তোমার আমার গল্প পর্ব ১৩
noorayn
আলিশার কান্নার শব্দে শাইনা বেগম ছুটে এসে তাকে ধরলেন।
কি হয়েছে পুতুল? এভাবে কান্না করছিস কেন?
“বড় মা, আরহা…আরহাম…” কান্নার জন্য কথা বলতে পারছেনা সে।
“কি হয়েছে আরহামের?”
–আলিশা কোনোমতে ভিডিওটা দেখালো। সেটা দেখে শাইনা বেগম কিছু বলার আগেই আলিশার ফোনে কল আসলো আরাফের।
–শাইনা কলটা ধরে বললেন –
“আরাফ আমার আরহাম কোথায়? ভিডিও টা কিসের?”
আলিশার ফোন শাইনা ধরায় আরাফ একটু হকচকিত হলেও পরে স্বাভাবিক হয়ে বললো –
“রিলেক্স আন্টি, আরহাম ঠিক আছে। বাড়ি ফেরার পথে তার ছোটখাটো একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। তবে, এখন ঠিক আছে। আমরা সময়মতো তাকে হসপিটাল নিয়ে এসেছি।
আলিশা বারবার আরহামকে কল দিচ্ছিলো দেখে, আমিই কিছু না ভেবে তারাহুরাই ভিডিওটা দিয়েছি।”
“তোমরা কোথায় আছো এখন?”
“সেফ কেয়ার হসপিটালে আছি।”
“আমরা আসছি” বলেই কল কেটে দিলেন শাইনা।
“আরহামের কি হয়েছে বড় মা?”
“পুতুল শান্ত হও। এভাবে কান্না করলে বাচ্চার ক্ষতি হবে।”
“আগে বলো, আমার আরহামের কি হয়েছে?”
“একটু ব্যাথা পেয়েছে আর কিছুই হয়নি ; ঠিক আছে সে। তুমি ঘুমাও মা। আমরা আরহামকে নিয়ে আসছি।”
“না, আমিও যাবো।”
“জেদ করবেনা পুতুল, এই শরীর নিয়ে যেতে পারবেনা তুমি।”
“আমি যাবোই, প্লিজ।”
–আলিশার জেদে শেষ পর্যন্ত হার মানলেন শাইনা।
তারপর গিয়ে বাকিদের জানালে, সবাই তাড়াহুড়া করে হসপিটাল গেলো।
হসপিটালে সকলে এখন আরহামের ক্যাবিনে অবস্থান করছে।
এতজনকে একসাথে ডাক্তার এলাউ করতে চায়নি তবে খান পরিবারকে চিনেন বিধায় কিছু বলেননি।
শাইনা আরহামের কাছে গিয়ে কড়া ভাষায় তাকে বকতে লাগলেন –
“আজকের পর কোনোদিন যদি বাইক চালিয়েছিস তবে আমার চেয়ে আর কেউ খারাপ হবেনা। আমি বুঝিনা, গাড়ি ফেলে কেন বাইক চালাতে হবে? আজ যদি খারাপ কিছু হয়ে যেতো।” বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন শাইনা।
“মা থামো তো, ঠিক আছি আমি।”
ইজাজ সাহেব ছেলেকে ধমকে বললেন –
“চুপ কর, বেয়াদব ছেলে। এত রাতে সবাইকে পেরেশানিতে ফেলে শান্তি হয়েছে তোমার?”
নিয়াজ সাহেব বড় ভাইকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন।
“যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এখন এসব নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমি ডিসচার্জ ফর্মালিটি পূরন করে আসছি।”
–আয়শা তখন ক্যাবিনের বাইরে আলিশাকে সামলাতে ব্যাস্ত।
–সকলে আরহামের ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আলিশা ক্যাবিনে প্রবেশ করলো।
আরহাম কেবল চোখ বন্ধ করেছিলো ; এরমধ্যেই, কেউ একজন আচমকা তার বুকে হুমরি খেয়ে পড়েছে। সে জানে এটা কে?তাই চুপ করে থাকলো।
“এই উঠ, এমন পাগলের মত করছিস কেন?”
“তুই ইচ্ছা করেই এসব করেছিস তাই না?” বলেই আরহাম এর বুকে কিল মারতে লাগলো।
“আহ…থাম থাম।। কি করছিস এসব?”
“বেশি ব্যাথা পেয়েছো?”
