Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৬

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৬

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৬
নওরিন মুনতাহা হিয়া

বাহুদ্বয়ের বাঁধনে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মেঘ তার স্বামীকে। অতিরিক্ত রক্ত”ক্ষর”ণের কারণে আদ্রিয়ানের শরীর নিস্তেজ হয়ে যায় ধীরে ধীরে সমস্ত দেহের ভার ছেড়ে দিয়ে লুটিয়ে পড়ে মেঘের উপর। থুতনি ধরে মাথা উঁচু আদ্রিয়ানের মুখশ্রীর দিকে তাকায় মেঘ। দীর্ঘ সময় ধরে ঠান্ডা জলে ভিজে থাকার ফলে চোখ _ মুখ রক্তিম হয়ে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। গম্ভীর মুখ শুকিয়ে ফেকাসে হয়ে গেছে! আদ্রিয়ানের প্রতি বেশ মায়া হয় মেঘের।

ফারহানের প্রপোজে রাজি হলে আদ্রিয়ান কষ্ট পাবে সেটা মেঘ জানত। কিন্তু আদ্রিয়ান যে আ”ত্ম”হ”ত্যা করবে! তা হয়ত মেঘ বুঝতে পারেনি। যদি আর একটু দেরি করে মেঘ বাড়ি ফিরত বা ওয়াশরুমে যেত! তবে কি যে হত তা ভেবে মেঘের কলিজা কেঁপে উঠে। আদ্রিয়ানের মতো এমন ম্যাচিউর‚ বুদ্ধিমান‚ শান্ত ব্যক্তি আত্মাহত্যার করার ভুল কি করে করল? মেঘ কখন ও চাই না আদ্রিয়ানের কোন ক্ষতি হোক! আদ্রিয়ানের শাস্তি চাই কিন্তু মৃত্যু নয়! কেন স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যু চাইবে না কখন না! আদ্রিয়ান মেঘের কাছে শেষ সুযোগ চেয়েছিল‚ মেঘ তা দিবে! কিন্তু এইটাই শেষ।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

[রাত প্রায় ১২ : ০০ ]
অজ্ঞানরত আদ্রিয়ানের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মেঘ। শরীরে প্রচুর জ্বর আদ্রিয়ানের। জ্বরের তীব্রতায় সারা শরীর কেঁপে উঠছে! কিন্তু আদ্রিয়ানের এখন কোন হুঁশ নাই। জ্বর আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অনেক আগেই অজ্ঞান হয়ে গেছে। শরীরে এখন ভেজা শার্ট আর প্যান্ট জড়ান খোলা হয়নি! মেঘ আলতো হাতে আদ্রিয়ানের কপালে হাত ছুঁয়ায় কপালে যেন জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! পানির মধ্যে বেশি সময় থাকলে জ্বর এসে পড়ার ধাচঁ রয়েছে আদ্রিয়ানের। কিন্তু এখন মেঘের বেশ চিন্তা হচ্ছে! প্রথমত ‚ আদ্রিয়ান অজ্ঞান হয়ে গেছে তাছাড়া তার শরীরে এখন অনেক জ্বর। বাসায় এখন মেঘ ছাড়া আর কোন মানুষ উপস্থিত হয়। একা মেঘ এখন কি করবে? ঔষধ না খাওয়া অবধি জ্বর কমবে না! কিন্তু ঔষধ কি করে খাবে আদ্রিয়ান তো অজ্ঞান হয়ে গেছে? সকাল অবধি অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। কিন্তু রাতে যদি জ্বরের তীব্র বেড়ে যায় তখন? মেঘের মাথায় এক পরিকল্পনা আসে। বিছানা থেকে উঠে বাক্সে থাকা ঔষধ বের করে শক্ত কোন বস্তু দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে। ঔষধ গুড়ো করে এরপর পানির সাথে মিশিয়ে চামচ দিয়ে আদ্রিয়ানের ঠোঁটে দেয়। মাথা উঁচু করে ধরে যাতে ঔষধ গলা অবধি নামতে পারে।

উষ্ণ চাদের নিচে ঢাকা পড়া আদ্রিয়ানের ভিজা শার্টের বোতামে হাত রাখে মেঘ। প্রথমে সংকোচ বোধ করলে ও আদ্রিয়ানের শরীরে জ্বরের তীব্রতা দেখে দ্রুত হাত চালায় মেঘ। উপরে অংশে শার্টের বোতাম খুলে দেয় মেঘ! বুকের ভেজা পশম চিকচিক করে উঠে। মেঘ সামান্য ঢুক গিলে পুনরায় সারা দেহ অনাবৃত করে। এরপর শরীর থেকে শার্ট ছড়ায়! কিন্তু ভেজা প্যান্টের কি করবে? টেবিলের উপর থেকে হেয়ারড্রয়ার নিয়ে এসে ধীরে ধীরে ভেজা প্যান্ট সামান্য শুকায়। এরপর আদ্রিয়ানের শরীরে চাদর জড়িয়ে দিয়ে মেঘ তার রুমে চলে যায় ড্রেস চেঞ্জ করতে।
ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে উষ্ণ জামাকাপড় পরিধান করে মেঘ। সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে গিয়ে বিছানায় বসে কিছুক্ষণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে! ঘড়িতে তখন রাত প্রায় ১:০০। দুই চোখ জুড়া ঘুমে টলমল করছে মেঘের। ভীষণ টার্য়াড তার শরীর! কিন্তু হঠাৎ মেঘের মস্তিষ্কে এক ভাবনার উদয় হয়। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কল লিস্টে থাকা ফারহানের নাম্বারে কল লাগায়।

