দুইজনাতেই পর্ব ১৮
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“ বাহ, গুড! এক্সসিলেন্ট। আপনাদের ম্যাচিং ম্যাচিং আসলেই সুন্দর স্যার।এতই সুন্দর যে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ”
কথাটুকু বলেই দ্বিতী হাসল। এমনভাবে হাসল যেন সত্যি সত্যিই সে এর চাইতে সুন্দর আর দেখেনি। এটাই সুন্দর। সবচাইতে সুন্দর! দ্বিতী তাকাল। ফের আবারও হাসি দিয়ে বলল,
“ প্লিজ ওকে ডাকি? পাশাপাশি দাঁড়াবেন একটু? আমি আপনাদের দুইজনের ম্যাচিং ম্যাচিং ড্রেসের ছবি তুলতাম স্যার৷ দেখে দেখে শিখতাম। ভবিষ্যৎ জামাই এর পাশে ম্যাচিং ড্রেস পড়ে দাঁড়াতে তাহলে সুবিধা হবে। ”
সাক্ষ্য গম্ভীর ভাবেই চাইল। ভবিষ্যৎ জামাই? বলল,
“ আসুন, আমি শিখিয়ে দিচ্ছি। পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে শিখতে হবে না। ”
মুহূর্তেই উত্তর এল,
“ এভাবে শিখলে হবে না। আপনাদের দুইজনকে সরাসরি একসাথে দেখলে তবেই শিখতে পারব। ”
“ জ্বী, আমাকে এবং আমার ওয়াইফকে একসাথে দেখলে ও শিখতে পারবেন। ভুল বলছি না, নিশ্চয়? ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকায়। সাক্ষ্য ততক্ষনে হাত বাড়িয়ে নিতে নিল দ্বিতীর ব্যাগটা। ঠিক একই রকম কালো রংয়ের ড্রেস খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যেই ব্যাগের চেইন খুলতে নিতেই দ্বিতী গলা উঁচিয়ে বলল,
“ আমার ব্যাগ কেন? কি আশ্চর্য। ব্যাগ দিন। ”
সাক্ষ্য তখনো চেইন খুলতে লাগছিল। বলল,
“ আপনার ব্যাগের সবকিছু ডাকাতি করব। এনি প্রবলেম? ”
দ্বিতী মুহূর্তেই জবাব করল,
“ হাজারটা প্রবলেম। প্রবলেম হবে না? আবার কি সুন্দর করে বলে, এনি প্রবলেম? ”
সাক্ষ্য চেইন খুলতে পারল না। তার আগেই একপ্রকার টেনে নিল দ্বিতী ব্যাগটা। বলল,
“ আমার ব্যাগে দরকারি জিনিসপত্র আছে। ধরবেন না, খবদ্দার। ”
সাক্ষ্য কপাল কুঁচকে নেয়। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কয় লাখ টাকা এনেছেন? ”
“ যতই আনি। অন্যের জিনিস ধরা উচিত না,জানেন না?
সাক্ষ্য এবারে ঠোঁট কামড়ে হাসল৷ বলল,
“ যার জিনিস ধরছি সে নিজেই তো আমার। ”
দ্বিতী সরু চোখে চেয়ে উত্তর দিল,
“ মোটেই না। সে শুধু তার নিজের। ”
এইটুকু বলতে না বলতেই বাইরে থেকে শামীম ডাক দিল সাক্ষ্যকে। বেচারা সাক্ষ্য বন্ধুর প্রতি একপ্রকার বিরক্তই হলো যেন। দাঁত মুখ শক্ত করে সে বোরিয়ে গেল এর পরের মুহুর্তেই। দ্বিতী তখন দরজার ধারে দাঁড়াল। একবার ঘাড় কাঁত করে দেখল নিধিও ওখানেই বসা। সোফার এককোণে বসে আছে। বোধহয় আড্ডা দিবে। দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে দরজাটুকুর সামনেই কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে রইল যেন কি বলে তা সহজেই শুনতে পায়। অপর দিকে সাক্ষ্যর ফিরল তার একটুখানিক পরই। দরজা ঠেলে ভেতরে ডুকতে নিতেই দরজাটা গিয়ে ঠেকল দ্বিতীর শরীরেই। কিঞ্চিৎ ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে বলল,
“ দেখে আসবেন না? কি আশ্চর্য!”
