Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২০

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২০

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২০
রাফিয়া জান্নাত রিফা

সারাদিন হাসি-আনন্দে, হইচই-উল্লাসে কেটে গেল ইতি, বিথী ও নীধির দিনটি।এখন রাত নয়টা। খাওয়া দাওয়া করে তিন বোনই নিজ নিজ ঘরে একই বিছানায় পাশাপাশি বসে আছে, মুখে কোনো কথা নেই, ঘরে নেমে এসেছে এক নীরবতা। মনখারাপের ছায়া তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট।

এই বিষণ্ণতার কারণও বড় সহজ। কিছুক্ষণ আগেই মা, সিদ্দিকী বেগম এসে জানিয়ে গেছেন”কাল সকালেই ঢাকায় ফিরতে হবে। অথচ তারা ভেবেছিল আরও দু’দিন গ্রামে থাকবে এটাই কথা ছিল, মাঠে-ঘাটে ঘুরবে, নদীর পাড়ে বিকেল কাটাবে। ভ্যাবলা ভাইকে তাদের সাথে নিয়ে যাবে ঢাকায় বড় এক হাডুডু ক্লাব ভর্তি করাবে, ন্যাশনলে খেলবে ভ্যাবলা ভাই,তাকে টিভিতে দেখবে সবাই, অনেক ট্রফি জিতবে, বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত হবে। কিন্তু তা কিছুই হলো না,এমন হুট করে নেওয়া সিন্ধান্তে।বাবার কঠোর নির্দেশে তাই, ফেরার সিদ্ধান্ত আর পাল্টানো গেল না।
রাতের খাবার শেষে, ক্লান্ত দেহে ও মনভরা অভিমানে একে একে ঘুমিয়ে পড়ল ইতি, বিথী ও নীধি।ঘরের বাতাসে তখনও ভেসে আছে তাদের না-বলা দুঃখের নীরব সুর। তিনজনেরই ভাবার কেন্দ্রবিন্দু ভ্যাবলা ভাই।

পরের দিন সকালে,,
সকালবেলা রোদ এখনও ভালো করে ওঠেনি, অথচ তিন বোনের মুখ গোমরা। প্রত্যেকের চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি ভেবেছিল বিকেলের দিকে ঢাকা রওনা দেবে, কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য কথা ভেবেছে। হঠাৎই মা, সিদ্দিকী বেগম, ঘর ভরিয়ে ডেকে উঠলেন,,
__ সবাই এখনই রেডি হও! গাড়ি দাঁড় করানো হয়েছে বাগানে।
সেই থেকে তিন বোনের মুখ ভার। কেউ মুখে কিছু না বললেও, তাদের নীরব অভিমান ঘিরে ধরেছে পুরো উঠোন।
রেডি হয়ে বুকে হাত গুঁজে, ঠোঁট ফুলিয়ে তারা দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির সামনে। ভোর ছয়টা থেকেই মাকে কতভাবে অনুরোধ করেছে,,

__মা, আজকের দিনটা থাকি না? কাল সকালে যাই।”
কিন্তু সিদ্দিকী বেগমের সিদ্ধান্ত অটল। দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন,,
__না, তোমাদের বাবা বলে গেছেন,আজই যেতে হবে। তার কথার বাইরে কিছু হবে না।
গত রাতেই নাজিম তালুকদার, নাইম তালুকদার আর নাফিস তালুকদার ঢাকার পথে পা বাড়িয়েছেন।
তাদের পেছন পেছন এখন রওনা দেবে তিন বোনও মুখ ভার, মন ভার, কিন্তু মায়ের কথার সামনে বলবার সাধ্য কারও নেই। ভ্যাবলা ভাইকে জানানোই হলো না যে তাদের ঢাকা ফিরতে হচ্ছে, এজন্য মনটা জঘন্য খারাপ হয়ে আছে।

