তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪৯
তানিশা সুলতানা
আসিফদের বাড়ির কোথায় কি আছে সেটা জানা নেই আবরারের। আন্দাজে সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় উঠতে থাকে। পেছন থেকে সবাই ডাকছে। কোথায় যাচ্ছে, কি করতে চাচ্ছে, এসব জিজ্ঞেস করছে। তবে জবাব দিচ্ছে না ছেলেটা। প্লেন থেকে তাড়াহুড় করে নামতে গিয়ে পায়ের ক্ষতস্থানে আবার আঘাত পেয়েছে। সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। কালো রঙের প্যান্ট রক্তে ভিজে গিয়েছে। তবে সেদিকে খেয়াল নেই ছেলেটার। হাঁটতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে। বা পা টা খুব ভারি হয়ে গিয়েছে। তবুও থামছে না। পা টেনে টেনে দোতলায় উঠে একটা কক্ষে ঢুকে পড়ে। এবং সেখানে দুটো কম্পিউটার দেখতে পায়। মুহূর্তের মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা শুরু করে। বাকিরা ততক্ষণে কক্ষে হাজির হয়ে গিয়েছে। আসিফের মা বলে চলেছে “তোমার সাহস হয় কি করে অনুমতি না নিয়ে কক্ষে ঢোকার? ভদ্রতা জানোনা?”
জবাব দেয় সিয়াম
“আন্টি একটা মেয়ে হারিয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলে হয়তো কোনো ক্লু পাওয়া যাবে। আপনি প্লিজ ডিস্টার্ব করিয়েন না।
মহিলাটা চুপচাপ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো। আতিয়া বেগম আবরারের ক্ষতস্থান গুলো দেখতে থাকে। তোর ইচ্ছে করছে ডাক্তার কে কল করতে। ছেলে শরীর থেকে ঝরে পড়া এক এক বিন্দু রক্ত তার কলিজায় আঘাত করছে। তবে ছেলে যে তার কথা শুনবে না। ডাক্তার আসলেও তাকে ট্রিটমেন্ট করতে দেবে না। সেজন্য চুপচাপ চোখের পানি ফেলছে।
আসিফ এখন নিজের উপর বিরক্ত হচ্ছে। তার কেনো এতক্ষণ সিসিটিভি ফুটে চেক করার কথা মনে পড়লো না?
আব্দুর রহমান আশার আলো খুঁজে পেলো। এতক্ষণ তার ভয় করছিলো। মনে হচ্ছিলো আর কখনো খুঁজে পাবে না আদ্রিতাকে। তবে এখন মনে হচ্ছে গোটা দুনিয়া ওলটপালট করে হলেও আবরার ঠিক খুঁজে বের করবে আদ্রিতাকে।
বর্ষা আবরারের হাত ধরে অনবরত আহাজারি করে বলে চলেছে
“আব্বা আমার আদ্রিতাকে খুঁজে এনে দে। আমি আর কোনদিন ওকে চোখের আড়াল করব না। সব সময় বুকের মধ্যে চেপে রাখবো।
এরই মধ্যে শোনা গেলো সিয়ামের কণ্ঠস্বর। ও প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলো
“আদ্রিতা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলো এ্যানিকে নিয়ে।
তারপর গাড়িটা আসলো, দুজন লোক নামলো আর তুলে নিয়ে গেলো ওকে।
দেখ পেছনে এ্যানি কেউ দেখা যাচ্ছে।
আমান মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির নাম্বার লিখে নিলো ফোনে।
ইভান পুলিশকে কল করলো। বলল এই নাম্বারের গাড়ি কোথায় কোথায় কোথায় গিয়েছে ১০ মিনিটের মধ্যে তার আপডেট জানাতে।
আহাদ ইতিমধ্যে কয়েকটা হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করে ফেলেছে।
