Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৩

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৩

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৩
নওরিন মুনতাহা হিয়া

মোমবাতির নিভু নিভু আলোয় খাবার খাওয়া শেষ করে তারা দুইজন এখন তারা ঘুমিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু সমস্যা হল এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে মেঘ একা একা কি করে ঘুমাবে! চোখ বন্ধ করলে মনে হবে যেন অন্ধকারে কোন ভুত বা পরী এসে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে। ছোটবেলা থেকে অন্ধকারকে সে থাকতে ভীষণ ভয় পায়। আদ্রিয়ান ঘুমাতে যাওয়ার উদ্দেশ্য তার রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। তবে হঠাৎ কি মনে করে যেন থেমে যায় ‚ পিছনে ফিরে দেখে মেঘ মুখ কাচুমাচু কর দাঁড়িয়ে আছে। এক হাত দিয়ে অন্য হাতের তালু ঘসছে আর ভীতু চোখে চারপাশের অন্ধকার দেখছে।

মেঘ মন এখন আদ্রিয়ান খুব ভালোই পড়তে। মেঘের চোখে আর মুখে যে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট তা হয়ত আদ্রিয়ান বুঝল। আদ্রিয়ান তবুও নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করল
“মেঘ তুমি কি অন্ধকারে রুমে একা থাকতে পারবে? তোমার কি একা থাকতে ভয় করবে?”
আদ্রিয়ানের কথার উত্তর মেঘ ভিতু ভিতু কণ্ঠে বাচ্চাদের মতো করে বলে উঠে
“না‚মানে আমি সবসময় রুমে একাই থাকি। ঘুমানর আগে লাইট অফ করে ঘুমায়। কিন্তু আজ একা থাকতে একটু ভয় করছে যখন মনে পড়বে বাসায় কারেন্ট নাই। সারা রুম অন্ধকার তখন হয়ত ভয় পেতে পারি।”
কথা বলার সময় মেঘ ঠোঁট পাউন্ড করে কিউট ভীতু চেহারা করে রাখে। যা দেখে আদ্রিয়ানের বেশ হাসি পায় ‚ ঠোঁটের কোণায় এক মুচকি হাসি বজায় রেখে আদ্রিয়ান বলে

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“তুমি যেহেতু ভয় পাবে। তবে আর একা থাকার প্রয়োজন নাই ‚ তুমি বরং আমার সাথে আজ রাত থাকবে।”
মেঘ আদ্রিয়ানের কথার অর্থ বুঝল না সে মনে করেছে আদ্রিয়ান হয়ত তার সাথে এক রুমে থাকার কথা বলছে। না ‚ মেঘ আদ্রিয়ানের সাথে এক রুমে থাকবে না! অসম্ভব! আদ্রিয়ানের সাথে মেঘ ভালো ব্যবহার করছে মানে এই নয় যে ‚ সে অতীত ভুলে গেছে। মেঘ বলে উঠে
“আদ্রিয়ান স্যার আমি আপনার সাথে এক রুমে থাকতে পারব না। আমি বরং আমার রুমে একায় থাকি। একবার ঘুমিয়ে পড়লে আর ভয় করবে। আমি রুমে গেলাম।”

মেঘ যখন কথাটা বলে আদ্রিয়ানের পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে যাবে। ঠিক তখন আদ্রিয়ান পিছন থেকে মেঘের কনুই ধরে তাকে থামিয়ে দেয় এরপর এগিয়ে যায় মেঘের কাছে। মৃদু হেঁসে মেঘের কপালে তার আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে বলে

“মেঘ তুমি আমার কথার মানে উল্টো বুঝেছ। আমি তোমাকে আমার সাথে এক রুমে থাকতে বলেনি! আমি শুধু বলেছি আমার সাথে থাকতে!”
মেঘ এখন ও হয়ত আদ্রিয়ানের কথার অর্থ বুঝল না সে বোকার মতো পুনরায় প্রশ্ন করে উঠে
“মানে?এক রুমে না থাকলে এক সাথে কি করে থাকব? ”
মেঘের বোকার মতো কথা প্রশ্ন শুনে আদ্রিয়ান শব্দ করে হাসে এরপর মেঘের হাত ধরে। ছোফার কাছে নিয়ে যায় বাহু ধরে চাপ প্রয়োগ করে মেঘকে ছোফায় বসায় আর বলে
“আজ রাতে তুমি এই ছোফায় ঘুমাবে। আর আমি পাশে থাকা অন্য ছোফায় ঘুমাব। তাহলে আর ভয় পাবে না তুমি।”

