Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮৬

দাহশয্যা পর্ব ৮৬

দাহশয্যা পর্ব ৮৬
Raiha Zubair Ripti

নিরব কোলাহল মুক্ত রাত। সকল মানুষ এখন ঘুমে বিভোর হলেও এই মধ্যরাতে নির্ঘুমে আছে এজওয়ান। বেলকনির ইজি চেয়ারে বসে সিগারেট মুখে নিয়ে একটা টান দিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন টা বের করলো। কল লিস্টে গিয়ে স্ক্রোল করে খানিক টা নিচে একটা কাঙ্খিত নম্বর পেলো। কিছু একটা ভেবে নিয়ে কল করলো। প্রথমবারেই কল রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে ভেসে আসলো এক মিষ্টি মেয়েলি সুরেলা কণ্ঠ –
“ এজওয়ান সুলতান ফোন করেছে দেখছি! সূর্য কি ভুল করে বাংলাদেশে পশ্চিম দিক থেকে উঠেছে নাকি আজ?”
এজওয়ান মুচকি হাসলো এ কথা শুনে। আকাশের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে দিতে দিতে বলল-

“ ইউ নো,আমি দরকার ছাড়া কাউকে নক করি না। ”
“ তা কি দরকার আমাকে,বলো শুনি। ”
“ তুমি বলেছিলে আমি যেন বাংলাদেশি একটা ছেলে খুঁজে দেই তোমার জন্য। ”
মেয়েটা হাসতে হাসতে ওপাশ থেকে জবাবে বলল-
“ তুমি কি কথাটা সিরিয়াসলি নিয়ে নিয়েছো এজওয়ান। ”
“ অফকোর্স। আমি ছেলে দেখেছি তোমার জন্য। দারুন মানাবে তোমার সাথে। তুমি দেখতে পারো।”
“ এই বোকা ছেলে আমি জাস্ট ফান করেছিলাম। ”
“ বাট অ্যাম সিরিয়াস ফ্লোরা। বিয়ে শাদি তো করবেই একদিন। এই ছেলেটাকে চুজ করতে পারো। গ্যারান্টি ওয়ারেন্টি দুটোই দিতে পারি। তুমি ঠকবে না। ”

“ আচ্ছা পাঠাও ছবি টা। দেখি কেমন ছেলে পছন্দ করলো আমার বন্ধু আমার জন্য। ”
এজওয়ান হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠালো একটা ছেলের। ফ্লোরা ছবি টা দেখলো। ইউনিফর্ম পড়া সুঠাম দেহের এক সুপুরুষ। প্রথম দেখাতে যে কারোর চোখ আঁটকে যাবে।
“ দেখে কি সিদ্ধান্ত নিলে তুমি ফ্লোরা? পছন্দ হয়েছে? যদি না হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে তোমার চয়েস যথেষ্ট বাজে। ”
“ ছেলেটা দেখতে শুনতে তো ভালোই। তবে..”
“ তবে কি? ”
“ ছেলে তো বোধহয় আইনের লোক। ইউ নো না,আমার আবার আইনের লোক পছন্দ না।”
“ সো হোয়াট? খুবই দায়িত্বশীল আর সৎ একজন অফিসার। ”
“ ঠিক আছে আমি জানাবো পরে। ”
“ এখনই ভেবে জানাও। তুমি রাজি না হলে অন্য মেয়ে দেখতে হবে। ”
“ এত তাড়া কিসের? ”
“ ছেলেটা বিয়ে করার জন্য অধৈর্য হয়ে গেছে। ছেলের বাপও চাচ্ছে তাড়াতাড়ি একটা ছেলের বউ। এখন আমি ঘটকালি করছি। তুমি রাজি হলে বিডিতে চলে আসো কালকের মধ্যে। বাকি কথা বাংলাদেশে আসার পর বলা হবে। ”
“ ঠিক আছে আমি আসছি। ”
“ থ্যাংকিউ ফ্লোরা। বাই। ”

এজওয়ান ফোন কেটে রুমে আসলো। মাহি ঘুমে বিভোর। বিছানার মাঝখানে লম্বা কোলবালিশ। মাহি প্রতি রাতে ঘুমানোর সময় এটা দিয়ে রাখতে ভুলে না, আর এজওয়ান নিজ দায়িত্বে সেই দেওয়াল ভেঙে দিতে ভুলে না। এজওয়ান হাসে। হো হো করে গা দুলিয়ে হাসতে ইচ্ছে করছে। হায়রে শ্যাটা ভাঙ্গা জীবন। একটা থার্ড ক্লাস মেয়ের জন্য তার জীবন পুড়ে! আবার ভালোও লাগে পুড়তে। নতুন অভিজ্ঞতা হয়। আর এজওয়ানের ডিফারেন্ট ডিফারেন্ট অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে ভালোই লাগে। এজওয়ান আলতো ধীর পায়ে হেঁটে আলমারির কাছে গেলো। আলমারির কিছুটা নিচে থাকা কাঙ্ক্ষিত একটা বক্স সে বের করলো। কাঠের সেই বক্সটা খুলতেই দেখা মিললো অতি পরিচিত একটা জিনিস। নিজ হাতে ধার দিয়ে রেখেছিল এজওয়ান। হাল্কা একটু ঘেঁষা লাগলেই চামড়া কে’টে গলগল করে র’ক্ত বের হতে ভুল হবে না। এজওয়ান ছু’রি টা হাতে নিয়ে মাহির দিকে ঘুরে তাকালো। ড্রিম লাইটের আলোয় মাহিকে অপ্সরার চেয়ে কম লাগছে না। এজওয়ান ছুরি টা মুখের সামনে ধরে বিরবির করে বলল-

