তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৯
রিমঝিম বৃষ্টি
” বলছিলাম বিয়ে করছে ভালো কথা বাপের বাড়ি থেকে কি নিয়ে আইসে আগে সেইটা দেখাও..?”
জাহানারা চুপটি করে রইলো পাশে থাকা তুবা কেবল মাথা নিচু করে মুখটা ছোট করে রইলো। জিসানের একটাই ফুপি জিসানের বিয়ের খবর পেয়ে এসেছে বউকে দেখতে। জাহানারা তাকে বোঝানোর জন্য বললো,
” আপা বিয়ে টা তো হুট করে হয়েছে শুনলেনই তো আর তাছাড়া আমি কেনো তার বাপের বাড়ি থেকে নিবো আমার ছেলের কি কম আছে যে বউকে বাপের বাড়ি থেকে আনতে হবে..! ”
ফাউজিয়া শিকদার মুখ বাকিয়ে বললো,
” উমম এত উদার ভালো না। তা এই যে মেয়ে রান্না বাড়ি পারো তো নাকি যাও দেখি এক কাপ চা করে নিয়ে আসো তো আমার জন্য..?”
তুবা এবার মুখ খুললো আস্তে করে বললো,
” জি পারি এখুনি করে আনছি..!”,
বলেই উঠে চলে গেলো। তুবাকে যেতে দেখে উনি আস্তে করে বললো,
” শোনো একদম টাইট দিয়ে রাখবা বউকে যেনো আগ বাড়িয়ে কথা বলতে না পারে। এখনকার এইরকম বয়সী মেয়েরা শশুর বাড়িতে গেলে শুধু পায়ের পর পা রেখে আয়েশ করতে চায়, শাশুড়ির দেখভাল করতে চায় না তাই আগেই একটু টাইট দিবা..!”
” এ মেয়ে সেরকম নয় আপা দু’দিনেই তা টের পেয়েছি তাই টাইট দেওয়ার দরকার নেই..! ”
কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তুবাকে আসতে দেখেই দু’জনেই চুপ হয়ে গেলো। দুই কাপ এগিয়ে এনে এক কাপ শাশুড়ী কে দিলো আর আরেক কাপ তাকে দিলো। ফাউজিয়া হাত বাড়িয়ে চা টা নিতে গেলেই তুবার হাত খেয়াল করে কিছুটা অবাক হয়ে বললো,
” ওমা দেখো কান্ড নতুন বউয়ের হাতে সামান্য স্বর্ণের বালা অব্দিও নেই তা ভাবী কোন ঘরের মেয়ে টেনে আনছেন যে এসবও জোটে নাই সামান্য । ভাইয়ের কথা কি বলবো এত দামী দামী ঘরের সমন্ধ এনে দিতাম পছন্দ হলো না শেষমেশ ছেলে কি টেনে আনলো এসব.?”
তুবা সেখানেই দাঁড়িয়ে এক নজর শাশুড়ীর পানে তাকালো টলমলে চোখে তা দেখে শাশুড়ী চোখের ঈশারায় চুপ করে থাকতে বললো। জাহানার কিছু বলার আগেই পেছন থেকে ভেসে এলো নজরুলের গলা।
” ফজু শোন! তুই আর যাই করিস আমার বাড়িতে এসে আমার মেয়েকে অপমান করবি না। কীসের স্বর্ণের কথা বলছিস আমি চাইলেই আমার ছেলের বউকে সোনায় মুড়িয়ে দিতে পারি এখনি কিন্তু আমার মেয়েই নেয় নি কাল রাতে কত সেধেছিলাম তোর ভাবীকেই জিজ্ঞেস করে দেখ।”
শশুরের কথায় তুবা মাথা উঁচু করে এক নজর সিঁড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো তার পিছে পিছে জিসান নেমে আসছে হসপিটাল থেকে কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে। জিসানকে নামতে দেখে জাহানারা তুবাকে বললো,
” তুবা যাও তো জিসানকে খাবার দাও আগে, বাইরে থেকে আসছে খাটাখাটুনি করে যাও গিয়ে দেখো..!”
তুবা তা শুনে সেখান থেকে সরে গেলো ডাইনিং রুমের দিকে পা বাড়াতেই জিসানের গলার আওয়াজ শুনতে পেলো। জিসান তার ফুপুর সামনেই বসতে বসতে বললো,
” ফুপি আমার বউয়ের জন্য কি নিয়ে এসেছো শোনো সোনা না দিলে কিন্তু তোমার থেকে কিছুই নিবো না..!”
