না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৪ (৩)
মাইশা জান্নাত নূরা
ড্রয়িংরুমে মেঝেতে নির্ঝর হাত-পায়ে ভর দিয়ে ঘোড়ার মতো হয়ে আছে। আর নির্ঝরের পিঠে চেপে বসে নির্বাণ আনন্দে দুলছে। নির্বাণ ওর ছোট্ট দু’হাত দিয়ে নির্ঝরের মাথার মাঝামাঝি অংশের চুলগুলো মুঠো করে ধরে আছে যেনো পরে না যায়। নিজের নিরাপত্তার খেয়াল সে নিজেই রাখছে। হাঁটু ভাঙা অবস্থায় চলার সময় চুলে দারুণ টান পড়ায় নির্ঝর বললো….
—“বাপ আমার! এভাবে টানিস না, চুলগুলো ছিঁড়ে টাক হয়ে যাবে আমার মাথা!”
নির্ঝরের এমন কষ্টভরা কথায় নির্বাণের কোনো হেলদোল হলো না। বরং সে আরো শক্ত করে টেনে ধরলো নির্ঝরের চুলগুলো। নির্ঝর মেঝের এপাশ থেকে ওপাশ নির্বাণকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আবারও বললো….
—“এই কম বয়সে টাক পড়লে আমার বিয়ে হবে না, বাপ! আর বিয়ে না হলে তোর খেলার জন্য নতুন সঙ্গী আসবে না। এবার তো বুঝ!”
নির্ঝরের এরূপ কথায় নীরা হেসে ফেললো পাশেই থাকা সোফায় বসা অবস্থায়। নির্বাণ তো নির্ঝরের এই কঠিন শব্দের ব্যবহারে করা একের পর এক মিনতি বাক্য বুঝে উঠতে পারলো না। নির্বাণ ওর নিজের খুশি মনে মেতে থেকে বললো….
—“তল তল ঘোলা তল! নি নি ঝোল মামা ঘোলা ঘোলা! তল ঘোলা তল!”
এই বলেই নির্বাণ আবারও নির্ঝরের চুলে টান দিলো। নির্ঝর দাঁতে দাঁত চেপে বললো….
—“বাবা আমার আর বিয়ে হবে না, ও বাবা আমার আর বিয়ে হবে না।”
সেই সময় তেজ ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলো। ওর পরনে হাফ হাতা কালো রঙের একটি গেঞ্জি, সাথে প্যাস্টেল গ্রিন ট্রাউজার রয়েছে। চুলগুলো এখনও ভেজা আছে কারণ একটু আগেই সে ফ্রেশ হয়েছে। ভেজা থাকার কারণে তেজের চুলগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে গোছালো দেখাচ্ছে। নীরার অপজিট পার্শে সোফায় এসে বসলো তেজ। পরক্ষণেই সিঁড়ি বেয়ে ইলমা আর অনুকে একসাথে নিচে নামতে দেখলো তেজ। ওদের দু’জনের পরনেই সুতি কাপড়ের সালোয়ার-কামিজ রয়েছে। অনুরটা নেভি ব্লু, আর ইলমারটা কলিজা রঙের। কামিজের উপর ছোট ছোট কাঁচ বসানো রয়েছে যা ড্রয়িংরুমের আলোয় আরো ঝকঝক করছিলো। এছাড়া কামিজে থাকা হালকা হাতের কাজ গুলোও স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছিলো।
অনু ওর ওড়নাটা শরীরের চারপাশে ভালোভাবে জড়িয়ে নিয়েছে। আর ইলমা ওড়নাটা টেনে মাথার উপর নিয়েছে।
ইলমার চুলগুলো খোলা অবস্থায় থাকায় ওর সামনের দিকে কিছু অবাধ্য চুল দু’গালের পাশে এসে পড়েছে। যার ফলে ইলমার মুখশ্রী জুড়ে থাকা একধরনের অগোছালো সৌন্দর্য নজরে পড়ছে তেজের।