ছোফায় মেঘকে বসিয়ে দিয়ে আদ্রিয়ান হেঁটে দূরে অবস্থিত এক ছোফায় বসে পড়ে। তাদের দুইজনের মধ্যে এক টেবিল আর সামান্য দুরত্ব রয়েছে। মেঘ বেচারি আর কি করবে? তার আর কোন উপায় নাই ‚ অন্ধকারে রুমে একা একা থাকতে পারবে না। তাই অযথা জেদ দেখিয়ে লাভ নাই তাছাড়া আইন অনুসারে এখন ও আদ্রিয়ান তার স্বামী। স্বামী স্ত্রী এক সাথে থাকতে পারে যদিও মেঘ এখন আদ্রিয়ানকে আর স্বামী রূপে স্বীকার করে না। তাছাড়া এর আগেও আদ্রিয়ানের অসুস্থতার সময় তারা এক রুমে থেকেছে।

আদ্রিয়ান মেঘকে হাতের ইশারা দিয়ে বলে ঘুমিয়ে পড়তে। মেঘ তাই করল সে তার শরীরে থাকা উড়না দিয়ে সারা শরীর ঢেকে শুয়ে পড়ল। আদ্রিয়ান মেঘের দিকে তাকিয়ে হাসে এরপর সে ছোফায় হেলান দিয়ে বসে পকেটে থাকা ফোন করে চালাতে থাকে।

রাত প্রায় তখন ১১ : ০০ টায় আদ্রিয়ান এখন ও ফোন টিপছে তার চোখে ঘুম নাই। আসলে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমানর অভ্যাস আদ্রিয়ানের নাই সবসময় পড়াশোনা বা হাসপাতালের কাজ শেষ করে দেরি করে বাসায় ফিরে ঘুম দেওয়ার অভ্যাস তার। হঠাৎ আদ্রিয়ান খেয়াল করল মেঘ ঘুমের ঘোরে অদ্ভুত শব্দ করছে।

মেঘের মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে হয়ত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। তবে এমন অদ্ভুত শব্দ কি করে করবে! আদ্রিয়ান তার হাতে থাকা ফোন ছোফায় রেখে উঠা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে যায় মেঘের দিকে। মেঘের কাছে গিয়ে তাকে ডাক দেয় কিন্তু মেঘ শুনে না কারণ সে ঘুমিয়ে পড়েছে। আদ্রিয়ান মেঘের শরীরে হাত দেয় ‚ শরীর প্রচুর ঠান্ডা এক প্রকার বরফের ন্যায় জমে গিয়েছে। মেঘ তার হাত পা দিয়ে শরীর ঢেকে আড়ষ্ট হয়ে শুয়ে আছে।

আদ্রিয়ান বুঝল মেঘ হয়ত অতিরিক্ত শীতের তীব্রতায় এমন করছে। বাহিরে যা শীত পড়ছে এই পাতলা উড়না দিয়ে তা নিবারণ করা সম্ভব না। আদ্রিয়ান দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে তার রুমে চলে যায় রুম থেকে চাদর নিয়ে আসার উদ্দেশ্য। রুমে পৌঁছে আলমারি থেকে দুইটা চাদর বের করে নিয়ে আসে। এরপর চাদর মেলে দিয়ে মেঘের শরীরের সাথে জড়িয়ে দেয় ‚ শীতল উষ্ণ কাপড়ের সংস্পর্শে এসে মেঘ ঘুমের ঘোরে তা শরীরের সাথে জড়িয়ে নেয়। এরপর আবার ঘুমের অতল গভীরে হারিয়ে যায়।
আদ্রিয়ান ঘুমন্ত মেঘের মুখশ্রীর দিকে তাকায় ‚হাটু গেড়েঁ বসে মেঘের কাছে। কিছুক্ষণ নিবার্ক মেঘের দিকে তাকিয়ে তার হাত নিয়ে রাখে মেঘের মাথার চুলের উপর। মেঘের এলেমেলো লম্বা অবাধ্য চুলে আলতো হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আবেগ মিশ্রত কণ্ঠে বলে উঠে