জিসানের কথা শুনে ফাউজিয়া চোখ দুটো পিটপিট করে বললো,
” আর বলিস না তাড়াহুড়ো তে এসেছি নিয়ে আসতে ভুলে গেছি পরেরবার পাঠিয়ে দিবো নে..! ”
” এটা কেমন কথা ফুপি লোকে শুনলে বলবে ফুপি শাশুড়ী কিছুই দেয় নি বউকে। আচ্ছা সমস্যা নেই, আমার শশুর বাড়ির লোক আবার খুব ভালো মনের থাক দিতে হবে না তারা কিছু মনে করবে না..!”
ফাউজিয়া বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো,
” বাহ্! বাহ্! এ তো দেখছি আগেই পটিয়ে রেখেছে শশুর বাড়ির লোক ভালোই কিন্তু আবার দেখিস সব ওখানেই বিলিয়ে না দিয়ে আছিস মা কষ্ট করে পড়ালেখা করাইছে, মানুষ করছে তাদেরও দেখিস..!”
” আমার ছেলে না দেখলেও চলবে ফজু, আমার নিজেরও কোনোকিছু তে অভাব নেই..! ”
ভাইয়ের কথায় ফাউজিয়া আর কথা বললো না। জিসান উঠে গিয়ে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসতেই তুবা খাবার বাড়তে শুরু করলো। জিসান এক নজর গম্ভীর দৃষ্টিতে তুবার মুখ অবলোপন করে বললো,
” খেয়েছিস তুই..? ”
” হুম..!”
” আঙ্কেল এর সাথে কথা বলেছিস এখন কেমন অবস্থা..? ”
তুবা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললো,
” আগের চেয়ে ভালো এখন..?”
জিসান খাবার খেতে খেতে বললো,
” মা যে তোকে বালা জোড়া দিলো সকালে পড়িস নি কেনো..?”
” এমনি..!”
জিসান পাশ ফিরে তুবার দিকে ঘুরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
” শোন এমনি বললেই সব সমাধান হয়ে যায় না। তুই এখন এ বাড়ির নতুন বউ যেহেতু তাই এ বাড়িতে কিছুদিন এ-ও আসতেই থাকবে আর তারা এসে যদি দেখে তোর হাতে সামান্য বালাটুকু নেই। তাতে তোর বাপের বাড়ির বদনাম না হলেও আমাদের বদনাম হবে যে শাশুড়ীই বা কেমন সামান্য বালাটুকু দিতে পারে নি.!”
তুবা কথা বললো না। জিসানের খাওয়া হতেই সে রুমের জন্য বাইরে যেতে যেতে বললো,
” রুমে আয় জলদি..?”
” এগুলো পরিষ্কার করে তারপর আসবো..?”
জিসান সেখানেই থেমে পড়লো ফের পিছন ঘুরে তুবার দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললো,
” শোন তোকে এসব করতে কে বলেছে এগুলোর জন্য লোক আছে তুই নিজের মতো করে চল..?”
তুবা হাতে থাকা সব এঁটো জিনিস টেবিলের ওপর রেখে জিসানের মুখপানে তাকিয়ে নিচু গলায় বললো,
” তাহলে আমি করবো তা কী? কেউ দেখলে বলবে বউ কোনো কাজই করে না..? ”
” আর পাঁচটা মেয়েরা যেমন তার বাড়িতে থাকে, শুইয়ে, বসে, টিভি দেখে, ফোন দেখে তুইও তাই করবি। একটু সময় পেলে আমার মায়ের সাথে, বাবার সাথে আড্ডা দিবি তারা এতে খুশি হবে সাথে তোর সময়ও যাবে। লোকে কী বলবে তা শুনে আমাদের পেট ভরবে না যে যেসবের জন্য বসে থাকবো ওগুলো রেখে রুমে আয় দ্রুত..!”,
বলেই আর দাঁড়ালো না চলে গেলো। তুবা সেদিকে তাকিয়ে রইলো তার মনে মনে একটা কথায় জাগলো হয় শুধু যে, সবকিছু পেলেও দিন শেষে শান্তি যেখানে তাই তার কপালে নেই। থালাবাসনগুলো রেখেই হাত মুছতে মুছতে ওপরে চলে গেলো। রুমে যেতেই দেখলো জিসান সোফায় বসে বসে ফোন ক্রল করছে। তুবা বেডের দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রায় কয়েক টা শপিং ব্যাগ।
” ওগুলোতে কিছু শাড়ি আর থ্রিপিস আছে দেখ পছন্দ হয়েছে কী না..?”
