Home তোমার নিরব অভিমানীনি তোমার নিরব অভিমানীনি পর্ব ১২

তোমার নিরব অভিমানীনি পর্ব ১২

তোমার নিরব অভিমানীনি পর্ব ১২
Israt Bintey Ishaque

আপনার মাথাটা ফা’টিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে! এবার কি করবো বলুন?
নজরাত এর এহেন কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল রাদ শাহমাত। ছোট ছোট চোখ দুটো বড় বড় করে তাকায় সে। নজরাত ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে চলে যায় রুম থেকে। রাদ শাহমাত বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে রইল।
নজরাত রাহা’র রুমে এসে বসে। রাহা শাওয়ার নিয়ে সদ্য বের হয়েছে বাথরুম থেকে। নজরাত কে দেখতে পেয়ে ছুটে এসে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,

—” ভাবীমণি আমি আজকে ভীষণ খুশি।
এদিকে নজরাত এর মাথা ঘুরছে। পরে যেতে নিলে নায়কের মতো করে রাহা ডান হাতে ধরে নিল‌। আর নজরাত রাহার হাতে ভর দিয়ে কাত হয়ে র‌ইলো। তারপর এভাবে থেকেই
নজরাত হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—” আলহামদুলিল্লাহ। তা এতো খুশি কেন শুনি?
—” রুপকথা আপু আসল লেখিকা রুপকথা না হ‌ওয়াতে বেশ হয়েছে।
—” কেন ভালো কেন?
—” এই যে এখন আর ভাইয়া রুপকথার পিছনে দৌড়াবে না। এখন থেকে ভাইয়া পার্মানেন্টলি তোমার হয়ে যাবে।
—” কিন্তু তুমি তো চেয়েছিলে তোমার ভাইয়া যেন তার ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে সুখী হতে পারে। তাহলে এখন এই কথা কেন?
রাহা ফিচেল হেসে বলল,

—” হুম বলেছিলাম। কিন্তু ভাইয়া যাকে লেখিকা রুপকথা ভেবেছিল সে তো তা নয়, ফেইক!
নজরাত খানিকটা উদাস গলায় বলল,
—” শুধু কি লেখিকা ভেবেই ভালোবাসতো? রুপকথা মেয়েটির রুপের মায়ার পরেনি কখনো? মেয়েটা তো অনেক রুপের অধিকারী ছিল।
রাহা ক্ষীণ একটু হেসে বলল,

—” যদি রুপের মায়ায় পড়তো তবে কি ভাইয়া এতটা কষ্ট পেত? কখনোই না।
নজরাত দুষ্টু হেসে বলল,
—” তা ঠিক সেই জন্য‌ই তো তোমার ভাইয়া এখন দেবদাস বনে গেছে হা হা হা।
—” আমার ভাইয়াটাকে আগের মত চঞ্চল প্রাণবন্ত করে দাও প্লিজ প্লিজ।
—” ইশশ বয়েই গেছে আমার। এত্ত ঠেকা কেন? আমি ওসব কিছু পারবো না বাপু। আমার আমিতে রহিয়াছি মগ্ন। তাই তোমার ভাইয়াকে নিয়ে আমার ভাববার সময় ক‌ই?

রাহা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। যা দেখে নজরাত চোখে ইশারা করে বোঝায়, কি? এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?
রাহা চোখ মুখে বিষ্ময়ের ভাব ফুটিয়ে তোলে বলল,
—” একদম উপন্যাসের ভাষা! তোমার বোধ হয় খুব উপন্যাস পড়া হয়। তাই না?
নজরাত খানিকটা উদাস হয়ে গেল, ধীর স্বরে বলল,

—” “আমি গল্প’তেই বাঁচি,
লিখে কিংবা পড়ে!
রাহা খানিকটা হেসে বলল,
—” মানে? ঠিক বুঝলাম না।
নজরাত খানিকটা কেঁপে উঠলো। এরিয়ে যেতে বলল,
—” মায়ের কাছে যাই। দেখি কিছুর প্রয়োজন হলো নাকি।
তারপর দ্রুত পায়ে চলে গেল নজরাত। রাহা খানিকক্ষণ ঠোঁট উল্টে বসে রইল।

