Home তোমার আমার গল্প তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৮

তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৮

তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৮
noorayn

সময়ের স্রোত বয়ে গেছে আপন গতিতে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে পেরিয়ে গেছে কয়েকটি মাস।
রাত্রি প্রায় শেষ প্রহরের দিকে। স্নিগ্ধ ভোর শুরুর পথে। ঘড়ির কাঁটা প্রায় ৫ টা ছুঁইছু্ঁই। বাহিরে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাইরে শীতল বৈরী বাতাস বইছে। ফজরের পর প্রকৃতি যেন এক ভিন্ন রূপ ধারণ করে। চারপাশে নেমে আসে এক অন্যরকম প্রশান্তি, আর সেই বৈরী বাতাসের স্পর্শে ভোরের সৌন্দর্য যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।
আরহাম-আলিশা ঘুমিয়েছে কেবল ২ ঘন্টা আগে। গত রাত্রি একে-অপরের সান্নিধ্যে এসে তাল হারিয়েছিলো দুটি দেহ – মত্ত হয়ে উঠেছিলো দুজন দুজনাতে। শেষ রাতের দিকে শাওয়ার নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছিলো দুজন।

তারা ঘুমানোর কিছুক্ষন পরই শোনা যায় বাচ্চার রিনরিনিয়ে কান্নার স্বর। আলিশা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলো বিধায় জেগে উঠেনি। আরহাম ঘুমঘুম চোখ মেলে দেখে দোলনায় ঘুমিয়ে থাকা ডোরা একটু পরপর কেঁদে উঠছে। নিশ্চয়ই ক্ষিদে পেয়েছে তার। আরহাম একবার আলিশার দিকে তাকিয়ে সতর্পণে উঠে গিয়ে ছেলেকে কোলে নিয়ে ফিরে আসলো।
ডোরা ক্ষিদায় কান্না করছে দেখে সে নিজেই আলিশার জামার হুক খুলে ডোরাকে মায়ের বুকে শুইয়ে দিলো। আলিশা একবার চোখ মেলে দেখেছে ডোরা খাচ্ছে তারপর তাকে ভালো করে বুকে জড়িয়ে আবার পাড়ি দিলো ঘুমের দেশে।
ডোরা রাতের বেলা মা-বাবার সাথে বিছানাতেই ঘুমায়। শুরুতে মায়ের বুকে থাকলেও সময়ের সাথে সাথে গড়াগড়ি করে চলে যায় বাবার বুকে। এই যেন নিত্যদিনের অভ্যাস তার। বাবার বুকে থাকলেও একটু পর পর মায়ের কাছ থেকে খেয়ে আবার বাবার দিকে চলে যায়। আরহামও পরম আদরে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নেয়।
গতরাতে ব্যাক্তিগত মুহুর্তের সময় আরহাম ডোরাকে নিয়ে দোলনায় শুইয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু রাত শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে গেলো তার গলা উঁচিয়ে কান্না। তারপর আবার তার ঠায় হলো মা-বাবার মাঝে। গড়াগড়ি করে দুজনের বুকে।

এখন সকাল প্রায় ৬ টা…
আরহাম-আলিশা এবং ডোরা, তিনজনই ঘুমে বিভোর।
ডোরা স্থীর হয়ে এক জায়গায় শুতে পারেনা। পুরারাত এখান থেকে সেখানে গড়াগড়ি খায়। কখনো মায়ের বুকে তো কখনো বাবার বুকে। তাও যেন তার সাধ মেটেনা। কখনো নিজে উল্টো হয়ে শুয়ে থাকে আবার কখনো গড়াতে গড়াতে পায়ের দিকটায় চলে যায়। এখন যেমন মায়ের পেটে মাথা এবং বাবার মুখের উপর নিজের গুলুমুলু পা দুটো দিয়ে আরামে ঘুমিয়ে আছে। আরহাম বেশ বিরক্ত হচ্ছে এতে, বারবার ছেলের ছোট পা-জোড়া মুখ থেকে সরিয়ে রাখছে কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। যতবার আরহাম মুখ থেকে পা সরিয়ে দিচ্ছে ঠিক ততবার ছোট্ট আরশান নিজের পা আবারও বাবার মুখের উপর তুলে দিচ্ছে। এখন এক পা আরহামের মুখের উপর এবং আরেক পা গলার উপর। শেষে আরহাম হার মেনে নিয়ে সেভাবেই ঘুমিয়ে পড়লো – ঘুমের মধ্যে সে বিড়বিড় করে বলছে – “এই ছোট মরিচের বাচ্চা আমাকে একটু শান্তিমত ঘুমাতেও দেয়না। দিনে এর মা জ্বালায় আর রাতে ছেলে। উফ বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা।” বলতে বলতে আবারও ঘুমে মগ্ন হলো সে।