আরিফ আসিফ কে বলল
“বাবা তুমি এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ো। থানায় গিয়ে এই গাড়ির খোঁজ করতে বলো।
আসলে আরিফ নিজেই যেতো। কিন্তু হাঁটার মতো শক্তি তার নেই। এক পা এগোলে দু পা পিছিয়ে যাচ্ছে। আসিফ গেলো না। সে তাকিয়ে আছে আবরারের মুখপানে। বরাবরই এই ছেলেটাকে ওর হিংসা হয়। আজকে হিংসের পরিমাণটা বেড়ে গেছে।
আবরার চোখ বন্ধ করে কিছু মুহূর্ত সেভাবেই বসে থাকে। হাত পা কাঁপছে তার। এসি থাকা সত্ত্বেও তরতর করে ঘেমে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। একটুখানি পানি খাওয়া প্রয়োজন।
তবে চিন্তায় পানি খাওয়ার কথাও ভুলে গেছে।
পায়ের ক্ষতস্থান থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছে। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে গিয়েছে। নাকের উপরে থাকা ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ অর্ধেক খুলে গিয়েছে ঘামে। বাকিটুকু এক টানে খুলে ফেললো ও। শার্টের সবগুলো বোতাম খুলে ফেলেছে। ভাজ ফেলানো বুকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আসিফের মামাতো চাচাতো বোনগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখছে ছেলেটাকে। ইতিমধ্যেই প্রেমে পড়ে গিয়েছে। স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
বরাবরই ফোনে দেখে আসছে। তবে আজকে সামনাসামনি দেখার পর ওদের মনে হচ্ছে ফোনের থেকে সামনাসামনি বেশি সুন্দর। আব্দুর রহমান তাকিয়ে থাকে ছেলের মুখ পানে। বড্ড মায়া হলো তার। ইচ্ছে করলো মাথায় হাত বুলিয়ে একটুখানি সান্ত্বনা দিতে। বলতে “এতো চিন্তা করিও না। আদ্রিতাকেই ঠিক খুঁজে বের করতে পারবে”
তবে ইগো এবং জেদ তার মনের ইচ্ছেটাকে পূরণ করতে দিলো না।
অনহা ইতিমধ্যেই ফ্রিজের ঠান্ডা পানি দিয়ে শরবত গুলে এনেছে।
প্রথমে আমানকে এক গ্লাস শরবত দিলো। খেতে চাইবে না সেটা জানা কথা। সেজন্য আগেই বলল
“আপনারা সুস্থ না থাকলে আদ্রিতাকে খুঁজবেন কিভাবে?
খেয়ে নিন ভালো লাগবে।
আমান আর মানা করলো না। খেয়ে নিলো। তারপর ইভান এবং আহাদ কেউ দিলো। শেষে সিয়ামের সামনে গ্লাসটা এগিয়ে দিতে কেনো জানি বুক কেঁপে উঠলো অহনার।
তাকাতে পারলো না মানুষটার মুখ পানে।
কোথায় আছে “যখন মায়া বাড়িয়ে লাভ হয় না তখন মায়া কাটাতে শিখতে হয়”
অহনাও সেটা করতে ব্যস্ত।
এখন আর মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই। সে অন্য কারো স্ত্রী।
সিয়াম ও তাকালো না অহনার মুখপানে। চুপচাপ গ্লসটা হাতে নিয়ে এক চুমুকে খেয়ে ফেললো সবটুকু শরবত।
আবরারকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দিলো অহনা।
বললো
“ভাইয়া পানিটুকু খেয়ে নাও।
কিন্তু আবরার পানি খেলো না। তাকিয়ে থাকলো বোনের মুখ পানে। খুব সুন্দর লাগছে। শাড়ি পড়েছে, নাকে ছোট্ট নাকফুল, গলায় চেন, হাতে চুড়ি সব মিলিয়ে মিষ্টি একটা বউ।
