দুইজনাতেই পর্ব ৫৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
সকালে খুব ভোর ভোর হসপিটালে নতুন একটা মুখ দেখা গেল। কণা! সাথে কিছুটা দূরে তার ভাই আর দাদীকেও দেখা গেল। দ্বিতী অবশ্য নিজের অসুস্থতার এই সময়টায় ভাবে নি যে কণা আসবে। অথবা ওর পরিবার। ফোঁস করে শ্বাস ফেলতেই কণা সামনে এল। মুখে একটা হাসি জুড়ে দিয়ে বলল,
“ আত্মীয়রা অসুস্থ হলে, হসপিটালে এডমিট থাকলে আমি প্রতিবারই পরিবারের সাথে দেখতে যেতাম। তুমি আবার ভাবি হও। না এসে পারলাম না তাই। ভালো আছো ভাবি?”
দ্বিতী চেয়ে থেকে হাসে। কণার হাতে তখনও জ্বলজ্বল করা রিংটা চোখে পড়ল। ওর মনে পড়ল সেদিনের কথাগুলো৷ স্পষ্টই মনে পড়ল। হেসে বলল,
“ একদম ভালো আছি৷ তুমি কেমন আছো কণা? ”
“ আছি। শুনো, আমি সেদিন তোমার কেকটা ফিনিশড করে দিয়েছিলাম বলে তোমার এত রাগ হয়েছিল? হুহ?”
“ নিজের অবস্থান জানার পর তোমার উপর আর রাগ হয়নি। বরং নিজের প্রতি রাগ হয়েছে। ”
“কোন অবস্থানের কথা বলছো?”
“ এই যে ঐ পরিবারে, তোমার গুরুত্বটাই বেশি। সাজি আম্মুর জীবনে তোমার গুরুত্বটা বেশি। ওদের বউ করার সিদ্ধান্তেও তোমার প্রায়োরিটিটাই বেশি ছিল। এমনকি সাক্ষ্যর জীবনেও….”
দ্বিতী পুরোটক সমাপ্ত করতে পারল না। ঠিক তখনই পেছনে থেকে ভেসে এল একটা ভরাট স্বর,
“ ডোন্ট সে দ্যাট সাক্ষ্যর জীবনেও ওর গুরুত্বটা বেশি। সাক্ষ্যর জীবনে ওর কোন ভ্যালুই রাখেই না আর…”
সাক্ষ্য গিয়েছিল মেডিসিন আনতে। দ্বিতীর কাছে রেখে গিয়েছিল অদিতি আহমেদকে। কিন্তু অদিতি আহমেদও দ্বিতীর একটু নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল বলে সমস্যাটা জানাতে গিয়েছিল ডক্টরদের। অতঃপর সাক্ষ্য মেডিসিন নিয়ে ফিরে যখন এমন দৃশ্য দেখল মুখচোখ গরম হলো ওর। থমথমে মুখশ্রী নিয়ে এগিয়ে এল সে। দ্বিতী চেয়ে থাকে। রাগ? নাকি অভিমান?দ্বিতীর কেন মনে হচ্ছে এটা সাক্ষ্যর অভিমান? চেয়ে থেকেই ও হেসে আওড়াল,
“ অভিমান থেকে বলছেন নাকি সাক্ষ্য?”
সাক্ষ্যর চাহনি এবারে শীতল হয়ে এল যেন। কি বুঝাতে চাচ্ছে দ্বিতী? কণাকেই কি ও বেশি গুরুত্ব দেয়? দেয় নাকি? এভাবে তৃতীয় ব্যক্তির সামনে এ প্রশ্নটা করে দ্বিতী আরো বোকামো করল না?সাক্ষ্য রাগে নাক চোখ লাল করে উত্তর করল দাঁতে দাঁত চেপে,
“ না, ভালোবাসা থেকে বলছি। বুঝেননি আপনি? ”
দ্বিতী সরু চাহনিতে চাইল। বলল,
“ বুঝেছি বলেই প্রশ্নটা করলাম। ”
সাক্ষ্যর এই পর্যায়ে এত রাগ হলো। এই তো মনে হচ্ছিল দ্বিতী তাকে কত ভালোবাসে। কত ভালোবাসে! আর এখন? সাক্ষ্য উত্তর করল না। সোজা কণার দিকে চেয়েই উত্তর করল,
“ ঐদিনের পর এতগুলো দিন তোমাকে বলা হয়েছে দ্বিতীর সাথে দেখা করতে। বলেছিলাম না কণা? তুমি দেখা করেছিলে? ফোনকলে একটা সরি অব্দি বলেছিলে? তো এখন কি অযুহাতে তুমি দ্বিতীর সাথে দেখা করতে এসেছো? আন্সার মি..”
