Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৩৬

দাহশয্যা পর্ব ৩৬

দাহশয্যা পর্ব ৩৬
Raiha Zubair Ripti

সোলেমান বেশ চটে আছে রুমাইসার উপর। বারবার বলেছিল কেউ যেন না আসে কেবিনে,তারপরও সেরিন আসলো কি করে?
রুমাইসা মাথা নত করে ফেললো। সে না করবে কিভাবে? সে তো তার আপন ছোট বোন কে দেখার জন্যই ছুটে এসেছে৷ এখন কি মুখের উপর বলে দিবে— “ভেতরে যেও না ভাইয়ার নিষেধ আছে!
সেরিন বোনের শরীর হাতিয়ে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করছে-

-” আর কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো? আব্বা আম্মার উপর ভীষণ রেগে আছি। আমাকে জানালো না! পর হয়ে গেছি নাকি?
মেহরিন মৃদু হাসলো বোনের এমন অস্থিরতা দেখে। একটু সামান্য ব্যথা পেলেই তার বোন বাবা মা প্রচুর অস্থির হয়ে যায়। সেখানে তো মেহরিন এখন হসপিটালে। আল্লাহ বোধহয় সব রহমত মেহরিনকেই দিয়ে পাঠিয়েছে। যেমন নিজের পরিবার তেমনই শ্বশুর বাড়িটাও। এই মানুষগুলোর জন্যই মেহরিনের অনেক বছর বাঁচার ইচ্ছে হয় পৃথিবীতে। মেহরিন বোনের হাত মুঠোয় নিয়ে বলল-

-” আপা শান্ত হও৷ আমি ঠিক আছি।
পাশ থেকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল-
-” পানিটা খাও।
সেরিন পানিটা খেয়ে বলল-
-” তোকে ও বাসায় নিয়ে যাব। সুস্থ না হওয়া অব্দি যেতে দিব না বলে রাখছি।
সোলেমান চুপচাপ শুনলো এ কথা। কি আশ্চর্য তার বউকে নিয়ে যেতে চাইছে ও বাড়ি!
সোলেমান বেরিয়ে আসলো কেবিন থেকে। সেরিন তা দেখে বলল-
-” রেগে চলে গেলো নাকি তোর জামাই নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে?
মেহরিনও বুঝলো না হুট করে এভাবে চলে যাওয়ার মানে।
সোলেমান কে নিজের পাশে দাঁড়িয়ে হাসফাস করতে দেখে আমিরুল সুলতান জিজ্ঞেস করলো-

-” কিছু হয়েছে?
-” মেহরিন কে ও বাড়িতে নিয়ে যাবে উনারা?
-” সেটাই তে বললো। কেনো কি হয়েছে?
-” ভিলায় নিয়ে গেলে হয় না?
-” না তো বলতে পারি না আমরা। জিনিস টা ভালো দেখায় না।
সোলেমান ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-
-” তাহলে আমি ঢাকা ব্যাক করলাম। আমার থাকার কি দরকার তাহলে?
আমিরুল সুলতান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো-
-” থাকার নিয়তে এসেছিলি নাকি?
-” আজই চলে যেতাম নাকি তাহলে? রাত টা তো থাকতাম।
-” তো থাক না ভিলায়।
-” তোমার বউমা থাকবে তার বাপের বাড়ি,আর আমি থাকবো আমার বাপের বাড়ি! দু’জনে দু মেরুতে। বিষয় টা মোটেও পছন্দ হচ্ছে না আমার।

-” তাহলে কি করতে বলছিস?
-” বউকে আমার সাথে রাখতে চাচ্ছি।
-” এক কাজ কর। তাহলে তুই ও শ্বশুর বাড়ি চলে যা। তাহলেই তো হয়ে যায়।
-” বিষয় টা মন্দ না কিন্তু আমার পছন্দ হচ্ছে না। তারা আমায় বলেনি যেতে। সেধে সেধে যাব আমি!
আমিরুল সুলতান তপ্ত শ্বাস ফেললো।
-” আচ্ছা দেখছি কি করা যায়। হুট করে এসে বউবউ করছিস বিষয় টা ভীষণ চোখে লাগছে।
-” বাজে বকো না। নিজেরই তো বউ,পরের বউ তো না আর। চোখে লাগবে কেনো আশ্চর্য। যাও ব্যবস্থা করো গিয়ে।
রুমাইসা এসে ডাকলো সোলেমান কে৷ মেহরিন কে নাকি এখন নিয়ে যাওয়া হবে ওর বাবার বাসায়। সোলেমান সেটা শুনে বলল-

