তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪৫ (২)
তানিশা সুলতানা
আসিফকে চৌধুরী বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না কয়েকজন কালো পোশাক ধারী লোক। পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। সকলের হাতে রয়েছে বন্দুক। কিছু মুহূর্ত আগেই একটা ফোন কল আসায় বরের গাড়ি থেকে নামে আসিফ। বাড়ির ভেতরে প্রচন্ড শব্দ, মানুষের কোলাহল এবং সাউন্ড বক্সের আওয়াজ, সেজন্য ভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলে তবেই ভিতরে ঢুকবে।
কলখানা রিসিভ করার আগেই কালো পোশাক ধারী লোক গুলো ওকে ঘিরে ধরে। দেখে বোঝা যাচ্ছে কারো হায়ার করা।
প্রচন্ড বিরক্ত আসিফ চোখ মুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করছে
“যেতে দিচ্ছেন না কেনো? আটকে রাখার কারণ কি? আমার ভাইয়ের বিয়ে। আজকে কোন ঝামেলা করতে চাচ্ছি না।
সবথেকে কালো লোকটা বলছেন
“সরি টু সে আপনাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
আশ্চর্য হলো আসিফ। নিজের রাগটা কন্ট্রোলে এনে জানতে চাইলে
” কারণটা তো বলতে হবে?
“আবরার তাসনিন নিষেধ করেছেন।
কন্ট্রোলে রাখা রাগটা তরতর করে বেড়ে গেলো আসিফের। আবরার তাসনিন এই নামটাকে বড্ড ঘৃণা করে ও। আদ্রিতা সঙ্গে রিলেশন হয়ে গিয়েছিল প্রায় ওই লোকটার জন্য হলো না।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল
“উনি কেনো নিষেধ করেছেন?
“আপনি আমাদের ম্যাম আদ্রিতা চৌধুরীকে ডিস্টার্ব করেন।
উনার আশেপাশে যাওয়া বারণ।
হাসলো আসিফ। পরমুহুর্তেই চোখ মুখে রাগের প্রতিফলন ফুটিয়ে একজনের কলার টেনে ধরে বলল
“ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন
আদ্রিতা চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ে হতে যাচ্ছে আমার। আব্দুর রহমান চৌধুরী কথা দিয়েছেন।
আপনাদের বস আবরার তাসনিনকে কথাটা জানিয়ে দেবেন।
এন্ড
আমার হবু বউয়ের আশেপাশে যাওয়ার রাইটস রয়েছে। এটাও স্পষ্ট করে বলে দেবেন।
যার কলার টেনে ধরেছিলো সে নিজের কলার ছাড়িয়ে নিলো। এবং সঙ্গে সঙ্গে বাকিরা আসিফকে পাকড়াও করে ধরলো। মুহূর্তের মধ্যে চোখ এবং হাত বেঁধে ফেলল।
ফিসফিস করে বলল
“আপনি ম/রা/র স্বপ্ন দেখছেন।
আদ্রিতা ম্যামকে বিয়ে করার অধিকার শুধুমাত্র আবরার তাসনিন স্যারেরই রয়েছে।
আসিফের মুখটা খোলা থাকলে অবশ্যই কিছু বলতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কারণে বলতে পারল না।
চৌধুরী বাড়ির পেছনের দিকে একটা গোডাউন রয়েছে। সেখানে সব ময়লা আবর্জনা, পুরনো জিনিসপত্র রাখা হয়।
গার্ডরা আসিফকে সেই গোডাউনে রেখে দিলো। এবং বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকলো।
এইতো গতকালের ঘটনা
মেয়ের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদ দিতে যায় কিছু সংখ্যক মানুষ। আদ্রিতা নিজেকে সাজিয়েছিলো হলুদ লেহেঙ্গারে। ভীষণ সুন্দর লাগছিল তাকে। দ্বিতীয় বার ভাই প্রেমে পড়ে যায় আসিফ।
নিজের মনের কথা চেপে না রেখে, একটা লাল গোলাপ দিয়ে প্রপোজ করে আদ্রিতাকে।
মেয়েটা জবাবে বলে
“আসলে আমি আবরার তাসনিন কে ভালোবাসি। ওনার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক আছে।
সম্পর্কটা একতরফা।
আমি একা একাই অনুভূতির পাহাড় গড়েছি। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি। সে কখনো আমায় ভালোবাসেনি।
এইযে এক তরফা একটা সম্পর্ককে টেনে নিয়ে যাচ্ছি এটার বোঝা আমার কাছে অনেক ভারী।
“কতদিন টানবে?
