তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৫
নীতি জাহিদ
শুক্রবার দিনটা বাসায় কাটানো হয়। মিনহাজ শুক্রবার দিনটা খুব প্রফুল্ল থাকে। বাসায় মায়া এসেছে। প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষার মাঝে মোনা দুই শুক্রবার বাসায় আসেনি। মিনহাজ মেয়ের সাথে দেখা করে এসেছিলো। আজ বাসায় উৎসব লেগেছে। খাবার টেবিলে সবাই একসাথে বসেছে। দাদী ইদানীং মোনাকে চোখে হারায়। এর কারণ টাও অবশ্য মোনার জানা। দাদীর মতে বিকাশের মত ছেলে পাওয়া দু/ষ্ক/র। সেদিন রিং পরাতে না পারায় আরো দুবার ডেট ফেলতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছে বিকাশের পরিবার। মোনার অসুস্থতা,পরীক্ষা সব মিলিয়ে ব্যাপারটা পিছিয়েছে। টেবিলে সব মোনার পছন্দের খাবার। কচুর লতি, কচুর শাক, শুটকির ঝাল, বেগুন পোড়া, ছোট মাছের মরিচ খোলা। কলিংবেল বেজে উঠাতে মামুন সাহেব দরজা খুলে বিকাশকে এগিয়ে নিয়ে আসলেন। হাত ধুইয়ে বিকাশকে মোনার পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। পরিবারের এমন কাজে মোনা অসম্ভব বিরক্ত। সবাই খেতে বসেছে কিন্তু মিনহাজ হাঁটাহাঁটি করছে। তিনি নাকি এসিডিটির ঔষধ খেয়েছেন। আবার কলিংবেল বেজে উঠলে মিনহাজ লাফিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। মোনা ঘাড় কাত করে দেখে দরজার সামনে সেই কাঙ্ক্ষিত পুরুষ দাঁড়িয়ে। চোয়াল ঝুলে গিয়েছে মোনার। চোখ মুখ চকচক করছে। সেদিনের পর ভদ্রলোক আর কথা বলেননি। একটা ফোন কল ও দেন নি। অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে ছিলেন টানা ২ টা সপ্তাহ। কোন চুলোর কাজ করে কে জানে, যে জায়গায় যায় ফোন সবসময় সুইচড অফ থাকে। মোনা কত মেসেজ দিলো,কত কল করলো। সব মেসেজের উত্তর একটাই ছিল, ” Monalisa I am outside from Dhaka. I will contact, later.”
মোনার মুখে মিষ্টি হাসি। সে আবার খাবারে মন দিলো। বিকাশ উঠে গিয়ে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। ছেলেটা বড্ড সম্মান করে এই লোককে। বিকাশকে বোধ হয় এখন আশা করে নি এই মুহূর্তে। বেচারার মুখটা চুপসে গিয়েছে। তবে মুখে সেই অনিচ্ছুক হাসিটা লেগে আছে। মায়ার কোল থেকে ওর ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করে দিচ্ছে। মায়ার মুখের হাসিটা প্রশস্ত হলো। মায়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
” নাম কি ছেলের মায়া?”
