Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১১

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১১

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১১
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

রিত্তিকা নিজের মনে হাসতে হাসতে হাত ধোয়ার জন্য বেসিনের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ও মনে মনে খুব ভালো করেই জানে, মুখে যাই বলুক না কেন—ভাই-বোনদের এই বাঁদরামিগুলো ছাড়া ওর নিজের দিনটাও আসলে একদম পানসে!

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের মিটিং রুম থেকে যখন জিয়ান কায়সার বের হলো, ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে চারটা। বিকেলের নরম আলো করিডোরে এসে পড়েছে। জিয়ান আসলে আজ আসতে চায়নি, কিন্তু কলেজের প্রিন্সিপাল স্যারের বিশেষ অনুরোধ ফেরানো সম্ভব ছিল না বলেই স্পোর্টস টিচারের সাথে এই মিটিংয়ে অংশ নিতে হয়েছে তাকে।
​করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে স্পোর্টস টিচার জিয়ানের দিকে তাকিয়ে কিছুটা চিন্তিত গলায় বললেন, “প্রফেসর জিয়ান, এবার তো নিয়ম কিছুটা বদলেছে। আমাদের ভার্সিটির পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষ টিমের বিরুদ্ধে একজন শিক্ষক এবং একজন শিক্ষার্থীকে একসাথে কোর্টে নামতে হবে। আমি ভাবছিলাম, শিক্ষকের কোটায় আপনিই খেলুন।”
জিয়ান কিছুটা অবাক হয়ে মৃদু হেসে বলল, “নো স্যার, আমি কেন খেলব? আপনি থাকতে আমাদের মতো জুনিয়রদের দিকে তাকানোর তো প্রয়োজন নেই।”
​স্পোর্টস টিচার দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, “এবার আমার শরীরটা একদমই পারমিট করছে না, প্রফেসর। তা ছাড়া আমি জানি, ব্যাডমিন্টন কোর্টে আপনার মতো ক্ষিপ্রতা আর স্কিল এই পুরো ভার্সিটিতে আর কারও নেই। আপনি অত্যন্ত চমৎকার খেলেন। তাই এই গুরুদায়িত্বটা এবার আপনাকেই নিতে হবে।”

​জিয়ানের চোখে একটা চেনা আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক খেলে গেল। সে বলল, “আচ্ছা, আপনি যখন এত করে বলছেন, আমি খেলব। আর প্রতিপক্ষের কথা ভাববেন না, যেভাবেই হোক, প্রতিবারের মতো এবারও ট্রফিটা আমাদের ভার্সিটিতেই আসবে। কিন্তু আসল সমস্যা তো অন্য জায়গায়। স্টুডেন্টদের মধ্য থেকে কে খেলবে? রাফসান তো এবার পাস করে চলে গেছে, ও তো আর আমাদের পক্ষে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না।”
“সেটাই তো সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়, প্রফেসর,” স্পোর্টস টিচার মাথা নাড়লেন। “এবার ব্যাডমিন্টনের জন্য একদম নতুন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে। আমি ভাবছি কালকেই ভার্সিটির নোটিশ বোর্ডে একটা ঘোষণা দিয়ে দেব। যে স্টুডেন্ট সবচেয়ে ভালো খেলতে পারবে, ট্রায়াল নিয়ে তাকেই সিলেক্ট করা হবে।”
​জিয়ান হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা, তাহলে সেটাই করুন। এবার বরং আমি আসি স্যার, অফিসে একটা জরুরি মিটিং আছে আমার।”