“আই এম সরি মেঘ। তোমাকে অনেক কষ্ট ‚আর অবহেলা করেছি আমি। কিন্তু বিশ্বাস কর মেঘ এখন আর তোমার কোন দুঃখ পেতে দিব না। অসম্ভব! আমি শ্রেষ্ঠ স্বামী হয়ে দেখাব। তোমার চোখ থেকে এক বিন্দু পানির বিন্দু গড়িয়ে পড়তে দিব না। তোমায় এতো ভালোবাসা দিব যে ভালোবাসা শব্দটার উপর তুমি বিরক্ত হয়ে যাবে। আর আমি তুমি ও তোমাকে ভালোবাসব।”
আদ্রিয়ানের বলা কথা মেঘ শুনল না ‚সে এখন বিভোর ঘুমে মগ্ন। কিছু মূহুর্ত মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকার পর ওর কপালের মাঝ বরাবর ঠোঁট ছুঁয়িয়ে দিয়ে আদ্রিয়ান গুণ করে গেয়ে উঠে

❝ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান”
“ঘুমাও আমার কোলে”
“ভালবাসার নাও ভাসাবো”
“ ভালবাসি বলে”
“তোমার চুলে হাত বুলাবো”
“পূর্ণ চাঁদের তলে ”
“কৃষ্ণচূড়া মুখে তোমার”
“জোসনা পড়ুক কোলে”
“আজকে তোমার মনকে জড়ায়”
“ধরবে আমার মন”
“গাইবে পাখি, গাইবে জোনাক গাছ গাছালি বন”
“এত ভালবাসা গো জান, রাখিও আঁচলে”
“দোলাও তুমি, দুলি আমি জগত বাড়ি দোলে।❞

রাত যখন সাড়ে বারোটা তখন আদ্রিয়ান মেঘের কাছ থেকে দূরে সরে আসে। এরপর তার ছোফায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু যতক্ষণ না আদ্রিয়ানের চোখে ঘুম ভর করে ঠিক ততক্ষণ সে মেঘের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এরপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে যায় আর ঘুমের অতল গভীরে হারিয়ে যায়।
ঘড়িতে সময় সকাল ৭: ০০। আমেরিকায় বরফ আচ্ছন্ন নিউইয়র্ক শহরে আজ সূর্য উঠেনি। আকাশে জমে থাকা বরফ খণ্ডের অতলে হারিয়ে গেছে সূর্য তেজ। রাতে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার কারণে মেঘ ঘুম খুব দ্রুত ভেঙে যায়। পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায় মেঘ চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে। কাল রাতের ঘটনা মনে পড়ে যায় মেঘের!

চোখ খুলে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে তার থেকে অল্প দুরত্বে মাথায় হাত দিয়ে ঘুমিয়ে আছে আদ্রিয়ান। মেঘ একবার ঘুমন্ত আদ্রিয়ানের মুখের দিকে তাকায় এরপর আবার চোখ সরিয়ে নেয়। আজ কলেজ আছে তাছাড়া রান্না করে তারপর রেডি হয়ে কলেজে যেতে হবে। তাই মেঘ দ্রুত ছোফা ছেড়ে উঠে পড়ে। কিন্তু মেঘ ছোফায় থেকে উঠার সময় খেয়াল করে তার শরীরে চাদর জড়ান। কিন্তু এই চাঁদর কোথা থেকে আসল? কারণ মেঘের স্পষ্ট মনে আছে কাল রাতে মেঘ শরীরে উড়না জড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিল৷ তবে কি আদ্রিয়ান রাতে চাদর এনে দিয়েছে মেঘের জন্য? মেঘ তাকায় আদ্রিয়ানের দিকে তার শরীরে ও চাদর রয়েছে।