কণা হেসে বলল,
“ ভাবি হয়, সে অযুহাতে। আপনাদের পরিবারের সাথে আমাদের পরিবারের তো কম ভালো সম্পর্ক নয়। তাহলে একজন মানুষ ইন্তেকাল করছে আর আমি আসব না?”
“জাস্ট শাটাপ কণা। হসপিটাল নাহলে আমি তোমার গালে থাপ্পড় বসাতাম। ইন্তেকাল করছে বলতে কি বুঝাচ্ছো? কি বুঝাচ্ছো হুহ?”
এই পর্যায়ে সাক্ষ্যর চোখজোড়া হয়ে উঠল লালাভ। লাল টকটকে চোখজোড়া দিয়ে তাকিয়ে ও যখন মুখ শক্ত করল তখন ওর নানী কিছু বলতে নিচ্ছিল। সাক্ষ্য শুনল না। ডিরেক্ট তার মাকে কল করেই বলে উঠল,
“ তোমার ফেমিলি আমার বউয়ের জন্য সিম্প্যাথি দেখাতে কে বলেছে আম্মু? কে বলেছে? আমি বলেছি ওদের এখানে এসে ঢং করে যেতে? ”
ওপাশ থেকে সাক্ষ্যর আম্মু কি বলল বুঝা গেল না। তবে সাক্ষ্য আবারও বলে উঠল,
“ প্লিজ আম্মু, ওদের হয়ে সাফাই গাইবে না। একদম না। ছোট বলে কেউ যা ইচ্ছে তাই করবে আর তুমি মাথায় তুলে নাচবে? এমন হলে তো আমি আমার ওয়াইফের গুরুত্ব নিয়ে শঙ্কায় পড়ব। তোমার উচিত নয় ওর অন্যায় গুলোও দেখা? নাকি উচিত না?”
সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস তুলে ফোনটা একপাশের টুলটায় ছুড়ে রাখল। অথচ ফোনের অপর প্রান্তে তখনও তার মা। এর ঠিক কয়েক মুহূর্ত পর সাক্ষ্যর নানী রাগতে রাগতে বেরিয়ে গেলেন। সাথে নিয়ে গেলেন নিজের নাতনিকেও। রুমটা যখন খালি হলো সাক্ষ্য শুয়ে থাকা দ্বিতীর দিকে চাইল। মুখচোখ শক্ত হয়ে আছে ছেলেটার। অসম্ভব থমথমে, রেগে থাকা মুহূর্তে দ্বিতী ফের বলল,
“যদি এই এক্সিডেন্টটায় মরে যেতাম সাক্ষ্য? তাহলে আমি শিওর আপনার সাথে কণার একটা সংসার হতো। তাই না? সাজি আম্মুও হ্যাপি থাকত, ফেমিলির সবাইও হ্যাপি থাকত। আপনিও…”
সাক্ষ্য চোখ গরম করেই চাইল। ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করল,
“ আমিও? ”
“ আপনিও একটু সময় পর হ্যাপিলি লাইফ কাটাতেন। ”
“ তারপর? ”
“ তারপর আর কি মাস দুয়েক হুজুংবাজুং বকতেন হয়তো আমার জন্য। এরপর কণাকে মেনে নিতেন। একবছর পর কণার কোল জুড়ে বাচ্চা আসত৷ আপনি হ্যাপিই থাকতেন৷ কখনো সখনো আমার কথা মনে পড়লে হয়তো বা আমার কবরে যেতেন, দুয়েকটা কথা বলতেন। আবার চলে এসে কণার সাথে হাসতে খেলতে সংসার করতেন। এটাই বাস্তব। ”
“ বাস্তবতা সম্পর্কে খুব জানেন? ”
“ না জানার তো কিছু নেই। আমি মারা গেলে আপনি নিশ্চয় সারাজীবন একা একা দেবদাস হয়ে ঘুরবেন না সাক্ষ্য। আমি আশা করিও না তা৷ কারণ পৃথিবী শূণ্যস্থান কখনোই পছন্দ করে না। প্রয়োজনের তাগিদে হলেও শূণ্যস্থান ঠিকই পূরণ হয়ে যায়৷ তো সে হিসেবে আমি মারা গেলেও মাস ছয়-সাত পর ঠিকই আপনার জন্য বিয়ের সিন্ধান্ত নেওয়া হতো। এক্ষেত্রে সাজি আম্মু অবশ্য কণাকেই পছন্দ করত। নিজের মেয়ের মতো, আবার আপনাকে ভালোবাসে চ্যুজ করবে না কেন বলুন? দেন কোনভাবে বিয়ে বিয়েটা হয়ে আপনি নারী সঙ্গ পেয়ে সংসারী হয়ে উঠতেন। ”
