তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৭
জান্নাতি আক্তার জারা
তাকবীর বিছানায় বসে আরাতের দিকে চেয়ে নিজের রাগ শান্ত করতে ব্যস্ত, আরাত মেঝেতে বসে কিছুক্ষণ পরপর হেঁচকি তুলছে আর তাকবীরের হাতের ক্ষত স্থান ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে, আরাত ব্যান্ডেজ করে দিতে দিতে তাকবীরের দিকে চেয়ে তাকবীর কে নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে হেঁচকি তুলে বলে উঠলো,
___” আপনার একটুও ব্যাথা হচ্ছে না ?
তাকবীরের সেই চিরচেনা গম্ভীর গলা,
___” না।
ব্যান্ডেজের দিকে চেয়ে আরাত হেঁচকি তুলে পুনরায় বলে উঠলো,
___” এভাবে বাবা-র উপর রেগে কথা বলা আপনার ঠিক হয়নি।
আরাতের কথায় তাকবীর গা ছাড়া ভাব নিয়ে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো,
___” উনার ঠিক হয়নি আমার বউয়ের উপর এভাবে ধমক দিয়ে কথা বলা।
তাকবীর কে নিজের মতো করে উওর করতে দেখে আরাত পুনরায় একি ভঙ্গিমায় বলে উঠলো,
___” আপনি নিজেকে কেনো ব্যাথা দিলেন?
আরাতের প্রশ্নে তাকবীর আরাতের দিকে চেয়ে একটা গম্ভীর নিঃশ্বাস ফেললো,কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক আরাতের মুখ পর্যবেক্ষণ করে ব্যান্ডেজ হাতে আরাতের মুখে হাত রাখলো, আরাত নীরব চোখে তাকবীর কে দেখছে, তাকবীর আরাতের মুখের উপরে এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে আরাতের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে আরাতের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে নীরব কন্ঠে বলে উঠলো,
___” আমার সামনে বা আড়ালে আমার বউকে কেউ বাজে কথা কেনো উচ্চ স্বরে কথা বললে আমি মেনে নিবো না, মানুষ টা যে কেউ হোক, আমার বউ দুষ্টুমি করবে আমি সহ্য করে নিবো, আমার বউ ভুল করবে আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে বলবো, আমার বউ অপরাধ করবে আমি তাঁকে শাসন করবো, মানিয়ে নেওয়ার হলে আমি মানিয়ে নিবো, বোঝানোর হইলে আমি আমার সবকিছু দিয়ে বুঝিয়ে বলবো,আমার বউয়ের উপর শুধুই আমার অধিকার, সবসময় একটা কথা মাথায় রাখবে,এখন তুমি আমার বউ, আমার বউ তুমি, এই আজান তালুকদার তাকবীরের অর্ধাঙ্গিনী।
আরাতের চোখে পানি, ঠোঁটের কোণে সুখময় হাসি, মাথা ঝাকিয়ে হুম বুঝিয়ে তাকবীরের হাতে ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ এর উপর এলোপাথাড়ি ঠোঁট ছুঁয়ে দিতে লাগলো, তাকবীর অপলক দেখছে তাঁর পাগল বউয়ের পাগলামি, আরাত ক্ষতস্থানে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে তাকবীর কে দু’হাতে জরিয়ে ধরলো, তাকবীর আরাতের পাগলামি দেখতে দেখতে একপর্যায়ে মুচকি হেঁসে আরাত কে নিজের বুকের মধ্যে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে নিলো, দুজনের মুখে কেনো কথা নেই, চুপচাপ নীরবতায় যেন সুখ খুঁজতে লাগলো দুজন, আরাত শান্ত মেয়ের মতো তাকবীরের বুকে মাথা ঠেকিয়ে আছে, তাকবীর ব্যান্ডেজ হাতেই আরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, এভাবে কেটে গেলো কয়েক মিনিট,তাকবীর এবার নীরবতা ভেঙ্গে আরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
___” বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা হৃদয় থেকে হয় জোর করে না, আর জীবনে খারাপ সময় আসা দরকার, খারাপ সময় বুঝতে পাওয়া যায়, কে হাত ধরে রাখে আর কে ছেড়ে দেয়, কে পাশে থাকে আর কে হারিয়ে যায়, আমাদের মন অনেক কিছুই মানতে নারাজ বাট মেনে নিতে হয়, কেনো না কোনো কিছু পার্মানেন্ট হয় না, সবকিছু বদলে যায়, এই জীবনের চাওয়া পাওয়া সময় মানুষ জায়গা এবং কী আমরা নিজেরাও, তাই কেনোকিছু নিয়ে যেমন আফসোস করতে নেই, তেমনিভাবে কারো উপর বেশি প্রত্যাশা রাখতে নেই, কারো উপর প্রত্যাশা না রেখে মোনাজাতে নিজের মর্জি তুলে ধরবে, তুমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে, তোমার নসিব তোমার দোয়াও চেয়েও বেটার হয়েছে।
আরাত একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে তাকবীরের বুক থেকে মাথা তুলে মলিন হেঁসে তাকবীর কে দেখতে দেখতে ধীর কন্ঠে বলল,
___” আমি ভুল করেছি, আমার সুখ ভালোবাসা ঘরে ফেলে, ভুল মানুষের পিছনে আমার সুখ খুঁজতে ব্যস্ত ছিলাম,আমার ভুলের শাস্তি স্বরূপ আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় একজন কে হারিয়ে ফেললাম,বুঝলাম আমি তাঁর শুধুই কাছের ছিলাম,মনে আর ছিলাম কই!
