দুইজনাতেই পর্ব ৪৯
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“আম্মু,সবাই আসেনি বোধহয়।তাই না?”
এইটুকু ধীরস্বরেই বলেই দ্বিতী ফের আবারও চাইল দরজার দিকে। সাক্ষ্য বোধহয় এই এল, এই আসবে। কিন্তু সাক্ষ্য এল না। সত্যিই এল না দ্বিতীর নিবু নিবু অবস্থায়ও৷ দ্বিতীর চোখ টলমল করল। ইগো দেখাচ্ছে? সাক্ষ্যর সাথে সেদিন বাসায় ফিরেনি বলেই সাক্ষ্য রাগ করে তাকে দেখতে আসছে না?সত্যিই? অথচ দ্বিতী যদি নাই বাঁচত? দ্বিতী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আরেক পলক ওদিকে ফিরেই বলল,
“কয়টা বাজে আম্মু? কেউ কি বাসায় ফিরে গিয়েছে? সবাইকে দেখলাম… ”
বাকিটুকু বলতে পারল না দ্বিতী। দ্বিতী বেশ গুরুতর আঘাত পেলেও ওর চেহারায়, কথায় কিংবা আচরণে ব্যথার বা দুঃখের রেশমাত্রও দেখা গেল না। মনে হলো না এই মেয়েটারই কয়েক ঘন্টা আগে জঘন্য রকমের অবস্থা ছিল। এই মেয়েটার জন্যই এক একজন কেঁদে কেঁদে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। অদিতি আহমেদ মেয়ের দিকে ফিরে টলমলে চোখে বললেন,
“ সবাই এসেছে তো আম্মু।কেউ ফেরেনি। সবাই তোমার জন্য অপেক্ষায় ছিল। সবাই তোমার জ্ঞান ফেরার জন্য ছটফট করছিলাম। কেউ ফেরেনি আম্মু। তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও৷ বাসায় গিয়ে আমরা সবাই মিলে গল্প করব বসে বসে কেমন? সাজি, আমি, তুমি সবাই! ”
দ্বিতী চাইল। দ্বিতীর যখন মন খারাপ হতো, খুব দুঃখ হতো কিংবা মা যখন তাকে অত্যাধিক আদরে ডাকে তখন তুমি করে সম্বোধন করে। আজও যে খুব বেশিই আদরের দরুন এমন ভালোবেসে তুমি সম্বোধন করছে বুঝতে বাকি নেই তার। মা কি তাকে ছোট ভাবে? ভাবছে হয়তো এক্সিডেন্টে র কারণে খুব কষ্ট পাচ্ছে? দ্বিতী হাসে মৃদু। এই পর্যায় আরেকটিবার দরজার দিকে চেয়ে আগের চেয়েও মৃদু স্বরে শুধাল,
“ আম্মু, সাক্ষ্য আসেনি হসপিটালে তাইনা? নাকি এসেও… ”
দ্বিতীর বাকি কথা শেষ হওয়ার আগেই দরজার সামনে থেকে একটা ছায়া আচমকাই সরে গেল। এই কিয়ৎক্ষণ যাবৎ দ্বিতী ছায়াটাকে ভালোভাবে খেয়াল না করলেও ছায়াটা যে এতোটা সময় ওখানটাতেই ছিল তা বুঝতে অসুবিধা হলো না মেয়েটার। কিন্তু সরে গেল কেন ওভাবে? দ্বিতীর মনে প্রশ্ন জাগতেই তার আম্মু উত্তর দিল,
