Home তুমি এলে বসন্ত নামে তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৮

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৮

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৮
রিমঝিম বৃষ্টি

” আম্মু আচো তুমি ভয় কলছে..?”
ইয়াশের কথায় ফারিশা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
” ওই যে তোমার চাচ্চু বসে আছে চাচ্চুর কোলে গিয়ে বসো আমি তোমার ব্যাগ আনছি..!”
ইয়াশ পাশ ফিরে ইভানের দিকে তাকাতেই ইভান গাড়ির পিছনের তাক থেকে একটা চকলেট বক্স এগিয়ে দিয়ে বললো,
” আসেন তো বাবা আমরা চকলেট খাই এটা কিন্তু অনেক মজার খেতে..!”
ইয়াশ চকলেট দেখে কিছুটা শান্ত হয়ে চুপটি করে ইভানের উরুর ওপরে গিয়ে বসলো ইভান মুচকি হেসে উঠলো তা দেখে । ফারিশা আর ইরাদ ব্যাগগুলো নিয়ে বাকি জিনিসপত্র ফ্ল্যাটেই রেখে দারোয়ান কে বলে গাড়িতে উঠে পড়লো দু’জনই সামনে। পিছন ফিরে ইয়াশ কে চুপ করে থাকতে দেখে মৃদু হেসে সামনে বাড়ির দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে দেখলো একবার ফারিশা কত বছর হলো এ বাড়িতে ছিলো আজ ছাড়তে হচ্ছে তাকে। গাড়ি স্টার্ট দিতেই ইয়াশ চকলেট ছেড়ে সামনে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

” আম্মু আমলা কোতায় যাচ্চি ঘুমাবো না..? ”
ফারিশা পিছন ঘুরে বললো,
” বাবা আমরা তোমার মিলাদের বাসায় যাচ্ছি আজ থেকে ওখানেই থাকবো..!”
ইয়াশ উত্তর দিলো না আর, গাড়ি চলতে শুরু করতেই ইয়াশ পিছন ঘুরে সীটের ওপর পা ভেঙে বসে কাচের ওপর হাত ভর দিয়ে সামনে বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলো কেমন মায়াবী দৃষ্টিতে। ইয়াশের যবে থেকে বুজবার বয়স হয়েছিলো তবে থেকেই তার বেড়ে উঠা এখানে, কেমন যেনো স্থির হয়ে তাকিয়ে দেখলো। একটা নিষ্পাপ শিশুর মনে নিখুঁত ভাবে কষ্ট লাগলো বোধহয় । যতক্ষণ না বাড়ি সামনে থেকে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে গেলো ততক্ষণ অব্দি তাকিয়ে রইলো দুই চোখ করে শুধু পাশ থেকে ইভান তা নিঃশব্দে খেয়াল করলো। ছেলেটার মন যে ভীষণ মায়ায় ভরা ইভান আভাস পেলো ইয়াশকে পাশ থেকে সরিয়ে কোলে বসিয়ে বললো,
” মন খারাপ ইয়াশের..!”
ইরাদ ইভানের কথা কানে আসতেই গাড়ির মেরর দিয়ে ছেলের মুখখানা দেখে পিছন ফিরে বললো,

” ইয়াশ হাত ব্যাথা করছে বাবা..! ”
” আপনি সামনে তাকান ড্রাইভ করছেন তো..?”
ইরাদ ফারিশার কথা শুনে সামনে তাকাতেই ইয়াশ শুকনো মুখে বললো,
” আমি বালি যাবো..! ”
ফারিশা পিছন ফিরে ছেলেকে দেখে মলিন হয়ে বললো,
” বাবা আমরা বাড়ি যাবো তো কাল যাবো হে আজ ঘুরে আসি..!”
” আচ্চা..!”
ছোট্ট করে উত্তর দিলো শুধু। গাড়ি চলতে চলতে ইভানের ফোনে তার ক্লাসমেইট বান্ধবীর ফোন আসতেই রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ঝড় এলো যেনো,
” বেয়াদব একটা, গরু একটা, তুই খালি ক্লাসে আয়। তোকে মেরে আমি তোর হাড্ডি নিয়ে নর্দমায় ফেললো। তোর জন্য আমার সংসারে আগুন লাগছে। আমার বয়ফ্রেন্ডের কাছে আমার আইডি লগ ইন করা শালা সব দিলি ঘেঁটে তুই..!”
ইভান বোকার মতো চোখ ঘোরাচ্ছে শুধু। ইয়াশ পাশ ফিরে ইভানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ফোনের হালকা আওয়াজ ইয়াশের কানেও পৌছালো কাছে থাকায়। ইয়াশ দাঁত গুলো বের করে বললো,

