Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯৮

দাহশয্যা পর্ব ৯৮

দাহশয্যা পর্ব ৯৮
Raiha Zubair Ripti

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামতে শুরু করেছে। সারাদিনের কান্না আর মানুষের আনাগোনায় বাড়িটা যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। উঠানের একপাশে কয়েকটা চেয়ার এখনো পড়ে আছে। রান্নাঘর থেকে থেমে থেমে বাসনপত্রের শব্দ ভেসে আসছে। বাতাসি আর তানজিলা বেগম রাতের খাবারের আয়োজন করছে। অথচ এই বাড়ির কারও খিদে নেই। খাবারের কথা মনে করার মতো অবস্থাও নেই কারও। মেহরিন তখনও উঠানের এক কোণে বসে ছিল একইভাবে। নামাজ কালাম পড়তে ভুলে গেছে। তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে। কিন্তু সে সেদিকে তাকিয়েও নেই। মানুষ কখনো কখনো এতটা কাঁদে যে, একসময় কান্নাও ফুরিয়ে যায়। মেহরিনের কান্না ফুরিয়ে গেছে। চোখ দুটো ফুলে আছে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। মাঝে মাঝে শুধু বুকটা হালকা কেঁপে উঠছে। যেন শরীরটা এখনো কাঁদতে চাইছে, কিন্তু মন আর কোনো অনুভূতি গ্রহণ করার অবস্থায় নেই।

সোলেমান কিছুটা দূরে বসে ছিল। সে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে আছে। কীভাবে একজন মানুষকে সান্ত্বনা দিতে হয়, সে জানে না। কীভাবে একজন মেয়েকে বোঝাতে হয় যে তার বাবা আর কখনো ফিরে আসবে না। সেটাও জানে না। সেও তো এতিম।
কিছুক্ষণ পর ঊর্মি ধীরে ধীরে উঠানে এসে দাঁড়াল। তার হাতে মোবাইল ফোন। চোখেমুখে অদ্ভুত এক দ্বিধা। মেহরিনের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল সে।
আজ একটা খবর এসেছে। এমন একটা খবর, যে খবরের জন্য একটা পরিবার আনন্দে পাগল হয়ে যাওয়ার কথা।কিন্তু আজ সেই খবরটা বলতেও ঊর্মির ভয় করছে। আজ ১২ মার্চ, ২০২৩। সন্ধ্যার পর প্রকাশিত হয়েছে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল। মেহরিন এই ফল প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল কতদিন ধরে। কত রাত জেগে পড়েছিল।
কত স্বপ্ন দেখেছিল। তার আব্বু কতবার বলেছিলেন,‘আমার মেয়ে ডাক্তার হবে।’ আজ সেই ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।
আর ভাগ্যের পরিহাস আজই তার বাবা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তাদের ছেড়ে চলে গেছে বহুদূর। যেখান থেকে ফিরে আসা একেবারেই অসম্ভব।

ঊর্মি ধীরে ধীরে মেহরিনের কাছে গিয়ে বসে পড়ল। মেহরিন তাকাল না। ঊর্মি কয়েকবার ঠোঁট খুলেও কিছু বলতে পারল না। মেহরিন শূন্য চোখে সামনে তাকিয়ে ছিল। ঊর্মি খুব ধীরে বলল, “মেহরিন…”
মেহরিনের চোখ নড়ল না। শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলল, “হুম?”
কণ্ঠটা এতটাই নিস্তেজ যে, মনে হলো শব্দটা তার ভেতর থেকে বের হয়নি। কেবল অভ্যাসবশত মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে। ঊর্মি মুঠো করে ফোনটা ধরে রাখল।
“তোর রেজাল্ট দিয়েছে।”
মেহরিন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ঊর্মি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“মেহরিন… তুই…”
কথাটা আটকে গেল তার গলায়। মেহরিন মাটির দিকে তাকালো। ঊর্মির চোখে পানি এসে গেল। মেহরিন কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলে উঠলো,
“তুই পুরো বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম হয়েছিস। তুই ডাক্তার হতে যাচ্ছিস। খোদা তোর স্বপ্ন পূরণ করেছেন।”
নীরবতা। খুব দীর্ঘ নীরবতা। মেহরিনের চোখে কোনো বিস্ময় দেখা গেল না। কোনো আনন্দও না। সে শুধু ঊর্মির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল,

