দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ২১+২২
আনায়া আফরিন
ফারাজ বসে আছে করিডোরের বাহিরে।পাইচারি করছে ব্যস্ত পায়ে।সুক্ষ্ণ ব্যাথা অনুভব করছে বুকে।ডাক্তার সময় দিয়েছে ২৪ ঘন্টার মধ্যে আনায়ার জ্ঞা*ন ফিরলে ভালো আর না হয় আল্লাহর হাতে সব।আদিল এটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।রুদ্ভিকার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।সে প্রার্থনা করছে আল্লাহর কাছে তার বোন যেনো সুস্থ হয়ে যায়।কিন্তু ইতোমধ্যে ১৯ ঘন্টা পেরিয়ে গিয়েছে।ফারাজের মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে।মিনিট দশেক পর একজন নার্স বেরিয়ে বললো-
“পেশেন্টের জ্ঞা*ন ফিরেছে।দেখা করতে চাইলে করতে পারেন তবে পেশেন্টকে বেশি উ/ত্তে/জি/ত করবেন না।তার ক্ষ*ত পুরোই কাচা কিন্তু!”
এটা বলে নার্সটা চলে গেলো।ফারাজ দিক বেদিক ভুলে দ্রুত ভিতরে ঢুকে গেলো।আদিল জানতো এমন কিছুই হবে তাই অবাক হলো না।তার বোনের জ্ঞা*ন ফিরেছে এটা ভেবেই তার আত্না ঠান্ডা হলো।রুদ্ভিকা ফারাজের এহেন আচরণে অবাক হলেও বোনের জ্ঞা*ন ফেরাতে।নজর গেলো তার।এরিক-এরিদ আফরিনের কাছেই এখন।
কারো উপস্থিতি অনুভব করতেই আনায়া আলতো করে ঘাড় ফেরালো।অনাকাঙ্ক্ষিত এক পুরুষকে দেখে ইবাক হলো।সে ভেবেছিলো বেচে গেলে যদি চোখ মেলে কাউকে দেখে তাহলে নিশ্চয়ই এক পাশে বাবা আর অপ্র পাশে ভাই হবে কিন্তু ফারাজকে দেখে সে বড্ড অবাক হলো।বোকা মেয়েটা জানে না তার বাবা-ভাইয়ের পাশে যেই ছেলেটি তার অনুপস্থিতিতে না ঘুমিয়ে রাত কেটেছে,উন্মাদের মতো তাকে খুজেছে সেটা ফারাজই।আদিলের সাথে অশ্রু বিসর্জন করা পুরুষটা এই ফারাজ ছিলো।আদিল ভাই হিসেবে উন্মাদ হচ্ছিলো,ইরফান সাহেব বাবা হিসেবে মেয়ের জন্য কাতরাচ্ছিলেন কিন্তু ফারাজ জানে না তার এমন অস্থিরতার কারণ কি ছিলো।বন্ধুর বোন বলেই?কোথায় আফরিনও তো বন্ধুর বোন তবে আনায়ার জন্য উন্মাদনা এত্তো বেশি কেন তা ফারাজের জানা নেই।আনায়ার সামনে ধীরে পায়ে এগোলো সে।ভাঙা কণ্ঠে ডাক দিলো-
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“অনু”
আনায়া স্তব্ধ হয়ে গেলো।এমন সুর?এমন সুরে আনায়াকে শেষবার কোন পুরুষ ডেকেছিলো।এরিক তাই না?তার নাম প্রথমবার জানার পর এরিক তাকে অনুই বলেছিলো।তবে সে ডাকে আনায়া কোন কোমলতার ছোয়া পাইনি।ফারাজের ডাকে কি যেনো একটা ছিলো যা আনায়া ঠাহর করতে পারলো না।চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।পরক্ষণেই অনুভব করলো বাকিদের কথা।জিজ্ঞাসা করতেই ফারাজ বললো-
“তারা সবাই ঠিক আছে।সকলে তোমার অপেক্ষায় আছে অনু।”
আনায়া-“আর আফ-আফরিন?”