” গলু কোতায়..?”
ইভান ইয়াশের দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক একটা হাসি দিয়ে বললো,
” গরু বাড়িতে আছে আব্বা তুমি চকলেট খাও..!”
ইয়াশ মাথা নামিয়ে চকলেট গুলো দেখতে লাগলে ইভান দাঁতে দাঁত চেপে আস্তে করে বললো,
” এই তোর তো সাহস কম নই তুই আমাকে বকা দিস তোরে কী আমি কিছু কইছি? তোর বয়ফ্রেন্ড রাগ করলে আমার কী..!”
” সেটাও তো তোর কি? ওই তুই এমন ঢং করছিস যেনো কিছুই জানিস না। দুপুর থেকে তুই আমারে ফাউ ফাউ মেসেজ দিছোস বল দিস নাই তুই? যা নয় তাই বলছিস? ওই বেডা আমি তোর সাথে কবে প্রেম করছি ব্রেকাপ করতে বলিস তুই আমারে..? ”
ইভানের ভ্রু কুঁচকে গেলো সে তো আজ ফেসবুকে যাওয়া তো দূর ফোন টায় ছুঁয়ে দেখেনি তাহলে এসব কি বলছে সে। ইভান ফোনটা লাইনে রেখেই এক নজর সব জায়গায় চেক করতেই দেখলো কোথাও কোনো মেসেজ নেই তা দেখে ফের কানে ফোনটা নিয়ে বললো,
” তোরে মেসেজই দেই নাই কি বলিস তুই এসব..?”
” ইভান মিথ্যা কথা বলিস না তো প্র্যাঙ্ক করে থাকলে বলে দে ভাই মাথা ঠান্ডা করি একটু..! ”
ইভান কিছু একটা ভেবে বললো,

” আচ্ছা মেসেজগুলো সব স্কিনশর্ট করে আমারে পাঠা তো..! ”
” আচ্ছা পাঠাচ্ছি তোর ব্যাপার আমি বুঝি না কাল আয় শুধু কলেজ খবর আছে তোর আমার বয়ফ্রেন্ডকে ধরিয়ে দিবো তারপর কেলানি খাস..!”,
বলেই ফোন টা কেটে দিলো। পরক্ষণেই নোটিফিকেশন আসতেই ইভান চেক করতেই সব মেসেজ পড়লো সেখানে সুন্দর করে তার বান্ধবী কে এই বলে শাসিয়েছে যে, ” এই তুই আর ভুলেও আমার বাড়িতে কখনো আসবি না , তোর জন্য আমার হবু বউ রাগ করছে আমারে খুব। তোর লজ্জা করে না অন্যের বরের সাথে প্রেম করতে কালই ব্রেকাপ করে নিবি বেয়াদব মেয়ে..! ” এতটুকুই দেখারই বাকি ছিলো যা দেখে ইভানের মাথায় যেনো আগুন জ্বলে উঠলো।

