তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৯ (২)
noorayn
আলিশার মন আজ বেশ চটে আছে। একটু আগেই সে মোবাইল ঘাটাঘাটি করার সময় অনলাইনে বেশ কিছু কিউট বেবী ড্রেসে দেখছে সাথে কিউট কিউট হেয়ার ব্যান্ড ; যা দেখার পর থেকেই আলিশার তা কেনার জন্য মন আকুপুতু করছে। এতো আদুরে ড্রেসগুলা সে বারবার ঘুরে ফিরে দেখছে তবে কিনতে পারছেনা…
তার একটায় কারন – ডোরা ছেলে বাচ্চা।
আর আলিশা অনলাইনে যেসব কিউট ড্রেস দেখেছে সেসব মেয়ে বেবীর। এখন আলিশা কি করবে?
ড্রেস আর হেয়ার ব্যান্ড গুলা এতোই কিউট যে না নিয়েও আলিশার মন মানছেনা। আবার নিবেও কেমনে তা ভেবে পাচ্ছেনা ; এই দুঃখে সে একটু পর পর কটমট করে আরহামের দিকে তাকাচ্ছে যে কিনা এখন ডোরাকে নিয়ে খেলতে ব্যাস্ত। সব দোষ এই ব্যাটার! নিজেও গন্ডার আর ছানাও হয়েছে মিনি গন্ডার।
আরহামের কল আসায় সে ডোরাকে আলিশার কোলে দিয়ে ব্যালকনির দিকে চলে গেলো। এদিকে আলিশা এক দৃষ্টিতে ডোরার দিকে চেয়ে আছে ; কত্ত কিউট বাচ্চা তার! উম্মাহ!
ছেলেকে আদর করে আলিশা বুকে জডিয়ে নিলো তারপর ডোরার ফোলা ফোলা গালে আঙুলের টোকা দিয়ে বললো,
“পুরাই একটা রসগোল্লা ছানা আমার।”
“আ..মাম…মাম” – মায়ের আদর পেয়ে ডোরা বিড়াল ছানার মতো আলিশার বুকে ঢুকে পড়লো।
আলিশা ডোরার দিকে তাকিয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে লাগলো –
ফোলা ফোলা গাল, গোলাপি আভার নরম ত্বক, হালকা ব্রাউন চুল, এ্যাশ কালারের চোখের মণি, ঘন চোখের পাপড়ি আর নাদুসনুদুস গোল ছানা তার – বড্ড কিউট!
ইতালীয়ান মা-বাবার সংমিশ্রণে তৈরি এক যত্নে গড়া আদুরে বাচ্চা।
আলিশা ভাবলো – ডোরা যদি ছেলে না হয়ে মেয়ে হতো, তাহলে একেবারে জীবন্ত পুতুলের মতো লাগতো তাকে!
ভাবনাটা মাথায় আসতেই সে মনে মনে ডোরাকে মেয়ে বাচ্চাদের বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর পোশাকে কল্পনা করতে শুরু করলো। যেসব ড্রেস সে অনলাইনে/শপিং মলে দেখে থাকে।
–না, খারাপ লাগছে না তো!
বরং মেয়েদের সাজে ডোরাকে আরও বেশি আদুরে লাগছে।
আর বাচ্চা তো বাচ্চাই ; এসব ছেলে-মেয়ে করে কী হবে? ছেলে কি মেয়েদের চেয়ে কম সুন্দর নাকি?
আলিশা বরং ডোরাকে মেয়ে বাবুর থেকেও বেশি সুন্দর করে সাজাবে। এতে তার মনের শখও পূরন হবে।
ব্যস! আর দেরি কেন?
আলিশা চটজলদি ফোনটা হাতে তুলে নিলো তারপর নিজের মনমতো মেয়ে বাচ্চাদের একের পর এক কিউট কিউট ড্রেস, হেয়ারব্যান্ড আর ছোটখাটো অ্যাক্সেসরিজ দেখতে শুরু করলো।
একের পর এক জিনিস পছন্দ হতে না হতেই কার্টে যোগ করছে আবার কোনটা ডোরার ওপর বেশি মানাবে সেটা ভেবে দেখছে।
শেষমেশ নিজের পছন্দমতো বেশ কয়েকটা সুন্দর সুন্দর ড্রেস আর হেয়ারব্যান্ড অর্ডার করে ফেললো আলিশা।
মনে হচ্ছে, নিজের মেয়ের জন্যই বুঝি শপিং করলো সে।
একদিন পর….
আলিশার অনলাইনের পার্সেল এসে পৌঁছিয়েছে আজ সকালে। সে একটা একটা করে সব খুলে দেখছে আর নিজ মনে খুশি হচ্ছে আবার ডোরার দিকে তাকাচ্ছে।
আলিশা ডোরাকে ঝাপটে ধরে কাছে এনে সব দেখিয়ে বললো – “দেখ ডোরা দেখ…তোর মাম্মা তোর জন্য কত সুন্দর সুন্দর ড্রেস এনেছে?”
“ডেশ ডেশ…দোরা নিউ ডেশ।” ডোরা উচ্ছ্বাস নিয়ে নিজের গুলুমুলু হাত নাড়াতে নাড়াতে বললো।
আলিশা এবার ডোরাকে কাছে এনে রেড কালারের একটা কিউট বেবী ফ্রক পড়িয়ে দিলো তাকে ; তারপর একটা বেবী হেয়ার ব্যান্ড নিয়ে ডোরার ছোট ছোট চুলে পড়িয়ে দিলো সাথে ছোট ছোট গুলুমুলু হাতে মিনি সাইজের চুড়িও পড়ালো তারপর ফোলা ফোলা গালে বেবী পাওডার দিয়ে সাজিয়ে দিলো।
সব শেষে ডোরাকে দেখতে যেন এক আদুরে জীবন্ত পুতুল মনে হচ্ছে ; “আহা তার ছানাটা কত্ত আদুরে! উম্মাহ…”
আলিশা ডোরাকে আদর করে বেশ কয়েকটা ছবি তুললো।
ছোট্ট ডোরাও সেজেগুজে বড্ড আনন্দিত অনুভব করছে ; সে ভেবেছে তাকে নিয়ে মাম্মা বাহিরে ঘুরতে যাবে।
আলিশা এবার ডোরাকে কোলে নিয়ে বললো –
“চল ডোরা, তোর এই নতুন রুপ সবাইকে দেখিয়ে আসি।
ওহ স্যরি…এখন তো তুই ডোরী – আমার কিউট বাচ্চা ডোরী।”
“দোরা হুইচে দোরী দোরী।” ডোরা খুশিতে নিজের গুলুমুলু পা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
নীলা লিভিং রুমে বসে বসে ম্যাগাজিন পড়ছে। তার পাশের সোফায় মেহরোজা আক্তার বসে তজবীহ পাঠ করছেন।
আয়শা সার্ভেন্টদের গার্ডেনে গিয়েছেন তাজা কিছু সবজি তুলতে।
শাইনা এসে নীলার পাশে বসলো। নীলা একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে আবারও ম্যাগাজিনে মনোযোগ দিলো।
শাইনা চুপচাপ মেয়ের মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে।তার এত সুন্দর মেয়েটার এই কী হাল হয়েছে?