এই ভাড়ি বোঝা বয়ে কতদিন বাঁচবে?
আদ্রিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
“জানিনা
তবে নতুন কোনো সম্পর্কে জড়ানো আমার পক্ষে পসিবল না।
আপনিও কোনো আশা রাখবেন না মনে।
চলে যায় আদ্রিতা। তবে থেমে থাকে না আসিফ। ওই মুহূর্তে ছুটে যায় চৌধুরী বাড়িতে। আরিফ এবং আব্দুর রহমান কিছু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলো।
আসিফ ওনাদের সামনে গিয়ে সরাসরি বলে
“আঙ্কেল
আমি আপনার মেয়ে আদ্রিতা কে ভালোবাসি। ওকে বিয়ে করতে চাই।
আসিফ খুব ভালো ছেলে। দেখতে সুন্দর, ভদ্র, বাবার ভালো পজিশন, একজন সাকসেসফুল বিজনেসম্যান। অপছন্দ করার কোনো কারণই নেই।
তাছাড়া আরিফ মনে মনে ভাবছিলো অহনার বিয়েটা হয়ে গেলেই ইনিয়ে বিনিয়ে আসিফের সাথে আদ্রিতার বিয়ের প্রস্তাব রাখবে।
কিন্তু সেসবের আর প্রয়োজন পরলো না। না চাইতেই হাতে চাঁদ পেয়ে গেলো।
আব্দুর রহমান আসিফ কে নিজের পাশে বসালেন। নিজের স্ত্রীকে বললেন এক গ্লাস পানি নিয়ে আসতে।
“আঙ্কেল আমার কিছু লাগবে না।
আপনারা শুধু বলুন আদ্রিতাকে দেবেন আমায়?
আসিফের উতলা কণ্ঠস্বর শুনে আব্দুর রহমান বললেন
“শান্ত হও
তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। পানি খাও একটু রিলাক্স হও
তারপর আমাকে বলো কি বলতে চাও।
আতিয়া বেগম ততক্ষণে পানি নিয়ে চলে এসেছে। বাড়ি ভর্তি মেহমান গিজ গিজ করছে। আসিফকে দেখে সকলের মনের প্রশ্ন। উনারা শুনতে ইচ্ছুক ড্রয়িং রুমে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে আব্দুর রহমানের ভয়ে কেউ এগোতে পারছেন না।
আসিফ আতিয়াকে থ্যাংক ইউ বলে পানির গ্লাসটা হাতে নিলো, এবং এক চুমুকে গোটা গ্লাস ফাঁকা করে ফেললো। প্রচন্ড পিপাসা পেয়েছিল তার। টেনশন আর উত্তেজনায় সেটা ভুলেই গিয়েছিলো। এবার পানি খাওয়ার পর মনে হচ্ছে কলিজাটা ঠান্ডা হলো।
হাফিজুর চৌধুরীকে ডেকে পাঠালেন আব্দুর রহমান। বয়স বেড়েছে, তার ওপর আবরারের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারিনি। ফলস্বরূপ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। নিজ কক্ষ থেকে বের হয় না অতিরিক্ত প্রয়োজন ছাড়া।
এখনো ছেলের ডাক অগ্রাহ করে কক্ষে বসে থাকতে পারলো না। কারুকাজে সরিতো লাঠি ভর দিয়ে প্রবেশ করলেন ড্রয়িং রুমে।
বসলেন আরিফের পাশে।
এইবার আব্দুর রহমান আসিফ কে বললেন
“তুমি কি বলছিলে আবার বলতে পারবে?
আসিফ তাড়াহুড়ো করে জবাব দিল
“একবার কেনো ১০০ বার বলতে পারবো।।
আপনাদের মেয়ে আদ্রিতা চৌধুরীকে আমি ভালোবাসি। তাকে বিয়ে করতে চাই। আমার বাড়ির সবাই বিষয়টা জানে। এবং তারাও আদ্রিতাকে পছন্দ করে।
ভাইয়ার বিয়ের পরপরই প্রস্তাব পাঠাতে চাচ্ছিলেন।
হাফিজুর চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আব্দুর রহমান বললেন
“ঠিক আছে
আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি
আমাদের আদ্রিতাকে তোমায় দেবো।
আসিফ খুশি হলো। মুহূর্তের মধ্যে কয়েকবার আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো। এই বিষয়টা সব থেকে বেশি মুগ্ধ করলো আব্দুর রহমান এবং আরিফকে।
আতিয়া বেগমের চোখ দুটো টলটল করছে। নিজের ছেলের কথা ভাবতেই কলিজা কেঁপে উঠছে।
আবরার যদি জানতে পারে বিষয়টা তাহলে কি হবে?
