Home ডেসটেনি ডেসটেনি পর্ব ৩৫

ডেসটেনি পর্ব ৩৫

ডেসটেনি পর্ব ৩৫
সুহাসিনি মিমি

স্বভাবতই ​মেহেরিনের ঘুম ভাঙল সকাল বেলা। বিছানা ছেড়ে সোজা নিচে নেমে এলো। হলরুমে কেউ নেই। গতকাল মার্কেট থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিলো। সুমি বেগম উঠেন নি তাই। কিচেন থেকে টুকটাক থালা বাসনের শব্দ আসছে। ঝুমুর কিচেনে নাস্তা বানাচ্ছে। মেহরিণ দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। ​পা বাড়িয়ে গিয়ে দাঁড়াল বাগানটার একপাশে।দেখল সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ মালি চাচা খুব মন দিয়ে গার্ডেনিং করছেন। লনের ধারে থাকা পাতাবাহারের ঝোপগুলো থেকে বাড়তি ডালপালা কাঁচি দিয়ে ছাঁটাই করছেন তিনি।পানিও দিচ্ছেন।
​মেহেরিন সেখানে এগিয়ে গিয়ে মিষ্টি কণ্ঠে শুধাল,

“কী করছেন চাচা? এত ভোরেই কাজে নেমে পড়েছেন?”
​লোকটার নাম ইলিয়াস। বিগত ছয় বছর যাবৎ এই কাজে নিয়োজিত তিনি। কাঁচিটা থামিয়ে চশমার ওপর দিয়ে চাইলেন মেহরিণ এর দিকে। পরিচিত মিষ্টি হাসিতে মুখটা ভরিয়ে বললেন,
“গাছপালার যত্ন সকাল করেই নিতে হয়। সকালের এই ঠান্ডা পানি আর রোদটাই তো এদের আসল খাবার।”
“আমি আপনাকে সাহায্য করি চাচা?”
মেহরিণ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই জিজ্ঞেস করল। ইলিয়াস মৃদু হেসে আপত্তি জানাল প্রথমে। মেহরিণ জোড় করলে লোকটা হাল ছেড়ে দিয়ে বলেন,
“সাবধানে দিয়ো। আমি একটু ওইপাশ থেকে আসি। কেমন?”
​তিনি হাতে থাকা পানির লম্বা পাইপটা মেহরিণ এর হাতে দিতেই মেহরিণ জানাল,
​“আচ্ছা চাচা, আপনি যান।”

​ইলিয়াস চলে গেলেন। মেহরিণ প্রথমে পাইপটা নিয়ে নিজের পা দুটো ভিজালো। জুতো জোড়া খুলে রেখে থোকা থোকা শিশিরভেজা ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটল কিছুক্ষন। অতঃপর পাইপ দিয়ে ঝরনার মতো পানি ছড়িয়ে ছড়িয়ে ছোট ছোট চারা গাছগুলো ভিজালো। ​পানি ছিটাতে ছিটাতে মেহেরিনের চোখ গিয়ে আটকালো কোণে থাকা সেই বিশেষ বাগানটার দিকে।
মস্ত বড় বড় হলুদ সূর্যমুখী ফুলগুলো ভোরের আলোর দিকে মুখ করে ফুটে আছে। বাগানটা ভীষণ ঘন, সারি সারি গাছের পাতায় ঢাকা। মেহেরিনের মনে হলো ওই সোনাঝরা হলুদ ফুলগুলোর গায়ে একটু পানি ছিটিয়ে দিলে ওরা হয়তো আরও তাজা হয়ে উঠবে!​কৌতুহল নিয়েই মেহেরিন পানির পাইপটার মুখ সামান্য চেপে ধরে সোজা সূর্যমুখী বাগানের দিকে নিশানা করল। সজোরে চুরমার হয়ে পানির ফিনকি গিয়ে আছড়ে পড়ল ঘন ঘন ডালপালার ওপর। মেহেরিন মনের আনন্দে সুর তুলে গুনগুন করতে করতেই পানির তোড় বাড়িয়ে দিল এবার।
​কিন্তু তার সেই আনন্দ স্থায়ী হলো ঠিক চার সেকেন্ড!
​ঘন সূর্যমুখী বাগানের একদম মাঝখান থেকে আচমকা এক গর্জনে ভোরের নিরবতা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ল ওর কানে,

