দাহশয্যা পর্ব ৪১
Raiha Zubair Ripti
অক্টোবর মাস টা যেনো আস্ত একটা সাদা চাদরের মতন। অক্টোবর এলেই মনটা কেমন যেন নরম হয়ে যায়। জানি না কেন, এই মাসটা আসলেই অন্যরকম লাগে। নরম আলো, নীল আকাশ আর দিগন্তজোড়া কাশফুলের ভেতর কোথাও যেন হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। আবহাওয়া তখন ভারহীন। বাতাসে থাকে একধরনের শান্ত গন্ধ। সকালে জানালা খুললেই ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া এসে গালে লেগে যায়। আর দূরে মাঠের কিনারায়, নদীর ধারে থাকা কাশফুল সাদা তুলোর মতো দুলে দুলে হাসে। কি যে ভালো লাগে মেহরিনের তখন। তার সুলতান সাহেবের সাথে রোজ তিনবেলা করে কথা তো হচ্ছেই মধ্য রাত অব্দিও কথা বলা হয়। কখনও তো মেহরিন কলে থাকা কালিনই ঘুমিয়ে যায়। বেচারা সোলেমান হ্যালো হ্যালো করতেই থাকে।
আজ হাল্কা কুয়াশা পড়েছে। মেহরিন নামাজ শেষ করে জানালা খুলে বাহিরে তাকালো। কি স্নিগ্ধ পরিবেশ। মনটা খুশি হয়ে গেলো প্রকৃতি টা দেখেই। ফটাফট রান্না ঘরে ঢুকে চা বানিয়ে ফেললো। কেউ উঠে নি এখন। মেহরিন কেতলি তে চা রেখে নিজের জন্য এক কাপ নিয়ে রুমে আসলো। বেলকনিতে বসে চা খাবে আর এই মূহুর্ত টা ফিল করবে।
এজওয়ান রাতে আর তার ফোন টা চেক করে দেখে নি যে মাহি কত টাকার শপিং করেছিল। এখন মেসেজ চেক করে দেখে মাত্র ২৫ হাজার টাকা শেষ করেছে। ফকিন্নির গুষ্টি তরিকুলের বেটি মাত্র ২৫ হাজার টাকার শপিং করছে! ছিঃ মানসম্মান আর রাখলো না। এসব ফকিন্নি নিয়ে শপিংমলে যাওয়া যাবে না আর। কোথায় লাখ লাখ টাকার শপিং করবে তা না।
মাহি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছে। এজওয়ান পাশে দাঁড়িয়ে বলল-
-” এই ফকিন্নি শোনো।
মাহি ভ্রু কুঁচকে এজওয়ানের দিকে তাকালো।
-” কি বললেন?
-” বললাম শোনো।
-” তার আগের শব্দ টা কি ছিলো?
-” ফকিন্নি। সুন্দর না নাম টা? তোমার সাথে খুব স্যুট করে।
-” আমাকে আপনার ফকিন্নি মনে হয়?
-” আগে মনে হতো না। গতকাল থেকে শিওর হলাম তুমি আসলেই একটা ফকিন্নি।
মাহি রুমে এসে তার ফোনটা নিয়ে বলল-
-” আপনার ব্যাংক একাউন্ট নম্বর বলুন। আপনার টাকা গুলো ব্যাক দিব। ২৪ ঘন্টাও হয় নি ২৫ হাজার টাকা ধার দিয়েছেন। এর ভেতর খোটাও দেওয়া সারা! ছোটলোক কোথাকার।
এজওয়ানের কপাল কুঁচকে আসলো। সে কখন খোঁটা দিলো টাকার? তার টাকা মানেই তো তার বউয়ের টাকা।
-” খোঁটা কখন দিলাম তোমায়?
-” ফকিন্নি বললেন কেনো? আমি কিনতে চেয়েছিলাম? বলি নি কার্ড আনি নি।
-” আরে আমি কি ওটার জন্য ফকিন্নি বলছি নাকি?
-” তাহলে কোন সুখে ফকিন্নি বললেন আমায়?
-” তোমায় আমি আমার নিজেকে সহ আমার কার্ড টাই দিয়ে দিছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে ইনটেক রেখে আমার কার্ড ইউজ করলে তাও মাত্র ২৫ হাজার টাকা! এত ছোটলোকিপনা কেনো করলে? তুমি চাইলে পুরো শপিং মলের সব জামাকাপড় কিনতে পারতে।
-” আমাকে কি আপনার আখাইয়া মনে হয়?