“ও।”
শুধু একটি শব্দ। ঊর্মির বুকটা কেমন করে উঠল।
“তুই শুনছিস? পুরো বাংলাদেশে প্রথম! তোর মেডিক্যালের রেজাল্ট..”
“আব্বু জানে?”
প্রশ্নটা শুনে ঊর্মি থেমে গেল। মেহরিনের চোখ তখনও স্থির। “আব্বু জানে আমি প্রথম হয়েছি?”
ঊর্মির ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল। সে মাথা নাড়ল, “না…”
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর চোখ নামিয়ে ফেলল।
“তাহলে আমাকে বলার দরকার নেই।”
ঊর্মির বুকটা ফেটে যেতে চাইল।
“মেহরিন…”
“আমি ডাক্তার হয়ে কী করব?”
খুব শান্ত গলায় প্রশ্ন করল মেহরিন। ঊর্মি কোনো উত্তর দিতে পারল না। মেহরিন মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার আব্বু তো আর নেই। আমি ডাক্তার হয়ে প্রথম যে মানুষটাকে দেখাতে চাইতাম, সে-ই তো নেই।”
তার কণ্ঠে কান্না ছিল না। কোনো অভিযোগও ছিল না। ছিল কেবল এক অদ্ভুত শূন্যতা। “আমার রেজাল্ট ভালো হয়েছে—এটা শুনে আব্বু আমাকে জড়িয়ে ধরত। বলত, ‘আমি জানতাম আমার মেয়ে পারবে।” মেহরিনের ঠোঁট কেঁপে উঠল। কিন্তু চোখে পানি এলো না। “এখন আমি প্রথম হয়েছি। পুরো বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম।” একটু থামল সে। “কিন্তু আব্বুকে গিয়ে বলব কীভাবে?”
ঊর্মি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মেহরিন স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর খুব ধীরে ঊর্মির হাত সরিয়ে দিল।

“আমার ভালো লাগছে না।”
“কী?”
“রেজাল্ট।”
মেহরিনের চোখ আবার শূন্য হয়ে গেল।
“আমার এখন কোনো কিছুতেই ভালো লাগছে না।”
কিছুটা দূরে বসে থাকা সোলেমানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল। একটা মেয়ে আজ জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য পেয়েছে। পুরো দেশের মধ্যে প্রথম হয়েছে। অথচ সেই মেয়েটার চোখে আনন্দ নেই। মুখে হাসি নেই। নিজের সাফল্য নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাস নেই।
কারণ, যে মানুষটার জন্য সে এতদিন পড়েছে, যে মানুষটা তার প্রতিটি সাফল্যের স্বপ্ন দেখেছে, যে মানুষটা আজ তার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলার কথা ছিল- ‘আমি জানতাম, আমার মেয়ে পারবে।’
সেই মানুষটা আজ কয়েক হাত মাটির নিচে শুয়ে আছে।সোলেমান ধীরে ধীরে পকেট থেকে ফোনটা বের করল।তারপর কারও দৃষ্টি আকর্ষণ না করে উঠান থেকে একটু দূরে সরে গেল। ফোনের স্ক্রিনে একটি নম্বর খুঁজে বের করে কল দিল সে। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হলো। সোলেমান গলা পরিষ্কার করে বলল,

” আমি সোলেমান বলছি। ধন্যবাদ আপনাকে। মেহরিনের রেজাল্ট…”
সোলেমান একটু থামল। ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর অধ্যাপক ভদ্রলোক হেসে বললেন,
“আপনার টাকার তো কোনো দরকারই পড়েনি, সোলেমান সাহেব।”
সোলেমান স্থির হয়ে গেল। “মানে?”
“আপনার ওয়াইফ নিজের মেধাতেই প্রথম হয়েছে। আমাদের কোনো অনিয়ম করতে হয়নি। কোনো নম্বর বাড়িয়ে দিতে হয়নি। কোনো সাহায্যও করতে হয়নি।”
সোলেমানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন থমকে গেল।অধ্যাপক আবার বললেন,
“She is a brilliant student. ৯৫+ নম্বর পেয়েছে। এমন মেধাবী শিক্ষার্থীকে প্রথম করানোর জন্য কারও সুপারিশ বা টাকা-পয়সার প্রয়োজন হয় না। আপনার বরং নিজের স্ত্রীর মেধার ওপর ভরসা রাখা উচিত ছিল।”
কথাটা সোলেমানের বুকে এসে লাগল। নিজের স্ত্রীর মেধার ওপর তার ভরসা রাখা উচিত ছিল। কিন্তু সে কী করেছিল?