আগের তুলনায় নীলা অনেকটাই শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে কালি পড়েছে, সারাদিন কেমন মনমরা হয়ে থাকে। সে সবার সামনে নিজেকে স্বাভাবিক ও হাসিখুশি দেখানোর চেষ্টা করলেও, সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষণ্ণতা শাইনার চোখ এড়ায় না।
শাইনা ধীরে ধীরে নীলার মাথায় হাত রেখে বললো,
“কিছু খাবি মা? বানিয়ে দেবো?”
“না।”
ম্যাগাজিনের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই জবাব দিলো নীলা।
শাইন স্নেহের গলায় বললো,
“আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাক।”
নীলা এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
“সোফাতেই?”
“হ্যাঁ…আগে মনে নেই? যেখানে সেখানে মায়ের কোল দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়তি। এখন বুঝি অনেক বড় হয়ে গেছিস?”
নীলা কোনো জবাব না দিয়ে চুপচাপ সোফায় পা তুলে শাইনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।
শাইনা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে বিলি কেটে দিচ্ছে।
মেহরোজা আক্তার একবার সেদিকে তাকিয়ে আবারও নিজের তজবীহ পাঠেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
এদিকে, আয়শা বাস্কেট ভর্তি তাজা সবজি নিয়ে মাত্রই বাড়িতে ঢুকেছেন ; ভেতরে ঢুকেই আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে সোজা লিভিং রুমের সোফায় এসে বসে পড়লেন।
নীলা একবার আয়শার ঘামন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে
কিছু না বলে পাশ থেকে এসির রিমোট নিয়ে এসির পাওয়ারটা একটু কমিয়ে দিলো তারপর মায়ের কোল থেকে চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো কিচেনের দিকে।
শাইনা আয়শার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে ছোট? বেশি খারাপ লাগছে?”
“বাহিরে এত্ত গরম আপা! দেখো, অল্প সময়েই কেমন ঘেমে গিয়েছি।”
“এই গরমের মধ্যে গার্ডেনে যাওয়ার কী দরকার ছিলো? মানাও করেছিলাম তোকে। শুনিস নি…”
“দুপুরের রান্নার জন্য সবজি লাগতো।”
“জামালকে বললে তুলে নিয়ে আসতো। ও তো গার্ডেনের দেখাশোনাই করে।”
“না আপা…নিজে বেছে না নিলে কেমন যেন মন অস্থির লাগে।”
“তোর এই খুঁতখুঁতে স্বভাব আর গেলো না।”
ইতিমধ্যে, নীলা এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত নিয়ে এসে আয়শার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আবারও গিয়ে নিজের মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।
আয়শা এক ঢোকেই পুরো গ্লাসটা খালি করে ফেললেন।
সত্যিই, এই মুহূর্তে শরবতটার ভীষণ প্রয়োজন ছিলো তার। তিনি চাওয়ার আগেই তা নীলা নিজ থেকে এনে দিয়েছে…
তার ছেলের বউটা সত্যিই লাখে এক!
যদিও আয়শা নীলাকে কখনো শুধুই ছেলের বউ হিসেবে দেখেননি ; বরং নিজের মেয়ে আলিশার মতোই সমান চোখে দেখেন, আদর করেন।
একই বাড়িতে ছোট থেকে বড় হয়েছে ওরা সবাই। তাই নীলা-আরশাদের বিয়ে কিংবা আরহাম-আলিশার বিয়ে ; কোনোটাই তাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে বদলে দিতে পারেনি।
আর আয়শার কাছে নীলা আজও সেই আগের মতো ছোট আদরের মেয়েটা ; যে কিনা কিছু হলেই নিজের ছোট মায়ের কাছে সব আবদার জুড়ে দিতো।
সবাই যখন নিজেদের আলাপে ব্যস্ত ; ঠিক তখনই আলিশা ডোরা ওরফে ডোরীকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে।
আলিশা লিভিং রুমে সবাইকে বসে থাকতে দেখে নিজেও সেদিকেই পা বাড়ালো।
আলিশার আগমনে সবাই একবার তার দিকে তাকিয়ে আবারও নিজেদের আলাপে ব্যস্ত হয়ে পড়লো, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই একে একে সবার চোখ আবারও গিয়ে আলিশার দিকে আটকালো।
আসলে আলিশার দিকে নয় ; সবার চোখ এখন তার কোলে থাকা বাচ্চা মেয়েটার দিকে!
নীলা চটজলদি মায়ের কোল থেকে উঠে বসলো। চোখ দুটো ডলে আবারও সেদিকে তাকালো।
সে কি ঠিক দেখছে?
সবাই যেন বিস্ময়ে কথা বলতেই ভুলে গেছে। এই বাচ্চাটা কে? নিজের বিস্ময় আর সামলে রাখতে না পেরে নীলা দ্রুত আলিশার কাছে এগিয়ে গেলো।
“এই বাচ্চাটা কে, আলিশা?”
আলিশা একগাল হেসে জবাব দিলো,
“আমাদের ডোরা।”
“কিইইইইই!”
সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলো।
আলিশা যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে হাসিমুখে বললো,
“দেখো…আমার ডোরীকে কত্ত কিউট লাগছে!
নীলা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
“ডোরী কে?”
“ডোরার ফিমেল ভার্সন।”
ছোট্ট ডোরা তখন আঙুল চুষতে চুষতে নীলার দিকে তাকিয়ে আছে তারপর নীলার কোলে যাওয়ার জন্য ছোট্ট দুটো হাত বাড়িয়ে দিলো সে।
নীলা যেন বিস্ময়ের ঘোরে ডোরাকে কোলে নিতেই ভুলে গেছে।
ডোরা আবারও হাত বাড়িয়ে বললো,
“দোরী পুমা কুলে দাই…দোরীক নাউ।”
আদরের ডোরার মুখে “পুমা” শব্দটা শুনতেই যেন নীলার হুঁশ ফিরলো। সে তাড়াতাড়ি ডোরাকে আলিশার কোলে থেকে নিজের কোলে নিয়ে নিলো।
তারপর অবাক চোখে আলিশার দিকে তাকিয়ে বললো,
“এসব কী?”
আলিশা হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বললো,
“এসব সেসব ছাড়ো নীলাপু। আগে বলো, ডোরাকে কিউট লাগছে না?”
নীলা এবার ভালো করে ডোরার দিকে তাকালো।
সত্যিই তো…
ডোরাকে অসম্ভব কিউট লাগছে। নীলার তো মন চাইছে আদর করতে করতে একেবারে খেয়ে ফেলতে…
ঠিক তখনই আয়শা চেঁচিয়ে উঠলেন,
“আলিশা! এসব কী শুরু করেছো তুমি?”
আলিশা মায়ের দিকে তাকিয়ে কোনোমতে বললো,
“উফ মা! চেঁচাচ্ছো কেন? ডোরাকে দেখো, কত সুন্দর লাগছে ওকে।”
মাম্মার মুখে নিজের সুন্দর লাগার কথা শুনেই ডোরা খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লো।
“দোরা চুন্দল! দোরা চুন্দল..”
আয়শা মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে অবাক না হয়ে পারলেন না।
তার মেয়ে চঞ্চল এটা তিনি আগে থেকেই জানতেন, কিন্তু আজ আলিশা তার সেই ধারণাকেও ভুল প্রমাণ করে দিলো!
সে কেবল চঞ্চল নয় বরং আধপাগলও…
যে কিনা নিজের ছেলে বাচ্চাকে মেয়ে সাজিয়েছে!