-” হোয়াট ইজ আখাইয়া?
-” আপনার মাথা। তাড়াতাড়ি ব্যাংক একাউন্ট নম্বর বলুন।
-” আই লাভ ইউ বলো। তারপর আমার জাইঙ্গার সাইজ নম্বর বলছি। একটা কিনে দিও।
মাহি চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো।
-” ইয়াক। বে’য়াদব ব্যাটা, নষ্টা মুখ।
-” তোমারই তো।
-” একদম দূরে থাকুন।
এজওয়ান দু হাত মেলে দিয়ে বলল-
-” কাছে আসো নাআআআ।
-” একদম না।
-” আমাদের হানিমুনে যাওয়া উচিত মাহি।
-” কিসের হানিমুন হু? কোথাও যাব না।
-” তোমার মতামত শুনতে চাইছি আমি? আব্বার সাথে পরামর্শ করে আসি ওয়েট। বুড়ো ব্যাটার কি দাদা ডাক শুনতে ইচ্ছে করে না নাকি?
এজওয়ান একটা সিগারেট ধরিয়ে বাশার সুলতানের কাছে আসলো। বাশার সুলতান বাগানে বসে চা খাচ্ছে। এজওয়ান পাশে বসলো। বাশার সুলতানের নাকে সিগারেটের গন্ধ আসতেই চোখ মুখ কুঁচকে বলল-
-” দেখতেছিস তো চা খাচ্ছি। মুখের সামনে এসে সিগারেট না খেলে হয় না?
এজওয়ান বাপের মুখে সরাসরি ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে বলল-
-” না হয় না।
বাশার সুলতান এজওয়ান কে বিরবির করে বে’য়াদব বলে মুখের সামনে থেকে ধোঁয়া সরাতে সরাতে বলল-
-” আমি তোর বাপ হই কোনো সমবয়সী বন্ধু না।
-” সো হোয়াট?
-” বউকে জ্বালানো শেষ? এখন আসছিস আমায় জ্বালাতে?
-” হুমম।
-” কি বলবি বল।
-” বয়স হচ্ছে তো।
বাশার সুলতান নিজেকে ঘুরে ঘুরে দেখে বলল-
-” খুব বেশি বয়সের লাগে আমাকে?
এজওয়ান সরু চোখে তাকালো।
-” আমার কথা বলেছি। তোমার না।
বাশার সুলতান গা ঝাড়া দিলো। ভাবসাব নিয়ে বলল-
-” বয়স তো হবেই তোর।
-” ভাইজান কোথায়?
-” সকাল সকাল দেখলাম সেজেগুজে বের হয়েছে।
-” কোথায় গেছে?
-” তা জানি না। দেখলাম স্যুটবুট পড়ে টাই বেঁধে যাচ্ছে।
-” মেবি আজ কোনো মিটিং আছে?
-” হয়তো।
-” আচ্ছা শোনো,আমি আর মাহি ভাবছি হানিমুনে যাব।
বাশার সুলতান ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
-” আমাকে শোনানোর কি আছে?
-” তাহলে কাকে শোনাবো আমি? দাদা ডাক তুমি শুনবে নাকি বাহিরের মানুষ শুনবে হু?
বাশার সুলতান কেশে উঠলো।
-” এখন কি ব্যবস্থা আমার করে দেওয়া লাগবে?
-” হুমম। তোমার বাগান বাড়িটায় গেলে কেমন হয়?
-” চট্টগ্রাম?
-” হুমম।
-” তাহলে আমার একটা শর্তে রাজি হয়ে যা?
-” কি শর্ত?