“যাই হোক,” অধ্যাপক ওপাশ থেকে বললেন, “টাকাগুলো নিয়ে যাবেন। ওগুলোর দরকার পরে নি।”
সোলেমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “না।”
“না মানে?”
“টাকাগুলো আমি নেব না।”
অধ্যাপক একটু অবাক হলেন। “কেন? আপনারই তো টাকা।”
সোলেমান ধীরে ধীরে বলল, “আমি একবার কিছু দিলে সেটা পুনরায় গ্রহণ করি না। টাকা গুলো মেডিক্যালের কোনো খাতে ব্যয় করুন। ”
কথাটা বলেই সে ফোন কেটে দিল। কয়েক সেকেন্ড ফোনটা হাতে নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল সোলেমান। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেহরিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যে তার দেওয়া টাকার কোনো ভূমিকা ছিল না। তার নিজের মেধাই তাকে সেখানে পৌঁছে দিয়েছে। সোলেমানের বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে গেল। তার দুর্নীতি অন্তত বিফলে গেছে। সোলেমান ধীরে ধীরে আবার উঠানে ফিরে এলো।
মেহরিন তখনও একইভাবে বসে আছে। শূন্য চোখে। তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনটা যেন তার কাছে কোনো অর্থই বহন করছে না।
সোলেমান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। মেহরিন ধীরে ধীরে মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে তখন অসংখ্য তারা। সে ফিসফিস করে বলল,

” এ্যাই আব্বু শুনতে পাচ্ছ? আমি নাকি প্রথম হয়েছি।”
তার গলা কেঁপে উঠল। কোনো উত্তর এলো না। মেহরিন কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর মাথা নিচু করে আবার বলল,
“তুমি তো বলেছিলে, আমি ডাক্তার হলে তুমি সবচেয়ে বেশি খুশি হবে। কিন্তু তুমি তো নেই আব্বু। হারিয়ে গেলে। আজই হারিয়ে গেলে। চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলে। এমন ভাবে হারিয়ে গেলে যে আমি শতবার ডাকলেও তোমার একটি সাড়া আসবে না আমি অব্দি।”
সোলেমান আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ঊর্মি চলে গেছে। সোলেমান ধীরে ধীরে মেহরিনের কাছে এসে দাঁড়াল। মেহরিন তার দিকে তাকাল না। শুধু বলল,
“সোলেমান সাহেব…”
“হুম।”
“আমার আব্বু কি খুব অন্ধকারে আছে?”
সোলেমানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ থেমে গেল। মেহরিন তাকাল তার দিকে।
“কবরের ভেতর কি খুব ভয় লাগে?”
সোলেমান কোনো উত্তর দিতে পারল না। মেহরিন আবার নিচের দিকে তাকাল।

“আমি নাকি আজ পুরো বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম হয়েছি। এই রেজাল্টের দরকার নেই আমার। যার জন্য আমার এত পরিশ্রম, সেই মানুষটাই তো রইলো না। আমার কী মনে হচ্ছে জানেন? আমি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ। আমি ভেবেছিলাম আমি চান্স পাবো না। আমার নিজের ওপরই তো আমার বিশ্বাস ছিল না। ভেবেছিলাম রেজাল্টের দিন আব্বুর সামনে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবো না। কিন্তু আব্বু এমন এক কাজ করলো যে আমি চেয়েও আর আমার মুখটা তাকে দেখাতে পারবো না। উফ কি যন্ত্রণা। আর পারছি না সহ্য করতে। আমাকে ঘুমের ঔষধ এনে দিবেন? আমি এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চাই। এটা আমার সহ্যের বাহিরে। আর পারছি না। কলিজা জ্বলেপুড়ে ঝলসে যাচ্ছে। ”