” দীপ্ত শাহাজাহান ”
” মাশাল্লাহ, ছেলে তোমার মতোই সুন্দর”
বাহ! বাহ! সবাইকে সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করছে কিন্তু ভদ্রলোক একবার ও মোনার সাথে কথা বলা তো দূরের কথা, তাকালোই না। কেন ফুফিকে সুন্দর বলবে!! মোনার অভিমান হলো। ইমরান বুঝতে পেরে না তাকিয়ে হাসি দিলো। মোনার বিপরীতে থাকা চেয়ারটা টেনে বসলো। আরেকবার মোনা ভালো করে লক্ষ্য করার জন্য দৃষ্টি রাখলো এই বলিষ্ঠ মধ্যবয়সী পুরুষের দিকে। যাকে পেতে ফুফি,ভাতিজি,অফিসের এইচ. আর হেড, এছাড়া তার ভার্সিটির ম্যাম পর্যন্ত উদ্ভিগ্ন। অদ্ভুত চিন্তাধারা সবার। মোনা ভাবনার মধ্যে নিজে নিজেই হেসে উঠলো। ইমরানের দিকে তাকাতেই খেয়াল করলো কালো শার্ট পরেছে,সাথে কালো প্যান্ট। কালো ঘড়ি, আগাগোড়া দেখি সবই কালো। কিন্তু চোখের চশমার ফ্রেম টা গোল্ডেন কালার। অদ্ভুত!!! ভাগ্যিস রীমলেস নতুবা সানগ্লাস হলে শিউর আজকে কুপোকাত হত। মোনা সেই তখন থেকে ঠোঁট কামড়ে ভ্রু কুচকে দেখে যাচ্ছে ইমরানকে। ইতালিয়ান ” Bvlgari ” যাকে বুল্গেরি নামে উচ্চারণ করে বাঙালি। এই পারফিউম ব্যবহার করে এই ভদ্রলোক। এই সুগন্ধির ঘ্রানে পুরো ডাইনিং রুম সুভাসিত। এই লোক মেয়েদের আকর্ষণ পেতেই এসব করে। আকস্মিক বাবার ডাকে সম্বিত ফিরে এলো মোনার,
” এই মেয়েটা খাবে বলে এতক্ষন নাজেহাল অবস্থা,কোনদিকে হা করে আছো আম্মা। খাওয়া শুরু করো। আমরা তো খাচ্ছি।”
মোনা বাম হাত দিয়ে মাথা চুলকে খাওয়া শুরু করলো। আচমকা ইমরানের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো। ইমরান হাসছে মুখ টিপে। মোনা চোখ বড় বড় করে একবার তাকিয়ে আবার প্লেটে তাকালো। লজ্জায় ব্লাশ করছে। চোখই তুলতে পারলোনা। এই লোকের চোখের চাহনীই এত অদ্ভুত যে কেউ ঘায়েল হবে। সেই মুহূর্তে ইমরান বলে উঠলো,
” মোনালিসা ইউ আর ব্লাশিং??? হোয়াই??”
মোনার শ্বাস আটকে যাবে। যার জন্য ব্লাশ করছি সেই এমন প্রশ্ন করলো। বিকাশ মোনার দিকে তাকিয়ে বলে,
” বাহ, স্যার নাম টা তো দারুন দিয়েছেন, মোনালিসা! আমাকে তো আপনার পছন্দ না মোনালিসা, তাহলে আমি আসাতেই কেনো আপনি ব্লাশ করছেন?”
বিকাশের মোনালিসা ডাকটা মোনার একদমই পছন্দ হলো না। সে খুব শক্ত ভাবে বললো,
” আমাকে দয়া করে মোনালিসা ডাকবেন না, এই নামে শুধু উনি ডাকে। আমাকে যারা স্পেশাল নামে ডাকে তাদের ডাকটা শুধুই তাদের একান্ত”
সবাই একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো এভাবে বিকাশকে বলাতে। মিনহাজ জানে মেয়ে স্পষ্টভাষী তাই প্রসঙ্গ বদলাতে বললো,