ফারাজ-“ও আপাতত ঠিক আছে।রিদ আর রিক দুইজনই তার পাশে আছে।”
আনায়ার চোখ জলে ভরে যাচ্ছে।তার ডাক্তার সাহেব এত্তো পা*ষা*ণ কেন?ম/রা/র পথেও একবার বুঝি ডাক্তার সাহেব তাকে দেখতে আসবে না?সে কি এতোই খা/রা/প?সে তো কখনো এরিককে বি/র/ক্তও করেনি তবে এরিক কেন তাকে বারবার এড়িয়ে চলে?কেন তাকে বুঝে না?বোকা মেয়েটা বুঝলো না যেভাবে সে ভালোবাসে এরিককে,তাকেও ঠিক একই ভালো বাসে কেউ।নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
“ভাইয়া কোথায়?বাবা আসেনি?”
ফারাজ-“বাড়িতে কাউকে জানানো হয়নি।তাদের অবস্থা এমনিতেই খারাপ।আর আদিল আসছে!”
এসময় আদিল আর রুদ্ভিকা প্রবেশ করলো।রুদ্ভিকা দ্রুত পায়ে এগোলো।তার পা-তে যে ব্যাথা সেটা সে ভুলেই বসলো।আদিল “আস্তে” যেতে বললো।রুদ্ভিকা এসেই বোনের বুকের উপর ঝাপিয়ে পড়লো।আনায়া দাত খি*চে চোখ বন্ধ করে নিলো।ঘা টাই একটি টান লেগেছে।কিন্তু বোনকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো আলতো করে।রুদ্ভিকা ফুপাচ্ছে।চোখের অশ্রু গুলো লুকাতে গিয়েও ব্যর্থ সে।মাথা উঠাতেই আনায়া বললো-
“এই আমি ঠিক আছি রুদু,তুই কাদিস না।কাদলে তোকে দেখতে মন্দ লাগে।পরে লজ্জায় তো আর আসবিই না আমাদের সামনে।”
এটা শুনে রুদ্ভিকা দ্রুত সোজা হয়ে গেলো।আনায়া মুচকি হাসলো।আদিল এগিয়ে গেলো বোনের দিকে।আনায়া তাকাতেই আদিল বললো-
“ক্ষমা কর আমি তোর আদর্শ ভাই হতে পারিনি।তোর দুঃখের ভার নিতে পারিনি।ভাই ব্যর্থ এ্যানা!”
আনায়া-“এই পৃথিবীতে আমার দেখা সেরা ভাই তুমি।যা ছিলো বা হয়েছে সব ভাগ্য।আমার ভাগ্য অতোটাও ভালো না।পরিবারের দিক থেকে বাদ দিয়ে বাকি সবদিক দিয়েই খারাপ।কিন্তু শুনো ভাইয়া পরের বার একটু আগে যাবে ঠিক আছে।এবার অনেক অপেক্ষা করেছি তোমার জন্য!”
আদিল-“তোকে আর কখনো এই পরিস্থিতির ধারে-কাছেও যেতে দিবো না।”
ফারাজও বলে উঠলো-
“আর এমন হুট করে বেরিয়ে যেয়ো না মেয়ে।তুমি জানো কী অবস্থা হচ্ছিলো আমাদের সবার?”
আনায়া কিছু বললো না।ফারাজকে কেন জানি তার উন্মাদ লাগছে নিজের মতো।ফারাজের চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে ছেলেটা ক্লান্ত।আনায়া ফারাজের মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে।৪ বছর আগে শুনেছিলো বাহিরে থাকতে এরিকের বাইক এ*ক্সি*ডে*ন্ট হয়েছে।প্রচুর ব্লি*ডি*ং হয়েছিলো।তখন আনায়া নিজেকে এই অবস্থায় পেয়েছিলো।তবে সে তো ভালোবাসতো এরিককে,ফারাজ কি বাসে নাকি!সে তো বন্ধুর বোন দেখে এমন উতলা হয়েছে।আনায়া দরজার দিকে তাকাতেই একটি পুরুষ অবয়ব সরে গেলো।আনায়া অবাক হলো।চোখ দিয়ে আবারও নোনাজল গড়াল্প।এবার সে মুচকি হাসলো।মনে মনে বললো-
“কিসের এতো লুকোচু*রি ডাক্তার সাহেব?ভয় পান বুঝি যে আপনার উপস্থিতিতে আরো এলোমেলো হয়ে যাই নাকি?ডাক্তার সাহেব আপনার অনুপস্থিতি আমাকে যতোটা পু*ড়ায় তার থেকে বেশি পু*ড়ায় আপনার এই লুকোচু*রি!আপনি একতরফা প্রেমের দুঃখ বুঝেন না ডাক্তার সাহেব।আপনি বুঝেন না এই প্রেমের জ্বা*লা!”