ঢাকায় যাচ্ছে সুন্দর, সঙ্গে রয়েছে সুহানা ও ।সুন্দরের ঢাকায় যাওয়ার দুটি কারণ এক, পরীক্ষা; দুই, নিঝুম।তবু সে প্রথমে অনেক বলেছিল, যাবে না, কিছুতেই যাবে না,মানে নিজেকে ছ্যাঁচড়া প্রমানিত থেকে রক্ষার্থে কিন্তু মনে মনে তো যাওয়ার জন্যই প্রচেষ্টা চলছে।আলিফা বেগমের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত পেরে উঠল না।তাই আরকি যাচ্ছে? মনের ভেতর অন্য হিসাবও আছে তার নিঝুমের সঙ্গে সম্পর্কটাকে আরও গভীর, আরও আপন করে তোলার বাসনা। সেইসব ভেবেচিন্তেই রওনা দিচ্ছে সে ঢাকার পথে।

অন্যদিকে সুহানার ঢাকায় যাওয়ার তেমন কোনও বিশেষ কারণ নেই।সে যাচ্ছে কেবল বেড়ানোর উদ্দেশ্যে।সঙ্গে কিছু বই ও পত্রিকা নিয়েছে সেখানে গিয়ে পড়বে বলে, ভার্সিটির পরিক্ষা ও দিবে সেখানেই।
তবে যাওয়ার আগেই ছোটখাটো এক ঝগড়া বেধেছিল সুন্দর আর সুহানার মধ্যে।অকারণ নয়, দুই দিন ধরে সুহানার মুখে ব্যবহৃত সব ক্রিম চুপিচুপি নিয়ে নিজের মুখে মেখে ফেলছিল সুন্দর।ব্যস, সেই থেকেই মনোমালিন্য।
সুন্দর দৃঢ়কণ্ঠে নিজেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল “এখন থেকে আমাকে খুবই সুন্দর হতে হবে!” সেই সংকল্পেই একরাতে সুহানার মুখের ক্রিমটি চুপিচুপি চুরি করে এনে মুখে মাখে, যেন সে রাতারাতি রূপের রানী হয়ে উঠবে। দু’দিনেই এমনভাবে ক্রিম ব্যবহার করে যে প্রায় পুরো ক্রিমের বেশিংশেই শেষ হওয়ার পথে।

পরদিন সকালবেলা আয়নার সামনে দাঁড়াতেই সুন্দর থমকে যায় মুখজুড়ে চারটি লালচে পিম্পল! মুহূর্তেই তার মুখের রঙ পাল্টে যায়, রাগে ফুঁসতে থাকে। হাতে ক্রিমটি নিয়ে সে হনহনিয়ে ছুটে যায় সুহানার ঘরে।
ওদিকে সুহানা তো গত রাত থেকেই পাগলের মতো ক্রিম খুঁজছে। সুন্দরকে হাতে ক্রিম দেখে আর রাগে নিজেকে সামলাতে পারলো না দু’জনের মধ্যে শুরু হয় চুল ধরে টানাটানি, আরেকজনের ওপর চড়াও হওয়া। সে যেন এক মহাযুদ্ধ!পুরো বাড়ি তখন তাদের ঝগড়ার গর্জনে মুখর।

সিদ্দিকী বেগমের কঠোর হুমকিতেই দুমকিতে গাড়িতে উঠে বসতে হলো ইতি, বিথী ও নীধিকে। তিনজনেরই ভীষণ কান্না পাচ্ছে। ভ্যাবলা ভাইকে কিছু না বলেই এভাবে চলে যেতে হবে এই চিন্তাটাই যেন মন জুড়ে কষ্টের বিষ ঢেলে দিচ্ছে।
আজ আর আলবান, আর্দ্র কিংবা দির্শকের বাইকে ওঠেনি তিন বোন।বাবার কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এ বিষয়ে। বিদায়ের মুহূর্তে আলবান, আর্দ্র ও দির্শক সবাইকে সালাম জানিয়ে বাইক নিয়ে রওনা হলো ঢাকার উদ্দেশে।
একটি মাইক্রো ও একটি প্রাইভেট কার। মাইক্রোবাসে বসেছেন আছিয়া বেগম, আলিফা বেগম, সিদ্দিকী বেগম, মিলি বেগম, নিলা বেগম, মিশকাত, নিখিল, মুহিন এবং মোজাম্মেল চাচা।
অন্যদিকে প্রাইভেট কারটিতে রয়েছে ইতি, বিথী, নীধি ও নিঝুম। গাড়িটি চালাচ্ছে পিকি, আর তার পাশে বসে আছে সুন্দর। এতগুলো মেয়ে মানুষের সামনে বসে থাকতে গিয়ে সুন্দর যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে,চোখ নামিয়ে রেখেছে লজ্জায়।