তাকবীর আরাত কে নিষ্পলক দেখছে,চঞ্চল হাসিখুশি মেয়েটার মধ্যে নেই কেনো চঞ্চলতা, মুখে লেগে আছে ব্যর্থতা, প্রিয় কিছু হারিয়ে ফেলার চাহনি, যা কেউ দেখলে বলে দিতে পারবে, মেয়েটা ভিতর থেকে ভেঙ্গে পড়েছে, নতুন করে গড়ে উঠতে হয়তো সময় লাগবে, ছোট থেকে বেড়ে উঠা দুই দেহ এক প্রায় হটাৎই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়া কী সহজে নতুন করে গড়ে উঠতে পারে,তাকবীর থাকতে অসম্ভব কিছু না, তাকবীর তাঁর বউকে ভেঙ্গে পড়তে দিবে না, তাকবীর খুব মনোযোগ সহকারে আরাতের কথা গুলো শুনছে, আরাত ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় মলিন হেঁসে পুনরায় বলে উঠলো,
___” আপনি ভাববেন না আমার কষ্ট হচ্ছে, অনেক কিছুই না পেয়ে আফসোস করছি অথচ পরে দেখছি সেটা না পাওয়াটাই আমার জন্য উওম ছিলো, হয়তো রশ্মি কে হারিয়ে ফেলার মধ্যে আমার জীবনে উওম কিছু অপেক্ষা করছে।
আরাতের কথায় তাকবীরের মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো, দু’হাতে আরাতের গাল ধরে নাকে নাক ঘষতে ঘষতে আদুরে গলায় বলে উঠলো,
___” এই তো লক্ষ্মী বউ আমার।
তাকবীরের আদুরে গলায় আরাত মলিন মুখে ফিক করে হেঁসে উঠলো, তাকবীর আরাতের মন কিছুটা ঠিক হতে দেখে পুনরায় বুঝানোর ন্যায় বলে উঠলো,
___” আমাদের লাইফে ক্ষণিকের জন্য ভুল মানুষ আসেই সঠিক মানুষের আগমন ঘটাতে, ভুল মানুষটা না এলে সঠিক মানুষের কদর বুঝতাম না, অতএব যে তোমাকে ভালোবাসা শিকায় সেই ভালোলাগার পুরুষ সঠিক পুরুষ তো সঠিক সময়ে আসে।
আরাত তাকবীরের ন্যায় বলে উঠলো,
___” আর আমার লাইফে সঠিক মানুষটা আপনি, আমাকে আপনার ভালোবাসার মায়া জালে বেঁধে ফেলছেন আপনি, আপনাকে ছাড়া এই মায়াজাল কাটাতে পারবো না আমি।
___” মায়া কাটাতে না জরিয়ে নিতে শিখো।
তাকবীরের কথায় আরাত তাকবীর কে পুনরায় জরিয়ে ধরল, তাকবীরের বুকে মাথা ঠেকিয়ে শান্তিতে চোখ বুঝে নিয়ে নরম সুরে বলে উঠলো,
___” রশ্মি আমার জীবনে এক টুকরো ভালোবাসা ছিলো, আর পুরো আমিময় জুড়ে আপনি আছেন, ইনশাআল্লাহ ইহকাল পরকাল আমার অস্তিত্ব জুড়ে আপনি থেকে যাবেন।
তাকবীর আরাতের মতো দু’হাতে আরাত কে জরিয়ে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ঝুলে চোখ বুঝে ছোট করে বলল,
___” ইনশাআল্লাহ।
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা লেগে গেছে, আরশ মিমের পিছনে পিছনে তালুকদার বাড়ি অবধি এসেছিল, জানা নেই কেনো মিমের পিছু নিয়েছিল,মিম তালুকদার বাড়িতে ঢুকে যাওয়ার পর আরশ পুনরায় কলেজে ফিরে আসে, কলেজ ছুটির পড়ে কলেজে বেশ কয়েক ঘন্টা সময় কাঁটিয়ে বাড়ি ফিরছে মাএ, আরশ রাফি কলেজে থেকেও মাহির রশ্মির বিয়ের কথা তাড়া দুজন জানে না, আরশ বাইক পার্ক করে মুখে শিস বাজিয়ে বাইকের চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে বড়বড় পা ফেলে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো, বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ দেখে আরশের কপাল কুঁচকে এলো, ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে কপাল কুঁচকে পুরো বাড়ি পর্যবেক্ষণ করার মধ্যে দেখলো, আরশের মা-বাবা সোফাতে ঝিম ধরে বসে আছে, হানিফ তাঁদের পাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে, আরশের মা-বাবার সামনে সোফাতে রুপা আর তাসিন বসা, তাসিন কে এই বাড়িতে দেখে আরশের কপাল আরো কুঁচকে এলো, শিস বাজানোর আওয়াজে আরশের বাবা-মা আরশের দিকে মুখ তুলে চাইলো, আরশ তাসিন কে দেখে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
___” তুই এই বাড়িতে কী করছিস ?
তাসিন বাঁকা হেঁসে বলে উঠলো,
___” যা আমার করার কথা ছিলো!
তাসিনের কথায় আরশ গম্ভীর মুখে,
___” হোয়াট ?
___” ঠাসসসস।
আরশের মুখ থেকে কথা বের হওয়ার আগে আরশের গালে থাপ্পড় পরলো, তাসিন আগের ন্যায় বাঁকা হেঁসে দেখছে, হানিফ চমকে উঠলো ছোট ভাইয়ের গালে নিজের বাবা কে থাপ্পড় দিতে দেখে, আরশের মা আগের ন্যায় ঝিম ধরে বসে আছে, আরশের গালে থাপ্পড় পরার সঙ্গে সঙ্গে আরশের গাল মেঝের দিকে ঝুঁকে গেলো, চোখ বন্ধ, হানিফ নিজের বাবার কাছে এসে আটকাতে লাগলেন, আরশ চোখ মেলে নিজের বাবার দিকে তাকালো, তানিস কে দেখেই যা বুঝার বুঝতে পেয়েছে, তানিস মিম আর আশরের বিয়ের সবকিছু বলে দিয়েছে, আরশের বাবা আরশ কে থাপ্পড় দিয়ে বলতে লাগলো,
___” তোমার মতো নির্লজ্জ ছেলে আমি আমার লাইফে দুটো দেখিনি, তোমার লজ্জা করলো না, বড় ভাইয়ের হবু বউ কে বিয়ে করতে, মেয়েটা কে সাদাসিধা ভেবেছিলাম কিন্তু মেয়েটা যে এমন বের হবে কল্পনার বাহিরে ছিলো।
আরশ বাবার মুখে মিমের নামে এমন কথা শুনে শক্ত হয়ে হাতে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জায়গায় দাঁড়িয়ে মেঝের দিকে চেয়ে বলে উঠলো,
