Home দগ্ধ প্রেমানল দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ২৫ (২)

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ২৫ (২)

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ২৫ (২)
আনায়া আফরিন

পুরো রুম জুড়ে অন্ধকার।বারান্দার কাচের গ্লাসটা খোলা বিধায় চাদের অকৃত্রিম রশ্নি কিছু ঘরে আসছে।আদিল নিজের খাটের উপর বসে ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছে।আঙুল দুটো বরাবর চলছে।হঠাৎ করে দরজায় নক করার শব্দ এলো।আদিল না তাকিয়েই “কাম” উচ্চারণ করলো।সে তার কাজেই ব্যস্ত।বারান্দা বরাবর রুমের অংশটুকু একটি নারী দাড়ালো।মিনিট কয়েক পাড় হলো।আদিলকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে তার কাজে কতোটা ব্যস্ত।মিনিট খানেক পার হলো।আদিল ভেবেছে রুদ্ভিকা এসেছে।তাই চোখ না তুলেই জিজ্ঞাসা করলো-

“কি হয়েছে কিছু বলবি?”
অপর পাশ থাকে কিছু সেকেন্ড সময় নিলো।তারপর উত্তর দিলো-
“মামি আপনাকে খেতে ডাকছে আদিল ভাই!”
আদিলের হাত দুটো বন্ধ হয়ে গেলো।ঘরটা পুরো নিস্তব্ধ।আদিল বুঝে গিয়েছে তার সামনে কে।সে চোখ তুলে তাকাতে পারলো না।সামনের নারীটি হয়তো হাসলো।তারপর বললো-
“চোখ মিলাতে ভয় পাচ্ছেন আদিল ভাই?”
আদিল এবার তাকালো।থমকালো।চাদের আলো পড়ছে মেয়েটার মুখে।বারান্দার থেকে আসা বাতাসে সামনে এলোমেলো চুলগুলো উড়ছে।আদিল ২ মিনিটের মধ্যেই চোখ ফিরিয়ে নিলো।মেহের আবার নিজ থেকেই প্রশ্ন করলো-

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“কেমন আছেন আদিল ভাই?”
আদিলের কথাগুলো জট পেকে আসছে।তবুও নিজেকে সামলে বললো-
“যেমন থাকার কথা।তুই কেমন আছিস?”
মেহের অকপটে জবাব দিলো-
“যেমন থাকতে দেওয়ার জন্য প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তার থেকে বহুগুন সুখে আছি!”
আদিল হাসলো।তার শান্ত মেহের জবাব দিতে পারে এখন।বললো-
“বড় হয়ে গিয়ে গিয়েছিস মেহু!”
মেহের-“যেই শিক্ষা দিয়েছো তা নিয়ে কি।আর ছোট থাকতে পারি!”
আদিল প্রত্যুত্তর করলো না!মেহের-“আপনাকে নিচে মামি ডাকছে।সবাই খেতে বসবে চলুন!”
আদিল-“আসছি”
মেহের চলে যেতে উদ্যুত হলেই আদিল পেছন থেকে বললো-

“ঘৃ*ণা করিস মেহের?”
মেহেরের পা জোড়া থেমে গেলো।পিছন ফিরে হাসলো।বললো-
“যাকে ভালোবাসা যায়,তাকে ঘৃণা করা যায় না।আর যদি ঘৃণা করা হয় তাহলে তাকে কখনো ভালোবাসা হয়নি।আমার ভালোবাসা এতো দুর্বল ছিলো না আদিল ভাই।আমার ভালোবাসা ছিলো পাহাড়ের মতো অটল,স্রোতের মতো উত্তাল,গ্রীষ্মের রোদের মতো প্রখর।তাই এটাকে এতো দুর্বল ভাববেন না!”
আদিল মেহেরের এমন স্বীকারোক্তিতে বড্ড অবাক হলো।বললো-
“এখন”
মেহের-“সব জায়গায় তো ‘ছিলো’ শব্দটা উচ্চারণ করলামই না”