” পছন্দ অপছন্দ দেখে আর লাভ কী যা এনেছিস এতেই হবে..!”
ব্যাগগুলোতে কী আছে দেখার প্রয়োজন মনে করলো না সবগুলো নিয়ে আলমারিতে রেখেই বেডের ওপর চুপটি করে বসলো।
” আচ্ছা তুই রাত জেগে ল্যাপটপে কাজ করিস, বেডের ওপর তুই থাকলেই তো পারিস নাকি ভয় পাচ্ছিস যদি আমি কাছে যায় তাই..?”
জিসান হালকা হেসে উঠলো ফোন টা অফ করে পাশে রাখতে রাখতে বললো,
” এসবে ভয় পায় না আমি। ফারিশার বাসার দারোয়ান ফোন দিয়েছিলো সন্ধ্যায়..!”
” কেনো কি হয়েছে..?”
” বললো ওরা ওর হাসবেন্ড এর বাসায় চলে গেছে নিচতলায় নাকি আগুন লেগে মারা গেছে মালিকের মেয়ে কাল গিয়ে তোর জিনিসপত্রগুলো নিতে আসতে বলেছে.!”
তুবা কিছুটা হতাশ হয়ে বললো,
” ওরা ঠিক আছে তো..?”
” ইয়াশের একটু লেগেছে হাতে তবে ঠিক আছে.! ”
তুবা আর কিছু বললো না। জিসান বসা থেকে উঠে এগিয়ে গিয়ে আলমারি থেকে বক্স টা বের করে বিছানার তুবার থেকে একটু দূরত্বে গিয়ে এক সাইডে বসলো বক্স থেকে বালা জোড়া বের করতেই তুবা সেদিকে তাকিয়ে বললো,
” জিসান দিস না আমি পড়বো না..!”
” কেনো পড়বি না তুই.?”
তুবা জিসানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললো,
” এই জিনিসের কদর করে কি করবো যদি অধিকারই না থাকে সেই জায়গার..?”
জিসান এর প্রতিত্তোরে কিছু বললো না বালা টা হাতে নিয়ে আরেক হাতে তুবার বা হাত টা নিজেই টেনে পড়াতে পড়াতে বললো,
” হেরে যাবি এতো তাড়াতাড়ি যা তোর হাতের ভেতর তা নিজের অধিকার হিসেবে বুঝে নিতে শেখ..!”
” বলছিস তুই অধিকার বুঝে নিতে..! যেই অধিকার বুঝে নেওয়ার কথা ছিলো তা এখন হাতের বাইরে…?”
জিসান সেই প্রসঙ্গ পাল্টে তুবার হাত টা টেনে সামনে ধরে বললো,
” বাহ্ হাতে একদম ফিট হয়েছে তোর.! ”
তুবা জিসানের দিকে তাকিয়ে শুধু হাসলো। জিসান খালি বক্স টা নিয়ে উঠে গেলো আর বললো,
” হাতের বাইরের জিনিস ধরতে নেই যদি তোর কপালে থাকে তা আপনাআপনিই হাতের নাগালে আসবে..!”
তুবা হাতের বালার দিকে তাকিয়ে রইলো শুধু বালাটা একদম চকচক করছে জিসানের মা আগেই বানিয়ে রেখেছিলো তার ছেলের বউয়ের জন্য। আজ সকালেই তাকেই একটা বাক্স দিয়ে গেছে যাতে স্বর্ণের এক জোড়া দুল, বালা আর নোসপিন ছিলো তার শাশুড়ী বারবার করে বলেছিলো বালা টা যেনো হাতে পড়ে মনে করে কিন্তু তুবা তা করেনি। কেনো যেনো তার মন টানলো না সম্পর্কের কথা ভেবে যেখানে নেই কোনো রঙ সেখানে সেজে আর কীসের ঢং। তবুও এবার তার মনে একটুআধটু খারাপ লাগলো শাশুড়ীর কথা ভেবে, যে এভাবে জিসানের ফুপুর কথা শুনতে হলো তাকে।
” কাল তোর জিনিসপত্র গুলো এনে ক্যাফেতে যাবো অনেকদিন যাওয়া হয় না জাহিদ একা সামলাচ্ছে..! ”
” আমি আর জাহিদ আছি তো তোকে আসতে হবে না , তোর ডিউটি নেই..!”