-” ভেতরে কে কে আছে?
-” সেরিন আপু নেই। মেহরিন একাই আছে।
সোলেমান ফোন টা পকেটে ভরে কেবিনের দিকে হাঁটা ধরলো। আসলেই মেহরিন ব্যতিত কেউ নেই। সোলেমান গিয়ে মেহরিনের পাশে বসলো। মেহরিন সোলেমানের মুখের দিকে তাকালো। কপাল টা তার কুঁচকে আছে৷ রেগে বা বিরক্ত হয়ে আছে নাকি কোনো কিছু নিয়ে?
-” কিছু নিয়ে বিরক্ত নাকি?
সোলেমান মেহরিনের মুখের দিকে না তাকিয়েই ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” তুমি ও বাড়িতে যেতে চাও?
-” আপনি যেতে দিলে যাব।
সোলেমান এবার মেহরিনের দিকে তাকালো।
-” যদি না দেই?
-” তাহলে যাব না।
সোলেমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-

-” ঠিক আছে বাঁধা দিব না। বাবা মায়ের সাথেই যাও। আমি ঢাকা ব্যাক করবো।
সোলেমানের এই কথাটা মোটেও ভালো লাগলো না মেহরিনের। কেনো চলে যাবে? একটু থাকলে কি হয়? সব সময় তো ঢাকা তেই থাকে। মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে সোলেমান হাত টেনে বলল-
-” থেকে যান না।
মেহরিনের বাচ্চা সুলভ কন্ঠে ব্যাকুল অস্থিরতার ছাপ পাওয়া গেলো৷ সোলেমান মেহরিনের কম্পিত ঠোঁটের দিকে একবার তাকালো৷ শালার তাকালেই কেমন নেশা চড়ে যায়। সোলেমানের ভেতর সত্তা বলতে চাইলো—“ আমায় তোমার সাথেই রেখে দাও না মেয়ে৷ ”
কিন্তু কঠিন হৃদয় সত্তা মুখ ফুটে বলতে পারলো না। শুধু বলল-
-” থেকে গেলে খুশি হবে?
মেহরিনের চোখ মুখে আনন্দের ছাপ দেখা গেলো। খুশির সাথে বলল-

-” ভীষণ।
-” বেশ তাহলে না হয় থেকেই গেলাম। কিন্তু তুমি তো বাবা বাড়ি চলে যাবে৷
-” আপনিও চলুন না।
-” তোমার বাবা বা তোমার পরিবারের তো কেউ কিছু বলে নি আমায়৷ তাহলে যাই কি করে বলো ?
কেবিনের দরজা ঠেলে তখনই প্রবেশ করলো মোতালেব ভুঁইয়া। সোলেমান কেই খুঁজছিলো তিনি। গলা ঝেড়ে এগিয়ে এসে বলল-
-” বাবা তোমাকেই খুঁজছিলাম৷ মেহরিন কে আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাই৷ তোমার এতে আপত্তি নেই তো?
সোলেমানের বলতে ইচ্ছে করলো— ঘোর আপত্তি আছে আমার। কিন্তু মুখে সেটা বললো না। স্বাভাবিক ভাবে বলল-

-” আপত্তি নেই।
মোতালেব ভুঁইয়া একটু সঙ্কা মুক্ত হলেন।
-” বাবা তুমিও চলো না৷ এমনিতেও তোমাকে তেমন ভাবে আপ্যায়ন করতে পারি নাই। ক’টা দিন থেকে যাও। দু জামাই কে এক সাথে দেখাও হবে৷ অনিকও চলে আসবে আজ বাড়িতে৷ তুমি থাকতে রাজি হলে ভীষণ খুশি হতাম।
মেহরিন বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। এবার তো যাওয়াই যায় তাহলে সোলেমানের মেহরিনের সাথে।
সোলেমান ভাবতে লাগলো রাজি হবে কি হবে না। এতক্ষণ তো এটারই অপেক্ষায় ছিলো। মেহরিন পাঞ্জাবির হাতা টেনে ফিসফিস করে বলল-