“ তোমাকে না যতটা যত্নে আমি রেখেছিলাম তরিকুলের বেটি, তার চেয়েও বেশি যত্নে আমি এটাকে রেখেছিলাম। ভবিষ্যতে এটার সদ্ব্যবহার আমায় করতে হতে পারে।” কিছুটা থেমে এজওয়ান আবার বলল-“ এই খেলার শুরুটা তোমার হাত ধরে,মাঝখানের সব চালও তুমি চালবে। কিন্তু শেষ চালটা হবে কেবল আমার। তুমি ভাববে তুমি এই খেলার মাস্টারমাইন্ড,তোমার কথাতেই সব হচ্ছে, তুমিই সব কিছু কে কন্ট্রোল করছো। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে তুমি হচ্ছো এই খেলার জাস্ট একটা গুটি মাত্র। আর আমি এজওয়ান সুলতান হচ্ছি এই খেলার গডফাদার। যে কি না মাঠের বাইরে বসে তোমার পুরো খেলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তোমার প্রতিটা চাল, প্রতিটা পদক্ষেপকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তোমার কোনো কিছুই এই এজওয়ান সুলতানের দৃষ্টি সীমার বাহিরে নয় মিসেস সুলতান… ”
মাহি একটু নড়েচড়ে উঠতেই এজওয়ান ছু’রি টা জায়গা মতো রেখে লক করে দিলো। তারপর বিছানায় এসে মাঝখান থেকে কোলবালিশ টা সরিয়ে মাহির গা ঘেঁষে মাহির দিকে ফিরে শুয়ে পড়লো।

মির্জা বাড়ি…বাজে এখন সকাল সাতটা। সাফওয়ান মনোযোগ দিয়ে ব্রেকফাস্ট করছে। পাশেই শামসুল মির্জা ১০-১২ টা মেয়ের ছবি নিয়ে বসে আছে। ছেলেকে কখন থেকে বলে যাচ্ছে মেয়ে গুলোর ছবি দেখতে। কিন্তু এই ছেলে তো ফিরেও তাকাচ্ছে না। ভীষণ রেগে গেলেন তিনি এজন্য। ঠাস করে ছবি গুলো টেবিলে রেখে রাগী গলায় বলল-
“ তুমি কি চাও আমি এই বুড়ো বয়সে তোমার টেনশনে হার্ট অ্যাটাক করে ম’রে যাই? ”
সাফওয়ান ব্রেডে কামড় বসিয়ে বলল-
“ কেনো চিন্তা করো আমাকে নিয়ে বুঝি না। আমি তো আর ফিটার খাওয়া বাচ্চা নই যে তুমি চিন্তা করবে। ”
“ বাপ তো আমি। ছেলে আমার যদি একঘেয়ে হয়ে থাকে,বিয়ে শাদি করবে না বলে পন করে তাহলে তো আমাকে চিন্তা করতেই হবে। বিশে শাদি করে নাও। জীবনে তোমাকে নিয়ে চিন্তা করবো না। ”
“ বিয়ে শাদি ছাড়া কোনো কথা থাকলে বলো। আমি শুনবো। ”
“ বিয়ে শাদি কেনো করবে না তুমি? ”
“ তুমি খুব ভালো করেই জানো কেনো করবো না। ”
“ মাহির জন্য? তুমি চাও না সাফওয়ান মাহি ভালো থাকুক?”
“ অবশ্যই চাই। ”

“ তাহলে তাকে ভালো থাকতে দাও। এজওয়ান কে নিয়ে তোমার যেই ভুল ধারণা ছিলো সেটা তো ভেঙে গেছে। ছেলেটা ভালোবাসে মাহি কে,বিয়ে হয়ে গেছে তাদের। সংসার করতে দাও তাদের। তোমাকে নিয়ে তাদের মধ্যে ঝামেলা হয়। আমি চাই না আমার ছেলের জন্য কারো সংসারে ঝামেলা হোক। ”
“ আমি কি ওদের সংসারে গিয়ে থাকছি নাকি? তাহলে?”
“ থাকছো না। কিন্তু তুমি বিয়ে টা করে নিলে তো সব সমস্যাই মিটে যায়। বাবার কথাটা শোনো এবার। আমার একটা মেয়েকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। কথা বলে দেখো। দেখা করে তো দেখো। পছন্দ হবে আশা করি। না হলে না-ই। জোর করবো না। ”