সাদিয়ার প্রোফাইলে কোনো পিক দেওয়া না থাকায় সে সময় সাবাহ্ ভেবেছে এটা তার আপুর ননদই হবে তাই সে এসব পাঠিয়েছে। ইভান ভেবে পেলো না এসব কে করেছে সে সারাদিন বাইরে ছিলো আজ ফোন নিতে ভুলে গেছিলো, প্রয়োজন ছিলো না জন্য আর ফোন নিতে বাড়িতেও যায় নি। সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে পৌছাতেই ইরাদের ডাকে সে তাড়াহুড়ো তে ফোনটা শুধু পকেটে নিয়েই ছুটেছে। কাজটা করলো কে আর ভাবলো না ইভান, বাড়ি যাক আগে তারপর না হয় দেখা যাবে ফোন টা পকেটে রেখে দিলো তারপর ইয়াশের সাথে গল্প করতে লাগলো।
চলতি পথে ইরাদ তার মাকে নিয়ে তবেই বাড়ি ফিরলো। চৌধুরী প্যালেসে ঢুকতেই ফারিশার চোখ স্থির হলো। গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দরজায় দাঁড় হতেই তারেক চৌধুরী বসা থেকে এগিয়ে আসলেন সাথে সাবাহ্ আর তমাও এগিয়ে আসলো। ফারিশা এক নজর বাড়ির দিকে ঘুরে তাকালো একেই বোধহয় কপাল বলে ভাগ্য যেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো যেই দুয়ার থেকে পাঁচ বছর আগে আজ সেই দুয়ারি তাকে বরণ করলো। ভেতরে পা বাড়াতে গিয়েও পিছিয়ে এলো ইরাদ। পাশ ফিরে ফারিশা টলমলে চোখখানা দেখে আলতো করে তার হাত নিজের হাতে ভাঁজে নিয়ে শক্ত করে ধরে বললো,
” এই যে ফিরে এলে এই ইরাদ চৌধুরী কথা দিচ্ছে আর কখনো তোমায় আর তোমার সন্তানের জীবনে কষ্ট আসতে দিবে না..!”

ফারিশা ইরাদের হাত ধরে মৃদু হেসে উঠলো। সবাই ভেতরে যেতেই সুমানা এগিয়ে এসে ফারিশা কে বললো,
” যাক ঘরের লক্ষ্মী ফিরে এসেছে আর কোনো চিন্তা নেই সাথে শাশুড়ীও এসেছে দেখছি..!”
ইভা এগিয়ে এসে ব্যাগ সোফায় রেখে বসতে বসতে বললো,
” তা না এসে আর যায় কোথায়? তবে তোমাদের ঝামেলা মিটেছে জন্য আসলাম নয়তো আরেকটু ঘুরে আসতাম..!”
” সেটা তো বুঝলমা তা ছিলেন কোথায় আপনি..? বিদেশে নাকি..? ”
পিছন থেকে স্বামীর গলা পেয়ে ইভা পিছন ঘুরে বললো,
” কেন খুঁজে পান নি তাই। আহারে ছিলাম তো আপনার বোনের বাড়িতে আর আপনি খুঁজেছেন আমার বাপের বাড়িতে , আপনার বোন বলেনি..!”
ইমদাদুল সেই কথা শুনে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লো বলে কী তার বোনের বাড়িতে ছিলো আর তারা কি না জানায় নি। ইমদাদুল এগিয়ে এসে সোফায় বসতে বসতে বললো,
” তা এসেছে তোমার বউ মা তাহলে..!”
ইভান ইয়াশকে নিয়ে সোফার কাছে এগিয়ে আসতেই ইভা তাকে নিজের কাছে নিয়ে বললো,
” ভালো আছো তো তুমি..?”

ইয়াশ ইরাদের মাকে চিনতে পেরে সুন্দর করে মাথা দুলিয়ে বললো,
” হুম কিনতু হাতে ব্যতা..!”,
বলেই হাত এগিয়ে দিলে ইভা সেদিকে তাকিয়ে হাত টা ধরে বললো,
” ইশশ তুমি কষ্ট পেও না ঠিক হয়ে যাবে..!”
” এই যে এদিকে এসো তো ইয়াশ..! ”
পাশের ডিভান থেকে তারেকের ডাক শুনতেই ইয়াশ ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকিয়ে পাশে থাকা ইরাদকে বললো,
” ওতা কে..?”
ইরাদ এগিয়ে এসে ইয়াশের হাত ধরে তারেক এর কাছে নিয়ে গিয়ে বললো,
” এটা তোমার ছোটদাদু হয় ঠিক আছে..! ”
তারেক ইরাদের কথায় ইয়াশকে নিজের কাছে নিয়ে গালে হাত দিয়ে বললো,