বাতাসি আসলো রান্নাঘর থেকে মেহরিন কে নিয়ে যাওয়ার জন্য। মেহরিন কে ধরে তার রুমে নিয়ে গিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করলে মেহরিন কিছুই খেলো না। গতকাল থেকে না খাওয়া। আজও পেটে কিছু পরলো না। ঔষধের ঝুড়ি থেকে খালি পেটেই একটা ঘুমের ঔষধ খেয়ে শুয়ে পরলো। পৃথিবী এবার একটু শান্তি দাও। বাবা হারানোর শোক কাটিয়ে তাকে পৃথিবী চিনতে দাও। এবার যে তার নিজের লড়াই নিজেকে একাই লড়তে হবে। তাকে জড়িয়ে বুকের মাঝে জায়গা দেওয়ার জন্য যে একটি বাবা মোতালেব ভুঁইয়া নেই।
মেহরিন জানে না, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যটা সারা দেশে কী পরিমাণ আলোড়ন তুলেছে। খবরের কাগজ থেকে শুরু করে ফেসবুকের প্রতিটি ফিড,সবখানেই তখন মেহরিন। দেশসেরা মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার্থী কে এই মেহরিন? তার রেজাল্ট নিয়ে হইচই পড়ে গেল চারদিকে।অথচ তার একটি ছবিও পাওয়া যাচ্ছে না! সাধারণত কোনো শিক্ষার্থী দেশের সেরা হলে তার ছবি, সাক্ষাৎকার, স্কুল-কলেজের স্মৃতি সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মেহরিনের ক্ষেত্রে যেন সবাই এসে আটকে গেল একটি অদৃশ্য দেয়ালে। তার কোনো ফেসবুক আইডি নেই। কোনো পাবলিক প্রোফাইল নেই। কোনো ছবি নেই। মিডিয়া যতই খুঁজল, ততই রহস্য বাড়ল। শেষ পর্যন্ত মেহরিনের পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সূত্র ধরে একে একে প্রকাশিত হতে শুরু করল তার একাডেমিক রেকর্ড। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা থেকে শুরু করে জেএসসি, এসএসসি—প্রতিটি পরীক্ষার ফলাফল খুঁজে বের করা হলো। নওগাঁর মহাদেবপুরের মধ্যে পিএসসি, জেএসসি আর এসএসসি তিনটি পরীক্ষাতেই মেহরিন ছিল সেরা সাতজনের মধ্যে। তার ফলাফল দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। কেবল মাত্র এইচএসসি তে কিছুটা বাজে করেছে। যার আউটপুট এই মেডিক্যাল পরীক্ষার রেজাল্ট।
এই মেয়েটা এতদিন কোথায় ছিল? কেন কেউ তাকে চিনত না? নওগাঁর মেয়ে পুরো দেশে প্রথম! অবিশ্বাস্য কামব্যাক! মেহরিন এক অনুপ্রেরণার নাম। যে মেয়েটাকে কেউ চিনত না, আজ পুরো দেশ তাকে চিনতে চাইছে। এই মেয়েটার গল্প জানতে চাই। কিন্তু মেহরিন তখন এসবের কিছুই জানে না।তার অজান্তেই হাজার হাজার মানুষ তাকে নিয়ে লিখছিল।
হাজার হাজার মানুষ তার সাফল্যে আনন্দ করছিল। তারপর হঠাৎ করেই সেই আনন্দের জায়গাটা বদলে গেল শোকে।