___” মিমের নামে উল্টোপাল্টা কথা বলবেন না, মিম খুব ভালো মেয়ে।
আরশের কথায় আরশের মা-বাবা ছেলের দিকে তাকালো, তাসিন অবাক হয়ে বলে উঠলো,
___” বা বা বা বা, আজকে দেখি মিমের প্রতি তো দরদ উঠলে পড়ছে, আঙ্কেলের মুখের উপর কথা বলছিস ?
তাসিনের কথায় উপস্থিত সবার মুখে বিরক্ত প্রকাশ পেলো, হানিফ রাগী গলায় বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
___” আমাদের ফ্যামিলির মধ্যে তুমি নাক গলাবে না, মিমের প্রতি আরশের দরদ থাকবে এটা সিম্পল বিষয়, বিকজ মিম আরশের ওয়াইফ, আর তুমি যে নোংরামি করছো তাঁর ফল ইনশাআল্লাহ তুমি পাবে ওয়েইট এন্ড ওয়াচ।
হানিফের কথায় তাসিনের মন গম্ভীর হয়ে এলো, গম্ভীর গলায় হানিফ কে বলে উঠলো,
___” তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারো না, আমি কার জন্য এসব করছি, শুধু মাএ তোমাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য, আর তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছো?
হানিফ বিরক্ত মুখে তাসিনের সামনে এসে দাঁড়ালো, তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___” আমার জন্য তোমাকে নোংরামি করতে বলি নাই, আমি জাস্ট তোমাকে চেঞ্জ হতে বলছিলাম, তোমার ড্রেস আপ চেঞ্জ করতে বলছিলাম, আর তুমি আমার এতটুকু আস্কারা পেয়ে নিজের মন মতো যা ইচ্ছা করছো ?
তাসিন হানিফের হাত ধরে বলতে লাগলো,
___” দেখো আমি কী করেছি সত্যি টা জাস্ট সবার সামনে বলে দিয়েছি, এছাড়া আমার হাতে কিছু করার ছিলো না, ওই মিম মেয়েটার সঙ্গে আমি তোমাকে মেনে নিতে পারছিলাম না, তুমি তো জানো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি, তোমাকে ভালোবাসি বলেই আমি সুযোগ বুঝে মিমের সঙ্গে আরশের বিয়ে দিয়ে দিছি, আরশ মিম কে বিয়ে করতো না আমি ওকে বাধ্য করেছি মিম কে বিয়ে করতে, যেন আমাদের মধ্যে মিম আসতে না পারে, আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই তো এ-সব করেছি বলো, আমাদের মধ্যে মিম নেই চলো আমরা আজকেই বিয়ে করে ফেলি।
তাসিনের এতএত কথা হানিফের মন গলাতে পারলো না, তাসিনের হাত নিজের হাত থেকে এক ঝটকায় বের করে দিয়ে হানিফ একনজর নিজের বাবা-মা ছোট ভাইয়ের দিকে চেয়ে পুনরায় তাসিন কে বলতে লাগলো,
___” তুমি যদি আমাকে ভালোবাসতে, তাহলে নিজেকে চেঞ্জ করতে, সাধারণ মেয়েদের মতো চলাফেরা করতে, তোমার পাগলামিতে তোমার প্রতি একটা সফট কনার তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তোমার এই নোংরামিতে তোমার প্রতি ঘেন্না ছাড়া কিছুই আসে না আজকাল।
তাসিন হুট করে হানিফ কে সবার সঙ্গে জরিয়ে ধরে বলতে লাগলো,
___” না, তুমি এভাবে বলতে পারো না, তুমি শুধু আমাকেই ভালোবাসো, আমি তোমার ঘেন্না সহ্য করতে পারবো না, আমি তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি হানিফ, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না, আমার তোমাকেই চাই।
হানিফ হাতে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
___” আমাকে ছাড়ো তাসিন!
___” না আমি তোমাকে ছাড়বো না, আগে বলো তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমাকে বিয়ে করবে ?
হানিফ তাসিন কে ধাক্কা দিতে যাবে তাঁর আগেই, আরশের মা সোফা থেকে উঠে এসে হানিফের কাছে থেকে এক ঝটকায় তাসিন কে ছাড়িয়ে তাসিনের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো,
___” ঠাসসসস।
সবাই চমকে তাকালো, তাসিন চোখে পানি নিয়ে গালে হাত দিয়ে হানিফের দিকে তাকালো, হানিফ নিজের মা’কে কিছুই বলল না চুপচাপ দেখছে, আরশের মা তাসিন কে থাপ্পাড় দিয়ে বলতে লাগলো,
___” কী মনে করছো, মিম কে আমাদের সামনে খারাপ প্রমাণ করবে আর আমরা তোমাকে মেনে নিবো, অনেক হয়েছে তোমার নোংরামি বের হও বাড়ি থেকে।
আরশের মা তাসিনের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের করতে চাইলো, তাসিন আরশের মায়ের পা ধরে বলতে লাগলো,
___” আন্টি আমি হানিফ কে খুব ভালোবাসি আন্টি, হানিফ কে ছাড়া আমার আর কিছুই চাইনা, প্লিজ আন্টি মেনে নিন না আমাকে, আমি ওকে ছাড়া ভালো থাবো না আন্টি প্লিজ আন্টি….