” আসলে বিকাশ আমি ওকে শাহজাদী ডাকি, ইমরান মোনালিসা ডাকে, মায়া মুনিয়া ডাকে। ও পছন্দ করে না যার নাম সে ছাড়া অন্য কেউ সেই নামে ডাকা। তুমি নিজের মত একটা নাম দিয়ে দাও।”
মোনা আবার প্রতিবাদ করে বললো,
” ভুলেও এই কাজ করবেন না বিকাশ সাহেব, আগে আপনি আমার পরিবারে সামিল হন এরপর দেখা যাবে।”
বিকাশ খুব সুন্দর ভাবে হাসলো,
” আংকেল মোনার এই দিকটা খুব ভালো। যা বলে স্পষ্ট বলে।”
” জ্বি, একদিন দেখবেন এমন স্পষ্ট কথা বলব হার্ট এটাক হয়ে যাবে আপনার”
কথাটা মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো। ইমরান হাসছে। মোনা তীক্ষ্ণ চাহনি নিয়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এই লোকের সমস্যা কি। এত মজায় আছে কেনো। আসার পর থেকে হাসছে। তার কালোজামের হাসিটা বুকে ধকধক লাগিয়ে দিয়েছে। ইমরান তখন মুখ থেকে তার গুরুত্বপূর্ণ কথা বের করলো,
” এজন্যই বোধ হয় ভিঞ্চি বলেছিলো মোনালিসারা রহস্যময়। তাদের প্রতিটি কাজের পেছনে অসাধারণ রহস্য রয়েছে। হাসিটাও এমন যে হাজার বছর তাকিয়ে থাকলেও তৃষ্ণা মিটবেনা। তাই না মোনালিসা!!! ”
খাবার টেবিলের প্রত্যেকের নজর ইমরানের দিকে। বিকাশ ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলে,
” স্যার শুনেছি আজ দেখলাম। ইউ আর জিনিয়াস। বুয়েটের নাফিজা ম্যাম,অনন্যা ম্যাম মনে হয় আপনার ব্যাচমেট। উনাদের মুখে সবসময় একটাই কথা ছিলো, বহুবার ইমরানের প্রেমে পড়েছি। অনন্যা ম্যাম তো বলেই ফেললেন একবার, আমি মেয়ে হয়ে ইমরানকে প্রপোজ করেছি। ওর রিজেকশন পেয়ে ও লজ্জা লাগে নি। বরং ও হেসে কথা বললেই মনে হত আমি স্পেশাল কেউ। তাকে এড়িয়ে যাওয়ার সাহস কি কারো আছে!!ডিপার্টমেন্ট থেকে কতবার তাকে বলা হয়েছিলো জয়েন করতে। কিন্তু সেই নাছোড়বান্দা নাকি পড়াবে না। সে নাকি শিক্ষার্থী থাকতে চায় সারাজীবন, শিক্ষক নয়।ইমরানকে যদি তোমরা পেতে; বুঝতে পারতে প্রেম কি? অ্যাম্বিশন কি? নেতৃত্ব কি? সাহিত্য কি? সেই সাথে ফ্লার্ট কি?”
ইমরান হো হো করে উচ্চস্বরে হেসে বললো,
” অনন্যা একজন চমৎকার মানুষ। ও বাড়িয়ে বলেছে তোমাদের। ফ্লার্ট আমি করতে পারি ভালোই, সেই বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই।”
” কিন্তু মোনা যে নিতান্ত বাচ্চা,স্যার?”
ইমরান আবার হাসলো,