এই সবগুলো কথাই ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে সাজিয়া আফরোজ শুনতে পেলেন। স্পষ্টই শুনতে পেলেন। ফোনের অপর পাশ থেকে তখন ভাঙা গলায় বলে উঠল,
“ দ্বিতী?”
দ্বিতী হকচকাল কিঞ্চিৎ। ফোন রাখে নি? সাক্ষ্য নিজেও কন্ঠটা খেয়াল করে ফোন তুলতেই সাক্ষ্যর মা ওদিক থেকে বলে উঠল,
“ দ্বিতী, আম্মু তোর চোখে আমি যতোটা খারাপ হয়ে গেছি আমি আসলে অতোটাও খারাপ না রে আম্মু৷ আমি এতোটা নিষ্ঠুর নই যে অন্যের মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী হয়েও সে মেয়েটার বদলে নিজের ভাইয়ের মেয়েকে আনতাম। বরং…বরং পুরো একটা জীবন আমার অপরাধবোধে কেটে যেত আম্মু। কেটে যেত এই ভেবে যে তোর মৃত্যুর আগে একটাবার আমি তোকে বুঝাতে পারলাম না যে আমি একটু হলেও তোকে ভালোবাসি আম্মু। ”
সাক্ষ্য শুধু এইটুকু বলল,
“ ফোন রাখছি আম্মু।”
অতঃপর কল রেখে দ্বিতীর দিকে সামান্য ঝুঁকেই দুই হাত রাখল দ্বিতীর দুইপাশে। বলল,
“আমি হ্যাপিলি লাইফ লিড করতাম তাই না?আমি কণাকেই বিয়ে করতাম তাই না? আমি.. আমি কণার বাচ্চার বাপ হতাম তাই না? কি মনে করেন আমাকে? লোক দেখানো ভালোবাসি আমি? লোক দেখানো? নাকি নাটক করি মনে হয়? ”
দ্বিতী বোধহয় সাক্ষ্যর অমন রাগ রাগ রূপ দেখে চোখ ছোট ছোট করে চাইল। এতগুলো দিন শান্তশিষ্ট থাকা,কান্নাকাটি করে লেপ্টে থাকা ছেলেটা হুট করেই এমন খেপাটে রূপ ধারণ করে এতোটা কাছে এসে এভাবে রাগ ঝাড়বে তা বোধহয় বুঝে উঠে নি সে৷বলল,
“ আপনি এমন চোখ মুখ লাল করে রাগ দেখাচ্ছেন কেন সাক্ষ্য? আমি শুধু বাস্তবতাটা বলেছি। ”
“ ওহ রিয়েলি?বাস্তবতা! ”
“ দেখুন, আমি পুরুষ মানুষদের দেখেছি সমাজে। প্রথম স্ত্রী মরে যাওয়ার পর শতকরা দুয়েকজন বাদে বাকি নিরানব্বই জনই বিয়ে করেছে। সংসার গুছিয়েছেে।বাচ্চাকাচ্চা জন্ম দিয়েছে। এইক্ষেত্রে আপনারও অবশ্য অবশ্যই অধিকার আছে জীবন গুছানোর। ইভেন আমি যদি এই মুহূর্তেও মারা যাই আমি অবশ্যই চাইব আপনার বাকি জীবনটা সুন্দর কাঁটুক।”
সাক্ষ্যর এই পর্যায়ে বোধহয় আরোও রাগ হলো। একেই কণাকে দেখে রাগ লাগল। এরপর ওদের কথা শুনে। এরপর মায়ের সাথে কথা বলে রাগল। এখন দ্বিতীর একের পর এক কথা শুনে আরো রাগ লাগছে।ফোঁসফোঁস করে শ্বাস তুলে সে বলল,
“ দ্বিতী….প্লিজ স্টপ। আর কিছু বলবেন না। ”
হিম, শান্ত গলায় কথাটা শুনে দ্বিতী চাইল। সাক্ষ্য ফের তাকিয়ে বলল,
“ সাক্ষ্য এহসানের ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না দ্বিতীয়বার। প্রশ্ন রাখবেনও না মনে। যদি প্রশ্ন থেকেই থাকে, তাহলে ভাবব আমার ভালোবাসায় ত্রুটি আছে..”