এদিকে, মেহরোজা আক্তার পুরোনো আমলের মানুষ। নিজের বংশের প্রদীপকে এভাবে ছেলে থেকে মেয়ে সাজতে দেখে তিনি হায়হায় করে উঠলেন।
“হায় আল্লাহ! আমার বংশের চিরাগের এই কী হাল হইলো! ওওও পরী? তোর মাথায় কোন ভূত চাপছে? এখনই আমার চিরাগরে ঠিক কর।”
“আহা দাদি…কিছু সময়ের জন্যই তো মেয়ে সাজিয়েছি। একটু পরেই আবার চেঞ্জ করিয়ে দেবো।”
শাইনা এতক্ষণ অবাক হয়ে সব দেখছিলেন। এবার তিনিও কিছু না বলে পারলেন না।
“পুতুল…এটা কেন করলি?”
আলিশা এবার একটু দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললো,
“আমার না মেয়ে বাবুদের ড্রেস অনেক কিউট লাগে। কিন্তু কিনতে পারি না। তাই আজ নিজের শখ পূরণ করতে ডোরাকে একদিনের জন্য ডোরী সাজিয়েছি।”
আয়শা এমন কথা শুনে যেই না মেয়েকে আবার বকতে যাবেন, ঠিক তখনই শাইনা তাকে থামিয়ে দিলেন।
“থাক না ছোট…কিছু সময়ের জন্য নিজের শখ পূরণ করলে ক্ষতি কী? আর আমাদের আরশানকে দেখ, কত আদুরে লাগছে।”
আয়শা আর কিছু বললেন না। তবে, মেয়েকে চোখে চোখে শাসন করতে ভুললেন না।
এদিকে, নীলা ততক্ষণে ডোরাকে অগণিত চুমু দিয়ে ফেলেছে। কত্ত আদুরে লাগছে ডোরাকে!
ছোট্ট ডোরা এবার একে একে সবাইকে নিজের নতুন ড্রেস, হাতের ছোট্ট চুড়ি আর চুলে পরা নতুন হেয়ারব্যান্ড দেখাতে শুরু করেছে..
নিজের সাজগোজ নিয়ে তার আনন্দ যেন উপচে পড়ছে।
“দোরা নিউ ডেশ…দোরা চুন্দল।”
“দোরা হুইচে দোরী দোরী!”
তারপর এবার নিজের লাল ড্রেসটা ধরে টেনে দেখিয়ে বললো,
“দোরা রেদ ডেশ পলেচে…”
এরপর নিজের গুলুমুলু দুই হাত নাড়িয়ে বললো,
“দোরা গুরতে দাই..”
কেউ কিছু বলার আগেই আবার শুরু করলো,
“দোরা হুইচে দোরী দোরী…দোরী চুন্দল।”
একবার নীলাকে, একবার শাইনাকে, আবার আয়শাকে… একে একে সবার কাছে নিজের নতুন ড্রেস, চুড়ি আর হেয়ারব্যান্ড দেখিয়ে চলেছে ডোরা।
আর প্রত্যেকবারই সেই একই কথা আওড়াচ্ছে।
আরহাম আর আরশাদ গিয়েছিলো একটা ফুটবল টুর্নামেন্টে। মাত্রই দুজন বাড়ি ফিরেছে।
আরহাম হরহামেশার মতোই বাড়িতে ঢুকেই চারপাশে চোখ বুলালো। ডোরা প্রায় সময়ই এই জায়গাটায় খেলাধুলা করে।
তবে, আজ ঢুকেই ছেলের দেখা মিললো না।
হয়তো নিজের রুমে মায়ের সঙ্গে আছে।
এই ভেবে আরহাম লিভিং রুমে একবার উঁকি দিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো।
কিন্তু রুমে যাওয়ার আগেই লিভিং রুম থেকে ভেসে এলো সবার কথাবার্তার আওয়াজ যার মধ্যে আলিশার কণ্ঠও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
তার মানে সবাই লিভিং রুমেই আছে ; তাই আরহাম পথ ঘুরিয়ে সেদিকেই পা বাড়ালো।
আরশাদ এরই মধ্যে কিচেন থেকে ঠান্ডা জুসের একটা ক্যান হাতে নিয়ে লিভিং রুমের দিকে আসছে।
আরহাম গিয়ে দেখলো, সবাই মিলে গল্প করছে।
সে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে সবার মাঝে ডোরাকে খুঁজতে লাগলো, কিন্তু না কোথাও নেই!
তার গোল আন্ডাটা গেল কোথায়?
আরহাম এবার আলিশার দিকে তাকালো। মেয়েটা এমনভাবে কথায় মশগুল যে তার আসার টের পর্যন্ত পায়নি।
আরশাদ জুস খেতে খেতে আলিশার সোফার পেছনে এসে তার মাথায় একটা গাট্টা মারলো।
“এই! কে রে?”
মাথা ডলতে ডলতে পেছনে ফিরে তাকিয়ে আরশাদকে দেখে আলিশা বিরক্ত হয়ে বললো,
“মারলে কেন?”
আরশাদ কোনো জবাব না দিয়ে তাকে ঠেলে সোফার এক কোণে সরাতে সরাতে বললো,
“আমি বসবো এখানে। তুই ওইদিকে যা।”
“আমি আগে বসেছি। আমি এখানেই বসবো।”
“চুপ…বড় ভাইয়ের কথা শুনতে হয়। যা বলছি।”
আলিশা সঙ্গে সঙ্গে মায়ের দিকে তাকিয়ে অভিযোগ করলো,
“দেখো মাম্মা…ভাই কী করছে! এখন কিন্তু আমিও ঝগড়া শুরু করে দেবো। সরতে বলো তোমার ছেলেকে।”
“আহা আরশাদ…কেন জ্বালাচ্ছিস ওকে?”
আরশাদ নিজের কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললো,
“গরম থেকে এসেছি। এদিকে ফ্যানের বাতাস বেশি, তাই আমি এদিকেই বসবো।”
আয়শা এবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ভাই গরম থেকে এসেছে। তাকে বসতে দাও।”
আলিশাকে অবশ্য নিজে থেকে সরতে হলো না। আরশাদ ঠেলেই তাকে সরিয়ে জায়গা করে নিলো।
আরহাম এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাই-বোনের কাণ্ড দেখছিলো ; তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আয়শা বললেন,
“আরহাম, তুমিও বসো বাবা।”
আরহাম এবার আলিশার সোফার পেছনে এসে আচমকাই আলিশার চুল ধরে টান দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এই ভোটকি…আমার ছানা কই?”
আলিশা চুল ছাড়াতে ছাড়াতে আরহামের হাতে নখ বসিয়ে দিলো।
“গন্ডার! ছাড় আমার চুল।”
আলিশার নখের আঁচড়টা আরহামের হাতে বেশ ভালোই লেগেছে ; তাই সে রেগে গিয়ে আলিশার দিকে তেড়ে যেতে নিতেই শাইনা বেগম ধমকে উঠলেন,
“মেহতাব! কতবার মানা করেছি পুতুলের সঙ্গে মারামারি করবে না? এখন বড় হয়েছো তুমি।”
আরহাম হাত দেখিয়ে বললো,
“ও যে আমাকে খামচি দিয়েছে, তার বেলায়?”