সুহানা অবশ্য এই গাড়িতে ওঠেনি। কারণ একটাই সুন্দরের উপস্থিতি। তার ভাষায়,,
“আমি ওই অসুন্দরের পাশে বসব না।”
অতএব, সুহানা নির্দ্বিধায় উঠে বসেছে মাইক্রোবাসে।
অতঃপর সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকার পথে চললো গাড়ি দুটি।গাড়ির জানালার বাইরে দেখছে তিন বোনেই, এঁকে অপরের গায়ে উঠে পড়ে দেখছে জানালার বাইরে, নির্দিষ্ট আলাদা ব্যাক্তি কে তিন জোড়া চক্ষু খুঁজে চলেছে।ছুটে চলা দৃশ্যের ভেতর লুকিয়ে আছে বিদায়ের অজস্র অশ্রুসিক্ত গল্প। অবশেষে দেখল, চিরচেনা সেই বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে ভ্যাবলা,তিন বোনেরই চুক্ষু আরো বেশি অজস্র অশ্রুসিক্ত ভরে উঠলো। ভ্যাবলা ভাইয়ের চোখে মুখে ও অসহায়ত্ব ছেয়ে আছে।সে ও অপলক চোখে তাকিয়ে আছে সাদা গাড়ি খানার দিকে,যখনি দেখলো তাকেও তিন তরঙ্গ উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখছে,ঠিক তখনি ভ্যাবলা ভাইয়ের চোখেও পানি টুইন্বটম্বর হয়ে আসলো।
ইতির হুকুমে গাড়ি থামাল পিকি,তিন বোনই গাড়ি থেকে নামলো, তাদের দেখে ভ্যাবলা ভাই অসহায় ভাবে হেসে মুখ দিয়ে আঃ উই শব্দ করে ইশারা করল,,,

__ এতো তাড়াতাড়ি যাচ্ছো যে।
ইতি ইশারা করে বলে,,,
__ আবার আসবো তোমাকে নিতে,ভালো থেকো, খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করিও।
ভ্যাবলা ভাই মাথা ঝাঁকিয়ে “আচ্ছা” বোঝায়।এবার বিথী ইশারা করে বলে,,,,
__ ওই নুরুলের মায়ের কোন কাজ করে দিবে না কিন্তু,ওরা শুধু তোমাকে দিয়ে বেশি বেশি কাজ করিয়ে খাটায় শুধু।আর পারিশ্রমিক দেয় না।পরে তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে।
ভ্যাবলা ভাই আকাশ পানে তাকিয়ে হো হো করে হাসে,আর মাথা নাড়ায়।
নিধির ফ্যাচ ফ্যাচ করে কান্না করা দেখে ভ্যাবলা ভাই, হাসতে হাসতে মুখ দিয়ে কাইকুই শব্দ বের করে বলে,,