“ প্রশ্ন রাখিনি আমি। শুধু সত্যিটা বলেছি। দেখুন সব পুরুষই প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকাকালীন বলে সে অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। কিন্তু সে মারা যাওয়ার পর বাস্তবতার মুখে পরে হলেও করে তো। তাই না? শতকরা ৯৯% ই বিয়ে করে। ”
“নিরানব্বই পার্সেন্ট বিয়ে করলে আমাকেও করতে হবে তার কোন বাধ্যবাধকতা তো দেখছি না। রাইট? ”
দ্বিতী থম মেরে গেল।সাক্ষ্য আবারও বলল,
“ ঐ ৯৯% বাদে আমাকে কেন ঐ এক পার্সেন্টে ভাবা গেল না যারা প্রথম এবং শেষ স্ত্রীর স্মৃতিটুকু নিয়েই জীবন কাটায়। বলুন, মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম? আন্সার মি..”
দ্বিতী চাইল। ওর এমনিতেই শ্বাসকষ্টের একটু প্রবলেম হচ্ছিল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। এই এতোটা সময় পর বলল,
“ এক সিনিয়র ছিলেন, বুঝলেন সাক্ষ্য? উনার বর উনাকে এত বেশি ভালোবাসতেন। চোখে হারাতেন। সে বর উনি মারা যাওয়ার আট মাস পর বিয়ে করেছেন। পাশাপাশি বাসার এক ছেলে ছিল। ঐ যে আমাদের পাশের বাসার ডক্টর ভাইয়া। উনার ওয়াইফের সাথে উনি কি হ্যাপি দেখেন?ছোট্ট ছোট্ট তিনটে ছানাপোনা আছে। কি সুন্দর সংসার তাই না? অথচ উনারও আগে একটা ওয়াইফ ছিল যাকে উনি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলের। দুর্ভাগ্যবশত বউটা মারা যায়। অথচ ঐ বউটাকেও উনি খুব ভালোবেসেছিলেন। খুব। লাভ ম্যারেজ ছিল। তো কোনভাবে কি বর্তমানের এই হাসিখুশি সংসারটা আর এখনকার বউয়ের প্রতি ভালোবাসা দেখে কারোর মনে হয় উনি আগেও কাউকে পাগলের মতো ভালোবেসেছিলেন? মনে হয়? হয়না। দুনিয়াটা এমনই! সবাই ই এমন। তো আপনাকেও বা কিভাবে ঐ এক পার্সেন্টে রাখতাম আমি? আজ আপনার মনে হচ্ছে বিয়ে করবেন না, কাল আপনার কি মনে হবে তা কিভাবে জানব বলুন? ”
“ঠিকাছে। আজ আমি মারা গেলে কাল তো আপনিও ঠিক দ্বিতীয় বিয়ে করে নিবেন তাই না মিসেস এহসান? আমি তো অনেক মেয়েকেও দেখি দ্বিতীয় বিয়ে করে। ”
দ্বিতী চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। সাক্ষ্য হাসে। বলে,
“ অথচ আপনি যতোটা ইনসিকিউরড, আমি ততোটা ইনসিকিউরড নই মিসেস এহসান। আমি জানি আমার ওয়াইফ আমাকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। আমি যদি কবুল বলার ঠিক পরমুহূর্তেও মরে যেতাম, তবুও আমার ওয়াইফ কখনো দ্বিতীয় পুরুষকে জীবনে জড়ানোর কথা ভাবত না। কখনো না। আই থিংক আপনার চিন্তাধারাটাও এমন হওয়া উচিত। ”
