তোমার আমার গল্প পর্ব ৪১
noorayn
খান পরিবারের সদস্যরা দার্জিলিংয়ে এসেছে আজ তিন দিন হলো। এই তিনটি দিন সবার কেটেছে আনন্দ, হাসি আর প্রশান্তিতে। প্রায় এক বছর পর সবাই কাজের ব্যস্ততা দূরে সরিয়ে রেখে নিজেদের এবং পরিবারের জন্য সময় বের করেছে। পাহাড়ের মনোরম পরিবেশে তারা উপভোগ করছে একান্ত কিছু সুন্দর মুহূর্ত। কাল সকালে সবাই ফিরে যাবে নিজের সেই চিরচেনা ঠিকানায়।
একটু আগেই রিসোর্টে ফিরেছে সকলে। আজকের জন্য ঘোরাঘুরি শেষ এখন ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
আলিশা এসেই ফ্রেশ হয়ে লাগেজ গোছানো শুরু করে দিয়েছে। পরে ডোরা ঘুম থেকে উঠলে আর করতে দিবেনা।
আরহাম এসেছে থেকেই ফোন নিয়ে ব্যাস্ত। দিন-দুনিয়ার কোনো খবর আপাতত তার নেই। তার সম্পুর্ন মনোযোগ এখন মোবাইলে খেলতে থাকা গেমিংয়ে।
আলিশা একে একে জিনিসপত্র ব্যাগে ঢোকাচ্ছে আর আরহামকে বকাবকি করছে –
“একটু হেল্প হলেও তো করতে পারে কিন্তু তা না সে এসেছে থেকে মটকা মেরে শুয়ে আছে।”
“এই ভোটকি চুপ একদম। কিসের হেল্প কিসের কি? আসার সময় আমায় হেল্প করেছিলি প্যাকিংয়ে? তাহলে এখন আমি কেনো করবো?”
“বদলা নিচ্ছো?”
“নিচ্ছি।”
“আর যদি কাছে এসেছিস তো খবর আছে।”
“সর বেয়াদব মহিলা। তোর পারমিশন চেয়েছি আমি?”
“সময় বলে দেবে।”
আরহাম আলিশাকে নকল করে ভেঙিয়ে বললো –
“চময় বলে ডিবে”
আলিশা আর কিছু না বলে ধুপধাপ প্যাকিং করতে লাগলো।
একটু পর আরহাম উঠে বাইরে যেতে যেতে বললো –
“আমার আসতে রাত হবে। খাবার আসলে খেয়ে নিবি, আমার অপেক্ষা করতে হবেনা।”
“কোথায় যাচ্ছো এইসময়? একটু আগেই না ফিরলাম।”
“কাজ আছে।”
“কি কাজ?”
“একজনের সাথে দেখা করবো।”
“কার সাথে?”
“সব তোর জানা লাগবেনা। ডোরা উঠলে খাইয়ে দিবি। গেলাম আমি – দরজা লক কর।”
বলেই আরহাম বের হয়ে গেলো।
আলিশা হতাশার শ্বাস ফেলে বেডে শুয়ে পড়লো ডোরার পাশে। আরহাম কোথায় যায়, কি করে এসব কোনোদিন আলিশা কে বলা প্রয়োজন মনে করেনি আর না জিজ্ঞেস করলে বলে। বলতো একটা সময় সব বলতো তবে ডোরা আসার পর থেকে দিনে কি কি হয়েছে সেটা আর বিস্তারিত বলা হয়না – যা বলে সংক্ষেপে। তবে আলিশা এক কদম বাইরে ফেললেও সেটার মুহুর্তের খবর