“ প্রমিস করো জোর করবে না? পছন্দ না হলে আর ঘ্যানঘ্যান করবে না বিয়ে নিয়ে।”
“ ঠিক আছে করবো না। ”
“ ঠিক আছে,এটাই ফাস্ট আর এটাই লাস্ট।”
সাফওয়ান জুশ টা খেয়ে চলে গেলো ব্যুরোতে।
শামসুল মির্জা এজওয়ান কে ফোন করলো। এজওয়ান তখন ঘুমে ছিলো। শামসুল মির্জার ফোন পেয়ে এজওয়ান ঘুম ঘুম চোখে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল-
“ রাজি হয়েছে আপনার ছেলে?”
“ হু। তবে অপছন্দ হলে বলেছে আর মেয়ে দেখাতে না। ”
“ ভরসা রাখুন আমার উপর। মেয়ে অপছন্দ হবেই না। ”
“ আসবে কবে মেয়ে?”
এজওয়ান ফোনে সময় দেখে নিয়ে বলল-
“ বিকেলের আগে পৌঁছাবে বাংলাদেশে। আগামীকাল দেখা করার ব্যবস্থা করুন। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে আপনার ছেলের বিয়েটা দেখে যেতে চাই।”

“ ঠিক আছে। আমি তাহলে সাফওয়ান কে বলছি আগামীকালকের কথা। ”
এজওয়ান ফোন কেটে বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে গেলো ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে অফিসে গেলো কাজকর্ম গুলো সেরে ফেলতে।
মাহি টুকটাক রান্না শেখার চেষ্টা করছে মেহরিনের থেকে। মেহরিনের ভালো লাগছে মাহির এমন আগ্রহ দেখে। এভাবেই যেন আস্তেধীরে তাদের সম্পর্ক টা স্বাভাবিক হয়।
সাফওয়ান ব্যুরোতে আসার পর খবর পেলো বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে জঙ্গিদের উপদ্রব বেড়েছে। পরশু যেতে হতে পারে।
এজওয়ান অফিসের কাজকর্ম সব শেষ করতে করতে ফ্লোরার ফোন পেলো। ফ্লোরা চলে এসেছে বিডি। ঢাকার একটা হোটেলে উঠেছে। এজওয়ান কাজ গুলো ফেলে রেখেই হোটেলে চলে গেলো দেখা করতে।
ফ্লোরা এ নিয়ে দ্বিতীয় বার বাংলাদেশে আসলো। প্রথম বার এসেছিল বাবার সাথে বিজনেসের কাজে। দ্বিতীয় বার আজ আসলো নিজের বিয়ের বিষয়ে কথা বলতে। এজওয়ান হোটেলে আসতেই অনেক কথাবার্তা বলো। সাফওয়ানের বিষয়ে অনেক চমৎকার চমৎকার কথা শুনলো। তবে এজওয়ান লুকিয়ে গিয়েছে সাফওয়ান আর মাহির সম্পর্কের বিষয় টা। সব শুনে ফ্লোরার মনে হলো দেখা করা যেতে পারে। দুজনের দুজনা কে পছন্দ হলে ফ্লোরা তার বাবা কে জানাবে বিষয় টা। এজওয়ান কথাবার্তা বলে বিদায় নেওয়ার সময় বলল-

“ আমার বডিগার্ড গুলো সবসময় তোমার খেয়াল রাখবে ফ্লোরা। ডোন্ট ওয়ারি। তুমি নিরাপদ এখানে। আঙ্কেল কে চিন্তা করতে না করো। কাল দেখা করে এসো। তারপর বাকি কথা হবে। ”
ফ্লোরা মাথা নাড়ালো। এজওয়ান নিবাসে চলে আসলো সেখান থেকে। বাসায় এসে রাতে ডিনার করার সময় এজওয়ান জানলো আজ নাকি মাহি রান্না করছে। মেহরিন দেখিয়ে দিয়েছে শুধু। এজওয়ান কোনো কথা বললো না। চুপচাপ খেয়ে রুমে চলে গেলো। বাশার সুলতান এক চিমটি প্রশংসা করে বলল- হয়েছে কোনোরকম।
মাহি মুখ ভার করে রইলো। এজওয়ান কিচ্ছু বললো না! আজ সারাদিনে তাদের না হয়েছে কথা,আর না হয়েছে ঝগড়া। সিরিয়াস কিছু হয়েছে নাকি?
মাহি এঁটো থালাবাসন ধুয়ে রুমে আসতেই এজওয়ান বলল-
“ তোমার কি কোনো কেনাকাটা করার লাগবে তরিকুলের বেটি? তাহলে কাল করা যেতে পারে। আমি ফ্রী আছি। আর তাছাড়া আমাদের কখনও বাহিরে একসাথে খেতে যাওয়া হয় নি। তুমি ফ্রী থাকলে চলি?”
মাহি ছোট করে জবাব দিলো –

“ হু ফ্রী আছি,আমি। ”
এজওয়ান ল্যাপটপে কিছু কাজ করে বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। মাহি একবার সেদিকে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো। কতদিন হলো সে মুক্ত বাতাসে আর আগের মতো ডানা মিলে ঘুরে না। এবার হয়তো পারবে।
পরের দিন দুপুরে এজওয়ান কালো রঙের একটা গেঞ্জি আর তার উপর সেম রঙের জ্যাকেট পড়ে বা হাতে একটা ঘড়ি পড়ে রেডি হলো। মাহি নীল রঙের সেলোয়ার-কামিজ পড়েছে। মেহরিন আর সোলেমান কলেজে। বাশার সুলতান ছেলে আর ছেলের বউ কে ভরদুপুরে বের হতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ কোথাও যাচ্ছিস?”
এজওয়ান জবাব দিলো –
“ হু। ”
“ কোথায়?”
এজওয়ান বিরক্ত গলায় বলল-
“ হানিমুন করতে যাচ্ছি আমি। যাবে তুমি সাথে?”

