Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯৮ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯৮ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯৮ (৩)
Raiha Zubair Ripti

মোতালেব ভুঁইয়ার মৃত্যুর কয়েকদিন পর দুপুরবেলা একটি সাদা মাইক্রোবাস এসে থামল তাদের উঠোনে। গাড়ি থেকে নেমে এলেন ব্যাংকের তিনজন কর্মকর্তা। নিজেদের পরিচয় দিয়ে তারা বললেন,
” আমরা মোতালেব ভুঁইয়ার রেখে যাওয়া কিছু নথিপত্র আপনাদের হাতে তুলে দিতে এসেছি। ”
কথাটি শুনে মেহরিনের বুকটা কেঁপে উঠল। আব্বু শব্দটা যেন আবারও নতুন করে তার বুকে শূন্যতার ঝড় তুলল। তার আব্বু আর নেই! একজন কর্মকর্তা একটি ফাইল খুলে ধীর কণ্ঠে বললেন,
” মোতালেব সাহেব প্রায়ই বলতেন, “আমি না থাকলেও আমার মেয়েদের যেন কারও কাছে হাত পাততে না হয়। সেই কারণেই তিনি অনেক আগেই কিছু ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।
মেহরিন নিঃশব্দে মাথা তুলল। তার চোখদুটি ইতোমধ্যেই ভিজে উঠেছে।

” বড় মেয়ে সেরিনের নামে সুলতানপুরে দশ শতাংশ জমি কিনেছিলেন তিনি। জমির রেজিস্ট্রেশনও তার নামেই সম্পন্ন করা হয়েছে।”
সেরিন নির্বাক হয়ে বসে রইল। বাবার জীবদ্দশায় এসবের কিছুই সে জানত না। কর্মকর্তা এবার আরেকটি কাগজ সামনে রেখে বললেন,
” আর মেহরিন তাবাসসুমের নামে আমাদের ব্যাংকে একটি সেভিংস অ্যাকাউন্ট রয়েছে। বহু বছর ধরে তিনি নিয়মিত সেখানে টাকা জমা করেছেন। যাতে তার মেয়ের কখনো পড়াশোনা বা জীবন থেমে না যায় টাকা পয়সার জন্য। বর্তমানে সেই হিসাবে সাত লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা রয়েছে। ”
শব্দগুলো কানে যেতেই মেহরিনের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। তার হাত কাঁপতে লাগল। চোখের জল আর আটকে রাখা গেল না। তার আব্বু নিজের জন্য কিচ্ছু করে নি! সব দু হাতে বিলিয়ে দিয়ে গেছে দুই মেয়েকে! কত ঈদে নতুন পাঞ্জাবি কেনে নি তার বাবা। পুরোনো স্যান্ডেল সেলাই করে বছরের পর বছর পরেছেন। নিজের ওষুধ কেনার আগেও হিসাব কষেছেন। মেহরিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কাগজগুলো দুই হাতে বুকে চেপে ধরে শিশুর মতো কেঁদে উঠল। সে তো এসব কিছু চায় নি। চায় নি টাকা পয়সা জমি জমা। সব কিছুর বিনিময়ে কি সে তার বাবা কে পূনরায় ফিরে পেতে পারে? এই পৃথিবীর দেখি সবাই স্বার্থপর। চলে যাবার সময় হলে সাথে নেয় না কাউকে।