​স্পোর্টস টিচার জিয়ানের দিকে তাকিয়ে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বললেন, “আপনি আসলেই একজন অলরাউন্ডার, প্রফেসর জিয়ান! একদিকে ভার্সিটির ক্লাস, অন্যদিকে নিজের এত বড় বিজনেস সাম্রাজ্য—দুটো একসাথে যেভাবে সামলান, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। যাই হোক, সাবধানে যান।”
​স্পোর্টস টিচারকে বিদায় জানিয়ে জিয়ান সোজা নিজের অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। অফিসে পৌঁছানোর পর তার ব্যক্তিত্ব আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রিসেপশনের দিকে না তাকিয়ে, চেনা গম্ভীর পায়ে সে সোজা নিজের পার্সোনাল কেবিনে ঢুকে গেল।
​টেবিলের কিছু ফাইলপত্র দেখছিল সে, এমন সময় দরজায় নক করে ভেতরে প্রবেশ করল তার বিশ্বস্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট বিরাজ।
​”স্যার, মিটিং শুরু হতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। আর একটা বিশেষ খবর আছে,” বিরাজ কিছুটা উত্তেজিত গলায় বলল।
জিয়ান ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল, “কী খবর, বিরাজ?”

“মিস্টার এহসান নাকি এবার নিজেই এসেছেন মিটিং করতে। ”
জিয়ানের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, “ওহ, রিয়েলি? তাহলে শেষ পর্যন্ত ওনার মহামূল্যবান কদম আমার অফিসে পড়েই গেল!”
“জি স্যার, উনি অলরেডি কনফারেন্স রুমের দিকে যাচ্ছেন।”
জিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ব্লেজারটা ঠিক করতে করতে বলল, “ওকে, লেটস গো।
জিয়ান যখন গম্ভীর পায়ে কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করল, উপস্থিত বোর্ডের সমস্ত মেম্বাররা একযোগে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানিয়ে বলল, “গুড ইভনিং, স্যার।”
​জিয়ান মাথা ঝুঁকিয়ে প্রতিউত্তর দিল, “গুড ইভনিং।” ঠিক সেই মুহূর্তেই মিটিং রুমের ভারী দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন মিস্টার এহসান। তার চোখে-মুখে এক ধরনের অহংকার।
​জিয়ান তার দিকে তাকিয়ে একটু বাঁকা হেসে বলল, “ওয়েলকাম টু মাই অফিস, মিস্টার এহসান।”
​মিস্টার এহসানও জিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, “থ্যাংকস, মিস্টার কায়সার। আপনার ব্যাপারে অনেক গল্প শুনেছি। আজ নিজের চোখে আপনাকে দেখার সুযোগ হলো।”
​জিয়ান বাঁকা হেসে বললো,“Are you feeling something looking at me?” 🙂
মিস্টার এহসান কুটিল হেসে বললেন, “Yeah, I’m feeling a bit of romance in the air. Is that what you want to hear?” 😕

​তার সেই বাঁকা হাসিটা বজায় রেখেই এহসান ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে বললেন, “যাই হোক, এসব অহেতুক কথাবার্তা ছেড়ে এবার আসল মিটিংটা শুরু করা যাক।”
​জিয়ান ক্ষণিকের জন্য থামল। তারপর ঠান্ডা, বরফশীতল গলায় বলল,
“আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড।”
পুরো রুমে যেন পিনপতন নীরবতা নেমে এল। মিস্টার এহসান চমকে উঠে বললেন,
“হোয়্যাট?!”
​”ইয়েস,” জিয়ান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুঁজে বলল। “আপনার সাথে কোনো রকম ডিল করার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা আমার নেই। সো, লিভ মাই অফিস।”
​মিস্টার এহসানের মুখ রাগে লাল হয়ে গেল। তিনি টেবিলের ওপর হাত চাপড়ে বললেন, “আপনি কিন্তু মস্ত বড় ভুল করছেন, মিস্টার জিয়ান!”
​জিয়ান এক চুলও নড়ল না। তার কণ্ঠস্বর আরও দৃঢ় শোনাল, “আমি খুব ভালো করেই জানি আমি যা করি, সেটাই ঠিক। আর একটা কথা মাথায় রাখবেন মিস্টার এহসান—আপনি নিজ থেকে আমার সাথে ডিল করতে এসেছেন। এসেছেন আপনার ইচ্ছায়, কিন্তু এখান থেকে যাবেন আমার ইচ্ছায়। সো, লিভ মাই অফিস রাইট নাউ!”