বাশার সুলতান থতমত খেয়ে গেলো। বেয়াদব ছেলে তার এটা ভুলে যায় কি করে সে। তিনি উঠে যেতে যেতে বলে গেল-
“ যাচ্ছিস যা। সুখবর নিয়ে আসিস আসার পথে। ”
গাড়ি চলছে মোটামুটি ধীর গতিতেই। দুপুর হলেও কড়া রোদ নেই। হাল্কা মৃদু বাতাস আছে। রাস্তায় তেমন জ্যামও নেই। এজওয়ান গাড়ি চালাচ্ছে খুব মনোযোগ দিয়ে। মাহির দৃষ্টি বাহিরে। এজওয়ান গলা ঝেড়ে বলল-
“ তরিকুলের বেটি শোনো। ”
মাহি বাহির থেকো দৃষ্টি সরিয়ে এজওয়ানের দিকে তাক করে বলল-
“ হু বলুন। ”
“ আমাদের ভবিষ্যৎ কি?”
“ জানি না। ”
“ তোমাকে নিয়ে যে আমার অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়ার তীব্র ইচ্ছে আছে। পূরণ কি হবে সেই ইচ্ছে? ”
“ জানি না। ”
“ কি জানো তবে তুমি?”
“ কিছুই জানি না। ”
“ কিছু তো জানো। যেটা জানো সেটাই বলো। ”

“ এটুকুই জানি, এই সম্পর্কে আমাদের শুধু দেহের মিলন হবে। কিন্তু মনের মিলন কোনোদিন হবে না। হয়তো দু এক বছর পর বা পাঁচ বছর পর আমি আপনার সন্তানের মা-ও হবো তবে সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে না ,পুরোটাই অনিচ্ছাকৃত ভাবে। আমাদের সংসার হবে ঠিকই, কিন্তু সেই সংসারে কোনোদিন ভালোবাসা থাকবে না। ”
এজওয়ান কথা গুলো শুনে বাহিরে তাকালো। ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো তাচ্ছিল্যের হাসি। মনে মনে আওড়ালো-
“ এমন একটা দিন তোমার জীবনে আসবে,তরিকুলের বেটি,সেই দিন তুমি আমাকে খুঁজবে। পাগলের মতো খুঁজবে। খুঁজতে খুঁজতে তুমি নিজেই কনফিউজড হয়ে যাবে। আসলে তুমি কি খুঁজছো পাগলের মতো এটা ভাবতে ভাবতেই। আমাকে নাকি আমার ভালোবাসা কে। ”
এজওয়ান কার স্টেরিওতে বোতাম চেপে স্লো ভলিউমে একটা গান ছেড়ে দিলো-
Tu pyar hai kisi aur ka,
tujhe chahta koi aur hai
Tu pasand hai kisi aur ki,
Tujhe maangta koi aur hai…

মাহি গানটা শুনে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
এজওয়ান ড্রাইভে মনোযোগ দিলো। তার জীবনের সাথে কি চমৎকার ভাবেই না মিলে গেছে এটা!
এজওয়ান আর মাহি প্রথমে শপিংমলে ঢুকলো। মাহি কিছু টপস কিনলো,বিউটি প্রডাক্ট কেনার সময় তার হুট করে বাতাসির কথা মনে পড়লো। মেয়েটা কেমন আছে কে জানে। কি মনে করে যেন মাহি বাতাসির জন্যও অথেনটিক কিছু বিউটি প্রডাক্ট কিনলো। শরীরের যত্ন নেয় না মেয়েটা। দেখা হলে দিবে এগুলো। কেনাকাটা শেষে এজওয়ান বিল দিতে গেলে মাহি বলল-
“ আমার কাছে আছে টাকা। আমি দে…”

“ আমি যতদিন আছি ততদিন তোমার খরচ বহন করবো একমাত্র আমি। ওগুলো বরং তুমি বাঁচিয়ে রাখো। ”
এজওয়ান বিল পে করে মাহিকে নিয়ে মল থেকে বেরিয়ে পাশের একরা রেস্টুরেন্টে গেলো খাবার খেতে। ওয়েটার কে ডেকে এজওয়ান খাবার অর্ডার দিলো মাহির পছন্দের। ফোনে একটা কল আসায় এজওয়ান উঠে একটু দূরে চলে যায়। মাহি চেয়ারে বসে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে সবটা। রেস্টুরেন্ট টা বেশ সুন্দর ডেকোরেশন করা। এদিক ওদিক দেখতেই হুট করে মাহির চোখ গেলো পাশের রেস্টুরেন্টে। সাফওয়ান আর একটা মেয়ে হেঁসে হেঁসে কথা বলছে আর খাচ্ছে। মেয়েটার দিকে তাকালো মাহি। কি সুন্দর এই মেয়েটা। শামসুল মির্জা সেদিন বলেছিল ছেলের বিয়ে দেওয়ার জন্য মেয়ে দেখছে। এটাই কি তাহলে সেই মেয়ে! সাফওয়ান বিয়ে করছে! মাহির মাথা ঘুরে গেল। এজওয়ান এসে চেয়ার টেনে বসতেই মাহি তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুমে চলে গেলো। তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। তবে মাহি চায় সাফওয়ান বিয়ে করে মুভ অন করুক। তাহলে এখন কেনো মানতে কষ্ট হচ্ছে? মাহি চোখ মুখে পানি দিলো। নিজের কান্না চেপে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ডোন্ট ক্রাই মাহি,ডোন্ট ক্রাই। সাফওয়ানের বাঁচার অধিকার আছে। সে-ও কাউকে ভালোবাসতে পারে, কাউকে বিয়ে করতেই পারে। এমনটাই হতো আজ হোক বা কাল। তার জন্য তুই প্রস্তুত ছিলি। তাহলে আজ কেনো ভেঙে পড়ছিস? সাফওয়ান আজীবন তোর জন্য অপেক্ষা করবে না। তুই নিজেও এখন বিবাহিত। সাফওয়ান কে সুখে থাকতে দে। সাফওয়ান সুখ ডিজার্ভ করে। একদম কাঁদবি না আর। তুই ভীষণ স্ট্রং একটা মেয়ে। ভুলে যাস না। ”