সাক্ষ্য দেখতে নিল দ্বিতীর হাতটা। ব্যাথা পেল কি পেল না তা দেখেই ভ্রু কুঁচকে নিল। বলল,
“দরজার কাছেই কান পেতে ছিলেন নাকি? ”
“ থাকলে কি আপনার সমস্যা হতো নাকি? ”
সাক্ষ্য ব্যথা পেয়ে ও ত্যাড়া কন্ঠে কথা বলছে দেখে হেসে ফেলল আবারও। হাসি চেপে বলল,
“ থাকলে ভালো। ”
“ কেন? ”
“ কারণ, এসব ওয়াইফদের অভ্যাস গত অধিকার এসব। আপনার সে অধিকার আছে। ”
এইটুকু বলতে বলতেই ভেতরে এল। নিজের ব্যাগ খুলল। অতঃপর দ্বিতীর পরনের জামার কালারটার মতো জামাও খুঁজল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত লাল রংয়ের টিশার্ট তার নেই৷ সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলে জানাল,
“ দ্বিতী, লাল রংয়ের টিশার্টই নেই আমার। আপনি কি কাইন্ডলি ড্রেস চেঞ্জ করবেন? তাহলে আমিও চেঞ্জ করতাম তা মিলিয়ে। ”
দ্বিতী এহেন ভালোমানুষি কথা শুনেও ভালোমানুষি দেখাল না। বরং বলল,
“ আমি কেন ড্রেস চেঞ্জ করব? কি আশ্চর্য। আমার ড্রেস একদম ঠিক আছে। ”
সাক্ষ্য তাকাল। জানে এই মেয়ে কেমন। তাই আর কথা বাড়াল না। যেতে যেতে বলল,
“ওকে বসুন। আমি আসছি। ”
এইটুকু বলে চলেই যাচ্ছিল সাক্ষ্য। দরজা পেরিয়ে চলে যাবে ঠিক তখনই দ্বিতী মুখ খুলল। প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“ নিধির সাথে এই ভাবটা অনেকদিনের তাই না স্যাররর?”
শেষের স্যার শব্দটা দ্বিতী টেনে টেনেই বলল। যেন ইচ্ছে করেই বলল। সাক্ষ্য তখন ঘাগ ফিরিয়ে চাইল। বাক্যটা বুঝে উঠে বলল
” হুহ? ”
“ নিধি আপনার খুব প্রিয় স্টুডেন্ট এই কারণেই তাই না? ”
সাক্ষ্য ভ্রু কুঁচকাল। নিধির সাথে তো এখন কথাও বলল না ছেলেটা। তবুও এই মেয়েটা শুধু নিধিকেই নিয়ে পড়ে থাকে। কেন? সাক্ষ্য ভ্রু কুঁচকেই ওভাবে বলল,
“ কে বলেছে নিধি প্রিয় স্টুডেন্ট?
“ পুরো ভার্সিটি জানে । ”
সাক্ষ্য হতাশ। শ্বাস ফেলে যেতে যেতে বলে বল,
“ পুরো ভার্সিটি আপনার মতো মাথামোটা তো। ”
তখন বৃষ্টি নেমেছে ধরনীতে। চারপাশে ঝড়ো, ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আশপাশটা গাছগাছালিতে ভরপুর হওয়াতে কিছু শুকনো পাতা ও উড়ছে। দ্বিতীর জানালার পাশটাতেই বসা। এই রুমের বিছানাটা একদম জানালার সাথেই। কাজেই সারাদিন বসে বসেও জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যাবে, প্রকৃতি অনুভব করা যাব৷ দ্বিতী তাই করল। এই বৃষ্টিতেও ওভাবে বসে থাকল। বৃষ্টির দাপট এতোটাই যে ছিটকে এসে পড়ছে বিছানাতে ও। বৃষ্টি শুরু একটু পরই সাক্ষ্য এল। সাক্ষ্যর হাতে এবার দেখা গেল সত্যি সত্যিই লাল রংয়ের একটা টিশার্ট। দ্বিতী তাকিয়ে দেখল একবার। সাক্ষ্য ততক্ষনে চাপা হেসে বলল,
“ চলুন, ম্যাচিং ম্যাচিং শেখাব। ”
দ্বিতী চেয়ে দেখল শুধু। তাকে একটু আগে মাথামোটা বলে গিয়েছে। ভুলে গেছে সে? অবশেষে বলল,