প্রায় প্রতিটি কোচিং সেন্টারেরই একটা নিয়ম থাকে। তাদের কোনো শিক্ষার্থী কোনো জায়গায় ভালো করলে, বিশেষ করে দেশের সেরা হলে, তারা সেই শিক্ষার্থীর বাড়িতে যায়। শুভেচ্ছা জানায়। সাক্ষাৎকার নেয়। সেই সাফল্যের গল্প অন্যদের সামনে তুলে ধরে। মেহরিনও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা ছিল না। তার ফলাফল প্রকাশের পর একাধিক কোচিং সেন্টার তার খোঁজ শুরু করল। শেষ পর্যন্ত তারা জানতে পারল মেহরিনের বাবা মারা গেছেন ফলাফল প্রকাশের দিনই। উদ্ভাসের অফিসিয়াল পেজ থেকে মেহরিনকে নিয়ে একটি পোস্ট করা হলো। এই খবর শোনার পর কোনো ক্যামেরা নিয়ে তার বাড়িতে যাওয়ার সাহস হলো না কারও। দেশের সেরা হওয়া মেয়েটার বাড়িতে তখন উৎসবের বদলে শোক। পোস্টটি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ মেহরিনের জন্য দোয়া করল। তার বাবার জন্য দোয়া করল। অনেকেই নিজেদের জীবনের গল্পের সঙ্গে মেহরিনের গল্প মিলিয়ে পোস্টটি শেয়ার করলো। কেউ লিখল,‘মেয়েটা যেন শক্ত থাকতে পারে। কেউ নিজের বাবাকে হারানোর স্মৃতি মনে করে পোস্ট শেয়ার করল।

কেউ লিখল,মেহরিন, তুমি জানো না—তোমার বাবা আজ বেঁচে থাকলে তোমাকে নিয়ে কতটা গর্বিত হতেন।’
আবার কেউ লিখল দেশের মধ্যে প্রথম হওয়া মেয়েটার আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার বাবাকে। বাবাকে হারানোর পরও যে মেয়ে দেশের সেরা হতে পারে, সে মেয়ে দুর্বল হতে পারে না। মেহরিন, তুমি ভেঙে পড়ো না। তোমার বাবা তোমাকে দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তুমি নিশ্চিত থাকো,তিনি তোমার জন্য গর্বিত ছিলেন।’ সেই পোস্টের নিচে হাজার হাজার মন্তব্য জমা হতে থাকল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেহরিনের নাম ছড়িয়ে পড়ল।কিন্তু যার নামে এত আলোচনা সে নিজেই এসবের কিছুই জানে না। কারণ মেহরিনের কোনো ফেসবুক আইডি নেই।
তার হাতে কোনো ফোন নেই। আর এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো খবরই তার কাছে তার আব্বুর মৃত্যুর চেয়ে বড় নয়।তার বাবার মৃত্যুতে হাজারো মানুষ অশ্রুসিক্ত হয়েছে।
সকালের পর ইমন আসলো দেখা করতে মেহরিনের সাথে। সেও তার বাবাকে হারিয়েছে। জানে এই যন্ত্রণা কতটা গভীর হয়। হু করে মাথার উপর একটা ছায়া সরে যাওয়ার পর তাদের জীবনযাপন কেমন হয়েছিল। সে মেহরিন কে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলল,

” আমি জানতাম তুমি পারবে। তোমার উপর আমার এই বিশ্বাস ছিলো যে তুমি চাচার স্বপ্ন পূরণের জন্য সব করতে পারবে। শুধু একটাই আফসোস চাচা তোমার সাফল্য টা নিজ চোখে দেখে যেতে পারলো না। তাই বলে মোটেও ভেঙে পড়বে না মেহরিন। সামনের দিকে এগোতে হবে তোমায়। সবে চান্স পেয়েছো। এখনো ডাক্তার হওয়া বাকি। জীবন কে থামিয়ে রাখা যাবে না। জীবন কে জীবনের গতিতে যেতে দিতে হবে। চাচা খুশি হবেন তোমাকে দেখে। ”