আদিল কিছু বললো না।মেহের চলে গেলো।সে আর দাঁড়াতে পারছিলো না।অন্যদিকে আদিলের বুকে ঝড় শুরু হলো।হয়তো ব্যাথা করছে।ভাবলো তার রোগের আরেকটি লক্ষণ।কিন্তু এই ব্যাথা যে ছিলো তার বিনাশিনীকে হারিয়ে ফেলার।আদিল বুঝলো কি না কে জানে!
অন্যদিকে মেহের ডাইনিং টেবিলের সামনে আসলো।সেখানে তার আর আদিলের জন্যই অপেক্ষিত সবাই।মেহের আসতেও এরিক পাশের চেয়ারটা টেনে বসতে দিলো।সে মেহেরের দিকেই তাকিয়ে আছে।সবিতা বেগম এসে জিজ্ঞাসা করলেন আদিল আসছে কি না!মেহের বললো-
“আসছে”

চোখের জল গুলো টলমল মতো করছে।মেয়েটার হাত কাপছে।বারবার ঢোক গিলছে কান্না না আসার জন্য।এরিক সব দেখলো।পকেট থেকে টিস্যু বের করে মেহেরের সামনে রাখলো।মেহের টিস্যুটা নিয়ে বললো-
“চোখ জ্বলছে।হয়তো কিছু ডুকেছে।তাই পানি আসছে!”
এরিক গম্ভীর সুরে জবাব দিলো-
“চোখ জ্বলছে নাকি হৃদয়?”
মেহের অবাক নয়নে এরিকের দিকে তাকালো।এরিক কথা ঘুরানোর প্রসঙ্গে বললো-
“শরীর খারাপ লাগছে নাকি তাই জিজ্ঞাসা করলাম”
মেহের নিঃশ্বাস ছাড়লো।বললো-
“না এখন আর খারাপ লাগা রা ছুতে পারেনা আমাকে!”

এরিক-“আমি ছুতে দিবো ও না।তোমার কাছ থেকে সকল দুঃখকে দূরে রাখবো আমি!!
মেহের হাসলো।এরিকও হাসলো।তবে মেহেরের হাসি মুছে গেলো আদিলের আগমনে।আদিল এসে ফারাজের পাশে বসলো।ফারাজ এরিককে দেখেই খোচা মারলো।বললো-
“কিরে জেন্ডার চেঞ্জ করেছিস নাকি?ঘরে আড়ালে লুকিয়ে ছিলি যে?পর্দা করিস নাকি?”
আদিল বিরক্তির স্বরে বললো-
“জেন্ডার চেঞ্জ করলে তোর মতো ছাগলের সাথে বসতাম আমি হ্যাঁ?”
তারা কথা বলতে বলতেই হঠাৎ ফারাজ বলে উঠলো-
“আমি একটা বিজ্ঞাপন নিয়ে এসেছি।”
এরিক-“কাজের বিজ্ঞাপন নাকি?”
ফারাজ-“ভাই শোন আমি সবসময় গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞাপন নিয়েই হাজির হই!”

আদিল-“এখন বল বিজ্ঞাপন টা কি?”
ফারাজ-“আমরা হয়তো খুব শীঘ্রই একটা বিয়ে খাবো!”
সবাই অবাক নয়নে চাইলো।এরিদ বললো-
“বিয়ে?আবার কার বিয়ে?”
ফারাজ-“আসার সময় শুনলাম রুদ্ভিকার বিয়ের কথা চলছে!”
এরিদের মাথাটা ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরে গেলো।সে কিছুটা চিল্লিয়ে বললো-“কিহ্‌?”
সকলের দৃষ্টি তাদের দিকেই।রুদ্ভিকার খাওয়া থেমে গিয়েছে।মেহের বললো-
“বলো কি?ওর বিয়ে?কার সাথে?আমি ই তো জানতে পারলাম না!”
ফারাজ খাবার চিবোতে চিবোতে বললো-

“আমিও মাত্রই শুনলাম।মিতালি আন্টি সবিতা আন্টিকে বলছিলো আদিল ভাইয়ের সাথে রুদ্ভিকার বিয়ের কথা!”
প্রতিটা মানুষ যেনো আকাশ থেকে পড়লো।এরিদের কেন জানি মুহুর্তেই রুপ বদলে গেলো।সে কিছুটা উগ্র হয়েই বললো-
“আজব ওরা তো ভাই-বোন।আর ওদের বয়সের পার্থক্য অনেক।এর মধ্যে রুদ্ভিকাও ছোটো।তাদের একসাথে মানাবে না!”
এরিক এরিদের দিকে তাকালো।আফরিনও দেখলো।ভাইকে বসতে বললো।আফরিন এরিদের কানে ফিসফিসিয়ে বললো-

