Home দগ্ধ প্রেমানল দগ্ধ প্রেমানল গল্পের লিংক || আনায়া আফরিন

দগ্ধ প্রেমানল গল্পের লিংক || আনায়া আফরিন

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ১+২
আনায়া আফরিন

~আদিল রেডি হচ্ছে বাহিরে যাবে আজ।সিড়ি দিয়ে নামতেই দেখলো তার বোন আনায়া রেডি হয়ে নিচে নামছে।বাড়ির দরজার সামনে দুই ভাই বোন মুখোমুখি হতেই আদিল শান্ত গলায় বলে উঠলো-
“কোথায় যাচ্চিস এ্যানা?”
“মেহুর বাসায়!”
“কোন কারণে নাকি? ”
“তাকে দেখতে আসবে আজ পাত্রপক্ষ”
আদিলের বুকটা যেনো মুচড় দিয়ে উঠলো।রাশভারি কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো-

“সে রাজি?”
আনায়া এবার বিরক্তিকর সুরে বললো-
“রাজি হয়েছে বলেই তো পাত্রপক্ষ আসছে ভাইয়া।এখন তোমাকে জিজ্ঞাসা করি,কোথায় যাচ্ছো?”
“আজ এরিক পাত্রী দেখতে যাবে!তার সাথেই যাবো!”
কথাটা বলেই আদিল হনহন করে চলে গেলো!অন্যদিকে আনায়া থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো!মনে মনে আফসোসের সহিত বললো-
“জীবনসঙ্গী খুজতে যাচ্ছেন ডাক্তার সাহেব।কেউ না তো কেউ হবেই আপনার জীবনসঙ্গী।আমি হলে কি ক্ষতি?”
দুই ভাই বোন রওনা দিলো গন্তব্যে।দুইজনের হৃদয়েই যেনো ঝড় বইছে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

~~আয়নার সামনে দাড়ানো মেহেরকে একনজরে তাকিয়ে দেখেছে তার ছোটবোন রুদ্ভিকা।বোনের এমন চাহনির কারণ বোধহয় মেহের বুঝলো।তাই বোনের দিকে না তাকিয়েই বললো-
“এভাবে গিলে খাচ্ছিস কেন আমাকে?আমি ঠিক আছি রুদ্ভি!”
“চন্দ্রফুল আজ যে তোমাকে…..
দু’বোনের কথার মাঝেই তাদের মা মিতাল বেগম এসে বলছেন-
” মেহের তৈরি হলি কি?পাত্রপক্ষ যে এসে পড়বে”
মেহের নির্বাক হয়ে ঘোমটাটা মাথায় দিয়ে উঠে দাড়ালো!মায়ের পিছু পিছু রান্নাঘরের দিকে যেতে শুরু করলো!
পিছনে এক জোড়া রমণীর চোখ তার বোনকে বোঝার চেষ্টা করতে থাকলো!রুদ্ভিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো-
“চন্দ্রফুল আমি চাই তুমি দুঃখ ভুলে যাও।অতীতের দুঃখ যেনো তোমার পিছুটান না হয়।তোমাকে দুঃখ ছোয়ার আগে সেই দুঃখ আমার হোক!”

(আলতাফ চৌধুরী আর মিতালি বেগমের দুই কন্যা মেহের চৌধুরী রোজা আর ইলাহা চৌধুরী রুদ্ভিকা।
দাদা বাড়ির দিক দিয়ে আলতাফ উদ্দিনই একমাত্র সন্তান।আর নানাবাড়ির দিক দিয়ে মিতালি বেগম আর তার একজন ভাই আছেন যার নাম ইরফান রহমান।তার স্ত্রীর নাম সবিতা রুকসানা।তাদের একজন মেয়ে এবং একজন ছেলে আছে।মেয়ের নাম ওয়ারিজা রহমান আনায়া আর ছেলের নাম ওয়াজিহার রহমান আদিল।রুদ্ভিকার দাদা-দাদী বহু বছর আগেই মারা গিয়েছে আর নানী মারা গিয়েছে কিছু মাস হলো তবে নানা এখনও জীবিত।রুদ্ভিকার বাবা একমাত্র সন্তান হওয়ায় বাবার সব সম্পত্তিই তার নামে।তাই তারা মোটামুটি বেশ সচ্ছল!)