-” রাজনীতি তে ঢোক। সামনের নির্বাচনে সোলেমান মন্ত্রী হলে এমপির জায়গায় তো কাউকে লাগবে। তুই এখন থেকেই ঢুকলে হতে পারবি।
-” কেনো ইব্রাহিম ভাই আছে তো।
বাশার সুলতান চোখ পাকিয়ে তাকালো।
-” সুলতান বংশের ছেলে তুই। ইব্রাহিম মেয়র। মেয়রই ঠিক আছে। সোলেমানের পর তোকেই তো বসতে হবে।
-” সরি আই হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট। বিজনেস সামলাচ্ছি সেটাই যথেষ্ট।
এজওয়ান চলে গেলো। বাশার সুলতান বিরক্ত হলো। এই ছেলের সাথে কথা বলা মানে গাধার সাথে বকবক করে নিজের মুখটাই ব্যথা করা।
ইব্রাহিম আর ইমন আজ সামনা-সামনি বসে নাস্তা করছে। ইব্রাহিম ছুরি দিয়ে চিকেন কাটছে আর ইমন কে বারবার দেখছে। কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু বিষয় টা কেমন দেখাবে সেটা ভেবেই চুপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কৌতূহল ও তো দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। গলা ঝেড়ে ইব্রাহিম প্রশ্ন করেই ফেললো—
-” ইমন তোমার আর ঊর্মির বিয়ে কবে?
কথাটা কানে আসতেই খাবার আঁটকে গেলো ইমনের। বিষম খেয়ে অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। ইব্রাহিম তড়িঘড়ি করে পানির গ্লাস টা এগিয়ে দিলো। ইমন এক বারে পুরো পানিটা খেয়ে শেষ করলো। বড়বড় করে দম নিয়ে ইব্রাহিমের দিকে তাকালো।
-” ঠিক আছো তুমি?
ইমন ট্যিসু দিয়ে মুখ মুছে বলল-
-” এখনই তো মে’রে ফেলতেন আমায় স্যার।
ইব্রাহিম চুপসে যাওয়া মুখ নিয়ে বলল-
-” কি এমন বললাম যে এটা বলছো? ভালোবাসো, বিয়েতো করবেই একদিন। লজ্জা পাওয়ার কি আছে?
-” স্যার আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে ঊর্মি আমার…
-” হবু বউ তাই তো?
-” আস্তাগফিরুল্লাহ নাউজুবিল্লাহ, স্যার কি বলছেন এসব? ঊর্মি আমার বোন।
-” কাজিন তাই না? কাজিন কাজিন তো আজ অহরহ বিয়ে হচ্…
-” স্যার ঊর্মি আমার মায়ের পেটের বোন। আপনি কিসব বলছেন এসব!
ইব্রাহিম এবার নিজেও বিষম খেলো কথাটা শুনে। তাড়াতাড়ি করে পানি খেয়ে বলল-
-” ঊর্মি তোমার মায়ের পেটের বোন
-” হুমম। কিন্তু আপনি ঊর্মি কে চিনেন কি করে?
-” ঊর্মি তো মেহরিনের বেস্ট ফ্রেন্ড।
-” হুমম কিন্তু আপনি মেহরিন কেই বা কিভাবে চিনেন?
-” না চেনার কি আছে। মেহরিন তো সোলেমানের বউ।
কথাটা কানে আসতেই ইমনের হৃৎপিণ্ডের গতি আকস্মিক ভাবে থেমে গেলো। সোলেমান সুলতানের বউ মেহরিন!
-” তোমায় বিয়েতে কেনো দেখলাম না ইমন? তুমি তো আমার আর সোলেমানের সাথেই যেতে পারতে। ইভেন ঈদে তো তোমাদের বাড়িতেও গিয়েছিলাম আমি মাংস দিতে। তোমায় দেখলাম না তো!
ইমনের মনে পড়লে মেহরিনের শ্বশুর বাড়ি থেকে মাংস এসেছিল ইমনদের বাসায়। তারমানে ইব্রাহিম ই দিয়ে গিয়েছিল! ঘুরেফিরে ইমন মেহরিনের শ্বশুর বাড়ির লোকের বাসায়ই কাজ করছে!
-” কি হলো চুপ করে গেলে যে?
ইমন কোনো জবাব না দিয়ে বসা থেকে উঠে চলে গেলো। টেবিলে পড়ে রইলো ইমনের ফোন টা।
ইব্রাহিমের কপাল কুঁচকে আসলো। ইমন চলে গেলো কেনো? কথাটা ভাবতেই ইমনের ফোনে কল আসলো। ইব্রাহিম তাকালো ফোনের দিকে। যাহ্ ছেলেটা তো ফোন টা রেখে চলে গেছে।
ইব্রাহিম ফোনটা হাতে নিলো। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাগান বাড়ি খুঁজে দেখলো ইমন নেই। এদিকে ফোনটাও বেজে চলছে। ইব্রাহিম কি ধরে কথা বলবে? কে না কে ফোন দিয়েছে। কথাটা একবার ভাবতেই হাতের স্পর্শে ফোন টা রিসিভ হয়ে গেলো। ওপাশ থেকে কেউ বলছে-
-” হ্যালো ভাইয়া? শুনছিস? হ্যালো?
