তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৬
noorayn
নীলা – আরশাদ ফ্লাইটে উঠেছে অনেক আগেই। এরমধ্যে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, ওদের পৌঁছাতে হয়তো বিকেল হবে বাংলাদেশি টাইমে।
এখন রাত প্রায় ১ টা।
আয়শা আর শাইনা সকল কাজ শেষ করে ঘুমাতে চলে গেছেন। বাকিসব কাজ সার্ভেটরা করে নেবে সকালে।
আরহাম সেই ৮ টা বাজে বেরিয়েছিলো বন্ধুদের সাথে, এখনো ফেরার নাম নেই। শাইনা বেগম কল দিয়ে অনেক বকেছেন – বাপ হয়েছে এখনো কোনো পরিবর্তন নেই বরং দিনদিন রসাতলে যাচ্ছে।
আলিশা ডিনার করে ছোট্ট আরশান কে বুকে নিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে কিন্তু এই ছেলের চোখে ঘুমের রেশমাত্র নেই। কেমন পিটপিট করে মায়ের দিকে চেয়ে আছে। এতো চেষ্টা করেও ঘুম পাড়াতে পারলোনা আলিশা, সব দোষ এর বাপের। সেই কোলে নিয়ে নেচে-কুঁদে ঘুম পাড়ানোর অভ্যাস করিয়েছে, এখন আর বাপ ছাড়া ঘুমাচ্ছেনা। উফ কি জ্বালা – আরহাম সঠিক নাম দিয়েছে ছোট মরিচ।
আলিশা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে হেঁটে হেঁটে বহুকষ্টে ঘুম পাড়িয়েছে। তারপর ডোরাকে দোলনাতে শুইয়ে দিয়ে চলে গেলো শাওয়ার নিতে।
আরহাম বাড়িতে ফিরেছে রাত ২ টা নাগাদ। বাড়ির সামনে এসে গাড়ি পার্ক করে চোরের মতো ধীরে ধীরে মেইন দরজার পাসওয়ার্ড এন্টার করে ভিতরে প্রবেশ করেছে।
গাড়ির চাবি আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে মনের সুখে শিষ বাজাতে বাজাতে আসছিলো নিজের রুমের দিকে – কিন্তু যেই না রুমের দরজা খুললো দেখলো ভিতরে সব অন্ধকার। তার ভ্রু আপনা-আপনি কুচকে গেলো। ছোট মরিচ আর ধানিলঙ্কা কোথায় গেলো?
সে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিতে দিতে হালকা স্বরে ডাক দিলো -“লিশা…”
–না কোনো সারাশব্দ নেই।
লাইট অন হওয়ার পর দেখলো ছোট্ট ডোরা দোলনা তে ঘুমিয়ে আছে কিন্তু ওর মা কই?
ছেলেকে এভাবে অন্ধকারে রেখে কোথায় গিয়েছে ডিংডিং করে?
সে ডোরার কাছে গিয়ে তাকে চেক করে আবারো ডাক দিলো আলিশাকে কিন্তু এবারো কোনো সাড়াশব্দ নেই। আরহাম ওয়াশরুম/ড্রেসিং রুম চেক করে দেখলো কেউ নেই। তাহলে কোথায়?
হঠাৎ তার নজর পড়লো ব্যালকনির দিকে। যেখানে হালকা রশ্নির কিছু ঝিলিক দেখা যাচ্ছে।
সে ধীর পায়ে এগুলো বারান্দার দিকে – গিয়ে দেখলো কালো রঙের কিছু পড়া একজন রমনী খোলা চুলে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। প্রথম দেখাতে আরহাম মনে মনে ভয় পেয়ে বুকে থু থু দিয়ে বিড়বিড়ালো – “আমার বাড়িতে শাকচুন্নি কোথা থেকে এলো? আয়হায় আমার লিশা কই?”