মেহরিন কেবল শুনলো। কিছু বললো না। এই পৃথিবীর বাতাস অসহ্য লাগছে। সোলেমান দূর থেকে শুনলো ইমনের কথা গুলো। ইমনের কি অগাধ বিশ্বাস ছিলো মেহরিনের উপর। কেবল দেখছি তারই ছিলো না!
তিনদিন পর মোতালেব ভুঁইয়ার নামে গ্রামের মানুষ জন ও এতিমখানার শিশুদের জন্য খাবার দাবারের ব্যবস্থা করলো সোলেমান। ইয়াসিনও আসলো সেদিন। বাড়ির উঠোনে মানুষজনের আনাগোনা। ইয়াসিন সেসব উপেক্ষা করে বাতাসি কে খুঁজতে লাগলো। কেনো তা জানে না। মনে হচ্ছে অনেক গুলো বছর হলো সে বাতাসি কে দেখে না। এখন তো মোতালেব ভুঁইয়া নেই। মেয়েটা এখন থাকবে কোথায়? মোতালেব ভুঁইয়া নিজের মেয়ের মতোই আগলে রেখেছিল তাকে। তার চিন্তা হলো। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে মেহরিনের রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলো মেহরিনের কাঁধে মাথা রেখে বাতাসি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কেমন যেন বুকটা মোচড় দিলো। তার আম্মার কথা মনে পরলো। বাবা মা রা কেন মারা যায়? তারা কেন আজীবন বেঁচে থাকে না?

বাতাসির কান্না দেখে মেহরিন শান্ত চোখে তার দিকে তাকালো। এই দুনিয়া চোখের জলের ব্যথা বোঝে না বাতাসি। মেহরিন আগলে নিলো বুকের মাঝে। হুহু করে কেঁদে উঠলো বাতাসি। সে যাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। তারাই হারিয়ে যায়। এই জীবন এত কঠিন কেনো? কেনো এত জটিল?
মেহরিন বাতাসির চোখের জল মুছে দিতেই বাতাসি হেঁচকি তুলে বলতে লাগলো,
” আপু কেন মানুষ মারা যায়? কেন তারা আমাদের সাথে নিয়ে যায় না? ফাহাদ ভাইয়ার মৃত্যু, তারপর উনার আম্মুর মৃত্যু, আর আজ চাচার মৃত্যু। এত মৃত্যুর ভার কেমনে বইবো আপু? আমার চোখের জল ফুরাবে কবে? ”
মেহরিন এখন আর কাঁদে না। কাঁদার জন্য চোখে হয়তো আর জলই নেই। সে কেবল জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে বলল,

” আমার মতো ভুল কখনো করো না বাতাসি। কারো কাছে নিজের দুঃখ প্রকাশ করো না। দুঃখ গোপন রাখার বিষয় বাতাসি,গোপনই রাখতে হয়। একবার ভুল করে প্রকাশ করলেই তা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকে। এই আমাকে দেখো না। আমার দুঃখ আমাকে গ্রাস করতে করতে আজ ঠিক কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন আমার না আছে একটি সন্তান। না রইলো বাপ। আর না আছে স্বামী। এই পৃথিবীতে সব হারা এক অভাগী আমি। তাই cry alone, suffer alone but never share your inner pain with anyone. পৃথিবী কে নিজের দূর্বলতা কখনো দেখাবে না। কখনোই না। এখন গিয়ে একটু রেস্ট নাও। অনেক কেঁদেছ। আর নয়। ”
বাতাসি উঠে দাঁড়ালো। দরজার সামনে ইয়াসিন কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখের জল সন্তপর্ণে মুছে ফেললো। তারপর পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে ইয়াসিন ডেকে উঠলো। কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,

” ভাবি একটি কথাও কিন্তু ভুল বলে নি বাতাসি। দুঃখ পেও না তুমি। ”
বাতাসি না তাকিয়েই বলল,
” আমি দুঃখ পেলেই আপনার কি? ”
আসলেই তো ইয়াসিনের কি? ইয়াসিন সাথে সাথে জবাব দিলো না। তবে বলল,
” আমার কিছুই না। তোমার জন্যই বললাম। দুঃখ পেলে মানুষ বেশি দুঃখ দেয়। ”
” আপনাকে ভাবতে হবে না। আমি বুঝে নিব আমার জীবন। ”
বাতাসি চলে গেলো। অসহ্য এক লোক ইয়াসিন।
ঢাকা মেডিকেল পরীক্ষার কিছু দিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হলো। ঊর্মি পরীক্ষা দিলো। সে মোটামুটি একটা ভালো পজিশন নিয়েই সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে চান্স পেয়েছে। এখন ভর্তির কার্যক্রম ও ক্লাস শুরু হওয়ার জন্য বাকি আছে তিন-চার মাস। এই সময়টায় ইব্রাহিম ঠিক করেছে ঊর্মি আর ইহরাম কে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে ঘুরে আসবে। সেজন্য এজওয়ান কে জানালো। অস্ট্রেলিয়া থেকে তার তুর্কি নিজ পিতৃভূমি তে যাবে। তারপর বাংলাদেশে আসবে। ঊর্মির এটাই প্রথম বিদেশ সফর।
মাহি আর এজওয়ান তাদের আসার খবর শুনে খুশিই হলো। মাহি তো বাবুর জন্য কেনাকাটা করার জন্য এজওয়ান কে নিয়ে শপিংমলে এসেছে। বাচ্চার জন্য কেনাকাটা করার সময় মাহি জিজ্ঞেস করলো,