​“হেই ইউ ইডিয়েট! বন্ধ কর এটা!”
​কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ঘন সূর্যমুখী গাছগুলোর পাতা আড়াল করে সশব্দে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘদেহী মূর্তি!​ আর সেই মানব কে দেখতেই ভয়ে, আতঙ্কে বেচারির হৃত্পিণ্ড থেমে গেল যেন ওখানেই।
​বাগানের আড়ালে নিচু হয়ে হয়তো কোনো বিশেষ গাছের গোড়া ছাঁটাইয়ের কাজ করছিল সেহরোজ। মেহেরিনের ছিটানো পানির তোড় সরাসরি গিয়ে আছড়ে পড়েছে তার ওপর!​সেহরোজ এর পরনে থাকা ধবধবে সুতির গ্রে-কালার টি-শার্টটা পুরোপুরি ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। শার্টের ভেতর দিয়ে তার সুগঠিত চওড়া বুক, পেশি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কপাল বেয়ে ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ছে নোনা পানি। চুলের গোছা ভিজে কপালে এসে লেপ্টে গেছে।​ ​চোখ দুটো রাগে টকটকে লাল। চোয়াল শক্ত প্রচন্ড। ওই চোখ দিয়েই বুঝি জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে বেচারিকে।
​মেহেরিনের মাথা ততক্ষণে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হলে এমন পরিস্থিতিতে হয়তো পাইপ ফেলে দিয়ে উল্টো দিকে দৌড় মারত, কিন্তু চরম ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মেহেরিনের হাত আর মস্তিষ্ক যেন কাজ করাই বন্ধ করে দিয়েছে!

​পাথরের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ওখানটায়। আতঙ্কে বিবেক বুদ্ধি লোপ পেয়ে পাইপটা আগের ন্যায় ধরেই রেখেছে লোকটা বুক বরাবর। বুকের ভেতর সহস্র ঢাক ঢাকঢোল একযোগে বেজে চলেছে ওর! শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া গলায় বেশ কয়েকটা শুকনো ঢোক গিলল মেহরিন।
​সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেহরোজ এর চোখ দুটো থেকে সাক্ষাৎ আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে যেন! ​​রাগে রি-রি করতে করতেই এগিয়ে এসে এক ঝটকায় মেহরিনের হাত থেকে পাইপটা কেড়ে নিল সেহরোজ। কাড়ার সাথে সাথেই কোনো কিছু না ভেবেই সেটা মেহরিণ এর মুখ বরাবর চেপে ধরতেই সহস্র পানির ধারায় মুহূর্তেই ভিজে চুপচুপে হলো বেচারি।

​“আঃ!”
হাতের উল্টো পিঠে পানি আটকানোর চেষ্টা করল। মেহরিণ এর গায়ে ছিল বেবি পিঙ্ক কালার একটা থ্রি পিস সেট। অঝোর পানিতে সেই কাপড় ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে ফুটে উঠল নারীলি অবয়ব। শরীরের প্রতিটা ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল তাতে। গলার ওড়নাটাও ভিজে এক পাশে ঝুলে পড়েছে।​
তড়িৎ হুসে ফিরল মানব।পাইপ অন্যত্র সরালেও নিজের অবাধ্য দৃষ্টি সরাতে পারল না তার।
ফ্যালফ্যাল করে, সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইল সেই ভেজা মানসীর দিকে!নিজের ত্রিশ বছরের সুশৃঙ্খল, কঠিন,রাশভারী জীবনে সে কখনো কোনো নারীকে দেখে এমন অনুভূতি অনুভব করেনি।কখনো কোনো রূপ তাকে এতটুকুও টলাতে পারেনি। যা এই এক মুহূর্তে এই সাধারণ একটা ভেজা থ্রি-পিস পরা মেয়েটাকে দেখে ফিল করছে! হৃদপিণ্ডের গভীর কোণে কেমন যেন এক অজানা তোলপাড় শুরু হয়ে হলো বোধহয় !মেহরিন পানির তোড় থামতেই চোখ মেলে চাইল।লোকটার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে কাঁপতে কাঁপতেই ওড়নাটা টেনে জড়ালো গায়ে।

​লোকটার ওই দৃষ্টিতে তীব্র অসস্তি অনুভূত করল সে। লজ্জায় কুঁকড়ে গেল আরো। দুই হাতে ওড়নাটা কোনোমতে টেনটুনে বুক আর শরীর ঢাকতে ঢাকতে সেখান থেকে বাঁচার জন্য উল্টো ঘুরে এক দৌড় দিল।
​কিন্তু ভিজে যাওয়া পিচ্ছিল ঘাসের ওপর দৌঁড়াতে গিয়েই আকস্মিক ধুপ করে পা পিছলে গেল ওর।
ভারসাম্য হারিয়ে আছাড় খেয়ে মাটিতে পড়তে নিলে
কোমরে একখানা শক্ত পোক্ত কোনো কিছুর অস্তিত্ব টের পেলো। তড়িৎ বেগে শক্ত হাতে কোমর আঁকড়ে ধরে টেনে নিয়েছে নিজের বুকের মাঝখানে!
​বাতাসে দুটো ভেজা শরীরের মৃদু ঘর্ষণ হলো। নিচে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেলেও মেহরিনের সোজা ল্যান্ডিং হলো লোকটার সুগঠিত, পুরুষালি ভেজা বুকের ওপর!
​সেহরোজ এর কি হলো কি জানে। তাল জ্ঞান হারিয়ে সম্পূর্ণ ঘোরের মাথায় মেহেরিনের কোমরে চেপে বসা শক্ত হাতটা আরেকটু শক্ত করল। টেনে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নিল সে।পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির মেহরিণ ছয় ফুট সেহরোজ এর বুক ছুঁই ছুঁই। মেহরিণ কাঁপছে। সেই কম্পিত নিষ্পাপ, ভীতিগ্রস্ত মুখের দিকে অপলক চেয়ে থাকল মানব। চোখ পড়ল ভিজা গোলাপের পাঁপড়ির ন্যায় কোমল মেয়েলি ওষ্ঠাধয়ে। অমনি শক্তপোক্ত গরণের সেহরোজ তালগোল পাকিয়ে বসল সব। ধ্যান জ্ঞান হারিয়ে অজানা ঘোরের বশেই মুখটা এগিয়ে নিলো মেহরিণ বরাবর। একদম কাছাকাছি এসে থামলো। মেহরিণ এর ছটফটানি, অস্থির হয়ে নিজেকে ছাড়াতে চাওয়া সবকিছুকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে একদম মেয়েটার অধর বরাবর এগিয়ে গেল।