“ এতক্ষন কি করেছেন? নির্ঘাত নিধিও এখন লাল জামা পরে বসে আছে তাই না? মিথ্যে বলবেন না। ”
সাক্ষ্য উত্তর করল না। তবে মুখ গম্ভীর রেখে বসল দ্বিতীর পাশেই । বলল,,
“ বৃষ্টির পানিতে বিছানা ভেজে যাচ্ছে দ্বিতী। জানালা বন্ধ করছেন না কেন? ”
“ আমার ভালো লাগছে তাই। আমি কি আপনাকে কিছুতে নিষেধ করি নাকি করেছি কখনো ? তাহলে আপনি কেন নিষেধ করবেন? গিয়ে কথা বলুন নিধির সাথে। ”
সাক্ষ্য এবার গম্ভীর স্বরেই জানাল,
“ বন্ধ করুন জানালা।”
“করব না। ”
“ ওকে ফাইন। আমি খোলা জানালার সামনেই ড্রেস চেঞ্জ করছি। খুশি হুহ? ”
এইটুকু বলেই নিজের টিশার্টটা দুইহাতে টেনে ধরল খোলার উদ্দেশ্যে। ঠিক তখনই দ্বিতী বলল,
“ যেখানে ইচ্ছে করুন। কিন্তু আমার সামনে নয়। দূর হোন চোখের সামনে থেকে। আপনাকে দেখলেই আমার অসহ্য লাগছে। ”
সাক্ষ্য হাসল শুধু। নিজের টিশার্টটা বদলে লাল রাঙা টিশার্টটা পড়তে পড়তেই বলল,
“ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকুন আমার দিকে। অসহ্য লাগবে না আর। ”
দ্বিতী নাক মুখ কুঁচকে উত্তর করল,
“ বিচ্ছিরি লাগছে। ”
সাক্ষ্য হাসে। টিশার্ট পরে চেয়ে দেখে দ্বিতীর দিকেই। মুখচোখ ভিজে এসেছে মেয়েটার। বৃষ্টির ফোটা ফোটা পানি জমেছে চোখ মুখে৷ সাক্ষ্য দ্বিতীর মুখে পড়া সে বৃষ্টির পানিগুলোই তর্জনী আঙ্গুলে ছুঁয়ে দিতে দিতে বলল,
“ বাট আমার ভালো লাগছে। আম্মু বান্ধবীর মেয়েটা আসলে অতোটাও খারাপ নয় রাইট? ”
“ আপনার আম্মুর বান্ধুবীর মেয়েটা অনেক বেশি ভালো । কিন্তু আমার আম্মুর বান্ধবীর ছেলেটা দারুণ মাফের বজ্জাত। ”
“ কি দেখে বুঝলেন বজ্জাত? ”
“ বহুকিছু। আপনাকে বলতে ইচ্ছুক নই আমি। ”
সাক্ষ্য হাসে। নিজের টিশার্ট আর দ্বিতীর জামাটা একসাথে দেখিয়ে চাপা হেসে এবারে বলল,
“ ম্যাচিং ম্যাচিং। শিখে নিন ম্যাম। ভবিষ্যৎ এ বরের পাশে দাঁড়াতে পারবেন। ”
বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়ার কারণে একটু আগেই ইলেক্ট্রিসিটি চলে গিয়েছে। দ্বিতীর ফোনে চার্জও নেই। না তো ফোনে ব্যালেন্স আছে। অথচ সন্ধ্যার পর থেকে দ্বিতীর আম্মু কল করে নি। দ্বিতীও কল করতে পারেনি। দ্বিতীর আবার মাকে ছাড়া ঘুম হয় না। সেখানে মায়ের সাথে কথা না বলেই ঘুমাবে কি করে? দ্বিতী তখনও দাঁড়িয়ে। সাক্ষ্য একটু আগেই ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বেলকনিতে গিয়েছে। আবার এল ও মিনিট পাঁচ পর। দ্বিতীতে তখনো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ঘুমাচ্ছেন না কেন? ”
সবসময় ত্যাড়ামো করা দ্বিতীকে এবার একটু নরম দেখাল। সবসময়ের উত্তর গুলো ত্যাড়ামো হিসেবে এলেও এবারে স্থির গলায় জানাল,
“ আমি আম্মুর সাথে কথা বলব। একবারও কল করল না কেন আম্মু?”