মেঘ উঠে দাঁড়ায় এরপর সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে ফ্রেশ হয়ে আসে রান্নাঘরে গিয়ে সকালের নাস্তা রেডি করতে শুরু করে। আদ্রিয়ান এখন ও ঘুমিয়ে আছে মেঘ আর তাকে ডাক দেয় না।
সকাল যখন ৮: ৩০ তখন ঘুম ভাঙে আদ্রিয়ানের৷ চোখ খুলে তাকিয়ে প্রথম দেখে মেঘ কোথায়? ছোফায় মেঘকে না দেখতে পেয়ে মেঘ দ্রুত উঠে পড়ে। আশেপাশে তাকিয়ে মেঘকে খুঁজতে থাকে। ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে কফির মগ হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমের কাছে এগিয়ে আসে মেঘ। মূলত আদ্রিয়ানকে ঘুম থেকে ডাক দিয়ে তাকে কফি দেওয়ার জন্য মেঘ এসেছিল। কিন্তু আদ্রিয়ান ডাক দেওয়ার আগেই উঠে পড়েছে দেখে মেঘ বলে

“গুড মনিং আদ্রিয়ার স্যার৷ আপনি ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন? এই নেন আপনার কফি?”
“তুমি কোথায় ছিলে মেঘ? ঘুম থেকে উঠে কোথায় চলে গিয়েছিলে?”
“কোথায় যাব আমি? রান্নাঘরে ছিলাম। সকালের নাস্তা রেডি করছিলাম।”
“ওহ্ আচ্ছা। সকালের জন্য খুব হালকা নাস্তা তৈরি কর। আজ কিন্তু কলেজ আছে দ্রুত কলেজে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি রান্না শেষ কর।”
“আমার রান্না করা শেষ। আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন আমি খাবার দিচ্ছি৷”
“এতো দ্রুত কি করে রান্না করে ফেললে মেঘ?”
“আমি অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠেছিলাম। আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন বলে আর ডাক দেয়নি।”
“গুড গার্ল। আমি রুমে গেলাম ফ্রেশ হতে তুমি ও রেডি হয়ে নিচে আসো৷ একসাথে খাওয়া দাওয়া করব এরপর কলেজে যাব।”

“ওকে।”
এরপর মেঘ আর আদ্রিয়ান ফ্রেশ হয়ে কলেজের জন্য রেডি হয়ে নিচে ড্রয়িং রুমে আসে। একসাথে খাওয়া দাওয়া শেষ করে কলেজের জন্য বাহির হয়।
কলেজের গেইটের বাহিরে এসে পৌঁছায় গাড়ি। মেঘ গাড়ির দরজা খুলে বের হয়ে যায় বাহিরে আদ্রিয়ান ও বাহির হয়। ড্রাইভার গাড়ি পার্ক করার উদ্দেশ্য নিয়ে যায় তারা দুইজন একসাথে দাঁড়ায়। ক্লাস শুরু হয়ে যাবে ঘণ্টা বাড়ি দিয়ে দিয়েছে তাই মেঘ বলে
“আদ্রিয়ান স্যার ক্লাস শুরু হয়ে যাবে আমি তবে ক্লাসে গেলাম।”
“হুম যাও মেঘ।”

আদ্রিয়ানের থেকে বিদায় নিয়ে মেঘ ক্লাসে যাওয়ার দিকে পা বাড়ায়। আদ্রিয়ান ও তার কেবিনে চলে যায়। আজ সকল শিক্ষকদের সাথে প্রিন্সিপালের মিটিং রয়েছে ‚ যার জন্য প্রতৈকে তাড়াতাড়ি কলেজে উপস্থিত থাকতে বলেছে। আজ হয়ত ক্লাস শুরু হতে দেরি হবে।
ক্লাস রুমে প্রবেশ করে মেঘ সকল ছাএ ছাএী তাদের সিটে বসে পড়েছে। নূহা প্রথম সারিতে বসেছে ‚ প্রতিদিনের মতো মেঘ সবার শেষ সারির সিটের কাছে যায়। তবে শেষ সারিতে তিহানকে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যায় মেঘ? তিহান মূলত মেঘের জন্য আজ শেষ সারিতে বসেছে৷। অনেক সময় ধরে মেঘের জন্য সে সিট ফাঁক রেখে বসে ছিল ফাইনালি মেঘ এসেছে। তিহান মেঘকে দেখে মুচকি হাসি দিয়ে তার পাশের সিটে বসার ইশারা করে বলে

