Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৯

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৯

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৯
নওরিন মুনতাহা হিয়া

__ “আত্মীয়” শব্দটা শুনে তিহান চুপ হয়ে যায়। বুকের ভিতর এক শূন্য অনুভূতির দেয়াল সৃষ্টি হয়। তারা এখন অবস্থান করছে কলেজ গাউনে‚ প্রথম এই গাউনে মেঘের সাথে দেখা হয়েছিল তিহানের! বৃষ্টি ভেজা এক আবেগময় মুহুর্তের সাক্ষী হয়েছিল এই কলেজ গাউন। প্রথমবার কোন নারীর রূপের মায়া মুগ্ধ হয় এক যুবক! নিজের মনের অজান্তে ঠেই হারিয়ে ভালোবাসা নামক এক অদ্ভুত অনুভূতির মায়া জাল তৈরি হয়। মানুষ বলে‚ প্রথম প্রেম ভুলা যায় না। হয়ত তিহানও পারবে না মেঘকে ভুলতে? কিন্তু আদ্রিয়ানের সাথে কি মেঘের কোন সম্পর্ক রয়েছে? না‚ তারা শুধুই আত্মীয়? গাড়ির বাহিরে দাঁড়ান দুইজনের হাস্যজ্জ্বল মুখ সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে না? তবে কি তিহানের সন্দেহ ভুল! না সঠিক?

হঠাৎ ভাবনার জগৎ তিহানকে হারিয়ে যেতে দেখে পাশে থাকা নূহা অবাক হয়! মুখ_ চোখ এমন চুপসে কেন গেছে তিহানের? শান্ত আর নির্জীব হয়ে তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে ! নূহা একবার ডাক দেয়
“তিহান? কোন ভাবনার জগৎতে হারিয়ে গেলেন আপনি? শুনছেন তিহান?”
কিন্তু নূহার কথায় কোন সাড়া দেয় তিহান। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে পূর্বের ন্যায় শরীর ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মস্তিষ্ক জুড়ে এখন মেঘের খেয়াল। নূহা এইবার তার ডান হাত উঁচু করে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে শব্দ করে আওয়াজ করে। তিহানের চোখের সামনে! এরপর বলে
“শুনছেন তিহান? কি হয়েছে আপনার? কথা বলছেন না কেন?”
নূহার ডাকে ঘোর কাটে তিহানের। চিন্তিত মুখশ্রী স্বাভাবিক করে বলে উঠে
“না‚ আমার কি হবে? তুমি ক্লাসে যাও। আমি বাইক পার্ক করে আসছি।”

সাধারণ কণ্ঠে তিহান কথা বললেও নূহার স্বাভাবিক মনে হয়নি। কিন্তু ক্লাস শুরুর ঘণ্টা বেজে যাওয়ায় আর কথা বাড়ায় না সে! চুপচাপ ক্লাসে চলে যায়। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষণ হতাশ ভঙ্গিতে কলেজ গাউনে দাঁড়িয়ে থাকে তিহান। এরপর বাইক পার্ক করে ক্লাস রুমে চলে যায়।প্রতিদিনের মতো ক্লাস রুমের শেষের সারিতে বসে আছে মেঘ। ক্লাস রুমে হয়ত এখুনি স্যার প্রবেশ করবে! প্রতৈকে নিজ নিজ সিটে বসে পড়েছে। বাইক পার্ক করে আসতে দেরি হয়ে গেছে তিহানের। আজ সে আশা করেছিল মেঘের সাথে বসবে। নিজের মনের অনুভূতির কথা মেঘকে জানাবে! কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি।

আজ অন্য এক ছাএী বসেছে মেঘের পাশে। ক্লাস রুমের দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে হাস্যজ্জ্বল মুখ নিয়ে মেঘের দিকে তাকায় তিহান। কিন্তু শেষের সারিতে অন্য ছাএীকে বসতে দেখে তার মন ভেঙে যায়। তার মুখে থাকা হাসি বিলুপ্ত হয়ে যায়! হতাশ হয়ে তিহান আশেপাশে ফাঁকা সিট খুঁজতে লাগে‚ তার বসার জন্য। কিন্তু সম্পূর্ণ ক্লাস ছাএ ছাএী দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল ‚ বসার জন্য কোন সিট খালি ছিল না। ঠিক তখুনি তার চোখ যায় দ্বিতীয় সারিতে ফাঁকা সিট রয়েছে‚ তিহান এগিয়ে যায় সেখানে! কিন্তু ওই সিটের পাশে নূহাকে দেখে অবাক হয়ে যায়। তিহান বলে
“নূহা‚ তুমি এখানে বসেছ?”

দ্বিতীয় সারিতে তিহানকে এগিয়ে আসতে দেখে নূহা অবাক হয়নি। বরং মনে মনে খুশি হয়। মূলত নূহা জানত ক্লাসে কোন ফাঁকা সিট নাই‚ সব ছাএ ছাএীরা আগে থেকেই ফিলাপ করে রেখেছে। তাই সে ইচ্ছা করে তার পাশের সিটে নিজের এক বই রেখে দিয়েছিল‚ যেন ওই সিটে কেউ না বসে। ক্লাস রুমের দরজায় তিহানকে দেখে সে তার বই উঠিয়ে নেয়‚ যেন তিহান সন্দেহ না করে! স্বাভাবিক কণ্ঠে তিহানের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নূহা বলে উঠে
“কেন তিহান? আপনি কি কোন ফাঁকা সিট খুঁজে পান নাই? এখানে বসতে চান?”
নূহার কথা শুনে আশেপাশে তাকায় তিহান। সত্যি ক্লাসে কোথাও ফাঁকা সিট নাই‚ তাই সে বাধ্য হয়ে হ্যাঁ বোধক সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে

“হুম‚ এখানে বসতে চাই।”
‎ সিটে বসার আগে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকায় তিহান। বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে আছে মেঘ‚ ক্লাসের পড়াশোনা রিভাইর্স করছে হয়ত। নূহা একটু সরে গিয়ে জায়গায় দেয় তিহানের বসার জন্য।
প্রায় দশ মিনিট পর ক্লাসে উপস্থিত হয় আদ্রিয়ান। ফার্স্ট ইয়ারের প্রথম ক্লাস তার। ক্লাস রুমে আদ্রিয়ান প্রবেশ করার পর সব ছাএ ছাএীরা উঠে দাঁড়ায় হাসি মুখে বলে একএে বলে উঠে
“গুড মনিং স্যার।”
আদ্রিয়ান মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে সব ছাএ ছাএীর উদ্দেশ্য বলে উঠে
“গুড মনিং স্টুডেন্ট।”

‎ যথারীতি নিদিষ্ট সময়ে ক্লাস শুরু হয়ে যায়। বোর্ডে পড়াশোনা বোঝান শুরু করে আদ্রিয়ান। মেঘও তার ক্লাসের উপর যথেষ্ট মনোযোগ হয়। দ্বিতীয় সারিতে বসে নূহা আর তিহানও ক্লাস করতে থাকে।
আজ মেডিক্যাল কলেজে জিয়া এসেছে। ইরফান সাহেব এই কলেজের শেয়ারহোল্ডার তার একমাত্র মেয়ে জিয়া। বাবার অনুপস্থিততে কলেজ পরিদর্শন করবে সে! তাই কলেজের টির্চার হয়ে জয়েন করেছে। যদিও তার মূল উদ্দেশ্য আদ্রিয়ানের সাথে দেখা করে তার সাথে একান্ত সময় কাটাবে। সকালে প্রিন্সিপালের অফিসে গিয়ে জিয়ার সাথে দেখা হয় আদ্রিয়ানের! প্রথমে জিয়াকে দেখে অবাক হলেও পরে প্রিন্সিপালের কাছ থেকে জিয়ার জয়েন করার কথা শুনে!

প্রচণ্ড বিরক্ত হয় আদ্রিয়ান জিয়ার কথা শুনে! কাল খুব কষ্ট করে বাসায় কয়েক মুহুর্তের জন্য সয্য করেছে সে জিয়াকে! কিন্ত এখন সারাদিন কলেজে এই জিয়ার ন্যাকামি কি করে সয্য করবে? আর জিয়া যদি সবসময় আদ্রিয়ানের পিছু পিছু ঘুরাঘুরি করে তখন ‚ মেঘের মনের অবস্থা কেমন হবে?
প্রিন্সিপাল রুমে জিয়ার সাথে আর কথা বাড়ায় না আদ্রিয়ান। শুধু সৌজন্যে বোধক“ অভিনন্দন” জানিয়ে তার ক্লাস রুমে চলে আসে।
ঘড়িতে সময় ১১:৩০ আদ্রিয়ানের ক্লাস প্রায় শেষ। কাল ক্লাসের জন্য ছাএ ছাএীদের পড়াশোনা দেখিয়ে ছুটি দিতে যাবে। তখন হঠাৎ দরজায় নক করার শব্দ শুনা যায়‚ আর্দ্র টেবিল থেকে মাথা উঁচু করে দরজার দিকে তাকায়। অপর পাশ থেকে দরজার লক খুলে ভিতরে প্রবেশ করার অনুমতি চেয়ে জিয়া বলে

“ডক্টর : আন মে আই কাম ইন?”
ক্লাসের সকল ছাএ ছাএী জিয়ার দিকে তাকায়। শেষের সারিতে বসে থাকা মেঘ হঠাৎ জিয়াকে কলেজে দেখে অবাক হয়ে যায়! জিয়া এখানে কি করছে? মেঘ সন্দিহান দৃষ্টিতে টেবিলে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্রিয়ানের দিকে তাকায়! অতিরিক্ত বিরক্তি আর মৃদু রাগে ভ্রু কুঁচকায় আদ্রিয়ান। ক্লাসে ডিস্টার্ব করায় ইচ্ছা করছে এখুনি ধমক দিতে জিয়াকে। কিন্তু তা সে পারবে না। জিয়া এখন এই কলেজের টির্চার! আদ্রিয়ান অনুমতি দিয়ে বিরক্তি মাখা মুখশ্রী নিয়ে প্রশ্ন করে উঠে

“ডক্টর : জিয়া ‚ আপনি হঠাৎ আমার ক্লাস রুমে? কোন বিশেষ প্রয়োজন ছিল কি?”
___ আদ্রিয়ানের নমনীয় ব্যবহার দেখে জিয়া মৃদু হেঁসে বলে উঠে
“প্রিন্সিপাল স্যার‚ জরুরি নোর্টিশ দিয়েছে যার বিষয়ে কথা বলার প্রয়োজন ছিল। অনুমতি দিলে ভিতরে আসতে পারি?”
প্রিন্সিপালের নোর্টিশের কথা শুনে আদ্রিয়ান আর বাড়তি কোন কথা বলে না! যথেষ্ট ভদ্র ভাবে বলে উঠে
“জি অবশ্যই ভিতরে আসুন।”
হাতে থাকা কাগজ নিয়ে জিয়া দ্রুত ভিতরে চলে আসে।
ফাস্ট ইয়ারে পড়া ছাত্র ছাএীর জন্য মেডিক্যাল কলেজ থেকে ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। তারা পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে জনগণের স্বাস্থ্য সেবা দিবে! দুর্গম এলাকার জনগণকে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে পরিচিত করে তুলবে! কলেজ কতৃপক্ষ কতৃক এমন নোটিশ এসেছে। যার মূল দায়িত্ব পড়েছে আদ্রিয়ান আর জিয়ার উপর। জিয়া আর আদ্রিয়ান দুইজনে মিলে সব ছাত্র ছাএীকে এই ক্যাম্প সফল করতে গাইড করবে।