ভুঁইয়া বাড়িটা সানজিদা বেগমের নামে অনেক আগেই লিখে দিয়েছিলেন মোতালেব। তার জীবনে যত অর্জন আছে সব তিনি দু হাতে স্ত্রী আর সন্তানদের নামে রেখে গেছেন। নিজের জন্য কিচ্ছু রাখেন নি। ঠিক এই একটা জায়গায় মেহরিনের কষ্ট। এমন বাবা পৃথিবীতে আর কোথায় পাবে সে? জীবনে তো তেমন পূন্যের কাজ ও নেই যে জান্নাত আশা করবে। সে তো পাপে জর্জরিত এক অসহায় মেয়ে।
সেদিন বিকেলে ইমন আসলো। আলাদা ভাবে বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো মেহরিন আর ইমনের মাঝে। সোলেমান যায় নি ঢাকা তখনও। সে মেহরিন কে নিয়েই ফিরবে। শুরুতে মেহরিন অস্বীকৃতি জানালে ইমন চলে যাবার পরই মেহরিন হুট করে রাজি হলো। সে ঢাকা যাবে। কারন হিসেবে জানালো তার এখনো ডাক্তার হওয়া বাকি। সোলেমান নিয়ে আসলো মেহরিন কে ঢাকা।
ঢাকা আসার পর তাদের ভেতরকার দূরত্ব যে কমেছে তা একদমই না। বরং আরো বেড়েছে। বাশার সুলতান কে দেখলেই পায়ের রক্ত মাথায় উঠে আসে মেহরিনের। তার মোতালেব ভুঁইয়া কে নিয়ে খারাপ লাগার যে অভিনয়, সেটা দেখে মেহরিনের জাস্ট তার গলাটা চেপে ধরতে ইচ্ছে করছিল। মেহরিন নিজেকে দমিয়ে রেখেছে। শান্ত থাকতে হবে।
সোলেমান খাবার নিয়ে আসলো, মেহরিন খাবারের প্লেটে হাত নাড়তে নাড়তে জিজ্ঞেস করলো,

” কথা দিয়েছিলেন আমার বাবার খুনি দের শাস্তি দিবেন। তার কাজ কতদূর? ”
” খুঁজছি আমি। আশা করছি দু একের ভেতর পেয়ে যাব। ”
” তারপর? ”
” তারপর মারবো। ”
” না। মৃত্যু কোনো সাজা হতে পারে না। ”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
” তাহলে? ”
” তাকে এমন যন্ত্রণা দিবেন যে সে জীবন ও মরনের মাঝখানে ঝুলে থাকবে। না বাঁচবে আর না মরবে। ”
” ঠিক আছে। ”
সোলেমান চলে গেল। মেহরিন খাবারটা খেলো না। বাড়ির কুকুর কে দিয়ে দিলো। তারপর রুমে এসে ইমন কে ফোন করলো।
ইমন এখনো নওগাঁয় আছে। মোতালেব ভুঁইয়া কিছু লোকের কাছে টাকা পেতেন সেগুলো উঠানোর চেষ্টা করছে। মেহরিনের ফোন পেয়ে রিসিভ করলো। মেহরিন সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

” আপনি ঢাকা আসবেন কবে ইমন ভাই? ”
” কোনো সমস্যা হয়েছে মেহরিন? ”
” না। আমি উনার চাচা কে সহ্য করতে পারছি না ইমন ভাই। আমার আব্বুর খুনি আমার চোখের সামনে দিয়ে ঘুরছে কিন্তু আমি কিছু করতে পারছি না। আমি উনাকে পুরো দেশের সামনে এক্সপোজ করতে চাই ইমন ভাই। আপনি বলেছিলেন আপনি আমাকে সাহায্য করবেন। ”
” আমি আজ রাতেই ঢাকা ফিরছি মেহরিন। সোলেমান কে কিছু বলেছো? ”
” না। ”

” বলো না। বাশার সুলতান সুবিধার লোক না। আমার ধারণা উনি সোলেমান কে ব্যবহার করছে কোনো একটা লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। চাচা আমাকে উনার আর সোলেমানের বিষয়েই কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। বলছিলেন সোলেমানের সামনে ঘোর বিপদ। বিপদ টা কেমন তা বলে নি। উনার ভেতর কোনো একটা রহস্য আছে। তা না হলে বলো কেউ নিজের সন্তান কে একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দিয়ে ভাইয়ের ছেলের জীবন এমন নরক করবে? টাকা পয়সা প্রতিপত্তি সব তো যতদূর জানি সোলেমানেরই। আমার বিশ্বাস সুযোগ পেলে স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে বা সোলেমান তার বিপক্ষে চলে গেলে তিনি সোলেমান কেও মেরে ফেলবে। ”
মেহরিন চুপচাপ শুনলো। তারপর কেটে দিলো। সোলেমান ক্লাব ঘরে এসেছে। বাশার সুলতান পাশে বসা। ইয়াসিন এসে তাদের সামনে দাঁড়ালো। গতকাল উকিলের কাছ গিয়েছিল। তার আর বাতাসির ডিভোর্স পেপার বানানো হচ্ছে। আশা করছে সামনের মাসের মধ্যেই ডিভোর্স টা হয়ে যাবে।