“মেঘ দাঁড়িয়ে আছো কেন? এখানে বসো? সিট ফাঁকা আছে তো!”
ফাকাঁ সিটে মেঘ বসে যায় এরপর তার কাঁধে থাকা ব্যাগ টেবিলের উপর রেখে মেঘ তিহানকে প্রশ্ন করে
“তিহান আজ হঠাৎ তুমি শেষের সারিতে বসলে কেনো? প্রথম সারিতে নূহার পাশের সিট খালি আছে তো!
“না ‚ ওই মিস : ঝগড়ুটের সাথে আমি এক সিটে বসব না।”
“তিহান তুমি ও না! নূহা কিন্তু খুব ভালো মেয়ে। তুমি শুধু শুধু ওর সাথে ঝগড়া কর।”
“কি আমি ঝগড়া করি নূহার সাথে। নূহা সারাক্ষণ আমার সাথে ঝগড়া করে। আর ও ভালো মেয়ে না বরং ভীষণ ঝগড়ুটে আর জল্লাদ মেয়ে।”

“আচ্ছা থাক আর নূহার বিষয়ে খারাপ কথা শুনতে চাই না আমি। তুমি এখানে বসেছ এখানেই বসো।
কলেজে আজ সকল টিচার্দের নিয়ে প্রিন্সপাল মিটিং করছে যার জন্য ক্লাস শুরু হতে লেইট হয়৷ প্রায় দুই ঘণ্টা পর মিটিং শেষ হয় প্রথম ক্লাস আদ্রিয়ানের থাকায় সে ক্লাসে আসে। সকল ছাএ ছাএী সম্মানের সহিত উঠে দাঁড়ায় আদ্রিয়ান ক্লাসে প্রবেশ করে সবাইকে হাত নাড়িয়ে বসার ইশারা করে।

ক্লাসে প্রবেশ করার পর আদ্রিয়ানের সর্বপ্রথম চোখ যায় শেষ সারিতে বসে থাকা মেঘের উপর। মেঘকে দেখে আদ্রিয়ানের মুখে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠে কিন্তু যখন মেঘের পাশে এক পরিচিত ছেলেকে দেখে এখন আবার গম্ভীর হয়ে যায়। তবে ক্লাসে যেহেতু ছেলে মেয়ে উভয়ই একসাথে বসতে পারে তাই আর আদ্রিয়ান কিছু মনে করল না।
ক্লাস শুরু হয়ে যায় আদ্রিয়ান বই বের করে এক পৃষ্ঠা আলোচনা করছিল আর বুঝাছিল। মেঘ তার সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে বইয়ের লাইন বুঝার চেষ্টা করছিল। তিহান তার ব্যাগ খুলে বই বাহির করার জন্য কিন্তু ভুলবশত আজ সে তার বই বাসায় রেখে এসেছে। এখন কি করবে সে! তিহান পাশে বসে থাকা মেঘকে অনুরোধ করে বলে
“মেঘ আজ ভুলবশত আমার বই বাড়িতে রেখে এসেছি। তুমি কি তোমার বইটা আমায় একটু দিবে? আমরা কি এক বই শেয়ার করতে পড়তে পারি।”

তিহানের কথা শুনে মেঘ রাজি হয়ে যায়। তিহান একটু দূরে বসে ছিল কিন্তু দূর থেকে এক বই দিয়ে পড়া সম্ভব নয় তাই মেঘের কাছে আসে। এরপর তারা বই পড়তে থাকে৷ তিহানের মনোযোগ বইয়ের থেকে বেশি মেঘের উপর ছিল সে মেঘের চোখ ‚মুখ ‚সব পর্যবেক্ষণ করছিল। কি মায়াবী আর মিষ্টি চেহারা মেঘের যতই দেখতে ততই প্রেমে পড়ে যায়। মেঘ বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকায় সে তিহানের চোখের ভাষা বুঝল না। কিন্তু দূরে থাকা আদ্রিয়ান সব লক্ষ্য করছিল তিহানের মেঘের উপর তাকিয়ে থাকা ‚ তাদের একে অপরের কাছাকাছি আসা সব।

