তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৯
নীতি জাহি
পুল সাইডে চেয়ারে বসে আছে ইমরান।হাতে সি/গা/রে/ট। কাকনের চলে যাবার পর সব ছেড়ে চলে গেলেও এই সি/গা/রে/টই তার পাশে ছিলো। টানা সাতটা সি/গা/রে/ট শেষ করে পুলের পানির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে ইমরান। অস্থির লাগছে। এত বিষাদ কেনো জীবনে। প্রচন্ড ক্রোধ হচ্ছে মেয়েটার উপর। এতটা বিষাদ এর আগে কখনোই গ্রাস করতে পারেনি ইমরানকে। মেনে নিতে পারছেনা ডাক্তারের কথা গুলো। ছোট্ট মেয়েটা এত কষ্ট আড়াল করলো কি করে!!! সবাই দেখছে ইমরানের ক্রোধ, ভেতরটা যে পুড়ছে তা দেখার কেউ নেই। এই দুই বছরে মেয়েটা কেনো কোনো প্রতিবাদ করলো না,কেনো সবাইকে জোর গলায় বললো না সে ভালোবাসে ইমরানকে। মায়ার অত্যাচার সহ্য করে এসেছে কেনো? আর ভাবতে পারছেনা, প্রবল বেগে গায়ের টি শার্ট টা খুলে ছুড়ে মারলো পুলের এক পাশে। পানিতে ঝাঁপ দিলো। ইচ্ছামত কিছুক্ষন পুলের পানিতে সাঁতরালো । মিনহাজ,নয়ন,ইশতিয়াক এবং ইশান দূরে দাঁড়িয়ে ইমরানকে দেখছে। ইশানের চোখে পানি,মুখ খিচে বললো,
‘ আমার পাপার এত কষ্ট কেনো?’ নয়ন আগলে নিলো ইশানকে।
গগন কাঁপিয়ে বজ্রপাত। মনে হচ্ছে মুষলধারে বৃষ্টি হবে। ইমরান আরেকটা সি/গা/রে/ট পানিতে দাঁড়িয়েই ধরালো। ঘাড় ঘুরাতেই দেখতে পায় বারান্দায় তার অর্ধাঙ্গিনী,প্রিয় মানুষটি ছল ছল চোখে তাকিয়ে আছে। দু হাতে বার বার চোখ মুছেই যাচ্ছে। জলন্ত সি/গা/রে/ট ছুঁড়ে মারলো পুলের পানিতে। সজোরে বললো,
‘ভেতরে যাও,বৃষ্টি আসবে। ভিজে গেলে আরো খারাপ হবে শরীর।’
মানুষ টা অবহেলা করেও যত্ন নিচ্ছে। দরকার কি এমন যত্নের। এরচেয়ে হাসি মুখ রেখে অযত্নই ভালো। ঝুপঝাপ বৃষ্টি শুরু হতেই আড়ালে থাকা প্রানী গুলো বাগানের এক পাশে ছাউনিতে দাঁড়ালো। মিনহাজ নয়নকে ধমক দিয়ে বলে,
‘ বেয়াদপ কোথাকার,আমি মেয়ে আর মেয়ের জামাইর এই ব্যক্তিগত কথা শুনবো এখানে দাঁড়িয়ে। এই ইশান ভেতরে যাও।বাবা মা কে একা ছেড়ে দাও। এটা লজ্জা জনক নয়ন।’
‘রাখো তোমার লজ্জা, ভুলে যাও ইমরান তোমার মেয়ের জামাই। আপাতত কাঠখোট্টা ইমরানের এই অবস্থা কেনো হলো সেটা অবগাহন করার চেষ্টা করো।’
ইমরান সজোরে পানিতে ঘুষি মারছে। ওর এমন আচরনে বাকিরা ভয় পেয়ে গেলো। পানিতে ডুব দিয়ে যাচ্ছে অনবরত। ইশান ভয় পেয়ে বললো,
‘আংকেল আমি যাচ্ছি,পাপার এজমার প্রবলেম আছে। এভাবে পানির মধ্যে ডুব দিচ্ছে কেনো?’
ইশান দৌড়ে গেল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে খানিকটা ভিজে গেলো।
‘পাপা উঠো।’
ছেলের ডাকে ইমরান পেছন ফিরে দেখে ছেলে ভিজে ছুপছুপা। তড়িঘড়ি করে পুল থেকে উঠে গেলো নিজেকে বকতে বকতে। নিজের এই রূপ ছেলেকে দেখাতে চায় না সে। ছেলে জানে তার বাবা খুব সেন্সিবল,রেসপন্সিবল একজন মানুষ। নিজের পাগলামি ছেলেকে দেখানো যাবে না। এত বড় ছেলে বাবার পাগলামি দেখবে ভাবতেই লজ্জা লাগছে ইমরানের।
‘তুমি এখানে কেনো প্রিন্স,ভিজেছো কেনো?’