“ সাক্ষ্য তো ছিল সারাটা রাত। যখন অপারেশন হওয়ার পর তোমায় কেবিনে দিল তার একটু পরই হসপিটালের পাশের মসজিদটায় নামাজ পড়তে গিয়েছে৷ সাম্যকে বারবার বলেছিল জ্ঞান ফিরলেই যাতে জানায়। সাম্য হয়তো ভুলে গিয়েছে জানাতে। আমি এক্ষুনিই জানাচ্ছি আম্মু, কেমন? ”
এইটুকু বলেই অদিতি আহমেদ উঠতে নিলেন। দ্বিতীর শরীর জুড়ে ব্যথা। হাত পা নড়াতেও কষ্ট হয় তবুও মায়ের হাতটা সে ধরল। বলল,
“ থাক, উনি এলে আসবেন। পাশে বসবে আম্মু? আব্বু কোথায়? ”
“ডাকব? ”
দ্বিতী চাইল। আব্বু আম্মুর প্রতি যেটুকু অভিযোগ ছিল তা হয়তো তার মন থেকে কমেনি। কিন্তু ঐ যে এক্সিডেন্টের মুহূর্তটায় যখন উপলব্ধ হলো এটাই তার শেষ মুহূর্ত তখনই আব্বু-আম্মুর সাথে কাটানো মুহূর্তের লোভ ও সামলাতে পারেনি সে। আফসোস হচ্ছিল যে আম্মু-আব্বুকে আর কখনো দেখা হবে না, কথা হবে না, আদর পাওয়া হবে না। ইশশ! মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্তটা বোধহয় এমনই হয়। এক একজন কত কত আফসোস নিয়েই পৃথিবী থেকে চলে যায়। দ্বিতী চোখ বুঝে। মায়ের হাতটা ওভাবে ধরে থেকেই বলল,
“ আম্মু, তোমরা আলাদা থাকলেও আমার তোমাদের চাই। আমি তোমাদের দুইজনকেই ভালোবাসি আম্মু। দুইজনকেই। তোমাদের এক হতে হবে না, তবে তোমরা আমায় আগের মতোই ভালোবাসবে হুহ?আগের মতোই!”
অদিতি আহমেদের চোখজোড়া বেয়ে জল গড়াল। বোধহয় মেয়ের সামনে কাঁদতে চাননি বলেই উনি অযুহাত দিয়ে বাইরে এলেন। চোখের পানি মুঁছলেন। আর ঠিক তখনই চোখে পড়ল দরজার সামনে দাঁড়ানো সাক্ষ্যকে। চোখজোড়া কি ভীষণ লাল টকটকে দেখাচ্ছে৷ নাকটাও লাল দেখাচ্ছে। ছেলেটা কি নামাজে কেঁদেছে? অদিতি আহমেদ চাইলেন। দ্রুতই বললেন,
”সাক্ষ্য দ্বিতী তোমার খোঁজ করছিল। যাবে না দ্বিতীর কাছে? এখানে দাঁড়িয়ে আছো যে? ”
সাক্ষ্য চাইল। উত্তর করতে পারল না সে। শুধু গলা ধরে এল তার। দ্বিতী..দ্বিতীর কাছে যাবে? হৃদয়ের এতোটা সময়েে ছটফটানি শান্ত হবে? অস্থিরতাটা মিইয়ে আসবে? সাক্ষ্য উত্তর করে না। শুধ পা বাড়ায়। পরনে তখনও রক্তে মাখামাখি করা সে শার্টটা। রক্তগুলো শুকিয়ে এসেছে কেমন। চুলগুলো কেমন উষ্কখুষ্ক, এলেমেলো।