সবাই শুধু দেখছে তাসিন কে, কারো মনে তাসিনের জন্য একটু মায়া হলো না, হবে কী করে, তাসিনের এই পাগলামি দেখতে দেখতে সবাই বিরক্ত, প্রায় তিন বছরের বেশি হবে তাসিনের এই পাগলামো গুলো সহ্য করে আসতেছে, তাসিনের সঙ্গে আরশের ফ্রেন্ডশিপ টা ভিন্ন ছিলো, তানিস প্রথম থেকেই প্যান্ট শার্ট পড়ে অভ্যস্ত, ছেলেদের মতো তাঁর চলেফিরা চালচলন, আরশের সঙ্গে মাঝেমধ্যে আরশ দের বাড়িতে আসতো, শুধু আরশ দের বাড়িতে না রাফি মাহির দের বাড়িতে যেত, কিন্তু আরশের বাড়িতে বেশি আসার কারণ ছিলো হানিফ, হানিফ কে প্রথম দেখায় ভালো লেগে যায়, হানিফের নীরবতা মা-বাবার বাধ্য ছেলে, সবসময় চুপচাপ স্বাভাব সবকিছু তাসিনের ভালো লেগে যায়, আরশের মা প্রথম থেকে তাসিন কে পছন্দ করতেন না, কারণ একটাই ছেলেদের মতো চলাফেরা চালচলন পোষাক, উনার কথা মেয়েরা সবসময় শান্তশিষ্ট ভদ্র পোষাকে নমনীয় থাকবে, আরশ কে মাঝেমধ্যে বকাঝকা করতেন তাসিনের সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করার জন্য, আরশ কর্ণপাত করতো না মায়ের কথা, তাসিন আরশ দের বাড়িতে এসে হানিফের সামনে এসে এটাওটা করে নিজের অনুভূতি বুঝাতে শুরু করে, কিন্তু হানিফ নিজের মায়ের মতো তাসিন কে পছন্দ করতো না, হানিফ তাসিন কে পছন্দ করে না জানার পড়ে তাসিনের পাগলামো শুরু হয়ে গেলো, হুটহাট হানিফ কে রাস্তা ঘাটে বিরক্ত করতে লাগলো, এতে আরশ থেকে শুরু করে আরশের বাবা-মা হানিফ সবাই বিরক্ত সঙ্গে অধিষ্ঠিত হতে লাগে, শেষ পর্যন্ত আরশ নিজে তাসিনের বাবা-মা কে বলে সবকিছু, কিন্তু তাঁদের কথা তাসিন যা চাইবে তাই করবে, বাবামায়ের কথা শুনে তাসিন আরো বেশি আস্কারা পেয়ে যায়, শেষমেশ আরশের মা তাসিন কে অপমান করে, আরশ দের বাড়িতে আসতে বারণ করে দেয়, উনার কথা তাসিন কে কখনো নিজের ঘরে তুলবে না, দিনদিনে তাসিনের পাগলামো তে হানিফ দুর্বল হয়ে যায়, তাসিন কে বলে দেয় তুমি নিজেকে চেঞ্জ করো, তোমার চলাফেরা লাইফ স্টাইল সবকিছু চেঞ্জ করতে পারলে আমি তোমাকে ভালোবাসবো, এতে তাসিন ধরে নেয় হানিফ তাঁকে ভালোবাসে, হানিফ তাঁর হয়ে গেছে,
হানিফ কে তাসিনের প্রতি দুর্বল হতে দেখে আরশের বাবা-মা বড় ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে শুরু করে, শহরে মেয়ে উনার পছন্দ না, ভদ্র মহিলার পছন্দ মেয়ে ধার্মিক সাধারণত সঙ্গে নম্রভদ্র, আর দূরে গ্রামে বিয়ে করাবে যেন তাসিন কেনো ভেজাল করতে না পারে, মিমের ছবি দেখে উনাদের পছন্দ হয়ে যায়, এজন্য হানিফ কে সঙ্গে নিয়ে একদম মিম কে দেখতে চলে যায়, হানিফ যেতে চাইছিলো না মেয়ে দেখতে, তাসিন কে ভালো লাগতোনা শুরু করেছিলো, তারপর তাসিন কে কথা দিয়েছিল, তাসিন নিজেকে চেঞ্জ করতে পারলে হানিফ তাসিন কে ভালোবাসবে, এদিকে মা-বাবার মুখের উপর না করতে পারছিলো না,বাধ্য ছেলে মতো মা-বাবার সঙ্গে মেয়ে দেখতে চলো গেলো গ্রামে, কিন্তু বিয়ে ভাঙ্গার সব দায়িত্ব ছোট ভাই কে দিলো,
গ্রামে এসে মিম কে দেখে কেনো ফিলিংস কাজ করে নি, দুজন কে যখন আলেদা কথা বলার জন্য ছাঁদে পাঠানো হলো, মিমের চুপচাপ নিরবতা আর মিমের ভনিতা ছাড়া বিয়ে করবে না বলা কথাতে হানিফ অবাক হলো, মুখের উপর এভাবে রিজেক্ট করে দেওয়াতে মিমের বিষয়ে জানতে ইচ্ছা হলো, তাইতো মিম কেনো বিয়ে করবে না, বা কেমন ছেলে পছন্দ, সবকিছু জানতে চাইলো মিমের কাছে, বাড়িতে ফিরে আরশ কে বলে দেয় তুমি মা-বাবা কে ম্যানেজ কর আমি এই মেয়ে কে বিয়ে করবো না, তাসিনের প্রতি নিজের অনুভূতি, সবকিছু আরশ কে বলে এবং বিয়ে ক্যানসেল হয় তাঁর জন্য বাবা-মা কে রাজি করাতে, কিন্তু কয়েকদিন পড়ে যখন বাবামায়ের চাপে হানিফ মিমের সঙ্গে দেখা করতে যায়, তখন থেকে আরশ কে লক্ষ করে,হানিফ কে মিমের পাশে আরশ সহ্য করতে পারে না,
রেস্টুরেন্টে মিম সবকিছু খুলে বলে, আরশের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছে, আর আরশ মিমের সঙ্গে কী কী করেছে, সবকিছু শোনার পর থেকে নিজের ভাইয়ের প্রতি রাগ হয়, হানিফ যদি রাগী ভাইদের মতো হতো তাহলে হয়তো আরশ কে পিটাইতে পিটাইতে ঠিক করে দিতো, একটা মেয়ের সঙ্গে এতটা জঘন্য নিকৃষ্ট কাজ করার জন্য, কিন্তু করতে পারেনি এতি ভদ্র ছেলের কারণে, আরশের চোখে নিজেকে ঘিরে জেলাসি দেখে হানিফ মিমের সঙ্গে কথা বলে, আরশ কে দেখিয়ে দেখিয়ে কথা বলে এবং বুঝায় মিম কে তাঁর পছন্দ হয়েছে, মিম কে সে বিয়ে করবে, এতে আরশ আরো জেলাসি ফিল করে, এদিকে নিজের ভাইয়ের পাশাপাশি তাসিনের প্রতি যতটুকু দুর্বলতা ছিলো তা এক নিমেষেই ঘিন্নাতে পরিনতি হয়ে যায়, তাসিন হানিফের জন্য নিজেকে চেঞ্জ না করে আরো আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে আরশ কে হেল্প করছে, কথাগুলো ভাবলেই শরীরের রক্ত টকবক করে রাগে, কিন্তু একটাই সমস্যা অতি ভদ্র ছেলে,