ঘন্টাখানেক পর সকলে বেরিয়ে গেলো।রইলো কেবল আদিল।আনায়া বললো-
“ভাইয়া অধু আর তার মেয়ে ঠিক আছে তো?”
আদিল-“দু’জন ঠিক আছে।অধরার পা-তে খানিকটা আঘা*ত পেয়েছে এখন বিশ্রাম নিচ্ছে আর তার মেয়ে পুরোপুরো ঠিকা আছে!”
আনায়া-“ভাইয়া একটু আমার কাছে এনে দিবে অধরাকে।”
আদিল বোনের দিকে তাকালো।”না” করতেও পারল্প না তাই চুপচাপ উঠে চলে গেলো।
অধরা শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো।তার মেয়ে উঠেছিলো।এখন আবার ঘুমিয়ে গিয়েছে।যেহুতু রাত এখন তাই।তাকেও যথেষ্ট যত্ন নেওয়া হচ্ছে।রুদ্ভিকা তার সাথেই থাকে এখন।রুদ্ভিকা বসে আছে মুনতাহার পাশে।আদিল এসেই বললো-
“আনায়া তোমাকে দেখতে চায়!”
অধরার ঠোঁ*ট জোড়ায় হাসি ফুটে উঠলো।নিজের ক্ষ*ত ভুলেই উঠে গেলো।ফ্লোরে পা ঠেকাতে গেলে ব্যাথায় পড়ে যেতে নিলে একটা শক্ত হাত তাকে ধিরে নিলো।রুদ্ভিকা দেখে মুচকি হেসে দিলো।আদিল সেকেন্ড দেরি না করেও অধরাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বললো-
“পা-য়ের কি অবস্থা দেখেছো?আগেই উঠতে যাও কেন?হুইল চেয়ার এনেছে সেটায় বসে যাবে!”
অধরা আদিলের এমন গম্ভীর কথায় বসে রইলো মুখ ঘুরিয়ে।কিছুক্ষণ পর একটি হুইল চেয়ার এনে বসিয়ে দিলো অধরাকে।আদিল এবার স্পর্শ করেনি।নার্সের সাহায্যে বসিয়েছে।অধরার বড্ড খারাপ লাগলো।নিজের ভাগ্যের প্রতি তার হাসি পেলো।সে যা ভালোবাসে সেটাই কেন তার হয় না?ভাগ্যকে মেনে নিলো সে এখন।আনায়ার কাছে গেলো সে।রুদ্ভিকার কাছে মুনতাহাকে রেখে গেলো!
অধরা হুইল চেয়ারে করে আসলো আনায়ার কেবিনে।আদিল পিছু পিছুই আসছিলো।ভিতরে যাইনি।বাহিরেই বসেছে সে।ফারাজ আফরিনকে দেখতে গিয়েছে।কেবিনে আপাতত অধরা আর আনায়াই আছে।অধরা আসলো আনায়ার সামনে।আনায়া অধরাকে জিজ্ঞাসা করলো-
“ঠিক আছিস তুই?”
অধরা-“তোকে এই অবস্থায় দেখে মন পুড়ছে।দেহ ঠিক আছে!”
আনায়া-“মন তো তোর কতো কারণেই পুড়ে!আচ্ছা মুনতাহা কোথায়?”
অধরা-“রুদ্ভির কাছে।”
আনায়া:”এখন বল সেদিন হঠাৎ করে আমাদের ছেড়ে যাওয়ার কারণ কী ছিলো অধরা?”
অধরা নিশ্চুপ।আনায়া আবার প্রশ্ন করতেই অধরা বললো-
“ভাইয়ার কাছে চলে যেতে ইচ্ছে করছিলো তাই!”
আনায়া এবার গম্ভীর গলায় বললো-
“ভাইয়ার কাছে চলে যাওয়ারও একটা কারণ ছিলো?বল কি?আমার সামনে মিথ্যা বলিস না।তুই এখনও আগের মতো।চোখ দেখলেই বোঝা যায় তোর কোনটা মিথ্যা আর কোনটা সত্য!”