ইব্রাহিম তাকালো ফোনের দিকে। আরেহ্ ফোন দেখি রিসিভ হয়ে গেছে! ফোনটা কানে নিয়ে ইব্রাহিম হ্যালো বলল। ঊর্মি আকস্মিক অপরিচিত গলার স্বর শুনে ফোনটা মুখের সামনে নিয়ে আসলো। নাহ্ নম্বর তো ঠিকই আছে।
-” আপনি কে? আমার ভাইয়ার ফোন আপনার কাছে কেনো?
ইব্রাহিম বুঝলো ঊর্মি এটা। গলা ঝেড়ে গম্ভীর গলায় বলল-
-” আমি তোমার ভাইয়ার স্যার বলছি পিচ্চি মেয়ে।
ঊর্মি ভ্রু কুঁচকালো।
-” আপনি পিচ্চি বলছেন কেনো আমায়? আমার ভাইয়াকে দিন ফোনটা। কথা আছে।
-” তুমি পিচ্চি সেজন্য পিচ্চিই বলছি।
-” এত কথা কেনো বলছেন? আপনাকে না বললাম আমার ভাইয়াকে ফোন টা দিতে?
-” তোমার ভাইয়া নেই আশেপাশে। আসলে দিয়ে দিব।
-” ভাইয়া আসলে বলবেন ঊর্মি ফোন দিয়েছিল। কল ব্যাক করে যেন।
-” জ্বি অবশ্যই। তা ভালো আছো পিচ্চি মেয়ে?
ঊর্মির রাগ হচ্ছে বারবার পিচ্চি শব্দ টা শুনে। ফোনটা কেটে দিলো। কাটা শেষে বিরবির করে অসভ্য বলে কয়েকটা গা’লি দিলো।
দুপুরের দিকে জোহরের নামাজ শেষে ভাতঘুম দিয়েছিল মেহরিন। এখন বাজে বিকেল সাড়ে ৪ টা। আকস্মিক গাড়ির শব্দ কানে আসতেই ঘুমটা ভেঙে যায় মেহরিনের। কিছুটা সময় নিয়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো। কেবলই ঘুমঘুম চোখে হাই তুলছিলো মেহরিন। হুট করে সোলেমান কে রুমের ভেতর ঢুকতে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। পড়নে ডার্ক নেভি ব্লু শার্ট, ব্লু টাই,ব্লাক স্যুট, কালো প্যান্ট, কোমরে কালো বেল্ট, পায়ে চকচকে অক্সফোর্ড শু। বাঁ হাতে কালো ডায়ালের ঘড়ি। চুলগুলো আগের তুলনায় ছোট করে ফেলেছে ফেলছে।
মেহরিনের হাত সোজা বুকে চলে গেলো। বাপ্রে সুলতান সাহেব কে ফাস্ট টাইম সে এই লুকে দেখে হার্টবিট ফাস্ট দৌড়াচ্ছে। উনি যে আসবে সেটা সকালে কেনো বললো না? ১০ টার দিকে তো কথা হয়েছিল।
মেহরিন কোনো রকমে বসা থেকে উঠে দৌড়ে গিয়ে সোলেমানকে জড়িয়ে ধরলো। তার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না উনি এসেছেন!
সোলেমান বিজনেস মিটিং এর জন্য রাজশাহী এসেছিল। বিজনেস টাইমে আর রাজনীতি টাইমে সোলেমান দু জায়গায় দু রকম রোল প্লে করে।
মিটিং টা শেষ করেই সে বউয়ের কাছে ছুটে আসলো। আর রুমাইসাও কদিন আগে বলেছিল বউকে নিয়ে একটু ঘুরতে। বিয়ের পর থেকে তো সময়ই দেয় নি বউকে।
সোলেমান চেপে ধরলো বউকে নিজের সাথে। কলিজা টা ঠান্ডা হলো।
মেহরিন খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলল-
-” আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না আপনি এসেছেন?
বউকে বিশ্বাস করানোর জন্য মেহরিনের গালে কপালে অসংখ্য চুমু খেলো সোলেমান। মেহরিন নুইয়ে মাথা ঠেকালো সোলেমানেী বুকে।
-” সকালে বললেন না কে আপনি আসবেন?