আজকে তাসিন আরশের বাড়িতে এসে মিম আরশের বিয়ে কথা বলে দেয়, সঙ্গে মিম কে নষ্ট মেয়ের উপাধি দেয়, যেন আরশের বাবা-মা মিম কে খারাপ মেয়ে ভাবে, আর নিজেদের ভুল ধারণা থেকে তাসিন কে বড় ছেলের বউ করে নেয়, আরশের বাবা-মা প্রথমে তাসিন কে বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই দেননি, কিন্তু তাসিন জোর করে ঢুকে প্রথমে মিম আর আরশের কথা বলে, এতে আরশের বাবা-মা শকট হয়ে হানিফের কাছে জানতে চায়, হানিফ বলে হ্যাঁ আরশ মিমের বিয়ে সত্যি হয়েছে, বড় ছেলের মুখে ছোট ছেলে আর এই বাড়ির হবু বউয়ের কথা শুনে তাজ্জব হয়ে যায়, আরশের মা তাসিনের সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো, তাসিন চোখ ভরা পানি নিয়ে একবার হানিফ তো আরেকবার আরশের বাবা-মার দিকে তাকাচ্ছে, এই আশায় তাড়া তাসিন কে মেনে নিবে, আরশের মা তাসিনের সামনে থেকে সরে এসে আরশের সামনে দাঁড়ালো, আরশ নিজের মায়ের থেকে চোখ লুকালো, আরশ কে চোখ লুকাতে দেখে ভদ্র মহিলা কটাক্ষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে উঠলেন,
___” চোখ লোকাচ্ছ কেনো বাপধন, তুমি তো আমার গর্বিত সন্তান, তুমি একটা মেয়ের সন্মান নিয়ে খেলা করছো, তুমি তাঁকে সবার সামনে অপমান করছো, তাঁকে নিয়ে এখনো খেলে যাচ্ছো বা বা বা বা তোমার মতো ছেলে আমি আমার পেতে ধরে ধন্য বাপধন, খুব ধন্য…
___” আম্মু….
___” ঠাসসস ঠাসসস ঠাসসস ঠাসসস
আরশ ভদ্র মহিলাকে অসহায় গলায় ডাকতেই ভদ্র মহিলা আরশ কে এলোপাতাড়ি গালে থাপ্পড় দিলে লাগলেন, থাপ্পড় দিতে দিতে এক পর্যায়ে আরশের কান্না করতে করতে বললেন,
___” আমি তোমাকে এই শিক্ষা দিয়ে বড় করেছি, একটা মেয়েকে কি করে এই সমাজে কলঙ্ক করতে চেয়েছিলে তুমি, একবারও নিজের মায়ের কথা মনে এলো না তোমার, আমাদের শিক্ষার তুমি এই প্রতিদান দিলে, তুমি কী করে পারলো মিমের সঙ্গে এমন করতে, হ্যাঁ মানলাম সব শেষে বিয়ে করছো, তাহলে মিম কে সম্মান মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুললে না কেনো, তুমি যানো একটা মেয়ে কলঙ্ক হওয়ার খেসারত, তুমি বুঝো মেয়েটা একা একা নিজের সঙ্গে কতটা যুদ্ধ করে বেঁচে আছে, এসেছিলো তো আমাদের বাসায়, একবার মনে হয়নি মেয়েটার মনের মধ্যে কী চলছে, মনে হাজারো কষ্ট নিয়ে আমাদের সামনে হাসে খেলে থাকছে, তুমি কী করে পারলে বিয়ে করে তোমার বউ কে রাস্তায় ফেলে আসতে, একটা মেয়ের জন্য কতটা অপমান তুমি বুঝতে পারছো, মেয়েটা নিজের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে এটাই তো অনেক, ছিহ লজ্জা করছে আমার তোমার মতো ছেলেকে পেতে ধরেছি, আমার ভাবতেই শরীর ঘিনঘিন করছে, মিম একা একা কতটা সভার করছে।
ভদ্র মহিলা কান্না করতে করতে কথা গুলো বললো, আরশ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাপুরষ ভাবছে, তাঁর জন্য তাঁর মা কান্না করছে এর চেয়ে লজ্জা আর কী হতে পারে, আজকে বুঝতে পারছে মিম কে কতটা কষ্ট দিয়েছে, সবার সামনে প্রকাশ না করলো রাতের অন্ধকারে কতটা কান্না করেছে মেয়েটা, একটা মেয়েকে বিয়ে করে রাস্তায় ফেলে আসা মেয়েটার জন্য কতটা অপমান, শুধু সেই মেযেটা বুঝবে, আরশ নিস্তব্ধ হয়ে মেঝের দিকে চেয়ে আছে, মুখে কোনো কথা নেই, চোখটা নিমেষেই লাল টকটকে হয়ে গেছে, আরশের বাবা ভদ্র মহিলাকে শান্ত হতে বললেন, ভদ্র মহিলা হানিফ কে বলল,
___” হানিফ গাড়ি বের করো, আজকেই তালুকদার বাড়িতে যাবো, আমার বউ মাকে আমার বাড়িতে তাঁর প্রাপ্ত মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুলবো।
কথাটা বলে ভদ্র মহিলা হানিফের দিকে তাকালো, হানিফ মাথা ঝাকিয়ে বাহিরে যেতে লাগলো, হানিফ কে বাহিরে যেতে দেখে তাসিন হানিফের পিছু নিতে নিলো, আর ভদ্র মহিলা তাসিন এর হাত ধরে আটকে দিয়ে বলল,