আদ্রিয়ান শরীর রাগে জ্বলে যাচ্ছে কত বড় সাহস এই ছেলের আদ্রিয়ান রোদায়ানের বউয়ের উপর নজর দিচ্ছে! হাতে থাকা বইয়ের পৃষ্ঠার উপর আদ্রিয়ান শক্ত করে হাত চেপে ধরে আর অন্য হাত মুষ্টি বদ্ধ করে রাখে। ক্লাসে এখন অনেক ছাএ ছাএী এখানে কিছু বলা যাবে না। মেঘ বইয়ের উপর থেকে চোখ সরিয়ে সামনের দিকে তাকায় দেখে আদ্রিয়ার মুখ থমথম করে রাগী দৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যেন এখুনি মেঘকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে! আদ্রিয়ানের ব্যবহার অদ্ভুত লাগে মেঘের কাছে হঠাৎ এমন রেগে আছে কেন? মেঘ আবার কি করল?
অবশ্য আদ্রিয়ানের মুখই এমন যে সে সাধারণ ভাবে থাকলে ও মনে হয় সে রেগে আছে। মেঘের চোখে চোখ পড়তেই আদ্রিয়ান রাগ একটু শান্ত হয় কিন্তু যখন মেঘ আদ্রিয়ানের উপর থেকে চোখ সরিয়ে তিহানের দিকে তাকায়। তখন আবার রাগের পরিমাণ দিগুণ হয়ে যায়। আদ্রিয়ান জোরে শব্দ করে বই টেবিলে রাখে এরপর গম্ভীর গলায় বলে
“তোমরা সকলে বোর্ডে মনোযোগ দাও। আমি চিএ আকঁব।”

সকল ছাএ ছাএী বোর্ডের দিকে তাকায় মেঘ তার ব্যাগ থেকে খাতা কলম বের করে চিএ আঁকবে বলে। আদ্রিয়ান বোর্ডে চিএ আঁকছিল কম বারবার বইয়ের দিকে তাকিয়ে পিছনে মেঘের দিকে দেখছিল। তার বইয়ের সকল চিএ মুখস্থ তবুও সে ইচ্ছা করে বইয়ের দিকে তাকায় যাতে সে মেঘকে দেখতে পায়। আদ্রিয়ান খুব দ্রুত চিএ আঁকে যার ফলে মেঘ সম্পূর্ণ শেষ করতে পারিনি। তাছাড়া এই চিএটা খুব জটিল হওয়ায় মেঘ আঁকতে পারছিল না। মেঘ পাশে থাকা তিহানকে বলে

“তিহান তুমি কি এই চিএ একেঁ ফেলছ? আমায় একটু সাহায্য কর। আমি আঁকতে পারছি না!
“দাও আমি তোমাকে সাহায্য করছি।”
তিহান মেঘকে সাহায্য করে চিএ অঙ্কন করতে মেঘের চিএ একটু বাঁকা হয়ে যাচ্ছিল বলে। তিহান মেঘের হাত শক্ত করে চিএ আঁকায় সাহায্য করছিল। আর অন্যদিকে তিহানের মেঘ হাত ধরার বিষয়টা আদ্রিয়ান খেয়াল করে। দাঁত কটমট করে তাকিয়ে আছে সেইদিকে ইচ্ছা করছে এখুনি গিয়ে ওই ছেলেকে খুন করে ফেলতে! আর মেঘের কোন ওর সাহায্যর প্রয়োজন পড়বে। আদ্রিয়ানকে বললে সে কি চিএ বুঝিয়ে দিত না? ক্লাসের স্যারকে সমস্যার কথা না বলে অন্য ছেলেকে বলছে সিরিয়াসলি। আবার তার হাত ধরে চিএ অঙ্কন করছে!