শাইনা এবার কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেন,
“শুরু তুমি’ই করেছিলে আর সে এখন তোমার বউ, তোমার সন্তানের মা ; তাই নিজের আচরণ সংযত করো।”
আরহাম কটমট করে আলিশার দিকে তাকালো।
তারপর আরশাদের হাত থেকে আধখাওয়া জুসের ক্যানটা কেড়ে নিয়ে তাতে চুমুক বসালো।
আরশাদ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো,
“এই এই! তুই আমার ক্যান নিলি কেন? দে আমারটা! তুই নিজেরটা গিয়ে ফ্রিজ থেকে আন।”
আরহাম নির্বিকার ভঙ্গিতে জুস খেতে খেতে বললো,
“পারবো না। তোমার বোনকে বলো এনে দিতে।”
ক্যানে আবারও চুমুক দিতে দিতে আরহাম এদিক-ওদিক চোখ ঘুরালো। না…কোথাও তার ছোট মরিচ নেই!
ইতিমধ্যে, নীলা হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ নিয়ে লিভিং রুমে ফিরে এসেছে।
এসেই তার চোখে পড়লো আরশাদ আর আরহাম।
আরহামও নীলার দিকে তাকালো। কিন্তু নীলার কোলেও ডোরা নেই! এবার আরহামের ভ্রু কুঁচকে গেলো।
বাড়ির সবাই তো এখানে…তাহলে ডোরা কোথায়?
সে যখন কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, ঠিক তখনই নিজের পায়ের কাছে ছোট ছোট হাতের উপস্থিতি টের পেলো।
আরহাম নিচে তাকিয়ে থমকে গেলো!
একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে তার পায়ের কাছে হামাগুড়ি দিয়ে বসে আছে আবার ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে তার ব্যাগি জিন্স ধরে টানাটানি করছে।
আরহাম অবাক!
বাড়িতে বাচ্চা মেয়ে কোথা থেকে এলো? আর এলেও তার পায়ের কাছে এসে কী করছে? তার ছানা কই?
আরহাম দ্রুত এক পা পিছিয়ে গেলো।
তার সরে দাঁড়াতেই বাচ্চাটার হাত থেকে তার প্যান্টটাও সরে গিয়েছে…ব্যস!
ছোট্ট বাচ্চাটা সঙ্গে সঙ্গে গলা উঁচিয়ে কান্না শুরু করে দিয়েছে ; ডোরার কান্না দেখে নীলা চটজলদি তাকে নিজের কোলে নিয়ে নিয়েছে। আরহাম অবশ্য সেদিকে তাকালো না।
বাচ্চাকাচ্চা তার খুব একটা পছন্দ নয়। সারাদিন কানের কাছে সাইরেন বাজাতে থাকবে ; উফ!
সে এমনিতেও বাচ্চাদের খুব একটা কোলে নেয় না।
তবুও, ডোরা আসার পর থেকে কেন যেন বাচ্চাদের প্রতি তার আলাদা একটা টান তৈরি হয়েছে। ডোরাকে একদিন না দেখলেই কেমন অস্থির অস্থির লাগে তার।
অথচ, এই ছেলেটায় কিনা একসময় বাচ্চাদের থেকে একশো হাত দূরে থাকতো!
যদিও এখনো খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। অন্য বাচ্চাদের দেখলে আরহাম এখনো কোলে নেয় না, আদরও করে না।
তবে ডোরা হলে ভিন্ন কথা। কখন যে ছোট্ট ডোরাটা তার হৃদয়জুড়ে এতটা জায়গা করে নিয়েছে, সে নিজেও যেন তার টের পায়নি।
হয়তো রক্তের টান বলে কথা।
নিজের অংশের প্রতি আরহাম বড্ড দুর্বল।
আরহাম চারপাশে তাকিয়ে অবশেষে প্রশ্ন করলো,
“ডোরা কই? আর এই বাচ্চাটা কে? কেউ বাড়িতে এসেছে? তার বাচ্চা?”
একটু থেমে আবার চারপাশে তাকিয়ে বললো,
“কিন্তু কোথাও তো বাইরের কাউকে দেখছি না।”
আরহামের কথার মাঝেই নীলার কোল থেকে ছোট্ট ডোরা তার দুটো হাত বাড়িয়ে দিলো।
“বাবা দাই…”
আরহাম থমকে গেলো।
নিজের ছানার আওয়াজ ভিন্ন একটা বাচ্চার মুখ থেকে শুনে এবার সে মেয়েটার দিকে তাকালো।
এই বাচ্চা তাকে বাবা ডাকছে কেন?
সে কোনোমতে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে বললো,
“হেই, বেবি গার্ল! আমাকে বাবা ডাকছো কেন? একদম ডাকবে না। এটা কেবল আমার ছানা ডাকে।”
কিন্তু ছোট্ট বাচ্চাটা ততক্ষণে নিজের গুলুমুলু পা দুটো দাপাতে দাপাতে আরহামের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে…
“বাবা দাই…দোরা বাবা দাই…”
আরহামের বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠলো। এই আওয়াজটা…এটা তো তার ছানার আওয়াজ!
সে ধীরে ধীরে এবার মেয়েটার দিকে তাকালো। ভালো করে তাকালো। একবার চোখের পলক ফেললো।
তারপর আবার তাকালো।
কীরে? বাচ্চাটাকে ডোরার মতো লাগছে কেন?
আরহাম নিজের চোখ দুটো ডলে আবার খুললো। না…একই তো! নাকি সে ভুল দেখছে?
সারাদিন ডোরার সঙ্গে থাকতে থাকতে হয়তো এখন সব বাচ্চার মধ্যেই ডোরাকে দেখতে পাচ্ছে!
ঠিক তখনই আলিশা বলে উঠলো,
“দেখছো না? ডোরী কাঁদছে…ওকে কোলে নাও।”
“ডোরী? কে ডোরী?”
আলিশা নির্বিকার ভঙ্গিতে বললো,
“ডোরা।”
আরহাম চোখ কপালে তুলে বললো,
“পাগল হয়েছিস? আমার ডোরা কোথায়? আর ডোরীই বা কে?”
আলিশা তার কোনো উত্তর না দিয়ে নীলার কোল থেকে ডোরাকে তুলে নিয়ে জোর করে আরহামের কোলে দিয়ে দিলো।
আরহাম হতভম্ব হয়ে ছোট্ট মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
আর ছোট্ট ডোরা?
বাবার কোলে যেতেই কান্না থামিয়ে দুহাত দিয়ে আরহামের জামা আঁকড়ে ধরেছে…
“আবা..বা..দোরা মিচ্চি ইউ।”
আরহাম চমকালো, থমকালো! এটা তো ডোরা…
এরমধ্যেই আলিশা বললো,
“কেমন বাপ তুমি যে কিনা নিজের ডোরা ওরফে ডোরীকে চিনতে পারছোনা?”
আরহাম আবার তাকালো ডোরার দিকে ; যে কিনা মাথা কাত করে বাবার দিকে চেয়ে আছে মায়া মায়া চোখে।
“না এটা হতে পারেনা। এই বাচ্চাটা আমার হতেই পারেনা।”
আরহামের কথা শেষ হওয়ার আগেই ডোরা ঠাস করে বাবার নাক বরাবর থাবা দিলো।
“দোরা হুইচে দোরী দোরী।”
এতক্ষন বিশ্বাস না করলেও ডোরার হাতের থাবা খেয়ে আরহাম এবার বিশ্বাস করতে বাধ্য হলো যে এটাই তার ছানা।
আরহাম আলিশার দিকে তাকালে সে হাসিমুখে জবাব দিলো,
“দেখো আমাদের কিউট ডোরাকে। আমি ওকে আজকের জন্য মেয়ে সাজিয়েছি।”
“কিইই?”