বাবার গলায় কোমলতা নেই। ইশান কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বললো,
‘এমন করছো কেনো,পাপা। উঠে এসো।’
‘আ’ম অলরাইট প্রিন্স। আসছি।’
‘ফুফি খাবার দিয়েছে একসাথে খাব বলে তোমাকে খুঁজতে এসেছিলাম’।
‘ওহ’
টাওয়াল দিয়ে গা মুছে শরীরে টাওয়াল টা পেছিয়ে ট্রাউজার টা খুলে একপাশে রেখে দিলো । রেক থেকে বাথরোব টা বের করে গায়ে দিলো।
‘চলো’
ইশান আশপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে নয়নরা আছে কিনা, দেখে কেউ নেই। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ইমরানের চোখে পড়লে নির্ঘাত মহাপ্রলয় হয়ে যেত। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই দেখে সবাই টেবিলে। আইরিন ডাক দিলো,
‘খেয়ে যাহ ইমন।’
টেবিলে তাকিয়ে দেখে মোনা ও বসে আছে। আজ কিছুটা লজ্জা পেয়েছে। বাথরোব পরা অবস্থায় বাড়ির মেইড বা আইরিন ছাড়া কেউ দেখেনি। এত খোলামেলা ভাবে ইমরান নিজেকে কারো সামনে উপস্থাপন কখনো করেনি।ভেবেছিলো সোজা রুমে ঢুকেই ড্রেস চেঞ্জ করবে। কিন্তু ইশানের জোরাজোরিতে পুল এ ভেজা কাপড় রেখে এসেছে। টেবিলে মোনা,তুশি বসে আছে। কিছুটা বিব্রত অবস্থায় পড়ে গিয়েছে সবাই। কথা না বাড়িয়ে সামনে পা আগাতেই আইরিনের আবার ডাক,
‘কিরে ডাক দিলাম না।’
‘আপা আমি বাথরোব পরা আছি,চেঞ্জ তো করে আসি।এমন অর্ধেক টাওয়াল, গায়ে বাথরোব পরে খেতে বসবো? কি বলো এগুলা।’
‘আশ্চর্য তুই কি আজ প্রথম রোব পরে খাবি,প্রতিদিন তো এক্সারসাইজ করার পর গোসল করে রোব পরেই নাস্তা খাস। মাঝে মাঝে তো রোব ও থাকেনা টাওয়াল পেছায়ে খাওয়া শুরু করিস।’
ইমরান ফোস করে দম ফেললো। দাত কিড়মিড় করা জবাব দিলো,
‘ওটা আমার বেডরুমে,আপা!
‘পুরো বাড়িটাই তো তোর…
সোহান ইশারা করতেই কথা শেষ না করে মোনার দিকে চোখ যেতেই আইরিন জিহবায় কামড় দিলো,’ ওহ স্যরি,যাহ আমি ভুলে গিয়েছিলাম এখানে নতুন বউ আছে। ও হয়তো তোর এমন রূপ দেখেনি।’
আপার লাগাম ছাড়া কথা গুলো আর গেলোনা। মোনা এক পলক ইমরানের দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলে চোখ সরিয়ে ফেলে।
তৎক্ষনাৎ নয়ন বলে উঠলো,
‘মামা চলে আয়,তোকে কিন্তু হট ড্যাশিং পুরো চকলেট বয় লাগছে। এই অবস্থায় দেশী বিদেশী যেই মেয়েই দেখবে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ওয়েট মেয়েদের মত অভিনয় করে বলি, ইমরা আ আ ন ইউ লুক সো হহহহট……ওই যে সোফিয়া আছে না তোর ইটালিয়ান এমপ্লয়ি ও যদি দেখতো এই অবস্থায় শিউর ঝাঁপিয়ে পড়তো।’
‘ছিঃ নয়ন আংকেল,সোফিয়ার কথা একদম বলবে না। সেদিন বিজনেস মিটিং শেষে আমি,পাপা আর ম্যানেজার ডিসকাস করছিলাম।ওই মুহুর্তে সোফিয়া কোথায় থেকে এসে আচমকা পাপাকে জড়িয়ে ধরে পাপার কোলে বসে পড়ে। যেই না চুমু খেতে যাবে, ঠাস ঠাস দুটো পড়েছে সোফিয়ার গালে। সোফিয়া ফায়ার্ড। বেহায়া মহিলা।’