“আহহহহহহহহহহ”
হঠাৎ এমন তীব্র আর্তনাদের স্বরে আলিশা এক লাফে ঘুম থেকে উঠে বসলো।
“কি হয়েছে? কি হয়েছে? কে চেঁচালো এভাবে?” বলতে বলতে আলিশার নজর যায় আরহামের দিকে – যে এখন দুহাতে নিজের অন্ডকোষ চেপে ধরে আছে।
তাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে আলিশা ভ্রু কুঁচকে বললো –
“এই সাধ-সকালে এমন অশ্লীল ভঙ্গিতে বসে আছো কেন? অসভ্য পুরুষ।”
আরহাম উত্তর করলোনা বরং চোখ দিয়ে ভষ্ম করে দিবে এমনভাবে তাকালো আলিশার দিকে।
আরহামের এমন লুক দেখে আঁতকে উঠলো আলিশা। কেননা তার চোখজোড়া লাল হয়ে আছে।
আলিশা কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে এর আগেই আরহাম চেঁচিয়ে দিয়ে বললো বরফ আনতে। পরিস্থিতি দেখে আলিশা কিছু না বলেই তড়িঘড়ি করে বরফ নিয়ে আসলো।
“এনেছি। এবার বলো বরফ দিয়ে কি করবে?”
আরহাম চটজলদি বরফ হাতে নিয়ে ট্রাউজারের উপর দিয়েই ব্যাথিত স্থানে চেপে ধরলো।
আলিশা তা দেখে অবাক না হয়ে পারলোনা – “ছিহ ছিহ। এসব কি করছো?”

“দেখতে পারছিস না?”
“দেখতে পাচ্ছি বিধায় জিজ্ঞেস করছি।”
“ব্যাথা পেয়েছি এখানে।”
“কেমনে?”
আরহাম ছোট্ট ঘুমন্ত ডোরার দিকে কটমটিয়ে চেয়ে বললো –
“তোর গুনধর ছেলে ঘুমের মধ্যে লাথি দিয়েছে আমার পুরুষত্বে।” বলেই নিজের ব্যাথিত স্থানের দিকে তাকালো মায়া মায়া চোখে।
আলিশার মুখে হাত। একবার ঘুমন্ত ডোরার দিকে তাকাচ্ছে তো আরেকবার আরহামের দিকে। ছেলে তার বড় হয়ে ফুটবলার হবে জানতো তাই বলে প্রথম গোলই বাপের অন্ডকোষে দিলো!
আলিশা ঢোক গিলে আমতা আমতা করে শুধালো –
“বেশি লেগেছে?”
এমন প্রশ্নে আরহাম দাঁতে দাঁত চেপে বললো –
“না একদমই লাগেনি। আমিতো মনের সুখে আকাশে উড়ছি।”
দুইহাত পাখির ডানার মতো ঝাপ্টে দেখালো সে।
“কোথায় লেগেছে দেখি?” বলেই আলিশা বহুকষ্টে হাসি কন্ট্রোল করে আরহামের ট্রাউজারের দিকে হাত বাড়াতে গেলে আরহাম দিলো এক ধমক।
“দূরে সর বেশরম মহিলা। একদম আমার সম্পদের দিকে হাত বাড়াবিনা। সব তোদের মা-ছেলের মিলিত কারসাজি।”

“আমি কি করলাম?”
“এই ছোট মরিচ কে তুই শিখিয়েছিস তাই না? যাতে আমার সম্পদে কিক মারে?”
“আমি কেন শেখাতে যাবো?”
“তাহলে আমার এখানে কিক দিলো কেন? কই তোকে তো কোনোদিন দেয়না।”
“আমি কিভাবে জানবো?”
“এই হিংসুটে ছেলে ইচ্ছে করে করেছে যাতে তার ভাই-বোন আসতে না পারে। সব আদর তার একার চায়।”
“আমার এতোটুক ছানার উপর একদম দোষ দিবেনা বলে দিলাম।”
“হ্যাঁ তোর ছানা আরেকটু হলে আমার বংশের বাত্বি নিভিয়ে দিতো। সেটা কিছুনা?”
“ও কি এতসব বোঝে? এতো ছোট বাচ্চা আমার।”
“বুঝে বুঝে সবই বুঝে। আজ বিয়ে দিলে কালই বাপ হয়ে যাবে তোর এতটুক বাচ্চা।”
“সবাই কি আর তোমার মত?”
“কি বললি?”
“কিছুনা।”