​অপমানে শরীর কাঁপতে থাকা মিস্টার এহসান চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “এই অহংকারের মাশুল কিন্তু আপনাকে কড়ায়-গণ্ডায় দিতে হবে।”
জিয়ান হোহো করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো ভয় ছিল না, ছিল চরম দম্ভ। সে বলল, “ওহ রিয়েলি? ভুলে যাবেন না যে আপনি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন”
​”মনে আমি রাখলাম,” দাঁতে দাঁত চেপে কথাটি বলেই মিস্টার এহসান এবং তার অ্যাসিস্ট্যান্ট দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
বিরাজ এতক্ষণ এককোণে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়েছিল। মিস্টার এহসান চলে যেতেই সে চরম কৌতুহল আর কিছুটা ভয় নিয়ে জিয়ানের দিকে এগিয়ে গেল।
​”স্যার… মিস্টার এহসানকে এভাবে তাড়িয়ে দিলেন কেন?” বিরাজ আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল।
জিয়ান নিজের চেয়ারে আরাম করে বসতে বসতে বলল, “ওনার সাথে ডিল করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই, ব্যস এটুকুই।”

“কিন্তু স্যার, এটা আমাদের কোম্পানির অন্যতম বড় একটা ডিল ছিল। ওনার সাথে পার্টনারশিপ করলে অফিসের প্রফিট গ্রাফ এক ধাক্কায় আকাশছোঁয়া হয়ে যেত। অনেক লাভ হতো আমাদের!” বিরাজ বোঝানোর চেষ্টা করল।
​জিয়ান বিরাজের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল, “কোম্পানির লাভ আর লস নিয়ে তোমায় অত মাথা ঘামাতে হবে না বিরাজ। তার জন্য আমি একাই যথেষ্ট। তুমি এখন নিজের কাজে যাও।”
​বিরাজ আর একটা কথাও না বাড়িয়ে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
অফিসের সেই ঝোড়ো মিটিং শেষ হওয়ার পর আরও কিছুক্ষণ নিজের কেবিনে ফাইলপত্র দেখল জিয়ান। মিস্টার এহসানের মতো বড় ব্যবসায়ীকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর চারদিকে যে সামান্য শোরগোল উঠবে, তা সে ভালো করেই জানে। তবে জিয়ান কায়সার এসবের তোয়াক্কা করে না। ঘড়ির কাঁটা যখন ছ’টা ছুঁইছুঁই, তখন ব্লেজারটা কাঁধে ফেলে সে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সারাদিনের ধকল শেষে নিজের চেনা প্রাসাদে ফিরে একটু শান্তি দরকার তার।

____অন্যদিকে ​রিত্তিকা নিজের পড়ার টেবিলে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছিল। ঠিক তখনই সেই শান্ত পরিবেশকে এক নিমেষে চুরমার করে দিয়ে, তুমুল চেঁচামেচি আর হাসাহাসি করতে করতে ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল তার ছোট বোন রিদিতা আর ভাই রিহান। ওরা যেন এক একটা আস্ত ঝড়ের বেগ নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।
রিত্তিকা বিরক্তিতে কপালে হাত দিয়ে বই থেকে চোখ তুলল। ওদের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল, “শুরু হয়ে গেলি রে তোরা আবার! তোরা কি চোখে দেখিস না যে আমি মন দিয়ে পড়ছি? তাও ঘরের ভেতর এসে এমন বাজারের লোকের মতো চিল্লাপাল্লা করছিস কেন? তোদের জালায় কি এই বাড়িতে একটু শান্তিতে পড়াশোনা করারও উপায় নেই?”