” তুমি যাকে বাচ্চা ভাবো আমি তাকে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সেই ভুবনভুলানো রহস্যময়ী হাসির মোনালিসা ভাবী, সে এখন নারী,প্রাপ্তবয়স্ক। নারীদের অবহেলা করার সাধ্য থাকেনা বুঝলে খোকা। বরঞ্চ তুমি এখনো লিটল বেবি। চারদিকে এত সৌন্দর্য্যের অবগাহন অগ্রাহ্য করো কি করে শুনি! যেখানেই দেখিবে ছাই,উড়াইয়া দেখো তাই। পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন। মোনালিসা তো শুধু মোনালিসা নয় স্যানিওরিটা, স্লিপিং বিউটি। এলিজাবেথান লিটারেচার পড়বে। রোমান্টিক পয়েট্রি পড়বে। জীবনে সত্যিকার প্রেমটা পেয়েই যাবে।”
মনসুর এতক্ষন চুপচাপ খাচ্ছিলো। আপাতত সে মুখ খুলে বললো,
” ইমরান ভাই, আমাকে আপনার শিষ্য বানাবেন? মানে আপনার এত প্রতিভা আর সাহিত্যমনা। ইঞ্জিনিয়ার কিভাবে সাহিত্যপ্রেমিক হয়? আমার তো মনে হচ্ছে জেন অস্টিন এর মেইল ভার্সন আপনি।”
ইমরান খাওয়া শেষ করে দাঁড়িয়ে পড়ে হাসতে হাসতে বলে,
“মনসুর বিয়েটা যদিও টেকেনি, কিন্তু প্রেম করেই করেছিলাম। পাগলামির স্বাক্ষী তো তোমরা ছিলে।”
যেই হাসিতে এতক্ষন পুরো ডাইনিং টেবিল আমোদিত,এখন কিছুটা ঠান্ডা। মোনা মন খারাপ সেই প্রথম থেকে, দীপ্তকে আদর করলো, ফুফিকে সুন্দর বললো, অথচ তার দিকে ঠিকঠাক তাকালো ও না। এখন আবার আগের বিয়ের কথা সগর্বে জাহির করছে। এই ছোট্ট মানুষটার মন টা ভেঙ্গে যাচ্ছে সে কি বুঝতে পারছে না। কথাই বলব না। মোনা খাবার টেবিল থেকে উঠে গেলো ফোনের আওয়াজ পেয়ে। আজ প্রত্যেকে ইমরানের ভিন্ন রূপ দেখলো। মোনা পা টিপে রুমে গেলো, বিরক্তি নিয়ে মুখে উচ্চারন করলো,
– ফোন আসার আর সময় পেলোনা।
রবি অফিস থেকে কল করেছে, ফোন কেটে দিয়ে আবার ডাইনিং এ আসতেই ইমরানের সাথে দেখা। ইমরান কানের কাছে এসে বললো,
” গাল ফুলাতে হবে না, আমার মোনালিসা বরাবরই সুন্দর তার রহস্যময়ী হাসির জন্য। বাকি সব ফিকে পড়ে তার সামনে, তার সৌন্দর্য্য এতটাই মোহনীয় যে ইমরানকে এক মুহুর্তে কবজা করার ক্ষমতা রাখে।সে আমার দ্বিতীয় প্রহর।”
কানের কাছে ফু দিয়ে চুলগুলো নাড়িয়ে দিয়ে ড্রইং রুমে বসে পড়লো ইমরান। মোনার সারা শরীরে শিহরণ জেগে উঠেছে। এ কোন অনুভূতি। লজ্জায় মিইয়ে গেলো মোনা। এটা তার জন্য নতুন। এতটা আবেগী ইমরানকে সে আগে দেখেনি। সত্তিই কি সে প্রেমিক পুরুষ!
একটু আগের রাগের কথা মনে পড়লো, মোনা ইমরানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, চারপাশে তাকিয়ে দেখে সবাই টেবিলে। বিকাশ কথা বলছে সবার সাথে হেসে হেসে। ইমরানের সম্মুখে এসে বলে,
” এতই যখন ভালোবাসেন প্রথম বউকে তাকে ফিরিয়ে আনলেই পারেন, তাহলে আর আক্ষেপ করতে হবে না।”
” জেলাস???”