” ভারী মিষ্টি দেখছি আমার দাদুভাই টা তা তুমি কী আমার সাথে খেলবে আমি কিন্তু বল খেলতে পারি..? ”
ইয়াশ তো ভীষণ খুশির খেলার নাম নিতেই তারেকের সাথে গল্প জুড়ে বসলো যেনো, তাদের দু’জনের কথোপকথন দেখে মনে হলো তারা বুঝি বন্ধু হয় তা দেখে ফারিশা হেসে উঠলো মৃদু। পাশ থেকে সুমানা ফারিশাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জোর করে সোফায় বসিয়ে দিলো আর বললো,
” বসো তো এটা তোমারি বাড়ি! এই শিউলি জুস বানিয়ে নিয়ে আয় তো আর ব্যাগগুলো ওদের ঘরে দিয়ে আয়..!”
শেষ কথা টা শিউলিকে বলতেই শিউলি দ্রুত রান্মাঘরে গিয়ে কাজে লেগে পড়লো। ইরাদ দীদাকে না দেখতে পেয়ে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো,
” বাবা দীদা কোথায়..?”
ইমদাদুল স্ত্রীর সাথে কথা বলতে বলতে ছেলেকে জবাব দিলো

” তোর দীদার রাতে ঘুম হয়না আজ তিন-চার দিন হলো তাই সন্ধ্যার দিকে ঘুমের মেডিসিন খেয়ে ঘুমোচ্ছে। ”
ইরাদ আর কিছু জিজ্ঞেস না করে সোজা উঠে ফারিশাকে বললো,
” তুমি এখানেই থাকো আমি রুম থেকে আসছি..!”
ফারিশা শুধু তাকিয়ে এক নজর ইরাদকে দেখলো। ইরাদ সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরলো। প্রায় পাঁচ-ছয়েক সিঁড়ি পেরিয়ে উঠতে লেগেছিলো কিন্তু কারোর কথায় থমকে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লো।
তারেক ইয়াশকে সিঁড়ির দিকে ইরাদকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” তা দাদুভাই ওটা তোমার কে হয় বলো তো..?”
ইয়াশ ঘাড় বাকিয়ে ইরাদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট জোড়া প্রশস্ত করে ফেললো মুখের মধ্যে নিজের হাতের বুড়ো আঙ্গুল টা পুড়ে নিয়ে আদো আদো গলায় সুন্দর করে উঁচু গলায় বলে উঠলো,
” বাবা..!”

ইয়াশের কথায় ফারিশা সুমানার সাথে গল্প করতে করতে ছেলের স্থির হয়ে দেখলো। ইরাদ থমকালো খুব করে থমকালো আজ। তার কানে শুধু সেই প্রতিধ্বনিই বাজছে “বাবা”। সে কী ঠিক শুনলো তার হাত-পা সর্বাঙ্গ যেনো কেঁপে উঠলো হঠাৎ করে। ধীরে পায়ে পিছন ঘুরে সেখানে দাঁড়িয়েই গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” ইয়াশ কি বললো চাচ্চু..! ”
ইরাদের কথায় তারেক ইয়াশকে আরেকটু নিজের কাছে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো আবারো,
” ওটা কে হয় আবার বলো তো দাদুভাই..!”
ইয়াশ ইরাদকে দেখে হাসিমুখে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বললো,
” বাবা….!”