“হ্যাঁ। দেখো ওকে কত্ত কিউট লাগছে।”
আলিশার কথার মাঝেই আরশাদ ছোঁ মেরে ডোরাকে আরহামের কোল থেকে নিয়ে ফটাফট কয়েকটা চুমু খেয়ে আদর করে দিলো।
“আমার ডোরা মামাকে কত্ত আদর লাগছে। তোর মা’ও ছোট থাকতে এমন কিউট ছিলো।”
ডোরা মামার কথায় খুশি হয়ে হাত-পা দাপিয়ে বলছে,
“দোরা না..ন্নাই…দোরা গুরটে গেচে।”
“তবে আপনি কে মামা?”
“দোরী দোরী…দোরা হুইচে দোরী দোরী।”
আরশাদ হো হো করে হেসে আবারও ডোরার ফোলা ফোলা গালে ঠোঁট দাবিয়ে দিলো। কিন্তু মামার এই আদর পছন্দ হলোনা ডোরার।
“মামা তাইত! ডোন আপা।”
ভাগ্নার কাছে বকা শুনে আরশাদ মুখ বাকিয়ে বললো,
“মায়ের মতো মেয়ে সাজলে কি হবে? তোর আচরন তোর বাপের মতোই খাটাশ ব্যাটার মতো। হুহহ।”
আরশাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই সে নিজের কোল ভেজা ভেজা অনুভব করলো।
নিচে তাকাতেই বুঝতে পেলো ডোরা তার আবেগের উপর শিশি করে দিয়েছে…
মামার কোলে শিশি করতে পেরে ডোরা বড্ড খুশি। তাই নিজের গুলুমুলু পা দাপিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে বলছে,
“দোরী মামাকে চিচি দিচে।”
“আরহামমমম! তুই এই পটকাকে ট্রেইনিং দিয়ে নিজের মতো বানিয়েছিস।”
আরহাম নিজের প্যান্টর পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে অন্যহাত দিয়ে হায় তুলতে তুলতে বলে,
“জায়গা বরাবর শিশি পড়লে মানুষজন এমনই আচরন করে।”
রুমে ফেরার পর….
“আমার ছানাকে কী করেছিস তুই?” আরহাম প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আলিশা একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
“ছানাকে ছানী সাজিয়েছি।”
আরহাম চোখ কপালে তুলে তাকালো ডোরার দিকে ; বেডের ওপর বসে ডোরা তখন নিজের নতুন সাজ নিয়ে মহাখুশি। এখন তার হাতের ছোট্ট চুরিগুলা নেড়ে নেড়ে ঝুনঝুন শব্দ করছে আবার নিজে নিজে খুশি হচ্ছে আর তার মুখে একই কথা ঘুরেফিরে চলছে তোতাপাখির মতো,
“দোরা হইচে দোরী… দোরী!”
“এই, চুপ! তুই ছেলে বাচ্চা হয়েও নিজেকে মেয়ে বাচ্চা বানানোর জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিস কেন?”
ডোরা অবশ্য বাবার ধমকে দমে যাওয়ার বাচ্চা নয়। সে আরও উৎসাহ নিয়ে বললো,
“দোরা হুইচে দোরী… দোরী!”
“হুপপপ! এখনই তোকে বাইরে ফেলে আসবো।”
ডোরা এবার নিজের ফোলা ফোলা গাল আরও ফুলিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
“দোরী চুন্দল… বাবাও চুন্দল।”
আরহাম কয়েক সেকেন্ড ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো তারপর বিরক্ত মুখে বললো,
“এই ব্যাটা, চুপ! আমি এবং তুই ; আমরা কেউই সুন্দর না। আমরা হচ্ছি হ্যান্ডসাম। আর তুই কোনো ডোরীও না, তুই ডোরা।”
“হেনচাম?” ডোরা ভাবুক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো।
“হ্যাঁ, হ্যান্ডসাম। এসব ডোরী-টরী ভুলে যা। নয়তো তোকে ডোরী ফিশের মতো খেয়ে ফেলবো।”
ডোরার চোখ গোল হয়ে গেলো। এটা আবার কী?
“দোরী ফিশ?”
“হ্যাঁ। ডোরী একটা ফিশ। আর তুই আমার আন্ডা।”
“বাবা আন্দা?”
আরহাম নিজের কপাল চাপড়ালো। এই বাচ্চাকে বলে কি আর সেই বুঝে কি?
“চুপ, চুপ! আমি আন্ডা হবো কেন? তুই আন্ডা মানে তুই আমার ছানা।”
ডোরা এবার কৌতুহলে নিজের চোখ বড় বড় করে বললো,
“চানা? দোরা বাবাল চানা?”
“হ্যাঁ… এখন চুপ থাক।”
“তুপ তাকবো?”
আরহাম হতাশ চোখে ডোরার দিকে তাকালো।
এই পটকার সঙ্গে কথা বলা মানে কথা থেকে কথা বাড়ানো আর তার থেকে নতুন দশটা প্রশ্নের জন্ম দেওয়া!
ডোরার এই তোতাপাখির মতো কপির চক্করে আরহামের পাগল হয়ে যাওয়ার দশা।
শেষমেশ সে গম্ভীর মুখ করে বললো,
“চুপচাপ খেল। আর একটা কথা বললে তোর পাছা লাল করে দেবো।”
ডোরা কিছুক্ষণ চুপ করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর হঠাৎ হাত-পা ছুড়ে প্রতিবাদী কন্ঠে বলতে শুরু করলো,
“পাচু লাল্টু? দোরা পাচা লাল্টু কললে মাম তোমাল পাচু লাল্টু কলবে!”
আরহাম এবার সত্যিই বাকরুদ্ধ। এই ছোট মরিচের মুখ বন্ধ করানোর কোনো উপায়ই কি নেই?
ডোরার এমন উত্তর শুনে আলিশা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। সে হা হা করে হেসে ফেললো তারপর আরহামের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি মেশানো কন্ঠে বললো,
“আসো আসো, পাচু লাল্টু কলে দেই…”
কথাটা শেষ করার আগেই আরহাম পায়ের মোজা খুলে আলিশার দিকে ছুড়ে মারলো।
“এইইই…”
আলিশা মুখ ভেঙিয়ে দৌড়ে ড্রেসিং রুমের দিকে ভৌ দৌড় লাগালো। সে দরজার আড়ালে গিয়ে লুকাতেই পেছন থেকে আরহামের গলা শোনা গেলো,
“আজ পায়ে স্যান্ডেল ছিলো না বলে বেঁচে গিয়েছিস ভোটকি…”
আলিশা ড্রেসিং রুমের দরজাটা সামান্য ফাঁক করে সেই ফাঁক দিয়ে শুধু মুখটা বের করে তারপর জিহ্বা দেখিয়ে আবারও মুখ ভেঙিয়ে বললো,
“বেশি কথা বললে কিন্তু পাচু লাল্টু করে দেবো।”
“ভোটকিইইই…!”