“না, ঠিক আছি।”
–এটা শুনেই আলিশা আবার আরহামের বুকে মুখ গুজে কাঁদতে শুরু করলো।
এভাবে ২ মিনিট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আরহাম আলিশার মাথায় হাত রেখে বললো –
“হ্যাপি বার্থডে জান।”
–কথাটি শুনে আলিশা তার বুক থেকে মাথা তুলে জিজ্ঞেস করলো – “মনে আছে তোমার?”
“ভুলে যাওয়ার কথা ছিলো?”
“আমি ভেবেছি তাই…”
“আগে কোনোদিন ভুলেছি?”
“না”
“তাহলে?”
–আলিশা চুপ।
“তোর জন্য তাড়াহুড়া করে বাড়ি ফিরতে গিয়েই তো এই অবস্থা।”
“তার মানে সব আমার জন্য হয়েছে?”
“না, আমিই বেশি স্পিডে বাইক চালাচ্ছিলাম তাই। এসব ছাড়, আগে বল ; তুই কেন এসেছিস এখানে?”
“আসবোনা বলছো?”
“এই অবস্থায় কেন আসতে হবে?”
“বাবু বলেছে আসতে।” বলেই আরহামে ডান হাত নিয়ে নিজের বাড়ন্ত উদরে রাখলো।
“বাবু ঘুমাচ্ছে।” (আরহাম)
“না, জেগে আছে ও। একটু আগেও ফুটবল খেলেছে আমার পেটে।”
–আলিশার কথা শেষ হতে না হতেই আবারও কিক করলো বেবী।
“এই দেখো আবার।”
“লিশা ও অনেক ছোট্ট তাই না?”
“হুম”
“কাপড়টা একটু উঠাবি? ওকে দেখবো।”
“মাথা খারাপ হয়েছে তোমার? এটা হসপিটাল।”
“কেউ আসবেনা এখন।”
“না”
“প্লিজ।”
–মনে সংকোচ নিয়ে হলেও আলিশা আস্তে আস্তে তার পড়নের ফ্রকটা পেটের উপরে তুললো।
আরহাম চেয়ে রইলো সেদিকে। সতপর্নে, আলিশার পেটে হাত বুলাতেই যেন নিজের অস্তিত্বের টের পেলো।
“আহ…” (বাবু আবার কিক দিয়েছে)
“লিশা…”
“কি?”
আরহাম উচ্ছ্বসিত কন্ঠে জানালো –
“জানিস? ওর ছোট্ট পা দেখেছি আমি। অনেক ছোট।”
“সত্যি? আমিও দেখবো। ” পেটের দিকে তাকালো আলিশা।
“কোথায়? দেখছিনা তো।”
“ও তোকে দেখাবেনা। কেবল বাবাকেই দেখাবে।”
“পেটে রাখছি আমি, কষ্ট করছি আমি আর সব ভালোবাসা বাপের প্রতি?” (রেগে বললো আলিশা)
–দুজনের কথার মাঝেই নার্স এসে প্রবেশ করলো।
নার্সকে ভেতরে আসরে দেখেই ওরা থতমত খেয়ে গেলো।
আলিশা তড়িঘড়ি নিজের কাপড় ঠিক করলো আর আরহাম নার্সকে উদ্দেশ্য করে কটমটিয়ে বললো –
“ম্যানার্স নেই আপনার? আসার আগে নক করেন নি কেন?”
–নার্স বেচারি চুপ।
ইতিমধ্যে, ইজাজ সাহেব এসে তাড়া দিলেন –
“চলো ডিসচার্জ হয়ে গেছে।”
আয়শা এগিয়ে এসে আরহামকে জিজ্ঞেস করলেন –
“বাবা তুমি একা পারবে?”
“পারবো ছোট মা।”
বাড়ি ফেরা মাত্রই আরহাম ঘুমিয়ে পড়লো হাই ডোজ মেডিসিনের পাওয়ারে।
–সবাই একে একে আলিশাকে উইশ করলো।
ইজাজ সাহেব আলিশার মাথায় আদরের সহিত হাত রেখে বললেন –
“স্যরি মা। এতকিছুর মধ্যে তোমার জন্মদিনের উইশ টাও ঠিকমত করতে পারিনি।”
“কিছু হবে না বড় বাবা।” বলেই আলিশা জড়িয়ে ধরলো ইজাজ সাহেব কে।
আলিশা প্রেগন্যান্ট তাই এবারের জন্মদিন আর বড় করে করা হবেনা। এরজন্য, আলিশা নিজেই মানা করেছে।
পরদিন সকালে…
আরহাম সজাগ হতেই আলিশা জিজ্ঞেস করলো –
“উঠেছো? নাস্তা এখানে নিয়ে আসি?”