-” রাজি হয়ে যান না।
সোলেমান একটু সময় নিয়ে বলল-
-” বেশ আমি যাব।
মোতালেব ভুঁইয়া খুশি হলেন। মেয়েকে বাড়িতে নিয়েই বাজারে ছোট লাগাবেন। দুই মেয়ের জামাই আজ প্রথম বার একসাথে হবে।
মোতালেব ভুঁইয়া বেরিয়ে আসলো কেবিন থেকে।
মেহরিন সোলেমানের বাহু জড়িয়ে ধরে বলল-
-” ধন্যবাদ আপনায় রাজি হবার জন্য।
সোলেমান নিজের বাহু ছাড়িয়ে নিয়ে বুকের সাথে চেপে জড়িয়ে ধরলো মেহরিন কে। তারপর চুলের ভাজে হাতের আঙুল বুলিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো।

-” এই অসুস্থ বেশে দেখতে একদমই ভালো লাগছে না আমার। দ্রুত সুস্থ হও।
মেহরিন সোলেমানের বুকে আকিঁবুকিঁ করতে করতে ফিসফিস করে বলল-
-” কিছু অসুখ যদি সুখ হয়ে আসে তাহলে মন্দ কোথায় অসুস্থ হতে।
সোলেমান মৃদু হাসলো এই কথা শুনে।
জানলার বাহির দিয়ে মাহি তাকিয়ে আছে মেহরিন আর সোলেমানের দিকে। যে ভাগ্যবতী হয় সে সব দিক দিয়েই ভাগ্যবতী হয়। আর যে ভাগ্যবতী হয় না সে কোনো দিক দিয়েই ভাগ্যবতী হয় না।
এজওয়ান মাহির দৃষ্টি অনুসরণ করে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলো তার বড় ভাই তার বউকে জড়িয়ে ধরেছে৷ তা দেখে এজওয়ান মাহিকে উদ্দেশ্য করে বলে-

-” তুমি চাইলে আমিও তোমায় এভাবে জড়িয়ে ধরতে পারি। পৃথিবীর সব ভালোবাসা তোমার পায়ের কাছে এনি দিতে পারি৷ তার বিনিময়ে শুধু তুমি আমাকে চেয়ে দেখো,আমায় ভালোবেসে দেখো।
এজওয়ানের কথায় মাহি এজওয়ানের দিকে তাকালো। মুখে ফুটে উঠলো বাঁকা তাচ্ছিল্যের হাসি সাথে তো আছেই ঘৃণা।
-” আমার ভালোবাসা কে দু হাতে গলা চেপে মেরে এখন চাইছেন আমি যেন আপনায় ভালোবাসি! হাহ্ হাস্যকর! আজ এক আল্লাহ কে সাক্ষী রেখে বলছি আমার এই ঠোঁট কখনো উচ্চারণ করবে না যে আমি আপনাকে ভালোবাসি৷ আপনি মর’বেন আমার ভালোবাসা না পাওয়ার ছটফটানি তে।
কথাটা কান আসতেই এজওয়ান মাহিকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠে-