তার জানা লাগে। এই নিয়ে বহুবার ঝগড়া লেগেছে তাদের সব ফলাফল সেই শুন্যর কোঠায়। আলিশা আর ঘাটায় না সেসব নিয়ে তবে ছাড় ও দেয়না – আরহাম কিছু করলে সে তার পরমুহূর্তেই আরহামের অপছন্দের কিছু একটা করবেই করবে। আজও তার ব্যাতিক্রম নয় – আলিশা শুয়ে শুয়ে ভাবছে এবার কি করা যায়। কিছুক্ষণের মাঝেই তার মাথায় হানা দিলো শয়তানি বুদ্ধি। আলিশা তার সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট ওপেন করে আপলোড দিলো গতকালের তোলা বেশ কয়েকটা ছবি। গতকাল আলিশা শাড়ি পড়েছিলো পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্য। সেখানের কয়েকটা ছবি আরহামের শিখিয়ে দেওয়া তার ব্যাক্তিগত স্টাইলে – যেখানে আলিশাকে লাস্যাম্যয়ী লাগছে, শরীরের ভাজ বোঝা যাচ্ছে এমন।
হাই-সোসাইটি এবং আজকের জেনারেশনে এমন ছবি বেশ স্বাভাবিক ভাবেই নেওয়া হয় – বিয়ের আগে আলিশা অনেক এক্টিভ থাকতো সোশ্যাল সাইটে। এমন ছবিও প্রায় দেওয়া হতো তখন তবে বিয়ের পর নতুন সম্পর্ক এরপর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ডোরার আগমনী বার্তায় আস্তে আস্তে সোশ্যাল সাইটে কম এক্টিভ হতে থাকে আলিশা।
আরহাম ছবিগুলা তুলে দিলেও কড়া ভাষায় পইপই করে বলে দিয়েছে যাতে এগুলার একটাও আপলোড করা না হয়। আলিশাও বাধ্যগত মেয়ের মতো সায় দিয়েছিলো তাতে। তবে একটু আগে আরহামের করা ত্যাড়ামির কারনে আলিশাও এবার অবাধ্য হলো।
ইজাজ সাহেব বসে আছেন রিসোর্ট রুমের বারান্দায় – হাতে ধোয়া উঠা গরম চা। শাইনা বেগম সব গুছিয়ে মাত্রই পাশে এসে বসলেন।
“এভাবে আর কতদিন চলবে শাইনা?”
“কিসের কথা বলছেন?”
“তোমার ছেলের কথা। জীবন নিয়ে কোনো সিরিয়াসনেস তার মধ্যে এখন অবদি দেখলাম না।”
“বয়স কম, রক্ত গরম। সময় দেন আস্তে আস্তে বুঝতে শিখবে।”
“এক বাচ্চার বাপ হয়ে গেছে। আর কত সময় দেবো?”
“দেশে গিয়ে কথা বলবো আমি ওর সাথে। আপনি অযথা চিন্তা করে প্রেশার বাড়াবেন না।”
“হুম।”
— নিয়াজ সাহেব কপালে হাত দিয়ে শুয়ে আছেন। আয়শার সাথে একটু আগে কথা কাটাকাটি হয়েছে উনার। আয়শার মতে সঠিক সময়ে আওয়াজ তুলতে পারেন নি যখন তখন এই সময়ে এসে কথা বাড়ানোর কি প্রয়োজন?