দিন বদলের হাওয়ায় রাদ শাহমাত নিজেকে ধাতস্থ করে অফিসে নিয়োমিত হয়। তবে ভিতরে চাপা কষ্ট বিদ্যমান। ব‌উয়ের দিক দিয়ে আগের মতই উদাসীন সে। তবে এসবে মোটেও দুঃখ প্রকাশ করে না নজরাত। সবসময়ের মত সবার সাথে হাসিখুশি থাকছে। বাহিরে থেকে ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও ভিতরে ভিতরে শূন্যতায় কুরে খায় তাকে। তবুও হাসি মুখে ঘুরে বেড়ায়।

একদিন সবাইকে নিয়ে বাবার বাসায় যাবে বলে ঠিক করল। রাহা ইতস্তত বোধ করে ও বাসায় যাওয়া নিয়ে। কিন্তু নজরাত এর কষ্ট হবে ভেবে নিষেধ করতে পারে না। কিন্তু মনে মনে রূপক কে নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। লোকটার মুখোমুখি হ‌ওয়ার যে কোন পথ খোলা রাখেনি সে।

সন্ধ্যা বেলা নিজের বাসায় পৌছে নজরাত আর তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন। বরাবরের মতো মেহমান আপ্যায়নে কোন রকম ঘাটতি রাখছেন না সাজ্জাদ হোসেন। সাথে রূপক ও আছে। তবে রাহা কে এরিয়ে চলছে সে। রাহা আড়চোখে বার কয়েক দেখে নিয়েছে রূপক কে। অন্যদের সাথে হাসি মুখেই কথা বলছে। রাহা এরপর থেকে মাথা নিচু করেই বসে আছে।
তবে এসবের মাঝে একটা ব্যাপার আছে।

রাহার পরিবার ছাড়া আর কজন মেহমান এসেছেন এ বাসায়। এর মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন। রাহার মনে হচ্ছে তাকে ইঙ্গিত করে কিছু বলা হচ্ছে। কিন্তু কি তা জানে না সে।
রাদ শাহমাত এই প্রথম মন থেকে কথা বলছে রূপক এর সাথে। দুজনে এবার মিলেছে ভালো। অপরদিকে সাজ্জাদ হোসেন আর সাজেদা চৌধুরী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলছেন। নজরাত কিচেনে গিয়ে দেখছে কি কি খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। যদিও সে জানে তার বাবা এবং ভাই মেহমানদের আপ্যায়নে ত্রুটি রাখবে না।

হঠাৎ সাজ্জাদ হোসেন এর কন্ঠস্বর উচ্চ শোনালো। সবার নজর উনার উপর নিবদ্ধ হয়। সাজ্জাদ হোসেন গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
—” আজকে একটা বিশেষ দিন। যার কারণে আপনাদের এখানে জড়ো করা হয়েছে, আই মিন নিমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে। আজ এবং এক্ষুনি আমার একমাত্র ছেলে রূপক এর এনগেজমেন্ট! আমার ছেলের সুখী ভবিষ্যৎ কামনা করে সবাইকে দো’আ রাখার অনুরোধ।

সাজ্জাদ হোসেন আরো অনেক কিছু বলে চলেছেন। আর তার পাশে ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রূপক। রাহা ছলছল চোখে চেয়ে আছে রূপক এর দিকে। তাকে দেখে বুঝা যাচ্ছে বেশ আনন্দিত সে। অবশ্য শুধু সে নয় রাহা আর রাদ ব্যতিত সবাই খুশি।
“আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে পাত্রি কে? পাত্রি আমাদের সাথেই আছে। মিস রাহা চৌধুরী”!
রাহা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আদৌও কি তার নাম ঘোষণা করা হয়েছে? নাকি সে ভুল শুনছে? তখন নজরাত এসে রাহা কে নিয়ে গিয়ে রূপক এর পাশে দাঁড় করিয়ে দিল। রাহা আকাশ সম বিষ্ময় নিয়ে বলল,