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে আসতেই ওদের দু’জনের উপস্থিতি ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা হালকা পরিবর্তন করে দিলো। তেজ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিলো ইলমার দিকে। পরপরই তেজ নিজের চোখ ও মন উভয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ টানলো। নির্বাণকে পিঠের উপরে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নির্ঝর এবার ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে। নির্বাণকে নিজের কোলের উপর বসিয়ে একপ্রকার হাঁপাচ্ছিলো সে। নীরা তা বুঝে নির্বাণকে নিজের কাছে নিলো। এইমূহূর্তে নির্বাণের সামনে নতুন ৩টি মুখ রয়েছে। তেজ আর অনুকে বাড়িতে ঢুকতেই একঝলক দেখলেও ততোটা খেয়াল ওর ছোট্ট মন রাখতে পারে নি এটা স্বাভাবিক।
নির্বাণ তাই একবার তেজ তো আবার ইলমা পরপরই আবার অনুর দিকে তাকাচ্ছে। ওদের পরিচয় জানার জন্য যেনো নির্বাণের ছোট্ট মন অস্থির হয়ে উঠেছে। নতুন মানুষ দেখলে কিছু বাচ্চারা ভ*য়ে মায়ের বুকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইলেও নির্বাণ সম্পূর্ণ আলাদা। ওর ভিতর নতুনদের সাথে পরিচয় হওয়ার আগ্রহ অনেক বেশি।
তেজ এগিয়ে এসে নির্বাণের সামনে ঝুঁকে নিজের হাত বাড়িয়ে নরম গলায় বললো…..
—“আসো সোনা বাবা, আমি তোমার মেজো মামা হই।”
ড্রয়িংরুমের মেঝেতে বসে থাকা নির্ঝর মনে মনে বললো….
—“হুম, নাও নাও। আমিও শুরুতে এতোটাই এক্সাইটেড ছিলাম ওকে কোলে নেওয়ার জন্য। বাট কোলে নেওয়ার পর এই ব্রিটিশ বাচ্চা আমার ওতো সুন্দর নামটাকে পুরো ঝোলে ডুবিয়ে ছেড়েছে! না জানি তোমার নাম শোনার পর সেটার কোন ফ্লেভারে ফালুদা পাকায়, তেজ ভাই!”
নির্বাণ নিজের কৌতূহলী মুখশ্রী নিয়ে তেজ কোলে উঠলো। তেজ সঙ্গে সঙ্গে নির্বাণের গালে একবার চুমু খেলো। তেজের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির গুলো নিবার্ণের নরম গুলুমুলু গালে লাগায় সে নিজের চোখ মুখ হালকা কুঁচকে নিলো। তেজ বললো….
—“আমার নাম তেজ। আমি তোমার তেজ মামা।”
নির্বাণ ওর ডান হাতের শাহাদত আঙুলটা মুখে পুরে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো তেজের মুখশ্রীপানে। যেনো কিছু একটা নিয়ে গভীরভাবনায় মগ্ন আছে ওর ছোট্ট মস্তিষ্ক। কয়েক সেকেন্ড পর নির্বাণ বললো…..
—“তুমি তেত! তেত মামা!”
তেজ থেকে তেত হয়েছে শুনে নির্ঝরের চোখ-মুখ কুঁচকে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। সে বললো….
—“এইটা কি হলো! আমার নামের বারোটা বাজিয়ে দিলো, নির্ঝর থেকে নি-নি-ঝোল হয়ে গেলো আর তেজ ভাইয়ার নাম কিনা হালকা করে ‘তেত’বললো! এইটা তো খারাপ শোনায় না একদমই! ইয়া আল্লাহ শিশু থেকে জোয়ান, বুড়ো পর্যন্ত সব বয়সের মানুষরা কেনো কেবল আমার সাথেই অ*ন্যায় করে নির্দ্বিধায়! আমার জীবন কি জীবন না? এটা কি পুরো লস প্রজেক্ট হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন আপনি!”
তেজ ওর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে বললো….