বিরক্তিভরা মুখ নিয়ে বাড়ি ঢুকতেই কোমল হয়ে গেলো এরিকের মুখ!বহুদিন পর সোফার উপর বসে থাকা এই দুনিয়ার সবচেয়ে আপন দুই ব্যক্তিকে দেখে তার চোখ জুড়ালো!কিশোরী এক রমণী দৌড়ে এসে জাপ্টিয়ে ধরলো ভাইকে।ভাইও পরম আবেশে বোনকে বুকে আগলে নিলো!সোফার থেকে উঠে ভাইয়ের কাছে আসতে আসতে এরিদ বলে উঠলো-

“আমাকে কেউ দেখেই না!আজ বড় বলে এমন ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে জড়িয়ে ধরতে পারলাম না”।”
এরিক এবার ভাইয়ের মাথায় ছোট্ট করে একটা টোক্কা মারলো!তখন তার মুখ থেকে আফরিন মাথা তুলে এরিদকে বললো-
“হয়েছে তোমার নাটক ভাইয়া?”
এরিদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই এরিক বলে উঠলো-
“আমাকে কি একটু বসতে দিবি তোরা নাকি এভাবেই থাকবো?”
আফরিন ভাইয়ের হাত ধরে টেনে তাকে বসাল।ঘাম মুছতে মুছতে বললো-
“তোমার জন্য সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি
রেডি হয়ে।এবার চলো!জানি আমেরিকার থেকে মাত্র এসেছো।চলো জটপট পাত্রীটা দেখে আসি।দুই বাড়ি পরেই তাদের বাড়ি!”

এরিক কিছু বলতে যাবে তার আগেই দুই ভাইয়ের হাত ধরে টানতে টানতে তাদের নিয়ে হাটা শুরু করলো আফরিন!সারা রাস্তা সে পকপক করছে আর দুইভাই শুনছে কেবল।দুটি বাড়ি পিছনে বলে আনলেও প্রায় ৮ টা বাড়ি তাদের অতিক্রম হয়ে গিয়েছে!
পাত্রীর বাড়িতে আসতেই দেখলো বাড়ির গেইটের সামনে আদিল দাড়িয়ে।এরিক আর এরিদ উভয়েই অবাক হলো আদিলকে দেখে।এরিক বলে উঠলো-
“কেমন আছিস আদি?তোকে বললাম আজ আমার সাথে আসতে।অথচ তুই দেখি আগেই পাত্রীর বাড়িতে উপস্থিত।চিনলি কি করে এই বাড়ি?
আদিল যেনো এবার বুঝলো মেহেরকে দেখতে আসা পুরুষটা তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুই!তবে নিজের অস্বাভাবিকতাকে লুকিয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বললো-

“এতোদিন পর তোর দেখা পেলাম।দেশে এসেই পাত্রী দেখতে এসে পড়েছিস।বিয়ের এত্তো তাড়া কেন বন্ধু?”
পাশ থেকে এরিদ উত্তর দিলো-
“তাড়া ভাইয়ার না,তাড়া হলো ভাইয়ার ভ*ণ্ড বোনের!সেই ভাইয়াকে বিয়ে করানোর জন্য এমন উঠে পড়ে লেগেছে।ভাইয়া তো তোমার মতো সন্যাসী থাকারই পণ করে নিয়েছিলো!”
আফরিন বলে উঠলো-
“কিন্তু আদিল ভাইয়া আপনি এখানে যে?”
আদিল মুচকি হেসে চোখ নামিয়ে বললো-
“আজ আমার মামাতো বোনকে দেখতে আসবে তাই আনায়া এসেছে।আনায়াকেই এগিয়ে দিতে এসেছিলাম।তবে এখন বুঝলাম শর্টকাট এসে পড়েছি আমি বন্ধুর পাত্রীর বাড়িতে!”
এরিক-“তাহলে চল ভিতরে যাওয়া যাক!”