সাক্ষ্য এগোল। একদম ধীরপায়ে এগিয়ে এসে দ্বিতীর কোমল মুখটার দিকে চাইতে চোখে পড়ল মেয়েটা চোখ বুঝে আছে। শরীরটা নেতিয়ে আছে। মাথায় ব্যান্ডেজ। সাক্ষ্য র গলা দিয়ে স্বর বের হয় না। গলা কাঁপছে পুরুষটার। এমনকি হাত-পায়ে অব্দি কাঁপাকাঁপা ভাব। সাক্ষ্য সে কাঁপা কাঁপা হাতেই হাত এগিয়ে রাখল দ্বিতীর সুঁই ফুটানো হাতটায়। একদম মৃদু, আলতো একটা স্পর্শ। কোন শব্দ নেই, কোন কোলহল নেই তবু দ্বিতী চোখ মেলে চাইল। সামনের পুরুষটিকে আহত সৈনিকের ন্যায় মাথা নুইয়ে হাত ছুঁয়ে রাখতে দেখে খব গাঢ় নজরে চাইল সে। এই পুরুষটির সাথে সংসার বোনার ইচ্ছে তো তার সে কৈশোর থেকে। কিশোরীকালের টলমলে আবেগ জড়িত এই পুরুষটির সাথে আবার যে দেখা হওয়ার সুযোগ থাকবে এটাই তো ভাবে নি দ্বিতী৷ ভেবেছিল আর বুঝি দেখা হবে না। আর বুঝি কথা হবে না৷ আর বুঝি কখনো সংসার নামক আবেগে পা রাখাই হবে না। দ্বিতীর কান্না আসে এই পুরুষটিকে দেখে। ইশশ ঐ যে তীব্র যন্ত্রনা হলো, ব্যথায়-যন্ত্রনায় দ্বিতীর শরীরটা গড়াগড়ি খেল, চোখ বুজে এল ঐ মুহূর্তটায় দ্বিতীর কেবলই মনে হচ্ছিল এই আপন মানুষ গুলোর সাথে তার আর কখনোই দেখা হবে না। কখনো না। অথচ হলো দেখা। এই এতোটা সময় পর সে এই কাঙ্ক্ষিত মুখটা দেখতে পেল। মৃদু স্বরে আওড়াল,
“সাক্ষ্য, রাগ করেছেন? ”
দ্বিতীর তখনও শরীরে যন্ত্রনা। ব্যাপক যন্ত্রণা। যেন ব্যথা সহ্য করাটা সম্ভবই নয়। তবুও ও মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়েই বলল কথাটা। সাক্ষ্যর বোধহয় এবারে চোখজোড়া তীব্র লাল হয়ে উঠল। দ্বিতীর হাতের উপে রাখা হাতের স্পর্শটাও একটু দৃঢ় হলো যেন। ঠোঁট চেপে রাখল পুরুষটা। অথচ তখনও দ্বিতীর দিকে তাকায়নি সে৷ সরাসরি দৃষ্টি রাখেনি। বরং কান্না আটকাতে চাহনিটা দ্বিতীর হাত থেকে সরিয়ে অন্যপাশে রাখল। দ্বিতী মৃদু হাসে। ফের বলে,
“তারপর, আমাদের যদি আর কখনো দেখাই না হতো? যদি আর কখনো চোখই না খুলতাম? কি করতেন সাক্ষ্য? ওভাবে চোখ ফিরিয়ে চেয়ে থাকতেন?”
সাক্ষ্য এই পর্যায়ে চাইল। একদম লাল টকটকে হয়ে আসা বর্ণ নিয়েই দ্বিতীর মুখের দিকে ফিরে চাইল সে। অতঃপর কিছুটা ঝুঁকেই দ্বিতীকেই আলতো করে জড়িয়ে নিয়ে মুখ গুঁজল দ্বিতীর ঘাড়ের দিকটায়। মুহুর্তেই চোখের নোনাপানির অস্থিত্ব বুঝে উঠতে দ্বিতীর সময় লাগল না। সাক্ষ্য কাঁদছে? এই নিয়ে কতবার দ্বিতীর সাক্ষ্যর চোখের পানির অস্থিত্ব টের পেল।তাও দ্বিতীর জন্য। দ্বিতী চোখ বুঝে। সাক্ষ্য যখন অনেকটা সময় পর মাথা তুলল তখনও পুরুষটা নিশ্চুপ। কোন কথা বলল না। দ্বিতীর দিকে ভালো করে চাইল না। দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস তুলল। ফের আবারও বলল,
“এড়িয়ে যাচ্ছেন? কথা বলবেন না?”