ইরাদ সেখানেই থমকে গেলোম ফের । ছেলের মুখে বাবা ডাক শুনে তার সব তালগোল পাকিয়ে গেলো। সেদিকে তাকিয়েই সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে খেলো এক বড়সড় উস্তা। পাঁচ নাম্বার সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়লো একবারে ফ্লোরের ওপর, ধপাস খেয়ে পড়লো একদম যা সামনে বসা কেউই এমন ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলো না কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে সবাই বসা থেকে ছুটে গেলো সেদিকে। তারেক, ইমদাদুল আর ইভান এগিয়ে ইরাদকে তুলতে গিয়ে তার হাত টানতেই দেখলো ইরাদের সেন্স নেই সে জ্ঞান হারিয়েছে। দ্রুত সব ধরে ধরে সোফায় শুইয়ে দিলো। ফারিশা ইয়াশের নিজের কাছে নিয়ে এগিয়ে এলো। ইভা ছেলেকে এমন জ্ঞান হারাতে দেখে আতঙ্কে উঠলো। ইরাদের কপালের এক সাইডে যেনো আলুর মতো ফুলে উঠেছে ইতিমধ্যে ফারিশা তা দেখে ইয়দশকে অন্য সাইড করে নিলো যেনো ভয় না পায় । ইভা চিন্তিত গলায় চেঁচিয়ে উঠলো,
” শিউলি রে জলদি পানি নিয়ে আয়..!”
শিউলি দ্রুত পানি আনতেই পানির ছিটা দিলো ইভা কিন্তু উঠলো না। সবাই ঘাবড়ে গেলো ইমদাদুল পাশ থেকে পকেট থেকে ফোন বের করে বলে উঠলো,

” ডাক্তারকে ফোন দেই..!”,
বলেই ফোন দিলো এদিকে প্রায় দশ মিনিট হতে চললো অথচ, তার জ্ঞান ফেরার নামগন্ধ নেই সবাই এবার আরও বেশি ভয় পেয়ে গেলো। ইভা পানির ছিটা দিতে দিতে ইরাদের ভ্রু কুঁচকে গেলো হালক তা দেখে তারেক তার ভাইকে বললো,
” ভাই ডাক্তারের কাছে ফোন করে মানা কর আসতে..! ”
তারেক এর কথায় ইমদাদুল ফোনটা রেখে ছেলের দিকে ফের তাকালো। ইভা আরেকবার পানির ছিটা দিতেই ইরাদ মুখ খিঁচড়ে নিলো। নিভু নিভু চোখে সামনে কয়েক সেকেন্ড তাকাতেই তার পুরো সেন্স এলো। লাফিয়ে উঠে সোফা থেকে নামতে নামতে বললো,
” এই আমার ছেলে কই..?”
ইরাদের এমন কান্ড দেখে সবাই আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইলো শুধু । ফারিশার কোলে ইয়াশকে দেখে ইরাদ এগিয়ে গিয়ে ছেলেকে নিজের কোলে তুলে বললো,

” এই আমি তোমার কে হয় বলো তো আবার..!”
ইয়াশ বাবার কপালে লাল হতে দেখে সেদিকে হাত ছুঁইয়ে বললো,
” বাবা.. তুমিও কী পান লাগিয়েচো..?”
ইরাদ খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো বাচ্চাদের মতো ছেলেকে আঁকড়ে ধরে ঘুরতে ঘুরতে উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
” আম্মু দেখো আমার ছেলে বাবা ডাকছে আমাকে । ফারিশা শুনেছো ছেলের কথা। আমি বাবা ডাক শুনেছি ইশশ কী মধুর ডাক আমার সোনার, আমার কলিজার…! ”
বাবাকে এমন ঘুরতে দেখে ইয়াশ বাবার গলা আঁকড়ে ধরলো শক্ত যেনো পড়ে না যায় ইভান এগিয়ে এসে ভাইকে হাসতে হাসতে বললো,
” ভাইয়া ডাক্তারের কাছে চলো আগে মাথা ঘুরালো কেনো তোমার..?”
ইরাদ ছেলেকে কোলে তুলেই সোফার ওপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
” আরে এটা আমার ছেলের ডাকের পাওয়ার রে, আজ আমার কী খুশি লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না..!”
ইভা ছেলের পাগলামো দেখে আনন্দে তার চোখে যেনো দু’ফোটা জল এলো। ফারিশা শুধু তাকিয়ে রইলো আর বাপ-ছেলের কান্ড দেখছে। ইমদাদুল ছেলের দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললো,
” তুমি না একটু আগে আছাড় খেলে এমনে লাফাচ্ছো কেনো? কোথায় ব্যাথা পেয়েছো নাকি বললে তো না..?”
” আমার ব্যাথা লাগে নাই বাবা। আম্মু বাড়িতে বিরিয়ানি রান্না করে রাতের জন্য আজ সবাই একসাথে খাবো কিন্তু..? ”
ইভা ছেলের পাগলামো দেখে সুমানাকে ডেকে চলে গেলো হাসতে হাসতে আর শিউলি ব্যাগগুলো রুমে দিয়ে আসতে গেলো। সাবাহ্ তো এর মাঝেই হাওয়া হয়েছে তমাকে দেখে ইভান এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,