-” আর তুমি বেঁচেও ম’রে যাবে আমাকে এই এজওয়ান সুলতান কে ভালোবাসতে না পারার ছটফটানি তে। গ্যারান্টি দিলাম.. মিলিয়ে নিও সুইটহার্ট।
মাহি এজওয়ান কে নিজের থেকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল-
-” এমন দিন আসার আগে যেন আমার ম’রণ হয়।
-” মৃ’ত্যু এত সহজ নয় হিটলার বউ।
-” আপনাকে ভালোবাসার চেয়ে মৃ’ত্যুকে সাদরে গ্রহণ করে নিব আমি।
এজওয়ান মাহির হাত চেপে ধরলো।
-” এতো ঘৃণা! এই এজওয়ান সুলতান কে! আজ পর্যন্ত কারো চোখে দেখি নি৷ কিসের শত্রুতা আমার সাথে তোমার? জোর করে বিয়ে করেছি সেজন্য এত ঘৃণা?
-” আপনাকে ঘৃণা করার জন্য একটা বাক্যই যথেষ্ট..
-” কি সেটা?
-” আপনি বাশার সুলতানের ছেলে। আপনার বাবা কে আমি ঘৃণা করি। আর তারই র’ক্ত আপনার শরীরে। আপনাকে দেখলে আমার ঘৃ’ণায় শরীর কাঁপে। যখন আমায় স্পর্শ করেন তখন ইচ্ছে করে সেই স্থান গুলো কেটে শরীর থেকে কে’টে ফেলে দিতে। বুঝুন তাহলে ঠিক কতটা ঘৃণা আমি আপনায় করি।

-” কি করেছে কি আমার বাবা?
-” জানেন না আপনি? ন্যাকা সাজছেন?
-” আমি যে ন্যাকা সাজতে পারি না তা ভালো করেই জানো তুমি। বলো কি করেছে আমার বাবা তোমার সাথে?
-” শুনতে চান কি করেছে? শুনুন তাহলে, আপনার বাবার কারনে আজ আমি এতিম বুঝেছেন? আপনার বাবা একটা খু’নি। আমার মায়ের খু’নি। এর প্রতিশোধ আমি নিব না? সুদে আসলে নিবো এর প্রতিশোধ । আপনাদের এমন ভাবে নিঃশেষ আমি করবো না শুধু দেখে যাবেন।
-” এর সাথে আমার কি সংযোগ? বাবা যদি খু’ন করে থাকে আর তা প্রমান হয় তাহলে বাবা নিশ্চয়ই শাস্তি পাবে৷ আছে কোনো প্রমান তোমার কাছে?
-” নেই বলেই তে এখনও এক্সপোজ করতে পারছি না আপনার বাবা কে। আর সংযোগের কথা বলছেন? সবচেয়ে বড় সংযোগ তো আপনি তারই ছেলে৷ তবে আপনাদের ফ্যামিলির আর বাকি সবাই ভালো। তাদের কোনো ক্ষতি আমি করবো না।

কথাটা শেষ করেই মাহি বেরিয়ে গেলো হসপিটাল থেকে। এজওয়ান তাকিয়ে রইলো যাওয়ার পানে। তার বাবা মাহির মা’কে খু’ন করেছে? কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? মাহি মিথ্যা বলছে? চোখ মুখ তো মিথ্যা বললো না।
সন্ধ্যার পরপরই মেহরিন কে নিয়ে অলংকারপুর আসা হয়। সুলতান বাড়ি থেকে রুমাইসা আর সোলেমান এসেছে।
মেহরিনের রুমে মেহরিনের সাথে বসে আছে রুমাইসা। ঊর্মিও এসেছে৷ দুপুরের দিকে চম্পার মায়ের মুখে শুনেছে মেহরিনের অসুস্থতার কথা। মেহরিন হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরেছে শুনেই দেখা করতে চলে এসেছে৷
সোলেমান আর অনিক বাজারে গিয়েছে মোতালেব ভুঁইয়ার সাথে। সোলেমান চাচ্ছে এই বাজার টা সে তার তরফ থেকে করতে৷ এমনিতেও সে জামাই হিসাবে কোনো কিছুই করতে পারে নি এখনও৷ সোলেমান বাজারে এসে দরদাম করছে না। দোকানদার যা চাচ্ছে তাই মানিব্যাগ থেকে বের করে দিচ্ছে। মোতালেব ভুঁইয়া মানা করলেও সোলেমান শুনলো না৷ নিক বেশি একদিনই তো৷ কত টাকাই তো কতদিকে বেহিসাবি ভাঙে।
প্রায় ১০ হাজার টাকার মতন বাজার করে বাড়ি ফিরে সোলেমান মোতালেব ভুঁইয়া আর অনিক। গরমে পাঞ্জাবি টা ভিজে শরীরে লেপ্টে আছে। এত বাজার দেখে সেরিনের মাথায় হাত। অনিকের কানে কানে বলল-