“না, পারবো আমি।”
“তাহলে উঠো, ফ্রেশ হয়ে আসো আমার ক্ষিদে পেয়েছে।”
“ডোন্ট টেল মি লিশা যে, তুই এখনো না খেয়েই আছিস!”
“তোমার জন্য ওয়েট করছিলাম।”
“তাই বলে এই অবস্থায় না খেয়ে থাকবি?”
“এখন তুমি কথা বলেই দেরি করছো।”
–আরহামের বাম হাতে ফ্রেকচার হয়েছে। ডান পায়ের হাঁটুর কাছে অনেকটা ছিলে গেছে।
“আমি হেল্প করবো?” (আলিশা)
“নিজের দিকে তাকা আগে তারপর হেল্প করিস।” বলেই ফ্রেশ হতে চলে গেলো আরহাম।
–আরহাম ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখে, আলিশা বেডে মন খারাপ করে বসে আছে।
“কি হয়েছে?”
“ভালো লাগছেনা।”
“কেন?”
আলিশা গাল ফুলিয়ে কোনোমতে বললো –
“আমি কি অনেক মোটা হয়ে গেছি?”
“হ্যাঁ অনেক, একদম কুমরো পটাশ এর মতো।”
“তুই ইচ্ছে করেই এসব বলছিস। আমি জানি, আমি এখনো অনেক সুন্দর আছি।”
আরহাম মুখে হাত দিয়ে হাসি থামানোর ভঙ্গি করে বলছে –
“হ্যাঁ ঠিক তাই।”
–আলিশা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আয়শার ডাক পড়লো।
“আরহাম-আলিশা জলদি এসো”
“চল, সবাই অপেক্ষা করছে।”
–আরহাম-আলিশা ডাইনিং টেবিলে এসে বসে পড়লো যে যার বরাদ্দকৃত চেয়ারে।
“গুড মর্নিং এভেরিওয়ান” (আরহাম)
“গুড মর্নিং” (সবাই একসাথে)
“এখন কেমন লাগছে?” (ইজাজ)
“আগের চেয়ে বেটার।”
মেহরোজা আক্তার হায়হায় করে বললেন –
“আমার নাতিটার যে কার নজর লাগলো। এই বড় বউ শুনো, আজকেই হুজুর ডাকবা”
“ঠিক আছে আম্মা।”
নিয়াজ সাহেব মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন –
“আমার প্রিন্সেসের কি চায় এবারের জন্মদিনে?”
আলিশা এবার উৎসাহিত হয়ে আবদার করলো –
“আমার একটা নিউ কার চাই, বাবা।”
“ঠিক আছে, আমার আম্মা যা চেয়েছে তাই হবে।”
“কিসের নিউ কার? আগেরটার কি হয়েছে?” (আয়শা)
“ওটা পুরান হয়ে গেছে মাম্মা।” (আলিশা)
“২ বছর ও হয়নি।”
“আহা, আয়শা এমন করছো কেন?” (নিয়াজ)
“আপনি ওকে বেশি আদর দিয়ে দিয়ে বাঁদর বানিয়েছেন।” (আয়শা)
মেহরোজা আক্তার নিজের প্রিয় নাতনির পক্ষ নিতে সদা এগিয়ে থাকেন। তাই এবার তিনিও মুখ খুললেন –
“চুপ কর, ছোট বউমা। আমার পরী যা চেয়েছে তাই পাবে।”
আলিশা এবার নিজের বড় বাবার কাছে জানতে চাইলো –
“বড় বাবা তুমি আমাকে কি দেবে?”
“এটা তো সারপ্রাইজ আম্মা। এখনই বলা যাবেনা।”
আরহাম মাঝে দিয়ে ফোড়ন কেটে শুধালো –
“কেউ কিছু দিবেনা তোকে। দুইদিন পর বাচ্চার মা হবি সেখানে এত আবদার করছিস কেন বাচ্চাদের মতো?”
“তোর থেকে চেয়েছি? তুই কেন হিংসা করছিস আমাকে? খবরদার, আমার নিউ কার আসলে তার কাছেও ঘেষবিনা।”
আয়শা ধমকে উঠলেন মেয়েকে –
“আলিশা কতবার মানা করেছি তোমাকে? আরহামের সাথে তুই তোকারি করবেনা ; স্বামী হয় সে তোমার”
শাইনা আলিশার পক্ষ নিয়ে বললেন –
“আহা আয়শা, শুধু শুধু পুতুলকে বকা দিবিনা। এসবের শুরু কিন্তু আরহামই করেছে।”
এবার শাইনা আরহামের দিকে চেয়ে বকাবকি শুরু করলো-
“আর আরহাম তুমি পুতুলকে বলার আগে নিজের দিকে দেখো। পুতুল একা মা হচ্ছেনা সাথে তুমিও বাবা হচ্ছো তবে এখন পর্যন্ত তুমি তোমার কোনো চালচলন ঠিক করোনি। পড়ালেখার বালায় নেই ; সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়াবে আর আছে এক স্টুডিও ; সেখানে দিনরাত পড়ে থাকবে।” (শাইনা)
“আরহাম, তোমার এবারের সেমিস্টার রেজাল্ট এত খারাপ এসেছে কেন?” (ইজাজ)
“তুমি আমার রেজাল্ট কিভাবে জানো বাবা?”