” তমা আপু বলছিলাম তুমি কী আমার ফোন ধরেছিলে.?”
তমা চোরাচোখে তাকালো তার বোন নিশ্চয় কিছু অকাম করেছে তা ভেবে কিছু টা আমতা আমতা করে বললো,
” আমি কই না তো কেন.?”
” কিন্তু আমি তো দেখেছি তুমি সাবাহ্ কে আমার ফোন দিলে..!”
তমা এবার বোকার মতো হাসি দিয়ে বললো,
” তোরা যে কি করিস আমি বুঝি না? সাবাহ্ এখন চাইলো লক খুলে আমি তাই দিলাম কেনো কি হয়েছে..? ”
ইভান আন্দাজ করে টোপটা মারলো আর সহজ-সরল তমা ভাইয়ের মিথ্যা কথা যে সেটা বুঝলো না। ইভান গটগট পায়ে সোজা ওপরে চলে গেলো। তমা সেদিকে তাকিয়ে ভাবলো একবার যদি সাবাহ্ জানতে পারে সে বলে দিয়েছে তাহলে আর হয়ছে তমা দ্রুত পায়ে এগিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো। ইরাদ ইমদাদুল আর তারেক কে দেখেও লজ্জা করলো না লাফাতে লাফাতে সোফা থেকে নেমে ফারিশার হাত ধরে বললো,
” চলো রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আছি আমরা..! “,
বলেই তিনজনই চলে গেলো ফারিশা কিছুটা লজ্জাবোধ করলো বড়দের সামনে এইভাবে টেনে নিয়ে যাওয়ায়।

” তুই আমার ফোনে কী করেছিস সাবাহ্..? ”
সাবাহ্ পড়ার টেবিলে বসে নিজের ফোনে রিলস দেখছিলো হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এলো থমথমে গলা তা শুনে সাবাহ্ শুকনো ঢোক গিললো। পিছনে না ফিরেই বললো,
” কয় না তো আমি কী আপনার ফোন ধরতে পারি, আপনি তো ফোন রেখেই যান না বাড়িতে আজব তো..?”
” তা আমার রুমে তোর পারফিউমের স্মেইল কয় থেকে আসলো এবার এটা বলিস না যে তুই পারফিউম ইউজ করিস না..!”,
বলতে বলতে এগিয়ে এলো। সাবাহ্ দ্রুত বসা থেকে দাঁড়িয়ে পিছন ঘুরতেই ইভানকে নিজের কাছে দেখে পিছনে সরে যেতে যেতে দেওয়ালের সাথে ঠাস করে বারি খেলো। ইভান সেদিকে গিয়েই শক্ত গলায় বললো,
” আমার ক্লাসমেট সাদিয়াকে এসব কী বলেছিস তুই
আমি তোর বর হই? ”
সাবাহ্ কথা বললো না সে মনে মনে এই সাহস জুগানের চেষ্টা করছে যে আজ মনের কথা বলেই দিবে সে। সাবাহ্ কে চুপ থাকতে দেখে ইভান সাবাহ্ গাল চেপে ধরে বললো,