​রিহান মোটেও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে রিত্তিকার পড়ার টেবিলের কোণায় পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে এক গাল হেসে বলল, “না, পারবি না! আমরা যতক্ষণ এই ঘরে থাকব না, ততক্ষণ তুই মন চাইলে বিজ্ঞানী হয়ে যা, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমরা যখন একবার এসে পড়েছি, তখন ওই মোটা মোটা বই বন্ধ কর। এখন শুধু আমাদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিবি, ব্যস!”
​রিত্তিকা এবার রিহানের দিকে তেড়ে গিয়ে বলল, “আরেহ বাহ! আবদার কত! তোরা কে রে ভাই যে তোদের জন্য আমি আমার পড়াশোনা লাটে তুলে আড্ডা দেব? তোদের কোনো কাজকাম নেই? যাহ, এক্ষুনি আমার রুম থেকে বের হ তোরা!”
বড় বোনের এমন তাড়া খাওয়া কথা শুনে রিদিতা চট করে তার নাটুকে স্বভাবটা বের করল। সে নিজের দুই চোখের কোণায় কাল্পনিক জল মুছে, একদম নিখুঁত নেকা কান্না করার মতো মুখভঙ্গি করে বলল, “ওরে বাবা রে! শুনলি রিহান? আপু আমাদের চেনে না! আমরা কেউ না তোর? এত তাড়াতাড়ি পর করে দিলি আমাদের? আমাদের ভালো বাসার কি কোনো মূল্যই নেই তোর কাছে! 🥹”

রিদিতার এমন নিখুঁত ওভার-অ্যাক্টিং আর নেকা কান্না দেখে রিত্তিকা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। তবে মুখে কৃত্রিম গম্ভীরতা বজায় রেখে, হাতের কলমটা টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রাখল সে। তারপর চেয়ারটা ঘুরিয়ে দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে ওদের দিকে তাকাল।
​”হয়েছে, অনেক হয়েছে! এবার তোদের এই অস্কারজয়ী অ্যাক্টিং বন্ধ কর আর চুপ কর!” রিত্তিকা রিহান আর রিদিতার দিকে চোখ রাঙিয়ে বলল। “অনর্থক সেন্টিমেন্ট দেখাস না। তোরা এখনো কলেজে পড়িস, তোদের এই বয়সের সব চালাকি আমার নখদর্পণে। ভালো করেই জানি, তোরা দুজন বিনা কারণে এই অসময়ে আমার ঘরে এসে অত চিল্লাপাল্লা করিসনি। নিশ্চয়ই কোনো বড়সড় মতলব আছে। এবার সোজা সাপটা বল, কেন এসেছিস এখানে?”
​রিদিতা চট করে চোখ থেকে কাল্পনিক জল মোছার ভঙ্গি বন্ধ করে এক গাল হাসল। রিহানও টেবিল থেকে নেমে রিত্তিকার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল। দুই ভাই-বোনের মুখে তখন এক চতুর আর তোষামোদের হাসি ফুটে উঠেছে।

রিহান রিত্তিকার কাঁধে হাত রেখে বলল, “দেখলি রিদিতা, বড় আপু আমাদের কত ভালো চেনে! আসলে আপু, আমরা একটা মহা বিপদে পড়ে তোর কাছে এসেছি। তুই ছাড়া আমাদের এই উদ্ধার করার মতো ক্ষমতা আর এই বাড়িতে কারও নেই।”
​রিত্তিকা সন্দেহের দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী বিপদ শুনি? তোরা কলেজে যাস পড়াশোনা করতে নাকি প্রতিদিন নতুন নতুন ঝামেলা পাকাতে?”
​”আরে না আপু, এবার ঝামেলা আমরা পাকাইনি, আমাদের কলেজের প্রফেসর পাকিয়েছেন!” রিদিতা এবার রিত্তিকার পড়ার টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিটা টেনে নিয়ে খেলতে খেলতে বলল। “আসলে হয়েছে কি, আগামী পরশুদিন আমাদের কলেজে একটা বিশাল প্রজেক্ট আর এসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার লাস্ট ডেট।”
​রিত্তিকা ভুরু কুঁচকে বলল, “তাতে আমার কী? তোদের এসাইনমেন্ট তোরা লিখবি।”
“আরে সেটাই তো সমস্যা!” রিহান চুল চুলকাতে চুলকাতে বলল। “টপিকটা এত কঠিন যে আমরা মাথায় কিছু ঢোকাতে পারছি না। তার ওপর আমাদের প্রজেক্টের যে প্রেজেন্টেশন স্লাইড বানাতে হবে, ল্যাপটপে সেই কাজ তো আমরা একদমই পারি না। তুই তো জানিস আপু, তুই এইসবে কতটা এক্সপার্ট! তোর কলেজের আর ভার্সিটির সব প্রজেক্ট তো সবসময় বেস্ট হতো।”