আরহামের চিৎকারে পুরো রুম যেন কেঁপে উঠলো।
ডোরা পাশ থেকে এতক্ষণ সবকিছু মন দিয়ে দেখছিলো। বাবার চিৎকার শুনে সেও খুশিতে নিজের গুলুমুলু দু’হাত দিয়ে তালি দিতে দিতে বাবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলতে লাগলো,
“বাবা… বা বুটকি! বাবা হুইচে বুটকি বুটকি…”
আরহাম এবার কাঁদো কাঁদো মুখে ছেলের দিকে তাকালো।
এই ছোট মরিচ না কিছু বোঝে, না কিছু ভুলে। যা শোনে, সেটাই তোতাপাখির মতো আওড়ায় তাও আবার বাপের সঙ্গে যোগ করে…
এই মা-ছেলে মিলে তাকে শান্তি দিবেনা…
আজ শুক্রবার।
বাড়ির পুরুষেরা আজ জুমার নামাজের জন্য মসজিদে যাবে তাই আজ সকলেই একটু জলদি ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। এমনিতে বন্ধের দিনে আরহাম ডোরাকে বুকের ভেতর ঝাপটে ধরে আরাম করে ঘুমিয়ে থাকে কিন্তু শুক্রবার বন্ধ হলেও আজ আর ঘুমানোর উপায় নেই।
–আজ ডোরাও বাবার সঙ্গে নামাজে যাবে।
যদিও নামাজ বোঝার মতো বয়স এখনো তার হয়নি।
তবুও আজ সকাল থেকে জেদ ধরেছে ; সেও বাবার সঙ্গে মসজিদে যাবে।
আরহাম যদি একবারও বলে “নিবো না” তাহলে সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় চিৎকার, পা দাপাদাপি আর কান্না…
তাই শেষমেশ আরহামও তাকে নিতে রাজী হয়েছে।
আজ সে ডোরাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে ; মসজিদে গিয়ে নাহয় নিজের পাশে বসিয়ে রাখবে।
তাই আজ ডোরাকে সকাল সকাল ঘুম থেকে তুলে শাওয়ার করানোর প্রস্তুতি চলছে।
ডোরা পানি দেখলেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। পানির বোল দেখামাত্রই তার হাত-পা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। আলিশার একার পক্ষে এই দুষ্ট বাচ্চাকে গোসল করানো একপ্রকার অসম্ভব ; আর আজ যেহেতু আরহাম বাড়িতেই আছে, তাই আলিশা তাকে ধরে-বেঁধে সঙ্গে নিয়ে এসেছে।
এই মুহূর্তে ডোরা আরহামের কোলে আর আলিশা গিজার অন করে বেবি শাওয়ার বোলে হালকা গরম পানি নিচ্ছে,
কিন্তু পানি চোখে পড়তেই ডোরার ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙে গিয়েছে ; সে বাইন মাছের মতো আরহামের কোলের মধ্যেই লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে…সে এখনই পানির কাছে যাবে।
“দোরা মাম দাই… দোরা টাওয়ার নিব্বে..”
আরহাম ছেলেকে শক্ত করে ধরে বললো,
“এই পটকা, শান্ত থাক। আর টাওয়ার কী হ্যাঁ? শাওয়ার হবে শাওয়ার।”
“না…ন্নাই..টাওয়ার! টাওয়ার।”
ডোরা নিজের গুলুমুলু দুই হাত বাড়িয়ে পানির দিকে ঝাপ দিতে চাইছে…
ইতিমধ্যে, আলিশাও সবকিছু রেডি করে ফেলেছে।
সে এসে আরহামের কোল থেকে ডোরাকে নিয়ে পানির বোলে বসিয়ে দিলো। ব্যস…
ডোরার আনন্দ আর দেখে কে? সে পানিতে নিজের গুলুমুলু ছোট্ট শরীরটা নাড়িয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে খেলতে শুরু করেছে। একবার হাত দিয়ে পানি চাপড়াচ্ছে তো পরক্ষণে আবার পা দিয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে…
আলিশা কিছুতেই তাকে থামাতে পারছে না।
ডোরার ছোড়াছুড়িতে এর মধ্যেই তার জামাকাপড় প্রায় পুরোটাই ভিজে গিয়েছে।
“একদম হাত-পা ছুড়বি না, বলে দিলাম! একটা বাচ্চা কেমনে এত দুষ্ট হয়? সত্যি করে বল, তুই আমার পেট থেকেই হয়েছিস তো?”
এক হাতে বেবি শ্যাম্পু আর অন্য হাত কোমড়ে রেখে ছোট্ট ডোরাকে শাসাচ্ছে আলিশা।
ডোরা অবশ্য মায়ের বকুনি খুব একটা আমলে নিলোনা। তবে, পানির বোলে বসে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে আপাতত বাবার দিকে ঠোঁট উল্টে তাকালো ; যেন বোঝাতে চাইছে “মাম্মা বকু দিচে…মামকে তাইত দাও।” তারপর আবার পানিতে হাত দিয়ে ঝাপাঝাপি করতে শুরু করলো।
আলিশা এবার হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে আরহামের দিকে তাকিয়ে বললো,
“এই, ওকে ধরো।”
আরহাম সঙ্গে সঙ্গে এক পা পিছিয়ে গেলো।
“এই ছোট মরিচ ধরতে দিবে? এখন একটু হাত লাগালেও গলা ফাটিয়ে কান্না শুরু করবে। তারপর সবাই ভাববে আমি মেরেছি। তারচেয়ে বরং আমি যাই, হ্যাঁ? শুধু শুধু আমাকে এখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস।”
“এক পা-ও বাড়াবে না, বলে দিলাম। ধরো ওকে।”
“কান্না করলে দোষ তোর।”
“বাচ্চা কার?”
“আমাদের।”
“ও কার বুকে ঘুমায়?”
“আমার।”
“ডিএনএ কার?”
“আমার।”
“তাহলে সব দোষ কার?”
আরহাম এক মুহূর্তও না ভেবে উত্তর করলো,
“আমার।”
“কারেক্ট! সব দোষ তোমার।”
আরহাম হতবাক হয়ে আলিশার দিকে তাকিয়ে রইলো।
এই মাত্র কী বলল সে? নিজেই নিজের ঘাড়ে সব দোষ নিয়ে নিলো! সবকিছু এই ছোট মরিচের মা ধানিলঙ্কার কারসাজি!
আরহাম যেই না প্রস্তুতি প্রতিবাদ করতে যাবে তখনই…
–ছপাৎ!
পানির একটা বড় ছিটা এসে সোজা তার মুখ বরাবর পড়লো। আরহাম সাথে সাথে নাক-মুখ কুঁচকে চোখ খেচে বন্ধ করে নিলো। আর ডোরা?