“উফ, এখনো জ্বলছে। এতোটুক মরিচের পায়ে এতো জোড় কেমনে?”
“বাচ্চাদের হাত-পায়ের থাবা একটু জোড়েই লাগে। আর ১৬ মাসের বাচ্চার কিক আর কতই বা লাগবে?”
“তোর ১৬ মাসের বাচ্চা আমার এবং তোর ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিতো আরেকটুর জন্য।”
আলিশা কিছু বলতে যাবে তার আগেই ডোরা শব্দ করে কেঁদে উঠলো। মায়ের সাইডে ফিরে নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে মাকে খুজছে সে।
আলিশা তা দেখে ছেলের কাছে গিয়ে তাকে কোলে আগলে নিলো। ডোরা বারবার মায়ের বুকে মুখ ঘেষছে। যেন বোঝাতে চাচ্ছে তার ক্ষিদে পেয়েছে।
আলিশা ডোরা কে খাওয়াতে শুরু করলে সে শান্ত বাচ্চার মতো মায়ের বুকে লেপ্টে চুকচুক শব্দ করে খাচ্ছে আর একহাত উপরে তুলে এদিক সেদিক ঘুরাচ্ছে।
আরহাম মা-ছেলের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার শুয়ে পড়লো। তার ঘুম পাচ্ছে অনেক। ঘুমানোর আগে আলিশাকে কাটকাট শব্দে জানিয়ে দিলো যাতে মা-ছেলে কেউই তার ঘুমের বেঘাত না ঘটায়।

সকাল ১০ টা…
আলিশা একটু আগে ছেলেকে ফ্রেশ করিয়ে খাইয়ে নীলার কাছে দিয়ে এসেছে। তার ক্লাস আছে একঘন্টা পর।
আলিশা রেডি হয়ে ব্যাগে সব বইখাতা ঢুকাচ্ছে। আরহাম এখনো উঠেনি ঘুম থেকে। তাকে উঠাতে হবে নাহলে ডোরা মা-বাবা কাউকে বেশিক্ষণ না দেখলে কান্না করে।
“এই উঠো। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“উফ, ঘুমাতে দে লিশা। পুরারাত ঘুমাইনি।”
“আমিও ঘুমাইনি কিন্তু ক্লাসে যেতে হচ্ছে।”
“তো যা না। আমাকে বিরক্ত করছিস কেন?”
“আরশান একা, ওকে দেখতে হবে। উঠো।”
“বাড়িতে সবাই আছে। আমাকে কেন উঠতে হবে?”
“তুমি জানোনা ও আমাদের ছাড়া বেশিক্ষণ থাকেনা। আমি চলে গেলে কান্না শুরু করবে।”
আরহাম উত্তর করছেনা। সে আবার ঘুমিয়ে গেছে। আলিশা জানে তাকে এতো সহজে তোলা যাবেনা তাই সে আরশানকেই কোলে করে নিয়ে আসলো রুমে।
আরশান কে আদর করে বেডে ছেড়ে দিলো। বাকিটা সে নিজেই করে নেবে।

“আমার সোনা বাচ্চাটা। বাবার সাথে থেকো। মাম্মা জলদি চলে আসবো। টাটা…”
আরশান মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলো। মায়ের কথা শুনে সেও আধো-আধো গলায় বললো – ” তাতা..তা।”
আলিশা হেসে বেরিয়ে গেলো ক্লাসের জন্য। মাকে যেতে দেখে আরশান বাবার দিকে তাকালো – যে এখন উদাম গায়ে উল্টো হয়ে শুয়ে আছে।
ডোরা হামাগুড়ি দিয়ে বাবার কাছে গেলো। বাবার চুল মুঠ করে ধরে টেনে বললো – “বা..ব্বা..বা।”
“উফ, গোল আলু সর। ঘুমাতে দে।”
“আব..ব্বা..বা।”
আরহাম সোজা হয়ে ছেলের দিকে তাকালো। তারপর তাকেও জড়িয়ে ধরে কম্ফোর্টার এর ভিতর ঢুকিয়ে দিলো।