এজওয়ান প্রথমে বুঝে নাই মাহির ওভাবে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যাওয়ার মানে টা। তবে পাশে তাকাতেই যখন দেখলো ফ্লোরা আর সাফওয়ান কে। তখন ইচ্ছে করলো দুটোকে তুলে আছাড় দিতে। আর জায়গা পেলো না মিট করার জন্য! শালার শ্যাটা ভাঙ্গা জিন্দেগী। বাঁশ আর এজওয়ানের পেছন ছাড়ে না। পাছার সাথে সাথেই লেগে থাকে ঢুকে পড়ার জন্য।
বউয়ের পেছন পেছনই এজওয়ান ছুটে আসে লেডিস ওয়াশরুমের ভেতরে। বউয়ের কান্নার স্বর শুনে এজওয়ান পকেট থেকে টিস্যু বের করে বউয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে চলে যেতে গুন গুন করে গেয়ে গেল-
Dard hota hai, dard hone do
Zakhm gehra hai, ise rehne do
Aankhein roti hain, inhein rone do
Yaad aayi hai, mujhe peene do
মাহি টিস্যুটা দিয়ে নাক মুছে সেটা ডাস্টবিনে ফেলে দিলো।

ইয়াসিন বাতাসির ম্যাডামের সাথে দেখা করেছে। মহিলা বলল- বাতাসি অমনোযোগী। ক্লাসে ঠিকঠাক হোমওয়ার্ক করে না। রেজাল্ট খারাপ হয়েছে এক্সামে। ইয়াসিন কথা গুলো শুনে অবাক হলো। যদিও ইদানিং তেমন একটা খোঁজ খবর রাখা হয় না বাতাসির তার। তবে এত খারাপ স্টুডেন্ট কি আসলেই বাতাসি? ইয়াসিন বিষয়টা দেখবে বলে চলে গেলো। তিন্নি আরো কিছু বলতে চাইলো। কিন্তু ইয়াসিন কাজ আছে বলে চলে গেল।
বাসায় আসতেই ইয়াসিন বাতাসি কে ডেকে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ শুনলাম তুমি খুব অমনোযোগী পড়াশোনার প্রতি? পরীক্ষা খারাপ হয়েছে? কোন সাবজেক্টে খারাপ করেছো তুমি?”
বাতাসি মিনমিন করে জবাব দিলো –
“ ইংরেজি। ”
“ কত পেয়েছো?”
“ ৫৫।”
“ এত কম পাওয়ার কারন কি?”
“ আমি ধরতে পারি নি। পরীক্ষা তো ভালোই দিয়েছিলাম। ”

“ পড়াশোনা করো ঠিকঠাক। তোমার ম্যাডাম বারবার তোমাকে নিয়ে রিপোর্ট দেয়। এমন চলতে থাকলে তোমায় চট্টগ্রাম রেখে আসবো। তখন আর পড়াশোনা করা লাগবে না। তোমার ভাইয়ের স্বপ্নও আর পূরণ করা হবে না। ”
বাতাসি চুপচাপ শুনলো কথা গুলো। রুমে চলে আসতেই রত্না ফোন করলো। সে নাকি তিন্নি ম্যাডাম আর ইয়াসিন কে আজ নীলক্ষেতে দেখেছে। চা খেতে খেতে কথা বলছিলো। ম্যাম ঢ্যাপঢ্যাপ করে ইয়াসিন কে দেখছিলো। তিন্নি ম্যাডাম যেন কেমন। বাতাসির সাথে খারাপ ব্যবহার করে। আবার ইয়াসিনের সাথে হেঁসে হেঁসে কথা বলে। দু মুখো সাপ একটা। ইয়াসিন বাতাসির রুমে এসে জানালো তাকে ক’দিনের জন্য চট্টগ্রাম যেতে হবে। যাওয়ার আগে তাকে সুলতান নিবাসে রেখে যাবে। সোলেমান বলেছে নিয়ে যেতে। বাতাসি মাথা নাড়লো। খাবার খেতে বসে বাতাসি দূরের চেয়ারে বসে ইয়াসিন কে কি মনে করে যেন জিজ্ঞেস করলো-

“ আচ্ছা আমাদের যখন ছাড়াছাড়ি হইয়া যাইবো,তারপর আপনি আরেকটা বিয়ে করবেন তাই না?”
ইয়াসিন খেতে খেতে জবাব দিলো-
“ হু। ”
“ আপনি আমারে ভুলে যাবেন?”
ইয়াসিন বাতাসির দিকে তাকালো।
“ না। ”
“ আপনি আমারে ভালোবাসলেন না ক্যান? আমারে কি একটু ভালোবাসা যায় না? আমারে ভাইয়া ছাড়া আর কেউ কোনোদিন ভালোবাসে নাই। আমার আম্মাও আমারে ভালোবাসে নাই আমার গায়ের রং কালো বইলা। আপনার আম্মাও ভালোবাসছিলো। কিন্তু সেও চইলা গেল। আচ্ছা সুন্দরী রূপবতী , গায়ের রং দুধে আলতা ফর্সা না হইলে কি কারো ভালোবাসা পাওয়া যায় না?”