​“আরে! তোমরা দুজনে সকালে উঠে এখানে কী করছ?”
​দূর থেকে ভেসে আসা শাফিনের উচ্চকিত ডাকটা নিমেষে বাজ হয়ে আছড়ে পড়ল সেহরোজ এর কানে!​ বন্ধ হয়ে যাওয়া মস্তিষ্ক সচল হলো নিমিষে। ঘোর কেটে বাস্তবতায় ফিরল সে!আলগা করল হাতের বাঁধন। ওদিকে লোকটার হাতের বাঁধন আলগা হতেই পুনরায় চোখ মুখ খিচিয়ে উল্টো পথে দৌড় লাগালো মেহরিণ। ​
সেহরোজ তখনো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। দেখল মেয়েটার পাগলের মতো দিকবেদিকশূন্য হয়ে ছুটে চলা। এরপর তাকালো সাফিনের উপর। সাফিন চোখ কপালে তুলে তার দিকেই তাকিয়ে।নিজের হাত দুটোর উপর দৃষ্টি তাক করল এবারে। একটু আগে সে কি করতে যাচ্ছিলো এসব? কী করছিল এতক্ষণ? সাধারণ একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখে তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো? তাও আবার ওই হাফফুট গ্রামের দুই ইঞ্চি, আঁনকালচার্ড মেয়েটা! ভাবতেই নিজের ওপর চরম বিরক্তি চেপে বসল তার।হাতের মুঠো শক্ত করে চেপে চোয়াল ভেঙে ধপধপ করে পা ফেলে সোজা বাড়ির ভিতর চলে গেল সেও।শাফিন বোকার মতো চেয়ে চেয়ে দেখল শুধু। যাক! কি হলো এটা? কিছুই মাথায় ঢুকল না তার।

রুমে ঢুকে দরজাটা শব্দ করে বন্ধ করল সেহরোজ।
​নিজের ওপর চরম ঘৃণায় ফেটে পড়ছে সে।
​একজন দায়িত্বশীল নেভি অফিসার, অত্যন্ত সুশৃঙ্খল আর ইস্পাতকঠিন যার আত্মনিয়ন্ত্রণ! সে কিনা সামান্য একটা গ্রাম্য, বোকা আর ছটফটে মেয়ের অতটা কাছাকাছি গিয়ে কীভাবে নিজেকে হারাতে বসল? কীভাবে একটা ফালতু ঘোরের মধ্যে নিজের সমস্ত ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিতে যাচ্ছিলো সে? মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্বে নিজের ঠোঁট দুটো নিয়ে যাওয়ার মতো এমন সস্তা আর গর্হিত কাজ করল কীভাবে?
​“শিট! শিট! হাউ কুড আই বি সো কেয়ারলেস!”
দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল সেহরোজ। ​রাগে, স্বকীয় ধিক্কারে মাথা বিকল হয়ে যাচ্ছে তার। ড্রয়ার টেনে টেবিল থেকে ফাইলপত্রগুলো আছাড় মেরে মেঝেতে ছিটিয়ে দিল। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা পারফিউমের শিশিটা ছুড়ে ফেলল কার্পেটে।তার রাগটা অন্য কারো ওপর নয়।কেবলই নিজেরই হচ্ছে। কোনো পরিস্থিতিতেই নিজের এহেন বিচ্যুতি মেনে নিতে পারছে না সে।
​অনেকক্ষণ রুমে পায়চারি করার পর কোনোমতেই নিজেকে ধাতস্ত করতে পারছেনা। কিভাবে ওই মেয়েটার মুখোমুখি হবে এরপর?অবশেষে চোখ বন্ধ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হলো সেহরোজ। এখানে আর এক মুহূর্তও থাকা যাবে না। সে এখনই বেইজে ফিরে যাবে।

