Home তুমি আমার শেষবেলা তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৪

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৪

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৪
নীতি জাহি

সকালের মিষ্টি রোদ চোখের উপর পড়েছে। রুমের মধ্যে হালকা গরম অনুভূত হচ্ছে। মোনা চোখ পিট পিট করে খুলে বেডে হেলান দিয়ে বসলো। তাকিয়ে দেখে সোফায় বসে আছেন তার একান্তু ব্যক্তিগত স্বামী পেপার হাতে।
‘শুভ সকাল মোনালিসা’
‘শুভ সকাল’
পেপার থেকে চোখ ইমরান মোনার দিকে তাকালো। অধর কোণে হাসি। এলোমেলো মোনা বসে আছে। চুল গুলো সব উড়ছে, চোখে মুখে ঘুমো ঘুমো ভাব,অনেকটাই ফোলা ফোলা। ঘুম এখনো চোখ থেকে সরেনি। দু হাত দিয়ে চোখ কচলে আশপাশে তাকাচ্ছে। ইমরান মোনার ঘুমো ঘুমো গলা শুনেই কেমন মোহে পড়ে গিয়েছে। এই মেয়ে যদি একবার ইমরানের চোখের দিকে তাকায় এখন সর্বনাশ দেখবে। আশ পাশ তাকিয়ে কি খুঁজছে এই মেয়ে?

‘ইমরান সাহেব…’
‘জ্বি রানী সাহেবা…’
‘মজা করবেন না।’
‘আচ্ছা। কি বলবেন বলেন?’
আজব কাজ কারবার। এই মেয়ে ঠোঁট উল্টে গাল ফুলিয়ে রেখেছে। এখনই না কেঁদে দেয়? কি চাইছে? মোনা তৎক্ষনাৎ ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
‘ বুকে নেন,আমার কষ্ট হচ্ছে। ফুফিকে স্বপ্নে দেখেছি।’
ইমরান তড়াক করে সোফা থেকে উঠে গেলো। ছোট বাচ্চার মত আবদার। এ যেন আগের মোনা। আর বসে না থেকে ইমরান আসন ছাড়ে। মেয়েটা এত ভালোবাসে মায়াকে। যে ফুফি মা*র*তে চেয়েছিলো সেই ফুফিকে স্বপ্নে দেখে কাঁদছে। কি বলে স্বান্তনা দিবে? এই মেয়ে নিজেই বেশি বুঝে। মোনার পাশে বসে আগলে ধরলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে,

‘মোনালিসা যাও ফ্রেশ হও,কালকে ফুফি আসবে প্রোগ্রামে।কথা বলে নিও।’
‘সত্যি?’
‘হুম।’
‘যদি না আসে?’
‘ধরে নিয়ে আসবো আমার রানী সাহেবার জন্য।’
মোনা মনে হয় খুশিই হলো।কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো স্বর বের করলো না। ঠিক ওই মুহূর্তে ইশান রুমে ঢুকে গিয়েছে।
‘স্যরি, স্যরি স্যরি… আই এম এক্সট্রিমলি স্যরি।’
ইমরান কড়া চোখে ছেলের দিকে তাকালো।
‘ইশান দরজা খোলা ছিলো না। নব ঘুরিয়ে ঢুকেছো। নক করা উচিত ছিলো না?’
‘পাপা স্যরি।’
‘ইটস ওকে কাম হিয়ার’
মোনা লজ্জা পেয়ে উঠে ওয়াশরুমে গেলো। ইমরান ছেলেকে বসার ইশারা দিলো।
‘ কিছু বলবে?’
ইশান লজ্জা পেয়ে ইতস্তত বোধ করছে ইমরান স্পষ্ট বুঝতে পারছে। ছেলেকে স্বাভাবিক করতে বললো,

‘ ইশান ইট’স নরমাল,ডোন্ট বি শাই।’
‘ পাপা আমি মায়ের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। প্রতিদিন তো একসাথে নাস্তা করি।ঘুম থেকে উঠে মায়ের সাথেই আগে দেখা করি। আজ তোমার সাথে দেখা করতে গিয়ে বুঝলাম তুমি এখানে তাই চলে এলাম।’
মাথা নিচু করে প্রতিটি কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ছেলেটা বললো। ইমরান ছেলেকে দেখছে প্রাণ ভরে। এত ভদ্র নম্র হলো কি করে এই ছেলে।
‘প্রতিদিন মায়ের সাথে আগে করো,আজ বাবার সাথে করতে গেলে যে?’
‘তোমার জন্যই তো মাকে পেলাম, ভুলি কি করে?’
অধর প্রশস্ত হাসি ইমরানের। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ ডাইনিং এ খাবে নাকি এখানে নিয়ে আসতে বলবো, তিনজন একসাথে খাব?’
‘ডাইনিং এ চলো। এখানে নিয়ে আসতে ওদের আবার কষ্ট।’
মোনা ততক্ষনে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে মিষ্টি হাসি দিলো বাবা-ছেলেকে। ঘড়িতে সকাল ৮ টা। তিনজন একসাথে নাস্তার টেবিলে বসে গল্প করতে করতে নাস্তা করছে। টুক করে একটা সেলফি তুলে নিলো ইশান।