“ কালো মানুষদের ভালোবাসে কেউ? ওসব উপন্যাস, গল্পেই কালো মানুষদের ভালোবাসা মানায়। বাস্তব জীবনে রূপ টাই আসল। ”
“ আচ্ছা আমি কি খুব কালো তাইলে? শ্যামলাও কি বলা যায় না আমারে?”
“ তোমাকে আমি শ্যামাঙ্গিনী, শ্যামকন্যা বলে উল্লেখ করে মন কে স্বান্তনা দিতে পারি না। তুমি এরচেয়েও ভীষণ কালো। ”
বাতাসি মৃদু হাঁসলো।
“ আপনারা শিক্ষিত মানুষ,কেমনে মুখের উপর সত্যি কথা কইয়া দেন। ”
“ খারাপ লাগলেও। এটাই তিক্ত সত্য। ”
“ পরজন্ম বলতে তো কিছু নাই। নইলে আল্লাহ রে কইতাম পরজন্মে যেন সুন্দরী রূপবতী কইরা পাঠায়। কিন্তু আপনার লগে তো আমার শেষ দেখা হইবো হাশরের ময়দানে। তাই হাশরের ময়দানে আল্লাহ রে বলমু। আমারে যেন খুব সুন্দরী রূপবতী কইরা আপনার সামনে আনে। তহন তো আপনি আর আমারে ভালো না বাইসা থাকতে পারবেন না তাই না? ”
ইয়াসিন জবাব দিলো না। বাতাসি জবাবের আশায় ছিলো। ইয়াসিন খেয়েদেয়ে হাত ধুয়ে চলে গেলো।

মাগরিবের আজানের পর থেকে যৌন পল্লীতে গান বাজনার আয়োজন শুরু হয়েছে। একের পর এক খদ্দের আসছে, রমরমা আয়োজন। প্রেমা ঠিকমতো মনোযোগ দিয়ে এশার নামজ টাও পড়তে পারলো না। বারবার বিঘ্ন ঘটছিলো। কোনো রকমে কষ্ট করে পড়লো। পড়া শেষ হতেই পূর্ণা আসলো একটা বোরকা নিয়ে। ইকবাল পাঠিয়েছে। প্রেমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে পূর্ণা বলল-
“ এটা পড়ে নাও। ইকবাল ভাই যখন বলবে তখন আমি এসে নিয়ে যাব। ততক্ষণ তুমি দরজা টা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখো। ”
প্রেমা তাই করলো। সিমরান কে কোলে নিয়ে বসে রইলো। পূর্ণা বৈঠক ঘরে গেলো। মেয়েরা নাচছে,আর লোক গুলো টাকা উড়িয়ে ফেলছে,শিস বাজাচ্ছে। পূর্ণাও যোগ দিলো। ইকবাল মদের গ্লাস এনে দিচ্ছে খাওয়া জন্য সবাই কে। ইকবাল নিজেও খাচ্ছে এমন ভান করলো। নেশায় যখন বুদ হয়ে গেলো সবাই তখন যে যার মতো মেয়ে পছন্দ করে নিয়ে রুমে চলে গেলো। শেখর মনির দিকে তাকিয়ে বলল-

“ প্রেমার কি খবর? ও আসবে না? নিয়ে আয় ওকে। ”
মনি যেতে চাইলো। পূর্ণা সেটা দেখে বলল-
“ আমি নিয়ে আসছি। ”
শেখর অনুমতি দিলো। ইকবাল প্রস্রাবের কথা বলে সেও প্রস্থান করলো। পূণা রুমে এসে প্রেমাকে তাড়া দিয়ে বলল-
” প্রেমা তাড়াতাড়ি আসো। ইকবাল ভাই দাঁড়িয়ে আছে বাহিরে। তাড়াতাড়ি করো। ”
প্রেমা সিমরান কে বিছানায় শুইয়ে দিলো। কটা চুমু খেলো। কানের কাছে বিরবির করে বলল-
“ আবার আসবো মা। ”
প্রেমা পূর্ণার পেছন পেছন গেলো। পূর্ণা বাড়ির পেছনের দরজা টা খুলে দিলো ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে। দরজাটা খুলতেই প্রেমা দেখলো ইকবাল দাঁড়ানো। প্রেমাকে দেখামাত্রই ইকবাল বলল-
“ চলুন প্রেমা। ”