​রিদিতা এবার রিত্তিকার হাত চেপে ধরে অনুনয় করার গলায় বলল, “প্লিজ আপু! এই দুটো দিন রাতে তুই আমাদের একটু হেল্প কর না! তুই জাস্ট ল্যাপটপে স্লাইডগুলো একটু সাজিয়ে দিবি আর প্রজেক্টের মেইন আইডিয়াটা একটু গুছিয়ে দিবি। নইলে কলেজের সবার সামনে আমাদের খাতা পেন্ডিং হয়ে যাবে, আর ইন্টারনাল মার্কস একদম কাটা যাবে!”
​রিত্তিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোরা যে কী পরিমাণ অলস! নিজেরা সারাবছর ফাঁকি মেরে এখন শেষ মুহূর্তে আমার ঘাড়ে এসে চেপেছিস?, আর আমি এখন তোদের কলেজের এসাইনমেন্ট আর প্রজেক্ট করে দেব?”

“আরে আপু, পুরোটা করতে হবে না, তুই জাস্ট একটু গাইড করবি!” রিহান দুই আঙুল দেখিয়ে বলল। “আর তুই রাজি হলে তোর একটা বিশাল লাভ আছে।”
​”কী লাভ?” রিত্তিকা চোখ ছোট ছোট করে তাকাল।
​রিহান এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “তুই রাজি হলে, কালকে তুই যখন তোর ভার্সিটি থেকে ফিরবি, তোকে তোর ফেভারিট রেস্টুরেন্ট থেকে বিফ বার্গার আর কোল্ড কফি ট্রিট দেব। আমাদের পকেট মানি থেকে! প্রমিজ!”
ছোট ভাই-বোনের এই করুণ মুখ দেখে রিত্তিকার কঠিন মনটা একটু গলল। সে মনে মনে ভাবল, নিজের পড়ার ফাঁকে এক ঘণ্টা ওদের ল্যাপটপের কাজটা দেখিয়ে দিলে ওদের উপকার হবে।
রিত্তিকা একটু ভাব নেওয়ার জন্য কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আচ্ছা বাবা ঠিক আছে, রাজি। কিন্তু ল্যাপটপের সামনে তোরা দুজন খাতা-কলম নিয়ে বসবি, আমি শুধু মুখে বলে দেব আর স্লাইডটা রেডি করে দেব। এক চুলও যদি এদিক-ওদিক মন দিছিস, আমি কিন্তু ল্যাপটপ বন্ধ করে দেব, বলে দিলাম!”
​”ইয়েসসস! লাভ ইউ আপু!” 😘বলেই রিহান আর রিদিতা খুশিতে একটা যৌথ চিৎকার দিয়ে রিত্তিকাকে জড়িয়ে ধরল, যেন তারা অলরেডি কলেজের প্রজেক্টে ফুল মার্কস পেয়ে গেছে!
চুক্তি হওয়া মাত্রই রিহান আর রিদিতা এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ভোঁ-দৌড় দিল নিজেদের ঘরের দিকে। মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে তারা তাদের কলেজের মোটা মোটা খাতা, জটিল সব টেক্সটবুক, আর একটা পেনড্রাইভ বগলে চেপে আবার রিত্তিকার ঘরে এসে হাজির হলো। রিহানের এক হাতে তাদের ল্যাপটপ আর অন্য হাতে চিপসের প্যাকেট।
​রিত্তিকা তার নিজের পড়ার টেবিলটা একটু গুছিয়ে ল্যাপটপ খোলার জায়গা করে দিল। সে গম্ভীর গলায় বলল,