সে মনে সাহস জোগাড় করে আয়াতুল কুরসি পড়তে পড়তে পা বাড়ালো বারান্দার দিকে।
এদিকে আলিশা সুন্দর করে সেজেগুজে শাড়ি পড়ে রেডি হয়েছে আরহাম কে জ্বালানোর উদ্দেশ্যে। আজ এই গন্ডারকে মজা বুঝাবে তাকে ভোটকি/বোরিং বলার কিন্তু যাই হোক কাছে আসতে দিবেনা।
গাড়ির শব্দে বুঝেছিলো যে আরহাম এসেছে তাই তো রুমের আলো নিভিয়ে বারান্দা এসে দাঁড়িয়ে আছে আর ইচ্ছে করেই এতবার ডাকার পরও কোনো আওয়াজ করেনি।
আলিশা ভেবেছিলো আরহাম তাকে বারান্দায় শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে চমকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরবে কিন্তু এতক্ষনেও এই গন্ডার আসছেনা কেন?
হঠাৎই আলিশার কানে বেজে উঠলো সূরার শব্দ যা ধীরে ধীরে বেড়ে চলছে। মানে কি এসব কি? এতো রাতে সূরা কে পড়ছে? আওয়াজ টা তার কাছে আসতেই সে পিছন ঘুরে তাকাতেই আরহাম জোড়ে “ডাইনি ডাইনি” বলে উল্টা দৌড় দিলো। আলিশা থমকে দাড়ালো – “এভাবে দৌড় দিলো কেন? আর ডাইনি? কে ডাইনি?” তারপর তার মনে পড়লো সূরার শব্দের কথা। তার মানে সূরা আরহাম পড়ছিলো। কিন্তু কেন?
একে একে দুই মেলাতেই আলিশার মুখ শক্ত হয়ে উঠলো। কোনোভাবে এই গন্ডার তাকে ডাইনি ভাবেনি তো?
হ্যাঁ তাই ভেবেছে নাহলে সে পিছু ফিরতেই এভাবে দৌড় দিলো কেন?
আলিশা যেন অবাক হতেও ভুলে গেছে। এতো সুন্দর করে যার জন্য সাজুগুজু করলো সেই কিনা তাকে ডাইনি ভেবে পালালো!
আলিশা দুঃখভরা মন নিয়ে কামরার দিকে এগুলো – কিন্তু গিয়ে দেখলো আরহাম একহাতে ডোরাকে কোলে নিয়ে দরজা খোলার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে।
আলিশার বড্ড কান্না পেলো এসব দেখে। সে চাইলো টা কি আর হলোটা কি?
আরহাম দরজা দিয়ে যেই না বেরিয়ে যাবে তখনি পিছন থেকে ডাক পড়লো আলিশার।
“এই দাড়াও, এক পা ও রুমের বাইরে দিবেনা।”
আরহামের পাজোড়া আপনা-আপনি থেমে গেলো। এটাতো তার লিশার শব্দ। কেমনে?
এই ডাইনি কোনোভাবে তার লিশার আওয়াজ নকল করে তাকে জ্বালে ফেলতে চাইছেনা তো?
আরহাম পিছে ফিরে তাকালোনা।
আলিশা বুঝতে পারলো এই গন্ডার কেন তাকাচ্ছেনা? নিশ্চয় ভয় পাচ্ছে। তাই সে তেজী গলায় বললো –
“এদিকে ফির গন্ডার। আমি সত্যিকারের আলিশা, কোনো ডাইনি না।”
গন্ডার ডাক শুনে আরহামের জানে প্রান ফিরে এলো।
সে এবার ডোরাকে নিয়ে পিছু ফিরলো। দেখলো আলিশা ছলছল চোখে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।
আরহাম এবার ভালো করে তাকালো আলিশার দিকে। দেখতেই যেন তার শ্বাস আটকে এলো।
কালো রঙের ফিনফিনে পাতলা শাড়ি জড়িয়েছে গায়ে।
এমনভাবে পড়েছে যাতে দেহের প্রায় শতাংশ উন্মুক্ত।
স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে ডিপনেক গলা। শাড়ি হাতের উপর তোলার কারনে ফর্সা উদর দৃশ্যমান।
খোলা চুল সাথে হালকা মেকআপ। আলিশা এমনিতেই ইতালিয়ান সুন্দরী তার উপর এমন সাজে যেন হুর লাগছে। আরহামকে ঘায়েল করার জন্য আলিশার এতটুক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট – সে যেন কথা বলতে ভুলে গেছে।
আরহামের ধ্যানের মাঝেই আলিশা কাছে এসে তার কোল থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে নিলো ডোরাকে।
আরহামের কারনে ঘুম ভেঙে গিয়েছে ডোরার।
আলিশা বুকে নিয়ে ফিড করাতেই আবারো ঘুমিয়ে গেলো ডোরা। চোখে ঘুম থাকায় এবার আর বিরক্ত করেনি বরং মা বুকে নিতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
ডোরা ঘুমিয়ে গেলে তাকে আবারো দোলনাতে শুইয়ে দিলো আলিশা। তারপর আয়নার সামনে এসে একে একে খুলতে লাগলো শাড়ির সব পিন। পড়বেনা সে কোনো শাড়ি।
এই শাড়ির জন্য তাকে শেষমেষ ডাইনি বলা হয়েছে।
আলিশা যখন পিন খুলতে ব্যাস্ত তখনি আরহাম এসে তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিয়েছে – তার হাত বিচরন করছে আলিশার উন্মুক্ত উদরে।
হঠাৎ এমন স্পর্শে আলিশা শুরুতে কেঁপে উঠলেও সব মনে পড়তেই ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো আরহামকে।
ধাক্কা খেয়ে ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো আরহাম।
“কি হলো? ধাক্কা দিলি কেন?”