“ভাইয়া শান্ত হও কি বলছো এসব?”
মেহের অবাক স্বরে বললো-
“কী আজব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা?”
মেহেরের মাথাটা ঘুরছে যেনো।অধরা মনে মনে বললো-
“হে প্রভু।ভাই নিলে,তারপর বাবা নিলে,তারপর মা নিলে,তারপর আপনজনের রুপ দেখালে।ভালোবাসার মানুষটাকেও নিজের করে পেলাম না।এখন কি তাকে অন্যকারো সাথে দেখানোর পরিকল্পনা করছো?আমার এতো শক্তি নেই ঈশ্বর।আমি পারবো না আর নিতে এটা!”
আনায়া ভাইয়ের দিকে একবার তাকালো।কেমন বিষণ্ণ লাগছে চেহারাটা।চোখ দুটো লাল হচ্ছে।হয়তো রাগে,নয়তো কষ্টে।বুঝতে পারছে না ঠিক।কিন্তু আনায়া জানে এমন কিছুই হবে না।আদিল উঠে চলে গেলো।এরিদ রুদ্ভিকাকে জিজ্ঞাসা করলো-

“তোমার কি এমন কিছুতে মত আছে রুদ্ভিকা?”
রুদ্ভিকা মাথা নিচু করে প্লেটে হাত নাড়ছিলো।এরিদের কথায় সে আলতো করে মাথা নাড়িয়ে না করলো।এরিদ এবার দীর্ঘ একটা নিশ্বাস নিয়ে বললো-
“যেখানে মেয়ের মত নেই সেখানে এটা কীভাবে চলবে?”
এরিল ভাইকে এমন উতলা দেখে বললো-
“এরিদ বড়রা তো এখনও কাউকে কিছু বলেনি।আর তুই-ই বা এমন কেন করছিস হ্যাঁ? আর রুদ্ভিকার জন্য আছি আমরা।ও যেমন বলবে তেমনই হবে!”
ফারাজের দিকে তাকিয়ে বললো-
“আর এই যে ফারাজ।তোর কাজ নেই।এই তোকে বলেছে কেউ তাদের কথা গিলে এসে আবার এখানে উগলে দিতে!”

ফারাজ-“আরেহ ভাই মানুষকে নতুন খবর দেই,তাও ভালো লাগে না!”
আফরিন বললো-
“ভাইয়া এটা আইটেম বো*ম ছিলো।সাধারণ খবর না!”
ফারাজ-“আমি কি জানতাম!”
রুদ্ভিকা উঠে চলে গেলো।এরিদও আর খেলো না।মেহেরের মনটা যেনো তেতো হয়ে উঠেছে।এরিক দেখলো মেহেরকে।মনে মনে বললো-
“কোন কোন ভাবে তোমাকে চাইলে তুমি আমাকে ওর মতো করে ভালোবাসবে?তোমার চোখে অন্য কারো জন্য দুঃখ দেখে আমার বুক জ্বলে।তুমি কি বুঝোনা?”

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ২৫

এরিকের এই একাধারা চাহনি দেখে আনায়ার হৃদয় অস্থির হলো।কতো ইচ্ছা ছিলো এই চাহনির ভিতরের ভালোবাসা পাওয়ার।অথচ তার সাধনা সব বিফলে গেলো।অধরার সব অদ্ভুত লাগলো।অন্ধকার লাগলো সব।মুনতাহাকে নিয়ে সে চলে গেলো।ফারাজ আনায়ার চোখে দেখলো এক অদ্ভুদ ব্যাথা।না পাওয়ার ব্যাথা যার সাথে সেও পরিচিত।আফরিন চুপচাপ নিজের খাবার খেতে লাগলো।পুরো টেবিলে প্রত্যেকের হৃদয়েই আক্ষেপ রয়ে গেলো।না পাওয়ার,পেয়ে হারানোর!

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ২৬