আবরার দাঁড়িয়ে অহনার হাতে থাকা পানির গ্লাসটা রাখলো টেবিলে তারপর আলতো করে জড়িয়ে ধরলো।
বোনের জন্মের সময় প্রথমবার কোলে নিয়েছিলো আবরার। তারপর আর কখনো কোলে নেওয়া হয়নি। আদর করে কথা বলে নি। কিছু কিনে দেয়নি। কখনো কোথাও ঘুরতে নেয় নি। তবে আজকে কেনে জানি বোনকে একটুখানি আদর করতে ইচ্ছে করলো।
তাইতো এক হাতে জড়িয়ে ধরে আরেক হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।
বিড়বিড় করে বলল
“আ’ম স্যরি
আ’ম স্যরি
এইটুকু আদুরে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো অহনা। কেনো কাঁদছে ওর জানা নেই। আতিয়া বেগম দুচোখ ভরে দেখল দুই ভাইকে।
কয়েক মিনিট পরেই অহনাকে ছেড়ে দিলো আবরার।
“ভালো থাকিস
আসছি
বলেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে গেলো। পেছন থেকে আতিয়া এবং অহনা ডাকলো অনেক। তবে থামলো না আবরার। যেখান দিয়ে হেঁটে গেলো সেখান দিয়েই ফোঁটা ফোঁটা রক্তের চিহ্ন রেখে গেলো।
আব্দুর রহমান হাঁটু মুড়ে বসলো ফ্লোরে। এক ফোঁটা র/ক্ত হাতের আঙুলে তুলে নিলো। এবং সেটার দিকে তাকিয়ে থাকলে অনেকক্ষণ।
ওই গাড়িটা শেষ বার দেখা গেছে কক্সবাজার সুগন্ধা ব্রিজ মার্কেটের কাছাকাছি। এখন পর্যন্ত সেখানেই রয়েছে।
এবং এই গাড়ির মূল মালিক হচ্ছে বন্ধনবাড়িয়ার তাপস পাল। বছরখানেক আগে তার বাড়ি থেকে চুরি হয়ে গিয়েছিলো গাড়িটা। থানা ডায়েরি করা হলেও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেহেতু দীর্ঘদিনের পুরনো, আর আরও গাড়ি ছিলো সেহেতু খুব বেশি ঝামেলা করেনি।
এক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ এতোটুকুই তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে। তবে এতে সন্তুষ্ট হলো না আবরার।
পুলিশের ওপর ভরসা হারিয়ে ফেললো। শুধু এতোটুকু জেনে খুশি হলো যে আদ্রিতাকে কক্সবাজারের কোথাও না কোথায় রাখা হয়েছে। পুরো বাংলাদেশ বাদ দিয়ে এখন শুধু ওই জায়গাটা খুঁজতে হবে। সেই জন্য আপাতত কক্সবাজার পৌঁছানো অতীব জরুরী।
সেই সে হেলিকপ্টার নিয়ে ছুটে যায় কক্সবাজার।
পেছন পেছন ওর চার বন্ধুও ছোটে।
পানি পিপাসায় গলা শুকিয়ে গিয়েছে আদ্রিতার। কতক্ষণ একটুখানি পানির জন্য চিৎকার চেঁচামেচি করলো। তবে আশেপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না।
এ্যানি স্থির নেই। যে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। অন্ধকারেরও বিড়াল চোখে দেখে। তাই ছোটাছুটি করতে একটুও অসুবিধা হচ্ছে না।
আদ্রিতা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে।
আবরার আসবে।
কিন্তু কখন আসবে?
আদ্রিতার যে কষ্ট হচ্ছে।
এটা কি উনি বুঝতে পারছে না?
নাকি এখন পর্যন্ত জানেই না কিছু? যদি না জেনে থাকে তাহলে কিভাবে আসবে? আর না আসলে ওকে এখান থেকে কে বের করবে?