প্রেমা পূর্ণা কে জড়িয়ে ধরলো। মেয়েটা খুব আপন হয়ে গিয়েছিল এই কদিনে। তারপর ইকবালের পেছনে হাঁটা ধরলো। ইকবাল কিছুটা এগিয়ে গিয়ে হাতের ইশারায় প্রেমাকে থামতে বললো। প্রেমা থেমে গেলো। ইকবাল এগিয়ে গিয়ে বাহিরে থাকা গার্ড দের গিয়ে বলল- শেখর তাদের ডাকছে। ”
গার্ড গুলো ইকবালের কথা শুনে ভেতরে যেতে লাগলো। সেই সুযোগে ইকবাল প্রেমাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো পেছনের গলি দিয়ে।
এদিকে পূর্ণার দেরি হচ্ছে বলে শেখর বিরক্ত হয়ে বলল-
“ এতক্ষণ লাগে নাকি আনতে? মনি যা তো দেখে আয়। ”
হুড়মুড়িয়ে গার্ড রা ভেতরে আসলো।
“ স্যার আমাদের ডাকছিলেন?”
শেখর তাদের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ কই না তো। ”
“ ইকবাল ভাই বললো আপনি ডাকছেন। ”
শেখর ভ্রু কুঁচকালো এ কথা শুনে। আর তখনই পূর্ণা দৌড়ে এসে বলল-
“ প্রেমা নেই রুমে। ”
শেখর এক লাফে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
“ নেই মানে! কোথায় যাবে? ভালো করে খুঁজে দেখ কোথাও লুকিয়ে আছে। ”
“ দেখছি কেউ নেই। ”

শেখর ইশারায় সবাইকে খুঁজতে বলল। সবাই বাড়ির প্রতিটি কোনা খুঁজে দেখলো, প্রেমা নেই। শেখর পেছনের গেটের দিকে গেলো। পেছনের দরজা খোলা! প্রেমা এটা দিয়ে পালিয়েছে! কিন্তু এই দরজা তো তালা দেওয়া ছিলো। চাবি তো পাবার কথা না।
শেখর বাঘের মতো গর্জে বলল-
“ এই দরজার চাবি পেলো কিভাবে প্রেমা? কে সাহায্য করেছিস তোরা বল। ”
ঠিক তখনি মনি বলল-
“ ইকবাল ভাই কোথায় গেলো?”
শেখর ইকবালের নাম ধরে ডেকে উঠলো। ইকবাল আসছে না। ফোন করলো। ফোন বাজছে কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না। শেখর বাহিরের সিসিটিভি ফুটেজ টা চেক করলো গিয়ে। স্পষ্ট দেখতে পেলো ইকবাল প্রেমা কে নিয়ে পালাচ্ছে।
শেখর চিৎকার করে উঠলো-

“ বিশ্বাসঘাতকের বাচ্চা। আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা! এই শেখরের সাথে! শেখরের বউ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া! এক্ষুনি এই ইকবাল কে তোরা ধরে নিয়ে আয়। যেভাবেই হোক ইকবাল প্রেমা দুটোকেই আমার লাগবে। ”
শেখর তার সমস্ত গার্ড দের লেলিয়ে দিলো। ইকবাল যে এমন কিছু করতে পারে তা শেখরের বিশ্বাসই হচ্ছে না!
কান্দাপাড়ার ভেতরটা পেছনে ফেলে মূল গলিটা ধরে বের হয়ে ডানদিকের সামনের একটা সোজা রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলছে দ্রুত পায়ে ইকবাল আর প্রেমা। এই রাস্তাটা ধরে তারা সোজা ১০–১৫ মিনিট হাটলো। এরপর টাঙ্গাইল শহরের মেইন রোডে উঠে বাম দিকে ঘুরলো।
এখান থেকে রাস্তাটা লম্বা। দৌড়াতে দৌড়াতে দেখা গেল,বাস কাউন্টার,গ্যারেজ,হোটেল আর ওয়ার্কশপ। কোনো খালি গাড়ি নেই। দৌড়াতে দৌড়াতে প্রেমা হাঁপিয়ে যাচ্ছে। ইকবাল পেছনে ফিরে এসে ফের প্রেমার হাত ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে বলছে-
“ আর বেশি দূর নেই প্রেমা। আর অল্প একটু রাস্তা। এখন একটু কষ্ট করুন শুধু, আর করতে হবে না। ”
কিন্তু রাস্তা আর ফুরাচ্ছে না। এই রাস্তা ধরে তারা একটানা হাঁটলো প্রায় ৪–৫ কিলোমিটার। পায়ের অবস্থা খুবই বাজে প্রেমার। এই শীতল রাতেও প্রেমা ইকবাল দুজনের শরীরই ঘামে ভিজে গেছে। ইকবাল ইচ্ছে করেই কাছের রেলস্টেশন রেখে এই দূরের কালিহাতীর রেলস্টেশনে এসেছে। কারন টাঙ্গাইল রেলস্টেশনে গেলে ধরা পড়ে যেত। শেখর রা প্রথমে ওখানেই যাবে খুঁজতে। প্রেমাকে বেঞ্চ বসিয়ে ইকবাল ট্রেনের একটা টিকিট আর পানির বোতল কিনে আনলো। প্রথমে পানির বোতল টা এগিয়ে দিলো। প্রেমা ঢকঢক করে খেয়ে নিলো পুরো এক বোতল পানি। ইকবাল জিজ্ঞেস করলো- “ খাবার খাবেন?”
প্রেমা মাথা নেড়ে না জানালো। ইকবাল পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা ব্যাগ বের করে প্রেমার হাতে দিয়ে বলল-