তিহান মেঘকে চিএ বুঝিয়ে দেয়। মেঘ একা একা চেষ্টা করতে থাকে আঁকতে। কিন্তু মেঘের কপালে থাকা বাবড়ি চুলগুলো খুব বিরক্ত করছিল তাকে। যা হয়ত তিহান খেয়াল করে সে সাহস দেখিয়ে মেঘের কপালের চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে দেয়। মেঘ কিছু মনে করল না কারণ তিহানকে সে বন্ধুর মতো দেখে। আর তিহান যথেষ্ট ভালো ছেলে। মেঘ বলে
“ধন্যবাদ তিহান আমাকে সাহায্য করার জন্য।”
“ইটস অল রাইট মেঘ।”

মেঘ আর তিহান একে অপরের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল। আদ্রিয়ানের হয়ত ধৈর্যর সীমানা অতিক্রম হয়ে গেছে। মেঘকে ছুঁয়ার সাহস কি করে করল এই ছেলে? আবার তারা একে অপরে চোখে চোখে কথা বলছে। না এই দুইজনকে একসাথে বসতে দিলে হয়ত তারা সারা ক্লাস এমন করবে৷ মেঘ আর তিহান যখন একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিল তখন হঠাৎ আদ্রিয়ান জোরে গম্ভীর কণ্ঠে ধমক দিয়ে বলে

“মেঘ ‚ তিহান তোমরা উঠে দাড়াও ”।
আদ্রিয়ান ধমক এতো জোরে দিয়েছে যে সারা ক্লাস রুমের সকলে ভয় পেয়ে যায়। তারা অবাক চোখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেঘ আর তিহান হঠাৎ করে আদ্রিয়ানের ধমক শুনে চমকে যায় ‚ তারা সামনের দিকে তাকায়। মেঘ কিছু বুঝে উঠার আগেই আদ্রিয়ান দিগুণ জোরে ধমক দিয়ে বলে উঠে
“কি হল আমার কথা কি শুনতে পাও নি তোমারা? মেঘ ‚ আর তিহান তোমাদের উঠে দাঁড়াতে বলছি আমি।“l said Stand up।”

আদ্রিয়ানের ধমক শুনে সারা ক্লাস ভয়ে তটস্থ হয়ে যায়। মেঘ আর তিহার উঠে দাঁড়ায় আদ্রিয়ান রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে যেন চোখ গিলে ভস্ম করে দিবে দুইজনকে। এরপর কর্কশ আর শাসিত কণ্ঠে বলে
“শেষের সারি বলে তোমরা দুইজন কি করছিলে? তোমাদের কি মনে হয়? আমার ক্লাস কি কথা বলার জায়গা? যদি খুব বেশি কথা বলার প্রয়োজন থাকে তবে বাহিরে বের হয়ে যেতে পার। কিন্তু ক্লাসে বসে কথা বলে অন্যদের বিরক্ত করছ কেন?”
আদ্রিয়ানের ধমক শুনে মেঘ বলে
“আদ্রিয়ার স্যার আমরা কোন কথা বলেনি।
“just Shut up meg. এক তো ক্লাসে বসে কথা বলছ আবার শিক্ষকের মুখে মুখে তর্ক কর!”
“সরি স্যার।”

“ আর তিহান তুমি প্রথম সারিতে জায়গায় খালি রেখে পিছনের সিটে বসেছ কেনো? কথা বলার জন্য? আর কখন যেন তোমাদের আমি একসাথে বসতে না দেখি। শুধু আমার ক্লাস নয় অন্য যেকোন ক্লাসে তোমরা একসাথে বসবে না। আর আমার ক্লাসে বসে যদি আর একবার কথা বল তবে কান ধরে দুইটাকে বাহিরে দাঁড় করিয়ে রাখব।”
আদ্রিয়ানের ধমক শুনে সম্পূর্ণ ক্লাস নীরব আর শান্ত হয়ে যায় মেঘ ভয়ে মুখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। মেঘের ভযার্ত মুখ দেখে আদ্রিয়ান হয়ত মায়া হয় সে একটু নরম কণ্ঠে বলে

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩২

“আচ্ছা এখন বসে যাও। চুপচাপ ক্লাস করবে। কথা বলবে না আর।”
মেঘ বসে যায় আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে দশ বারেটা গালি দেয়। মেঘ মনে মনে বলে
“রাগী ‚বদমোজাজী ‚বদজাত, খাটাশ লোক একটা। শুধু শুধু বকা দিল আমাকে।”
আদ্রিয়ান মেঘের মুখ দেখে বুঝতে পারে এই মেয়ে নিশ্চয়ই তাকে গালি দিচ্ছে। বউয়ের মুখে গালি শুনতে তার অসুবিধা নাই কিন্তু তার বউকে সে অন্য কারো হতে দিবে না। অসম্ভব!

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৪