” বল কেনো বলেছিস এসব..?”
” ইভান ভাই আপনি বাচ্চা না যে বুঝবেন না। আমি আপনাকে ভালোবাসি, পছন্দ করি আপনি কী বুঝেন না নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করেন..?”
ইভান কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে সাবাহ্’র গাল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে চোয়াল শক্ত করে ফেললো। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,
” সাবাহ্ ফাজলামো করবি না ওটা আমার ক্লাসমেট ছিলো তোর অকামের জন্য আমাকে বকা খেতে হলো কতো জানিস তুই..?”
” ভালোবাসি আপনাকে বুঝেন না কেন ওটা আমি ভেবেছিলাম আপুর ননদ তাই ওসব বলেছি..?”
এক ঝটকায় সাবাহ্’র দুই বাহু চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
” আর একবার ভালেবাসি বল চড়িয়ে দাঁত ফেলিয়ে দেবো সবকিছুতেই তোর মজা..!”
সাবাহ্ কাঁদো কাঁদো দৃষ্টিতে এবার তার দিকে তাকিয়ে বললো,
” সিরিয়াসলি বলছি ভালোবাসি ইভান ভাই। আপনাকে কোনো মেয়ের সাথে দেখলে আমার মন পুড়ে আপনি বুঝেন না..! “,
ইভান তার দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখলো কয়েক সেকেন্ড দু’জনের দৃষ্টি মিলিত হলো সাবাহ্ বুঝলো না সেই লালিত চোখের ভাষা শুধু মনে হলো এই বুঝি নরম হবে আবার মনে হলো না ঠিক শক্ত হয়ে উঠবে আবার।
” আজকের পর থেকে আমাদের মাঝে সেই আগের সম্পর্ক কী আর থাকবে সাবাহ্? তুই আজ ভাই-বোন সম্পর্কের মধ্যে অপবিত্রতা টেনে আনলি..!”
সাবাহ্ কাঁদো কাঁদো গলায় ইভানের বাহু আঁকড়ে বললো,

” এটা আপনার কাছে অপবিত্র মনে হলো। ভালোবাসা কোনো অপবিত্র নয় ইভান ভাই আপনি ভুল বললেন?”
ইভান সূক্ষ্ম হেসে বললো,
” ভালোবাসা পবিত্র কিন্তু তুই সম্পর্কে আমার কে হোস ভুলে যাস না। পরিবারের মধ্যে এসব জঘন্য কথা আর ভুলেও তুলিস না। আজ তোর কথা শুনে আমার নিজেরই লজ্জাবোধ লাগছে সাবাহ্। দেখ চোখ তুলে তোর দিকে তাকানোর সাহসটুকু হচ্ছে না আমার..! ”
সাবাহ্’র চোখের কোণা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো ইভানের কথায় আস্তে করে বললো,
” ইভান ভাই কত পরিবারেই তো এমন সম্পর্ক আসে আর আমরা তো আপন ভাই-বোন নয় । আপনি তাই বলেই এতটায় ঘৃণা চোখে দেখলেন যে চোখ তুলে তাকাতে পারবেন না। আমার ফিলিংসের কী কোনো দাম নেই আপনার কাছে..?”
ইভান চোখ বন্ধ করে জোরে কয়েক বার শ্বাস ছেড়ে সাবাহ্ এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজের মুখের সামনে আঙ্গুল রেখে শাসিয়ে উঠলো,

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৭ (২)

” চুপ..! আর একটা বার তোর মুখে ওই কথা শুনলে তোকে আমি নিজ হাতে মেরে ফেলবো নয়তো আমি এই বাড়ি ছেড়েই চলে যাবো কথাটা মাথায় রাখিস..!”,
বলেই রুমের দরজা ঠাস করে খুলে বেরিয়ে গেলো সাবাহ্ সেদিকেই পাথরের ন্যায়ে তাকিয়ে রইলো।

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here