ক্লাসের সব ছাত্র ছাএী অনেক খুশি হয়। কিন্তু মেঘ শুধু চুপচাপ সামনে থাকা দুইজন মানুষের দিকে তাকিয়ে ছিল। যারা এখন হাসিমুখে নোটিশ নিয়ে আলোচনা করছে! আদ্রিয়ান আর জিয়াকে একসাথে দেখে মেঘের হিংসা হচ্ছে না বরং কষ্ট হচ্ছে! এক অজানা ভয় তার অন্তর জুড়ে আধিপত্য লাভ করছে। উভয়ের হাস্যজ্জ্বল দেখার ধৈর্য আর মেঘের হল না, চোখ সরিয়ে নিল সে। হাতে থাকা কলম শক্ত করে ধরে মাথা নিচুঁ করে মাটির দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইল।

নোটিশ নিয়ে জিয়ার সাথে কথা বলার মাঝে আদ্রিয়ানের দৃষ্টি যায় মেঘের দিকে। মাথা নিচুঁ করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে আছে মেঘ! বুকের ভিতর ধক করে উঠল আদ্রিয়ানের। জিয়া তার কাছে আসলে মেঘ কষ্ট পায় তা আদ্রিয়ান জানে। কিন্তু সে এখন কি করবে? নোটিশ পড়া শেষ হলে, জিয়া আদ্রিয়ানকে প্রশ্ন করে উঠে
__ আদ্রিয়ান, তোমার কি ক্লাস শেষ?”
___ হ্যাঁ শেষ। কিন্তু কেন জিয়া?”
___ ক্যাম্পের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন। তুমি কি এখন কেবিনে যাবে? চল, আমিও যায়।”
জিয়ার কথাবার্তায় অতিরিক্ত বিরক্ত হয়ে আদ্রিয়ান বলে উঠে
____ জিয়া, আমি এখন একটু বিশ্রাম নিতে চাই। পরে আলোচনা করি।”
‎ আদ্রিয়ানের নিষেধ কানে তুলল না জিয়া। জিয়া বলে
___আদ্রিয়ান, আর দুইদিন পর ক্যাম্পে যেতে হবে। এখুনি আলোচনা করা উচিত। চলো যায় তোমার কেবিনে।”
জিয়ার ন্যাকামি দেখে আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে মুখের উপর কোন তিক্ত কথা বলতে চাইল। কিন্তু ক্লাসে উপস্থিত স্টুডেন্টের জন্য আর কোন কথা বলল না। আদ্রিয়ান বলে উঠে
____ হুম চল।”

মাথা নিচুঁ করে বসে থাকলেও তাদের দুইজনের সব কথা শুনছিল মেঘ। চোখ ভর্তি জল নিয়ে উপরের দিকে মাথা তুলে তাকায় মেঘ, একদম আদ্রিয়ানের চোখ বরাবর। দুইজনের চোখ মিলিত হয়! ওই অশ্রুসিক্ত চোখে কোন প্রকার অভিযোগ, কষ্ট, ঘৃণা, ছিল না। শুধু একরাশ অভিমান আর এক বুক কষ্ট। ফ্লোরের মধ্যে যেন আদ্রিয়ানের পা স্থির হয়ে যায়, তার প্রেয়সির এমন চাহনি দেখে! হঠাৎ হাঁটা বন্ধ করে আদ্রিয়ানকে থেমে যেতে দেখে জিয়া প্রশ্ন করে উঠে
—— আদ্রিয়ান, কি হয়েছে তোমার? থেমে গেলে কেন? চলো কেবিনে যায়?”
জিয়ার কথা যেন আদ্রিয়ানের কান অবধি পৌঁছায় না। তার দুই চোখ এখনও মেঘের উপর স্থির হয়ে গেছে। মেঘকে কষ্ট পেতে দেখতে পারবে না আদ্রিয়ান! আদ্রিয়ান বলে উঠে

___ মেঘ, টেবিলে থাকা এটেনডেন্সর খাতা নিয়ে আমার কেবিনে আসো। দ্রুত আসবে।”
____ আদ্রিয়ানের আদেশ শুনল মেঘ কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ক্লাস থেকে বের হয়ে যায় ওরা দুইজন।
আশেপাশে সকল ছাএ ছাএী জিয়া আর আদ্রিয়ানকে একসাথে দেখে বলছে ” তাদের দুইজনকে একসাথে দারুণ মানাবে! জিয়া ম্যাম কতো সুন্দরী আর আদ্রিয়ান স্যারও যথেষ্ট সুর্দশন। কাপল হলে মন্দ হবে না কিন্তু। মেঘ সব কথা শুনল। বিষন্ন মন নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে।
প্রায় তিরিশ মিনিট পর, টেবিলে থাকা এ্যাটেডেন্স খাতা নিয়ে আদ্রিয়ানের রুমের দিকে এগিয়ে যায় মেঘ। আদ্রিয়ানের রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুড ঠিক করে, এরপর যখন দরজায় কড়া নাড়তে যাবে! তার আগেই ভিতর থেকে দুইজনের হাসির শব্দ শুনে। মেঘ নক না করে মাথা উঁচু করে একবার কাঁচের দরজা দিয়ে ভিতরে তাকায়। কেবিনের ভিতরে চেয়ারে বসে ল্যাপটপের দিকে মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ান। আর তার কাঁধে হাত রেখে ঝুঁকে ল্যাপটপ দেখছে জিয়া!