ইয়াসিন মন খারাপ থেকে সোলেমান কিছু জিজ্ঞেস করলো না। তার নিজেরই মন মেজাজ ভালো নেই। বাশার অবশ্য স্বাভাবিক। সোলেমান সিসিটিভি ফুটেজ আনতে বলেছিল ইয়াসিন কে। ইয়াসিন সেটা দিতেই সোলেমান উঠে চলে গেল। বাড়ি ফিরে সিসিটিভি ফুটেজ টা অন করতেই দেখলো ক’জন লোক মিলে মোতালেব ভুঁইয়া কে মারছে। তাদের ফেস জুম করে করে দেখলো। দূর থেকে উপরে দাঁড়িয়ে মেহরিন দেখলো সেই ফুটেজ। মেহরিন চায় সোলেমান নিজ থেকে খুঁজে জানুক তার আব্বুর হত্যা কারী আর কেউ না। তার প্রাণের চাচা। মেহরিন দেখতে চায় সোলেমান কি করে চাচার সাথে। তার হাত কতটা কাপে পাপহীন মানুষের থেকে এক পাপী কে সাজা দিতে গিয়ে।
পরের দিন ইমন আসলো। রাজধানী তে আবার নারী পাচারের ঘটনা টা বাড়া শুরু করেছে। মেহরিনের বিশ্বাস এর পেছনে সুলতান পরিবার আছে। নিউজ চ্যানেল গুলোতে যখন গুম হওয়া নারীদের ছবি দেখানো হচ্ছিল তখন এক নারীর ছবি দেখে মেহরিন তাকে সাথক সাথে চিনে ফেলে। এই মেয়েটাকেই তো সে সেদিন কসাইখানায় দেখেছি। সোলেমান বলেছিল ছেড়ে দিব। তারমানে কথার খেলাপি করেছে! মেহরিন ঠোঁট কামড়ে ধরল।

ছিঃ! এই তাহলে সোলেমানের কথার দাম? যার মুখের একটা কথারও কোনো ঠিক নেই, তার ওপর ভরসা করেছিল সে? যে মানুষ একটা জবান দিয়ে আরেকটা কাজ করে, তাকে বিশ্বাস করার মতো বোকামি আর হয় না।
মেহরিন আর এক মুহূর্তও বসে রইল না। সঙ্গে সঙ্গে ইমনকে ফোন করল। পরদিন সকালে ইমন সোজা চলে গেল সেই থানায়, যেখানে মেয়েটির নিখোঁজ হওয়ার সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। ডিউটি অফিসারের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রফিকের কক্ষে ঢুকল। ইমন পরিচয় দিতেই তিনি কয়েকটি ফাইল টেবিলের ওপর রাখলেন।
ইমন মেহরিনের পাঠানো সেই নারী টির ছবি দেখিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
” তার কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে?
এসআই রফিক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ” না। এখনো না।”
” কোনো তথ্যই কি পাওয়া যায় নি তার বিষয়ে?
প্রশ্নটা শুনে অফিসার মাথা নাড়লেন।

” পারিবারিক তদন্তে যা পেয়েছি, তা হলো ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে বৈবাহিক সম্পর্কে থাকার পরও চার বছরের একটি সন্তান কে রেখে বাহিরে একজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ”
ইমন ধীর কণ্ঠে বলল, ” শুধু এই একজনের বিষয়েই জানতে পেরেছেন? ”
এসআই রফিক আরেকটি ফাইল খুললেন। ” সেটাই আমাদের উদ্বেগের কারণ। সাম্প্রতিক কয়েকটি মামলায় একটা মিল দেখা যাচ্ছে। কেউ বিয়ের আগেই একসঙ্গে বসবাস করছিল, কেউ সংসার ছেড়ে অন্য সম্পর্কে জড়িয়েছিল, আবার কেউ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করছিল,পার্টি,ক্লাব,হোটেলে গিয়ে রাত কাটানো। আমরা নিশ্চিত নই, কিন্তু মনে হচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই ধরনের নারীদের আলাদা করে নজরে রাখছে।