___” আমার ছেলের থেকে দূরে থাকো।
তাসিন অসহায় কন্ঠে বলল,
___” আন্টি আমা…….
___” তোমার একটা কথাও শুনতে ইচ্ছুক না আমি।
ভদ্র মহিলা তাসিন এর হাত ছেড়ে দিয়ে একপলক আরশ কে দেখে বাড়ি থেকে হনহন করে বের হয়ে গেলো, আরশের বাবা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, আরশ অপরাধী মুখে সোফাতে বসে পরলো, আরশ যানে মিম আসবে না,
মিম নিজের বিছানায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে মলিন মুখে বসে আছে, আদিবা তালুকদার আহাদ তালুকদার কেউ মিমের সঙ্গে টুঁশব্দ পর্যন্ত করে নি, রশ্মিদের বাড়ি থেকে এসে মিম যে বিছানায় বসে পড়ছে তারপর থেকে আর আদিবা তালুকদার বা অন্য কাউকে দেখা যায়নি মিমের রুমে, মিম কান্না করতে করতে চোখের পানি চোখেই শুকিয়ে গেছে, সবকিছু থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে, একটা বার আদিবা তালুকদার ভাতিজি কে প্রশ্ন পর্যন্ত করলো না, না কিছু জানতে চাইলো, মিম তাচ্ছিল্য হেঁসে চোখ বন্ধ করে নিলো, গাল গড়িয়ে দুফোঁটা পানি হাতের উপর পরলো, হটাৎই হাতে টান অনুভব হতেই মিম চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালো, চোখের সামনে রুপালী বেগমের চেহারা ভেসে উঠতেই মিম রুপোলী বেগম কে জরিয়ে ধরতে নিলে গালে চর পড়লো,
___” ঠাসসসস।
___” কাকি কী করছো।
মিম গালে হাত দিয়ে সামনে তাকাতেই দেখলো রুপোলী বেগমের চোখমুখ রাগে লাল হয়ে আছে, তিশা রুপোলী বেগম কে বাঁধা দিয়ে মিম কে জরিয়ে ধরলো, মিমের চোখে পানি, রুপোলী বেগমের চোখ রাগ থেকে পানিতে পরিনত হয়ে গেছে, রুমের মধ্যে আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদার কেও আসতে দেখা গেলো, মিম তিশা কে পেয়ে তিশা কে জরিয়ে ধরলো, রুপোলী বেগম চোখ ভরা পানি আর রাগ নিয়ে বলে উঠলো,
___” তুমি এই কারণে গ্রাম থেকে শহরে এসেছো, একটা বার ভেবে দেখছো গ্রামের মানুষ তোমার এই নষ্টামি জানতে পারলে আমাদের কিভাবে বাঁচতে হবে, মানুষ যদি জানতে পারে, বড় ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছেলের ছোট ভাই কে বিয়ে করেছো, তুমি কেনো এভাবে বিয়ে করছো মিম, আমার জবাব চাই, তোমাকে আমরা কিসের কষ্ট দিয়েছি জার জন্য আমাদের শাস্তি দিচ্ছো তুমি, তোমার আব্বু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, শুধু মাএ তোমার কারণে, তোমাকে ইচ্ছা করছে শেষ করে ফেলতে, এইদিন দেখার জন্য তোমাকে বড় করেছি, আগে যদি জানতাম তুমি এমন হবে তোমাকে জন্মের সময় মেরে ফেলতাম।
___” আম্মু….
রুপোলী বেগমের শেষের কথায় রাবেয়া তালুকদার রুপোলী বেগম কে ধমকে উঠলো,
___” অনেক বলে ফেলছো রুপোলী, তুমি আমি আমরা কেউ কিছু জানি না, না জেনে মেয়ে কে এভাবে কষ্ট দিও না।
আদিবা তালুকদার চুপ করে আসে, রুপোলী বেগমের কথায় মিম কান্না বন্ধ করে শান্ত হয়ে দেখছে, রুপোলী বেগম কে, রুপোলী বেগম রাবেয়া তালুকদার কে বলে উঠলেন,
___” ভাবী আর কী জানবো, আমাদের কথা না ভেবে বিয়ে করেছে, আমাদের থেকে সবকিছু লুকিয়ে রাখলো, প্রথম থেকে জেদি ছিলো, কিছু বলিনাই, আদরে আদরে বড় করেছি একটাই মেয়ে আমাদের, ওর কারণে আজকে ওর বাবা অসুস্থ হয়েছে, আমরা তো কখনো কেনো কিছুর কমতি রাখিনি, তাহলে এত বড় একটা কথা লুকিয়ে রাখলো কেনো, হানিফের জন্য তো ওকে আন্টি পড়িয়ে দিয়ে গেছে, এখন আমি তাঁদের সামনে কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াবো বলবেন?