কাঁধে থাকা জিয়ার হাতের উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেঘ। আদ্রিয়ান একবার জিয়ার হাত সরায় নাই! উল্টো একে অপরের কাছাকাছি এসে তারা দুইজন খিলখিল করে হেঁসে উঠছে! এই দৃশ্যটা দেখে কেন জানি মেঘের ভীষণ কষ্ট লাগল। চোখে বিন্দু বিন্দু জল জমতে শুরু করল! হাতে থাকা কাগজ শক্ত করে ধরে চোখের বিসর্জন দেয় মেঘ।
মেঘ কিছুক্ষণ এমনি করে দাঁড়িয়ে থাকল। তার পা দুটি যেন চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে! অবশ হয়ে গেছে। জিয়া সবসময় আদ্রিয়ানের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে তা মেঘ জানে। কিন্তু আদ্রিয়ান? সে কোন জিয়ার থেকে দুরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে না! তবে কি আদ্রিয়ানের আর মেঘকে ভালো লাগছে না? হয়ত তাই!
মেঘের আর ভিতরে প্রবেশ করার ইচ্ছা করল না। ওদের দুইজনের মধ্যে একান্ত মুহুর্তের মধ্যে বাধা দেওয়ার সে কে? কাবাবে হাড্ডি হয়ে থাকতে চাই না মেঘ! আদ্রিয়ান যখন চাই জিয়ার সাথে থাকতে। তার সাথে কথা বলতে, হাসতে! তবে মেঘ কোন বিরক্ত করবে না। চুপচাপ তার জীবন থেকে সরে দাঁড়াবে। গত নয় বছর ধরে একা একা থাকতে পেরেছে এখনও পারবে! দরজার কিনার থেকে সরে দাঁড়ায় মেঘ।
দরজার পাশ দিয়ে একজন সিনিয়র মেয়ে যাচ্ছিল, মেঘ তাকে থামিয়ে সাহায্য চেয়ে বলে উঠে

—–” আপু তুমি কি আমার একটা সাহায্য করতে পারবে?”
সিনিয়র মেয়ে অবাক হয়ে বলে উঠে
____” হুম কি সাহায্য বলো?
মেঘ তার হাতে থাকা এটেনডেন্সর খাতা এগিয়ে দিয়ে বলে
___”তুমি কি এই খাতা আদ্রিয়ান স্যারের কেবিনে পৌঁছে দিতে পারবে। আমার শরীরটা একটু অসুস্থ লাগছে তাই ভিতরে যাব না।”
সিনিয়র মেয়েটা মেঘের হাত থেকে খাতা নিয়ে হাসি মুখে বলে উঠে
___”ওকে আমি খাতা দিয়ে দিব। তুমি যাও।
মেঘ সৌজন্যে তার সহিত বলে উঠে
____ “ধন্যবাদ আপু।”

কেবিনের দিকে একবার তাকায়। এরপর পুনরায় বড় বড় পা ফেলে দ্রুত চলে যায় সেখান থেকে। সিনিয়র মেয়েটা খাতা নিয়ে এগিয়ে যায় আদ্রিয়ানের কেবিনে। এরপর দরজা কড়া নেড়ে বলে
___ আদ্রিয়ান স্যার ভিতরে আসব।”
হঠাৎ অপরিচিত কণ্ঠ শুনে আদ্রিয়ান জিয়ার হুঁশ ফিরে। আদ্রিয়ান ল্যাপটপের থেকে মুখ তুলে তাকায়। নিশ্চয়ই মেঘ এসেছে! কিন্তু জিয়া বিরক্ত হয় একটু আদ্রিয়ানের কাছে যেতেই কোথা থেকে উটকো ঝামেলা চলে আসে! আদ্রিয়ান বলে

____ হুম ভিতরে আসো।”
সিনিয়র মেয়েটা দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে। তবে তাকে দেখে আদ্রিয়ান অবাক হয়ে যায়! মেঘ আসেনি? সে তো মেঘকে খাতা নিয়ে আসতে বলেছিল। সিনিয়র মেয়েটা বলে
____ স্যার, আপনার খাতা।”
___” মেঘ আসেনি? আমি মেঘকে খাতাটা নিয়ে আসতে বলেছিলাম?”
___ ” স্যার, আমায় এক মেয়ে খাতা ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। ওর না কি শরীর অসুস্থ লাগছে তাই।”
___” ওহ্ আচ্ছা। তুমি খাতা রেখে চল যা-ও।
___” ওকে স্যার।”

