
ততক্ষনে সামনে এসে দাঁড়ালেন মধ্যবয়সী এক লোক। লোকটার গায়ে সাদা পাজামা পাঞ্জাবী। দেখেই বুঝা যাচ্ছে বেশ ধার্মিক ব্যক্তিবর্গ কেউ। উনি এসে তাজধীর আর ওর পিছনে গুটিয়ে থাকা প্রিয়ন্তী কে লক্ষ্য করলেন। ছেলেগুলো ততক্ষনে সত্যি সত্যি ফোন বের করে ফেলেছে। উনি হাত উঁচিয়ে থামালেন সবাইকে। বললেন,
“থামো। পাপ যেহেতু করছে তার শাস্তি হবেই। ভিডিও করোনা তোমরা। মেয়েটার কথা চিন্তা করে, এদের বরং বিয়ে পরিয়ে দাও।”

বয়স্ক লোকটার কথায় থেমে গেল ছেলেগুলো। মাঝখানে একজন গলা চড়িয়ে বলল,
“হ্যা চাচা খারাপ কয়নাই। চাচা দায়িত্বটা আপনেই নেন। এতোই যেহেতু পীড়িত তাইলে সারাজীবনের জন্য একলগে বাইন্দা দেন দুইডারে।বাড়িতে গিয়ে যা করার করুকগা।”
“অসম্ভব! ফাজলামো পেয়েছেন এসব? আমাদের দেখে কি আপনাদের ওরকম ছেলে মেয়ে মনে হচ্ছে? আর এইযে তোমরা, তোমাদের তো আমি দেখে নিচ্ছি, আমার ফোনটা দাও, এরপর সবকটাতে একবারে শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব আজন্মের।”

“দেখছেন চাচা?কেমন চেৎ দেখায়?”
বয়স্ক লোকটা এগিয়ে এসে দাঁড়াল তাজধিরের মুখোমুখি হয়ে,
“ফোন তুমি পাবে। আগে এই মেয়েটাকে বিয়ে করবে তারপর।”
“বললেই হলো? আপনারা যা বলবেন তাই মানতে হবে আমায়? ইয়ার্কি পেয়ে বসছেন?”
“দেখো ছেলে, তোমায় আমি ভালোভাবেই বুঝিয়ে বলছি। মেয়েটার সঙ্গে উল্টাপাল্টা কর্মকান্ড করতে পারবা আর বিয়ে করতেই দোষ? তোমাদের ভালো করে চেনা আছে আমাদের। এর আগেও কতগুলারে ধরসি। মাইগাগুলারে ভোলাবালা পাইয়া ব্যবহার করে ছেড়ে দাও।”
বয়স্ক লোকটার কথায় এবার হৈ হৈ করে উঠল ছেলেগুলো। মতবাদ পোষণ করে বলল,
“হ চাচার কথাই ঠিক। হয়তো এখুনি বিয়ে করবি, নাইলে ভিডিও করে সেটা নেটে ছেড়ে দিমু!”
“করবো না বিয়ে। তোদের যা করার কর।”
“তুই না করলে কি হইসে। এই মেয়ের বিয়েতো আজকেই হবে। আমাদের মধ্যে থেকেই একজন এই মেয়েকে বিয়ে করবে। এই শাওন তোর লাইগা না তোর মা মাইয়া দেখতাসিলো? বিয়ে করবি?”
শাওন ছেলেটা লোভাতুর চোখে চেয়ে বলল,

“হ ভাই। আমি তো একপায়ে রাজি। ”
তাজধীরের পিছন থেকেই শাওন নামের ছেলেটাকে পরখ করল প্রিয়ন্তী। হেংলা পাতলা, কালো কোঁকড়ানো চুলের একটা ছেলে। আতঙ্কে আরো ছটফটিয়ে উঠল মেয়েটা। কপাল বেয়ে কালো ঘাম জড়ছে রীতিমতো। গলা শুকিয়ে মরুভুমি ওর।
“দেখো ছেলে হয়তো তুমি এই মেয়েকে এখন বিয়ে করবে নাহলে এই মেয়েকে আমাদের এলাকার কারো সঙ্গে বিয়ে দেয়া হবে এখুনি। এরপর এর বাবা মা কে ডেকে এনে যা ব্যবস্থা করার করা হবে!”
লোকটার কথায় কাঁপতে কাঁপতে মানবের পিছনের শার্ট এর একাংশ শক্ত করে মুঠো করে চেপে কোনোরকমে আওড়াল প্রিয়ন্তী,
“আ আমি রাজি। রাজি এই বিয়েতে। প প্লিজ আপনিও রাজি হয়ে যান না।”
অবিশ্বাসে ঘাড় উল্টে তাকালো তাজধীর। অবলোকন করল প্রিয়ন্তীর ভীতু চেহারাখানা। আশ্বাস দিয়ে বলল ওকে,
“আপনি ভয় পাবেন না। আমি সামলাচ্ছি এদের!”
তন্মধ্য তাচ্ছিল্য করে বলল একজন,