” উঁহু, একদম না। বরং আনন্দিত এটা ভেবে সব মেয়েরা ইমরান শরীফ বলতে অন্ধ। ফুফি,ভাস্তি,শিক্ষিকা।ওয়াও!!আমার একজন ম্যাডাম সেদিন আপনার কথা বলাতে আমি অবাক। স্বপ্না ম্যাডাম আপনাকে কিভাবে চিনে তা জানিনা, আমাকে ক্লাসে সবার সামনে বলে মোনাশা তোমার ইমরান আংকেল এর সাথে দেখা হলে বলবে একদিন যেন দেখা করে আমার সাথে। আমার খুব প্রিয় মানুষ। – হুহ দুনিয়ার সবার জন্য তার সময় আছে,আমিই শুধুমাত্র উচ্ছিষ্ট। ”
ইমরানের হাসিমুখটা নিভে গেলো। মাথা হঠাৎ করে গরম হয়ে গেলো, উচ্ছিষ্ট বলতে কি বুঝালো এই মেয়ে। এভাবে অবুঝ এর মত বিহেভ করলে তো সমস্যা। যদি সময়,ব্যস্ততা না বুঝে তাহলে তো দূরে থাকাই ভালো ছিলো। ইমরান একটা ধমক দিলো মোনাকে,
” কথাবার্তার এই অবস্থা কেন? উচ্ছিষ্ট কি? কেউ শাসন করে না দেখে ভেবোনা যে মুখের ভাষা আমার সামনে খারাপ করবে। আজকে দুপুরে বানিজ্য মন্ত্রীর সাথে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিলো, এখানে আসব বলে সেটা পোস্টপন্ড করে এসেছি মুখের এইরূপ ভাষা শোনার জন্য। বড্ড ভুল করেছি এখানে এসে, এখন সামনে থেকে যাও।”
বিকাশের ডাকে সৎবিৎ পেয়ে ও ঘুরে তাকালো। বিকাশ এসে মোনার কাঁধে হাত রাখলো। ইমরান সাথে সাথে নিজের চোখ সংযত করলো। কারণ সে জানে এখন নিজেকে সংযত না করলে বিকাশ অক্ষত অবস্থায় বাসায় ফিরবেনা। মোনা কাঁধ থেকে বিকাশের হাতটা ছুঁড়ে ফেললো। রেগে গিয়ে বলল,
” টাচ করবেন না, আমার এসব অপছন্দ। যা চাই তা পাই না, যা পাই তা অসহ্যকর।”
মোনা একমুহূর্ত না দাঁড়িয়ে রুমে ঢুকে পড়লো। বিকাশ মুখটা পেঁচার মত করলো। ইমরানের পাশে বসে বললো,
” স্যার এত মুড সুইং করে ওর”
” বিকাশ ডোন্ট মাইন্ড, মুড সুইং কিনা জানিনা তবে অনুমতি ছাড়া কোনো পুরুষের নারীকে ছোঁয়াও তো অন্যায় বলো?”
” স্যরি স্যার ব্যাপারটা প্রথমে বুঝতে পারিনি।পরে তো ও রেগে গেলো।”
” সুযোগ যদি পাও মাফ চেয়ে নিও, যদিও মোনালিসা সুযোগ দেয়ার মত মেয়ে নয় আমি যতদূর জানি। ওর মন মর্জি উপরওয়ালাই বুঝেন”।
মোনাকে এক ঘন্টা ধরে মায়া ডাকছে। কিন্তু মেয়েটা দরজাই খুলছে না। কিছুক্ষন পর পর এসে ড্রইং রুমে আপডেট দিচ্ছে মোনা দরজা খুলছে না। মিনহাজ আয়েশী ভঙ্গিতে বসে বলছে,
” বাদ দে, একটু পর রাগ কমলে এখানে আসবে। বিকাশকে দেখলেই ওর মেজাজ খারাপ হয়। তুই বলিসনি বিকাশ চলে গিয়েছে?”