” মেয়ের সাহেবের ছেলেটার নাম যেন কি? ভুলে গেছি। ”
এজওয়ান একটা আন্ডারওয়্যার দেখছিলো তখন। আন্ডারওয়্যার টা এমন যে ব্লাক ক্লার আর উপরে রেড কালারের অ্যালাস্টিক। তার উপর লিপস্টিক মারা ঠোঁটের ইমোজি। বড্ড পছন্দ হলো।
” কি হলো বলুন না। নাম টা যেন কি? ”
” রুটি গোস্ত। ”
” কিহ! ” চোখ বড়বড় করে মাহি বলে উঠলো। এজওয়ান মাথা চুলকে বলল, ” ঐ তো কি একটা আদিম যুগের নাম। রুস্তম। এটাকে রুটি গোস্তই বলা যায়। ”
” আর নাম নেই? ”
” আছে রাম রাম হরেরাম। নাম তার ইহরাম। ”
মাহি জুতা,পোশাক কিছু বেবি ফুড কিনলো। তারপর গাড়িতে উঠলো। মাহির মেহরিনের বাচ্চাটার কথা মনে পরলো। আনমনে বলে উঠলো,
” এতদিনে মেহরিনের বাবুটা অনেক বড় হয়ে যেত তাই না? যদি সুস্থ ভাবে আসতে পারতো। ”
” হুমম। ”
” সোলেমান সাহেবের জীবন টা কেমন যেন। ”
এজওয়ান জানতে চাইলো, ” কেমন? ”
” তার শুধু দুঃখ আর দুঃখ। গ্রিন ফ্ল্যাগ লোকদের কষ্ট বেশিই থাকে রেড ফ্ল্যাগ দের তুলনায়। ”
এজওয়ান বুঝলো লাস্ট কথাটা তাকে মিন করেই মাহি বলেছে।

” হেই তরিকুলের বেটি রেড ফ্ল্যাগ কাকে বলছো তুমি? প্রশংসা যখন করবে ভালো মতো করো। রেড ফ্ল্যাগ ইজ ওল্ড ভার্সন। ডার্ক ফ্ল্যাগ ইজ আপডেট ভার্সন। অ্যাই অ্যাম ডার্ক ফ্ল্যাগ। অনলি ফর ইউ বেড পার্টনার। ”
” একটা কথাও দেখি মাটিতে পড়তে দেন না। সব কথারই জবাব দেখি ঠোঁটের আগায় জমিয়ে রাখেন। ”
” অফকোর্স, বিকজ অ্যাম মোর এডুকেটেড,ইন্টেলিজেন্ট, ব্রিলিয়ান্ট পার্সন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। ”
” আই এগ্রি উইথ ইউ। ”
এজওয়ান চমকে তাকালো। ” সিরিয়াসলি! তুমি আমার কথার সাথে সহমত প্রকাশ করলে দ্বিমত না করে! ওহ গড। আমি আকাশে উড়াউড়ি করছি মনে হচ্ছে। আমি ব্ল্যাশ করছি। লুক এট মাই ফেস তরিকুলের বেটি। স্যি। ”
মাহি এজওয়ানের অভিনয় দেখে মুখ লুকিয়ে হাসলো। অভিনয়ের জন্য এজওয়ান সুলতান সেরা রেহ্
গাড়ি চলতে শুরু করছে বাড়ির পথে। এজওয়ান ইহরামের জন্য কেনা জিনিসপত্রের শপিং ব্যাগ গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, ” আমাদের ও এবার একটা বাবু নেওয়া দরকার। বলা যায় না কবে,কখন,কিভাবে মরে টরে যাই। নিজের একটা ডিএনএ পৃথিবীতে ছেড়ে গেলে আমার বংশটা একটু বিস্তার হবে। ”

