তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২০
আশফিয়া হিয়া
বাড়িতে উৎসবের আমেজ। আজকের অনুষ্ঠানের মধ্যমনি পিহুকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। তার পরনে সাদা ও হলুদ কম্বিনেশনের শাড়ি। হাতে গলায় কানে ফুলের গহনা দিয়ে তার সাজকে পরিপূর্ণ করা হয়েছে। তাকে বাড়ির উঠানের তৈরী করা স্টেজে বসানো হয়েছে। হলুদের অনুষ্ঠানের নিয়ম অনু্যায়ী তার সামনের টেবিলে বাহারি রকমের খাবার দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। স্টেজের সামনে সবার বসার জন্য চেয়ার রাখা হয়েছে। ইয়াজ পেছনের দিকে একটা চেয়ারে বসা ছিল। রুহা ও তার বন্ধুবি শিলা দুজন মিলে তার থেকে কিছুটা দূরুত্বে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। ইয়াজ বিষয়টা খেয়াল করেনি সে তো ফোণ দেখতে ব্যস্ত। আহি আরুকে খুঁজছিল না পেয়ে সে ইয়াজের পাশে বসে পড়ল। দূর থেকে ফিসফিস শব্দ শুনতেই সে সেদিকে তাকাল। তাদের মুখের অঙ্গিভঙ্গি দেখে আর বুঝতে বাকি নেই ইয়াজকে নিয়েই কিছু বলছে৷ আহির হঠাৎ করেই শরীরটা জ্বলে উঠল ইচ্ছে করল দুজনকে মুখের ওপর কিছু কথা শুনিয়ে দিতে।সে ইয়াজের হাত থেকে ফোণ কেড়ে নিল। ইয়াজ তার দিকে চোখ গরম করে তাকেই সে ও চোখ বড় বড় করে চাইল। এরপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– ” আশেপাশে কি হচ্ছে চোখে দেখছো না?”
ইয়াজ সরাসরি সামনের দিকে তাকাল সেখানে বড়রা পিহুকে খাওয়াচ্ছে ও দোয়া করে দিচ্ছে। তাকে সামনের দিকে তাকাতে দেখে আহি বলল,
– ” আরেএ সামনে নয় আশে পাশে দেখতে বলেছি।”
ইয়াজ একটু খেয়াল করতেই যা বোঝার বুঝে গেল। সে তার পরনের পাঞ্জাবির কলার ঝাঁকিয়ে ভাব নিয়ে বলল,
– ” এটা অস্বাভাবিক কিছু নয় আমার মতো হ্যান্ডসাম ছেলে আশে পাশে থাকলে এমনটা তো হবেই।”
আহির শরীর রাগে রি রি করে উঠল। সে ইয়াজের হাতে ফোণ দিয়ে গটগট করে চলে গেল স্টেজের দিকে। ইয়াজ তার রাগ দেখেও পাট্টা দিল না আবার গেইম খেলায় মনোযোগ দিল।
আরু ও আহি দুজন মিলে পিহুকে একটু করে কেক খায়িয়ে দিল। এরপর পিহুর সাথে কিছু ছবি তুলে সরে এল। এবার রুহানি ও নিধি একসাথে গেল। তারা দুজনও একই কাজ করল। খাওয়ানো শেষ হতেই কান্নার শব্দ পেয়ে থেমে গেল। পিহুর মা – চাচিরা মিলে কান্না করছে। তাদের দেখে পিহুও কান্না করে দিল। মুহুর্তেই বিয়ে বাড়িটা কান্নায় ভরে উঠল। রোহান এতক্ষণ অন্যান্য কাজে ব্যস্ত ছিল। মাএই বাড়ির ভেতরে এল। এসেই বাড়ির অবস্থা দেখে তার চোখ দুটোও লাল হয়ে গেল। অনেক আদরের ছোট বোন তার। বোনটা কাল চলে যাবে ভাবলেই তার হাসফাস লাগছে। এসব দেখে আরুর কান্না পাচ্ছে।কারোর কান্না দেখলেই তার কান্না পায়। সে হাত দিয়ে নাক মুছতে গেলেই কেউ তার হাত আটকে দিল। পাশে তাকাতেই রুদ্ধকে দেখতে পেল। রুদ্ধ বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আরু নাক টেনে বলল,
– ” কি হয়েছে?”