বাইরে এমনিতেই বাজ পড়ছে, রুমের মধ্যে বোম ব্লাস্ট হয়েছে। ইমরান কাকে কি বলবে বুঝতে পারছে না। ছেলেটা ও হয়েছে ফুফুর মতো। ইমরান স্তব্ধ এদের কথা শুনে। হঠাৎ ও খেয়াল করলো ওর প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে। কিন্তু হাসলে এই অবস্থায় বাকিরা বিব্রত হবে। তাই সে চোয়াল শক্ত করে নয়নকে জোরে ধমক দিলো,
‘ নয়ন, বেয়াদপের মত কথা বলছিস কেনো? টেবিলের বাচ্চারা আছে দেখিস না। ভুলে যাস না তোর এসব কথা শুনে ওরা ভালো কিছু শিখবে না। মুখ সামলে কথা বল।’
নয়ন অতি আশ্চর্যজনক কিছু দেখার মত চমকে গিয়ে বললো,
‘ কে বাচ্চা,কই বাচ্চা। ইতু ছাড়া তো এই বাড়িতে কোনো বাচ্চা নেই। ও আচ্ছা তুই কি কোনো ভাবে সোহান,ইশান আর মোনা ভাবীকে ইঙ্গিত করলি। সোহানকে বিয়ে করালে বাচ্চার বাপ হয়ে যেত এতক্ষনে, ইশান এর বয়স তো আঠারো। এই বয়সে মিনহাজ বিয়ে করে ফেলেছে। আর বাকি রইলো মোনা ভাবী। থাক আমি আর কিছু বললাম না। হয়তো বছর ঘুরতেই দেখবো মিনহাজ ভাইয়ের নানা হওয়ার সংবাদ আর বন্ধুর বাপ হওয়ার। তাহলে বাচ্চা কই এখানে।’
এই মুহুর্তে ইমরানের ইচ্ছে করছে চড় দিয়ে নয়নের মুখ ভোতা করে ফেলতে। সবাই যে খুব আনন্দ পেয়েছে এই কথায় এদের মুখ দেখেই স্পষ্ট বুঝতে পারছে ইমরান। মিটমিট করে হাসছে। নিজেকে সংযত করলো। মোনার দিকে তাকিয়ে ইমরান রাগ নিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো।
মোনা কেমন যেন হাসলো। ইমরান বুঝলো হাসিটা কষ্টের। এই কষ্ট মোনার প্রাপ্য। ভোগ করুক সেই শাস্তি। কথা না বাড়িয়ে উপরে রুমে এসে চেঞ্জ করে নিলো ইমরান। ইমরান শুনেছে প্রিয় মানুষের বুকে শান্তি। কাকনকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে বহুবার। কিন্তু কাকন নিজের দুনিয়ায় ব্যস্ত ছিলো। আজ যখন মোনা বুকে চেপে ধরলো ওর মনে হলো, যদি সুযোগ থাকতো মনের সব গ্লানি উজাড় করে চোখের পানিতে ভাসাতো বুক। কিন্তু তা সম্ভব নয়।কারণ ইমরান পুরুষ। এই কান্না কাউকে দেখানো যাবেনা। দূর্বল ভাববে লোকে।
বড় ডাইনিং টেবিলটার একদম সামনের রাজকীয় চেয়ারটা টেনে বসলো ইমরান। ওটা ওর জন্য বরাদ্দ থাকে। এখানে ইমরান ছাড়া কেউ বসে না। এতক্ষন সবাই অপেক্ষা করছিলো ইমরানের জন্য। আসতেই সবাই শুরু করলো। খেতে বসে মোনার প্লেটে খাবার দিয়ে নিজের জন্য বেড়ে নিলো। এই দৃশ্যটা আড়াল থেকেই সবাই দেখলো। সবার মনে সুখের অনুভূতি। নিজের প্লেটের মাটন টা মোনার প্লেটে উঠিয়ে দিলো। মোনা কাচ্চির মাটন খেতে পছন্দ করে তা ইমরান জানে। টেবিল জুড়ে সবাই গল্প করছে শুধু দুইটা মানুষ চুপ। মনের আনাগোনা বাকি, বোঝাপড়া বাকি,জীবনের গল্প বাকি,একসাথে হাঁটা বাকি। ইমরানের এত প্রিয় বিরিয়ানি ও আজ গলায় আটকে যাচ্ছে। মোনার দিকে তাকাতেই বুঝতে পারছে মেয়েটা ও খাচ্ছে না আজ। ইদানীং চোখ গুলো খুব তাড়াতাড়ি ভেসে উঠতে চায়। ঝোকের বসে একটা ছোট্ট পরীর দায়িত্ব নিয়ে বসলো। হয়তো আর ১০ কি ১৫ বছর বাঁচবে। কিন্তু মোনার তো পুরো জীবন পড়ে আছে। কেনো বিয়েটা করলো????
মোনা এর মধ্য বলে উঠলো,
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৮
‘বাবা কিছু কথা বলবো’
‘হ্যা বল আম্মা।’
‘ আমার জন্য চিন্তা করোনা।আর ফুফিকে কিছুই বলোনা কেমন???’