দুপুরের পর থেকে আত্নীয়তে বাড়ি ভরে গিয়েছে। ইমরানের চাচা, ফুফু,মামা,খালারা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে এসেছে। বাড়িটা আজ ভরা ভরা লাগছে।এক সময় ইমরানের মায়ের জন্য এই বাড়িতে আত্মীয় স্বজন দিয়ে ভর্তি থাকতো। তিনি অতিথি আপ্যায়ন পছন্দ করতেন। আজ তাই সবাই ইমরানের ডাকে ছুটে এসেছে।শুনেছে সবাই ইমরানের বিয়ের কথা। জেঠা,চাচাতো ভাই,জেঠাতো ভাইদের মধ্যে অনেকে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। একজন আছেন তিনি প্রোগ্রামের দিন আসবেন। ছোট চাচা এসেছে।তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন। ইমরান জেঠাতো ভাইয়ের ছেলেদের সাথে বসে আলাপ করছিলো। ফুফুরা,খালারা ও সোফায় বসে গল্প করছে। সামান্তা মোনাকে আনতে উপরে গিয়েছে অনেকক্ষন। ইশান গল্প করছে ওর সম বয়সী আত্নীয়দের সাথে। সামান্তা মোনাকে নিয়ে উপর থেকে নেমে আসছে। মোনা তাঁতের মেজেন্ডা এবং কালো একটা শাড়ি পরেছে। হাতে গলায় সোনার ছোঁয়া মাথায় ঘোমটা। মেইক আপ করেনি কিন্তু চোখে আইলাইনার, কাজল দিয়েছে। হালকা গোলাপী রঙিন ঠোঁট। সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে। ইমরান একবার তাকিয়ে সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে ফোনের দিকে চোখ দেয়। ওর এই চোখ ধাঁধানো রূপে একবারের বেশি তাকালে ঝলছে যাবে সব। এত আত্মীয়ের সামনে লজ্জা জনক কাজ হবে এভাবে তাকিয়ে থাকা। ইমরানের পরনে অফ হোয়াইট পাঞ্জাবী। চোখে রিমলেস চশমা,হাতে চামড়ার ঘড়ি, পাঞ্জাবীর হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। মোনা একবার তাকালো কিন্তু চোখ ফেরালো না। এই মধ্য বয়সী ইমরান শুধুই তার। ভাবতেই মনে সুখ লাগে। মোনা সামনে আসতেই কয়েকজন পুরুষ মহিলা দাঁড়িয়ে সালাম দিলো। এত বড় লোক গুলো দাঁড়িয়েই পড়লো। তাদের মধ্যে সুন্দরী মহিলা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে বললো,

‘কেমন আছেন বড় মা?’
মোনা এমন সম্বোধন এর জন্য পুরোপুরি অপ্রস্তুত ছিলো। মহিলার বয়স কম হলেও ৩৬ বা ৩৭ হবে। মোনা ইমরানের দিকে তাকাতেই ইমরান পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।
‘মোনালিসা ও হচ্ছে নওশিন। মাশফির ওয়াইফ। আমাদের বংশের বড় বৌমা। ‘
‘বৌমা!! ‘মোনা আস্তে করে একবার আওড়ালো।
‘চাচাজান আমি বুঝিয়ে বলছি বড় মাকে। আমি হচ্ছি আপনার শ্বশুরের বড় ভাই এর নাত বউ। বাবা,আর দাদা-জান তো দুনিয়াতে নেই। আমরা দেশের বাইরে ছিলাম এই বছরই দেশে স্যাটেল হলাম’
‘ আচ্ছা,আপনারা ভালো আছেন?’
‘এত সুন্দর একটা মিষ্টি মা পেলে ভালো না থেকে পারা যায়? চাচাজান এই পুতুল মা কে তো সাথে করে নিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে।’
‘নিয়ে যাও বৌমা।’

মোনা ড্যাব ড্যাব করে ইমরানের দিকে তাকিয়ে আছে। কত বড় বড় মহিলা – পুরুষ চাচা ডাকছে। ইমরান মোনার অবস্থা বুঝে মুচকি মুচকি হাসছে। ইশানের বয়সী একটা ছেলেকে ইশান সামনে এনে মোনাকে বলে,
‘ মা ওকে চেনো? জাহিন। মাশফি ভাইয়ার ছেলে। ‘
‘আমি আপনাকে কি ডাকবো? আম্মু উনাকে কি ডাকবো?’
ছেলেটা নওশীনের দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই পড়ে গিয়েছে মহা বিপদে। মোনাকে তো কোনো ভাবেই দাদী ডাকা যাবে না। মোনা সবার সামনে এবার মুখ খুললো,
‘ আর যাই ডাকো প্লিজ দাদী ডেকোনা?’
‘ বড় ভাবী ডাকি? দাদা ভাইদের ভাইয়া ডাকি।’
‘ প্লিজ ডাকো,ভাবী অনেক সুন্দর ডাক।’
‘ আজকে থেকে তুশি দাদী ও তাহলে ছোট ভাবীতে ট্রান্সফার হলো।’
সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। খালা শ্বাশুড়ি, ফুফু শ্বাশুড়ি সবাই মহা খুশি। কারণ মোনা কম বয়সী,ইমরানের যত্ন রাখবে তাই তারা খুশি। ইমরান সবার আদরের, অল্প বয়সে একাকিত্বকে সঙ্গী করা মানুষটা বিয়ে করেছে এতেই সবাই আকাশের চাঁদ পেয়েছে। খালা শ্বাশুড়ি মোনাকে এক সেট গয়না উপহার দিয়ে সবার সামনে অদ্ভুত এক দোয়া করে বসে। ফুফু শ্বাশুড়ি আর খালা শ্বাশুড়ি ঘিরে ধরেছে,