সাক্ষ্য এবারেও উত্তর দিল না। তার ইচ্ছে হচ্ছে দ্বিতীকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে নিক বুকের ভেতরে। দুই হাতে খুব শক্তপোক্ত ভাবে ঐটুকু শরীরটা জড়িয়ে ধরে কিছুটা সময় বসে থাকুক। তাহলে যদি হৃদয়টা শান্ত হয়? তাহলে যদি প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতির শঙ্কাটা কাটে?সাক্ষ্য চাইল। দ্বিতী ফের বলল ধীরস্বরে,
“যদি ঐ মুহূর্তটার পর আর দেখা না হতো সাক্ষ্য… আর চোখই না খুলতাম? কথা বলার আক্ষেপ থাকত কি আপনার? আমার তো বড্ড…”
দ্বিতীর বাকিটা বলার আগেই সাক্ষ্য দ্বিতীর দুইপাশে দুই হাত রেখে ঝুঁকে তাকাল। রক্তিম চোখজোড়ায় চেয়ে শীতল কন্ঠে আওড়াল,
“ আর কখনো চোখ না খোলার খুব শখ? আর কখনো দেখা না হওয়ার জন্যই এমন করেছিলেন তাই না? খুব শখ আমার সাথে শেষ দেখা হওয়ার? কেন দ্বিতী? এতোটা অসহ্যের বস্তু আমি ঠিক কেন হয়ে গেলাম বলবেন?”
দ্বিতী চাইল। সাক্ষ্য ফের আবারও বলল,
“ সরি, বাট আপনার ইচ্ছে বা শখ কোনটাই আমি সাপোর্ট করতে পারছি না। এমনকি এতগুলো দিন আপনার কথাগুলোর যেমন সাপোর্ট দিয়েছি তাও পারব না। ”
সাক্ষ্য এইটুকু বলেই ফের আবারও বলল,
“ এতগুলো দিন আপনি আমার সাথে যোগাযোগ করেননি। মেনে নিয়েছিলাম। দূরত্ব টেনেছিলেন। তাও মেনে নিয়েছিলাম। আপনার আমার সম্পর্কটা স্বাভাবিক রাখেননি মেনে নিয়েছি। আপনার সময় প্রয়োজন, তাও মেনেছি। আপনি নিজের মতো বাঁচতে চেয়েছেন তাও মেনেছি। কিন্তু আর মানতে পারব না। আমি সত্যিই আপনার আর কোন সিদ্ধান্তকে মেনে নিব না, নিতে পারব না। উপরওয়ালা আমায় আর যেটুকু হায়াত দিয়েছে আমি সবটুকু সময় আপনার সাথে কাটাব। আপনি চাইলেও কাটাব, না চাইলেও কাটাব। আমার আপনাকে ছাড়া চলবে না, ওকে? আন্ডারস্ট্যান্ড?”
দ্বিতী এই যন্ত্রণা, এই ব্যথার মধ্যেও মৃদু হাসি পেল। মন ফুরফুরে লাগল বোধহয়। শান্ত চাহনিতে চাইতেই সাক্ষ্য আবারও বলল,
“আমার দোষ ছিল। তার মানে এই নয় আমি দোষী বলে আপনাকে ছাড়া আমায় সারাজীবন পড়ে থাকতে হবে বুঝলেন? আমার দোষ এই তো যে ঠিক সময়ে ভালোবাসার প্রকাশ করিনি? এটাই তো? আমি ভাব ধরে সবসময় বুঝিয়েছি ভালোবাসিনি তাই তো? মাঝখানে একজন সুযোগ নিয়ে নিবে সে জায়গা থেকে আমি তো ভাবিনি। যদিও সে ক্ষেত্রেও দোষটা আমারই। আমার স্বীকার করছি। কিন্তু শুধু ভালোবাসা প্রকাশ করিনি এই অপরাধে আমায় অপরাধী করলে একই অপরাধী আপনিও মিসেস এহসান। আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন আমরা প্রায় সেইম প্যাটার্নেই এগিয়েছি৷ শুধু আমি আপনার প্যাটার্নটা বুঝে ফেলেছিলাম আর আপনি আমারটা বুঝেননি। কিন্তু আমরাই দুইজনই একইভাবে ভালোবেসেছি। একইভাবেই! আপনি লুকিয়ে চুরিয়ে দেখতে গিয়ে ধরা পড়ে যেতেন আমার চোখে আর লুকিয়ে চুরিয়ে দেখেও ধরা পড়িনি। আপনি ভালোবাসা প্রকাশ না করে রাগ রাগ ভাব জাহরি করতেন আর আমি গম্ভীর ভাব জাহির করতাম। আমাদের দুইজনের কেউই কিন্তু কখনো মুখে ভালোবাসি উচ্চারণ করিনি মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম। তাহলে দোষ আমার একার কেন হবে? ”