” মানে? ”
” মানে, তারা হয়তো এমন নারীদের বেছে নিচ্ছে, যাদের নিখোঁজের অভিযোগে অসঙ্গতি থাকে, কিংবা খোঁজাখুঁজিও কম হয়। বেশির ভাগ কেস পরকীয়া করছে এমন নারীদের টার্গেট করা হচ্ছে। তাই তদন্ত জটিল হয়ে পড়ছে। ”
ইমন বেরিয়ে এসে মেহরিন কে ফোন করে জানালো বিষয় টা।
সোলেমান তখন চাচার সাথে বসে সেই নিউজ গুলো দেখছে। বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে তার।
” অনেক তো টাকা কামিয়েছো। আর কত? ”
বাশার সুলতান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,

” যতদিন না আর্থিকভাবে তোর চেয়ে শক্তিশালী হতে পারি ততদিন। ”
” থামা উচিৎ তোমার। ”
” সময় হলে থামবো। খা কফি খা। ”
সোলেমান কফির মগে চুমুক দিলো। বাশার সুলতান আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
” তা শ্বশুরের খুনি কতদূর? ”
সোলেমান চোখ পিটপিট করে তাকালো। কি বললো কানে আসে নি কথাটা। তাই জিজ্ঞেস করলো,
” কিছু বললে? ”
” বললাম তের শ্বশুরের খুনিদের ধরতে আর কত সময় লাগবে তোর? ”
” কার খুনি ”
” তোর শ্বশুরের। ”
সোলেমান অবাক হওয়ার মতো হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” উনি কি মারা গেছেন নাকি? কবে? ”
” সে কি ভুলে গেলি সব? তোর শ্বশুর তো মারা গেছে। কারা যেন মেরেছে। ”

বাশার সুলতান হাসলো বাকা। নজরে আসলো সোলেমানের। তার কেমন অস্বস্তি লাগছে। মাথা চেপে মনে করার চেষ্টা করলো ,কবে মারা গেল তার শ্বশুর? কারা মারলো? কপালে স্লাইড করতে করতে রুমে আসলো। মেহরিন তখন ওয়াশরুমে। সোলেমানের শরীর জুড়ে কেমন যেন একটা হচ্ছে। মনে হচ্ছে রক্ত গুলো মারাত্মক রকমের গরম হয়ে যাচ্ছে। কামড়ে ধরছে শরীর। সে রাগ যন্ত্রণা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙতে শুরু করলো। মেহরিন সবেই ওয়াশরুম থেকে বের হতেই একটি কাঁচের অংশ ছিটকে গিয়ে তার পায়ে পরলো। সাথে সাথে ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো। হঠাৎ করে নিজের রুমে মেহরিনের মতো গলার আওয়াজ শুনে সোলেমান চমকে ফিরে তাকালো। ভেজা চুলে মেহরিন কে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলো। এ কোনো স্বপ্ন নাকি? মেহরিন আসলো কোথা থেকে তার রুমে? সে ফ্লোরে পরে থাকা কাঁচের তোয়াক্কা করলো না। পারিয়েই মেহরিনের কাছে গেলো। পা দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে তাকে কোলে করে বিছানায় বসিয়ে পায়ের ব্যান্ডেজ করে দিলো। মেহরিন ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলো,

” আর কত? নিজ থেকেই কষ্ট দিবেন,আঘাত করবেন। আবার নিজেই এসে কাটা গায়ে মলম লাগাবেন। জীবন কি তবে এভাবেই চলবে আপনার? ”
সোলেমান বুঝলো না কথার মানে।
” আমি ইচ্ছে করে দেই নি। আমি জানতাম না তুমি রুমে আছো। তুমি না চলে গিয়েছিলে আমাকে ছেড়ে? আবার ফিরে আসলে যে? ”
কথোপকথনের কোনো মিলমিশ পাওয়া গেলো না। সোলেমান কিসের কথা বলছে তা মেহরিন বুজছে না। মেহরিন কি বলছে সোলেমান বুঝছে না। সোলেমান কয়েক মাস আগের স্মৃতিতেই পরে আছে। তার সন্তান হারানোতেই।
মেহরিন জিজ্ঞেস করলো,