কলেজ গাউনের মাঝ বরাবর ভাবলেশহীন ভাবে হেঁটে যাচ্ছে মেঘ। তার শরীরে যেন হাঁটার বিন্দু পরিমাণ শক্তি অবশিষ্ট নাই! খুব কষ্ট করে পা চালিয়ে হাঁটছে। কোথায় যাচ্ছে তার কোন খেয়াল নাই। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানির বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে‚ হৃদয়ে জমে থাকা মৃদু যন্ত্রণা দায়ক ব্যাথা ক্রমশ বাড়ছে। অল্প দিনের সুখে হয়ত মেঘ তার জীবন থেকে খুব বেশি আশা করে ফেলেছিল। “সুখ” শব্দটা বহন করার মতে“দুঃখ” তার জীবনে আছে! বড্ড বেশি অভাগী সে‚ স্বামী‚ শশুড় বাড়ি থাকার পরও সংসার হল না। জন্মগ্রহণ করার পর মা_ বাবার ভালোবাসা পায়নি। আর এখন‚ ভালোবাসায় মানুষ থেকেও অবহেলা আর অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই তার ভাগ্য স্থায়ী হল না।অতঃপর‚ জীবনের শেষে পর্য়াযে প্রাপ্তির খাতায় পেল শূন্য।
আঁখি পল্লব বেয়ে অঝরে অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ছে মেঘের। ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বড় বড় পা ফেলে গাউন থেকে বের হয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য দ্রুত পা বাড়ায়। আজ আর ক্লাস করবে না সে! বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নিতে চায়।

কলেজ গাউনে বেশ কয়েকজন ছাএ ক্রিকেট খেলছিল! মেঘ মাঝ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল বিধায়‚ হঠাৎ অপর পাশ থেকে এক বল তড়িৎ বেগে ছুটে আসে তার দিকে! প্রথমে মেঘ বল দেখেনি‚ কিন্তু যখন উপরে মেলে তাকিয়ে দেখে উড়ন্ত বল তার দিকে ছুটে আসছে। তখন ভয়ে চোখ _ মুখ খিঁচে বন্ধ করে হাত দিয়ে কান চেপে ধরে হাঁটু গেঁড়ে মাটিতে বসে পড়ে! এখুনি হয়ত তার গায়ে বল এসে লাগবে। কিন্তু মেঘের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ হয়। বেশ কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন বল শরীর না লাগে! তখন মেঘ পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায়।

আকাশে উদয়ীত সূর্যের কিরণের মাঝে শক্ত হাতে খপ করে বল ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক সুর্দশন যুবক। নিচে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা মেঘের তার সম্মুখে থাকা পুরুষের মুখশ্রী পর্যবেক্ষণ করে পরিচিত হতে খুব বেশি সময় লাগে না। মেঘ অবাক করা কণ্ঠে বলে উঠে
___”আদ্রিয়ান স্যার”.
সম্মুখে দাঁড়িয়ে বল ধরে রাখা ব্যক্তি আদ্রিয়ান! এইটা দেখে মেঘ খুশি হয়েও হয় না। কেবিনে থাকা আদ্রিয়ান আর জিয়ার ঘনিষ্ঠ দৃশ্য দেখে তার মন বিষিয়ে উঠে! চোখ _ মুখ শক্ত করে দ্রুত উঠে দাঁড়ানর চেষ্টা করে মেঘ৷ কিন্তু তখন হঠাৎ বসে পড়ায় পায়ের রগে টান পড়ে তার ‚ তাই উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ব্যাথা পায়! ব্যাথায় আত্মানাথ করে বলে উঠে

___”আহ্।
মেঘের মুখে ব্যাথাত্তুর শব্দ শুনে হুঁশ ফিরে আদ্রিয়ানের। মাটিতে বল ছেড়ে দিয়ে দ্রুত হাত বাড়িয়ে দেয় মেঘের কাছে এরপর বলে
___” কি হয়েছে মেঘ? ব্যাথা পেয়েছ? উঠে দাঁড়াও।
আদ্রিয়ানের বাড়ন্ত হাতের দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকায় মেঘ। পায়ে ব্যাথা থাকা সত্তে ও আদ্রিয়ানের সাহায্য না নিয়ে‚ মাটিতে ভর করে নিজেই উপরে উঠে দাঁড়ায়! মেঘের এমন কর্মকাণ্ড দেখে আদ্রিয়ান অবাক হয়। হয়ত জিয়া আর তাকে একসাথে দেখে রাগ করেছে! মেঘ তার কাঁধে ঝুলন্ত ব্যাগ মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে শান্ত কণ্ঠে বলে
___” ধন্যবাদ স্যার। বলটা ধরার জন্য।”
কথার জবাবে আদ্রিয়ানের কোন প্রশ্নই করতে দিল না মেঘ। পা চালিয়ে কলেজ গেইটের দিকে হাঁটা ধরে! কিন্তু হঠাৎ এমন সময় কোথায় যাচ্ছে মেঘ? ক্লাস মাএ শেষ হয়েছে একটা! এখন টিফিনও দেয়নি। তবে? পিছন থেকে আদ্রিয়ান প্রশ্ন করে উঠে