-” বললে কি আর সারপ্রাইজ দেওয়া হতো? ফটাফট রেডি হয়ে নাও।
মেহরিন বুখ থেকে মাথা উঠিয়ে বলল-
-” কেনো?
সোলেমান মেহরিনের নাকের সাথে নাক ছুঁইয়ে দিয়ে বলল-
-” একান্তে কিছুটা টাইম পাস করা যাক। বিয়ের পর তো বরের সাথে ঘোরার সময় পাও নি। তাই আজ ল্যাদা বউ নিয়ে ঘুরবো।
-” সত্যি?
-” হুমম।
-” কোথায় যাব আমরা?
-” ঠিক করি নি। আগে রেডি তো হও।
মেহরিন আলমারি খুলে জামাকাপড় দেখতে লাগলো। বুঝতেছে না কি পড়বে।
-” কি পড়বো?
সোলেমান এগিয়ে এসে বলল-
-” শাড়ি সামলাতে পারো?
-” হুমম পারি।
-” আচ্ছা তাহলে শাড়ি পড়ো।
মেহরিন অফ হোয়াইট কালারের শাড়িটা বের করে সোলেমান কে বলল-
-” আপনি একটু বাহিরে যান।
সোলেমান টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলল-
-” কেনো?
-” চেঞ্জ করবো তো।
-” আমার সামনেই করো। আমি তো পরপুরুষ নই।
মেহরিন চোখ খিঁচে বলল-
-” লজ্জায় ম’রেই যাব আমি। প্লিজ।
-” বাহিরে যেতে পারবো না। উল্টো ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। হাতে তোমার জাস্ট ১০ মিনিটস। এর ভেতর যা করার করবে।
সোলেমান রুমের দরজা টা লাগিয়ে পিছু ফিরে হাত ঘড়িতে সময় দেখতে লাগলো। মেহরিন তড়িঘড়ি করে ড্রেস টা চেঞ্জ করে ব্লাউজ পেটিকোট পড়ে শাড়ি জড়িয়ে নিলো কিন্তু কুঁচি দেওয়ার আগেই সোলেমান ঘুরে দাঁড়ালো। মেহরিন হকচকিয়ে গেলো সোলেমানের ফেরায়।
-” আমার হয় নি তো।
সোলেমান এগিয়ে আসতে আসতে বলল-
-” ১০ মিনিট তো শেষ। বাকি টা এখন এভাবেই করো।
মেহরিন উল্টো ঘুরে কুঁচি টা গুঁজে বুকের আঁচল টা ঠিক করে পাশে ঘাড় বেকাতেই দেখলো সোলেমান তাকিয়ে আছে আয়নার দিকে। আয়নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মেহরিন কে। লজ্জায় পড়ে গেলো মেহরিন।
-” শেষ?
-” হুমম। চুলটা বাঁধবো।
-” না, খোলাই রাখো। আই লাভ লং হেয়ার। চোখে গাঢ় করে কাজল দাও। লিপস্টিক না দিলেও চলবে। তোমার ঠোঁট এমনিতেই গোলাপি।
মেহরিন সোলেমানের কথা মতন চুল খোলা রাখলো। চোখে গাঢ় কাজল দিলো। মুখে ময়েশ্চারাইজার দিলো। ঠোঁটে লিপস্টিক দিলো না তবে লিপবাম দিলো।
আয়নায় শেষবার নিজেকে দেখে নিলো। মেহরিনের পেছনেই সোলেমান দাঁড়ানো। আয়নায় মেহরিনের দিকেই তাকিয়ে আছে। মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
-” সব ঠিকঠাক?
সোলেমান ঠোঁটের কোনে হাসি ঝুলিয়ে বলল-
-” সব পারফেক্ট। যাওয়া যাক মিসেস সুলতান?