​গা ধুয়ে, পরনের জামাকাপড় বদলে একটা ট্রাউজার আর ডার্ক শার্ট গলিয়ে নিল।খিটমিটে মেজাজেই গিয়ে উপস্থিত হলো মায়ের দরজায়।​সুমি বেগম তখন সবেমাত্র সকালের প্রার্থনাসূচী শেষ করে ড্রয়িংরুমের দিকে আসতে যাচ্ছিলেন। দরজায় নিজে ছেলেকে ব্যাগের বেল্ট শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি একটু অবাকই হলেন।বললেন,
​“বাবু ? সকালে এভাবে তৈরি হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?”
সেহরোজ গম্ভীর কণ্ঠে জানাল,
“আমি বেইজে ফিরে যাচ্ছি আম্মু।”
​সুমি বেগম চরম বিস্ময়ে কয়েক পা এগিয়ে এলেন।বললেন,
“আজই? তুই না বললি এবার বেশ কদিনের ছুটি নিয়ে এসেছিস?”
“হু!”
“তাহলে এভাবে হঠাৎ চলে যাবি মানে? কী হয়েছে তোর?”
​“ছুটি ক্যানসেল হয়ে গেছে।”

মায়ের মুখের উপর না চাইতেও সাফ সাফ মিথ্যে ছুড়ে দিল সেহরোজ। বলল আবারও,
“তাছাড়া এখানে আমার আর কোনো কাজ নেই। গাড়ি রেডি করতে বলেছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বেরোব।”
​সুমি বেগম ছেলের এই হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণে বেশ দমে গেলেন। তিনি জানেন ছেলেটা যখন কোনো বিষয়ে গোঁ ধরে, তখন ওকে নড়ানো কঠিন। তবুও অত্যন্ত নমনীয় ও শান্ত গলায় বললেন,
​“শোন না বাবা। তুই এভাবে হুট করে চলে যাবি কেন? কিছু কি হয়েছে বলনা? এরকম আর কত করবি বল? একটু মায়ের দিকটাও তো বিবেচনা করবি।”
“যা বলতে চাও সোজাসুজি বলো আম্মু। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা ডিসলাইক করি জানোই!”
সুমি বেগম একটা ঢোক গিলে এক নিঃশাস বললেন,
“দেখ! তুই ভালো করেই জানিস মেহরিণ কে এখানে আনার পিছনে কারণ টা কি? আমি আর লুকোচুরি চাইনা। আমি চাই তুই মেয়েটাকে নিয়ে একটু ভেবে দেখ ঠান্ডা মাথায়। মেয়েটা কিন্ত অতটাও ছোট নয় যে তোকে বুঝবে না। শুধু একটু অবুঝ। সময় দিলে সব শুধরে যাবে।তুই শুধু একটা বার বল? দেখবি আমি ওকে একদম তোর মতো করে তৈরী করে নিবো। বলছিলাম কি বিয়েটা নিয়ে একবার ভাবলে হতো…
“স্টপ ইট আম্মু!”

এমনিতেই মেজাজ বিগড়ে ছিল সেহরোজ এর। তার মাঝে মেহরিণ এর নামটা আগুনে ঘি ঢালল যেন।মায়ের দিকে এক ধাপ এগিয়ে রূঢ় কণ্ঠে বলে উঠল মাকে,
“আমার জানার বা বোঝার কোনো ইচ্ছে নেই! আর দয়া করে ওই মেয়েটার প্রসঙ্গ তুলে আমার মেজাজ আর বেশি খারাপ কোরো না!”
​থমকালেন ভদ্রমহিলা। কিন্তু দমলেন না। তিনি মা! ছেলের ভালো-মন্দ ভাবার অধিকার তাঁর আছে। তিনি আরেকটু এগিয়ে এসে ছেলের হাতটা ধরে বললেন,
“তুই এত রেগে যাচ্ছিস কেন বল তো? আমি তোর ভালোটার জন্যই বলছি। মেয়েটা দেখতে যেমন মায়াবী, স্বভাবেও তেমন মিষ্টি। গ্রাম থেকে এনেছি বলে তুই ওকে এত অবহেলা করছিস? আমি তো চাইছি তোরা দুজনে সংসারটা শুরু কর। মেহেরিনকে যদি তোর মনের মতো করে গুছিয়ে নিস, ও একদম রাজকন্যা হয়ে তোর পাশে মানাবে বাবা…।”
​“স্টপ ইট, মা! জাস্ট স্টপ ইট!”
ঝাটকা মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো সেহরোজ।
মায়ের দিকে রূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

​“তুমি কি নিজের বিবেক-বুদ্ধি সব হারিয়েছ আম্মু? কীসের রাজকন্যা? আর কীসের বিয়ে? গ্রাম থেকে একটা কাকে তুলে এনে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছ তুমি? ওই মেয়েটার কি আমার সাথে কোনো একটা এঙ্গেলেও সামান্যতম ম্যাচ আছে?”
​”বাবু!নিজের মায়ের সাথে তুই এভাবে কথা বলছিস? মেহেরিন কী দোষ করল?”
​“ওর দোষ ও এখানে আছে! আর তোমার দোষ তুমি আমায় একটা অবুঝ, অশিক্ষিত আর আনাড়ি মেয়ের সাথে বেঁধে দেওয়ার পাঁয়তারা করছ!”
সেহরোজ এর চিবুক শক্ত হয়ে উঠল আরো। গলার রগ ফুলে উঠল রাগে।
“ওই মেয়েটার কি আদৌ বিয়ের বয়স হয়েছে? নাকি ওর সাথে কথা বলার মতো কোনো মানসিক পরিপক্কতা আছে? আমার মতো একজন নেভি অফিসারের পাশে ওকে দাঁড় করালে লোকে আমাকে হাস্যাস্পদ মনে করবে! কোন এঙ্গেলে ও আমার বউ হওয়ার যোগ্য, বল তো আম্মু? কোনো এঙ্গেলে নয়!”