নিয়াজ সাহেব আজকাল বেজায় চিন্তিত সন্তানদের জীবন নিয়ে। একদিকে আরহাম-আলিশার বেখাপ্পা জীবন। বিয়ের এতদিন পর এসেও কথায় কথায় ঝগড়া লাগে দুজনের। যেমন আজ সকালে ঘুরতে যাওয়ার সময়ে সবার সামনে একদফা মারামারি করেছে তারা। এরা কি বুঝতে শিখবেনা? এখন তো ছোট আরশান ও আছে – যার ব্যাপারে কেউ জানেনা। এমনকি কোনো আত্মীয়-স্বজনও না। যেখানে বিয়ের কথায় কেউ জানেনা সেখানে বাচ্চার ব্যাপারে প্রকাশ করা অসম্ভব। এই চিন্তা উনাকে গ্রাস করছে ভিতরে ভিতরে। দার্জিলিং আসার পর থেকে খেয়াল করেছেন আরহাম কেমন মাস্ক/ক্যাপ পড়ে থাকে যাতে কেউ তাকে চিনে না যায়। বাইরে গেলে পরিবার থেকে দূরত্ব মেইনটেইন করে চলেছে যা উনার চোখ এড়ায়নি। তবে উনি জনেন আরহাম তার মেয়ে কিংবা নাতির অবহেলা করেনা, আগলে রাখে। তিনি ভাবছেন দেশে গিয়ে আলিশার সাথে এই নিয়ে আলোচনায় বসবেন। আলিশার নিজেকে ম্যাচিউর করতে হবে। তার বাচ্চামো আচরন এখন সম্পর্কের বেড়াজ্বালে আটকে গেছে।
অন্যদিকে, আরশাদের সংসার জীবনের টানাপোড়া। একটা বাচ্চার জন্য কত হাহাকার। বাবা হয়ে কোনোকিছুই উনার চোখ এড়ায়না। ছেলের কষ্টে উনার ও সমান কষ্ট হয় – তবে বাবারা চাইলেও নিজের অনুভূতি সন্তানদের কাছে প্রকাশ করতে পারেন না। জীবন কত অদ্ভুত! যারা সন্তান চেয়েছে তারা পায়নি আর যারা ভাবেওনি তাদের কোল আলো করে আরশান চলে এসেছে।
আরহাম এসেছে একজন ফেমাস মিউজিক ডিরেক্টর এর সাথে দেখা করতে। লোকটার নাম – অনুরাভ সেন। আরহাম ফ্যামিলি ট্রিপে এসে কোনো কাজ করতে চায়নি তবে আরাফের জোরাজুরিতে এসেছে।
অনুরাভ সেন বড় মাপের মিউজিক ডিরেক্টর হলেও তিনি নিজেও আরহামের ভক্ত। তাইতো আরাফের মাধ্যমে আরহামের সাথে দেখা করার শিডিউল নিয়ে নিয়েছেন।
আরহাম এবং অনুরাভ সেন বিগত একঘন্টাযাবত কথা বলছেন। অনুরাভ নিজের একটা গানের জন্য আরহামের সাথে কোলাবোরেশ করতে চাচ্ছেন। এরজন্য বড় অংকের টাকা এবং সাথে বেশ কিছু অফার দিয়েছেন। তবে আরহাম এখনো হ্যাঁ/না কিছুই জানায়নি।
“সো ইয়াং ম্যান, কি ভাবলে?”
“আই নিড টাইম। ডিসিশন যেটায় হবে তা আরাফ আপনাকে জানিয়ে দিবে।”
“এমন সূযোগ কেউ হাতছাড়া করেনা। আশা করি তুমিও করবেনা।”
“দেখা যাক।”
“আই লাইক ইউর পার্সোনালিটি। যেখানে সবাই অনুরাভের সাথে কাজ করার মুখিয়ে থাকে সেখানে তুমি সময় নিচ্ছো।”
“সবার সাথে আমাকে মেলাবেন না মিস্টার সেন।”
“হাহাহা…ওকেই। বাই দা ওয়ে, আর ইউ সিঙ্গেল?”
আরহাম কিছু সময় চুপ থেকে জানালো –
“আমার ব্যাপারে সব খোজখবর যেহেতু নিয়েছেন তাই আশা করি এই বিষয়েও আপনার জানা থাকবে।”
“আমার জানা মতে তুমি সিঙ্গেল। তবে তুমি আসার পাচঁ মিনিট আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এক অতিসুন্দর রমনীর সাথে তোমার ক্লোজ পিকচার ভাইরাল হতে দেখেছি।”
আরহাম থমকে গেলো। কি শুনলো মাত্র এটা?
সে নিজেকে সামলে ফোন হাতে নিলো – আলিশা বারবার কল দিয়ে ডিস্টার্ব করবে ভেবে গত একঘন্টা যাবত সে তার মোবাইল এয়ারপ্লেন মোডে রেখেছে।
তোমার আমার গল্প পর্ব ৪০
সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকতেই আরহামের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। সারা মিডিয়া জুরে টাইগার হিলে তোলা তার আর আলিশার সেই সকালের ঘনিষ্ট ছবি!
হেইডলাইন দেওয়া – কে এই রমনী? যার সাথে রকস্টার আরহাম মেহতাব খানের এতো সখ্যতা?