রুপোলী বেগমের কথায় তিশা বলে উঠলো,
___” কাকি তুমি কিছুই জানো না, মিম কিভাবে বিয়ে টা করেছে, তুমি আগে সবটা শুনো তারপরে….
তিশার কথায় রুপোলী বেগম আরো রেগে গেলো,
___” তুমি চুপ করো, তুমিও জানো সব ?
তিশা রুপোলী বেগমের ধমকে মাথা নিচু করে নিলো, মিম নিজের মায়ের কথায় তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___” তোমার কথা শুনে কেমন লাগছে জানো,আমি তোমার নিজের মেয়ে না, আমার মনে হয় তুমি আমার আগের কথা গুলো ভুলে গেছো,আমি তো কাউকেই বিয়ে করতে রাজি ছিলাম না, এখনো নেই আমি জাস্ট ….
___” কারণ তোমার সঙ্গে আরশের বিয়ে অনেক আগেই হয়ে গেছিলো তাইতো ?
মিমের মুখের কথা কেরে নিয়ে আদিবা তালুকদার গম্ভীর গলায় বলল কথাগুলো, মিম নিজের ফুপুর মুখে এমন প্রশ্ন শুনে এতক্ষণ ধরে রাখা কান্না দমিয়ে রাখতে না পেয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো, আদিবা তালুকদার যে মিম কে অবিশ্বাস করছে এটা আদিবা তালুকদারের কথায় বুঝা যাচ্ছে, মিম নিজেকে এক্সপ্লেইন না করে রুপোলী বেগমের দিকে চেয়ে কান্নাভরা কন্ঠে বলে উঠলো,
___” আমি জানি আমি ভালো মেয়ে না, কারণ ভালো মেয়েরা তো সত্যি কে লুকিয়ে রাখে না, ভালো মেয়েরা তো কলঙ্কিত হয় না, ভালো মেয়েরা তো সবসময় বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের কথা বাদ্য মেয়ের মতো শুনে, আমি খারাপ না তো কী, যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক তাঁর ছোট ভাই কে বিয়ে করেছি, তোমাদের চোখে বিয়েটা কিভাবে হয়েছে এটা ফ্যাট না, বিয়ে করেছি এটা ফ্যাট, আমি এই অপবাদ নিয়ে ভালো আছি নাকি নেই, এটা জানা লাগবে না, তোমাদের কাছে আমি অপরাধ করেছি এটা আগে, আচ্ছা আম্মু তোমার মেয়ে ভালো আছে? একবারও জানতে চেয়েছিলে?
মিমের কথায় রুপোলী বেগম নীরব চোখে মিম কে দেখতে লাগলো, মিম চোখের পানি মুছে তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___” আমাকে নিয়ে তোমাকে সমাজের কটুক্ষ শুনতে হবে না, কেউ যদি তোমার মেয়ের কথা জানতে চায় তাকে বলে দিয়ো, তোমার মেয়ে মা-রা গেছে, আমার মুখ তোমাকে কখনো আর দেখতে হবে না, আমার কথা কখনো মনে করে কেঁদো না, তোমার মেয়ের জেদ বেশি, সে আর তোমাকে কষ্ট দিবে না, না তাঁর জন্য তোমাকে মানুষের কথা শুনতে হবে।
রুপোলী বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মিমের দিকে, আদিবা তালুকদার অবাক হয়ে বলে উঠলো,
___” এসব কথার মানে কী মিম ?
মিম হেঁসে উঠে বলল,
___” ফুপি আমি একা থাকতে চাই, আজকে তোমাদের উপর দিয়ে অনেক কিছু গেছে, এর মধ্যে আমিও একজন, শুধু আজকের রাত টা আমাকে সহ্য করো, আমার মুখ আর তোমাদের দেখতে হবে না, প্লিজ আগের মতো এখন একা ছাড়ো।
মিমের বারবার এমন কথায় তিশা আদিবা তালুকদার অবাক হয়ে দেখছে মিম কে, রুপোলী বেগম এবার বেশ রাগী গলায় বললেন,
___” আমাদের সঙ্গে নাটক করছো, তোমার আর আরশের বিয়ে টা কিভাবে হয়েছে আমি জানতে চাই?
মিম রুপোলী বেগমের কথায় উওর না করে তিশা কে ছেড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলো, রুপোলী বেগম মেয়ের গা ছাড়া ভাব দেখে আরো রেগে গেলেন, বিকাল বেলা আদিবা তালুকদার মিমের বাবা কে ফোন সবকিছু বলেন, মিমের বিয়ের খবর শুনে ভদ্র লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে, রুপোলী বেগম মেয়ের কথা শুনে মিমের বাবা কে সঙ্গে তালুকদার বাড়িতে আসার জন্য রেডি হয়ে যায়, মিম শহরে চলে আসার পর থেকে তিশার নিত্যদিনের কাজ হয়ে গেছে, মিমের বাড়ির উঠানে ফুলগাছ গুলোর যত্ন নেওয়া, এটা মিমের আদেশ, তিশা প্রতিদিনের মতো আজকে বিকালে মিমদের বাড়িতে এসেছিলো, এসেই রুপোলী বেগম আর মিমের বাবা কে রেডি হতে দেখে তিশা জানতে চাইলে তিশা কে শুধু বলে,