অধরা এবার তাচ্ছিল্যের সুরে বললো-
“সবাই চোখের ভাষা বুঝে না।তুই কাছের তাই বুঝে ফেলিস!”
আনায়া এবার মুচকি হেসে দিয়ে বললো-
“আচ্ছা এখন বল কি ঘটলো এই চার বছরে?”
অধরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা শুরু করলো-
“যখন জানতে পারলাম যারে আমি এত্তো ভালোবাসি সে আমার প্রাণপ্রিয় বান্ধুবী রে ভালোবাসে তখন সইতে পারলাম না আর।চেষ্টা করেছি থাকার পারিনি আমি।মেহুর মুচকি হাসি,আদিল ভাইয়ের যত্ন সব আমায় গুড়িয়ে দিচ্ছিলো।আমি সেই মহান একতরফা প্রেমিকা ছিলাম না তখন যে কিনা তার ভালোবাসার মানুষ অন্য কারো সাথে সুখী আছে এটা ভেবে শান্তি পেতো।ছোট থেকে যা চেয়েছি পেয়েছি,যেটা পাইনি সেটা আমার চোখের সামনে কখনো অন্যের হয়নি তাই এ বিষয়ে অভ্যস্ত নয়।যখন ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছিলাম তখন সিদ্ধান্ত নিলাম এই শহর ছেড়ে চলে যাবো।আধার ভাই যেহুতু ঢাকা থাকতো এবং সেখানে তার নিজস্ব ফ্ল্যাট কিনেছে সেখানেই যাবো ভাবলাম।আম্মু আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না,আম্মু সঙ্গে গেলে আব্বুর খেয়াল কে রাখবে এটা ভেবে তিনজনই রওনা দিলাম।এই শহরে আর কখনো ফিরবো না বলে চলে গেলাম!”
অধরা এতোটুকু বলে শ্বাস ফেললো।আনায়া শুনলো চুপচাপ।অধরা আবার বলা শুরু করলো-
“জানতাম না সেদিন আমার এই সিদ্ধান্তেই আমি একদিন সব হারাবো।সেখানে যাওয়ার পর আধার ভাইয়ের ঠিকানায় গেলাম।সব তখনও ঠিক ছিলো কেবল আমার মনটাই উদাস ছিলো।দরজা খুললো একজন রমণী।দুধে-আলতা গায়ের রঙ তার।কোলে একটা ৯ মাসের শিশু।আমরা অবাক হলাম যে ভুল ঠিকানায় এসে পড়লাম নাকি।তখনই রুম থেকে আধার ভাই বেরিয়ে আসলো।বাবা-মা পুরোই হতবাক।আমি তখনও জানি না কি হচ্ছিলো।আধার ভাই আমাদের দেখে অবাক হয়ে গেলো।দ্রুত সবাইকে ভিতরে ঢুকালো।আধার ভাই স্তব্ধ হয়ে আছে।মেয়েটি নিজের কোলের শিশুটিকে রুমে শুইয়ে দিয়ে আসলো।এসে আধার ভাইয়ের পাশে দাড়ালো।ভাইয়া তখন বলে উঠলো-
“এটা আমার মা-বাবা তোহা।আর আমার বিদ্যাশ্রী।আমার ছোট্ট বোন।”
আমি তখন ভাইয়ের সাথে লেপ্টে দাড়িয়ে ছিলাম।তোহা নামের মেয়েটি বাবা-মাকে সালাম দিলো।তারা উত্তর দিলো।মা মেয়েটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতেই ভাইয়া বললো-
“আমার স্ত্রী এটা।তিন বছর হয়েছে বিয়ে করেছি আমরা!”
ব্যস এতোটুকু শূনেই বাবা সপ্তম পর্যায়ে রেগে গেলেন।বাবার রাগ বরাবরই বেশি।উচ্চস্বরে ধমক দিয়ে বললেন-
“বিয়ে করেছো সিদুর নেই কিছু নেই?আর এতো বছর হয়ে গেলো আমাদের জানাওনি কেন?’