“ এটা ধরুন। ”
প্রেমা প্রশ্নাতীত দৃষ্টি নিয়ে তাকালো।
“ এখানে সব প্রমান আছে শেখরের বিরুদ্ধে। আপনি এই টাঙ্গাইলের কোনো পুলিশ স্টেশনে গিয়ে এসব দেখালে তারা কোনো পদক্ষেপ নিবে না। কারন সবাইকে শেখর টাকা দিয়ে হাত করে রেখেছে। ঢাকায় আপনি কোনো পুলিশ স্টেশনে গিয়ে এগুলো জমা দিবেন। ”
প্রেমা ব্যগটা খুলে দেখলো কয়েকটা ছবি। ভীষণ নোংরা সেই ছবি গুলো। মেয়েদের নির্মম ভাবে অত্যাচার করছে। সাথে একটা পেনড্রাইও আছে। ইকবাল ট্রেনের টিকিটা টা প্রেমার হাতে দিলো ট্রেন আসার শব্দ পেয়ে। প্রেমা ট্রেনের টিকিট টা হাতে নিলো। ইকবাল প্রেমার হাত ধরে ট্রেনের দিকে ছুটে যেতে লাগলো। ট্রেনের বগিতে ইকবাল প্রেমা কে দায়িত্বের সাথে তুলে দিয়ে বলল-

“ বাকিটা পথ এবার আপনার একা পাড়ি দেওয়ার পালা প্রেমা। আমার গন্তব্য এই পর্যন্তই ছিলো আপনার সাথে। ”
ইকবালের ভাঙা গলায় বলা কথা গুলো শুনে প্রেমার হাঁটা থেমে গেলো। সেই সাথে ইকবালের হাত ঢিলে হয়ে গেল। প্রেমা পেছন ফিরে দেখলো ইকবাল পিছিয়ে যাচ্ছে। মুখে ঝুলছে স্মিত হাসি। প্রেমা ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো। ইকবাল তাড়া দিয়ে বলল-
“ দাঁড়াবেন না প্রেমা। ওরা চলে আসবে। আপনি পালান। ”
প্রেমার মস্তিষ্ক কয়েক সেকেন্ডের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিলো। ইকবাল যাবে না তার সাথে! প্রেমা ইকবালের তাড়া শুনে বলল-
“ ক…কিন্তু আপনি? আপনি যে বলেছিলেন আমার সাথে যাবেন।”
“ ইচ্ছে ছিলো বাকিটা পথ আপনার সাথে যাওয়ার। কিন্তু সম্ভব নয়।”
“ কেনো সম্ভব নয়? আপনাকে আমি একা রেখে কি করে চলে যাই? ওরা আপনাকে ছেড়ে দিবে না। বাকিটা পথও না হয় সাথে চলুন আমার। ”
“ আমি আপনার সাথে চলে গেলে বাকি মেয়েদেরকে রক্ষা করবে কে? আপনি ঢাকা পৌঁছে এই প্রমান গুলো পুলিশের হাতে তুলে দিবেন। ওরা আসলেই মেয়ে গুলোও মুক্তি পেয়ে যাবে। ততক্ষণ,ততক্ষণ আমি সামলে রাখবো ওদের। ”
প্রেমার কান্না পেলো খুব। এই প্রথম কেউ বিনা স্বার্থে প্রেমাকে সাহায্য করলো। প্রেমা কাঁদো কাঁদো চোখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল-

“ আমি আপনার এই সাহায্য কোনোদিনও ভুলবো না ইকবাল ভাই। আমি পুলিশ নিয়ে ফিরবো এখানে ইনশাআল্লাহ । ততক্ষন,শুধু ততক্ষণ নিজের আর ঐ মেয়েদের খেয়াল রাখবেন দয়া করে। আমাদের এই দেখা শেষ দেখা না হোক। আমাদের পূনরায় আবার সাক্ষাৎ হোক।”
ইকবাল প্রেমা কে শেষ বারের মতো দেখে নিলো। কি স্নিগ্ধ একটা মেয়ে এই প্রেমা। টলমল চোখেও কি অপূর্ব লাগছে! শেখর মূল্য দিলো না মেয়েটার। আফসোস হচ্ছে শেখরের জন্য। কত কথাই এখন গলার কাছে এসে আঁটকে যাচ্ছে ইকবালের তা হিসাব বিহীন। প্রেমা তখনও ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়ানো। ট্রেন এগিয়ে যাচ্ছে তার গন্তব্যের দিকে। প্রেমা তাকিয়ে আছে আগের ন্যায় ইকবালের দিকে। ইকবাল মুচকি হেঁসে হাত উঁচু করে প্রেমাকে বিদায় জানাতে জানাতে অন্ধকারের সাথে মিশে যেতে যেতে বলে গেল-

দাহশয্যা পর্ব ৮৫

“ বেঁচে থাকলে আমাদের আবার দেখা হবে এই পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তরে। আর নয়তো পরপারে। পূনরায় সাক্ষাৎ আমাদের আবার হবে। হতেই হবে…..
ইকবালের বলা শেষ কথা গুলো হয়তো প্রেমা অব্দি আর পৌঁছাতে পারে নি ট্রেনের ঝনঝন শব্দের কারনে…. নইলে মেয়েটা নেমে চলে আসতো দৌড়ে……

দাহশয্যা পর্ব ৮৬ (২)