সোফায় বসে ল্যাপটপ টা কাছে নিয়ে বললো,
” কাল দিনের বেলায় তেমন ডিউটি নেই রাতে আসে তাই সমস্যা নেই আমি যাবো..! ”
চৌধুরী প্যালেস————-
রাতে আজ সবাই বেশ আড্ডা দিয়েছে খাবার টেবিলে। এই সপ্তাহের শেষেই সাদিক আসছে সামনেই বোধহয় বাড়িতে বিয়ের আমেজ লাগবে। ফারিশা নামাজ পড়ে একটু নিচে গেছে সুমানার ডাকে আর ইয়াশ ইভানের সাথে একুরিয়াম দেখতে গেছে । ইরাদ নামাজ পড়তে বসেছে প্রায় শেষের দিকেই সালাম ফেরাতেই কারোর আওয়াজ পেলো ঘরে ঢোকার। পিছন ফিরতেই দেখলো ইয়াশ আসছে। ইয়াশ ইরাদকে নামাজ পড়তে দেখে এগিয়ে এসে একদম জায়নামাজের সামনে গিয়ে বসে পড়লো আর আবদার করে বললো,
” আমিও আল্লাহ পলবো বাবা..!”
ইরাদ ইয়াশের দিকে হাত বাড়িয়ে জড়ালো কন্ঠে বললো,
” এদিকে আসো আমার কোলে বসো..!”
ইয়াশ চুপটি করে ভালো ছেলের মতো ইরাদের কোলে গিয়ে বসতেই বাবার মুখপানে মাথা উঁচু তাকালো এক পলক। বাবার টলমলে চোখের দিকে তাকালো কয়েক সেকেন্ড।
” বাবা তুমিও কাঁদচো! জানো আমাল আম্মুও আল্লাহ পড়াল সময় কাদঁতো সবসময় । আমার আম্মুল খুব কষ্ত বাবা! ”
ছেলের কথায় ইরাদের গাল বেয়ে পানি পড়লো আরও কয়েক ফোঁটা। সে আসলেই পাপ করেছে তার তো আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এত গুলো বছর তাদের কষ্ট দিয়েছে। সংসার জীবনে তো কথা কাটাকাটি লাগবেই কিন্তু অল্পতেই যদি নিরাশ হয়ে হাল ছাড়ি তাহলে কেমন পুরুষ হলো সে। ইরাদ মোনাজাত ধরতেই ইয়াশও তার হাতের ওপর হাত রাখলো যা সে তার মায়ের সাথেও করতো। ইয়াশ মাথা উঁচু করে দেখলো ইরাদ বিড়বিড়িয়ে কিছু পড়ছে চোখ দুটো বন্ধ করে তা দেখে ইয়াশও ছোট্ট করে বলতে লাগলো,
” আল্লাহ আমাল আম্মুল কষ্ত দূল করো আর বাবাল কষ্ত দূল করো। আল সবাইকে সুস্ত রাখো..!”
মোনাজাত শেষ করতেই ইরাদ ছেলের দু’হাতে চুমু খেয়ে ভেজা গলায় বললো,
” মায়ের কষ্ট সব দূর হবে বাবা তুমি দোয়া করো যেনো তোমার বাবা তাই করে..! ”
ফারিশা এগিয়ে এসে ইরাদের পিঠে হাত রাখতেই ইরাদ চোখ মুছে পাশ ফিরে ফারিশার দিকে তাকিয়ে বললো,
” ফারিশা আজ কেনো জানি নামাজ পড়তেও ভাল্লাগছে আমার দেহখানা ভীষণ শীতল আজ। আল্লাহর দরবারে আমার আর কিছু চাওয়ার নেই শুধু এতটুকুই চায় আমার পরিবারের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক..!”