“তুইও ঘুমা। আমাকেও ঘুমাতে দে।”
“না..ন্না..না। নাই গুম নাই…”
“এতো নানা করছিস কেন? নানার কাছে যাবি? দিয়ে আসবো?”
“না…ন্না নাই…বা..ব্বা তাকবো”
“তাহলে ঘুমা। একদম জ্বালাবি না।”
আরহাম ছেলেকে বুকে নিয়ে আবার চোখ বুজলো। কিন্তু একটু সময় যেতে না যেতেই নিজের উপরন্ত ইজ্জতে ভেজা ভেজা অনুভব হলো। সে চোখ খুলে দেখে ডোরা মায়ের মতো বাবার বুকেও দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছে। যা দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ। সে তড়িঘড়ি করে ছেলেকে বুক থেকে সরালো।
ডোরার পশ্চাৎদেশে আলতো থাবা দিয়ে বললো – “বজ্জাত বাচ্চা। তোর নজর শুধু বাপের ইজ্জতের দিকে কেন? সকালে নিচে আর এখন উপরে।”
আরশান বাপের কথা বুঝলো কিনা কে জানে তবে তার ছোট ঠোঁট দিয়ে বাবার গালে লালা লাগিয়ে আদর করে দিলো।
তা দেখে আরহামের মুখে হাসি খেলে গেলো। সে ডোরাকে নিজের পেটের উপর বসিয়ে বলতে লাগলো – “মায়ের মতো চালাক হয়েছিস। বকা না খাওয়ার জন্য কি ধান্দা তোর।”
বলেই ছেলের ফোলাফোলা গালে ফটাফট কয়েকটা চুমু এঁকে দিলো।

ইজাজ সাহেব, নিয়াজ সাহেব এবং আরশাদ সবাই ঘন্টাখানেক আগেই অফিসের উদ্দেশ্য বাড়ি থেকে বের হয়েছে। আলিশাও কলেজে গিয়েছে তাই আপাতত বাড়িতে তেমন কেউ নেই। শাইনা এবং আয়শা মিলে নিজের শাশুড়ির সাথে আড্ডা দিচ্ছে লিভিংরুমে আর নীলা পাশে বসে তাদের গল্পগুজব শুনছে।
আরহাম ডোরাকে কোলে নিয়ে মাত্রই রুম থেকে বেরিয়েছে।
লিভিংরুমে আসতেই ডোরা নীলাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিলো তার কোলে যাওয়ার জন্য।
নীলা হেসে পরম আদরে ডোরাকে কোলে নিলো।
শাইনা আরহামের উদ্দেশ্য বললো –

“আজ এতো দেরিতে উঠলি কেন? কয়টা বাজে খেয়াল আছে?”
“তোমার আদরের নাতি রাতে ঘুমাতে দিলেই তো সকালে উঠবো।”
“হ্যাঁ সব দোষ এখন আমার নাতির। পেয়েছিস এক বাহানা।”
“আপা, ছাড়ো তো এসব। ছেলেটা মাত্র এসেছে আর শুরু হয়ে গেছো তুমি।”
“হ্যাঁ তুই লায় দিয়ে দিয়ে আরো মাথায় উঠা এই বেয়াদবকে।”
“বড় বউমা, চুপ করো। সারাদিন তুমি আমার সোনার চাঁদ নাতিটার পিছে পইরা থাকো।”
যাকে নিয়ে এতো কথা হচ্ছে তার এদিকে কোনো মনোযোগ নেই। সে তো ছেলেকে নীলার কোলে দিয়ে সোফাতে বসে দিব্যি আরামে ফোন চালাচ্ছে।

তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৭

“ছোট মা, ক্ষিদে পেয়েছে। খাবার দাও।”
“দিচ্ছি বাবা, ডাইনিং টেবিলে আয়। তোর পছন্দের ব্রেকফাস্ট বানিয়েছি আজ।”
বলেই আয়শা চলে গেলো কিচেনে।
আরহাম যেই উঠতে যাবে তখনি ডোরা বাবার সাথে যাওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো।

তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৮ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here