—” ভাবীমণি?
এতেই নজরাত হেসে বলে,
—” সারপ্রাইজ কেমন দিলাম? বলুন ননদিণী!
রাহা কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখের ভাষা সব লোপ পেয়েছে তার।

নজরাত রাহার ব্যাপারে আবারও তার ভাইয়ার সাথে কথা বলে। রূপক প্রথমে রাজী হয়নি। পরে নজরাত তাকে আস্বস্ত করে বলে যে, এবার রাহা ফিরিয়ে দিবে না এটা নজরাত এর বিশ্বাস। তারপর রূপক রাজী হয় ঠিকই কিন্তু শর্ত দিয়ে বসে! নজরাত জানতে চায় কি শর্ত? তখন সে বলে,
—” আমি বিয়ে করবো বাট তোর কুটনি ননদিনী কে আমার বাড়ি এসে এনগেজমেন্ট করতে হবে!
নজরাত অবাক হয়ে বলে,

—” এ কেমন কথা? পাত্রী নিজে ছেলের বাসায় গিয়ে এনগেজমেন্ট করবে?
—” হ্যাঁ তাই করতে হবে। এটা আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার শা’স্তি স্বরূপ ফল।
নজরাত বেচারি আর কি করবে? সে তো তার ভাইয়ার রাগ সম্পর্কে অবগত আছে। তাই নজরাত জানে রূপক আর কখনোই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে রাহার কাছে যাবে না। সে চাইছে রাহা নিজে তার কাছে যাক! নজরাত পরে যায় মহা মুশিবতে। কিভাবে কি করবে বুঝতে পারে না। এ কয়দিন অনেক ভেবেছে এই নিয়ে।

এইতো পরশুদিন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে কফি হাতে ভাবছিল হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এলো আর সে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে হাত থেকে কফির মগ ফেলে দিল! ভাঙ্গার আওয়াজ পেয়ে রাদ শাহমাত দৌড়ে এসে দেখে এই কান্ড। নজরাত ভ্রু কুঁচকে ভয়ে ভয়ে মুখশ্রী করে তাকিয়ে থাকে।

কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে রাদ মণি কে ডেকে পরিষ্কার করতে বলে ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো গুলো। অথচ নজরাত ভেবেছিল তাকে হয়তো বকাঝকা করবে রাদ শাহমাত অথচ সেরকম কিছুই করেনি। এতে খানিকটা খুশি হয় নজরাত।
নজরাত তার শ্বাশুড়ি মায়ের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলে। সাজেদা চৌধুরী এমন অদ্ভুত কথা শুনে প্রথমে থম মেরে বসে থাকেন। তারপর দুষ্টু হেসে বলেন,

—” বৌমা রূপক একদম ঠিক ডিসিশন নিয়েছে! আমার ছেলে মেয়ে দুটোর যা অহং’কার, দাম্ভি’কতা এতে কিছুটা হলেও শিক্ষা পাবে তারা। তুমি বেয়াই সাহেব কে সবকিছুর আয়োজন করতে বলো। আমি আছি তোমাদের সঙ্গে।
নজরাত আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে শ্বাশুড়ি মাকে জড়িয়ে ধরে। সত্যি এরকম শ্বাশুড়ি মা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সে শুকরিয়া আদায় করেও শেষ করতে পারবে না আল্লাহ তা’আলার কাছে “আলহামদুলিল্লাহ”।

তোমার নিরব অভিমানীনি পর্ব ১১

এনগেজমেন্ট হ‌ওয়ার পর রূপক গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে যায়। রাহার সাথে একটা কথাও বলে না। ব্যাপারটাতে রাহা মনক্ষুণ্ণ হয়। এদিক ওদিক খুঁজেও তার দেখা পায় না সে। নজরাত এর সাথে তার রুমে এসে ভীষণ চমকায় রাহা। দরজায় লেখা ছিল “গল্পপুরি” ভিতরে ঢুকে প্রমাণ পায় এটা আসলেই একটা গল্পপুরি। নজরাত কে বলল,
—” আমি সেদিন ঠিক ধরেছিলাম। তুমিও ভাইয়ার মতো ব‌ই প্রেমী।….

তোমার নিরব অভিমানীনি পর্ব ১৩