__ তোমার কাঁদলে একদম ওই ল্যাওড়া গাছের লুকিয়ে থাকা পেত্নির মতোন লাগে নিধি।
কান্না করা অবস্থাতেই হেসে দেয় নিধি, এবং সেও ইশারা করে বলে,,,
__ এবার একটু চালাক হও,আর কতদিন বোকা হয়ে থাকবে?
বুঝতে সময় লাগলো ভ্যাবলা ভাইয়ের,আবার হেসে হেসে ইশারায় বলে,,
__ তোমরা যত দিন আছো।
বিথী ভ্যাবলা ভাইয়ের বাহু ধরে ইশারা বলে,,,
__ খুব তাড়াতাড়ি আমরা তোমাকে এই গ্রাম থেকে নিয়ে যাবো?
ভ্যাবলা হাসলো শুধু, ইতি একটা প্যাকেট বের করে ভ্যাবলা ভাইয়ের সামনে দিয়ে ইশারা করে বলে,,,
__ মেলা থেকে তোমার জন্য কিনছি এগুলো, ভাবছিলাম আজ বিকালে দিবো, কিন্তু হঠাৎ করেই ঢাকা ফিরতে হচ্ছে।

ভ্যাবলা ভাই প্যাকেট নিলো, সেখানে এক জোড়া সেন্ডেল ও দুটো গেঞ্জি ও লুঙ্গি পেল। ভ্যাবলা ভাইয়ের চোখ বড় বড় হয়ে গেল “তারা কিভাবে জানলো আমার এগুলো খুবই প্রয়োজন ছিল” এটা আনমনে ভাবতে লাগলো।
পরক্ষণে আবার বিথী একটা প্যাকেট ভ্যাবলা ভাইকে দিয়ে ইশারায় বলল,,
__ এই খাবার গুলো ঘরে রেখে দিবে, রাতে খিদে পেলে খাবে,কেমন?
ভ্যাবলা ভাই মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলল।
এবার নিধি একটা প্যাকেট দিয়ে ইশারা করে বলল,,,
__ মাথায় তো তেল দেও না মনে হয়, এগুলো রাখো,সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ফিটফাট থাকবে।
নিধির দেওয়া প্যাকেটে ছিল,সাবান,তেল,হুয়িল,একটা চিরুনি,শীতে ত্বক ময়েশ্চারাইজ রাখার জন্য লোশন,মেরিল ইত্যাদি।

তিন বোনেই আর সেখানে দাড়ালো না,বেতারক কষ্ট নিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল গাড়ির দিকে। ভ্যাবলা ভাই তাদের যাওয়ার পানে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়েই চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে গেল ভ্যাবলা ভাই।
পিকি, নিঝুম তাদের কথার কোন মানেই বুঝলো না সুন্দর একটু আধটু বুঝলো।এই তিন তরঙ্গদের ব্যাকুলতা, তাদের এক বাক-শ্রবন প্রতিবন্ধী জন্য এত মায়া,তাকে নিয়ে এত ভাবা এসবে পিকির মন তারা নাড়িয়ে তুলেছে। পিকির দৃষ্টি মুগ্ধতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে।পিকি এমনিতেও এই তিন কন্যাকে ভিষণ ভালো লাগে,মন থেকে স্নেহ করে,তবে আজ বোধহয় পিকির ভালোলাগার জায়গাটা আরো বেশি পাকাপোক্ত হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘ জার্নির পর তালুকদার বাড়িতে উপস্থিত হলো সবাই সবাই নিজ নিজ ঘরে চলে গেল ‌।
ক্লান্ত শরীরকে ঘিরে রেখেছে তিন বোনেরই , রুমে এসে জামাকাপড় পাল্টে, ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়লো।

তিন বোনেই এখনও ঘুমে, স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে,তখনি এক বিকট আওয়াজে ঘুম ছুটে গেল তিন বোনরই। তড়িৎ বেগে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠলো।হাত দিয়ে চোখ কচলাতে লাগলো,ঘুম ঘুম চোখে দেখলো তাদের মা জননী রাগি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। ঘুমের রেশ এখনো কাটে নি। সিদ্দিকী বেগম আবার গর্জে বললেন,,,
__ তাড়াতাড়ি উঠ,দির্শক বাবা আজ থেকেই পড়াবে বলছে, কাল তোদের রেজাল্ট দিবে ভুলে গেছিস?
ইতি হাই তুলতে তুলতে বেশ বিরক্ত নিয়ে বলল,,,
__ ভুলেই তো গেছিলাম,মনে করাইলা কেন?
বিথী ঝিমতে ঝিমতে বলে,,,
__ মা আজ না পড়লে কি এমন হবে? দুপুরের ঘুমটা দিলে তো উড়িয়ে।
সিদ্দিকী বেগম বলে,,