” ঘরের জিনিসপত্র ভাঙছিলেন কেনো? ”
সোলেমান স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিলো,
” শরীর জ্বালাতন করছিল। ”
” আমি কিছু শুনেছি। ”
” কী? ”
” আপনারা সেসব নারীদের পাচার করেন তাই না যারা পরকীয়া করে। বখে গিয়েছে,পরিবার মানে না। হোটেলে গিয়ে রাত কাটায়। ”
আকস্মিক ভাবে সোলেমান সব স্বীকার করে বলছে,
” হু। চাচা পরকীয়া করা নারী দেখতে পারে না। সেজন্য তাদের পাচার করে। এমনিতে তো ইসলামে তাদের পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলতে বলছে। সেখানে চাচা তাদের বেচে আবর্জনা কমাচ্ছে। ”
মেহরিনের রাগ হলো। ” ইসলাম টেনে পাপকে জাস্টিফাই করতে চাচ্ছেন আপনি? তারা পরকীয়া করবে বলে আপনারা পাচার করবেন? ”

” চাচা পাচার না করলেও আমি মেরে ফেলতাম। যেমন মারি ধর্ষনকারী দের। ঐসব নারী জানে না তাদের এসব কাজকর্মের জন্য। পরিবারকে কতটা সাফার করতে হয়। একটা সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যায়। আর স্বামীর কথা নাই বা বললাম। ”
” বের হন রুম থেকে। নত হতে শিখেন নি। যে নিজের কর্মকান্ডে ভুল খুঁজে পায় না,তাকে কখনো পরিবর্তন করা যায় না। আর আপনি ঠিক তেমন। ভুল স্বীকার করতেও শিখেন নি। শিখেছেন কেবল আপনারা যা করবেন,যা বলবেন সেটাই সঠিক। ”
সোলেমান বেরিয়েও গেল। তার ঘুম দরকার। ঘুম পাচ্ছে ভীষণ। কফি খেলেই তার ঘুম পায়। শরীর যন্ত্রণা করে। কেমন অন্যমনষ্ক হয়ে যায়। কি বলে না বলে তার হুঁশ থাকে না। কিছু মাস ধরে এই সমস্যা টা হচ্ছে তার।

এজওয়ানের পাঠানো গিফট টা মনস্টার খুলেছিল। এবং পড়েওছিল। পড়ার পর হো হো করে হেসেছে। দেওয়ালে থাকা বড় মনিটরে মাহির ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,
” এটা ওর বউ না? ”
জবাব আসলো, ” হুমম। ”
মনস্টার ঠোঁটের কোনে আঙুল চালিয়ে বলল,
” আই নিড হিস ওয়াইফ। মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আই লাভ শ্যি। এত সুন্দর মেয়ে আমি আগে দেখি নি। বিয়ে করবো। হ্যাঁ বিয়ে করবো এজওয়ান সুলতানের বউ কে। উঠিয়ে নিয়ে এসো ওর বউ কে। ওর কলিজা আমার নামে লিখে নিব। ”
সবাই এ কথা শুনে চমকে উঠলো। মনস্টার বিয়ে করবে!

ঊর্মি আজ সেজেছে। বাহিরে ঘুরতে বের হবে। ইহরাম কেও সাজানো হয়েছে। ইব্রাহিম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। পাশে এসে দাঁড়ালো ঊর্মি। ইব্রাহিম গাল পেতে দিলো চুমু খাওয়ার জন্য। ঊর্মি মৃদু হেঁসে গলায় গালে চুমু খেলো। এরিমধ্য ইহরাম কেঁদে উঠায় তাকে নিয়ে ইব্রাহিম রুম থেকে বেরিয়ে নিচে বসার ঘরে আসলো। এজওয়ান তখন সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। ইব্রাহিম পাশে এসে বসায় একবার আঁড়চোখে তাকালো। তারপর ঘাড় ফিরাতে গিয়েও আর ফিরাতে পারলো না। চোখ আঁটকে গেলো ঘাড়ে গালে গলায়। লজ্জা পাওয়ায় জায়গায় এজওয়ান দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। লিপস্টিকের দাগ বসে আছে গালে গলায়। এজওয়ান পাশ থেকে ট্যিসু নিয়ে গাল গলা মুছে দিয়ে বলল,
” রুম থেকে বের হবার আগে নিজেকে দেখে তারপর বের হবা না? গলায় গালে বউয়ের লিপস্টিক লাগিয়ে রাখছো। লজ্জা করে না? ”
ইব্রাহিম লজ্জা পেল কিছুটা। সে খেয়াল করে নি লিপস্টিক লেগে ছিল যে। তবে এজওয়ান কে তা বুঝতে না দিয়ে বলল,