আধার ভাই তখন বলেছিলেন-
“কীভাবে জানাবো বুঝিনি বাবা।আর বাবা ও মু-মুসলিম।তাই সিদু-”
কথা শেষ করার আগেই বাবা সজো*রে ভাইয়ার গালে একটা চ*ড় দিলেন।আমি কেপে উঠলাম কারণ জন্মের পর বাবার এই রু*প আমি প্রথম দেখছি।ভয়ে পিছিয়ে গেলাম আমি।তোহা ভাবি মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে।মা বাবাকে আটকালেন।ছেলের দিকে তাকিয়ে মা করুণ স্বরে বললেন-
“বাবা বিয়ে করলি তাও আবার মুসলিম মেয়েকে।আমাদের জানাতেও তো পারতি বাবা!”
ভাইয়া তখন মাথা নিচু করে বলেছিলো-
“মা আমিও মুসলিম……..”
মা কথা থামিয়ে দিলো ভাইয়ার।বাবা তখন আমার হাত ধরে বললেন-
“চল অধরা।এই বাড়িতে আর এক মিনিটও নয়।আরেকটু দুরেই তোর এক চাচার বাসা আছে।সেখানে আজ রাত থেকে কাল অন্য বাড়িতে উঠবো।অধরা ভাইয়ের দিকে ছলছল দৃষ্টিতে তাকালেন।মা-ও নিশ্চুপ।কিছু বললেন না।ভাইয়া তখন দ্রুত বাবার সামনে এসে ঝুকে বললো-
” বাবা ক্ষমা করো আমায়।আমি তোহাকে ভীষণ ভালোবাসি বাবা।ওকে ছাড়া ম*রে যেতাম বাবা।তাই ওকে বিয়ে করেছি বাবা।তোমার ছেলের ঘর থাকতে তুমি কেন ভাইয়ের ঘরে থাকবে বাবা?আমার বোন,বাবা-মা সবাই এইখানেই থাকবে!”
বাবা তখন উচ্চস্ব*রে ধমক দিয়ে বলেছিলেন-
“এই ছেলের বাড়িতে আর একমুহুর্তও নয়।”
মা বাবাকে শান্ত করতে আসলে বাবা বলেন-
“তোমার ইচ্ছা হলে থেকে যাও তুমি।আমি আর আমার মেয়ে চলে যাবো।তুমি আজ থাকলে আর কখনো ফিরে আসবে না!”
মা আমার মুখের দিকে তাকালেন আবার আধার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালেন।ভাইয়ার কাছে গিয়ে মা বললেন-
“বাবা অন্যা*য় করেছিস তো তাই একটু রেগে আছে তোর বাবা।শান্ত হলে দেখবি ঠিক ফিরে আসবে।”
আধার ভাইয়া ছলছল দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।তোহা ভাবি তখন দ্রুত বাবার সামনে এসে বললেন-
“বাবা উনাকে ক্ষমা করুন বাবা।সব দো*ষ আমার।আপনারা বরং আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করিয়েন বাবা।তবুও যাবেন না এই বাড়ি থেকে।সে অনেক কষ্ট পাবে।সে যে আপনাকে অনেক ভালোবাসে বাবা।”
বাবা কিছু না বলে মুখ গম্ভীর করে বেরিয়ে গেলেন।মাও চোখে অশ্রু নিয়ে বেরিয়ে গেলো।আমি ভাইকে জড়িয়ে ধরলাম।ভাইয়ার রুমে গিয়ে সেই ছোট্ট আদুরে শিশুটিকে একটু আদর করে আসলাম।দেখলাম মুখের গঠন পুরো ভাইয়ার মতো আর শরীরের রঙ পুরো ভাবির মতো।আলতো করে চু*মু দিয়ে বেরিয়ে গেলাম।তারপর সেদিন ভাইয়ার বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর চাচার বাসায় এক রাত কাটালাম।একটা নতুন বাসা জোগাড় করলো বাবা।সেখানেই থাকতে লাগলাম।নতুন ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম।বাবা ভাইয়ার সাথে সকলের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন।আমি ভার্সিটি যাওয়ার পথে মাঝে মাঝে লুকিয়ে ভাইয়ার সাথে দেখা করে আসতাম।কখনো কখনো মুনতাহাকে সঙ্গে নিয়ে আসতাম।এমন এক দিন সকালে আমি গেলাম ভাইয়ার বাসায়।
ভাবি তখন নাস্তা বানাচ্ছিলো।আমি যেতেই সে প্রতিবারের মতো জো*র করে টেবিলে বসালো খাওয়ার জন্য।মুনতাহাকে আমার কোলে দিলো।ভাইয়া তখন অফিস যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে।ভাবি আমাকে খাইয়ে দিলো।অন্যদিন এই বাসায় আসলে ভাইয়া-ই আমাকে এগিয়ে দিতো ভার্সিটিতে।সেদিন ভাইয়া আগে বের হয়ে গেলো।শীতকাল ছিলো।ভাবলাম মুনতাহার জন্য কিছু জামাকাপড় কিনবো।মা জানতো আমি আসি এখানে তাই নাতনির জন্য লুকিয়ে বহু জামা-কাপড়,আর ভাইয়া-ভাবির জন্য পিঠা পাঠিয়েছেন।ভাবি সেগুলো দেখে মহা খুশি।মুনতাহা ঘুরতে পছন্দ করতো।আমি বলতেই মেয়েটা হাত-পা লাফিয়ে ছোটাছুটি করতে শুরু করলো।ভাবি তাকে রেডি করে দিয়ে আমার কোলে দিলো।বের হয়ে এলাম আমি।তারপর…..”