দ্বিতী চোখ বুঝে এবারে। এতসব প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে খুব মৃদু গলায় বলল,
“ শার্ট রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। ঘেমেছেনও বোধহয়। শার্ট বদলাননি কেন? ”
সাক্ষ্যর এই এতোটা সময়ে শীতল নজরে চাইল। কন্ঠে চাপা রাগ ঢেলে বলল,
“ আনন্দে ছিলাম আমি। তাই। ”
“ শার্ট বদলানো উচিত ছিল।”
“ কেন? শার্ট বদলে কি পাত্রী দেখতে যেতাম আমি? নাকি হসপিটালের ডক্টরদের সামনে সুন্দর দেখাতাম নিজেকে? ”
দ্বিতী চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“ এক্সিডেন্ট কেউ ইচ্ছে করে করায়না। আপনার এমন রেগে কথা বলার মানে কি বলুন?”
“ কারণ একটু পর আপনি আবার বলবেন আপনার সময় চাই। আপনার অনেক কাজ শেখা বাকি। আপনি নিজের মতো বাঁচতে চান..”
“বলেছি? ”
“বললেও মানা হবে না। হসপিটাল থেকে আমার বাসায় না গিয়ে বাপ-মায়ের বাসার দিকে এক পা বাড়িয়ে দেখবেন কেবল। সোজা আমার বাসায় নিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে রাখব। মাইন্ড ইট। ”
দ্বিতীর দৃষ্টি নিবু নিবু। তবু চেয়ে বলল,
“হুমকি দিচ্ছেন? ”
“যা ইচ্ছে ভাবুন। কিন্তু এই মুহূর্তটার পর থেকে আমার মৃত্যু অব্দি আপনাকে আর একা থাকতে দেওয়া হবে না। আপনি বললেও না। বিয়ের পর স্বামী ছাড়া একা থাকতে চাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করাই গুনাহ।”
দ্বিতীর এই পর্যায়ে চোখ বুজে নেয়।কি ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে যে। ব্যথায় শরীর অসার হয়ে আসছে। তবুও স্বামীর দিকে মেয়েটা আরেকবার চাইল। বলল,
“ আপনার কি জ্বর? ”
“হু?”
“যখন জড়িয়ে ধরলেন মনে হলো শরীর থেকে তাপ ছড়াচ্ছে। তাই বুঝলাম জ্বর। বাসায় গিয়ে রেস্ট করুন। শার্টটা পাল্টে একটা গোসল দিয়ে ঘুম দিয়েন। আমি আছি, যাচ্ছি না কোথাও।”
“বিশ্বাস নেই আপনাকে। আছি বলেও দেখা গেল আচমকাই আমাকে একা করে দিয়ে চলে যাবেন। সুস্থ হওয়া অব্দি আর বিশ্বাস করতে পারছি না।”
দ্বিতীর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। তবুও বহুকষ্টে কথা বলছিল। অবশেষে ভ্রু উঁচিয়ে আবারও বলল,
“ এক্সিডেন্টে হলো আমার। আর অসুস্থ হলেন আপনি?এতোটা দুর্বল শরীর হলে কি করে হবে মিস্টার সাক্ষ্য এহসান? রোগ জীবাণু এত সহজে আক্রমণ করলে এই নাজুক শরীর নিয়ে বাঁচবেন কি করে?”