এই কথার বিপরীতে অন্য সময় হলে হয় মাহি রাগ করতো,বিরক্ত হতো বা হেঁসে উড়িয়ে দিত। আজ তেমন কিছু হলো না। মাহি আনমনে কেবল বলে উঠলো, ” ভুলক্রমে হয়তো কোনো একদিন সেও এসে যাবে। ”
এজওয়ান তাকালো। ” ভুলক্রমে বললে কেনো? তুমি চাও না আমি বাবা হই? চাও না তুমি মা হও? ”
মাহি তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, ” আমি তো আপনাকেও আমার জীবনে চাই নি এজওয়ান সুলতান। তারপরও তো ভুলক্রমে জোর করে চলে আসলেন। সে তো আপনারই রক্ত হবে। আপনার স্বভাবই পাবে। সেই হিসেবে নিশ্চিত সে ভুলক্রমে আমার মতের তোয়াক্কা না করেই বাবার ড্রিম পূরণ করতে জোর করেই চলে আসবে। আর এসেই বলবে ডোন্ট আর্গু উইথ মাই ড্যাড। হি ইজ দ্যা বেস্ট ড্যাড ইন দ্য ওয়ার্ল্ড । ”
এজওয়ান হেঁসে সম্মতি জানিয়ে বলল, ” অফকোর্স এটাই বলবে। কারন মেয়েরা বাবা প্রিয় হয়। আমার মেয়ে বাবা বলতে পাগল হবে। আমাদের তিনজনের একটা গুলুমুলু কুটুমুটু সংস্থা হবে। সেই সংসারে থাকবে কেনল এজওয়ান সুলতান,মিসেস মাহি সুলতান আর আমাদের প্রিন্সেস। ”

” হোক তবে। ”
” কী হোক? ”
” আমাদের কেবল একটা সুন্দর সংসার হোক ? সেই সাথে সকল দূরত্বের অবসান হোক। এই সংসারে আমাদের মধ্যে ভালোবাসা না হোক তবে দায়িত্ব থাকুক। বিশ্বাস আর ভরসার একটা জায়গা তৈরি হোক। পৃথিবী শুধু জানুক এজওয়ান সুলতান এতটাও খারাপ এতটাও জঘণ্য না যতটা আমি শুরুতে তাকে ভেবেছিলাম। সে সুন্দর ভীষণ রকমের সুন্দর। সদ্য বয়ঃসন্ধিতে প্রেমে পড়া প্রেমিকের মতো সুন্দর…”
এজওয়ানের মাথা ঘুরতে লাগলো। এত সুন্দর একটি কথা যেন এজওয়ান এই প্রথমবার শুনলো বৈবাহিক জীবনে। তার মাথা ঠুকে আনন্দে মরে যাওয়ার মতো ফিল হচ্ছে। তরিকুলের বেটি সংসার করতে চায় এজওয়ানের সাথে! এ-ও বুঝি সম্ভব! হাহ্ শালার জীবন দেখি উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এজওয়ান নরম চোখে তাকিয়ে বলল,

দাহশয্যা পর্ব ৯৭ (৪)

“ বিশ্বাস আর ভরসার জায়গা তৈরি হতে হতে তুমি আবার হারিয়ে যাবে না তো তরিকুলের বেটি?”
মাহি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। চোখ মুখে ওটা হাসি নাকি কষ্ট ছিলো এজওয়ান তা ধরতে পারলো না।
“ আমি জানি আমি হারিয়ে গেলেও আপনি পৃথিবী কে বাধ্য করবেন, পুরো ভ্রম্মাণ্ড তচনচ করে ফেলবেন আমায় খুঁজে বের করতে। এতদিনে এটুকু অবশ্য খুব ভালো করেই চিনেছি আপনায়। ”

দাহশয্যা পর্ব ৯৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here