__ সেই দুইটার দিক ঘুমাইছিস, দিনের বেলা এতো ঘুমলে রাতে তো ঘুমতেই পাবি না।বেশি কথা না বলে তাড়াতাড়ি উঠে হাত মুখ ধুয়ে নে,দির্শক আসছে।
এই বলে চলে যান সিদ্দিকী বেগম।
বিথী লম্বা একটা হাই তুলতে তুলতে বলে,,,
__ এই দুষ্শমন স্যারের খেয়ে দেয়ে কি আর কোন কাজ কাম নাই। বালের স্যার।
নিধি তো বসে বসেই ঘুমোচ্ছে তা দেখে ইতি নিধির মাথায় দিলো এক টালা।গেল ছুটে নিধির ঘুম।
এক এক করে তিন বোনই ফ্রেশ হয়ে পড়ার টেবিলে বসলো,সে মুহূর্তেই হুড়মুড়িয়ে সুহানা তাদের ঘরে প্রবেশ করলো।বই পএ নিয়ে, বিথী একটা ভ্রু উপরে তুলে বলে,,,

__ তুই কেন আসলি?
সুহানা চেয়ার টেনে বসে বলল,,
__ আমি ও তোদের সাথে পড়বো।
ইতি বলে,,,
__ তুই তো এমনিতেই ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, তোর আবার পড়াও লাগে। যাইহোক,পড়তে যখন এসেছিস তো পড়।
দির্শক আসলো, ইতি, নীধি, বিথী ,সুহানা দাঁড়িয়ে সালাম দিলো।দির্শক বিথীর পাশে রাখা চেয়ারে বসলো,দির্শক বিথী দিকে একবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তারপর দির্শক সবার দিকে তাকিয়ে বলল,,,
__ কাল তো রেজাল্ট তোমাদের,তো কার কেমন অনুভূতি।
বিথী বলে,,,

__ আমি তো গর্ভবতী অনুভব করছি?
ইতি বিথীর বাহুতে থাপ্পড় মেরে হাসতে হাসতে বলে,,,
__ ওহহ ওই জন্য আমার বমি বমি অনুভব হচ্ছে?
বেশ মজা করে নিধি ও বলল,,,
__ ওরে,আমার ওইজন্য কাল থেকে মাথাটা ঘুরছে।
বলে তিনজনই তিনজনের গায়ে ঢলাঢলি করে হাসতে লাগলো। পরক্ষণেই দির্শকের রাগি মুখ খানা দেখে তিন বোনেই হাঁসি বন্ধ করে দিল। এবার সুহানা বলল,,,

__ ইনশাআল্লাহ আমার A+ আসবে।
বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই সুহানার কথায় দির্শক মৃদু হাসল। তারপর মনোযোগ ফেরাল পড়াশোনায়। সুহানা বসে আছে দির্শকের বাম পাশে দির্শক একে একে প্রশ্ন করছে, আর সুহানা ঝটপট উত্তর দিয়ে দিচ্ছে,ইতি, বিথী,নিধি কে বলার কোন ফাঁকফোকর এ দিচ্ছে না। এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যেন আর সামান্য হলেই দির্শকের গায়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ে সুহানা।
ওই দেখে বিথী পড়েছে আরেক বিপাকে। সুহানার অতিরিক্ত কথা আর বাড়তি উৎসাহ তার একেবারেই সহ্য হচ্ছে না। মনে মনে বিরক্তি জমে উঠছে, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারছে না শুধু চুপচাপ তাকিয়ে আছে তাদের দিকে, চোখেমুখে স্পষ্ট অস্বস্তি।