-” এত বাজার! মানা করলে না কেনো?
-” মানা করলে শুনতো?
সোলেমান কে রুমের ভেতরে ঢুকতে দেখে ঊর্মি উঠে দাঁড়ায়। সোলেমান কে সালাম দেয়। সোলেমান সালামের জবাব দেয়। ঊর্মি মেহরিনের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। রুমে এখন রুমাইসা মেহরিন আর সোলেমান। সোলেমান রুমাইসার দিকে তাকিয়ে বলল-
-” আলাদা করে কিছু বলতে হবে তোকে?
রুমাইসা ভাইয়ের কথার মানে বুঝতে পেরে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে সোলেমান বলে উঠলো-
-” দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে যা।
রুমাইসা চাপিয়ে দিলো দরজাটা। মেহরিন দেখলো স্বামী তার ঘামে ভিজে একাকার। সোলেমান বিছানায় দু হাত পেছনে ভর দিয়ে বসেছে৷ ফ্যানের বাতাসে গরম কমছে না। সারাদিন থাকে এসির তলে সেই মানুষের কি আর ফ্যানের বাতাসে পোষায়?
মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-

-” গোসল করবেন? ভালো লাগবে তাহলে।
-” করাই যায় কিন্তু জামাকাপড় তো আনি নি। পড়বো কি? লুঙ্গি পড়তে বলো না আবার সেদিনের মতন।
-” লুঙ্গি না টি-শার্ট প্যান্ট আর পাঞ্জাবি রাখা আছে আলমারি তে।
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো।
-” আলমারি তে এসব আসলো কোথা থেকে?
-” অনিক ভাইয়া বাসায় আসার সময় নিয়ে এসেছে। আব্বা বলেছিল আনতে। দিব?
-” দাও,গোসল না করলে শান্তি পাচ্ছি না।
মেহরিন আলমারি থেকে অনিকের আনা সেই টি-শার্ট আর প্যান্ট টা বের করে দিলো।
সোলেমান সেটা নিয়ে গোসলে ঢুকলো।
রান্না ঘরের সব কাজ করছিল সেরিন আর সানজিদা বেগম। রুমাইসা একা একা দেখে সানজিদা বেগম সেরিন কে তার কাছে পাঠিয়ে দিলো। রুমাইসা অনেক বোর হচ্ছিল একা একা। সেরিন তাকে তার রুমে নিয়ে এসেছে । অনিক মোতালেব ভুঁইয়ার রুমে। রুমাইসার জন্য দেওয়া রুম মেহরিনের রুমের পাশেই। সেরিন রুমাইসা কে রুমে রেখে বলল-

-” বসো হাতমুখ টা ধুয়ে আসি৷ তারপর গল্প হচ্ছে।
সেরিন ওয়াশরুমে ঢুকলো। রুমাইসা ফোন টিপতে লাগলো। আকস্মিক এক শব্দে চমকে উঠলো রুমাইসা। ফোন বাজছে। সেরিনের ফোন সেটা। রুমাইসা ফোনের দিকে একবার তাকিয়ে সেরিন কে ডেকে বলল-
-” আপু কেউ ফোন দিয়েছে তোমার ফোনে।
সেরিনের মুখে ফেসওয়াশ লাগানো।
-” কে করেছে ফোন দেখো তো।
রুমাইসা দেখলো তেহরান নাম দিয়ে সেভ করা।
-” আপু নাম তেহরান।
সেরিন মুখের ফ্যানা ধুয়ে বেরিয়ে আসলো। বিছানা থেকে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে দেখলো তেহরান ভিডিও কল করেছে। সেটিন মুখ টা গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে ফোনটা রিসিভ করলো।
তেহরান মেহরিনের অসুস্থতার খবর শুনেই ফোন করেছে সেরিন কে। মেহরিনের তো আর ফোন নেই যে তাকে করবে। সেরিনের ফোন টা রিসিভ হতেই তেহরান দেখলো সেরিন মুখ মুছতে ব্যস্ত৷ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল-