___” মেঘ, তুমি কোথায় যাচ্ছো? ক্লাস শুরু হবে এখন। তুমি ক্লাস করবে না?”
পিছনে না তাকিয়ে হাঁটা থামিয়ে মেঘ উত্তর দেয়
___” স্যার, আমি একটু অসুস্থ বোধ করছি। তাই ক্লাস করব না। বাসায় ফিরে যাব।”
অসুস্থ? হঠাৎ কি হয়েছে মেঘের? জ্বর এসেছে কি? কিন্তু সকালে শরীরে কোন জ্বর ছিল না! তবে এখন কি করে? মেঘ দ্রুত আদ্রিয়ানের কাছ থেকে দূরে যাওয়ার জন্য বড় বড় পা ফেলে হাঁটা শুরু করে! কিন্তু তার পায়ের রাগে টান পড়ায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে তাকে। পায়ে টিপটিপ ব্যাথা করছে! কিন্তু এই ব্যাথা তার হৃদয়ে থাকা ব্যাথায় চেয়ে কম। আদ্রিয়ান মেঘের হাঁটার ধরণ দেখে বুঝতে পারে, মেঘের পায়ে ব্যাথা করছে।
দ্রুত হেঁটে গিয়ে পিছন থেকে টান দিয়ে মেঘের বাম হাতের কবজি ধরে নিজের কাছে ফিরায় আদ্রিয়ান! এরপর তার কোমড়ে হাত দিয়ে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু করে কোলে তুলে নেয়! হঠাৎ আকস্মিক এমন ঘটনায় মেঘ অবাক হয়ে যায়! সে হতভম্ব হয়ে আদ্রিয়ানের মুখের দিকে ফ্যালফ্যল করে তাকিয়ে থাকে। মেঘকে যত্ন সহকারে কোলে তুলে নিয়ে তার কেবিনের দিকে হাঁটা ধরে আদ্রিয়ান।

___ দ্বিতীয় ঘণ্টার ক্লাস শুরু হলেও বেশ অনেকজন শিক্ষার্থী বাহিরে ছিল। হঠাৎ কলেজ গাউনের মাঝে আদ্রিয়ান মেঘকে কোলে তুলে নেওয়ায়! সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কিন্তু আদ্রিয়ান কারো দেখার পরোয়া করে না! তবে মেঘের কাছে বিষয়টা দৃষ্টিকটুর লাগে! মেঘ আদ্রিয়ানের কাঁধে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে তার হুঁশ ফিরাতে বলে
____” আদ্রিয়ান, কি করছেন? কোলে তুললেন কেন আমায়? সব ছাএ ছাএী দেখছে আমাদের! নামান কোল থেকে।”
ভ্রু কুঁচকে তাকায় আদ্রিয়ান মেঘের পানে! এরপর বলে

___” কেন ফারহান তোমার কলেজ গাউনে সবার সামনে প্রপোজ করতে পারলে? আমি তোমায় কোলে নিতে পারব না? বউ হও তুমি আমার মেঘ।”
আদ্রিয়ানের এমন জবাব শুনে বিরক্ত হয়ে মেঘ বলে উঠে
___” আদ্রিয়ান, ফারহান আর আপনি কি এক? আমরা এখন কলেজে আছি? আপনি টির্চার হন আমার! প্লিজ বুঝেন আমার কথাটা। সবাই দেখছে।”
জেদ দেখিয়ে আদ্রিয়ান বলে উঠে
___”সো হোয়াট। বউকে কোলে নেওয়া অন্যায় নয়।”
___” আদ্রিয়ান, ছাড়ুন আদ্রিয়ান।”

কিন্তু কোন কথায় শুনল না আদ্রিয়ান ! মেঘকে কোলে নিয়ে নিজ কেবিনে চলে যায়। সব ছাএ ছাএী ফিসফিস করে আলোচনা করতে থাকতে। কলেজের নিউ ক্রাশ স্যার ফাস্ট ইয়ারের ছাএীকে কোলে নিয়ে নিজ কেবিনে চলে গেছে! এই কথা যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায়। যা জিয়ার কানে পৌঁছাতে বেশি ক্ষণ সময় লাগে না।
বাহিরে সাইনবোর্ড বড় বড় অক্ষরে লেখা ” ডক্টর : আদ্রিয়ান রেদোয়ান”। কেবিনের ভিতরে ছোফায় রাগে অগ্নি মূর্তি হয়ে বসে আছে মেঘ। হয়ত এখুনি সে আদ্রিয়ানকে খুন করে ফেলবে! রাগে দাঁত কটমট করে তাকিয়ে আছে মেঘ। কিন্তু আদ্রিয়ানের কোন হেলদোল নেই, সে ছোফার কিনারে বসে মেঘের পা নিজ উরুর মধ্যে নিয়ে হালকা করে মলম দিয়ে মালিশ করে দিচ্ছে! খুব যত্ন সহকারে ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছে যেন সামান্য ব্যথা অবধি মেঘের পায়ে না লাগে।
আদ্রিয়ানের থেকে নিজ পা ছাড়াতে চাইলে আরো শক্ত করে হাতের বাঁধনে চেপে ধরে ঔষধ লাগিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ আগে জিয়ার সাথে হেঁসে হেঁসে কথা বলে, নিজ কাঁধে ওর হাত রাখতে দিয়ে এখন আসছে! মেঘের ব্যাথার মলম লাগিয়ে দিতে! মেঘ ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলে উঠে

___ আদ্রিয়ান, ছাড়ুন আমার পায়। আমি বাসায় যাব।”
এইবার রাগী কণ্ঠে ধমক দিয়ে উঠে আদ্রিয়ান বলে উঠে
___” চুপচাপ বসে থাক মেঘ। একটা বাজে কথা বললে, কিন্তু মার খাবে।”
মুখে ভেংচি কেটে মেঘ উত্তর দেয়
___ ” নিজের বউকে মারতে পারবেন। কিন্তু জিয়াকে তাকে মাথায় করে রাখবে! ডক্টর: জিয়া বলে সম্মানের সাথে সম্মোধন করবেন। ”
আদ্রিয়ান মেঘের দিকে সয়তানি হাসি দিয়ে প্রশ্ন করে উঠে
___” মেঘ, তুমি কি জেলাস ফিল করছ? জিয়ার সাথে আমাকে দেখে?”
___” এখন আমি যদি ফারহানের সাথে থাকি। তবে আপনি কি ফিল করবেন আদ্রিয়ান স্যার।”
ফারহানের নাম শুনে আদ্রিয়ানের মুখ ফেকাসে হয়ে যায়। রাগে শরীর জ্বলে উঠে বলে
___” মেঘ, তোমায় কতবার বলেছি ফারহানের নাম নিবে না তুমি? ওর নাম শুনলে আমার রাগ উঠে যায়?”
মেঘ হেঁসে উত্তর দেয়
___” ফারহানের নাম শুনলে আপনার রাগ উঠে যায়। আর জিয়ার সাথে যখন থাকেন! তখন আমার কেমন লাগে?”