” তুই আর আমিই তো। বাহিরের কেউ তো দেখে নি। লজ্জা লাগবে কেন? তোর গালে মনে হয় লাগে না লিপস্টিকের দাগ। তের বউ মনে হয় খায় না চুমু? ”
এজওয়ান ভোঁতা মুখে বলল,
” না খায় না। আমার বউয়ের ওমন ১৮+ ঠোঁট নেই। যেই ঠোঁট দিয়ে তোমাদের বউদের মতো বুকে,পিঠে,ঘাড়ে,গালে গলায় ঠোঁট ইমোজির মতো চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিবে আমার শরীর। জোর করে যে তরিকুলের বেটিকে একটা চুমু খেতে পারি এটাই তো অনেক। সেখানে শরীরে তার ঠোঁট ওয়ালা চুমু পাওয়া তো বিলাসিতা। সেজন্য রেডিমেড ঠোঁট ওয়ালা ইমোজির জাইঙ্গা কিনসি। ওটা দিয়ে মন রে বুঝ মানাবো। তা কোথায় যাচ্ছ তোমরা? ”

” একটু সিডনি যাচ্ছি। ”
” ওহ। রুটি গোস্ত কে রেখে যাও। আকাশ মেঘলা বৃষ্টি পরলে ভিজে যাবে। ”
ইব্রাহিম ভাবলো রেখে যাবে কি যাবে না। পরে রেখে গেলো। অনেকদিন গুলো সে আর ঊর্মি একাকী ঘুরে না। ঊর্মি আসতেই বেরিয়ে গেলো। এজওয়ান ইহরাম কে কোলে নিয়ে রুমে আসলো। মাহি কাজে ব্যস্ত। এজওয়ান একা একা খেলা করলো ইহরামের সাথে। বেশ অনেক্ক্ষণ খেললো। ইহরাম প্রায় নেউটা হয়ে যাচ্ছে চাচার। হুট করে খেলতে খেলতে কান্না করে দিলো। এজওয়ানের কোলে উঠে দুধ খুঁজলো। দু একবার চেপেও ধরলো সেখানে আর ভাঙা গলায় বলল,ডু ডু। এজওয়ান হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
” অসভ্য লুচু,কোথায় হাত দিস আমার। আমার কাছে দুধ নেই। ”
এজওয়ান মাহির দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
” তরিকুলের বেটি রুটি গোস্ত তো কান্না করতেছে। ”
মাহি কাজ করতে করতে জবাব দিলো,
” ক্ষুধা লেগেছে সেজন্য। দুধ খাওয়ান। ”
” পাবো কোথায়? আমার বুকে তো দুধু নেই। সরি দুধ আছে কিন্তু দুধ বের হওয়ার মতো ওয়ে নেই। ”
মাহি কথাটা শোনামাত্রই কুশান ছুঁড়ে মেরে বলল,
” অসভ্য ফিডার খাওয়ান। ”

এজওয়ান ফিডার খুঁজে আনলো। মুখে দিলো। নবাবজাদা খাবে না। তার বুকের দুধই লাগবে। এজওয়ানও কম পাঁজি না। ফিডারের দুধই খাইয়ে ছাড়বে। সেজন্য একটা বুদ্ধি বের করলো। টি-শার্টের বুকের কাছ থেকে কাপড় কেটে সেখান দিয়ে ফিডারের বোট টা বের করে ইহরামের গালে দিলে। ইহরাম চাটতে লাগলো। এজওয়ান উলে উলে করে বলল,
” খা খা চাচার দুধুও খা। ”
মাহি তাকাতেই জাস্ট থ হয়ে গেছে। মানে কোন লেভেলের লোক এটা! কি চিন্তা এটা! টি-শার্ট কেটে দুধ খাওয়াচ্ছে।
” কি করছেন কি এটা? ”
এজওয়ান ইনোসেন্ট হয়ে বলল,
” অবস্থা বুঝে তার একটা ব্যবস্থা করসি মাত্র। আমার তো লিকুইড দুধ নেই। ”