ফারিশা মৃদু হেসে বললো,
” আল্লাহর পথে চলুন দেখবেন উনি নিরাশ করবে না উনি উত্তম পরিকল্পনাকারী। আমার মনে যদি সকল চাওয়া সৎ আর ভালো হয় তো আল্লাহ ঠিক সময় হলে পৌঁছে দিবে আপনার কাছে.!”
ইরাদ ইয়াশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইলো শুধু। ফারিশা ফ্লোরেই স্বামীর পাশে বসে নিচু গলায় বললো,
” আমরা এসেছি এখনি যে দীদা জানে কী..?”
” জানতো কাল আসবে হয়তো এজন্যই মেডিসিন সকাল সকাল নিয়েছে নয়তো আমরা আসবো জানলে এত তাড়াতাড়ি সে ঘুমোতো না..!”
ফারিশা চোখ নামিয়ে নিচে তাকিয়ে রইলো। ইরাদ ছেলেকে নিয়ে উঠতে উঠতে বললো,
” চলো তো আমরা এখন ঘুমোবো?”,
ছেলেকে নিয়ে বেডের ওপর শুইয়ে পড়তেই ফারিশা লাইট অফ করে বেডের কর্ণার সাইডে শুইয়ে পড়লে ইরাদ ইয়াশকে পাশে শুইয়ে বললো,
” আমার বউ দূরে পোলা মাঝে। পোলাডারে একটু মাথার ওপর রাখতে পারলে ভালো হতো তাহলে বউকে কাছে নিতে পারতাম..!”
ইয়াশ চোখ দুটো গোল গোল করে বললো,
” বাবা বউউ কোতায়…!”
” বড় হও বুঝিয়ে দিবো এখন ঘুমাও তুমি বাবা..!”
ইয়াশের কথা শুনে ইরাদ হেসে উঠলো ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বাঁকা হয়ে শুইয়ে আরেক হাত দিয়ে ফারিশাকে টেনে নিজের কাছে এগিয়ে এনে বললো,
” নাও এবার ঘুমাও দু’জনেই..! ”
ফারিশা কথা বললো না কেনো যেনো আজ তার শান্তি লাগছে স্বামীকে পাশে থাকতে পেরে কিন্তু মনে মনে ভীষণ ভয় জাগছে ততটায় তার এই নিয়েও যে এত তাড়াতাড়ি তার দীদা রাজি হলো কেনো তাই ভেবে।
” সাবাহ্ দরজা খোল সরি আমি বলতে চায় নি ইভান নিজেই বুঝে গেছে। খাবারটা খেয়ে নে এবার..!”
তমা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যার পর থেকে রুমের দরজা আটকানো। যেই মেয়ে একবেলা না খেলে খিদের ঠেলায় বমি আসে সে সন্ধ্যা থেকে খাওয়া তো দূর রুম থেকেই বের হয় নি আজ । ইভান নিশ্চয় ভালোমতো ঝারি দিয়েছে তা ভাবতেই তমার দুঃখ হলো নিজেকে এতটা বোকা ভেবে। তমা এক হাতে খাবার প্লেট টা নিয়ে ফের ডেকে বসলো দরজায় টোকা দিয়ে,
” সাবাহ্ দেখ বিরিয়ানি আনছি এবার তো দরজা খোল..!”
তবুও আওয়াজ এলো না পাশ থেকে ইভানকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখে তমা ডাক ছাড়লো।
” ইভান এদিকে আয়..?”
ইভান তমার ডাকে এগিয়ে আসতেই তমা তার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে বললো,
” ভাই তুই কী আজ মদ খেয়ে এসেছিস নাকি নেশা। চুলের এ হাল কেনো এত রাতে কোথায় গেছিলি তুই.? ”
ইভান চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে বললো,
” দরকারি কাজে গেছিলাম কিছু কেনো ডেকেছো বলো রুমে যাবো..?”
” সাবাহ্ কে কী পরিমাণ বকেছিস বল তো দেখ সন্ধ্যার পর থেকে রুম থেকেই বের হয় নি এখন তুই খাওয়া ওকে নয়তো তোর কান মলে দিবো কিন্তু..? ”
ইভান সাবাহ্’র দরজায় টোকা দিয়ে কিছু টা গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” সাবাহ্ চুপচাপ দরজা খুলে খেয়ে নে নয়তো পিঠের পর দু’ঘা বসিয়ে দিবো বলে দিলাম..! ”
তমা কোমরে হাত ফের বকা দিলো,
” তুই আদর করে ডাকছিস নাকি ঝারি দিচ্ছিস আশ্চর্য..? ”
ইভান ফের কিন্তু বলতে যাবে তার আগেই ভেতর থেকে আওয়াজ এলো,
” আপু চলে যাও আমার খিদে নেই..? ”
তমা বোনের গলা পেয়ে তাড়াহুড়ো করে বললো,
” আরে বিরিয়ানি এনেছি খেয়ে নে বোন.!”