দ্বিতী তাকিয়ে থাকে। একইভাবে বলে,
“ শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আম্মুকে পাঠালাম। অথচ এলই না। চলুন, আমিই বরং ম’রে যাই। তারপর উপর থেকে দেখব আসলেই দ্বিতীয় বিয়ে করেন নাকি? ”
সাক্ষ্যর নাকটা ফুলে উঠল। বেডের দুইপাশ থেকে হাত নিয়ে দ্বিতীর কপালে টোকা মেরে বলল,
“ ম’রার শখ অনেক! ম’রবেন যেহেতুই কষ্ট করে তখন শুধু দ্বিতীয় কেন, একজন পুরুষের যতগুলো বিয়ে করা জায়েজ ততগুলোই করব। কি বলেন? ”
এইটুকু বলেই ও পা বাড়াল। ঠিক রুম ছেড়ে বের হতেই দেখা গেল অদিতি আহমেদ দাঁড়িয়ে আছে। বোধহয় মেয়ের বেডের উপর মেয়ের বর দুই হাতে বর দিয়ে ঝুঁকে ছিল এহেন দৃশ্য দেখেই উনি আর ভেতরে ডুকেননি। সাক্ষ্যর দীর্ঘশ্বাস বের হলো। ধুররর! এই মেয়ে তাকে না রাগালে তো সে ঝুঁকত না। গলা ঝেড়ে সে বলতে নিচ্ছিল। মুহূর্তেই অদিতি আহমেদ বলল,
“ ডক্টর আসছে। মাত্রই বলে এসেছি। ”
সাম্য প্রায় পুরোটা রাত্রি ধরে আর কথার সম্মুখীন হয়নি। একটুও না। পুরোটা রাত সে বাসায়ও ছিল না। একই ধরণের ক্রিস্টাল সোপিশটা খুঁজে গিয়েছে এক বন্ধুকে সঙ্গে করে। অতঃপর পুরোটা রাত্রি খুঁজে এক পাইকারির শপে গিয়ে মিলল ঐ ক্রিস্টাল সোপিশটা। সাম্য মনে মনেই আল্লাহকে শুকরিয়া জানায়। অতঃপর সকাল সকাল এসেই সে হাজির হয়। পুরো রাগ নির্ঘুম থেকেও তার চোখে ঘুম নামেনি। তখন থেকেই কথার দরজায় কয়েকবার ঘুরঘুর করেছে। অথচ কথা তখন ও ঘুম থেকে উঠেনি। দরজা খুলেনি।
খুলবে কি করে। কথা নিজেও যে সারাটা রাত্রি কাঁদতে কাঁদতে ভোর রাতে চোখ লেগেছে। মায়ের দেওয়া শোপিসটা না পেয়ে যখন খুঁজছিল ঠিক তখনই পায়ে গাঁথা সে কাঁচের টুকরোটা হাতে ধরতেই বুঝে গেল সবটা। এমনকি মস্তিষ্কও আন্দাজ করে নিল এটা কে করতে পারে। কে করবে৷ সবটা আন্দাজ করেই নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা হারিয়ে সে সারাটা রাত কেঁদেছে। সারাটা রাত! অতঃপর যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন তার মুখচোখ ফোলা। কান্নার দরুন চোখ গুলোও ফুলে গেলে। আজ আইটেম থাকা স্বত্ত্বেও তার যাওয়া হলো না। যখন উঠে দরজা মেলে বাইরে যেতে নিল ঠিক তখনই সাম্য আড়াল করে রুমে এল। নিজের আনা কাঁচের শোপিসটা ঐ একই জায়গাতে রেখে যখন রুম ছেড়ে চলে যাবে ঠিক তখনই কথা আবারও এল। হেসে বলল,
“ কি?শান্তি তো সাম্য এহসান? কলিজা শান্ত হলো রাইট? ভেঙ্গেই ফেললেন তাহলে আমার অতো শখের জিনিসটা? ”
না, সাম্য ভাঙেনি। তবু চোরের মতো মুখ করল সে। মুখে সাহস ফুটিয়ে বলল ত্যাড়া স্বরে,