” বলেছি তো তাও খুলছে না”।
” আমি কি দেখবো একবার?” ইমরানের কথায় মায়া একটু অবাক হলো। কেমন করে যেন তাকালো। মিনহাজ নিশ্চিন্ত হয়ে বললো, ” ভাই যা,তুই শেষ ভরসা খুললে হয়। এই মেয়ে এত জেদী।”
মায়া আবার কড়া নাড়লো, ” মুনিয়া,মা খোল। দেখ তোর ইমরান আংকেল এসেছে। উনি খারাপ ভাববে। প্লিজ খোল”
ইমরান এর অজান্তে মাথায় হাত চলে গিয়ে কপাল চাপড়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো, ” আজকেই সব খারাপ হতে হল। এই মায়া আংকেল বলেছে। আগুনের মধ্যে ঘি ঢেলেছে। উফ এখন ভেতরে কি হবে আল্লাহ জানে।”
ইমরানের ভাবনার মাঝেই দরজায় কিছু ভাঙার আওয়াজ এলো। মায়া ঢোক গিলে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলে, ” ইমরান ভাই, আমি যাই আপনি সামলান”।
ইমরান ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো,
” মোনালিসা,আমি চলে যাচ্ছি। আগামীকাল সন্ধ্যায় ফ্লাইট আছে। কয়েকদিনের জন্য মালয়েশিয়া যেতে হবে…
কথার মাঝেই দরজা খুললো। ইমরানের হাত ধরে টেনে ভেতরে ঢুকিয়ে ফেললো। মিনহাজ ঘাড় কাত করে দেখেছে পুরোটা। নিজে নিজেই হাসলো।
রুমের মধ্যে সিলিং ফ্যানের আওয়াজ। দরজা বন্ধ। পর্দা টানা। রুম টা অন্ধকারাচ্ছন্ন তবে আলো দিনের বেলা বলে। চারদিকে কাগজপত্র ছিটানো। স্টিলের ফুলদানীটা দরজার কাছে পড়ে আছে। একটু আগে যা ছুঁড়ে মেরেছিলো। গরম লাগছে ইমরানের শার্ট এর দুটো বোতাম খুলে চেয়ার টেনে বসলো। মোনা বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। অদ্ভুত এই মেয়ে যদি শুয়েই থাকবে আমাকে ঢুকালো কেনো?
ইমরান শুয়ে থাকা কিশোরীর দিকে তাকিয়ে সামনে এগিয়ে খাটে এসে বসে রহস্যময় হাসি দিলো। দুষ্টুমি করতে মন সায় দিলো। কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো,
” মোনালিসা আমার এক্সট্রা শার্ট টা কি এই রুমে আছে? কক্সবাজার যেটা রুম থেকে সরিয়ে ছিলে?”
মোনা এক লাফে খাট থেকে নেমে দূরে গিয়ে ওড়না গায়ে পেচিয়ে বলে,
” আস্তাগফিরুল্লাহ, অসভ্য। ইমরান সাহেব!! কি বলেন এসব। এ্যাই আপনি শার্টের বোতাম খুলেছেন কেনো?”
ইমরান মুখ টিপে হাসছে। বোতাম লাগাতে লাগাতে এগিয়ে এসে বলে,
” মিনহাজ ভাই চিন্তা করছে। তাকে সময়মত ঔষধ দিও। আমি গেলাম। রাগ কমলে ফোন দিও। আসার পর দেখা হবে। মোনা তুমি এখন ও অবুঝ রয়ে গেলে। কোথায় কি বলতে হয় জানোনা। আমার বয়সের মানুষ তোমার মত বাচ্চা মেয়ের জন্য মিটিং ছেড়ে এসেছি তোমার বুঝা উচিৎ ছিলো তুমি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি বাচ্চামো পছন্দ করি তার মানে এই না যে অহেতুক রাগকে প্রশ্রয় দিব। আর বাকি রইলো আমার প্রথম বউ। তাকে আমি ভালোবাসতাম । সে আমার সন্তানের মা। সম্মান করি এখনো। সে যেখানেই আছে ভালো থাকুক। কেনো আমাদের মাঝে টানছো? ও আচ্ছা ভেবেছিলাম আদর করবো তাই বাটন খুলেছিলাম,তুমি তো নিলে না। কি আর করা!
মোনা অবাক হয়ে চেয়ে রইলো। শুকনো ঢোক গিলছে। গলা শুকিয়ে মরুভূমি। মুখে একটা শব্দ উচ্চারণ করলো,
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৪
” অসভ্য ইমরান সাহেব ”
ইমরান ভুবনভুলানো হাসি দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। মনে মনে ভাবছে “অসভ্য ইমরান সাহেব”, শুনতে বেশ ভালো শুনাচ্ছে।