” আমি সন্ধ্যায় চিপস্ খেয়েছি অনেক পেট ভরে গেছে আমার, তুমি চলে যাও.! ”
তমা এবার বিরক্ত হলো রাগী গলায় বললো,
” সেটা না হয় বুঝলাম দরজা খুলতে কি প্রবলেম তোর.?”
ইভান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দু’জনের কথা শুনছে। সাবাহ্ এবার আর উত্তর দিলো না কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো,
” আসতে হবে না চলে যাও তো এখান থেকে..! ”
” তুই যা ইচ্ছা কর আমি চলে গেলাম ভাত তোকে খেতে হবে না..!”,
বলেই চলে গেলো প্লেটা টা নিয়ে তা দেখে ইভানও আর দাঁড়ালো না সাবাহ্’র রুমের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো হনহনিয়ে।
সকাল সকাল ফারিশা ঘুম ভাঙতেই দেখলে ঘড়িতে বাজে সবে সাতটা। নতুন জায়গায় আসার কারণে ভোরপ উঠতে পারে নি আজ। পাশ ফিরতেই দেখলো তার ছেলে আর ইরাদ নেই। ফারিশা দ্রুত উঠে পড়লো। ফ্রেশ হয়ে রুমে আসতেই কারোর গলার আওয়াজ পেলো। মাথায় ওড়নাটা সুন্দর করে পেঁচিয়ে বেলকনিতে যেতেই দেখতে পেলো বাড়ির মাঠে ইরাদ, ইয়াশ, আর ইভান বল খেলছে। ইরাদ বেলকনি থেকে ফারিশা কে দেখে ইয়াশকে নিয়ে ফারিশাকে দেখাতেই ইয়াশ লাফিয়ে উঠলো,
” আম্মু খেলচি আচো তুমি..?”
ফারিশা মুচকি হেসে উঠলো আর বললো,
” তুমি খেলো পড়ে যেওনা ঠিক আছে..! ”
ফারিশার ফোনে কারোর ফোন আসতেই ফারিশা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কারোর গলা ভেসে এলো,
” হ্যালো আপনি কী ফারিশা..! ”
” জি আপনি কে..?”
ওপাশে থাকা ব্যক্তিটির মুখে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি। কম্পিত কন্ঠে বললো,
” ফারিশা তুই আমাকে চিনতে পেরেছিস আমার তোর মামাতো ভা…..
বাকি কথা বলার আগেই ফারিশা গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” সরি আপনি ভুল নাম্বারের ফোন দিয়েছেন। আমার কোনো মামা নেই। “,
বলেই ফারিশা ফোন কেটে দিলো। তার ভেতর টা ধক করে উঠলো এতদিন বাদেও তার মনে পড়লো সেদিনের কথা। সেই ছেলে যে তার জন্য ছোট থেকেই পাগল হতো। এতগুলো বছর তাকে সেই জন্যই আলাদা করেছিলো তার মামা-মামী কিন্তু এখনো সে তাকে ভুলেনি। সে খুব ভালো করেই জানে তার মামা মামি তার বিয়ের খবর কখনোই জানাই নি তার ছেলেকে। এরওপরও যদি হুট করে জেনে যায় তার বিয়ের খবর তাহলে কেমন রিয়েক্ট করবে কে জানে তা। আর কিছু ভাবলো না। সোজা নিচে যেতেই দেখতে পেলো আয়েশা চৌধুরী কে। ফারিশা এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে বললো,
” আসসালামু আলাইকুম দীদা..! ”
” ওয়ালাইকুম আসলাম তা আইছো নাকি কাল রাতেই। যাও তো একটু আদা চা করে নিয়ে আসো..!”