সোলেমান ডান হাত বাড়িয়ে দিলো। মেহরিন তার বাম হাত বাড়িয়ে দিতেই সোলেমান আলতো হাতে ধরে নিচে নেমে আসলো। আফিয়া সুলতান আর রুমাইসা বসার ঘরে বসা ছিলো সোফায়। সোলেমান বউকে নিয়ে যেতে যেতে বলল-
-” ফিরতে দেরি হবে আম্মা।
আফিয়া সুলতান খুশিই হলো। যাক ছেলে তার সংসারী হচ্ছে। বউকে পছন্দ হয়েছে।
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে আলতাদীঘি আসে। জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর। প্রকৃতির এক সুন্দর রূপের সাথে যেন সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।
রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে হঠাৎ করেই যখন আপনি পৌঁছাবেন আলতাদীঘির মূল ফটকে, তখন প্রথমেই চোখে পড়বে বিশাল একটি আর্চওয়ে। তার পাশে ছোট টিকিট কাউন্টার। ঢুকতেই গাছের ছায়ায় ঢাকা ছোট পাকা রাস্তা, দুপাশে নানান প্রজাতির গাছ, সেগুন, শাল, গর্জন, আকাশমণি, মেহগনি আর বট অশ্বত্থ।উদ্যানের ভেতরটা বেশ ঘন জঙ্গলের মতো। হালকা আলোছায়ার খেলা চারদিকে। পায়ে চলা মেঠো পথ, কখনও উঁচু-নিচু। চারপাশে শুধু পাখির কিচিরমিচির শব্দ।
আনুমানিক ১৪০০ সালে এ অঞ্চলে রাজত্ব করতেন রাজা বিশ্বনাথ জগদল। রাজার রাজত্বকালেই একবার পানির প্রকট অভাব দেখা দেয়।
মাঠ ঘাট শুকিয়ে চৌচির হওয়ায় আবাদি জমিতে ফসল ফলানো হয়ে ওঠে অসম্ভব। হঠাৎ একদিন রাণী স্বপ্নে দেখলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না পা ফেটে রক্ত বের হবে ততক্ষণ তিনি হাঁটতে থাকবেন এবং যেখানে গিয়ে পা ফেটে রক্ত বের হবে ততদূর পর্যন্ত একটি দিঘী খনন করে দিতে হবে। প্রজাদের দুঃখ দুর্দশা দূর করে রানী স্বপ্ন অনুযায়ী হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলেন।
সঙ্গে ছিল রানীর পাইক পেয়াদা, লোক লস্কর। অনেক দূর হাঁটার পরও যখন রানী থামছিলেন না, তখন পাইক-পেয়াদারা ভাবলেন এত বড় দিঘী খনন করা রাজার পক্ষে সম্ভব হবে না। এসময় তাদের একজন রানীর পায়ে আলতা ঢেলে দিলেন আর চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘রানী মা, আপনার পা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। একথা শুনে রানী সেখানেই বসে পড়েন। রাজা বিশ্বনাথ ওই স্থান পর্যন্ত একটি দিঘী খনন করে দিলেন। সেই থেকে এর নাম আলতাদিঘী।
এখানে আরো একটি আকর্ষণীয় জিনিস আছে।
সেটা হলো ওয়াচ টাওয়ার। টাওয়ারে উঠলে চোখে পড়বে সবুজের বিশাল কার্পেটের মতো বিস্তৃত বনভূমি এবং দীঘির মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য। বাতাসে দোল খাওয়া গাছের পাতা আর পাখিদের উড়ে বেড়ানো দৃশ্য। টাওয়ারে ওঠার কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও একবার চূড়ায় পৌঁছালে সব ক্লান্তি ভুলে যায়। তবে ২০২০ সালে ওয়াচ টাওয়ারের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না সেখানে।
সোলেমান মেহরিনের এক হাতধরে রেখে আরেক হাত পকেটে গুঁজে রেখেছে। মেহরিন আশেপাশে তাকালো। তার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। বিরবির করে বলল-
-” আমার ভীষণ অস্বস্তি লাগছে সুলতান সাহেব।
-” খুব বেশি অস্বস্তি লাগছে?
-” হুমম। এভাবে তো কখনও বের হই নি। হিজাব বাঁধা উচিত ছিলো আমার। ভুলে গেলাম কি করে আমি!
সোলেমানের ও ভাবনায় আসলো কথাটা। আসলেই তো সে কি করে তার বউকে এভাবে নিয়ে আসলো?