—“সাউন্ড ইজ নট ব্যড। তেজকে তেত বলছে। ভালোই লাগছে শুনতে।”
নির্বাণ ওর ছোট্ট আঙুলগুলো দ্বারা তেজের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িগুলো ছুঁয়ে দেখছে। ফলে নির্বাণ ওর আঙুল গুলোতে হালকা শিরশিরানি ভাব অনুভব করছে। আর তৎক্ষনাৎ এই কাজটা যেনো নির্বাণের কাছে একটা নতুন খেলায় রূপ নিলো। এরপর নির্বাণ বারবার তেজের দাঁড়িগুলোতে উল্টো পাশে হাত বুলাতে শুরু করলো। একটু করে হাত বুলাচ্ছে আবার হাত সরিয়ে সেই হাত নিজের মুখের উপর চেপে ধরে শব্দ করে হাসছে। তারপর আবার একই কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে সে।
নির্বাণের এমন কাজে উপস্থিত সবার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। গোমড়ামুখে থাকা নির্ঝরটাও না হেসে পারলো না। কিয়ৎক্ষণ পর নির্বাণ নিজ থেকে ইলমার দিকে হেলে গেলো ওর কোলে উঠার জন্য। ইলমা কিছুটা অবাক হলেও তৎক্ষনাৎ নির্বাণকে নিজের কোলে নিয়ে নিলো সে। তেজ বললো….
—“এই যে, পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অপেক্ষাও আর সহ্য হলো না ওনার। কোলে যাওয়ার কতো তাড়া!”
ইলমা বললো….
—”বাচ্চারা ভালো-খারাপের তফাৎ সহজেই বুঝতে পারে।”
তেজ ভ্রু কুঁচকে বললো….
—”বাই এনি চান্স, আপনি কি আমাকে খারাপ বললেন?”
—”হাটের মাঝে কথা পড়লো, যার কথা তার কানে বাজলো।”
তেজ দাঁতে দাঁত চেপে পুরো অপমান হজম করে নিলো। নির্বাণ ওর ছোট ছোট হাত দিয়ে ইলমার গালের উপরেও তেজের গালের মতো একই কাজ করতে নিলে তা দেখে নির্ঝর হেসে বললো….
—”ওরে পাগলা মেয়েদের দাঁড়ি হয় না।”
উপস্থিত সবাই শব্দ করে হেসে উঠলো নির্ঝরের এমন কথায়। নির্বাণ ওর ডান হাতটা মুঠো মতো করে মুখের কাছে নিয়ে সবার দিকে ঘুরে ঘুরে দেখছে। ওদের হাসির কারণ উপলব্ধি করার ক্ষমতা এখনও নির্বাণের হয় নি। ইলমা হাসি থামিয়ে বললো….
—”আমার নাম ইলমা। যদিও আমি সম্পর্কে তোমার আন্টি হবো কিন্তু তোমার মতো গুলুমুলুর মুখ থেকে আন্টি ডাকটা শুনতে পছন্দ করবো না। তাই তুমি আমায় ইলমা বলেই ডাকতে পারো বা বন্ধু বলে।”
নির্বাণ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে ইলমার মুখশ্রীপানে। সে খুব মনোযোগ দিয়েই শুনলো ইলমার কথাগুলো। তারপর হুট করে ইলমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো….
—”ইম্মা, ইম্মা, ইম্মা বন্তু..!”
ইলমা স্বযত্নে নির্বাণকে নিজের সাথে জড়িয়ে রাখলো। নির্বাণের বর্তমান কম্ফোর্ট জোন ইলমার কোলটা। ইলমা শব্দ করে নির্বাণের মাথার একপাশে চুমু খেলো। তেজ ভ্রু তুলে বললো….
—“ওরে ঘসেটি বেগমের পুত! পরিচয় পেতে না পেতেই একেবারে গলায় গলায় পিরীত জমে গেছে তোর ওনার সাথে!”
নীরা সঙ্গে সঙ্গে “ছ্যাৎ” করে উঠে বললো….
—“মেজো ভাইয়া! ও মোটেও ঘসেটি বেগমের পুত না! ও আমার ছেলে। নীরা খানের ছেলে। বুঝলে..!”
তেজ ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো….
—“তোকে তো চাচা-চাচী কুঁড়িয়ে এনেছিলো বুড়িগঙ্গার ধার থেকে। তোর শরীরে ঘসেটি বেগমের বংশের র*ক্তই বইছে আমি শিউর। তাই তো তোর ছেলের অবস্থাও ওমন হয়েছে!”