“আমার কাছে এসেছো কেন?”
“তাহলে কার কাছে যাবো?”
“জানিনা, সরো।”
আলিশা আবারও পিন খোলায় মনোযোগ দিয়েছে।
“এমন করে না জান। তুই কষ্ট করছিস কেন? এসব খোলাখুলি তো আমার কাজ। আয়…”
“ডাইনির কাছে আসতে ভয় লাগবেনা?”
আরহাম থতমত খেয়ে বললো – “ওইটা কেবল একটা ভুল বোঝাবুঝি ছিলো জান। অন্ধকারে কালো শাড়িতে তোকে চিনতে পারিনি তার উপর তুই পিছু ফিরে ছিলি।”
“তাই বলে ডাইনি?”
“স্যরি। আর হবেনা।”
আরহাম আবারও আলিশার কাছে আসার চেষ্টা করলো।
কিন্তু আলিশা যেন সুযোগ পেয়েছে এই গন্ডার নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরানোর।
“আমি না ভোটকি?”
“হ্যাঁ ভোটকি তো, আমার কিউট ভোটকি।”
আরহাম নারভাসনেসে কি বলছে নিজেও জানেনা।
“কিইইই!!!”
“না, মানে ওই…তুই একটু ও ভোটকি না।”
“তাহলে আমায় ভোটকি বলো কেন?”
“আদর করে ডাকি। সবাই তো জান/প্রান/সোনা ডাকে তাই আমি নাহয় একটু ইউনিক করে ডাকার চেষ্টা করি।”
বলতে বলতে আলিশার দিকে এগিয়ে এলো আরহাম। যেই না তার আঁচলে হাত দিবে তার আগেই আলিশা সরে যায়।
“আমি তো বোরিং। তবে এখন কেন কাছে ডাকছো?”
“তুই মোটেও বোরিং না।”
“বিকেলে না বললে আমি বোরিং?”
“কাজ করছিলাম তাই কি বলেছি খেয়াল ছিলোনা।”
“যাই হোক, বলেছো তো।”
“স্যরি।”
“এভাবে হবেনা”
“তো কিভাবে?”
“কান ধরে দশবার উঠবস করতে হবে।”
“হোয়াটটট!!”
“পারবেনা?”
“এটা কিন্তু বেশি বেশি হচ্ছে লিশা।”
“ওকে ফাইন। করতে হবেনা।”
“আচ্ছা, করছি।”
“শুরু করো। এক…দুই..তিন..”
আরহাম বাধ্য হয়েই দশবার কান উঠবস করলো। শাস্তি শেষ হলেই আরহাম একপ্রকার পেঁচিয়ে ধরলো আলিশাকে।
“নাও ইটস মাই টার্ন।”
তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৫
পরেরদিন বিকেল ৪ টা বাজে,
একটা বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামলো খান ম্যানশেন এর সামনে। গাড়ি থেকে প্রথমে বেরিয়ে এলো খান বাড়ির বড় ছেলে আরশাদ খান। তারপর তার হাত ধরে বেরিয়ে এলো খান বাড়ির বড় মেয়ে এবং বড় পুত্রবধূ নীলিমা খান।