ফারহান তার নিজস্ব বাসায় বসে এখন ল্যাপটপে কাজ করছে। গভীর রাত অবধি জেগে কাজ করার অভ্যাস ফারহানের নাই। কিন্তু খুব শীঘ্রই ফারহান কয়েক দিনের জন্য বাংলাদেশে যাবে ঘুরতে যার জন্য অগ্রীম কিছু কাজ করে রাখছে। ফারহান যখন ল্যাপটপে কাজ করছিল তখন হঠাৎ তার ফোন শব্দ করে বেজে উঠে। পাশে থাকা ফোনের স্কিনে মেঘের নাম্বার দেখে ফারহান অবাক হয়। এতো রাতে হঠাৎ মেঘ ফোন করছে কেন? কোন বিপদ হয়নি তো মেঘের? ফারহান দ্রুত ফোন রিসিভ করে বিচলিত কণ্ঠে বলে উঠে

“মেঘ‚ তুমি হঠাৎ এতো রাতে কেন ফোন করেছ? কোন সমস্যা হয়েছে কি তোমার? তুমি দাঁড়া ও আমি এখুনি আসছি।”
মেঘকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ফারহান একাই এক দমে সব কথা বলে ফেলল। অপর পাশে থাকা মেঘ বিরক্ত হয়ে বলে
“ফারহান‚ প্রথমে আমার কথা শুনেন। এরপর না হয় আপনার মতামত দিয়েন।”
“সরি মেঘ‚ বল কেন করেছ এতো রাতে আমায়?”
মেঘ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে শান্ত হয়ে নীরব কণ্ঠে বলে উঠে
“ফারহান কাল কি আমরা দেখা করতে পারি? কোন রেস্টুরেন্টে?”
মেঘের দেখা করার কথা শুনে ফারহান খুশিতে গদগদ হয়ে বলে
“হুম অবশ্যই মেঘ। তুমি বল কোথায় দেখা করতে চাও তুমি?”
“মেডিক্যাল কলেজের পাশে যে রেস্টুডেন্ট রয়েছে সেখানে। বিকাল ৪:০০ টায় অপেক্ষা করব আমি। আপনি আসবেন ফারহান?”

“ অবশ্যই আসব মেঘ। তবে কাল বিকালে দেখা হচ্ছে।
“হুম দেখা হবে কাল। এখন ফোন রাখি। আমার খুব ঘুম পেয়েছে।”
“ওকে বাই মেঘ। গুড নাইট।”
“গুড নাইট ফারহান।”
মেঘ ফোন রেখে দেয় এরপর আদ্রিয়ানের রুমে চলে যায়। আজ সারারাত মেঘ আদ্রিয়ানের সাথে থাকবে। আদ্রিয়ানের শরীরের অবস্থা ভালো নেই। রাতে জ্বরের তীব্রতা বাড়লে তখন কি হবে? তাছাড়া মেঘ আদ্রিয়ানকে প্রমিজ করছে তার সাথে আজ সাররাত থাকবে!

সকাল প্রায় নয়টা। জানালা ভেদ করে আসা সূর্যের আলোর ঝলমলে রোদ চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে যায় মেঘের। চোখ পিটপিট করে তাকায় সে। বিছানার এক কোণায় বেডের সাথে হেলান দিয়ে বসে ঘুমিয়ে ছিল কাল সারারাত। হঠাৎ মেঘের মনে পড়ে আদ্রিয়ানের কথা। পাশে তাকিয়ে দেখে বালিশে মাথা দিয়ে মেঘের হাত শক্ত ধরে বাচ্চাদের মতো মুখ করে ঘুমিয়ে আছে আদ্রিয়ান। ঘুমন্ত অবস্থায় আদ্রিয়ানের মুখশ্রী বরাবরই কিউট বাচ্চাদের মতো হয়ে থাকে। ভীষণ আদুরে। মেঘ মাথা নিচুঁ করে আদ্রিয়ানের ঘুমন্ত মুখের উপর নজর বুলায় হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেয়। শরীরে জ্বর এখন ও আছে কিন্তু রাতের মতো তীব্র নয়।