—“ইলমা আপা, তুমি অন্তত কিছু বলো মেজ ভাইয়াকে! কেমন কথা বলছে ও আমাকে আর আমার ছেলেকে নিয়ে!”
ইলমা তেজের দিকে তাকিয়ে বললো….
—“আহহ তেজ! ওভাবে বলছেন কেনো আপনি? হিংসে হচ্ছে নাকি আপনার বাবু আমার কাছে আসার তাড়া দেখালো, আবার আমার কোলে কিজের শান্তি খুঁজে নিয়েছে জন্য?”
তেজ এবার আর কিছু বলতে পারলো না। তবে ওর চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো ও আসলেই হিংসে বোধ করছে। এখন সেটা ওর নিজের থেকে নির্বাণের ইলমার প্রতি এতো ঝুঁকে যাওয়ার কারণে নাকি ইলমার নির্বাণের সাথে এতোটা মিশে যাওয়ার চেষ্টা করার কারণে তা বোঝা যাচ্ছে না।
রাতের বেলা…..
বাংলো বাড়ির ডাইনিং টেবিলে বসে আছে ওরা সবাই। অনেকক্ষণ আগেই নির্বাণকে খাওয়ানোর জন্য নেওয়া খাবার সে সব শেষ করতে পারে নি জন্য ঐ পাত্রেই আরেকটু খাবার নিয়ে নীরা নিজের খাওয়া সেরে নিয়েছিলো বিধায় নির্বাণকে ঘুম পাড়ানোর উদ্দেশ্যে নীরা ওর রুমেই রয়ে গিয়েছে।
নির্বাণের কানাডিয়ান কেয়ারটেকার সোফিয়ার খাবার পিহু নিজ দায়িত্বে গেস্টরুমেই দিয়ে এসেছিলো। এখন পিহু সবার পাতে পুনরায় গরম করা ‘ক্ষুদ বিরান’ উঠিয়ে দিচ্ছে। ইউনিক এই খাবার দেখে নির্ঝর বললো….
—”একি ভাত গুলো এতো ছোট ছোট কেনো? আর হলুদ রংয়ের হয়ে আছে। এগুলা কি এক প্রকার খিচুড়ি ভাবী?”
পিহু এবার একে একে সবার পাতে ভর্তাগুলো উঠিয়ে দিতে দিতে নির্ঝরকে বললো….
—”উহুহ এগুলো কোনো খিচুড়ি না। এগুলোকে ক্ষুদ বিরান বলে। এগুলো ধান ভেঙে চাল করার সময় মেশিনের প্রেসারে কিছু কিছু চাল ভেঙে গিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হয়ে যায়। আর এগুলো রান্নার পদ্ধতি যেমন আলাদা খাওয়ার নিয়মও আলাদা। ভর্তাগুলো একটু একটু করে নিয়ে মেখে মেখে খাও। মজা লাগবে।”
অনু পিহুর থেকে শোনার অপেক্ষা করে নি। কারণ সে এই খাবারের সাথে পূর্ব থেকেই পরিচিত। পিহু পুরো বিষয় বাকিদের বুঝিয়ে দিতে দিতে অনুর কয়েক লোকমা খাওয়া হয়ে গিয়েছে। আর সে খুব মজা করেই খাচ্ছে। সারফারাজ, নির্ঝর, তেজ, ইলমা বেশ কৌতুহলতার সাথে ভর্তা মাখানো ক্ষুদ বিরাণের প্রথম লোকমা মুখে নিলো।
আর এরপর আর অপেক্ষা করলো না। ভিষণ তৃপ্তির সাথে ওরা সবাই নিজ নিজ পাতে থাকা সবটুকু খাবার শেষ করলো। নির্ঝর ঝাল খেতে অভ্যস্ত না। আর এই খাবারের আসল মজাই পাওয়া যায় ঝাল ঝাল ভর্তার কারণে। এক প্রকার শোষাতে শোষাতে নির্ঝর ওর খাওয়া শেষ করলো। ঝালের কারণে ওর ফর্সা মুখ লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। পানিও খেয়েছে ইতিমধ্যে ৩ গ্লাস। পেট যেনো ফুলে ঢোল হয়ে আছে নির্ঝরের। অতঃপর সে আর বসার ধৈর্য নিলো না। চেয়ার ছেড়ে উঠে এক ছুটে চলে গেলো নিজরুমের দিকে। সোজা ওয়াশরুমে প্রবেশ করলো। উদ্দেশ্য পেটে জমা পানির ট্যংকি ফাঁকা করা আর মুখের লালা ফেলে ঝাল কমানো। সবার সামনে বিশেষ করে অনুর সামনে থেকে তো লালা ফেলার মতো এমন ঘেন্নাযুক্ত কাজটা করা যায় না! মান-সম্মান বলতে একটা বিষয় আছে। লালা ফেলে ঝাল কমানোর এই পদ্ধতিটা তেজ নির্ঝরকে শিখিয়েছে। নয়তো এমন উদ্ভট কাজ শেখার জন্য আলাদা ওস্তাদ নির্ঝর আর কোথাও খুঁজে পেতো না।
পরেরদিন সকাল বেলা…..