“ কথা বলেন নি কেন? ”
“ ব্যালেন্স নেই। আমার ফোনে চার্জও বেশি নেই। ইলেক্ট্রিসিটিও চলে গেল একটু আগে। ”
সাক্ষ্য শুনল। সত্যি বলতে দ্বিতীর এই শান্ত রূপটা সে আগে দেখেনি। আজই দেখেছে বলতে গেলে। সাক্ষ্য নিঃশব্দে হেসে ফোন এগিয়ে দিল। অদিতি আন্টিকে কল দিয়েই অদিতি আন্টির মেয়ের হাতে ফোনটা দিল৷ অতঃপর বলল,
“ কথা বলুন। ”
দ্বিতী বলল ও কথা মায়ের সাথে। পাশে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য শুনছিল কেবল মা-মেয়ের কথোপকোতন। অতঃপর কথা শেষ হতেই দ্বিতী ফোনটা ফেরত দিল৷ আর সাক্ষ্য তখন হেসে জানাল,
“আম্মুর বান্ধবীর মেয়েটা ভালো আবার শান্তও। আমি তার শান্তরূপ প্রথমবার দেখলাম। নট বেড। ”
“ আম্মুর জন্য। নয়তো আপনার সাথে শান্তভাবে কথা বলা? ইম্পসিবল! ”
এইটুকু বলতে বলতেই দ্বিতী বিছানার একপাশে গিয়ে শুঁয়ে পড়ল। চোখ বুঝতেই সাক্ষ্য প্রশ্ন ছুড়ল,
“ একই বিছানায় ঘুমাতে সমস্যা নেই ঘুমাতে? ”
দ্বিতী চাইল৷ সমস্যা থাকবে কেন? ছোট বাচ্চা সে? ভ্রু কুঁচকে বলল,।
” সমস্যা থাকলে খুশি হতেন আপনি, তাই না? ’
সাক্ষ্য মাথা নাড়ায় ঠোঁট এলিয়ে হেসে। জানাল,
“জ্বী না,সমস্যা থাকলেও মানিয়ে নিতাম।,”
“ শুনুন? আমি ঘুমপ্রিয় মানুষ। ঘুম যেতেই হবেে।কাজেই সাজি আম্মুর বড় ছেলের উদ্দেশ্য অতোটাও খারাপ হবে না আশা করি। ”
“ যদি খারাপ হয়? ”
“ দেখে নিব তখন। ”
এইটুকু বলেই দ্বিতী চোখ বুঝল। ঘুমে চোখ বুঝে আসছে মেয়েটার। এমনিতেই কত কত ঘুমায় সে বাসায়। দ্বিতী বোধহয় ঘুমিয়েই গেল। সাক্ষ্য ঠিক পাশেই থেকেই দেখছিল। নড়চড় নেই দেখে ভাবল সত্যিই ঘুমিয়ে গেছে মেয়েটা। অতঃপর মৃদু আলোতে পরখ করছিল ঘুমন্ত মুখটা। ঠিক যেন পুতুল এর মতো মুখ। সাক্ষ্য চাইল শুধু। অতঃপর একটু একটু করে মুখ ঝুঁকিয়ে রাখল দ্বিতীর মুখের কাছেই।
সাক্ষ্য এবারে মাথাটা ঝুঁকিয়ে
নিজের ঘন চুল গুলো ঠেকাল বউয়ের
কপালেই।অতঃপর ওভাবেই ভ্রু কুঁচকে বউয়ের ঘুমন্ত মুখ পরখ করতে করতে বিড়বিড় করল,
দুইজনাতেই পর্ব ১৭
“ আমি খুব কঠিনভাবে অদিতি আন্টির মেয়েটার জালে আটকে যাচ্ছি। ”
দ্বিতীর বোধহয় তখন মাত্রই চোখ লেগে এল। কপালের কিছুর স্পর্শ এবং বিড়বিড় করে কিছু বলার কারণেই বোধহয় দ্বিতী মুহূর্তেই চোখ খুলল। সন্দেহি চোখে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ আসলেই তো উদ্দেশ্য ভালো মনে হচ্ছে না। এভাবে ঝুঁকে কি করছিলেন হুহ? যা করার জেগে থাকতেই করবেন। ঘুমানোর সুযোগ নিবেন তো খবর করে ছাড়ব। ”
সাক্ষ্য চোখে হেসে চাইল। দ্বিতীর কথা শুনে ওভাবে থেকেই ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ এখন তো জেগে আছেন। এখন কিছু করলে খবর করার সুযোগ নেই বলছেন? ”