“শোন, তোদের কলেজের প্রজেক্টের টপিকটা কী আগে সেটা বল। আর স্যার ঠিক কী কী শর্ত দিয়েছে, তা পরিষ্কার কর। আমার নিজেরও পড়াশোনা আছে, তাই বেশি সময় নষ্ট করা যাবে না।”
রিদিতা চট করে তার কলেজের জটিল সিলেবাসের ডায়েরিটা খুলে রিত্তিকার সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এই যে দেখো আপু, আমাদের টপিক হলো, আইসিটি আর ইকোনমিক্সের মিক্সড একটা প্রজেক্ট—’ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্লকচেইন টেকনোলজি কীভাবে গ্লোবাল ইকোনমিকে বদলে দিচ্ছে’। স্যার বলেছেন, আমাদের শুধু খাতায় লিখলে হবে না, ল্যাপটপে অন্তত ১০টি আকর্ষণীয় স্লাইড বানিয়ে প্রেজেন্টেশন রেডি করতে হবে। আর রিহান তো ল্যাপটপে টাইপ করতে গেলে একটা একটা করে অক্ষর খোঁজে! ওদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির গ্রাফ আর ব্লকচেইনের ডায়াগ্রাম তো আমরা মাথায়ই ঢোকাতে পারছি না।”
​”এই, একদম বানোয়াট কথা বলবি না!” রিহান প্রতিবাদ করে উঠল। “আমি টাইপ করতে পারি, জাস্ট স্পিড একটু কম, এই যা! তুই নিজে তো পাওয়ার পয়েন্টের আইকনটাই চিনিস না।”
“আহ্! তোরা কি এখানেও ঝগড়া করতে এসেছিস?” রিত্তিকা ধমক দিয়ে উঠল। “রিহান, তুই ল্যাপটপটা অন কর। আর রিদিতা, তুই খাতা খুলে আমি যা যা পয়েন্ট বলছি, সেগুলো নোট কর। ব্লকচেইনের বেসিক ডেফিনিশনটা আমি সাজিয়ে দিচ্ছি।”

​রিত্তিকার ধমক খেয়ে দুই ভাই-বোন একদম সোজা হয়ে বসল। রিত্তিকা তার ল্যাপটপে পাওয়ার পয়েন্টের একটা সুন্দর প্রফেশনাল ব্ল্যাঙ্ক টেমপ্লেট সিলেক্ট করল। তার আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর ঝড়ো গতিতে চলতে লাগল। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল, “প্রথম স্লাইডে তোদের কলেজের নাম আর তোদের দুজনের রোল নাম্বার দে। সেকেন্ড স্লাইড থেকে আমরা মূল টপিকে ঢুকব। রিদিতা, তুই খাতায় লেখ—পয়েন্ট ১: ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার টেকনোলজি (DLT) এবং এর সিকিউরিটি।”
রিদিতা দ্রুত কলম চালিয়ে লিখতে লিখতে মাথা চুলকে বলল, “উফ আপু, এসব কী কঠিন কঠিন নাম! তুমি এত সুন্দর আইডিয়া এত তাড়াতাড়ি কীভাবে পাও? আমাদের কলেজের ইকোনমিক্সের স্যার তো এই ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার শুনলে নিজেই টাস্কি খাবেন!”