সন্ধ্যা,,
ঘরে বসে নিধি, বিথী আর সুহানা গল্পে মশগুল,হাসিঠাট্টার শেষ নেই। এদিকে ইতি অনেক দিন পর ছাদে উঠেছে। ছাদে পা রাখতেই নাকে ভেসে এলো ধোঁয়ার তীব্র গন্ধ। বিথী হঠাৎই মুখ কুঁচকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
ছাদের এক কোণে, রেলিংয়ে এক হাত ভর দিয়ে আকাশের দিকে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিচ্ছে আলবান। ইতি পেছন দিক থেকেই চিনে ফেলল,এ তারই দাবানল ভাই। নাকটা ওড়নায় চেপে ধরে হালকা বিরক্ত স্বরে বলল,
__ দাবানল ভাই, আপনার জন্য কোথাও গিয়ে শান্তি নেই?
আলবান পিছনে ফিরে ইতির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,,,

__ সন্ধ্যা বেলায় এখানে কি করছিস?
__ কথা সেটা নয়,কথা হলো আপনি সিগারেট খাচ্ছেন।
আলবান সিগারেটে আবার একটা টান মেরে বলল,,,
__ সো হোয়াট?
__ এই গন্ধটা অসহ্য লাগছে আমার ‌?
আলবান এবার বেশ বিরক্ত নিয়ে বললো,,
__ ইতি যাতো এখান থেকে মাথাটা খারাপ করিস না।ভালো লাগছেনা।
ইতি ঠোঁট উল্টে বলে,,,
__ আমি আবার কি করলাম?

আলবান কিছু বলতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে তার দৃষ্টি আটকে গেল ইতির মুখে। অজান্তেই কুঁচকে যাওয়া ভ্রু দুটো গুটিয়ে এলো। ইতি মাথায় ঘোমটা টানা, কানের পাশ ঘেঁষে চুলগুলো গলা বেয়ে নেমে এসেছে। ইতি বারবার হাত বাড়িয়ে নিজের মাথার ঘোমটাটা ঠিক করে নিচ্ছে।
আলবানের চোখ হঠাৎই স্থির হয়ে গেল। এমন শীতল, গভীর চাহনিতে ইতি থমকে গেল হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল তার। কী এমন হলো, বুঝে উঠতে পারল না সে।
কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল আলবান। তার চোখে এক অজানা ঘোর যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে। ইতি বুঝতে পারছে না, কীসের এমন পরিবর্তন তার চোখে। কিন্তু আলবানের নিজের কাছেও বিষয়টা অপ্রত্যাশিত ইতিকে এভাবে দেখবে, তা সে ভাবেনি। তবু, অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছেয়ে গেল তার মনে। শুধু মনে হলো এই মুখটা, একবার নয় বারবার দেখতেই হবে, অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছে। পরমুহূর্তেই আলবান বলে উঠলো,,,

__ হঠাৎ করেই তোকে বউ বউ লাগছে ইতি?
ইতির চোখ জোরা বড় বড় হয়ে গেল, আচমকা এমন কথায় ইতি হকচকিয়ে গেল,আলবানে দৃষ্টিতে নিজের দৃষ্টিকে অটল রাখতে পেল না। দৃষ্টি অন্য দিকে নত রাখলো, বুকের দ্রিমদ্রিম শব্দটা নিয়েই বলল,,,
__ ক কি বলছেন দাবালন ভাই? আমি তো বিবাহিত না,আর না বউ সেজেছি,আজাতা বউ বউ লাগতে যাবে কেন?
আলবানের ঘোর লাগা দৃষ্টি ইতির মুখে আবদ্ধ রেখেই বলে,,,
__ তুই বিবাহিত ইতি, অন্তত এটাকে অস্বীকার করিস না, যথেষ্ট বড় হয়েছিস বুঝতেও শিখেছিস?
ইতি আলবানের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বলে,,,
__ কোন বিয়ের কথা বলছেন দাবানল ভাই?আ আমার কোন বিয়ে টিয়ে হয় নি?
__ ইতি আমি একটা ছেলে হয়ে সেই অপ্রত্যাশিত হয়ে যাওয়া বিয়ের পবিত্র বন্ধনেই আবব্দ হয়ে আছি, সেটাকে মন প্রাণ থেকে মানি ও গ্রহন করেছি তোকে ব…
পরের শব্দটা আর উচ্চারণ করতে পারলো না আলবান,কেমন অস্তিত্ব কাজ করলো শুকনো একটা ঢোক গিলে আলবান,গম্ভীর কন্ঠে বলল,,,