“ কি? কি বলতে চাইছিস? কি ভাঙ্গব আমি? ”
“ জানেন না? কি ভেঙ্গেছেন সত্যিই জানেন না?এতোটা ইনোসেন্ট তো আপনি নন৷ ”
সাম্য মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“ ঢং করবি না। যা বলার সরাসরি বল।”
কথার চোখজোড়া আবারও টলমল করল। আবারও কান্না এল। লাল হয়ে এল। বলল,
“ কি মনে হয়? দুনিয়ায় তুমি একাই চালাক? আর সবাই বোকা তাই না সাম্য? বোকা সেজে থাকি বলে আসলেই বোকা ভেবে নিও না। বলেছিলে না আমার শখের কিছু ভেঙ্গে দিবে? ভেঙ্গে দিলে তো ফাইনালি? তোমার কফির মগটাই তো ভেঙ্গেছিল। বাজারে কত পেতে, পেতে না?তাই বলে আমার মায়ের উপহারটা ভেঙ্গে দিলে? কেন ভাঙ্গলে বলো সাম্য? কেন?ওটা বাদে পুরো ঘরটা ভেঙ্গে দিতে। নিষেধ করতাম? করতাম না তো। ওটাই কেন ভাঙ্গলে সাম্য. জানতে না ওটা আমার সুখ দুঃখের সাথী ছিল? জানতে না, ওটা জাস্ট একটা শোপিস হলেও আমি হাজারটা বকবক করতাম ওটার সাথে। জানতে না? ওহ..তুমি তো জেনেবুঝেই করেছো। চেয়েছিলে না আমি কষ্ট পাই? এখন দেখো, আমি কষ্ট পাচ্ছি। সত্যিই পাচ্ছি। আমার দম আটকে আসছের।নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।তুমি খুশি..খুশি তো সাম্য? ”
কথা কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতেই ফের আবারও বলল,
“তুমি খুব নিষ্ঠুর সাম্য৷ খুববব!চোখ বুঝে একবার ভাবো তো, তুমি আমায় যতবার যতভাবে আঘাত করেছো, কষ্ট দিয়েছো আমি তার একাংশও দিয়েছিলাম? দিয়েছিলাম বলো? ছোটবেলায় তুমি মারলে বলতাম না অব্দি তোমায় বকবে বলে। তুমি আমার প্রিয় কিছু নষ্ট করলে প্রথম প্রথম কষ্ট পেতাম। কি ভীষণ কষ্ট পেতাম জানো? মামনি, বাবাই যতক্ষণ না বুঝিয়ে কান্না থামাত ততক্ষণ কাঁদতাম। কান্না থামাতেই পারতাম না৷ সে আমি আস্তে আস্তে প্রিয় জিনিস হারিয়ে ফেলা সহ্য করে নিলাম। প্রিয় জিনিসের করুণ পরিণতিও মেনে নিতে লাগলাম চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ছোটবেলা থেকে তোমায় তুই করে বলার জন্য তুমি কত হুমকি ধমকি দিতে মনে আছে? মারতেও ছোটবেলায়। তখন ছোটবেলায় ভয়ে বাবাইকে বিচার দিলেও বড় হওয়ার পর আমি কখনো তোমার নামে বিচার দিইনি। কখনো তোমার নামে একটা কথাও মামনি বা বাবাইকে বলিনি৷ সবসময় চেয়েছি তোমার কষ্টগুলোর লাঘব করতে,তোমার রাগ ঠান্ডা করতে৷ কিন্তু তোমার মনে আমার জন্য একটু সহানুভূতিও জন্মায়নি কখনো সাম্য। জন্মালে কখনো আমার মায়ের দেওয়া শেষ উপহারটা তুমি এভাবে নষ্ট করতে না। করতে না নষ্ট!”