মাহি দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ল্যাপটপ টা পাশে রেখে এজওয়ানের থেকে ইহরাম কে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিডার খাওয়ালো। এজওয়ান চিৎপটাং হয়ে বিছানায় শুয়ে পরলো। তারপর ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকালো। কিছু একটা হিসেব করলো। কদিন পরই তাদের বিবাহ বার্ষিকী। মাহির কাছে এসব দিন টিনের কোনো আলাদা মূল্য নেই। তারা একবারও সেলিব্রেশন করে নি। আর না তাদের কোনো সুন্দর কাপল ছবি আছে। আনরোমান্টিক বেডি একটা কি না। তাতে এজওয়ানের কি। এজওয়ান এবার উপর হয়ে শুয়ে বলল,
“ শোনো তরিকুলের বেটি ২০২৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারী আমরা আবার বিয়ে করবো হু? আমার আনা কালো শাড়িটা তো ছুঁয়েও দেখো নি। তার জায়গা কোথায় হয়েছে কে জানে। সেদিন আমি লাল টুকটুকে একটা শাড়ি আনবো কেমন? তুমি বউ সাজবে। তোমায় বউ সাজে কেমন লাগবে? খুব সুন্দর লাগবে নিশ্চয়ই? আমার ভীষণ ইচ্ছে তোমায় বউ সাজে দেখার। চুলে সেদিন লাল টকটকে গোলাপ দিবে। চোখে গাঢ় করে কাজল দিবে। দু হাত ভরে মেহেদি দিবে। আর হাতের মাঝখানে আমার নাম লিখবে ছোট করে হু? আমি প্রথমবারের মতো শেরওয়ানী পরে বর সাজবো সেদিন। আমাদের কোনো ভালো ছবি নেই এক সাথে। সেদিন আমরা প্রথম কাপল ছবি তুলবো। আমরা কিন্তু সেদিন সত্যি সত্যি বিয়ে করবো। ভুলো না যেন? তারপর ৪ বছর পরপর এই দিনে আমরা বিবাহ বার্ষিকী পালন করবো কেমন?”
মাহি ইহরাম কে খাওয়াতে খাওয়াতে জবাব দিলো,

“২৪ সালে কেন নয়? সে বছরে তো লিপইয়ার হবে। ”
” ২৪ সাল সুন্দর না। আমরা আটাশেই বিয়ে করবো। ”
“ ২৪ সুন্দর না কেনো?”
“ আমার বয়স যখন আটাশ হলো তখন আমাদের বিয়ের ১ বছর হলো। ”
” আটাশ আসুক আগে। ”
” আসবে আসবে। আটাশ ঠিকই আসবে। তুমিও বউ সাজবে আমিও বর সাজবো। ”
” আচ্ছা। ইহরাম ঘুমিয়েছে। সরুন তো শুইয়ে দিব। ”
মাহি শুইয়ে দিলো তাকে। তারপর কাজে মশগুল হলো।

ইয়াসিন একদিন শাহবাগের ব্যস্ত রাস্তা ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছিল। চারপাশে মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন, কোলাহল,সবকিছুই যেন তার কাছে অর্থহীন। বহু রাতের নির্ঘুম ক্লান্তি মুখে স্পষ্ট। চোখের নিচে কালি, দাড়ি-গোঁফে অযত্নের ছাপ। মনে হচ্ছিল, কয়েক মাসেই যেন বয়স দশ বছর বেড়ে গেছে।
হঠাৎ দূরে ইমনকে দেখতে পেল সে। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এগোবে কি না, সেই দ্বিধা নিয়ে বুকের ভেতর যুদ্ধ চলল। শেষ পর্যন্ত নিজেকেই জোর করে সামনে এগিয়ে গেল।
“ইমন ভাই…”
পরিচিত কণ্ঠ শুনে ইমন ঘুরে দাঁড়াল। ইয়াসিনের শুকিয়ে যাওয়া মুখটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল,
“কেমন আছো? কিছু বলবে?”