__ ইতি এখান থেকে চলে যা আমার তোকে সহ্যা হচ্ছে না।
ইতি আর কিছু না বলে সেও রাগ দেখিয়ে চলে যেতে ধরে,তখনি ওড়নায় টান পড়ে, আলগোছে পিছনে তাকিয়ে দেখে আলবান তার ওড়না হাতে ধরে আছে,ইতি ভ্রু কুঁচকে বলে,,,
__ সমস্যা কি, অপমান করে আবার ওড়না টানছেন কেন?
আলবান নির্বিকার ভঙ্গিতে উওর দেয়,,,
__ বৈধ হয়েও হাত না ধরে ওড়না ধরছি,এটাই অনেক নয় কি?
__ এখন কেন ধরেছেন সেটা বলুন?
__ এদিকে আয় বলছি?
__ না আপনি মারবেন?
__ মারবো না এদিকে আয়?
__ কেন যাবো?
__ আরে বাবা আয় না,এত কথা বলিস কেন?
__ না যাবো না,আপনি আমাকে অপমান করেছেন?
__ কাছে না আসলে আরো বড় অপমান করবো?
__ আগে বলুন কেন যাবো?
__ একটা কাজ আছে?
__ তবে ওখান থেকে বলুন?

আলবান বুঝলো এর সাথে কথায় কোন ভাবেই পেরে উঠবে না তাই সে ইতির ওড়না ধরেই টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসলো ,ইতি হুমড়ি খেয়ে পড়লো আলবানের বক্ষপিঞ্জরে,তা বুঝতে পেরে আবার সোজাসুজি হয়ে দাড়ালো ইতি। কেমন যেন ভয় কাজ করছে ইতির মধ্য,মুখ দিয়ে টু শব্দটি ও আওড়ালোর সাহস পেলো না, মাথাটা নিচু করে নিলো ইতি। আলবানের হাত গেলো ইতির কপালে, কপালে থাকা টিপটাকে তুলে ফেলে দিলো,আলবানের শ্বাস ইতি মুখে এসে পড়ছে,এতে ইতির সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠছে বারংবার, শিহরিত হচ্ছে অগনিত, হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল তীব্রমাএায়।টিপ খানা ফেলে দিয়েই ইতির থেকে দুরুত্ব বজায় রেখে আলবান বলে,,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৯

__ আর টিপ পড়বি না ইতি,তোর কপালে টিপ পড়াতে আমি এক অন্যরকম ঘোরের মধ্যে ডুবে যাই,মন তখন অন্যকিছুতে মত্ত হতে চায়, তীব্রমাএায় ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে,এটা তোর জন্য ঘোর বিপজ্জনক হবে?
আমি জানি,এটায় আমার কোন ভুল হবে না বরং এটা আমারই বৈধতা, কিন্তু তাও এমন কিছু চাই না।টিপ আর কখনো পড়বিনা ইতি,পাড়লে মাথায় এমন ঘোমটা দেওয়ার ও দরকার নেই।
যা এখন ঘরে যা, তাড়াতাড়ি যা।
ইতি মাথা নিচু করেই এক প্রকার দৌড়ে চলতে লাগলো নিজের ঘরের দিকে।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২১