সাক্ষ্য গম্ভীর মুখ করে চাইল। মূল কথা থেকে বারবার যে দ্বিতী সরে গিয়ে এই ঐ কথা টানছে পছন্দ না হলেও চাপাশ্বাস ফেলল সে। অতঃপর নিজেকে শান্ত করে একই ভাবে থেকে প্রিয়তমার কপালে চুম্বন এঁকে ফিসফিস স্বরে উত্তর করল,
“ রোগ জীবাণুর আক্রমণ নয় মিসেস, প্রিয়তমার শূণ্যতা মেনে নিতে পারে না এই নাজুক শরীর ও মনটা। যদি এতই সুস্বাস্থ্য কামনা করেন তো তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে স্বামীর বাধ্যগত ওয়াইফ হয়ে যান। ”
সাম্য মাত্রই ভাইয়ের জন্য জামাকাপড় এনেছে বাসায় গিয়ে। বহুবার বলেও যখন বাসায় পাঠানো গেল না তখন না পেরেও তাকে আনতে জামাকাপড়। কিন্তি হসপিটালে এসেই সর্বপ্রথম চোখে পড়ল কথা বেশ হেসে হেসেই এক ডক্টরের সাথে আলাপ করছে। দ্বিতীর এমন একটা অবস্থায়ও কথা কি করে এমন করতে পারে?দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বকবক করছে? তাও হেসে হেসে? সাম্য সামান্য মেজাজ দেখিয়েই ডাক দিল কথাকে। অতঃপর কথা গটগট পায়ে এদিকে এগিয়ে আসতেই বলল,
” এমন একটা সিচুয়েশনেও এমন হেসে হেসে কথা বলিস কি করে? দ্বিতীর জন্য চিন্তা হচ্ছে না তোর?এমন তো নয় যে ও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে অপারেশন সাক্সেসফুর হওয়ার পরও, রোগীর জ্ঞান ফেরার পরও কি থেকে কি হয়ে যায় বলা যায় না। আমরা কতোটা চিন্তায় আছি আর তুই ওভাবে হেসে কথা বলছিলি? ”
কথা চাইল। বলে,
“তুমি ভুল বুঝছো। উনিও আমাদের মেডিকেল কলেজেরই স্টুডেন্ট ছিলেন।অনেক সিনিয়র যদিও। কিন্তু একবার কি একটা অনুষ্ঠানে উনার সাথে কথা হয়েছিল। প্রায় নয় বছরের সিনিয়র উনি। তাই হেসে জবাব দিচ্ছিলাম উনার প্রশ্নের। ”
সাম্য রেগে চাইল বোধহয়। থমথমে মুখ করে ধমকে উঠে বলল,
“জামাকাপড় গুলো নিয়ে ভাইয়াকে দিবি ওকে? আমার তো মনে হচ্ছে তোকে হসপিটালে আনাটাই ভুল হয়েছে আমার। ভেবেছিলাম তুই দ্বিতুর চিন্তায় অস্থির হবি তাই এনেছিলাম। এনে দেখি সিনিয়র পেয়ে গেছিস। ”
“দ্বিতুর জন্য চিন্তা হচ্ছে না কে বলেছে তোমায় সাম্য?”