এরিদ-“বোনের জন্য আনা পাত্র এবং তার পরিবারকে এভাবে বাহিরে দাড় করিয়ে রাখাটা ঠিক হলো না কিন্তু আদিল ভাই!”
আফরিন আদিল গেইট খুলতেই এরিককে ধরে ভিতরে নিয়ে গেলো।পেছন থেকে এরিদ বলে উঠলো-
“আমাকে কে নিবে ভাই?”
সে দৌড়ে ভাই-বোনের কাছে চলে গেলো।পেছন থেকে আদিল অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে রইলো!সে এখানে আনায়াকে এগিয়ে দিতে নয় বরং অন্য কাজে এসেছিলো!তার ধ্বংসের শুরু নিজ চোখে দেখতে এসেছিলো!অতঃপর সেও বাড়ির ভিতরে ঢুকলো!

(মিজান ইউহানের প্রথম সন্তান আদ্রিয়ান ইউহান এরিক,দ্বিতীয় সন্তান আবরার ইউহান এরিদ,তৃতীয় সন্তান এলিনা ইউহান আফরিন।বাবা-মা মারা গিয়েছে আফরিনের নবম জন্মদিনে কার-এক্সিডেন্টে!সেই থেকে দাদু বড় কিরেছে তাদের।তিনবছর আগে তিনি মারা গিয়েছেন।২৯ বছর বয়সী এরিক একজন অত্যন্ত বড় ডাক্তার।কাজেই তাকে আমেরিকাও যেতে হয়।দেখলে মনে হবে ভিনদেশী পুরুষ।সবুজ চোখের মনি।মুলত এই চোখ পেয়েছে মায়ের থেকে।ধুসর রঙের চুলও পেয়েছে মায়ের থেকেই।তার মা ছিলো আমেরিকান আর বাবা বাংলাদেশী।লম্বা সুঠামদেহী সাদা বর্নের এক সুদর্শন পুরুষ।২৬ বছর বয়সী এরিদ বর্তমানে দাদুর রেখে যাওয়া বিজনেস সামলাচ্ছে!বর্ননা দিক দিয়ে সে পুরোপুরি এরিকের মতো তবে উচ্চতা এরিকের থেকে ২ ইঞ্চি বেশি এবং তার চোখের রঙ বাদামি বর্ণের,গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের,তার বাবার চোখ ও রঙ পেয়েছে।২১ বছর বয়সী আফরিন এবার এইচএসসি দিয়েছে।গায়ের রঙ মায়ের চেয়েও উজ্জ্বল।শরীরে টোক্কা দিলেই রক্তের মতো লাল হয়ে যাবে এমন অবস্থা!বর্তমানে দুই ভাইয়ের বেশ ভালো অবস্থা। বেশ বড়লোক দু’জন।বাবার এবং দাদার উভয়ের সম্পত্তি সহ নিজেদের সম্পত্তি মিলিয়ে বেশ ভালো অবস্থা তাদের।একমাত্র বোনকে মাথার তাজ বানিয়ে রেখেছে দু’ভাই।অন্যদিকে আদিল হলো এরিকের সেই ছোট্ট বেলার বন্ধু।ভাগ্যক্রমে কলেজ,ইউনিভার্সিটি,স্কুল সব জায়গায় একই সাথে থেকেছে।তাদের বন্ধুত্বের প্রায় দুই যুগ!এরিকের বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ গুলো সে অবশ্যই আদিলকে তার পাশে রাখে।আদিলও তাই করে।আজও এরিক আদিলকে নিয়ে এসেছে তবে এসে দেখে তার পাত্রীর স্বজন আদিল।এরিক এবং আফরিনও আদিলকে বড় ভাইয়ের মতোই শ্রদ্ধা করে এবং ভালোবাসে।আদিলের বাসায় অহরহ আসা যাওয়া হতো আগে এরিকের তবে এখন খুব কমই যায়!বলতে গেলে যাওয়াই হয় না কাজের জন্য)