অধরার ঢোক গিললো।কেদে দিবো এমন অবস্থা।আনায়া অবাক হয়ে সবটা শুনলো।কতো কিছু হয়ে গিয়েছে।তার জন্য আনা পানিটা সে অধরাকে দিলো।অধরা সেকেন্ডেই পানিটা শেষ করে মাথা গুজে করে বসে রইলো কিছুক্ষণ!আনায়া আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।বললো-
“তারপর….তারপর কী?”
অধরা বলা শুরু করলো-
“ভার্সিটিতে যায়নি আমি সেদিন।বিকেল পর্যন্ত মুনতাহাকে নিয়ে ঘুরেছি আমি।তারপর তাকে পার্কে নিয়ে গিয়েছিলাম।সন্ধ্যা হওয়ার পর তাকে বাসায় দিতে এসে দেখলাম…..
দেখলাম পুরো বিল্ডিং এ দাউদাউ করে আগুন জ্ব*ল*ছে।ভাবলাম ভুল বাড়ি নাকি।মুনতাহা তখন গলা ফাটয়ে সে কি কান্না।আমি তাকে শান্ত করাতে লাগলাম।দূর থেকে দেখলাম তখন মা গলা ফাটিয়ে “আমার আধার” বলে কাদছে।পাশেই একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে কাদছে আর বলছে “হে আল্লাহ আমার ত্বোহা কে ফিরিয়ে দাও।”?আমি যেনো শরীরের সব শক্তি হারিয়ে ফেললাম।পা দুটো অ*চ*ল হয়ে যাচ্ছিলো।আমি ধীর পায়ে মা-র কাছে গেলাম।মা আমাকে দেখে কান্না করতে বললেন-
“মা-রে আমার আধার।আমার আধার এটার ভিতরে মা।ঈশ্বর আমার আধারকে বাচাও ঈশ্বর।”
নাতনির কান্নার আওয়াজ শুনে মা দ্রুত উঠে মুনতাহাকে কোলে নিলেন।কাদতে কাদতে বললেন-
“আমার সন্তানের অংশ।একমাত্র অংশ।হে ঈশ্বর এই ফুলের দিকে তাকিয়ে হলেও তুমি আমার ছেলে আর বউমাকে ফিরিয়ে দাও।”
আমি বসে পড়লাম সেখানে।পা আমার অচল হয়ে পড়লো।আমার আধার ভাই এই আ*গু*নের ভিতর।আমার ভাবিও।আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো।বাবাকে খুজলাম।দেখলাম কোথাও নেই।আ*গু*ন নিভানো হলো।ঢাকা শহরের বড় বিল্ডিং গুলোর মধ্যে এটা একটা ছিলো।অজস্র লা*শ উদ্ধার করা হলো।কেউ বেচে নেই।দু’তিন জনের প্রাণ একবারেই নিভু নিভু।আমি স্তব্ধ হয়ে দেখলাম সব।সর্বশেষে বেরিয়ে এলো দুটো দেহ।একজনের শরীর দেখার মতো।আরেকজনের চেহারার কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে।জানা গেলো ১৩ তালার বা পাশের ফ্ল্যাট থেকে এদের উদ্ধার করা হয়েছে।দুজন একই পাশে বসা ছিলো।তাদের হাতের বাধন এখনও অটুট।একজন শ্বাস একবারেই নিভু নিভু।মা দৌড়ে সেখানে গেলো।তারপর মা জ্ঞা*ন হারালো।মা আর সেই দুটো দেহ নিয়ে হাসপাতালে গেলাম আমরা।সঙ্গে ভাবির পরিবার ছিলো।এ্যাম্বুলেন্সে ভাইয়ার মাথার পাশে আমি ছিলাম।মুনতাহা আমার কোলে তখনও কাদছে।ভাইয়ার জ্ঞা*ন তখনও ছিলো।আমি তার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।ভাইয়া আমাকে দেখতেই বললো-
“বিদ্যাশ্রী”
আমি উন্মাদের মতো বললাম-
“হ্যাঁ ভাইয়া!”