“কি সামলাবি? হিরোগিরি দেখাও? আমাদের এখানে হিরোগিরি চলেনা। এইটা আমাদের এলাকা। আজকে বিয়ে না করলে এই মেয়েকে আমাদের মধ্যে থেকেই কেউ বিয়ে করবে!”
তাজধীর চোয়াল শক্ত করে এক পা এগোতেই পিছন থেকে আবারো চেপে ধরে প্রিয়ন্তী। মেয়েটা চোখের ইশারায় বুঝায় এখান থেকে না যেতে। তাজধীর থেমে যায় আবারো। দাঁতে দাঁত পিষে সামলায় নিজেকে।
“আমি একবার বলছি—আমরা এখানে কোনো অবৈধ কিছু করছিলাম না। আর তোমরা কার সাথে কথা বলছ, জানো না।আমি কিন্ত তোমাদের একজন কেও ছাড়বো না, মাইন্ড ইট!”
“বুঝসি এই পোলা রাজি হইবো না। এই চাচা আপনি বরং শাওনের লগেই এই মাইয়ার বিয়ে পড়ানো শুরু করেন। এরপর এটার ব্যবস্থা করতাসি আমরা!”
প্রিয়ন্তীর পা থেকে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হয়। মেয়েটা কেঁদেকুটে একাকার। কাঁদো কাঁদো গলায় আবারো অনুরোধ করে,
“প প্লিজ আপনি রাজি হয়ে যান না। প্লিজ!”
“মিস প্রিয়ন্তী কি বলছেন এসব? ভেবে চিনতে বলছেন তো? দেখুন ভয় পাবেন না একদম।”
“আমার আপনাকে বিয়ে করতে কোনো সমস্যা নেই। আমি ভেবেই বলছি। আ আপনি প্লিজ হ্যা করে দিন। প্লিজ!”
তাজধীর চোখ বন্ধ করল। লম্বা করে একটা শাস ছাড়ল। পরোমুহূর্তেই রুক্ষ স্বরে জানাল,
“আচ্ছা ঠিক আছে!”

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। আকাশ দিনের সমস্ত আলো গুটিয়ে নিয়ে ডুবে গেছে ধূসর অন্ধকারে।উইন্ডশিল্ডের উপর একের পর এক আছড়ে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা। ওয়াইপারগুলো নিরবচ্ছিন্ন ছন্দে সেগুলো সরিয়ে দিচ্ছে বটে, তবু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সামনের দৃশ্য।
গাড়ির ভেতরটাও অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ।ড্রাইভিং সিটে বসে তাজধীর একমনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। তার মুখভঙ্গি গম্ভীর। চোয়াল শক্ত। নিজের ভেতরের সমস্ত ঝড়কে জোর করেই আটকে রেখেছে যেন।
তাজধীরের পাশের সিটেই চুপচাপ বসে আছে প্রিয়ন্তী।মেয়েটা জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে।চোখদুটো টলমল। কান্না থেমে গেলেও চোখের কোণে এখনও জমে আছে অশ্রুর চিকচিক রেখা।কী থেকে কী হয়ে গেল! সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়ও কি সে কল্পনা করতে পেরেছিল, দিনের শেষে এমন একটা অবস্থার মুখোমুখি হবে?বাড়ি থেকে বের হয়েছিল শ্রেয়ার সঙ্গে।আর এখন
অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য, অবাঞ্ছিত এক বাস্তবতা তাকে ঘিরে ফেলেছে। শ্রেয়াকে খুঁজতে লোক লাগিয়েছে তাজধীর। পেয়েও গেছে। বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেই রওনা দিয়েছে দুজন।

পুরোটা পথ কেউ কোনো কথা বলল না।এভাবেই পার হলো ঘন্টা খানেকের পথ। আরো কিছুটা সময় নিয়ে অবশেষে গাড়িটা এসে থামল প্রিয়ন্তীদের বাড়ির সামনে। তাজধীর ইঞ্জিন বন্ধ করে ডাকল কেবল,
“চলে এসেছি।”
শব্দটা কানে যেতেই ধ্যান ভাঙল প্রিয়ন্তীর।মেয়েটা চমকে তাকাল সামনে।পরিচিত বাড়িটা চোখে পড়তেই বুকের ভেতর জমে থাকা ভার যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল।কোনো উত্তর দিল না সে।
নিঃশব্দে দরজা খুলে নেমে পড়তেই আচানক শুনতে পায়,
“মিস প্রিয়ন্তী!দেখুন আজ যা হয়েছে… সেটা আমাদের কারোর’ই পরিকল্পনায় ছিল না।সত্যি বলতে আমিও ভাবিনি জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত এভাবে, এত আকস্মিকভাবে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে।কিন্তু একটা কথা আমি বিশ্বাস করি। বিয়ে একটা পবিত্র সম্পর্ক। পরিস্থিতি যেমনই হোক, যেভাবেই হোক না কেন,আজ থেকে আপনার নামটা আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।আর সেই সঙ্গে আপনার দায়িত্বটাও।আমাকে আজই ফিরতে হবে।ইভেন এখান থেকেই সরাসরি আবারো রওনা দিবো। হয়তো কিছুদিন খুব ব্যস্ত থাকব।

কিন্তু তাই বলে এটা ভাববেন না যে আপনাকে একা রেখে যাচ্ছি, বা দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাচ্ছি। আপাতত এসব বিষয়ে কাউকে নিজ থেকে কিছু জানানোর প্রয়োজন নেই। আপনি ভয় পাবেন না। ব্যাপারটা আমি সামলে নিবো। খুব শীগ্রই ফিরবো। আপনি এখন আমার আমানত।আর আমানতের হেফাজত করা আমার দায়িত্ব।আশা করি আমার অমানতের খেয়ানত আপনি করবেন না। শুধু একটু ভরসা রাখুন আমার উপর।”

ডেসটেনি পর্ব ২৮

চুপচাপ শুনল মেয়েটা। অনেক কিছু বলতেও ইচ্ছে করল। আগ বাড়িয়ে বলল না কিছুই। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।তাজধীরও আর কিছু বলল না।দুজনের মাঝখানে নেমে এলো দীর্ঘ নীরবতা।আর সেই নীরবতার মাঝেই অদ্ভুত এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে প্রথম পদক্ষেপ রেখে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল প্রিয়ন্তী।আর সেদিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল তাজধীর।

ডেসটেনি পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here