___ “মেঘ, এমন অবুঝের মতো কথা কেন বলছ তুমি? জিয়া এখন আমার কলিগ হয়! তাছাড়া ক্যাম্প করার সমস্ত দায়িত্ব এখন আমাদের দুইজনের উপর পড়েছে। এখন কি করব আমি?”
___” ওহ্ রিয়েলি? কোন কলিগ তার সিনিয়র কাঁধে হাত রেখে কাজ করে! তার শরীরের সাথে মিশে কথা বলে?”
কাঁধে হাত রাখার কথা শুনে আদ্রিয়ান অবাক হয়। জিয়া কখন তার কাঁধে হাত রাখল! তখন ল্যাপটপ দেখার সময়? এই দৃশ্য দেখে কি মেঘ এমন রাগ করেছে? ওহ্ গড, তখন ল্যাপটপে ক্যাম্পের কাজ করছিল তারা দুইজন। জায়গা ঠিক করা, ওষুধ স, সবকিছু একটা প্রজেক্ট রেডি করছিল! কাজে এতো মনোযোগী ছিল যে, জিয়ার কাঁধে হাত রাখার বিষয়টা আদ্রিয়ান নোটিশ করেনি!
_পায়ে মলম লাগান শেষ আদ্রিয়ান এগিয়ে যায় মেঘের কাছে। সুন্দর করে ওর গাল দুটি টেনে ধরে টপটপ দুই তিনটা চুমু খায়! মেঘ প্রথমে নিজের গাল সরিয়ে নেয়। তবুও আদ্রিয়ান জাের করে। আদ্রিয়ান মেঘের আঙুল নিজের হাতের মুষ্টিদ্বয়ের মধ্য রেখে বলে উঠে

____” মেঘ তুমি কি চাও? আমি ঠিক কি করি? তুমি কি করলে খশি হবে বলে আমায়?”
মেঘ এইবার আদ্রিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত কণ্ঠ উত্তর দেয়
___” জিয়ার থেকে দূরে থাকবেন। এক দুই হাত নয়, বরং কিলোমিটার দূরে। ”
___” কিন্তু মেঘ —
মেঘ হাত বাড়িয়ে আদ্রিয়ানকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠে
___” আমি কোন কিন্তু শুনতে চাই না৷ জিয়া যদি আর একবার আপনার কাছে আসে, তবে আমি আপনাকে লবণ দিয়ে চিবিয়ে শশার মতো গছগছ করে খেয়ে ফেলব।”
আদ্রিয়ান মেঘের রাগী রূপ দেখে ভয় পাওয়ার মতো মুখ করে বলে উঠে

___” ওহ্ সরি বউ। ভয় পেয়ে গেলাম।’
__” হুম ভয় পাওয়া উচিত আপনার।”
আদ্রিয়ান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলে উঠে
___” তুমি যদি চাও। তবে আমি অবশ্যই জিয়ার থেকে দূরে থাকব। প্রমিজ। ”
আদ্রিয়ান মেঘের বাহুদ্ব ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। এরপর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে! কিন্তু তাদের এই সুন্দর খুনসুটি মুহুর্ত খুব দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয় না! খুব স্বাভাবিক ভাবে জিয়ার কানে এই কোলে নেওয়ার কথাটা গিয়ে পৌঁছায়! জিয়া দ্রুত পায়ে হেঁটে এগিয়ে আসে আদ্রিয়ানের কেবিনে। কেবিনের দরজায় নক করে শব্দ করে ডেকে উঠে
___” আদ্রিয়ান, আদ্রিয়ান।”
হঠাৎ জিয়ার কণ্ঠ শুনে মেঘ আঁতকে উঠে। আদ্রিয়ানকে ডাক দিয়ে মেঘ বলে
___ জিয়া ম্যাম এসেছে। আদ্রিয়ান ছাড়ুন। ওনি একসাথে দেখে নিবেন।”
জিয়ার হঠাৎ আগমনে আদ্রিয়ান যথেষ্ট বিরক্ত হয়! কিন্তু সে মেঘকে ছাড়ে না বরং শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বাহিরে থাকা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে

___” জিয়া, তুমি এখন চলে যাও। আমি ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলব।”
এমন সাংঘাতিক ঘটনা শুনার পরও জিয়া আদ্রিয়ানের সাথে দেখা না করে চলে যাবে।এইটা হয়ত অসম্ভব! তাছাড়া, ছাএ ছাএীর মুখে শুনেছে মেঘ এই কেবিনে রয়েছে! তবে ওরা দুইজন একসাথে কি করছে? কি ব্যস্ততা এতো মেঘের সাথে? আর ভিতর থেকে দরজা নক করা কেন? জিয়া বলে
___” আদ্রিয়ান এখুনি কথা বলতে চাই আমি তোমার সাথে? দরজা খুলো আদ্রিয়ান?”
জিয়ার ডাকে অতিরিক্ত বিরক্ত হয় আদ্রিয়ান! ইচ্ছা করছে এখুনি ওর গালে দশটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতে। সবসময় ওর রোমান্সের মধ্যে ডিস্টার্ব করে এই মেয়ে। জিয়া অনাবরত দরজা নক করতে থাকে, একপ্রকার রাগ আর বিরক্তি নিয়ে ছোফায় থেকে উঠে দাঁড়ায় আদ্রিয়ান। এরপর শব্দ করে দরজা খুলে ধমক দিয়ে বলে উঠে
____” প্রবলেম কি জিয়া তোমার? এমন পা”গলের মতো দরজায় নক কেন করছ? সিনিয়রের রুমে কি করে ঢুকে হয় তা কি তুমি ভুলে গেছ? ম্যানারলেস।”
মুখের উপর এমন ধমক শুনে জিয়া অবাক হয়ে যায়। কাল থেকে আদ্রিয়ান কতো সুন্দর তার সাথে ব্যবহার করছিল! আজ হঠাৎ কি হলো? জিয়া বলে

___” আদ্রিয়ান, সরি তোমায় বিরক্ত করার জন্য। কিন্তু তুমি এতোখন কি করছিলে? কি এতো ব্যস্ততা তোমার?”
জিয়ার কথায় আদ্রিয়ান বলে
___” আমার সব ব্যস্ততার উত্তর কি তোমায় দিতে হবে জিয়া? এখন যাও বের হও। আমি রেস্ট নিব ।”
জিয়া উঁকি দিয়ে ভিতরে তাকায়, কিন্তু মেঘকে দেখে উঠার আগেই আদ্রিয়ান তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে যায় আর বলে
___” কি প্রবলেম জিয়া। যাও, বের হও রুম থেকে।”
জিয়া নিজের আগ্রহ আর ধমিয়ে রাখতে না পেয়ে দ্রুত কণ্ঠে বলে উঠে
___” আদ্রিয়ান। মেঘ কি এই রুমে আছে? ছাএ ছাএীর কাছ থেকে শুনলাম তুমি মেঘকে কোলে করে কেবিনে নিয়ে এসেছ?
আদ্রিয়ান নিলিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিল

___” হুম.
__” মানে তুমি সত্যি মেঘকে কোলে নিয়েছ? কিন্তু কেন?”
___” কলেজ গাউনে হঠাৎ মেঘের শরীর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাই কোলে নিয়েছি? কোন প্রবলেম জিয়া?”
___” তুমি তাই বলে কোলে নিবে? আমি অসুস্থ হলে কি তুমি আমায় কোলে নিতে?
___” না”
___” কেন?
___ কারণ তুমি মেঘ না__.
আদ্রিয়ানের এমন উত্তর শুনে জিয়ার রাগ হয় সে বলে
___” মেঘের শরীরের কি অবস্থা আমি দেখতে চাই।কোথায় মেঘ?”
জিয়া জোর করে কেবিনের ভিতরে ঢুকে যায়! ভিতরে গিয়ে যা দেখে তাতে সে অবাক হয়ে যায়! মাথার নিচে বালিশ দিয়ে ছোফায় আরাম করে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে মেঘ! আদ্রিয়ান পিছু পিছু এসে বলে
___” জিয়া মেঘকে দেখে নিয়েছ? এখন যাও?__.
জিয়া মেঘের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠে
___” আমি মেঘকে নিজের সাথে কেবিনে নিয়ে যাচ্ছি। ও সেখানে বিশ্রাম নিবে।”
জিয়ার যাওয়ার আগেই আদ্রিয়ান ওর হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বলে
___” মেঘ ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন ওকে ডাক দেওয়া উচিত হবে না। তুমি কেবিনে যাও। মেঘ এখানে থাকবে।”
জিয়া এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলে উঠে

___” কিন্তু আদ্রিয়ান?”
জিয়ার কথা শেষ করার আগেই আদ্রিয়ান ওর হাত ধরে নিজে কেবিনের বাহিরে নিয়ে যায়। এরপর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলে উঠে
___” দয়া করে আর বিরক্ত কর না জিয়া। যাও নিজ কেবিনে যাও।”
কথাটা বলে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয় আদ্রিয়ান। বাহিরে আহাম্মকরত মতো দাঁড়িয়ে থাকে জিয়া! আদ্রিয়ান হঠাৎ এমন আগের মতো ব্যবহার করছে কেন তার সাথে? জিয়া বুঝতে পারে না! আদ্রিয়ান দরজার ভিতরের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেয়! জিয়া কিছু মুহুর্ত দাঁড়িয়ে থেকে রাগ গজগজ করে নিজ কেবিনে চলে যায়।
আদ্রিয়ান দরজা লাগিয়ে দিয়ে আবার ছোফায় ফিরে আসে। মেঘ প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। আদ্রিয়ান তার কাছে দিয়ে ছোফায় পাশে শুয়ে পড়ে! শক্ত করে মেঘকে জড়িয়ে ধরে বলে

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৮

___” মেঘ তোমার ক্লাস নাই এখন?
__” না, দ্বিতীয় ঘণ্টায় হয়ত স্যার চলে গেছে। এখন প্রায় অর্ধেক ক্লাস শেষ। এরপর টিফিন।”
___”তাহলে ঘুমিয়ে থাক।”
শক্ত করে একে অপরের জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। আদ্রিয়ান আলতো করে মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৬০