চারপাশের লোকজন বারবার তাকাচ্ছিল এই যুগলবন্দী কাপলের দিকে। পাশ থেকে প্রশংসার ফুলঝুরিও শোনা যাচ্ছিল। লোকজন একে ওপরকে বলছে-
-” দেখ দেখ লোকটা কি হ্যান্ডসাম। বাপ্রে একদম কোরিয়ান ড্রামার নায়কদের মতন।
পাশের জন বলছে।
-” মেয়েটাকেও দেখ। কি সুন্দর মানিয়েছে। কি লম্বা চুল। একদম মেইড ফর ইচ আদার।
সোলেমানের কপালে বিরক্তের ভাজ পড়লো। নিজেকে ইচ্ছে মতো বকে দিলো মনে মনে। এমন ভুল হয় কি করে? সাথে সাথেই উল্টো ফিরে সে মেহরিন কে নিয়ে চলে আসলো। ১০ মিনিটও তারা থাকে নি সেখানে। একটা নামি-দামি রেস্টুরেন্টে সোলেমান তার আর তার বউয়ের জন্য ক্যান্ডেলাইট ডিনারের ব্যবস্থা করেছে। সেখানেই ডিনার সেরে তারপর বাড়ি ফিরবে তারা।
সোলেমান মেহরিনের সিট বেল্ট টা বেঁধে দিলো। চারিদিকে আঁধার নেমে এসেছে। রাস্তা ঘাট একটু নিরিবিলি হয়ে এসেছে। আকাশটাও কালো হয়ে এসেছে। হয়তো বৃষ্টি নামবে।
সোলেমান গাড়ি ড্রাইভ করছে। মেহরিন বারবার আঁড়চোখে সোলেমান কে দেখে চলছে। মেহরিন ভাবছে তার সুলতান সাহেব আবার রেগে গেলো নাকি? চোখমুখে কেমন রাগের আভাস।
সোলেমান ভীষণ রেগে আছে। তবে সেটা নিজের করা বোকামির জন্য। কিন্তু বউ বারবার আড়চোখে তাকানোর ফলে রাগের ভাঁটা সরে যেতে শুরু করছে।
গাড়ির ভেতর জ্বলতে থাকা আলোয় মেহরিন কে আকর্ষণীয় লাগছে। এভাবে আড়চোখে তাকিয়ে থাকলে গাড়ি চালানো যায় নাকি?
সোলেমান পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাউকে ফোন করে বলল-
-” আমাদের টেবিল টা ফোর্থ ফ্লোরে সাজাও। টেবিলের আশেপাশে তো দূর ফোর্থ ফ্লোরের আশেপাশেও যেন কারো ছায়া না দেখি আমি। গট ইট?
সোলেমান ফোনটা কেটে দিয়ে একহাতে ড্রাইভ করে আরেক হাত দিয়ে মেহরিনের সিটবেল্ট টা খুলে দিয়ে মেহরিন কে হেঁচকা টান দিয়ে বুকের উপর এনে ফেলে মাথায় চুমু খেয়ে বলল-
-“ হেই ল্যাদা বউ! Aise Na Mujhe Tum Dekho
Seene Se Laga Loonga
Tumko Main Chura Loonga Tumse
Dil Mein Chhupa Loonga….
মেহরিন ভরকে যায় আকস্মিক এমন করায়। সোলেমানের এক হাত মেহরিনের শাড়ি ভেদ করে উন্মুক্ত কোমরে বিচরণ করছে। সেই হাত খামচে ধরলো মেহরিন। সোলেমান জোরে ব্রেক কষলো। দাঁত চেপে বলল-
-” হাত সরাও ল্যাদা বউ।
দাহশয্যা পর্ব ৪০
মেহরিন হাত সরিয়ে ফেললো। সোলেমান মেহরিন কে আরো নিজের সাথে চেপে নিয়ে এক হাত মেহরিনের গালে রাখলো। মেহরিনের শরীর কাঁপছে। ঠোঁট কাপছে। সোলেমান সেই কম্পিত ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আছে। শরীরের উত্তেজনা কেমন যেনো বেড়ে গেলো। নিজেকে নিজের মধ্যে আঁটকে রাখাই যাচ্ছে না। নিজেরই তো বউ। পরনারী তো আর না। এতো আঁটকে রেখে কি হবে নিজেকে? আর কত সাধু পুরুষ সেজে থাকবে সে? সোলেমান মেহরিনের ঠোঁটের দিকে নিজের ঠোঁট এগিয়ে নেয়। দু’জনের শরীরই অসম্ভব ভাবে কাঁপছে। নিশ্বাস দ্রুত ফেলছে। সোলেমান চোখটা বন্ধ করে মেহরিনের ঠোঁট নিজের দখলে নিয়ে নিলো। আর ঠিক তখনই পেছন থেকে গুলি ছোড়ার শব্দ ভেসে আসলো…