এতসব ভাবনার মাঝে পুনরায় কান্না পেয়ে গেলো। নাক টেনে কান্না আটকানোর চেষ্টা চালায়।
তখনই একফালি আলো এসে তার চোখে লাগে।
পিটপিট করে চোখ খুলতেই দেখতে পায় এ্যানি একটা জানালা খুলে ফেলেছে।
মানে এখানকার জানালা গুলো দেওয়ালের মতোই। শুধু হাত রাখলে বোঝা যাবে না।
এ্যানি জোরে আঘাত করেছে বলেই খুলে গিয়েছে। খুশি হলো আদ্রিতা। এক দৌড়ে ছুটে গেলো জানালার কাছে। উঁকি দিতেই দেখতে পায়
সে পাহাড়ের ওপরে রয়েছে। আশেপাশে মানুষ থাকার কথা নয়। কারণ যত দূর দৃষ্টি যাচ্ছে শুধু গাছপালা দেখা যাচ্ছে। আর দূরে সমুদ্র।
সমুদ্রের পানি দেখতেই আদ্রিতার পিপাসা বেড়ে গেলো। সে কি এখান থেকে বের হবে? না কি এখানেই অপেক্ষা করবে আবরারের জন্য?
এ্যানি ইতিমধ্যে জানালা দিয়ে লাফিয়ে নেমে গেছে। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে সে হয়তো কোনো মানুষ খুঁজছে যার কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে।
মানুষ না পেয়ে হতাশ হয়ে আবার ফিরে আসলো মালিকের কাছে।
আদ্রিতা কিছু মুহূর্ত চিন্তা করল। তারপর ভাবল তার আপাতত এ পক্ষ থেকে বের হওয়া দরকার। যারা কিডন্যাপ করেছে তারা যদি পুনরায় ফিরে আসে এবং ওকে এখান থেকে আরও দূরে নিয়ে যায়?
তার থেকে ভালো হবে এই কক্ষ থেকে বের হয়ে আশেপাশে মানুষ খোঁজা। তাদের থেকে ফোন নিয়ে বাবাকে বা মামাকে কল করা।
এসব ভেবে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ার চিন্তা করলো।
পুরো শরীরে কাদা লেগে আছে। জুতো জোড়া কোথায় হারিয়ে গেছে সেটা জানা নেই। ওড়নাটাও খুঁজে পেলো না।
শেষমেষ জানালার গ্রিলের উপর উঠে লাফ দিলো। পায়ের নিচে ছিলো শুকনো কাঠ এবং পুরনো লোহা।
একটা লোহা ঢুকে পড়লো অদ্রিতার পায়ে। ব্যথায় চোখ মুখ লাল হয়ে গেলেও মুখ থেকে একটা শব্দও বের করলো না।
কেনোনা ওপাশ থেকে লোকজনের আওয়াজ আসছে। নিশ্চয়ই ওই মনা আর ছেলেটা আবার এসেছে।
ওরা যদি দেখতে পায় আদ্রিতা জানালা খুঁজে পেয়েছে তাহলে আর এখানে রাখবে না।
আপাতত যত দ্রুত সম্ভব এই জায়গা থেকে দূরে যেতে হবে।
এটা ভেবেই ক্ষত পা নিয়ে প্রাণ প্রাণে ছুড়তে থাকে আদ্রিতা। ওর সাথে সাথে দৌড়াচ্ছে এ্যানি।
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪৮
সুগন্ধা ব্রিজ মার্কেটের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কাঁচা মাটির রাস্তা। ওদিক দিয়ে মানুষে চলাচল একদমই নেই বললেই চলে। কিডন্যাপার আদ্রিতাকে রাখার জন্য জনমানব শূন্য এলাকায় বেছে নেবে।
এতোটুকু আন্দাজ করেছে সিয়াম। ওর আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে হেলিকপ্টার থামানো হলো পাহাড়ের উপরে।
আবরার এক লাফে নেমে পরলো। এবং তার চোখে পড়লো আদ্রিতার জুতো।