সে খিলখিল করে হেসে আবারও পানির মধ্যে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে।
–বহুকষ্টে শেষমেশ আলিশা আর আরহাম দুজনে মিলে ছোট্ট ডোরাকে গোসল করাতে সক্ষম হলো।
শাওয়ার শেষে আলিশা ডোরাকে নরম বেবি টাওয়ালে মুড়িয়ে আরহামের কোলে তুলে দিয়েছে।
“ওকে নিয়ে বাইরে যাও। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি।”
ডোরা তখন পানির থেকে তুলে নেওয়ার কারনে ফোলা ফোলা গাল আরও ফুলিয়ে ছলছল চোখে বাবার দিকে চেয়ে আছে।
এদিকে, আলিশার জামাকাপড় পুরো ভিজে গিয়েছে তাই এবার তাকেও একসাথে শাওয়ার নিয়েই বের হতে হবে। যদিও জামাকাপড় সঙ্গে আনা হয়নি তবে বাথরোব আছে। সেটাই পরে নাহয় বের হয়ে কাপড় নিয়ে আসবে।
শাওয়ারের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় সে আগেই রুমে রেখে এসেছে।
আরহাম ডোরাকে নিয়ে রুমে চলে এলো।
কিন্তু পানির থেকে তুলে নেওয়ার পর থেকেই ডোরার কান্না যেন আর থামছেই না। গুনগুন শব্দে কেঁদেই যাচ্ছে সে।
আরহাম তাকে বেডে বসিয়ে ধীরে ধীরে বেবি লোশন আর পাউডার লাগিয়ে দিলো তারপর ছোট্ট একটা পাঞ্জাবি পড়িয়ে রেডি করে দিলো।
কিন্তু এসবের পুরোটা সময়েও ডোরার কান্না এক সেকেন্ডের জন্যও থামেনি। সে রাগে-জেদে আরহামের মুখ, নাক, বুক যা সামনে পেয়েছে সেখানেই নিজের গুলুমুলু ছোট্ট হাত-পা দিয়ে ঠুসঠাস মেরে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
সময় পেড়ুলেও অনেক চেষ্টার পরও যখন ডোরার কান্না কিছুতেই থামছেনা তখন আরহাম রীতিমতো বিপাকে পড়ে গেলো। ডোরাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেই যেন সে আরও জোরে কেঁদে উঠছে।
তার অনেক রাগ হয়েছে – কেন তাকে পানি থেকে তুলে আনা হলো? ডোরা আরও পানি নিয়ে খেলবে…
ছেলের কান্নায় শেষমেশ আরহাম উপায় না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলো – ডোরার সঙ্গে টুকি-টুকি খেলবে। এই খেলাটা ডোরার ভীষণ পছন্দের। কিন্তু বিপদের সময় মানুষ যেমন হুঁশ হারায় তেমনই বোধহয় আরহামের সাথে হলো। আশেপাশে কী আছে, কী নেই ; সেদিকে একদম খেয়াল না করেই যা হাতের কাছে পেয়েছে তা দিয়েই চোখ বেঁধে ফেললো সে।
তারপর চোখ বাঁধা অবস্থাতেই ডোরার দিকে তাকিয়ে বললো,
“দেখ পটকা, দেখ… আমায় কেমন লাগছে?”
বাবার চোখ বাধা দেখে ডোরা প্রথমে অবাক হয়ে কান্না থামিয়ে ফোলা ফোলা চোখে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো তারপর হঠাৎ করেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
আরহাম আবারও দুইহাত দিয়ে মুখের বাকি অংশ ঢেকে ডোরাকে বলছে,
“টুকি-টুকি… ডোরাকে টুকি!”
বাবার চোখ বাঁধা, তার ওপর আবার টুকি খেলা…ব্যস! ডোরার রাগ-কান্না মুহুর্তেই গায়েব।
সে উচ্ছ্বসিত হয়ে নিজের গুলুমুলু পা দাপিয়ে কুটিকুটি করে হাসতে শুরু করলো তারপর ছোট ছোট হাত দিয়ে তালি দিতে দিতে বাবার দিকে তাকিয়ে আবদার করলো,
“দান্স দান্স…”
ছেলের আবদার ফেললোনা আরহাম।
তার চোখ তখনও বাঁধা। তবুও নিজের সুরেলা গলায় গানের তালে কোমর দুলিয়ে নাচতে শুরু করলো সে।
“ডিসকো দিওয়ানেএএএএএ… ওহ হোওওও…”
ডোরা আনন্দে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে হাসছে ; বাবার নাচ দেখে তার যেন কান্নার কথা মনেই নেই।
ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো আলিশা।
বের হয়েই সে এদিক-ওদিক কিছু খুজতে শুরু করলো। নিজের অন্তর্বাসটা কোথায় রেখেছিলো, কিছুতেই মনে পড়ছে না। এখানেই তো রেখেছিলো মনে হচ্ছে…
খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে আঁটকালো আরহামের চোখের দিকে…আরহামের চোখে বাধা তারই অন্তর্বাস!
আর সেই অবস্থাতেই মনের সুখে নাচতে নাচতে টুকি-টুকি খেলছে গন্ডারটা।
আলিশা কয়েক সেকেন্ড হতবাক হয়ে দাঁড়িয়েই রইলো।
শেষমেশ কিনা তার অন্তর্বাস নিয়ে টুকি-টুকি খেলা হচ্ছে!
রাগে আলিশার চোখ-মুখ লাল হয়ে এসেছে…
সে চুপচাপ আরহামের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে একইভাবে গানের সুর তুলতে তুলতে তার পশ্চাৎদেশ বরাবর এক বারি মেরে বললো,
“ডিসকো দিওয়ানেএএএ…”
–হঠাৎ এমন আক্রমণে আরহাম হকচকিয়ে গেলেও তার মনের গায়ক তখনও থেমে যায়নি।
সে পেছনে হাত দিয়ে ডলতে ডলতেই আগের সুর ধরে গেয়ে চলছে…
“ডিসকো দিওয়ানেএএএএএ…”
আলিশা তার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে আর ডোরা?
সে তো মাম্মা-বাবার দেখাদেখি করে নিজেও বেডের ওপর নিজের নাদুসনুদুস শরীরটা দিয়ে গড়াগড়ি করতে করতে বলছে –
“ডিচকো ডিবানে… উহু…”
একজনের চোখ বাঁধা অন্তর্বাসে, আরেকজনের রাগে মাথা গরম আর মাঝখানে তাদের ছোট্ট ছানা “ডিচকো ডিচকো” করে চলেছে….
ইজাজ খান, নিয়াজ খান, আরশাদ, আরহাম আর সবার আদরের ছোট্ট ছানা ডোরা মসজিদে গিয়েছে।
আজ আরহাম আর ডোরার পড়নে একই রকমের পাঞ্জাবি। যদিও আরহাম মোটেও ডোরাকে সঙ্গে আনতে চায়নি। কিন্তু আরশানও ছেড়ে দেওয়ার মতো বাচ্চা না। আরহাম বের হওয়া অব্দি চোখে চোখে রেখেছে তাকে ; আজ সে বাবার সঙ্গে যাবেই যাবে।
খান বাড়ির সব পুরুষ যখন একসঙ্গে একই জায়গায় যাচ্ছে তখন স্বাভাবিকভাবেই যথেষ্ট পরিমাণ গার্ডস আর প্রোটোকল নিয়েই বের হতে হয়েছে তাদের।
খান ইন্ডাস্ট্রির সাথে অনেকেরই শত্রুতা রয়েছে ; তার ওপর আরহাম এখন দেশের বেশ পরিচিত একজন মুখ। কখন, কোন দিক দিয়ে বিপদ আসে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তাই ইজাজ খান আগেই বাড়ির সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন যাতে কেউ প্রয়োজন ছাড়া যেন কখনো গার্ডস ছাড়া বাইরে বের না হয়।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
–মসজিদের ভেতর তখন খুতবা চলছে। নামাজের জন্য সবাই সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
আরহামও নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে ডোরাকে পাশে বসিয়ে রেখেছিলো। কিন্তু এই ছোট মরিচ শান্ত থাকলে তো?
বাবাকে দাঁড়াতে দেখে ডোরাও উঠে দাঁড়িয়েছে। তারপর এক হাতে বাবার পাঞ্জাবি আর অন্য হাতে পাজামা ধরে টানাটানি শুরু করেছে।
আরহামের তো তখন জান যায় যায় অবস্থা…
কোন সময় না জানি ডোরার টানাটানিতে তার পাজামাটা খুলে যায়! তাহলে তো তার মান-সম্মান আর কিছুই বাকি থাকবে না!