বেশ কিছুক্ষণ ঘুমন্ত আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকে মেঘ। সময় বয়ে যায় কিন্তু আশঁ মিটে না তার। কিন্তু সকালের রান্না করতে হবে মেঘের। কাল রাতে আদ্রিয়ান কোন খাবার খায়নি। সকালে তাড়াতাড়ি খাবার খেয়ে ঔষধ খেতে হবে। মেঘ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এরপর রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে রান্না ঘরে চলে যায়।
____ সকল প্রায় ৯: ০০ টার সময় আদ্রিয়ানের জ্ঞান ফিরে আসে। ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকায়। মাথায় প্রচণ্ড ব্যাথা করছে তার! ‎বিছানার চাঁদর সরিয়ে উঠতে যাবে তখন আদ্রিয়ান খেয়াল করে তার শরীরে শার্ট নাই? নবীন বরণ অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় সাদা রঙের শার্ট পড়েছিল আদ্রিয়ান। কাল হাতে কি হয়েছিল? হঠাৎ আদ্রিয়ান দেখল তার হাতে বেন্ডেজ করা। সে বেশ অবাক হয়! মাথায় চাপ প্রয়োগ করে রাতের সব ঘটনা মনে করার চেষ্টা করে। ফারহান আর মেঘের প্রপোজ করার ঘটনা! এরপর একই গাড়ি করে তাদের বাড়ি পৌঁছান আর এরপর আদ্রিয়ানের হাত কাটার ঘটনার কথা মনে পড়ে! কিন্তু আদ্রিয়ান কাল রাতে আত্মাহত্যা করেছিল! তবে তাকে কে বাঁচিয়েছে? মেঘ? তার শার্ট ও মেঘ খুলেছে?

রুমের আশেপাশে আদ্রিয়ান মেঘকে খোঁজে কিন্তু কোথাও মেঘ নাই! আদ্রিয়ান তার কপালে হাত দিয়ে দেখে কপাল গরম ! মানে তার জ্বর এসেছে? টেবিলের উপর মেডিসিন ব্যাক্স পড়ে রয়েছে! কিন্তু মেঘ হঠাৎ আদ্রিয়ানের সেবাযত্ন কেন করবে? আগে আদ্রিয়ান অসুস্থ হলে করত কারণ তখন মেঘ আদ্রিয়ানকে ভালোবাসত? কিন্তু এখন ফারহানকে ভালোবাসে! অবশ্য আদ্রিয়ান মেঘের টির্চার হয় হয়ত এরপর অসুস্থতা সময় তার সেবা করেছে!
বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আদ্রিয়ান। এরপর ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে আসে। আলমারি থেকে জামাকাপড় বের করে পরিধান করে। রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যায়।
ড্রয়িং রুমে টেবিলের উপর খাবার সাজিয়ে রাখছিল মেঘ। হঠাৎ সিঁড়ির উপরে কার পায়ের শব্দ শুনে অবাক হয়ে তাকায় মেঘ। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছে আদ্রিয়ান! আদ্রিয়ানের জ্ঞান ফিরে এসেছে? জ্বর কি কমেছে এখন শরীরের? না জেদ দেখিয়ে নিচে চলে এসেছে? মেঘ আদ্রিয়ানের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে
“আদ্রিয়ান স্যার আপনি এই শরীর নিয়ে নিচে আসতে গেলেন কেন? আমি এখুনি খাবার রেডি উপরে নিয়ে যাচ্ছিলাম।”
মেঘের কথার উত্তরে আদ্রিয়ান ছোট জবাব দেয়

— আমি এখন সুস্থ মেঘ।
আদ্রিয়ানের কথা মেঘের বিশ্বাস হয় না। মেঘ আদ্রিয়ানের কপালে হাত দিয়ে দেখে। এখন ও শরীরে অনেক জ্বর। মেঘ বলে
—- আদ্রিয়ান স্যার মিথ্যা কেন বলছেন? আপনার শরীরে অনেক জ্বর? আপনি রুমে গিয়ে বিশ্রাম নেন।”
আদ্রিয়ান আগের মতো গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠে
—- মেঘ আমি ঠিক আছি। খাবার রেডি কর। কলেজে যাব আমি।
আদ্রিয়ানের ব্যবহার কেমন জানি অদ্ভুত লাগছে মেঘের কাছে। এমন গম্ভীর আর রাগী কণ্ঠে আগে কথা বলত আদ্রিয়ান তার সাথে। যখন প্রথম আমেরিকায় এসেছিল। মেঘ বলে
—- আপনার শরীর অসুস্থ আপনার। কলেজে যাওয়ার প্রয়োজন নাই।
মেঘের কথা শুনে আদ্রিয়ান ধমক দিয়ে বলে
— আমার কোন বিশ্রামের প্রয়োজন নাই মেঘ। আমি সুস্থ আছি। তুমি কি খাবার দিবে আমায় মেঘ। না আমি একা চলে যাব।
আদ্রিয়ানের ধমক শুনে মেঘ বলে

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৫

—- আপনি রাগ করছেন কেন আদ্রিয়ান স্যার? কলেজের সময় হয়নি এখন ও। তাছাড়া আমি ও তো কলেজে যাব।
—- তুমি কি আজ আমার সাথে কলেজে যাবে মেঘ?
মেঘ অবাক হয়ে বলে
—- হুম। কেন আমি প্রতিদিন আপনার সাথে যায় কলেজে।
—- না। আমি মনে করলাম হয়ত ফারহান চৌধুরী তোমায় গাড়ি করে কলেজে পৌঁছে দিয়ে যাবে। আফটার অল হবু স্বামী হয় তোমার।—

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৭