​রিহান চিপসের প্যাকেট থেকে একটা চিপস রিত্তিকার মুখের সামনে ধরে বলল, “আমাদের আপু বলে কথা! নাও আপু, একটু এনার্জি নিয়ে নাও। এরপর আমাদের স্লাইডগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড কালার আর থিমটা একটু চুজ করে দাও তো। কোনটা দিলে বেশি কুল আর টেকনিক্যাল লাগবে?”
​রিত্তিকা চিপসটা মুখে পুরে নিয়ে বলল, “যেহেতু এটা টেকনোলজি আর ফাইন্যান্সের ওপর প্রজেক্ট, তাই ডার্ক ব্লু অথবা ব্ল্যাক কালারের থিম রাখ, সাথে নিয়ন গ্রিন বা হোয়াইট ফন্ট দে। দেখতে একদম রিয়েল কোডিং বা ফাইন্যান্স ড্যাশবোর্ডের মতো লাগবে। আর শোন, ইন্টারনেট থেকে বিটকয়েন এবং ব্লকচেইনের ডেটা ব্লকের কিছু ইনফোগ্রাফিক ডায়াগ্রাম ডাউনলোড করে স্লাইডে অ্যাড কর। শুধু রিডিং লেখা থাকলে স্যার বোরিং ফিল করবেন আর মার্কস কেটে দেবেন।”

​পরের এক ঘণ্টা রিত্তিকার ঘরের পরিবেশটা পুরো একটা হাই-টেক কর্পোরেট অফিসের মতো হয়ে গেল। রিত্তিকা মেইন প্রজেক্ট ম্যানেজারের মতো ল্যাপটপে জটিল স্লাইড ডিজাইন করছে, ট্রানজিশন ইফেক্ট সেট করছে আর মাঝেমধ্যে রিহান-রিদিতাকে কঠিন কঠিন ফাইন্যান্সিয়াল টার্মের ইংরেজি টাইপ করতে সাহায্য করছে। রিহান ইন্টারনেট থেকে নির্ভরযোগ্য গ্রাফ ও চার্ট খুঁজে বের করার দায়িত্বে আর রিদিতা খাতায় প্রেজেন্টশনের স্পিচ রেডি করায় ব্যস্ত।
কাজটা প্রায় শেষের দিকে চলে আসলে রিদিতা একটা স্বস্তির হাই তুলতে তুলতে বলল, “আপু, আর মাত্র দুটো স্লাইড বাকি। ক্রিপ্টোকারেন্সির রিস্ক আর ফিউচার পসিবিলিটিজ দিলেই শেষ। এটা শেষ হলে কালকে ক্লাসে আমরা জাস্ট ফাটিয়ে দেব। আমাদের গ্রুপের বাকিরা তো এখনো ব্লকচেইন জিনিসটা কী, সেটাই বুঝতে পারেনি!”

​রিহান ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলল, “সত্যি আপু, তুমি না থাকলে কালকে কলেজের আমাদের কপালে বড় দুঃখ ছিল। প্রমিজ করছি, কালকে কলেজ থেকে ফেরার পথে তোমায় ওই স্পেশাল ডাবল প্যাটি বিফ বার্গার আর কোল্ড কফি মাস্ট খাওয়াব!”

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১০

​রিত্তিকা ল্যাপটপের মাউসটা ক্লিক করে ফাইলটা সেভ করতে করতে মুচকি হাসল। ছোট ভাই-বোনের এই চঞ্চলতা আর মিষ্টি আবদারগুলো মাঝেমধ্যে তার পড়ার একঘেয়েমি দূর করে দেয়। সে ল্যাপটপটা বন্ধ করে বলল, “হয়েছে, প্রজেক্ট রেডি। এবার তোরা পেনড্রাইভে ফাইলটা কপি করে নিয়ে নিজেদের ঘরে যা আর ঘুমিয়ে পড়। কাল সকালে তোদের কলেজ আছে, আর আমারও ভার্সিটির ক্লাস আছে।”
রিহান আর রিদিতা খুশিতে ফাইলটা লুফে নিয়ে রিত্তিকাকে একটা স্যালুট দিল, তারপর গুড নাইট জানিয়ে ডানা কাটা পাখির মতো ফুরফুরে মেজাজে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রিত্তিকা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার নিজের বইয়ের দিকে মনোযোগ দিল।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here