___” মিম আরশ কে বিয়ে করেছে, তুমি প্রথম থেকে জানতে সব?
তিশা রুপোলী বেগমের কথা শুনে আমতা আমতা করে, কারণ মিম তিশা কে সবকিছু ফোনে বলছে আগেই, কিন্তু রুপোলী বেগম কিভাবে জানতে পারলো এটা ভেবেই তিশা ঢোক গিলল, তিশা কে আমতা আমতা করতে দেখে রুপোলী বেগম যা বুঝার বুঝতে পেয়েছে, তিশা কে আর কিছু না বলে তালুকদার বাড়িতে আসার জন্য পুনরায় রেডি হতে লাগে, তিশা রুপোলী বেগমের তারাহুরা দেখে জেদ ধরে তিশা আসবে তালুকদার বাড়িতে, রুপোলী বেগম সরাসরি নাকচ করে দেয়, কিন্তু তিশা পিছু ছাড়ে না, রুপোলী বেগম বাধ্য হয়ে তিশা কে নিয়ে আসতে রাজি হয়ে যায়, রুপোলী বেগম তালুকদার বাড়িতে এসেই মিমের রুমে আসো, আর মিমের বাবা নিচে আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদারের সঙ্গে বসে আছে, রুপোলী বেগম মিম কে রাগী গলায় পুনরায় কিছু বলতে নিবে, তাঁর আগেই আরাত মিমের রুমে ঢুকে যায়, আরাত একপলক নিজের মা আদিবা তালুকদার কে দেখে, তিনি আরাত কে দেখে মুখ অন্য দিকে ঘুরায়, রুপোলী বেগম আরাত কে দেখে বেকুব বনে যায়, কারণ মিমের মতো আরাতের চোখমুখ কান্না করে ফুলে আছে, রুপোলী বেগম বুঝে উঠতে পারলেন না, আরাত কেনো কান্না করছে, পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে কেনো, শুধু কী মিম আরশ কে ঘিরে নাকি আরো কিছু ঘটেছে, রুপোলী বেগম বেশি মাথা ঘামালেন না, আরাত রুপোলী বেগম কে বলে উঠলো,
___” মামী আমাকে একটু সময় দিন, আমি বলছি ওদের বিয়ে কিভাবে হয়েছিলো।
আরাত একটু সময় নিয়ে মলিন মুখে বলতে শুরু করলো, সবকিছু শুনার পর রুপোলী বেগমের মন বেশি ক্ষিপ্ত হলো মিমের উপর, কারণ ওইদিন ক্লাস রুমে কী হয়েছিল এটা মিম আরশ ছাড়া কেউ জানে না, আর আরাত যতটুকু দেখেছে,আর তাঁদের বিয়ের পর কী কী হয়েছে সেসব বলছে, রুপোলী বেগম মিমের দিকে চেয়ে আছেন, কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না, উনাদের ধারনা মিম আর আরশ ক্লাসে নোংরামি করছিলো, আর সবাই দেখতে পেয়ে তাঁদের বিয়ে দিয়ে দিছে, রুপোলী বেগম নিস্তব্ধ চোখমুখ নিয়ে রুম থেকে ধীর পায়ে বের হয়ে গেলো, রাবেয়া তালুকদার রুপোলী বেগমের সঙ্গে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, আদিবা তালুকদার মিমের পাশে এসে দাঁড়ালো, কিছু বলতে নিবে মিম আদিবা তালুকদারের উপস্থিত বুঝতে পেয়ে মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
___” আর মাএ একটা রাত ফুপি, তাহলে আর তোমাদের এই কলঙ্কিত মেয়েকে দেখতে হবে না।
মিমের কথায় আদিবা তালুকদার মিমের মাথায় হাত রেখে বলল,
___” আমি জানি আমার মিম এমন না, অভিমান করছিস মা, তোর ফুপি আজকে নিজের মধ্যে নেই, একটার পর একটা শকট মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে রে মা, তোরা অনেক বড় হয়ে গেছিস।
মিমের বন্ধ চোখের কোণ থেকে পানি গড়িয়ে পরলো, নিজের মাথায় আদিবা তালুকদারের হাতের উপর হাত রেখে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল,
___” তুমি এতক্ষণে আসলো কেনো ফুপি, আমার যে তোমাকে খুব প্রয়োজন ছিলো, তুমিও সবার মতো আমাকে ভুল বুঝেছো বলো, দেখো না আম্মু আমার সঙ্গে কিভাবে কথা বলছে, একবারও আমাকে নিজের বুকে জরিয়ে ধরে বললো না, তুই কেমন আসিস মা, তোর কী বেশি কষ্ট হচ্ছিল, তুই ভুল না আমি জানি, আম্মু একবারও বলল না, তুমি আমার একটিবারও খোঁজ নিতে আসলে না, আমি সত্যি খুব খারাপ মেয়ে তাইনা ?
আদিবা তালুকদার মিমের কথা শুনে কান্না করে দিলেন, তিশা আরাত কান্না করছে, আদিবা তালুকদার মিমের মাথার কাছে বসে বলল,
___” তুই আমার সোনা মা, তুই খারাপ না, আজকে আমাদের পরিস্থিতি এমন জায়গায় নিয়ে এসেছে, সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে, কোথায় থেকে কি ঘটে যাচ্ছে, সবকিছু এলোমেলো লাগছে, তুই চিন্তা করিস না, আমি আসি তো, আমরা সবাই মিলে বসবো, তুই যদি আরশের সঙ্গে সংসার করতে চাস আমরা তোকে ধুমধামে নতুন করে আনুষ্ঠানিক ভাবে তুলে দিবো।
মিম আরশের নাম শুনে মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
___” আমার সাথে যেটা ঘটেছে সেটা আমার নসিবে ছিলো তবে ঘটনা সূচনা করার মানুষ টার কর্মফল খুব কঠিন ভাবে পেতে হবে।
আদিবা পুনরায় বুঝলেন না মিমের কথায় মানে, আইরা মিমের রুমে দরজার সামনে এসে একনজর মিম আরাত তিশা কে লক্ষ করে আদিবা তালুকদার কে বললেন,
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৬
___” মামনী… বড়-মামনী তোমাকে নিচে ডাকছে, হানিফ ভাইয়া আর তাঁর মা-বাবা এসেছে!
আইরার কথায় আদিবা তালুকদার অবাক হয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন, মিম চোখ মেলে তাকালো আইরার কথা শুনে, আইরা রুমে ঢুকে বিছানার সাইটে বসলো, আরাত তিশা বিছানায় বসে আছে, সবার মুখ মলিন, একদিনে কতকিছু ঘটে গেলো, রশ্মি বাড়ি থেকে চলে গেলো, আরাত আর মাহিরের রিলেশন কথা সবাই জেনে গেলো, মিম আরশের বিয়ে সবার সামনে প্রকাশ পেলো, একদিনে এতকিছু হজম করতে পারছে না কেউ, তারউপর নতুন করে হানিফ আর তাঁর মা-বাবা উপস্থিত হয়েছে তালুকদার বাড়িতে