”দেখা যাচ্ছে।”
এইটুকু বলেই সাম্য ফের পা বাড়াল গটগট করে। দ্বিতীর দুয়েকটা মেডিসিন ও বাইরে থেকে আনাতে হবে৷ সাক্ষ্যকে এই সময়টায় ছোটাছুটি করতে দেওয়াটায় আরো চাপ পড়বে বলে নিজেই ছুটল তাই।
দ্বিতীর যখন জ্ঞান ফিরল ঠিক তখনই খেয়া, সাদাত আর কিয়ান মেহুরা বের হলো। প্রায় শেষরাত্রি তখন। কিন্তু খেয়ার বাসার রাস্তাটা অন্যদিকে বলে কিয়ানই বলল,
“তুই যেতে পারবি? এগিয়ে দেই চল খেয়া। ”
মাঝে সাদাবই বাধা দিয়ে বলে উঠল,
“ আমি ঐদিক দিয়েই যাব। তুই বরং মিহুকে এগিয়ে দে। ও ও তো একা। ”
“ হু। আমি ভাবলাম তুই আরো মিহুকে এগিয়ে দিবি৷ খেয়াকে তো সহ্যই করতে পারিস না। ”
সাদাত ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ আজ দিলাম নাহয়। ”
”আচ্ছা। ”
অতঃপর চার বন্ধু অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা রিক্সা পেল। যেটায় মিহু আর কিয়ানই উঠল। ওরা চলে যেতেই সাদাত চোখ বুঝল। আজ নিজ চোখেই যে দেখল প্রিয়তমাদের হারানোর ব্যথা বা হারানোর ভয়টা কেমন হয় এরপর খেয়াকে একা ছাড়তে মন চাইল না ছেলেটার। নিজ চোখেই তো দেখল সাক্ষ্য স্যারের মতো গম্ভীর মানুষটার কান্না, আহাজারি! যদি আজ দ্বিতীর জায়গায় খেয়া থাকত? যদি সত্যিই আজ খেয়ার কিছু হতো? সাদাত আর ভাবতে পারল না। আচমকাই খেয়ার হাতটা তুলে ধরল নিজের হাতের বাঁধনে। ছোটছোট চোখ করে চেয়ে বলল,
“ হাতে একজোড়া চুড়ি ছিল না তোমার খেয়া? বিয়ের চিহ্নের ঐ চুড়িগুলোও ফেলে দিয়েছো? ”
খেয়া চাপাশ্বাস ফেলে জামার হাতার আড়াল থেকে চুড়ি দেখিয়ে বলল,
“ ভুল করেছিলাম। তার মানে সবসময় দোষী হবো এমন কেন ভাবিস? ”
সাদাত তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসে। বলে,
“ভুল? ওটা ভুল ছিল না খেয়া। ওটাই প্রমাণ ছিল যে কার জীবনে কার কতটুকু অংশ ছিল। ভাগ্যিস! নাহলে তো আমি বোকা আজীবনই ভেবে যেতাম তুমিও ভালোবাসো আমায়। ”
খেয়া কাঁপা স্বরে বলে উঠল,
“ ভালোবাসি।”
“ বিশ্বাস হয় না আর। যে নারী আমার হয়েও অন্যের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার ভালোবাসা বিশ্বাস হওয়ার উপায় আছে বলো? নেই। তবুও দেখো আমি বোকা এখনো মুভ অন করতে পারিনি। ”
খেয়া বিস্ময় নিয়ে বলল,
” মুভ অন? তুই মুভ অন করতে চাস সাদাত? আগে বলতি। বিয়েটা তাহলর আমরা দুইজনের সিদ্ধান্তে সমাপ্তি…”
খেয়া বাকিটুকু বলার আগেই সাদাত তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে শুধাল,
”তোমার জন্য সমাপ্তি টানা খুব সহজ তাই না খেয়া? কিন্তু আমার জন্য সহজ নয়। আমি সমাপ্তি টানবও না। তুমি খেয়া আজীবন আমার বউ হয়েই থাকবে। আমার হয়েই থাকবে। বুঝেছো? ”
দুইজনাতেই পর্ব ৪৮
খেয়া চেয়ে থাকে শুধু। এই সাদাত চায় কি? তাকে তার ভুলের জন্য ক্ষমা করল না, ঐ ঘটনার পর আর কখনো আগের সাদাতকে সে পায়নি৷ পায়নি! শুধু পেয়েছে তুচ্ছতাচ্ছিল্য,অবহেলা আর তীক্ষ্ণ ধারালো কথা, যে কথার আঘাতে ঝালাপালা হয়েছে তার হৃদয়টা। সাদাত বোধহয় জানেই না যে ঐ ঘটনায় খেয়া সাদাতকে যতোটা কষ্ট দিয়েছে সাদাত তার চেয়েও হাজরগুণ বেশি কষ্ট দিয়েছে ঐ এতগুলো দিনের আচার-আচরণ,ব্যবহার আর কথায়।