সাম্য শুধু শুনে গেল। আর দেখে গেল কথার কান্নামাখা মুখটা। অন্যদিন এই কান্নামাখা মুখটা দেখলে ওর যে সুখ সুখ অনুভব হয় তার ছিঁটেফোটাও অনুভব হলো না। কেমন যেন একটা স্থির অনুভূতি নিয়ে সে কিছু একটা আওড়াতে চাইল। বলতে চাইল সে কিছু করেনি। কিন্তু পারল না। নিজের হয়ে একটা যুক্তিও দিতে পারল না সে।
কথা তখনও কাঁদছে। সাম্যের আনা শোপিসটা হাতে তুলে কান্নার মাঝেই হাসল মেয়েটা। বলল,
“ এটা কেন এনেছো? কেন? এটায় আমার মায়ের ছোঁয়া আছে? ভালোবাসা আছে? এটা কি আমার মায়ের দেওয়া বলো? তাহলে কেন এনেছো? জুতো মেরে গরু দার করতে চাইছো তাই না? মহান!মহান সাজার ট্রাই করছো? ”
বলতে বলতেই কথা ঐ ক্রিস্টাল শোপিসটা প্রায় আঁছাড় মেরে ফেলল ফ্লোরে। মুহূর্তেই আওয়াজ তুলে তা আঁছড়ে পড়ে ভেঙ্গে গেল। টকরো টুকরো কাঁচের টুকরোতে ভরপর হলো ফ্লোরটা। সাম্য চমকাল। ও কখনো কথাকে রাগতব দেখেনি৷ কখনো না৷ তবে আজ দেখছে। শুনেছে শান্ত মানুষগুলো রাগলে নাকি ভয়ংকর। আজ তা টের ও পাচ্ছে খুব করে। সাম্য বিস্ময় নিয়ে চাইল শুধু। কথা ততোটা সময়ে ঐ ভাঙা কাঁচের টুকরোর উপর দিয়েই হেঁটে এল। সাম্যের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“ এভাবেই ভেঙ্গেছিলেন আমার শখের জিনিসটা রাইট? এভাবেই তো রাইট? সাম্য এহসান! আপনি শুধু ওটায় ভাঙেননি, আমার হৃৎপিন্ডটকও এভাবে চুরমার করে দিয়েছিন। আমি, কথা আপনাকে ঘৃণা করি। শুধু, এবং শুধুই ঘৃণা করি। এবং আমি আপনার শত্রু তাই না? শত্রুই তো রাইট? প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে চান না আমি কষ্ট পাই। দেখেন আমি পাচ্ছি। কষ্ট পাচ্ছি। কাঁদছি। এই বাড়িতে আসার পর থেকেই কষ্ট পাচ্ছি, গুমরে মরছি।আই..আই হেইট ইয়ু। ঠিক যতোটা আমি কষ্ট পেয়েছি তার চেয়েও হাজারগুণ বেশি ঘৃণা করি। ”
দুইজনাতেই পর্ব ৫২
সাম্য শুধু শুনে গেল কথার চিৎকার। অন্যদিন হলে কথার চিৎকারের বিনিময়ে সেও কিছু বলত। ঠিকই জবাব দিত। অথচ আজ পারল না৷ সত্যিই পারল না। জীবনে প্রথম সে কথার জন্য কিছু এনেছে। তাও এত কষ্ট করে খুঁজে এনেছে। অথচ কথা এভাবে ভেঙ্গে ফেলল? সাম্য ভাবতে ভাবতেই টের পেল ওখানে উপস্থিত হলো তার বাবাও। একটু আগেই সাম্যর বাবা নিজের স্ত্রীর সাথে রাগ দেখিয়ে এসেছেন দ্বিতীর এই অবস্থায় ও উনার পরিবারের মানুষ গুলো ওখানে গিয়ে নাটক করার কারণে। অতঃপর রাগ দেখিয়ে যেই না বের হবে ঠিক তখনই কানে এল ভাঙা কাঁচের শব্দ। অতঃপর এসেই দেখলেন এসব। সাম্যর বারবার কার্যকলাপে উনার মেজাজ হারানোটা স্বাভাবিক৷ তবুও গম্ভীর দৃঢ় গলায় উনি বলে উঠলেন,
“ সমস্যা কি তোমার সাম্য? সমস্যা কি? তুমি কি শান্তি দিবে না আমায়? আসলেই দিবে না?”