ফারিশা তা শোনামাত্রই সোজা কিচেনে চলে গেলো। চা বানাতে বানাতে দেখা হলো শাশুড়ির সাথে। ইভা ফারিশাকে দেখে বললো,
” এ কি তুমি এসেই রান্না ঘরে ঢুকেছো শিউলি তো ছিলো ওকে বলতে চা খাবে..?”
” মা এটা দীদার জন্য..! ”
ইভা ভেতর থেকে সকালের নাস্তাগুলো হাতে নিয়ে বাইরে যেতে যেতে বললো,
” আচ্ছা দিয়ে এসো..! ”
ফারিশা চা টা নিয়ে আয়েশার হাতে দিয়ে বললো,
” এই নিন দীদা..! ”
আয়েশা চা টা হাতে নিতেই ওপর থেকে দুই ভাই নেমে এলো ইমদাদুল আর তারেক। ইমদাদুল মায়ের পাশে বসে বললো,
” তা আজ সব কই দেখছি না যে..?”
” এই তো চলে এসেছি আমরা..!”
ইভান ইয়াশকে কাঁধে বসিয়ে ভেতরে ঢুকে সোজা ফ্লোরে ইয়াশকে নামিয়ে দিলো। ইরাদ ভেতরে আসতেই তারেক হাসতে হাসতে বললো,
” তোরা এত সকাল সকাল খেলতে গেছিস দেখ তো মাটি লাগিয়ে কি করেছিস ইয়াশকেও নোংরা বানিয়েছিস..!”
” দাদু মজা খেলেচি..! ”
ইয়াশের কথা শুনে তারেক গাল ফুলিয়ে বললো,
” আমায় তো নিলে না আমি রাগ করেছি তোমার ওপর..?”
ইয়াশ এগিয়ে এসে তারেক এর হাটু ধরে বললো,
” আচ্ছা সরি তোমায় আমি আবাল খেললে নিবো তখন..!”
তারেক ইয়াশের মুখে চুমু খেয়ে বললো,
” না বাবা আগে তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো আমরা খেয়ে নেয়..?”
ইরাদ ইয়াশকে নিয়ে ফ্রেশ হতে গেলো ইভানও নিজের রুমে গেলো ফ্রেশ হতে। কয়েক মিনিট বাদে ফারিশা তার শাশুড়ির সাথে খাবার গুলো টেবিলে এগোতেই ইরাদ নেমে এলো ছেলের সাথে করে । ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে ফারিশার হাতের থেকে সিদ্ধ ডিমটা নিয়ে মুখে নিয়ে এক কামড় দিতে দিতে বললো,
” এসেই কাজে লেগে পড়েছো..?”
” কেনো রে তোর মতো ছুটে বেড়াবে নাকি..? ”
সুমানার কথায় শুনে শিউলিও হেসে উঠলো মুখ চেপে। ইরাদ সূক্ষ্ম হেসে বললো,
” তা নাই বা করলো কিন্তু দু’তিন দিন তো অতিথির মতো অ্যাপায়ণ করবে আমার বউটাকে..!”
” ইয়াশ কোথায়..?”
ফারিশার কথা শুনে পিছনে তাকাতেই দেখলো হাওয়া সে গেলো কয়। এগিয়ে গেলো বসার রুমে সেখানে তারেক, তার বাবা আর দীদা গল্প করছে। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বললো,
” বাবা ইয়াশকে দেখেছো.?”
” কয় না তো তোর সাথেই তো ভেতরে গেলো..?”
ইরাদ ইভানকে ডাকলো ওপর থেকে ইভান রুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে এসো বললো,
” কী হয়েছে ভাইয়া..!”
” দেখতো ইয়াশ গেছে নাকি ওপরে..?”
ইরাদের গলা পেয়ে ফারিশাও ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে এলো আর বললো,
তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৮
” এত বড় বাড়ি দেখো কোথাই গিয়ে লুকিয়ে আছে? কোথাও আবার অকাম করে না বসে..! ”
ফারিশা আশেপাশের রুমে গিয়ে খুঁজতে গেলো সাথে ইরাদও বাইরে চলে গেলো। দেখতে দেখতে ছেলেটা গেলো কোথায় কে জানে তা। বাসার ভেতরে জায়গায় জায়গায় ভারী ভারী সব জিনিসপত্র যদি কোথাও লেগেই যায় তখন তা ভেবেই দ্রুত খুঁজতে ছুটলো সে।