“প্রিন্সিপাল কল করেছিলো আমাকে। তোমার এটেন্ডেন্সও এতো কম! সারাদিন করোটা কি তুমি?”
আরহাম চুপ করে আছে।
অন্যদিকে, আলিশা মিটিমিটি হাসছে। একদম ভালো হয়েছে ; তাকে বাঁশ দিতে গিয়ে নিজে বাঁশ খেয়ে বসে আছে।
এ.এম.কে স্টুডিওতে এখন আরহাম তার দল নিয়ে বসে আছে।
–হঠাৎ’ই আরাফ লাফাতে লাফাতে আরহামের দিকে এগিয়ে এসে সবাইকে অবাক করে দিয়ে জানালো – “হেই আরহাম, কি হয়েছে জানিস?”
“কি?”
“আজ সকালে ডাইরেক্টর কল করেছিলো। সামনের মাসে নাকি মিউজিসিয়ান এলভি ডিসুজা আসছে ইউকে থেকে। এন্ড ডু ইউ নো হোয়াট? হি ওয়ান্টস টু কোলাব উইথ এ.এম.কে মিউজিক ব্যান্ড!”
–কথাটি শুনেই আরহাম হাত থেকে গিটার রেখে সিরিয়াস হয়ে বসলো।
আরাফ আবারও উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো –
“এটা যদি হয়ে যায় তবে আমাদের ইন্টারন্যাশনাল পর্যায়ে পৌঁছাতে খুব বেশি দেরি নেই।”
“এখনো কিছু ফাইনাল হয়নি। সো রিলেক্স ব্রো।”
“তবে একটা বিষয় আছে?”
“কি সেটা?”
“কোলাবরেশেনের জন্য তোকে ইউকে যেতে হবে এলভির সাথে। তা যেতে পারবি তুই?”
“সেটা নাহয় এলভি আসলেই তা বুঝা যাবে।”
আজ আলিশা সারাদিনই তেমন কিছুই খায়নি।
তার মতে সে বেশি বেশি খেয়ে মোটা হয়ে যাচ্ছে এবং এতে
আরহাম নাকি তাকে মোটা বলেছে – এই অভিযোগে আজ পুরাদিন সে না খাওয়া।
–শাইনা বেগম এই নিয়ে বেজায় রেগে আছেন আরহামের উপর। কি দরকার ছিলো মেয়েটাকে এসব বলার?
এরমধ্যে, আবার এই ছেলে ফোন ধরছেনা।
আয়শা মেয়েকে আদর করতে করতে বললেন –
“আলিশা জেদ করোনা মা। খেয়ে নাও একটু।”
“না মানে না।”
“আলিশা, তুমি একটুও মোটা হওনি। সব মায়েদেরই এই সময়ে শরীরে এমন চেঞ্জেস আসে তবে তা বাবু হওয়ার পর ঠিক হয়ে যায়।”
“আরহাম না আসা পর্যন্ত আমি কিছুই খাবোনা।”
–শাইনা সে কবে থেকে আরহামকে কল দিয়ে যাচ্ছেন। এখন দু’ঘন্টা পর সময়ে হয়েছে এই ছেলেএ ফোন ধরার।
“হ্যালো মা, এতবার কল দিচ্ছো কেন? আমি মিটিংয়ে আছি।”
“এক্ষুনি বাসায় আসো তুমি”
“এখন আসতে পারবোনা। আমার ফিরতে রাত হবে।”
“রাত পর্যন্ত কি মেয়েটা না খেয়ে থাকবে?”
“কোন মেয়ে?”
“পুতুল সকাল থেকে না খেয়ে আছে তোমার জন্য”
তোমার আমার গল্প পর্ব ১২
“আবার কি নাটক শুরু করেছে ও?”
“বাসায় আসো তুমি”
“মা ওকে সামলাও প্লিজ, আমি এখন বাসায় আসতে পারবোনা।”
“তুমি কেন তোমার বাপ ও আসবে।”