বাংলো বাড়ি থেকে ওরা সবাই বের হয়েছে খান ভিলায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে। অনু যাওয়ার পূর্বে ইলমাকে বলেছিলো, ওদের না গেলে হয় না ওখানে! কিন্তু ইলমা সারফারাজের করা আদেশ বাক্য অনুকে স্মরণ করিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়েছিলো। তেজ আর নির্ঝর তেজের বাইকে করে রওনা করেছে। সারফারাজ ওর বিএমডব্লিউ গাড়িটাতে করে বাকিদের নিয়ে রওনা করেছে।
লম্বা জার্নির পর ওরা সবাই দুপুরের আগে আগেই খান বাড়িতে চলে আসলো। সারফারাজ গাড়ি থামাতেই সকলে গাড়ি থেকে নামলো। নির্ঝরও তেজের বাইক থেকে নেমে দু’হাতে বাতাসে উড়ে এলোমেলো হয়ে যাওয়া নিজের চুলগুলো একটু গোছালো করার চেষ্টা করলো। সারফারাজ আর তেজ চলে গেলো পার্কিং সাইডে নিজের কার ও বাইক রাখতে। অনু ইলমার একহাত জড়িয়ে ধরে আছে। নিজেকে একপ্রকার গুটিয়ে নিয়েছে যেনো সে।
ইলমার ভিতরে ভিতরেও কিছুটা ভয় ও সংকোচ কাজ করেছে। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ নিয়ে কেবল সংকোচহীন ও উৎফুল্ল মেজাজ নিয়ে আছে খান বাড়ির সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য নির্বাণ।
উৎসুক নয়নে সে নিজের চারপাশ দেখছে। আসার পর গাড়ির জানালা বন্ধ করতে দেয় নি নির্বাণ। ড্যব ড্যব করে চেয়ে ছিলো পুরো রাস্তা। বিভিন্ন গাড়ি, পাখি, মানুষদের দেখে সে ভিষণ আনন্দ পেয়েছে যেনো। নির্বাণের কানাডিয়ান কেয়ারটেকার সোফিয়াকে আরেকটা গাড়ি করে এয়ারপোর্টে ছেড়ে আসতে বলেছিলো সকালে একজন ড্রাইভারকে সারফারাজ। কারণ সোফিয়ার ফিরতি টিকিট সে আগেই করে রেখেছিলো। তাই কেবল রাতটুকুই সে বাংলাদেশে কাটালো।
সারফারাজ আর তেজ আসার পরই ওরা সবাই একসাথে খান বাড়ির ভিতরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো। পিহুর চোখ এড়ালো না অনু আর ইলমার মধ্যে কাজ করতে থাকা সংকোচবোধটা। বাকিরা খানিকটা সামনের দিকে এগিয়ে গেলে পিহু ইলমা আর অনুর পায়ের তালে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললো…..