​সুমি বেগম স্তব্ধ হয়ে রইলেন। ছেলেটা যে তার কতটা অহংকারী আর কঠোর হতে পারে, তা তিনি জানতেন। তবে মেহেরিনকে নিয়ে এভাবে রূঢ় আচরণ করবে, তা ভাবেননি।​সেহরোজ হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। তাড়া দিয়ে বলল,
​“আমি চলে যাচ্ছি। আর শোনো—পরের বার যদি আমায় এই বাড়িতে ডাকো, তবে এই ফালতু পাত্রী দেখার নাটক বন্ধ করে ডাকবে।সাথে ওই ফালতু এক্টিংও। নতুবা এই বাড়িতে আমার আসা পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যাবে!”
​কথাটা শেষ করে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সে। সুমি বেগমের উত্তরের উপেক্ষা করেই বিশাল লম্বা কদমে ধপধপ করে পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা বাইরে দাঁড় করানো গাড়িতে গিয়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গাড়িটা উঠোন চিরে তীব্র গতিতে বেরিয়ে গেল গেট দিয়ে। ​পড়ে রইলেন সুমি বেগম। এক বুক কষ্ট আর বিষাদ নিয়ে।

​সকালের পর মেহরিণ এর সময় কেটেছে নিজের ঘরে, বিছানায় মুখ গুঁজে। লজ্জায় নিচে নামারই সাহসই পায়নি।সাফিন চলে গেছে সকালের নাস্তা শেষেই। ভার্সিটি যেতে হবে আজ তাকে। ​দুপুরের দিকে রুম ছেড়ে বেরোলো মেহরিণ। সকালে অনেকবার ঝুমুর ডেকে আসলেও সারা দেয়নি ও। ঝুমুর মনে করেছে ঘুমাচ্ছে হয়তো। উঠলে নিজে থেকেই আসবে। ​মেহেরিন নিচু গলায় শুধাল,
“ঝুমুর আপু আন্টি কোথায়?”
​ঝুমুর গামছা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে মেহেরিনের কাছে এগিয়ে এলো। বেশ নরম গলায় বলল,
“খলাম্মা তো নিজের ঘরে শুয়ে আছেন। সকাল থেকে কান্নাকাটি করতাসে। কিছু খানওনি।”
​মেহেরিন অবাক হয়ে চাইল,
“কান্নাকাটি করছেন? কেন? কী হয়েছে?”
​ঝুমুর এদিক-ওদিক তাকিয়ে আরও একটু কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
“ভাইজান তো চলে গেছে।”
“চলে গেছে? কোথায় গেছে?”
“আরেহ একবারে বেইজে চইলা গেছে সকালে।আবার কবে আহেন কে জানে। তাই খালাম্মার মন খারাপ।”
মেহরিণ ভেবে বলল,

​” উনি না ছুটিতে এসেছিলেন?”
​“আসছিলেন তো। কিন্তু সকালে খালাম্মার সাথে কী নিয়া যেন সাংঘাতিক ঝগড়া হলো ভাইয়ার। খুব চ্যাঁচামেচি করল খালাম্মার উপর। আর তারপরই ব্যাগপত্র নিয়ে সোজা চইলা গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল সহজে নাকি আর এই বাড়িতে আইব না।”
​বিষয়টা মেহরিণ এর খুব অবাক লাগল। সকালের ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটার জন্যই কি লোকটা এভাবে রেগেমেগে চলে গেল? ওনাকে তো ভিজিয়ে দিয়েছিল মেহরিনই। ভুল তো মেহরিনেরই ছিল! তবে কি লোকটা ওকে এতটাই অপছন্দ করে, এতটাই ঘৃণা করে যে এই বাড়িতে ওর উপস্থিতিই সহ্য করতে পারল না?​মেহরিনের মনে কোথাও না কোথাও হয়তো অজান্তেই একটা প্রচ্ছন্ন আশা উঁকি দিয়েছিল। হয়তো লোকটা একটু নমনীয়। কিন্তু আজ হঠাৎ আকস্মিক নির্দয় প্রস্থান মেহরিনের সেই সুপ্ত চাওয়াটাকে মুহূর্তে চুরমার করে দিল।​ও খুশি হতে চাইল। ভাবল যাক—ওই জল্লাদ লোকটার কড়া চোখ আর ধমক থেকে অন্তত বাঁচা গেল! কিন্তু চেষ্টা করেও মেয়েটা খুশি হতে পারল না।​বরং কোথাও একটা অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করল।