‘ বৌমা আমাদের ইমনটা অনেক বছর একা ছিলো,এখন তুমি সামলাও, ঘর সংসার টা গুছাও।’
‘জ্বি খালা।’
‘সংসারের অনেক দায়িত্ব বুঝলে,গুছিয়ে রাখতে পারবে?’
‘জ্বি ফুফু।’
‘কিরে ইমন তোর বউ তো জ্বি খালা,হু খালা,ঠিক আছে ফুফু ছাড়া কিছু বলে না। শুনো মেয়ে শুধু বললে হবে না। করে দেখাইতে হবে।’
‘আচ্ছা খালা।’
‘আবার…
এবার সবাই হেসে উঠলো। খালা আর ফুফু মজার ছলে মোনাকে বলে,
‘আচ্ছা কি বুঝছো বলো তো?’
‘এই তো আপনারা যা বলেছেন,সংসার গুছাতে।’
‘এইত্ত ভালো মেয়ে,সংসার গুছায় কিভাবে জানো তুমি।’
‘রান্না-বান্না ইশান, পড়াশোনা,খাবার দাবার,ঘর গুছানো ‘… মোনা আটকে গিয়েছে আর বলতে পারছেনা। সে তো আর আগে সংসার করেনি।জানবে কি করে?’

‘এগুলা কেন করোন লাগবো,ঘরে কি কামের লোকের অভাব আছে। শুনো মেয়ে একটা ছেলে আছে বড়,ইশানটারে সঠিক পথ দেখাবে। তুমি শিক্ষিত মেয়ে।সব কিছু ভালো বুঝো আমাদের থেকে। গুরুত্বপূর্ণ কথা হইলো একটা ছেলে দিয়ে হবে না। সংসার ভরা ছেলে মেয়ে থাকবে। বুড়ো বয়সে কই যাবা। ইশান কই না কই থাকে। এই বংশের পোলারা তো বিদেশ যাওনের ধাৎ আছে বাপ মা ছাইড়া। মেয়েরা হলো ঘরের প্রদীপ। আমাদের নাতনী লাগবে। ইশান তো আছে এবার আমাদেরকে নাতনী দেও। বছর যাওয়ার আগে যেন সুসংবাদ শুনি।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে…. এহহ কি??’

মোনা অবুঝের মতো কথার তালে আচ্ছা ঠিক আছে বলে আবার নিজেকে শুধরাতে গিয়ে ভাবে কি বলে ফেললো। এত বড় কথা। বিয়ে হলো না এক মাস। লজ্জায় আর মাথাই তুলতে পারলো না।
‘হ্যাঁ মা আমার ও বোন চাই।’ ইশান কোথা থেকে এসে হঠাৎ তাল মেলালো।
ইমরান,মাশফি, নকিব চায়ে মাত্র চুমুক দিয়েছে আর এদের কথা শুনছিলো। ছেলে এবং ফুফুর কথা শুনে আচমকা মুখ থেকে চা ফেলে দিলো ইমরান। নাকে মুখে বিষম খেলো। আইরিন দৌড়ে এসে ভাইয়ের পিঠে,মাথায় হালকা থাপ্পড় দিচ্ছে আস্তে আস্তে। পানি এগিয়ে দিলো নকিব। ওরা নিশ্চিত বুঝতে পারছে চাচার বিষম খাওয়ার কারণ। ইমরান পানি গিলে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে এক পলক মোনার দিকে তাকিয়ে দেখে মেয়েটা আজ লজ্জায় লালা,নীল,বেগুনী সব রঙ ধারণ করেছে। শুধু কেঁদে দেয়া বাদ রেখেছে। ইমরান কারো দিকে না তাকিয়ে তুশিকে বললো,

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৩

‘ তুশি তোমার ভাবীকে রুমে দিয়ে আসো। আমি একটু বের হচ্ছি। হল এর কি অবস্থা দেখে আসি।’
হন হন করে বের হয়ে গেলো। উপস্থিত সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। মোনা মনে মনে কিছুক্ষন বকলো ইমরানকে,এই পরিস্থিতিতে ফেলে চলে যাওয়ার জন্য। কথাই বলব না এই লোকের সাথে।

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৫