কলিংবেলের শব্দ শুনে আনায়া এলো দরজা খুলতে।দরজার সামনে দাড়ানো পুরুষটাকে দেখে সে যেনো হতভম্ব।দীর্ঘ ৯ মাস পর পুরুষটাকে দেখছে।সামনের পুরুষটাকে দেখে নির্বাক সে।তার ডাক্তার সাহেব এসেছে।আনায়া যেনো নিস্তব্ধ চোখে এরিককেই দেখছে।তখন আফরিন একটু উচ্চস্বরেই বলে উঠলো-
“আনায়া আপুউউউউউউ।কতোদিন পর তোমার দেখা পেলাম।কেমন আছো আপু?”
আনায়ার যেনো এবার হুশ ফিরলো।সে এরিকের থেকে চোখ ফিরিয়ে আফরিনের দিকে তাকালো।সে তাকে জড়িয়ে ধরলো!ভালো-মন্দ জিজ্ঞাসা করলো।আনায়া আফরিন আর রুদ্ভিকাকে ছোটবেলার থেকেই নিজের ছোট বোনের মতোই স্নেহ কিরেছে এবং তারাও আনায়াকে বড় বোনের মতোই শ্রদ্ধা করে!এরিদ পিছন থেকে বলে মজা করে বলে উঠলো-

“পাত্রপক্ষ কে এভাবে দরজার সামনে দাড় করিয়ে রাখাকে কি আমরা বলতে পারি যে মেয়ে বিয়ের জিন্য রাজি নয় তাই আগেই আমাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে ঘরে না ঢুকিয়ে?”
তখন আনায়া বলে উঠলো-
“তুমি বদলাওনি এখনো।আসো ভেতরে আসো!”
দু’জনই মুচকি হাসলো!পিছনে আদিলকে দেখে আনায়া বলে উঠলো-
“তুমি না কার সাথে পাত্রী দেখতে যাবে?তবে এখানে যে!?”
আদিল মলিন মুখে বলে উঠলো-
“পাত্রী দেখতেই তো আসলাম”

আনায়া যেনো বুঝলো বা!ভ্রু কুচকে সে এরিদের দিকে তাকালো।এরিদ বলে উঠলো-
“আরে তোমার মামাতো বোনই তো পাত্রী”
আনায়ার হৃদয়টা যেনো একটা ধাক্কা খেলো।সামলে নিলো মেয়েটা নিজেকে।’অহ’ বলে চলে গেলো মেহেরের কাছে।রুদ্ভিকা আনায়ার মলিন মুখটার দিকে তাকালো।
রুদ্ভিকা-“কি হয়েছে আপায়?”
আনায়া-“আমার খারাপ লাগছে রুদ।তুই মেহেরকে নিয়ে যা।আমি আসছি পরে!”
রুদ্ভিকা-“খারাপ লাগলে শুয়ে থাকো আপায়।আমি চন্দ্রফুলকে নিয়ে যাবো”
রুদ্ভিকা চলে যায় মেহের কাছে।আনায়া বিছানায় শুয়ে থাকে।আপাতত তার মনের ঝড় কমানো উচিত।

রুদ্ভি-“চন্দ্রফুল এসে পড়েছে তারা।আম্মু বলেছে নিয়ে যেতে তোমাকে।”
মেহের নিঃশব্দে উঠলো।ঘোমটাটা ঠিকঠাক করে সে পা বাড়ালো।রুদ্ভিকা বোনের পাশেই হাটছে।
পাত্রপক্ষের সাথে বসে মিতালি আর তার স্বামী আলাপ-আলোচনা করছে।আদিল চুপচাপ বসে আছে।আফরিন বকবক করেই যাচ্ছে আর এরিদ তাকে চোখ রাঙাছে বারবার!মেহেরকে আনা হলো!সে এখনও মাথা নিচু করেই রেখেছে।এরিক এখনো চোখ তুলে তাকায়নি কারণ তাকে একপ্রকার জোর করে আনা হয়েছে।মেহেরের পিছু পিছু রুদ্ভিকাও এসে দাড়ালো।এরিদ খোচা মেরে ভাইকে বললো-
“লজ্জা পাচ্ছো কেন?তাকাও আমার সাথে তুমিও তাকাও!তুমি পাত্রী দেখো আর আমি ভাবিকে দেখি একবার তাকাও তো!”

মিতালি-“আমার বড় মেয়ে মেহের!”
রুদ্ভিকাকে উদ্দেশ্য করে বললো-
“রুদ্ভি তোমার আপায়কে বসাও এখানে”
এরিক,এরিদ,আদিল তিনজন-ই একসাথে চোখ তুলে তাকালো।
তিনজনেরই পৃথিবী যেনো থমকে গেলো!তাদের হৃদস্পন্দন এতো দ্রুত চলছে যে তারাও এটা উপলব্ধি করতে পারছে!

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৩+৪