ইয়াসিন মৃদু হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু সেই হাসি ঠোঁটেই মরে গেল। অনেকক্ষণ চুপ থেকে নিচু স্বরে বলল,
” আপনি আর মেহরিন ভাবি চাচাকে এক্সপোজ করার চেষ্টা করতেছেন। আমি যদি আপনাদের সাহায্য করি তবে কি আমার পাপের বোঝা একটু হলেও কম মনে হবে? ”
ইমন ঠিক বুঝলো না কথাটা। সেজন্য বলল,
” কি বললে? বুঝলাম না। তুমি কেন সাহায্য করবে? কিসের পাপের বোঝা হালকা করার কথা বলছো? ”
” জানি না। কোন সেই পাপ যার দীর্ঘশ্বাস আর হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। সোলেমান ভাইয়ের জন্য আমার মাঝেমধ্যে মায়া লাগতো। এখন নিজের জন্যও লাগে। চাচা সব ধ্বংস করে দিবে। সেদিন আমি দেখছিলাম মোতালেব ভুঁইয়া কে ক্লাব ঘরের দিকে ঢুকতে। চাচার সাথে নিশ্চয়ই কথা হইছিল। সোলেমান ভাইরে আজ জানাইছি। আপনারা যে চাচাকে এক্সপোজ করতে চান সেটাও তার অজানা নয়। আমি চাই চাচা সাজা পাক। অনেক পাপ করসে। আর সেই পাপের দায় ভাইয়ে নিজের ঘাড়ে নিসে। আমি আপনাদের সব আস্তানার খোঁজ খবর দিব। ফাইল ডকুমেন্ট যা জানি সব। ”

ইমন জড়িয়ে ধরলে ইয়াসিন কে। ধন্যবাদ জানালো। এবার বাশার সুলতান কে বাঁচাবে কে? পুরো দুনিয়া দেখবে তাকে।
কয়েক দিনের মধ্যেই ইয়াসিন নিজের কথা রাখল।
এক এক করে সব গোপন ফাইল, জমির কাগজ, ব্যাংক লেনদেনের নথি, অবৈধ অস্ত্রের তথ্য, গোপন বৈঠকের ছবি, এমনকি বহু বছর ধরে লুকিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টও ইমনের হাতে তুলে দিল। সব প্রমাণ এখন নিরাপদে। এবার আর বাশার সুলতানের পালানোর পথ নেই। কিন্তু খবরটা বেশিক্ষণ গোপন থাকল না। ইয়াসিনের বিশ্বাসঘাতকতার খবর পৌঁছে গেল বাশার সুলতানের কানে। রাগে তার চোখ লাল হয়ে উঠল। হাতে থাকা গ্লাস ছুড়ে ভেঙে ফেলল দেয়ালে। ইয়াসিন! তারই মানুষ হয়ে তার সঙ্গেই গাদ্দারি!
দাঁত চেপে আদেশ দিল, “লোক নামাও। ইমন আর ইয়াসিন দুজনকেই শেষ করে দাও। কালকের সূর্য ওঠার আগে ওদের নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে যায়।”

ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ল কাজের লোক। বললো সোলেমান তাকে ছাঁদে যেতে বলেছে। বাশার সুলতান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ছাঁদে গিয়ে সোলেমান কে খুঁজতে লাগলো। কি আশ্চর্য এই ছেলে কোথায়? একে চিন্তা হচ্ছে। ইমন ছেলেটা যদি কাল সকালে সত্যি সত্যি সব জনগণের সামনে প্রকাশ করে দেয় তখন? সব চিন্তা নিয়ে সে সোলেমানের নম্বরে ফোন দিতে দিতে ছাদের কার্ণিশে এসে দাড়ালো। সাথে সাথে দুটো হাত এসে পেছন থেকে বাশার সুলতান কে ধাক্কা দিয়ে তিন তলা থেকে নিচে ফেলে দেয়।
গগনবিহারী এক চিৎকারে কেঁপে উঠে সেই রাতের সুলতান নিবাস। পকেট থেকে ফোন বের করা হলো। ওপাশে কাউকে বলা হলো,

দাহশয্যা পর্ব ৯৮ (২)

” প্রচার করুন পাপের দায় থেকে বাঁচার জন্য বাশার সুলতান নিজ গৃহে আত্মহত্যা করেছে। ”
পরদিন সকাল। বাংলাদেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে একসঙ্গে প্রকাশ পেল বাশার সুলতানের গোপন কুকীর্তির বিস্ফোরক সব তথ্য। একটির পর একটি নথি, ভিডিও, অডিও রেকর্ডিং এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ সামনে আসতে লাগল। সেখানে প্রমাণিত হলো, ফাহাদ হত্যাকাণ্ড হয়েছিল বাশার সুলতানের সরাসরি নির্দেশে।অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, মাদক চক্রকে অর্থায়ন, জমি দখল, অর্থপাচার, ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এমন অসংখ্য অপরাধের দলিল জনসমক্ষে প্রকাশিত হলো। দেশজুড়ে শুরু হয়ে গেল তীব্র আলোড়ন।

দাহশয্যা পর্ব ৯৯