—”ভ*য় বা সং*কোচ সব এখনই মন থেকে হাজার বার ঝেড়ে ফেলতে বললেও তা ঝেড়ে ফেলতে যে পারবে না তোমরা সেটা আমার বুঝতে বাকি নেই। শুধু এতোটুকুই বলবো তোমরা আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো কয়েকদিন আগে আমিও এই একই জায়গাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার অনুভূতিটা আরেকটু অন্যরকম ছিলো কারণ যেদিন এবাড়িতে প্রথম পা রেখেছিলাম সেদিন রাতেই এ বাড়ির বড় বউয়ের দায়ভার বর্তেছিলো আমার উপর। কিন্তু জানো! এ পরিবারের প্রতিটা সদস্য এতো মিশুক, এতো ভালো এনাদের মন-মানসিকতা যে আমার মধ্যকার ভ*য় -সং*কোচ বোধ এক নিমিষেই দূর হয়ে গিয়েছিলো। মনে হয়েছিলো এই পরিবারের সাথে আমার জনম জনমের সম্পর্ক।”
ইলমা স্মিত হেসে বললো….
—”আপনি যেমন ভাগ্যবতী এমন একজন স্বামী ও শ্বশুরবাড়ি পেয়ে তেমনই নিশ্চয়ই আপনার শ্বশুরবাড়ির সবাইও নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেন তাদের মানসিকতার সাথে মানানসই বড় বউ তারা পেয়ে গিয়েছেন ভেবে!”
পিহু হালকা হাসলো কেবল। এর কোনো প্রতিত্তুর সে করলো না আপাতত।
খান বাড়ির মূল দরজা পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো প্রথমেই নীরা আর কোলে থাকা কিউট বয় নির্বাণ। পাশাপাশি একে একে বাকিরাও প্রবেশ করলো। সবার পিছন পিহুর পাশে পাশে হাঁটছে ইলমা ও অনু। ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে নীরার মা আতুশি খান বাদামের খোসা ছাড়াচ্ছিলো আর খাচ্ছিলো। অন্য দিকে রান্নাঘরে সারফারাজ ও তেজের তাহমিনা খান এবং নির্ঝরের মা শিউলি খান একে-অপরের সহযোগিতায় রাতের রান্নার আয়েজন করছিলেন।
সারফারাজ অবশ্য সবাইকে নিয়ে বাড়িতে ফেরার কথা আগেই তাহমিনাকে জানিয়ে দিয়েছিলো। তাই তাহমিনা দুপুরের খাবার খেয়ে আর ভাত ঘুম দেওয়ার পিছনে সময় নষ্ট না করে নিজের মেজ জা’কে নিয়ে কাজে লেগে পড়েছেন। বাদাম ভর্তা পিহু অনেক পছন্দ করে তাই তাহমিনা আতুশিকে দ্রুত বাদামের খোসা ছাড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু আতুশি তো আতুশিই। সে এই গরম গরম বাদাম এর খোসা ছাড়াতে গিয়ে তা খাওয়ার লোভ থেকে নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারে নি। চিনা বাদাম হওয়ায় বাদামের সাইজ ছিলো বড়। ভাগ্যবশত একটা বাদামে ৪টে করে দানাও পাওয়া যায়। তেমনই ১টা বাদাম ছিলে যদি ৪টে দানা বের হয় তার ১টা দানা আতুশি গায়েব করে ফেলে। আবার ৩ টে বের হলে তারও একটা গায়েব করে। এভাবে চলতে চলতেই অনেক কষ্টে-সৃষ্টে সে জমিয়েছে বেশ অনেকটা ছেলা বাদাম।
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৪ (২)
নীরার কোল থেকে একপ্রকার ছটফটিয়ে নিচে নামলো নির্বাণ। তারপর নিজের সবে সবে শক্ত হওয়া পা জোড়া দ্বারা দৌঁড়ে চলে গেলো আতুশির কাছে। হঠাৎ নিজের সামনে ফুটফুটে একটা বাচ্চা চলে আসায় আতুশি যেনো অবাকের শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছে। চোখ বড় বড় করে আতুশি তাকিয়ে আছে নির্বাণের দিকে। আর নির্বাণ হিহি করে হাসছে আতুশির দিকে তাকিয়ে।