ভাইয়া কি কষ্ট করে বললো-
“আমি ম*রে গে-লে বাবা-মা স-সহ আমার মে-মেয়েটাকে দেখিস!আর আমার ক*ব*র যেনো ত্বো-ত্বোহার পাশে হয়।”
ব্যস এতোটুকু বলার জন্যই বোধহয় তার নিঃশ্বাসটা আটকে ছিলো।তারপর ভাইয়া চলে গেলো।ভাবির হাত ধরেই পারি দিলো দুইজন ওপারে।সেদিন আমি কাদলাম।পুরো এ্যাম্বুলেন্স-এ আমার আর মুনতাহার কান্না মিশে গেলো।হারিয়ে ফেললাম ভাইকে।তাদের ক*ব*র দেওয়া হলো এক সাথে।ভাইয়া যেহুতু মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছে তাই তাকে সেভাবেই ক*ব*র দেওয়া হলো।দিয়েছে ভাবির পরিবারই।কেটে গেলো সেদিন এই বিরহে।আমি স্তব্ধ।মাও অসুস্থ হয়ে গেলো।পরেরদিন…..পরেরদিন জানতে পারলাম বাবা ছেলের এই খবর শুনে অফিস থেকে আসতে নিলে এ*ক্সি*ডে*ন্ট করেছেন।স্পট ডে*ড হয়েছে।ব্যাস নিজের ভাগ্য মেনে নিলাম।এই পর্যন্তই শেষ নয়।ওইযে একটা মা ছিলো না?মা টাও আমাকে রেখে পালালো।
ছেলে-স্বামীর শোক সইতে না পেরে চতুর্থ দিনে ছেড়ে চলে গেলো মানুষটা।পা*ষা*ণের মতো সবাই চলে গেলো।চারদিনে কী আমি কী হয়ে গেলাম।বুকে তখন পড়ে রইলো মুনতাহা।মনে পড়লো আমার ভাইয়ের কথা।এটাই আমার সব এখন।ওকে ঘিরে বাচতে হবে আমার।তাই বাবার যা ছিলো সব স্মৃতি নিয়ে গেলাম সিলেট দাদা বাড়িতে।চাচাদের রুপ দেখে আর থাকতে ইচ্ছে করলো না।বাবা যতোটুকু গড়েছে তা দিয়ে চললাম।তারপর পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করে কোনরকম কাটছিলো মুনতাহাকে নিয়ে জীবন।এটাই চার বছরের কাহিনি।পরিবার হারানোর পর যেই দুনিয়া দেখেছি সেই দুনিয়া বড্ড নিষ্ঠুর অনু।সেই দুনিয়ার কথা আর বলতে চাইনা আমি।”
আনায়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।মেয়েটা এতোকিছু সইলো কি করে।তার ইচ্ছে হলো অধরাকে একটু বুকের সাথে মিশিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে।কিন্তু ক্ষ*তের জন্য পারলো না।অধরা মাথা নিচু করে আছে।চোখ দিয়ে তার পানি পড়ছে।আনায়া আলতো হাতে জল মুছে দিলো।জিজ্ঞাসা করলো-
“এতোদিন পর এই পাষাণ শহরে তোর আগমণ?আর তারা তোদের ধরলোই কীভাবে?”