সামনের সপ্তাহ থেকেই প্রিয়ন্তীর পরীক্ষা। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের সিলেবাস মানেই তো সাহিত্য আর ক্রিটিসিজমের এক বিশাল পাহাড়! শেকসপিয়ার, মিল্টন আর চসারের কবিতার জটিল সব ব্যাখ্যা সামলাতে গিয়ে ইদানীং ওর নাওয়া-খাওয়ার একদম ঠিক নেই। সকাল থেকে একটানা ইংলিশ পোয়েট্রি আর ডিরেক্ট নোটস সামলাতে সামলাতে প্রিয়ন্তীর ক্লান্ত শরীরটা আর সায় দিচ্ছিল না। মোটা একটা টেক্সট বইয়ের ওপর মাথা রেখেই বিছানায় কখন যে নিঝুম ঘুমে তলিয়ে গেল, টেরই পায়নি।
টেবিলের ওপর রাখা মোবালেরএকটানা ক্যাটক্যাটে শব্দে সদ্য কাঁচা ঘুমটা উবে গেলো ওর। ​ঘুমের অতল সাগরে ডুব দেওয়া প্রিয়ন্তীর ভ্রু দুটো কুঁচকে এলো। চরম বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে, হাতড়ে হাতড়ে ফোনটা কোলের কাছে টেনে নিল সে। আধবোজা, ঘুমঘুম চোখ দুটো না খুলেই অলস বুড়ো আঙুলে স্ক্রিন সোয়াইপ করে ফোনটা সোজাসুজি কানে গুঁজল প্রিয়ন্তী।​ ধীমান, অস্ফুট কণ্ঠে জানতে চাইল,

​“হ্যালো… কে?”
​“আপনার বাচ্চার বাবা বলছি!”
​ওপাশ থেকে উত্তরটা এলো সঙ্গে সঙ্গেই! যেন ওপাশের গম্ভীর ব্যক্তিটি আগে থেকেই প্রস্তুত হয়েই বসে ছিল এমন জবাবের। উত্তরটা কান অব্দি পৌঁছানো মাত্রই প্রিয়ন্তীর ঘুম উবে গেলো পুরোপুরি। ​ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে, হকচকিয়ে বিছানার ওপর ঝট করে উঠে বসল মেয়েটা। কপালে এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো একহাতে সামলে, চোখ দুটো বড় বড় করে ফোনটা কান থেকে সরাল।​বুকের ধুকপুকানি তখন দ্বিগুণ গতিতে চলছে!​স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কন্টাক্ট নম্বরটা ভালো করে পরখ করল।নিরামিষ কমান্ডার দিয়ে সেইভ করা নাম্বারটা থেকে কল এসেছে।চোখ বন্ধ করে শ্বাস ছাড়ল ও। অসস্তি ভাব লুকিয়ে মেকি বিরক্তি নিয়ে বলল,
“আপনার এসব কথাবার্তা কি নেভির অফিশিয়াল ট্রেনিংয়ের অংশ, নাকি ইদানীং স্পেশাল কোর্স করছেন?”
​ নেভাল বেইজের কনফারেন্স রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তাজধীর ফোনটা কানে ধরে একচিলতে প্রচ্ছন্ন হাসি ফুটাল ঠোঁটে। সমুদ্রের হাওয়ায় ধবধবে সাদা ইউনিফর্মের কলারটা উড়ছে তার। অত্যন্ত শান্ত, গম্ভীর গলায় উত্তর দিল সে,

​“আপনার মতো খামখেয়ালী ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্টকে সোজা লাইনে রাখার জন্য এই কোর্সগুলো স্বউদ্যোগেই শিখতে হয়,মিসেস ! তা, ম্যাডাম কি পড়াশোনা ছেড়ে দিনেদুপুরে স্বপ্ন দেখছিলেন?”
​প্রিয়ন্তী দাঁতে দাঁত চিপে টেবিলের বইটার দিকে তাকাল। লোকটা দূর সমুদ্রে থেকেও কীভাবে জেনে যায় ও এইমাত্র ঘুমাচ্ছিল?বলল,
​“আমি মোটেও স্বপ্ন দেখছিলাম না! পরীক্ষা সামনে। তাই একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।”
​“তা মিসেস গিফটটা কি পেয়েছেন?”
​পড়ার টেবিলের এক পাশে রাখা কাচের ছোট একোয়ারিয়ামটার দিকে তাকালো প্রিয়ন্তী। সেখানে দুটো নীল রঙের ব্লু-হাফমুন ফিশ আপন মনে সাঁতার কেটে কেটে বেড়াচ্ছে। আজ দুপুরেই লোকটা আরেকটা মাছ পাঠিয়েছে। ​ওদিকে চেয়েই উত্তর দিলো,
​“জি।”
​ওপাশে তাজধীরের ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসিটা আরেকটু গাঢ় হলো। সমুদ্রের প্যানেলে দৃষ্টি রেখে বড্ড মেপে মেপে প্রশ্ন ছুড়ল,