-” হয়েছে মুখ মোছা? হলে থাম এবার৷ মেহরিনের কি অবস্থা এখন?
সেরিন মুখের সামনে থেকে গামছাটা সরালো।
-” হ্যাঁ এখন ভালো আছে।
তেহরান কিছু বলতে যাওয়ার সময়ই পাশে চোখ গেলো। হায়হায় ওটা সেই মেয়েটা না? মেহরিনের ননদ? রুমাইসা ফোন টিপছে মনোযোগ দিয়ে৷
-” সেরিন রুমের বাহিরে আয় তো।
-” কেনো?
-” আহা আয় না।
সেরিন বাহিরে আসলো।
-” বল কি এমন গোপন কথা বলবি।
-” ওটা মেহরিনের ননদ ছিলো না?
-” এটা জিজ্ঞেস করার জন্য বাহিরে আসতে বললি?
-” বড় ভাইয়ের জন্য একটা হেল্প কর না।
-” কি হেল্প?
-” মেহরিনের ননদের সাথে সেটিং করায় দে। ট্রাস্ট মি সামনের বছর চাকরি টা পেলেই প্রথম মাসের বেতন পেয়ে তোকে ট্রিট দিব।
সেরিন দাঁত চেপে বলল-

-” সরি রে পারবো না এমন হেল্প। শহরে মাইয়া নেই প্রেম করার জন্য?
-” আছে রে কিন্তু এই মেয়েটা একটু বেশিই কিউট৷ প্রথম দেখাতেই ভাল্লাগছে। ভাইয়ের উপকার টা কর সেরিন।
-” একদমই না। যার ননদ তার কাছে গিয়ে বল।
-” সেরিন কি বাচ্চি।
-” তেহরান কা বাচ্চা ভণ্ডামি বাদ দিয়ে ভালো হয়ে যা।
-” মেহরিনের ননদ দে ভালো হয়ে যাই।
-” ভণ্ড বাসায় আসিস৷ নিজেই এসে সেটিং করিয়ে নিস।
-” ওকে রাখছি তাহলে। পিচ্চিকে বলিস খোঁজ খবর নেই প্রতি নিয়ত তার। এত বড়লোক জামাই বউকে একটা ফোন কিনে দেয় না। টু মাচ কিপ্টে দেখছি।

-” তোদের এলাকারই তো এমপি।
-” হু কিপ্টেমি তো করতে দেখি নি কখনও আমাদের সাথে৷ যাই হোক মেহরিনের ননদ পটানোর জন্য হলেও আসা লাগবে নওগাঁ। ভালো থাক জামাই সংসার নিয়ে,কি দুঃখ আমার৷ বড় হয়েও আমার বউ নাই সংসার নাই,অথচ ছোট বোনদের জামাই সংসার সবই আছে।
সোলেমান গোসল শেষ করে এক হাতে ভেজা জামাকাপড় আর অন্য হাত দিয়ে গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বের হয়। মেহরিন বসা থেকে উঠে ভেজা জামাকাপড় গুলো সোলেমানের হাত থেকে নিয়ে বেলকনিতে মেলে দিলো।
সোলেমান বিছানায় বসতেই এমন সময় কারেন্ট টা চলে গেলো। বাহিরে জ্যোৎস্নার আলো। ঘরে জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকলেও তেমন আলোকিত হচ্ছে না রুম। মেহরিন কে বেলকনিতে থাকতে দেখে সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-

-” মেহরিন দেখতে পাচ্ছো কিছু?
-” হুমম।
মেহরিন ধীরে পায়ে রুমে আসলো। খাটের উপর বসে আছে সোলেমান। মেহরিন রুমে আসায় তাকালো তার পানে। জিজ্ঞেস করলো-
-” জেনারেটর নেই?
-” না। একটু অপেক্ষা করুন মোম জ্বালাচ্ছি।
মেহরিন ড্রয়ার টেনে খুলল। খুঁজে বের করল একটা মোমবাতি আর লাইটার। অল্প হাত কাঁপছে তার। লাইটারের ছোট্ট স্পার্কের সঙ্গে সঙ্গে মোমবাতির সলতে জ্বলে উঠল। নরম, হলদেটে আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরের আনাচে-কানাচে। মোমবাতির আলোয় মেহরিনের মুখটা স্পষ্ট হলো।