কিন্তু নামাজের মধ্যে তো নড়াচড়া করাও সম্ভব না তাই বুকের ভেতর কলিজাটা ধুকপুক করলেও মুখে কিছু বলার উপায়ও নেই।
আরহাম ডোরাকে বাইরে তার পিএস আনিসের কোলে দিয়ে আসার অনেক চেষ্টা করেছিলো ; কিন্তু ডোরা এক মুহূর্তের জন্যও বাবার কোল ছাড়বে না। পরে বাধ্য হয়েই তাকে ভেতরে নিয়ে আসতে হয়েছে।
–নামাজ শুরু হলে আরহাম যখন ঝুঁকে সেজদায় গেলো তখন ডোরাও বাবাকে দেখে নিজের ছোট্ট মাথাটা মাটির দিকে নামিয়ে বাবার মতো সেজদা দিলো।
আরহাম মাথা তুললে ডোরাও তাই করলো।
আরহাম আবারও সেজদায় গেলে ডোরা আবারও একইভাবে সেজদাহ দিলো।
–নামাজ শেষে আরহাম সালাম ফিরিয়ে ডোরার দিকে তাকালো। ডোরা তখন নিজের ইঁদুরছানার মতো ছোট ছোট দাঁত বের করে বাবার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে।
আরহামের মুখেও অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো।
কিন্তু মোনাজাত শুরু হতেই আবার নতুন বিপত্তি।
আরহাম দু’হাত তুলে মোনাজাত করছে দেখে ডোরাও নিজের গুলুমুলু ছোট্ট দুহাত তুলে বাবার মতোই মোনাজাত করার ভঙ্গি করলো। তবে, সেই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কিছুক্ষণ পরই ডোরা হামাগুড়ি দিয়ে বাবার পেছনে গিয়ে তার পায়ের পাতায় হাত রেখে শুরু করলো সুরসুরি দেওয়া।
আরহামের অবস্থা তখন এমন – না পারছে সইতে আর না পারছে কিছু বলতে…
সে কোনোমতে মুখ শক্ত কর মোনাজাত শেষ করলো তারপর সঙ্গে সঙ্গে ডোরাকে কোলে তুলে নিয়ে তার পশ্চাৎদেশে এক আলতো চড় দিয়ে করে বললো,
“ছোট মরিচ… এগুলা কী করছিলি তুই?”
ডোরা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে নিষ্পাপ কন্ঠে বললো,
“বাবা চেম… দোরাও চেম চেম।”
“এখনই তোকে ফেলে চলে যাবো।”
ডোরা জানে, বাবা তাকে ফেলে কোনোদিনই যাবে না। তাই বাবার হুমকিতে ভয় পাওয়ার বদলে সে কুটিকুটি করে হেসে নিজের গাল আর মুখের লালা আরহামের গালে মাখিয়ে দিয়ে আরও শক্ত করে তার গলা জড়িয়ে ধরলো।
“আ..বা…ব্বা…”
ঠিক তখনই নিয়াজ সাহেব মাথার টুপি খুলতে খুলতে এগিয়ে এসে নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন,
“আমার নানুভাই নামাজ পড়েছে বুঝি?”
–নানার দিকে তাকিয়ে ডোরা আঙুল চুষতে চুষতে জবাব দিলো,
“দোরা পচ্চি…”
নিয়াজ সাহেব হেসে নাতিকে কোলে তুলে নিলেন।
“আমার নানুভাই তো দেখি অনেক বড় হয়ে গিয়েছে।”
বাড়ি ফেরার পুরোটা পথজুড়েই ডোরা আরহামকে জ্বালিয়েছে।
সকালে বাবার সঙ্গে আসার জন্য যত জেদ, যত কান্না করেছে ; এখন তার কিছুই মনে নেই। এখন তার শুধু মাকে চাই মানে চাই।
আরহামের কোলে বসে একটু পরপরই বলছে,
“মাম… দাই… দোরা মাম দাই।”
কেউ কিছুতেই তাকে শান্ত করতে পারছে না। কখনো বাবার কোল থেকে অন্য কারও কোলে যাচ্ছে আবার পরক্ষণেই ছটফট করে আরহামের কাছে ফিরে আসছে। তারপর শুরু করে নতুন নতুন কান্ড ; কখনো বাবার জামা ধরে টানাটানি, কখনো চুল মুঠো করে টানা আবার কখনো হঠাৎ করেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার।
আরহামের অবস্থা তখন একেবারে নাজেহাল।
এমনিতেই গতরাতে তার ঠিকমতো ঘুম হয়নি। ভোররাতে আলিশার সাথে একসঙ্গে শাওয়ার সেরে চোখ বুজতে না বুজতেই সকাল হয়ে গিয়েছে তারপর ঘুম থেকে উঠে আবার নামাজের জন্য বের হতে হয়েছে।
তার ওপর এই ছোট মরিচের অত্যাচার!
আরহাম চোখ বন্ধ করে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“এ্যাঁ…হেহেহে…আমি আর পারছি না।”
পাশের সিটে বসা নিয়াজ সাহেব আরহামের এমন অসহায় অবস্থা বেশ উপভোগ করছিলেন। মুখে গম্ভীর ভাব রাখলেও মনে মনে তিনি বেশ খুশি। বেশ হয়েছে!
এই বেয়াদব ছেলেকে সোজা করার জন্য তার নাতিই যথেষ্ট।
নিয়াজ সাহেব আড়চোখে আরহামের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি ; বলা যায় পৈশাচিক আনন্দে হাসছিলেন।
আরহামের চোখ এড়াল না ব্যাপারটা।
সে কটমট করে শ্বশুরের দিকে তাকালো।
তার এই অসহায় অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে শুশুর আব্বা?
না, এটা সে কোনো কালেই মেনে নেবে না।
তাই কোলে বসে থাকা ডোরার সামনেই নিয়াজ সাহেবকে ডেকে উঠলো –
“শুশুউউ আব্বা…”
ডোরা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বাবার স্বর কপি করে সেও নানার দিকে তাকিয়ে সুর করে ডেকে উঠলো –
“চুচুউউ আব্বা… চুচু আবাআআ..”
নিয়াজ সাহেবের মুখ মুহূর্তেই থমকে গেলো। চুচু!
তার মতো সম্মানিত একজন মানুষকে কিনা নিজের নাতি চুচু বলে ডাকছে!
তিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলেন – সব এই বেয়াদব ছেলের জন্যই হয়েছে।
গাড়িতে আরহামের পাশেই বসে ছিলেন তিনি। আরশাদ আর ইজাজ খান অন্য গাড়িতে চলে গেছেন।
নিয়াজ সাহেব সাথে সাথেই আরহামের মাথায় একটা গাট্টা মেরে কটমট করে বললেন,
“বেয়াদব ছেলে! এসব কী শেখাচ্ছো আমার নাতিকে?”
আরহাম ইনোসেন্ট মুখ করে বললো,
“চুচু… স্যরি, আই মিন শুশু আব্বা। আমি কবে ওকে কিছু শেখালাম?”
“চুপ করো! এসব তোমারই কারসাজি ; আমি সব জানি।”
আরহাম এবার অসহায় মুখে বললো,
“স্যরি শুশুউউ আব্বাআআআ…”
নিয়াজ সাহেব বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে ফেললেন।
“অসভ্য ছেলে।”
পাশ থেকে ডোরা তখনও নিজের মতো করে বিড়বিড় করছে…
“চুচু… চুচু আব্বা…”