​“পছন্দ হয়েছে?”
নিচের ঠোটটা অজান্তেই দাঁত দিয়ে চেপে ধরলো প্রিয়ন্তী। ঠোঁট কামড়ে রেখেই প্রচ্ছন্ন কৌতূহল নিয়ে শুধাল,
​“হ্যাঁ, পছন্দ হয়েছে। তবে একটা কথা। আমার কাছে তো অলরেডি একটা ব্লু-হাফমুন ছিল। আপনি আবার আরেকটা পাঠালেন যে?”
​“আপনার কাছে যেটা ছিল ওটা তো আপনি কোনো অনুমতি ছাড়া, একপ্রকার চোরের মতো আমার একোয়ারিয়াম থেকে গায়েব করে নিয়ে এসেছিলেন। বেচারাকে আর কতকাল ঐভাবে একা একা রাখবেন? একাকিত্ব যে কতটা ভ য়ঙ্কর তা আমার থেকে ভালো আর কেইবা জানবে বলুন। তাই ওটার ওপর দয়া করেই দ্বিতীয়টাকে পাঠানো।”
​প্রিয়ন্তী সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফুলিয়ে খিটখিটে গলায় প্রতিবাদ করে উঠল,
“বাব্বাহ! আপনি আবার মাছের একাকিত্ব নিয়েও ভাবেন দেখছি!”
​“একটা বদ্ধ জায়গায় একা থাকাটা খুবই কষ্টদায়ক। আপনি কি লক্ষ্য করেছেন এতদিন ওটার সাঁতারের গতি কতটা মন্থর ছিল? কারণ সে জানত তার সাড়া দেওয়ার কেউ নেই। এবার দ্বিতীয় মাছটা গেছে।দুজন মিলে পুরো একোরিয়ামজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করবে।
​প্রিয়ন্তী ভুরু কুঁচকে একটু বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বলল,
“এ্যা! আপনি সাধারণ একটা একোয়ারিয়ামের মাছ নিয়ে এত জ্যামিতিক আর সামরিক ব্যাখ্যা দিচ্ছেন কেন বলুন তো?”

​“কারণ সামরিক কৌশল হোক কিংবা একোয়ারিয়ামের ভৌগোলিক সীমানা নিয়ম সব জায়গায় এক মিসেস। একটা মাছ যখন একা থাকে, তখন সে কোনো সীমানা মানে না। কিন্তু যখনই তার নিজস্ব সীমানায় জোড়ায় আরেকটা মাছ এসে প্রবেশ করে, তখন বাধ্য হয়েই প্রথমটাকে দ্বিতীয়টার মুখোমুখি হতে হয়। ইচ্ছে থাকলেও সে আর নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না। এখন ওদের দুজনকেই বড্ড কাছাকাছি কাটাতে হবে। একে অপরের গায়ের উত্তাপ আর পানির আন্দোলন সহ্য করতে হবে। চাইলেও কি আর এখন ওই নীল মাছটা দ্বিতীয়টার স্পর্শ এড়িয়ে এক কোণে লুকিয়ে থাকতে পারবে?”
প্রিয়ন্তী ভালো করেই বুঝল লোকটার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলা কথার ইঙ্গিতটুকু। লোকটা যে মোটেই শুধু বেটা ফিশের কথা বলছে না! মাছের নাম করে হুবহু তাদের নিজেদের মধ্যকার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত আকর্ষণ, দূরত্ব আর অবাধ্য কাছাকাছি আসার গল্পটাই কৌশলে সাজিয়ে দিচ্ছে বেশ বুঝতে পারল। অমনি লজ্জায় ওর গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠল। তবুও অবুঝের মতো না বুঝার ভান ধরে বলল,​
“আপনি কি বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা।”
” আমি তো একদম খাঁটি বায়োলজিক্যাল আর একোয়ারিয়ামের বাস্তবতার কথা বলছি মিসেস ! কিন্তু আপনার গলার কাঁপন শুনে মনে হচ্ছে আপনি মনের ভেতরে নিজস্ব কোনো বিশেষ ‘ডাবল মিনিং’ তৈরি করে নিজেই লজ্জা পাচ্ছেন? নাকি আপনি ভাবছেন, দ্বিতীয় মাছটা আসলে শান্ত জলে ঝড় তুলে প্রথম মাছটাকে একবারে নিজের আয়ত্তে এনে চেপে ধরবে?”

​“ছিহ!”
​প্রচন্ড লজ্জায় বিব্রতিতে আরষ্ট হয়ে আওড়াল প্রিয়ন্তী। ওপাশে থাকা তাজধীর একটুও বিচলিত হলো না তাতে। লোকটা পরপর আবারও বলতে লাগল,
​“অহেতুক চিৎকার করে নিজের শক্তি অপচয় করছেন কেন? আমি শুধু সতর্ক করছি। নতুন যে নীল মাছটা পাঠিয়েছি, ওটার স্বভাব কিন্তু বেশ একরোখা আর আধিপত্যপ্রবণ। ও একবার কাউকে নিজের সীমানার ভেতর পেয়ে গেলে সহজে রেহাই দেয় না।পাত্রের আঁকার যত ছোট হবে, ওদের ঘনিষ্ঠতা তত বাড়বে। প্রথম মাছটা যত দূরে যেতে চাইবে, দ্বিতীয়টা ঠিক ততটাই ঘেঁষে ঘেঁষে সাঁতার কাটবে। জলে বাস করে কি আর জলহস্তীর হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়?”