ঠিক সেই মূহুর্তেই মেহরিনের মাথার খোপা যেন নিজের ইচ্ছেতেই ভেঙে গেল। ঢলঢলে চুল ছড়িয়ে পড়ল পিঠে। মাথার কাপড়টাও সরে গিয়ে মেঝেতে পড়ল নীরবে। মেহরিনের গালের কাছে কয়েকটা চুল লুটিয়ে পড়েছে। নিঃশব্দ বাতাসে মোমের শিখা দুলছে।
সোলেমান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহরিনের দিকে। তার চোখে বিস্ময়, অভিভূতির ছায়া। এক ঢোক গিলে ফেলে অজান্তেই। কি মায়াবী লাগছে এই মেয়েকে। মেহরিন মোমবাতি টা ড্রেসিং টেবিলের উপরে বসিয়ে সোলেমানের দিকে ফিরলো এই বলার জন্য যে —“ খুব কি গরম লাগছে আপনার?
কিন্তু বলতে পারলো না। সোলেমান মেহরিনের বা হাত ধরে হেঁচকা টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসলো মেহরিন কে। আকস্মিক এমন টানে মেহরিন তাল সামলাতে না পেরে সোলেমানের উপরে পড়ে গিয়ে সোলেমান কাঁধের অংশ চেপে ধরে।
সোলেমানের হাত এবার গিয়ে ঠেকলো মেহরিনের কোমড়ে। চেপে ধরলো আলতো করে। মেহরিনের শরীর বাজে ভাবে কাঁপছে।

-” ক…কিছু বলবেন?
সোলেমান তখনও তাকিয়ে আছে মেহরিনের মুখের দিকে। বিশেষ করে কম্পিত গোলাপি ঠোঁটের দিকে। ফিসফিস করেই বলল-
-” অনেক কিছুই তো বলতে চাই। সব কি শুনবে?
-” জ…জ্বি বলুন না।
সোলেমান মেহরিনের কোমর ধরে উঁচু করে বিছানায় বসিয়ে দিলো৷ তারপর দু হাত বিছানায় ভর দিয়ে মেহরিনের দিকে ঝুঁকে পড়লো। মেহরিনের মুখের উপর সোলেমানের মুখ।
-” একটা চুমু খাই?
মেহরিন এতক্ষণ সোলেমানের চোখের দিকেই তাকিয়ে ছিলো। কিন্তু এখন সোলেমানের এমন কথায় আর চোখ তুলে তাকাতে পারলো না। এভাবে মেয়েদের জিজ্ঞেস করলে কি মেয়েরা বলবে-“ হ্যাঁ খান? বিষয় টা অস্বস্তিকর না? মেহরিন হা না কিছুই বলতে পারলো না। ফ্লোরে তাকিয়ে রইলো।
সোলেমান নিজের কপাল দিয়ে মেহরিনের কপালে ঠেকিয়ে মেহরিনের মাথা উঁচু করে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ৩৫

-” কিছু জিজ্ঞেস করেছি। জবাব চাই। হ্যাঁ বা না।
মেহরিন নুইয়ে পড়ে বলল-
-” আপনার ইচ্ছে।
সোলেমান অবশেষে পেয়ে গেল সেই প্রতীক্ষিত অনুমতি। মেহরিনের শিহরিত ঠোঁটের দিকে তার মুখ ক্রমেই এগিয়ে এলো। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল দু’জনের। দুই জোড়া ঠোঁট মিলনের এক অদৃশ্য রেখায় এসে পৌঁছেছিল, আর মাত্র এক চুল দূরত্ব ঠোঁট দুটির মাঝে। ঠিক সেই ক্ষণেই হঠাৎ করে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো সেরিন। হাতে থাকা হারিকেন টা বাড়িয়ে দিয়ে চোখ তুলে তাকিয়ে বলে উঠলো-
-” হারিকেনটা নে মেহরি………

দাহশয্যা পর্ব ৩৭