“যেই চাকরি করতাম সেটারই এদিকে ট্রান্সফার হয়েছে।অন্য চাকরি পেলে সেখানেই থেকে যেতাম।তবে এখন যেহুতু আমার আরো একটা প্রাণ আছে তাই তাকে চালাতেই আবার এই পাষাণ শহরে আগমন ঘটলো।রাস্তায় জ্যাম ছিলো বিধায় আসতে রাত হয়ে গিয়েছিলো।গাড়ি খুজছিলাম মেয়েকে নিয়ে।ভেবেছি দ
সেদিন কোন এক আত্নীয়ের বাসায় থেকে পরের দিন চলে যাবো।গাড়ি নিতেই দেখলাম লোকটা অসুবিধার।বহুদিন পর এই শহরে আসায় সব ভুলে গিয়েছি নির্দিষ্ট কিছু স্থান ছাড়া।আর সেই জন্যই অপ*হর-ণকারী সহজেই আমাদের ধরে নিলো।তারপর দেখলাম তোদের!”
আনায়া তার দিকে তাকিয়ে বললো-
“এতো কিছু হলো পাখি একবার বলতি?সব ছেড়ে আমি তোর কাছে যেতাম।জানিস মেহু,আমি,রুদু তোকে কতোটা মিস করেছি প্রতিনিয়ত।খুজেছি আমি আর মেহু তোকে।তোদের বাড়ির সব ভাড়াটিয়ার জিজ্ঞাসা করেছি,তারা বলেছে তোরা এই বাড়ি বি*ক্রি করে চলে গিয়েছিস।এক বার বলতে পারতি আমাদের।একজনের প্রতি অভিমান করে আমাদের ছেড়ে চলে গেলি?”
বিদ্যাশ্রী তাচ্ছিল্যের সুরে বললো-
“আমি একজনের উপর অভিমান করে তোদের ছেড়ে চলে গিয়েছি।আর দেখ আমার পরিবার কী করে আমায় ছেড়ে চলে গেলো।আমারও কিন্তু তোদের কথা অনেক মনে পড়তো অনু!”
আনায়া-“বুঝেছি পাখি।”
অধরা-“এখন বল তোর সেই ডাক্তার সাহেবের কী খবর?পেলি তাকে নাকি এখনও দেখিসই নি?”
আনায়া এবার মুচকি হেসে বললো-
“হ্যাঁ দেখেছি তো তাকে।সেই কবে দেখেছি।অন্য কারো পাশেও দেখে ফেলেছি!”
অধরা অবাক হয়।জিজ্ঞাসা করে-
“অন্য কারো পাশে মানে?”
আনায়া-“আমার ডাক্তার সাহেব এখন অন্য নারীর স্বামী।জানিস আমি ঠিক যেভাবে চেয়েছিলাম সে আমায় ভালোবাসুক ঠিক সেভাবেই সে তার প্রিয় নারীকে ভালোবাসে।সুন্দর না?”
অধরা যেনো অবাকের চুড়ান্ত পর্যায়ে।কতো কী হয়ে গেলো?আনায়া কী কিরে এটা মেনেছে।ও তো ডাক্তার সাহেব বলতে প্রায় পা*গ*ল ছিলো।জিজ্ঞেস করলো-
“কে সেই নারী?”
আনায়া এবার বিদ্রুপ হেসে বললো-
“তোর বেলায় যে ভাগ্যবতী ছিলো,আমার বেলায়ও সেই নারীই ভাগ্যবতী।”
অধরা ভ্রু কুচকে বোঝার চেষ্টা করলো।বুঝতেই তার চোখজোড়া বড় হয়ে গেলো।বিস্মিত স্বরে বললো-
“মে-মেহের?”
আনায়া-“হ্যাঁ”
অধরা-“তাহলে আ-আদিল ভাই?তা-তার কি হলো?”
আনায়া-“ভাইয়া-ই কি বুঝে জানি মেয়েটাকে না করছে।যদিও মেয়েটা বড্ড কষ্ট পেয়েছিলো।তাও আমি জানি ভাইয়া নিশ্চয়ই কোন কারণেই এমন করেছে।”
অধরা-“ঠিক আছিস তুই অনু?”
আনায়া পা*ল্টা প্রশ্ন করলো-
দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ১৯+২০
“তুই ঠিক আছিস?”
দুইজনই চুপ করে রইলো।রাত হয়ে গিয়েছে।তাই “ঠিক আছিস” এর উত্তর এই রাতের আকাশে ছেড়ে দিয়ে দুজন বসে রইলো।