ও না ধ্বংস করে দেবে সবকিছু। বাবা ফুপা দাদা এসব কি আর মানবে?
আবহাওয়া প্রচন্ড খারাপ। বিশাল এক ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে। ইতিমধ্যেই কিছু কিছু দেশে ভূমিকম্প হয়েছে।
প্লেন চলাচল একদম নিষিদ্ধ। তাছাড়া এই মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়ার কথা চিন্তা করে সুইজারল্যান্ড থেকে কোনো প্লেন বাংলাদেশে আসবে না।
থাইল্যান্ড ও যাবে না।
আবরার তাসনিনের মেজাজ খারাপ।
ইচ্ছে করছে সবকিছু ভেঙে গুড়িয়ে দিতে। আসিফ আদনানের প্রপোজালের কথা ইতিমধ্যেই তার কানে এসে পৌঁছেছে।
সিয়াম ফ্লোরে মাথা রেখে সোফার ওপর পা দিয়ে শুয়ে শুয়ে গান খাইছে
“যদি কখনো পাও শুনতে করেছি আত্নহত্যা
ভেবে নিও প্রিয় আর কোনো ছিলো না রাস্তা
নতুন নতুন মানুষের স্পর্শেরই ভিড়ে
এই আমি তার স্পর্শ কবে যাবে হারিয়ে
আসবে ঠিকই কাঁদবে তোমার প্রাণ
পাবে সেদিন আগর বাতির ঘ্রাণ
সিয়ামের গান শুনে বিরক্ত হইলো সবাই।
আমান একটা লাথি মেরে বলল
“কাকা করা বন্ধ কর শালা
দুঃখ পেলো সিয়াম। আসলে পৃথিবীতে প্রতিভাবান মানুষের কোনো দামই নেই। কেউ মূল্য দিতে চায় না।
এই যে সিয়াম ছেলেটা কতো সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করে।
কেউ তার কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়ে দুটো প্রশংসা করে না। এই যে এখন মধু সুরে গান গাচ্ছে
প্রাণ প্রিয় বন্ধু বলল কাকা করছে।
এতো অপমান সহ্য করে পড়ে আছে শুধুমাত্র
শুধুমাত্র
ওরা বলে সহ্য করে অন্য কেউ জুতা দিয়ে পিটিয়ে সোজা করে দিতো তাই।
সিয়ামের ভার মুখ দেখে আহাদ বললো
” শালা আগর বাতির ঘ্রাণ পুরোনো হয়ে গেছে।
বর্ধমানের ট্রেন্ডিং এ আছে মমতাজ আপা।
উনার একটা গান আছে না
আহাদের মুখ থেকে গানটা কারুনকে নিয়ে আমান গেয়ে ওঠে
“আমি নষ্ট মনে নষ্ট চোখে দেখি তোমাকে
মন আমার কি চায় বোঝাই কেমনে।
এই ফাঁকে ইভান গিয়ে সাউন্ড বক্সে গান চালিয়ে দিলো
” আমি হলাম রোমিও
পাক্কা প্লেবয় রোমিও
আবরার বিরক্ত হলো। সে তার কক্ষে চলে যায়। আর বাকি সবাই উরাধুরা নাচ শুরু করে দেয়।
আজকেও মনিটরে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। বেয়াদব মেয়ে কক্ষে আসে নি।
আবরার বিরক্ত হয়ে কল করলো আদ্রিতার নাম্বারে।
প্রথমবার রিং হতে হতে কেটে গেলো। দ্বিতীয় বার কল বাজার সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করা হলো।
ওপাশ থেকে হ্যালো বলার আগেই আবরার বলে ওঠে
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪৫
“ইডিয়েট পাখা গজিয়ে গিয়েছে?
জাস্ট আমায় আসতে দাও
চুমু খেতে খেতে খু/ন করে দিবো।