– ” তুই এত অপরিষ্কার কেনো? তুই কি ঠিক করেছিস কোনোদিনো ও বড় হবি না?”
আরু অবাক হয়ে বলল,
– ” অপরিষ্কারের কি করলাম?”
– ” হাত দিয়ে নাক মুছতে যাচ্ছিলি কেনো টিস্যু নেই?”
আরু এবার কি বলবে বুঝল না তার কি এত খেয়াল ছিল নাকি এটা তো তার কাছে নরমাল ব্যাপার সবাই তাই করে সবাই কি আর উনার মতো খিটখিটে নাকি?
– ” সবাই আপনার মতো এত খিটখিটে নয় বুঝেছেন?
বলেই সে সামনের দিকে তাকাল। হঠাৎ তার চোখ দুটো রোহানের দিকে গেল। তার চোখ দুটো দেখলেই বুঝা যাচ্ছে কতটা কষ্ট পাচ্ছে। রুদ্ধ আরুকে রোহানের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেই আরুর দু গাল চেপে ধরে তার দিকে ফেরাল। এরপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– ” ওদিকে কি?”
আরু ইশারায় বোঝাল গাল দুটো ছেড়ে দিতে নাহলে সে বলবে কি করে।
– ” এভাবেই বল।”
– ” ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে কষ্ট পাচ্ছে খুব বোনের জন্য তাই।”
রুদ্ধ তার গাল আরো একটু চেপে ধরে বলল,
– ” তাতে তোর কি?”
আরু জোড় করে হাত দুটো সরিয়ে দিল। অবশ্য রুদ্ধ ছাড়তে চেয়েছে বলেই সে ছাড়াতে পেরেছে। গাল ছাড়তেই আরু জোড়ে শ্বাস নিল।
– ” মানুষ হিসেবে তো আমার খারাপ লাগতেই পারে তাই না?”
– ” না।”
আরু মুখ ফুলিয়ে চুপ করে রইল আর কিছু বলল না। রুদ্ধ তার ফুলো গাল গুলো ইচ্ছে মতো টিপে দিয়ে হেসে ফেলল। আরু বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের দিকে এতক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিধি। তাদের এভাবে দেখে তার আর বুঝতে বাকি রইল না কিছু।
চাঁদের আলোয় ছাদের চারপাশ আলোকিত হয়ে রয়েছে। আকাশের তারারা মিটিমিটি করে জ্বলছে। চারিদিকে ঠান্ডা বাতাস সকলের মন প্রাণ শীতল করে তুলছে। হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত ৯ টা বেজে গেল। বাড়ির সব ছেলে – মেয়েরা এখন ছাদে গোল হয়ে বসে আছে সকলে মিলে ট্রুথ ও ডেয়ার খেলবে। সকলেই ভীষন এক্সাইটেড খেলার জন্য এমন আবহাওয়ায় ছাদে বসে খেলতে কার না ভালো লাগে। তবে রুদ্ধ চুপচাপ দোলনায় বসে ফোণ স্কোল করছে তার এইসব খেলার ইচ্ছে নেই। আহি রুদ্ধর দিকে তাকিয়ে আবদারের স্বরে বলল,
– ” ভাইয়া এসো না আমরা খেলি। খুব মজা হবে।”
রুদ্ধ তার আবদার ফেলতে পারল না গিয়ে তার পাশে বসল। আহি সেটা দেখে খুশি হয়ে গেল। রুদ্ধ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বাড়ির ছোট হওয়ায় সবার খুব আদরের সে। আরু তাদের দিকে এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তাদের দেখে ভেতরে একটা ভালো লাগা কাজ করল। আবার একটু ভেংঙিও কাটল আমি ডাকলে জীবনেও আসতো না। সবাই এবার খেলায় মনোযোগী হলো। প্রথমেই বোতল ঘুরাল রুহা বোতল দিয়ে পড়ল ইয়াজের দিকে। ইয়াজ বলল সে ট্রুথ নেবে। রুহা খুব উওেজিত হয়ে বলল,
– ” আমি প্রশ্ন করবো। আমি প্রশ্ন করবেো।”
তার এত হুড়োহুড়ি দেখে সকলে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। আহি নাক – মুখ কুঁচকে নিল। রোহান বলল,
– ” আচ্ছা তুই কর।
– ” আপনার কি গার্লফ্রেন্ড আছে ভাইয়া?”