​প্রিয়ন্তীর শ্বাসের গতি দ্বিগুণ হয়ে ছুটছে!ব্যাটা তো চরম লেভেলের অসভ্য! কিসব কথাবার্তার ছিরি দেখ! এই লোকটা নেভিতে না গিয়ে কোনো মানসিক অত্যাচার কেন্দ্র খুললে ভালো করত! কীভাবে স্রেফ কথার প্যাঁচে, কোনো স্পর্শ ছাড়াই কাউকে এভাবে লজ্জায় কাবু করে ফেলা যায়, তা কেবল এই তাজধীর সিদ্দিকের পক্ষেই সম্ভব!
​প্রিয়ন্তী নিজের শক্ত হয়ে ওঠা চিবুক সামলে দাঁতে দাঁত চিপল। ও বুঝতে পারছে এই মাছের ট্র্যাকে আর এক মুহুর্ত থাকলে ব্যাটার কথার জালে নিশ্চই ফাঁসবে। তাই কথার মোড় পাল্টাতে তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,
​”আচ্ছা আপনার ফেভারিট জিনিস কী কী? মানে আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কী?”
​“কী ব্যাপার, মিসেস? হুট করে আপনি আমার ফেভারিট জিনিস নিয়ে এত কৌতূহলী হয়ে উঠলেন যে?”
​প্রিয়ন্তী মুখ কুঁচকে জবাব দিল,

“একটা সাধারণ প্রশ্ন করলাম! দুজন মানুষের মধ্যে তো পছন্দ-অপছন্দ জানাটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। নাকি এতেও আপনার কোনো মিলিটারি সিক্রেসি লঙ্ঘন হয়ে যাচ্ছে?”
​তাজধীর পকেটে হাত পুরে দূর দিগন্তের নীল সাগরের দিকে চোখ রেখে অতি-গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
​“মিলিটারি সিক্রেসি নয় তবে আপনার প্রশ্ন করার সময়টা বড্ড সন্দেহজনক। এই যে একটু আগে আপনি একোয়ারিয়ামের নতুন সঙ্গীর ঘনিষ্ঠতা আর মুখোমুখি হওয়া নিয়ে লজ্জায় ছটফট করছিলেন, সেখান থেকে বাঁচতেই কি হুট করে আমার পার্সোনাল চয়েসের দিকে ট্র্যাক চেঞ্জ করলেন?হু?”
​“আপনি কি একটা কথারও সোজা জবাব দিতে পারেন না?বললে সোজা বলুন। না বললে বলুন যে বলব না! এত অজুহাত আর বিশ্লেষণের কী আছে?”

“উম!পারিতো।তবে আমার সোজা কথার ভার বহন করার ক্ষমতা আছে তো আপনার?”
“অবশ্যই!বলুন আপনি। আমি শুনছি।”
“আমার পছন্দের লিস্টটা কিন্ত একটু বেশিই লম্বা। বলব?”
​প্রিয়ন্তী নিজের কৌতূহল সামলাতে না পেরে নিচু গলায় শুধাল,
“যেমন? কী কী পছন্দ আপনার?”
​তাজধীর এক গভীর নিঃশ্বাস ছাড়ল। কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে আওড়াল,
“উম মাই ফেভারিট সাউন্ড? ইওর লাফটার… এন্ড দ্যাট নরমাল গলার অস্ফুট শব্দগুলো। মাই ফেভারিট কালার? ব্লু… নো, একচুয়ালি ইওর ডিপ ব্ল্যাক আইজ। মাই ফেভারিট প্লেস? ইওর ল্যাপ! মাই ফেভারিট স্মেল? ইওর হেয়ার এন্ড দ্যাট ন্যাচারাল বডি ফ্রেগ্র‍্যান্স অব ইওরস। আর মাই ফেভারিট টাচ? ইওর সফট, ওয়ার্ম লিপস এন্ড দ্যাট অবাধ্য কামড়ে ধরা ঠোঁট দুটো! মাই ফেভারিট ভিউ? দ্যাট ইজ ইওর ব..

ডেসটেনি পর্ব ৩৪

মুখের উপর ঠাস করে কল কেটে দিলো প্রিয়ন্তী।
​শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে অগ্নিকুণ্ড যেন জ্বলে উঠল যেন! গলার কাছে এসে দমটা আটকে রইল বুঝি।
​ফোনটা বিছানার ওপর আছাড় মেরে ফেলে দিয়ে বুকে হাত দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
​“অসভ্য! অসভ্য! একটা আস্ত এক নম্বরের একটা অসভ্য, বেশরম এই লোক!”

ডেসটেনি পর্ব ৩৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here