ইয়াজ তার প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই নিল। সরাসরি জবাব দিল,
– ” না।”
রুহা খুশি হয়ে বলল,
– তাই?”
তার এত খুশি দেখে আহি ফট করে বলে ফেলল,
– ” তুমি এত খুশি হচ্ছো কেন?”
সকলের সামনে এভাবে বলায় রুহা কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। তবে আর কিছু বলল না।
এবার রুহানি বোতল ঘুরাল বোতলের মুখটা আরুর দিকে পড়ল। আরু বলল সে ট্রুথ নেবে। আরুকে রোহান প্রশ্ন করল,
– ” তুমি কখনো কাউকে ভালোবেসেছ আরু?”
আরু রোহানের প্রশ্ন শুনে রুদ্ধর চোখে চোখ রাখল। রুদ্ধও তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। আরু তার দিকে চোখ রেখেই জবাব দিল,
– ” হুম।”
আরুর জবার শুনে রুদ্ধর ঠোঁটে হাসি চলে এল। তবে সে প্রকাশ করল। মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে সে একড়ু হেসেও ফেলল। রোহানের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। হয়ত সে প্রকাশ করতে পারছে না অনেককিছুই। তবে আরুর দৃষ্টি দেখে সে অনেক কিছুই বুঝে ফেলল। নিধি তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল তাদের দেখেই তার প্রচন্ড রাগ উঠে গেল। কোনোভাবেই সয্য করতে পারছে না এসব। নিধি এবার বলে উঠল,
– ” এইটুকু বয়সে আবার ভালোবাসাও বুঝ। এখনকার মেয়েরা এত পাকা।”
– ” তুমি বুঝি খুব বড় হয়ে গিয়েছ নিধি?” রুদ্ধর থমথমে স্বর শুনে নিধি হালকা কেঁপে উঠল। রুহানি ব্যাপারটা সহজ করতে আবার বোতল ঘুরাতে লাগল। বোতল এবার রুদ্ধর দিকে গেল। সবাই এবার তাকে চেঁপে ধরল অনেক ট্রুথ নেয়া হয়েছে এবার ডেয়ার নিতেই হবে। রুদ্ধ মেনে নিল তাদের কথা। রুদ্ধকে ডেয়ার দেয়া হলো তাকে গান শোনাতে হবে। রুদ্ধ রাজি হয়ে গেল।
সে আরুর দিকে তাকিয়ে খালি গলায় গান শুরু করল,
চলো বলে ফেলি
কত কথাকলি
জন্মেছে বলতে তোমায়
তোমাকে চাই
ঝলসানো রাতে
এ পোড়া বরাতে
তুমি আমার অন্ধকার
আর রোশনাই
কার্নিশে আলতা মাখানো
দিনেরা ঢলে পড়ে রাতে
তারপরে রাত্রি জাগানো
বাকিটা তোমারই তো হাতে
জেগে জেগে আমি শুধু ঘুমিয়ে পড়তে চাই
থেকে থেকে সেই মেঘেতে যাই বেড়াতে যাই
তোমাকে পাই
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৯
গান শেষ হতেই আরুর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।পুরোটা গান গাওয়ার সময় রুদ্ধ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।
সে আরুকে ইশারা করল চোখের পানি মুছে নিতে।
